somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... কন্সপিরেসি অফ সাইলেন্স
আমাদের পৃথিবীটা নির্ঝঞ্জাট ছিলো না কখনোই। আর শিল্প-সাহিত্যের জায়গাটা তো নয়ই। কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না যে তার শিল্পের জায়গাটা সে মসৃণ পেয়েছে। কতরকমের অদৃশ্য বাধা যে আমাদের সামনে এসে হাজির হয় তার ইয়ত্তা নেই। কবি-শিল্পীদের হাজার রকম বাধা পেরোতে হয়। সে সমস্ত বাধা পেরোতে তারা একটু থ্রিলও অনুভব করেন বটে। কিন্তু যে বাধা পেরোতে কবিকে হতে হয় অসৎ? কবিকে নামতে হয় ভিলেজ পলিটিক্সের চেয়েও নোংরা রাজনীতিতে সেটা কেমনতর বাধা? অথচ আজকের কবি-শিল্পীদের সেখানেই নামতে হচ্ছে। হচ্ছে মানে তারা নামতে বাধ্য হচ্ছে। কেননা আজকের এই সময়ে সাহিত্যের বি¯তৃত ভূমিতে একজন কবি অথবা কলমশিল্পীকে যতরকমের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তার মধ্যে প্রধানতম হলো সাহিত্যের নোংরা রাজনীতি। অবশ্য এই নোংরা রাজনীতি বেশি প্রকট হয় সেখানে, যেখানে সচেতন পাঠক সমাজের অভাব অনুভূত হয়। কারণ যেখানে সচেতন পাঠকসমাজের অভাব থাকে সেখানে সাহিত্যের মূল নিয়ন্ত্রণটা আপাত হাতে নিয়ে নেয় মিডিয়া। আর একথা সর্বজন বিদিত যে, মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণটা সবসময় থাকে ভাঁড় সম্পাদক ও তাদের সৃষ্ট মিডিওকার কবি-সাহিত্যিকদের হাতে।

কবিতে কবিতে ঈর্ষা ও অসূয়ার যে ধারাটি আমাদের সমাজে প্রচলিত তা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কালিদাস থেকে চণ্ডীদাস, হোমার থেকে চসার কেউ-ই বোধ হয় এই সমস্যার হাত থেকে রেহাই পায়নি। কিন্তু পাঠকই সবসময় এই সমস্যার সমুচিত জবাব দিয়ে দিয়েছে কূট-চাল চালকদের বিরুদ্ধে। ফলে এই ঈর্ষা ও অসূয়ার ধারাটি মেনে নিয়েই আমাদের পথ চলতে হয়। পাঠক সচেতন থাকলে এই সমস্যার সুরাহা আপনা-আপনিই হয়ে যায়। অবশ্য সচেতন পাঠক কোন না কোন সময় পাওয়াই যায়। আজকের পাঠক অচেতন থাকলেও ভবিষ্যতের পাঠক সচেতন হবেই। কিন্তু সমস্যা হলো আজকের পাঠক যদি অচেতন বা অসচেতন থাকেন তাহলেই গা নেড়ে চেড়ে বসে ভাঁড় সম্পাদক ও মিডিওকারেরা। পাঠকের এই অসচেতন অবস্থার সুযোগে দলে ভারি মিডিওকার ও ভাঁড় সম্পাদকেরা নিজের গোষ্ঠীর লেখকদের এমনভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করে যেন তারা এক একজন কালিদাস বটে। বর্ষসেরা, যুগসেরা, শতাব্দীসেরা, এই বাছাই, সেই বাছাই ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করে পাঠকের চোখ কপালে তুলে দিয়ে পাঠককে বাধ্য করে সেই সব বস্তাপচা গিলে খেতে (অবশ্য তাদের সবাই যে নষ্ট হয়ে যাওয়া বাতিল তা আমি বলছি না। অবশ্যই সত্যিকারের ভাল লেখকরাও সেই তালিকায় ঠাঁই পায়। তা না হলে নষ্টদের তারা কাদের ঘাড়ে চাপিয়ে