somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

'গণযুদ্ধের পটভূমি' এবং একজন অনাবিস্কৃত 'এস এম তুষার'

২৭ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৫:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বরিশালের বর্তমান প্রজন্মের ক'জন এস এম তুষার কে চেনে-? এই প্রশ্নটি ছুড়ে দেয়া হলে যে জরিপ ফল পাওয়া যাবে তাতে তুষার'কে চেনে এমন কিশোর-তরুনের সংখ্যা খুব বেশী হওয়ার কথা নয়। শতকরা ১০ ভাগ ছেলে মেয়েও যদি তুষার'কে চেনে তা নিশ্চয়ই অবাক করা হবে। আর যারাও বা নিভৃতচারী এই মানুষটিকে চেনে তাদেরও তার সম্পর্কে ধারনা খুব একটা ইতিবাচক নয়। তাদের নেতিবাচক ধারনার কারন তুষারের দীর্ঘ বোহেমিয়ান-বাউন্ডুলে জীবন।

এস এম তুষারের পুরো নাম 'সাদেকিন মোর্শেদ তুষার'। বরিশাল এর ঐতিহ্যবাহী বি এম কলেজের সামনেই তার বাসা। ছোট বেলা থেকে এলাকাতেই বেড়ে ওঠা তার, তবু সবার চেয়ে কেমন যেন একটু আলাদা। বাড়ির উঠোনের কলেজটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতোকত্তর ডিগ্রী নেয়ার অনেক আগে থেকেই সে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা পেশার সাথে। স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছে সে। তবে সাংবাদিকতা তার জীবনের একটা অংশ মাত্র। স্বপ্ন ছিল তার ফিল্ম বানানো। বিপ্লবী সিরাজ সিকদারের জীবন কাহীনি অবলম্বনে "গনযুদ্ধের পটভূমি" নামের একটি 'ডকু-ফিকশন'(তুষারের ভাষায়) ধারার শর্ট ফিল্ম তৈরী করেছিলেন তিনি। যার অধিকাংশ কলা-কুশলীরা ছিলেন ব্রজমোহন থিয়েটারের সেই সময়কার কর্মী। সেই শর্ট ফিল্ম এর এমনই এক কুশলী (অভিনেতা) বর্তমানে বরিশাল অমৃতলাল মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাংবাদিক দেবাষীস চক্রবর্তী একবার কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, ‘সিরাজ সিকদারের উপর ঐ কাজটির পূর্বে বা পরবর্তীতে আজ পর্যন্ত ঐরকম আর কোন কাজ হয়নি । অথচ ঐ কাজটির কোন প্রিন্টও পাওয়া যাচ্ছেনা।’ বিভিন্ন জনের সাথে এনিয়ে আলাপকালে জানা গিয়েছে ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্র বিপ্লবী সিরাজ সিকদারের জীবন কাহীনি নিয়ে নির্মিত হওয়ার কারনেই ঐ শর্ট ফিল্মটি সব প্রিন্ট রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহীনি ডিজিএফআই পুড়িয়ে ফেলেছিল। ঐ সময় এস এম তুষার'ও তাদের অত্যাচারের শিকার হয়েছিল বলে কেউ কেউ জানিয়েছেন। তবে নির্ভরযোগ্য কোন সূত্র এর সত্যতা নিশ্চিত করেনি। অবশ্য এর পরপরই মানুষিক সমস্যায় ভুগতে শুরু করে তুষার। শুরু হয় তার সমাজবিচ্যুত জীবন যাপন। অনেকে মনে করেন মাত্রাতিরিক্ত নেশার কারনে মানুষিক বিকারগ্রস্থতায় মগ্ন হন তিনি।

বিচ্ছিন্ন জীবন উদযাপন কালেও তিনি'অগ্নিযুগ' নামের একটি হাতে লেখা পত্রিকা বের করতেন। শুভাকাঙ্খীদের মাঝে সেই পত্রিকা বিলিয়েই যোগাতো তার মদ ও গাজার খরচ। বিদেশী মদ নয়, বরিশাল মহাশশ্মান ঘাটের মেথর পট্টির হাতে তৈরী মদ 'বিজাড়া'-ই তার কাছে স্বর্গের সুধা। বরিশাল থাকাকালীন বহুদিন সকালে আমার বাসায় গিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে একটি আবদারই জানাতেন, "ঈয়ন, একটু বিজাড়া খাওয়াবা...?" সে কি কাতর কন্ঠের মিনতী। এমনও হয়েছে আমি ধার করে তার জন্য মদের পয়সা এনে দিয়েছি। এরপর খুশি মনে বিদায় নিয়েছেন তিনি। কাছের কিছু মানুষ, যাদের সে আপন ভাবত-তুষার'কে নিয়ে আমার মত এমন মধুর সমস্যায় তাদের অনেকেই পড়েছেন বলেই জেনেছি। আর দু'একটি ঘটনা বলার লোভ সামলাতে পারছিনা। বহুদিন এমন হয়েছে বি এম কলেজ ক্যাম্পাসের পুকুর থেকে একগাদা কলমী শাক তুলে সে তাই নিয়ে হাজির হয়েছেন মেথর পট্টির কোন ঘরের দুয়ারে। শাকের বিনিময়ে একটু মদ খেয়ে আবার নিভৃতে বিদায় নিয়েছেন। আবার এক সকালে সে ঘুম থেকে ওঠার পর তার মা তাকে একটি ডিম খেতে দিয়েছেন। সে ডিমটি না খেয়ে কাগজে মুড়ে হাজির হয়েছেন গাজা বিক্রেতার বাসায়। সেই ডিমের বিনিময়েই গাজা নিয়ে এসেছেন। মাঝে মাঝে সে কোথায় যে ডুব দিত-শত খুঁজেও পাওয়া যেত না তাকে।

