বাংলাদেশের তত্কালীন কোচ গর্ডন গ্রিনিজকে বরখাস্ত করা হয়েছিল সেই বিশ্বকাপে। তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিল এমন একটা দিনে যার একদিন পরেই জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ব্যাপারটি লজ্জা দিয়েছিল সবাইকে। লজ্জার মাত্রাটা আরো বেড়ে গিয়েছিল, গর্ডন গ্রিনিজ বিশ্ব ক্রিকেটের একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব বলে। এই ঘটনাটি জাতি হিসেবে আমাদের মাথা উঁচু তো করেইনি, বরং এতে আমাদের ভদ্রতা জ্ঞান নিয়েও বহির্বিশ্বের প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ তৈরী করে দিয়েছিল।
১৯৯৬ সালে গর্ডন গ্রিনিজের মতো একজন বিখ্যাত ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব যখন বাংলাদেশের কোচ হয়ে এসেছিলেন, তখন পুরো জাতি বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নে বিভোর। বর্তমানের মতো বিশ্বক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়েও এদেশের পদচারণা ছিলনা। এসিসি ট্রফিতে আমিরাত,ফিজি পাপুয়া নিউগিনির মতো ক্ষুদে ক্রিকেট শক্তির বিপক্ষে জয়ও আমাদের তখন আনন্দে উদ্বেলিত করতো। এদেশে শীতকালে সফর করতে আসতো, বুড়োটে খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া এমসিসি, ডেকান ব্লুজ কিংবা হংকংয়ের মতো দলগুলো। কেনিয়াতে অনুষ্ঠিত আগের (১৯৯৪) আইসিসি ট্রফিতে ব্যর্থতা যখন আমাদের ৯৬’র বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নকে ভুলণ্ঠিত করেছিল । তাই এদেশের ক্রিকেটকে সাফল্য স্বপ্নে জাগাতে সুদূর বার্বাডোজ থেকে এসেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের অন্যতম কাণ্ডারি গর্ডন গ্রিনিজ।
গ্রিনিজ এদেশে থাকলেন তিনবছর। ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়াতে অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফিতে আকরাম-আতহার-মিনহাজুল-আমিনুল-রফিক-হাসিবুল-খালেদ মাসুদ-খালেদ মাহমুদদের নেতৃত্ব দিলেন অবিস্মরনীয় এক সাফল্যে। এদেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলো। বিশ্বকাপের জন্য দলকে তৈরী করলেন অনুপম মমতায়। এত বড় মাপের একজন তারকা হয়েও মিশে গেলেন আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেললো, ভালো করলো অথচ গর্ডন বিদায় নিলেন নিরবে, মাথা হেঁট করে।
কথিত রয়েছে, নিরানব্বই সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে টেস্ট মর্যাদার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন গর্ডন। আর তাতেই ক্রিকেট বোর্ডের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরাগভাজন হন তিনি। অনেকেই বলেন, বিশ্বকাপের সময় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গর্ডন গ্রিনিজকে বরখাস্ত করে অপদস্থ করার এক অসত্ ও অসভ্য পরিকল্পনা হয়েছিল পর্দার অন্তরালে। এটা করাই হয়েছিল টেস্ট মর্যাদা নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত মত দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে। তবে এ ব্যাপারে কখনোই সঠিক ঘটনাটি জানা যায়নি। যেসব কর্মকর্তাদের সঙ্গে গর্ডন গ্রিনিজের সমস্যা হয়েছিল, তাঁরা সকলে প্রভাবশালী হওয়ার কারণেই এ ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে থেকেছেন বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপে খেলা খেলোয়াড়েরা থেকে শুরু করে সকলেই। পুরো ব্যাপারটিই পর্দার একেবারে অন্তরালে হওয়ার কারণে তা থেকে গেছে সংবাদ মাধ্যমের নাগালের বাইরেই।
বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ দলের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ সদস্য মিনহাজুল আবেদীন, ফারুক আহমেদ, আকরাম খান, খালেদ মাসুদ ও খালেদ মাহমুদ সেদিনের সেই দুঃখজনক ঘটনার সাক্ষী। পর্দার আড়ালে কি হয়েছিল খেলোয়াড় হিসেবে তাঁরা তা জানেন না বা সেই ব্যাপারে তাঁদের কোনো আগ্রহ ছিলনা বলেই জানালেন। তবে পাঁচজনই একবাক্যে স্বীকার করেছেন, গর্ডন গ্রিনিজ যে মাপের ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব, তাতে তাঁকে এভাবে বিদায় করে দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটই অসম্মানিত হয়েছে।
গর্ডন গ্রিনিজকে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে নিবেদিত প্রাণ বিদেশি কোচ হিসেবে বর্ণনা করেছেন খালেদ মাহমুদ। যেদিন গর্ডনকে বিদায় করে দেওয়া হয়, সেদিনই পাকিস্তানকে হারায় বাংলাদেশ। আর সেদিনই দুর্দান্ত বোলিং করে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন মাহমুদ।