নদী পার করাবে)। অপরদিকে এর বিপরীত ঘটনাও ঘটেÑ যদি তারা দেখে যে তাদের গোষ্ঠীর কোন লেখকের ভাল কিছু একবারেই বলা যাচ্ছে না তখন শুরু হয় পরিকল্পিত সমালোচনা। চতুর্দিক থেকে এমন বিশেষ বিশেষ কায়দায় সমালোচনা শুরু হয় তখন পাঠক ভাবতে বাধ্য হয়- না জানি এর ভেতরে কী বিশেষ মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে? এই তো আমাদের নষ্টভ্রষ্ট সময়। আমাদেরই অসচেতনতার সুযোগে আমাদেরই মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছে একদল পরজীবী।

১৮৭৩ সালের শেষ দিককার কথা। পড়ন্ত বিকেলে প্যারির এক ক্যাফেতে এসে উঠলেন আঠার বছর বয়সের এক যুবক। এর প্রায় চার মাস আগে যুবক এক কাব্য রচনা করে মায়ের কাছ থেকে পয়সা চেয়ে নিয়ে নিজেই তা প্রকাশ করেন। বইটি ডাকযোগে পরিচিতদের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন প্যারির প্রায় প্রতিটি সাহিত্যপত্রিকা, কবি ও আলোচকদের। কারণ তিনি আশা করেছিলেন বইটির অনুকূলে যথেষ্ট রিভিউ হবে এবং সাড়া পড়বে। কিন্তু তিনি প্যারি এসে দেখেন যে, তার বইটি সম্পর্কে কেউ কোন কথা বলছে না। এমনকী তার বইটি যারা পড়েছেন এবং জেনেছেন তারাও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। রাগে, দুঃখে ােভে যুবক প্যারি থেকে পায়ে হেঁটে চলে আসেন নিজের গ্রাম শার্লে ভিলে। বাড়ি ফিরে সমস্ত পাণ্ডুলিপি এবং বইটির অবশিষ্ট কপি রাস্তায় জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেন। বাকি জীবনে আর কবিতার পথে পা বাড়াননি। ফ্রান্সের সুরম্য নগর ছেড়ে আফ্রিকার জঙ্গলে গিয়ে শুরু করেছিলেন বন্দুক চোরাচালানের ব্যবসা। অথচ ঐ ঘটনার বছর কয়েক পরে প্যারির এক পত্রিকার জনৈক সহ-সম্পাদক তাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন যে, ফরাসি কবিতার জগতে তিনি এখন কিংবদন্তী। প্যারি তার জন্য অপো করছে। কিন্তু তিনি গা করেননি। কারণ ঐ আঘাত তার পে সহ্য করা সম্ভব হয়নি। মৃত্যু পরবর্তীতে ঐ যুবক কবিতার ইতিহাসে ফিরে এসেছিলেন সিম্বলিস্ট ও সুররিয়ালিস্টদের প্রধান পুরুষ হয়ে। তিনি জ্যাঁ আর্তুর র‌্যাঁবো। আর যে গ্রন্থটি নিয়ে এত কাণ্ড হয়ে গেল সে গ্রন্থটি তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি নরকে এক ঋতু। তাহলে কী হয়েছিল সেদিন? কেন এমনটি হয়েছিল? সেদিন যা হয়েছিল তাকে এক কথায় বলা যায় কন্সপিরেসি অফ সাইলেন্স। আর এমনটি হয়েছিল এইজন্য যে আর্তুর র‌্যাঁবো ভাঁড় সম্পাদক ও পরজীবী লেখকদের গোষ্ঠীভূক্ত বা অনুগামী হতে চাননি বা পারেননি বলে।