এস এম তুষার'কে নিয়ে এভাবে লিখতে থাকলে এই লেখা বোধহয় শেষ করতে পারবো না। আজ আর দু'একটা কথা বলেই শেষ করছি। ব্যক্তিগত ভাবে আমার একজন প্রিয় কবি ও লেখক এস এম তুষার। তার লেখা গান ও কবিতা আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। আত্মীয়তা সূত্রে তিনি সিরাজ সিকদারের ঘনিষ্ট সহচর বিপ্লবী কবি হুমায়ুন কবিরের ভাগ্নে। তার লেখায় তার এই বিখ্যাত মামার প্রভাব ব্যাপক বলে তিনি নিজেই স্বিকার করেন। গদ্য ও পদ্য-এ দুই ধারারই বহু বইয়ের রচয়িতা সে। এর মধ্যে 'অস্ত্র জাতির শেষ কথা' তার অনবদ্য সৃষ্টি বলে জানিয়েছেন বরিশালের স্থানীয় বোদ্ধা মহলের একাধিক সিনিয়র ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক আদর্শেও তিনি তার মামা ধারা প্রভাবিত।

এখনো বেঁচে আছেন এস এম তুষার। তবে তার শরীরের অবস্থা ভালো নয়। অধিকাংশ সময় বাসাতেই থাকেন তিনি। তবু এখনো স্বপ্ন দেখেন বিপ্লবের। একটি 'আর্মস রেবুলেশনের'। মাঝে মাঝেই কয়লা বা ইট দিয়ে দেয়ালের উপর আনমনে লিখে যান তার জীবনের সবচে প্রিয় শ্লোগান- "পুঁজিবাদ নিপাত যাক, সর্বহারা মুক্তি পাক"-। বা কখনো বিমগ্ন চিত্তে লিখতে থাকেন স্বরচিত শিব সংগীত- "অন্ধকার আর নামবে না মা/খান্ডব’ও বনেতে আর/যদু বংশ ধ্বংস হবে/থাকবেনা কৌরব যোদ্ধারা/পশ্চিমের বসতি জ্বলে মা/ঝরো হওয়া বয় যে ঐ/মহাবীর কর্ণের জয় হোক/বলবেনা আর রণাঙ্গণ। "

তুষার ভাইকে দেখিনা অনেকদিন। ইদানীং বরিশালের যে কয়টি মানুষকে দেখার জন্য খুব মন টানছে, এর মধ্যে অন্যতম তিনি। জানিনা কবে বরিশাল যাওয়া হবে, আর যাওয়া হলেও তার সাথে আদৌ দেখা হবে কিনা-সেই পুরানো অনিশ্চয়তা। কখনো যদি কারো এস এম তুষার'কে আবিস্কারের ইচ্ছা হয় তবে সোজা চলে যাবেন বরিশাল বি এম কলেজের পূর্ব গেটের সামনে। সেখানে গিয়ে একটু কষ্ট করে খুঁজে বের করতে হবে "হাশেম কুটির"-নামের বাসাটি। এটিই তার আবাসস্থল। তবে বাসায় গিয়েও তাকে খুঁজে পাবেন, এমনই নিশ্চয়তা দিতে পারছিনা। আমিও যে তাকে খুঁজে পাইনি বহুদিন।

(এই লেখাটি ১২ মে, ০৯-তে লেখা। এরপর বরিশাল গিয়েছিলাম। কিন্তু তুষার ভাইয়ের সাথে দেখা হয়নি। শুনলাম সে ঢাকা এসেছে। এফডিসি, শাহাবাগ আর ছবির হাটের আশে-পাশেও তাকে দেখা গিয়েছে বেশ কিছু দিন। অথচ আমার সাথে দেখা হয়নি। গতকালও তাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। কেউ কি এই এস এম তুষারের সন্ধান দিতে পারেন..?)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৫:৩৬
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×