খালেদ মাহমুদ জানালেন, নর্দাম্পটনে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি খেলতে যাওয়ার সময় মনেই হয়নি, আজকে গর্ডন বরখাস্ত হবে। সে সাধারণত বাংলাদেশের খেলার সময় জার্সি পড়েই থাকতো। অন্য ম্যাচগুলোর মতো, সেদিনও বাংলাদেশের জার্সি পড়ে টিম বাসে করে সে আমাদের সঙ্গে মাঠে আসে। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সময় পুরোটাই তিনি ড্রেসিংরুমে ছিলেন। ব্যাটিং শেষে ড্রেসিং রুমে ফেরার পরপরই তিনি সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন, হাত মেলালেন, বিদায় বলে বেরিয়ে গেলেন। খুবই খারাপ লাগছিল। আরো খারাপ লাগছিল, ম্যাচটি জিতে যাওয়ার পর। প্রথমবারের মতো আমরা একটি টেস্ট দলকে হারালাম। গর্ডন আমাদের পেছনে এতো পরিশ্রম করলো, অথচ ওকে ছাড়াই এত আনন্দের একটা দিন আমাদের উদযাপন করতে হল।
ফারুক আহমেদ বলেন, গর্ডনের সেই বিদায় জাতি হিসেবে আমাদের মাথা হেঁট করে দিয়েছিল। যার চুক্তিই শেষ হয়ে যাচ্ছে পরেরদিন, তাঁকে এভাবে বিদায় না দিলেও আমরা পারতাম। সেদিন আমি খেলিনি, পুরো সময়ই ড্রেসিং রুমে ছিলাম। জানি কি হয়েছিল, সেগুলো না হয় নাই বললাম।’
খালেদ মাসুদ পুরো ব্যাপারটিকেই কিছু বোর্ড কর্মকর্তার নোংরামি হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘আমরা জানি না কি কারণে গর্ডনকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে যাই হোক না কেন, এতে আমাদের সম্মানই নষ্ট হয়েছে।’
খালেদ মাসুদ গর্ডন গ্রিনিজকে এদেশের ক্রিকেটের নতুন দিনের দিক নির্দেশক হিসেবে অভিহিত করে বলেন, গর্ডন আসার পরেই আমরা আধুনিক ক্রিকেটের অনেক কিছুর সঙ্গে পরিচিত হই। এদেশের ক্রিকেটের আজকের উত্থানের পেছনে গর্ডন গ্রিনিজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।’
আকরাম খান এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারেন সেদিনের প্রতিটি মুহূর্ত। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ম্যাচে বিপুল বিক্রমে ৪২ রানের ইনিংস খেলার পর আকরাম যখন মাঠ থেকে ফিরলেন তখন তিনি আবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন গর্ডন সবার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে, সবাইকে বিদায় জানাচ্ছে। ‘আমার কাছে এসে গর্ডন বলল, আকরাম আমি যাচ্ছি, তোমাদের ক্রিকেট বোর্ড আমাকে বরখাস্ত করেছে। ভালো থেকো।’ জানালেন আকরাম খান। অবাক হয়ে আকরাম জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন কি হয়েছে? জবাবে স্মিতহস্যে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে যান গর্ডন। আকরাম খান বলেন, ‘আমাদের দলের প্রতিটি খেলোয়াড়কেই গর্ডন খুব স্নেহ করতো। তাঁর অমন বিদায় আমাদের প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিল।
মাহমুদ, ফারুক, মাসুদ ও আকরামের তুলনায় মিনহাজুল আবেদীন অনেকটাই পেশাদারিত্বের সঙ্গেই দেখতে চান নিরানব্বইয়ের বিশ্বকাপে গর্ডনের বিদায়ের ব্যাপারটি। তিনি বলেন, ‘দেখুন পৃথিবীর সব দেশেই ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে কোচের সমস্যা হয়। কোচকে বরখাস্ত করা হয়, এসব নিয়ে খেলোয়াড়দের মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। আমরাও সেদিন ব্যাপারটি নিয়ে মাথা ঘামাইনি। যার প্রমাণ আমরা মাঠে রেখেছিলাম ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার, সাঈদ আনোয়ার, সেলিম মালিক ও শোয়েব আকতারদের পাকিস্তানকে হারিয়ে। তবে মিনহাজুল বলেন, ‘ক্রিকেট বোর্ড আরো একটু সংযমী হলেই ব্যাপারটি এতটা বিতর্কিত হতো না।’
১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জেতার পর বাংলাদেশ সরকার গর্ডন গ্রিনিজকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দিয়েছিল। নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গর্ডনকে দেওয়া হয়েছিল একটি পাসপোর্ট। এতকিছুর পরেও গর্ডন আজো সেই পাসপোর্টটি রেখে দিয়েছেন যত্নে সঙ্গে। মাঝে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সঙ্গে বাংলাদেশের এসেছিলেন তিনি সবকিছু ভুলে। এদেশের মাটিতে তিনি সেবার পা রেখেছিলেন বাংলাদেশের একজন গর্বিত নাগরিক হিসেবেই, ভিসা ছাড়াই।
গর্ডন গ্রিনিজ এদেশকে, এদেশে তাঁর নাগরিকত্বকে সম্মান দিয়েছিলেন ঠিকই, সেই সঙ্গে আমাদের পেতে হয়েছে জাতি হিসেবে একরাশ লজ্জা।
পুরো লেখাটাই প্রথম আলো থেকে কপি করা।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৩:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