কন্সপিরেসি অফ সাইলেন্স। নিরবতা পালনের মধ্য দিয়ে একটি ভাল কাজ, একটি ভাল শিল্পকর্মকে লোক চুর অন্তরালে রেখে দিয়ে তাকে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার ষড়যন্ত্রই হলো কন্সপিরেসি অফ সাইলেন্স। অর্থাৎ ভাল কাজটিকে নিয়ে তারা ভাল বা মন্দ কোন কথাই বলবে না। তাদের ধারণা অচর্চিত হতে হতে একদিন তা কালের গহব্বরে হারিয়ে যাবে। যদিও তেমনটি হয় না কোনদিন। একদিন তা সত্যি সত্যি সূর্যের আলো ফোটে বেরিয়ে আসে। তথাপি ণিকের জন্য হলেওÑসাহিত্যের মাঠে যারা নোংরা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাদের হাতেÑ কন্সপিরেসি অফ সাইলেন্স হয়ে ওঠে এক ভয়ঙ্কর নিরব মারণাস্ত্র। কারণ এই খেলায় অনভ্যস্ত বা অনীহা প্রকাশকারী কবি-শিল্পীরা রাগে, দুঃখে, সাহিত্য থেকে অকাল বিদায় নিতে পারেন। যা একার্থে একজন কবির মৃত্যুই। অন্যদিকে যারা এই খেলায় সিদ্ধি লাভ করেন তাদেরও মননের মৃত্যু ঘটে। আর কমিটেড কেউ যদি পাঁকে পড়ে এই খেলায় অংশগ্রহণ করে তবে একদিন টের পায় ভণ্ডামী এবং মুখোশ দুটোকেই একত্রে ধারণ করে আছে তারা। সেদিন নিজের ভেতরের ফাঁপা সত্যটা টের পায় তারা। একজন কবি বা শিল্পীর জীবনে এর চেয়ে তো মৃত্যু ভাল।

ভাঁড় সম্পাদক ও পরজীবী মিডিওকার কবি লেখকরা সুশীল কায়দায় কন্সপিরেসি অফ সাইলেন্সকে কাজে লাগাতে চায় পাঠকের অসচেতনতার সুযোগে। কিন্তু পাঠক চিরকাল বোকা হয়ে থাকে না। চিরকাল তারা অন্যের চোখ দিয়ে দেখে না। কোন না কোনদিন তারা নিজের চোখ দিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দেখে। সেদিন এইসব সুশীল ভাঁড়দের সমস্ত বুজরুকি ফাঁস হয়ে যায়। সেদিন ঠিকই স্বমহিমায় হাজির হন র‌্যাঁবো, জীবনানন্দ। কিন্তু এটাও তো সত্যি, এই কন্সপিরেসির জন্যই র‌্যাঁবো, জীবনানন্দের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। যে র‌্যাঁবো দুনিয়াজোড়া কবিতাকে মুক্তি দিয়েছিলেন অনুশাসন থেকে সেই র‌্যাঁবো এই কন্সপিরেসির কারণেই অকালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিদায় নিয়েছিলেন কবিতা এবং ৩৭ বছর বয়সে বিদায় নিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে। আজকে একজন জীবনানন্দ গবেষক জীবনানন্দের উপর একটি গবেষণাকর্ম সম্পাদন করে যে অর্থ উপার্জন করেন এই কন্সপিরেসির কারণে জীবনানন্দ জীবদ্দশায় নিজের লেখা থেকে তার সিকিভাগও অর্জন করতে পারেননি। অথচ কে জানে জীবনানন্দের পারিবারিক কলহের মূলে ছিল আর্থিক দৈন্যতা। অপরদিকে দলে ভারি মিডিওকার লেখকরা ভাঁড় সম্পাদকের কল্যাণে গাড়ি বাড়ি ও সেলিব্রেটির ফানুস নিয়ে কী বড়াই-ই না করছে।


আগেই বলেছি, সুশীল ষড়যন্ত্রকারীদের ধারনা, অচর্চিত হতে হতে একটি ভাল কাজ কালের গহব্বরে হারিয়ে যাবে। যদিও তেমনটি কখনও হয় না। একদিন না একদিন তা ঠিকই সূর্যের আড়াল ভেঙে বেরিয়ে আসে মানুষের সামনে। আর এটাই তো প্রত্যেক সৎ লেখকের প্রকৃত ভরসার জায়গা। কিন্তু তারপরও কথা থাকে। কালের বিচার সমকালে হলে তি কী? একজন সৎ লেখক যদি সমকালে, জীবদ্দশায় নিজের অর্জন দেখে যেতে পারেন, নিজের প্রাপ্য সম্মান নিয়ে যেতে পারেন, তাতে মন্দ কী? এমনটি হলে জাতি হিসেবে আমাদেরই তো গর্বিত হওয়ার কথা। পাঠক হিসেবে আমাদেরও সম্মানিত হওয়ার কথা। তবে তার জন্য চাই কন্সপিরেসি অফ সাইলেন্সের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়া। প্রয়োজন পাঠকের জেগে ওঠা। ভাঁড় সম্পাদক ও পরজীবী মিডিওকারদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখা। নিজের সৎ সাহিত্যকে নিজেদেরই কদর করা। কেননা যে জাতি সৎ সাহিত্যের কদর করে না সে জাতির কেউ সৎ সাহিত্য তৈরিও করে না।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29097769 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29097769 2010-02-14 19:28:01
মিথ্যামিথ্যি
ভাবো, পানির চাহিদা আমি মদের যোগানে মেটাইÑ- এই মিথ্যের গল্প দিয়ে প্রমাণিত যে সত্য, মানবজীবন এর বেশি কিছু নয়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29092920 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29092920 2010-02-07 17:26:51
আমার কন্যা নোয়ার জন্য সবার দোয়া চাই


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29079502 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29079502 2010-01-16 13:40:54
লিটলম্যাগ নিয়ে দু’চার কথা
লিটলম্যাগ শব্দটির সাথে আন্দোলন শব্দটি কেন জরুরি? আগে এ প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। তারও আগে মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন লিটলম্যাগ বলতে আমরা কী বুঝি? লিটলম্যাগ যাকে আমরা বাঙলায় বলি ছোটকাগজ, সেই ছোটকাগজ কার প্রেক্ষিতে ছোট আর কিসের নিক্তিতে ছোট? আয়তনে নাকি বোধবুদ্ধিতে? নাকি ব্যঙ্গ করেই বলা হয়েছিল ছোটকাগজ? প্রশ্নগুলো নিয়ে একটু ভাবা দরকার। প্রতিটি শিল্প আন্দোলন উন্মেষকালে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়েছিল প্রচলিত মূল্যবোধ ও মতাদর্শে বিশ্বাসী লোকদের কাছে। যেহেতু মিডিয়ার বড় ও বিশাল অঙ্গনটি তাদের দখলে ছিল এবং সেখানে নতুনদের সৃষ্টিকর্ম ও মতাদর্শ প্রচারের সুযোগ ছিল না আর সৃষ্টিশীল মানুষেরা বরাবরই ছিল একটু খেয়ালি প্রকৃতির- রামকিঙ্কর বলতেন, খেয়াল সবই খেয়ালে আঁকা- ফলে তাদের কাছে বিশাল মিডিয়া তৈরি করার মতো অর্থকড়ি থাকতো না আর তাই তারা তাদের শিল্পকর্ম ও মতাদর্শ প্রচারের জন্য ছোট ছোট পত্রিকা বের করতেন। আকারে সেগুলো খুবই ছোট হতো কিন্তু চিন্তা ও চেতনায় বাঘা বাঘা মিডিয়াকেও পেছনে ফেলে দিত। কালক্রমে সেই পত্রিকাগুলোই লিটলম্যাগ বা ছোটকাগজ নামে পরিচিতি পায়। লিটলম্যাগ আন্দোলন কেবল শিল্প সাহিত্যকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেনি। সুররিয়ালিজম, এক্সপ্রেশেনিজম প্রভৃতি শিল্প আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেমন লিটলম্যাগ আন্দোলন গড়ে উঠেছে তেমনি মার্ক্সবাদকে কেন্দ্র করেও লিটলম্যাগ আন্দোলন গ্রো করেছে। নয়া কৃষি আন্দোলনকে কেন্দ্র করেও ইদানিং লিটলম্যাগ আন্দোলন গড়ে উঠছে। সেই প্রেতি থেকে বিচার করলে আমাদের দেশে লিটলম্যাগ আন্দোলন তেমনভাবে গড়ে উঠেনি, গড়ে উঠার কোন যুৎসই হেতুও তৈরি হয় নি। বাংলা কবিতায় লিটলম্যাগের প্রসঙ্গ এলেই সর্বাগ্রে আমরা বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা পত্রিকার কথা বলি, কিন্তু আমাদের একথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, কবিতা কখনোই লিটলম্যাগ ছিল না। একটা উৎকৃষ্টমানের কবিতাপত্রিকা ছিল বটে। কিন্তু লিটলম্যাগ যে সমস্ত কমিটমেন্ট দাবি করে তা তাতে ছিল না। কয়েকজন তরুণ কবির কবিতা এতে স্থান পেয়েছে ঠিক, তাদের ভেতর অভিনবত্ব ছিল, ছিল নতুন চিন্তাও কিন্তু লিটলম্যাগ করার মতো পরিস্থিতি তখনো তারা তৈরি করতে পারেনি। তাদের কবিতা কবিতা পত্রিকা ছাড়াও প্রতিষ্ঠিত কাগজেও স্থান পেয়েছে। এমনকী কবিতায় রবীন্দ্রনাথের কবিতাও প্রকাশ পেয়েছে। তাছাড়া তখনকার সাহিত্য অঙ্গনের অধিপতি রবীন্দ্রনাথও তাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ফলে তেমন কোন বাঁধার মুখে তারা পড়েনি। সাহিত্যের পারস্পারিক ঈর্ষা বা কাব্যহিংসার যে জায়গাটি থাকে সে জায়গাটি থেকে নিজেদের উৎকর্ষ বিধানের জন্যই কবিতা পত্রিকার জন্ম হয়েছিল। কারণ আমরা দেখি কবিতায় বুদ্ধদেব বসুরা কোন নির্দিষ্ট শিল্প আন্দোলনকে ফলো করেনি এমনকি তারা কোন দর্শন অথবা মেনুফেস্টোও ঘোষণা করেনি। ছোটকাগজ প্রশ্নে কবিতার চেয়ে আমি বরং তত্ত্ববোধিনীকে এগিয়ে রাখতে চাই। ছোটকাগজ আন্দোলনে তত্ত্ববোধিনী আমাদের প্রথম ধাপ এবং এখনও পর্যন্ত এর চেয়ে ভাল কোন উদাহরণ আমরা তৈরি করতে পারিনি। তত্ত্ববোধিনী যে যাত্রার সূচনা করেছিলো তাকে আমরা এগিয়ে নিতে পারতাম, কবিতা সে সম্ভাবনাও তৈরি করেছিলো কিন্তু কেন জানি শেষ পর্যন্ত হয়নি। কয়েক দশক পরে হাংরি জেনারেশন আবারও লিটলম্যাগের প্রেতি তৈরি করলো। কিন্তু হাংরিও অকালে দম ফুরিয়ে মাঝপথে হাটুভাঙা দ’র মতো পড়ে রইলো।

বর্তমান সাহিত্যে লিটলম্যাগের এই দুরবস্থা শুধু বাঙলা সাহিত্যেই নয় বরং এই অবস্থা সামগ্রিক। লিটলম্যাগ আন্দোলন কবিতার প্রান্তর ছেড়ে নয়া কৃষি আন্দোলনে জায়গা করে নিলেও কবিতা লেখা তো আর বন্ধ হয়ে যায়নি। ফলে কবিতার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য লিটলম্যাগের স্থান দখল করে নিয়েছে কবিতাকেন্দ্রিক বিভিন্ন পত্রিকা। যেগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে। কবিতার উৎকর্ষ বিধান, নতুন কবির দাঁড়াবার জায়গা করতে আমাদের কবিতা পত্রিকাগুলো- যেগুলোকে কবিতার কাগজ বললে সুবিধা হয়- গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই কবিতার কাগজগুলো ভিন্ন আঙ্গিক থেকে একই আদর্শ ধারণ করছে। বিভিন্নজনের ভিন্ন ভিন্ন কনসেপ্ট রয়েছে সত্যি কিন্তু সেই কনসেপ্টগুলো আবার একবিন্দুতে এসে মিলে যায়। সেই বিন্দুটি প্রগতিশীল চিন্তা এবং চেতনার। এই প্রগতিশীল চিন্তা ও চেতনার উন্মেষের ধারক হিসেবে গত শতকের নব্বই দশকে বাঙলা সাহিত্য বিশেষত বাঙলা কবিতা নিয়ে প্রচুর কাগজ হয়েছে। নব্বই দশকের শুরুতে এই কাগজীরা একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে কাজ করেছে আর সেটি হলো প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, কেন্দ্রিকতা বিমুখ এবং তারুণ্য ও নতুন চিন্তার প্রসার। এর মাঝে তারুণ্য ও নতুন চিন্তার প্রসারের কাজটি সেই কবিতা থেকে শুরু করে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল হয়ে আহসান হাবীব সম্পাদিত দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতা এবং আবু হাসান শাহরিয়ার সম্পাদিত দৈনিকের সাহিত্য পাতা ও পরে সার্বভৌম সাহিত্য পত্রিকা খোলা জানালা হয়ে শামীম রেজা সম্পাদিত অধুনালুপ্ত আজকের কাগজ’র সাময়িকী সুবর্ণরেখার মতো দৈনিকের সাহিত্য পাতাগুলোও করছে। অপরদিকে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ছিল নব্বইয়ের কবিদের এক ধরণের ফ্যাশান। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার নাম করে তারা মূলত দৈনিক বিরোধিতাই করেছে। কিন্তু এর পেছনে তারা কোন যুৎসই হেতু আমাদের দেখাতে পারেনি। পরবর্তীতে তাদের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার এই স্টান্ট তারা নিজেরাই ধরে রাখতে পারেনি। একে একে প্রায় সকলেই কোন না কোন ভাবে প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হয়েছে। কারণ, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা কেন? প্রশ্নটির সঠিক উত্তর তারা নিজের কাছ থেকেই বের করতে পারেনি। নব্বইয়ের কাগজীদের যে ভূমিকাটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তা হলো কেন্দ্রবিমুখতা। অর্থাৎ কবিতাকে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে নিয়ে যাওয়া। কবিতার ভৌগোলিক আভিজাত্যকে দু’পায়ে পিষ্ঠ করে রাজধানীর রাজকবির কবিতার পাশাপাশি প্রান্তিকের এক নাম না জানা কবির কবিতাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করা ও করার সুযোগ করে দেওয়া। এতে করে যে লাভটি হয়েছে তা হলো আমরা একঝাঁক নতুন কবিকে পাঠ করতে পেরেছি। নব্বই দশকে যে আমরা শতাধিক কবির কবিতা আস্বাদন করতে পেরেছি তার পেছনে মূল কারণটি ছিল এই। এ কারণেই নব্বই দশকের শুরু থেকেই আমরা দেখি কবিতার কাগজগুলো রাজধানী নয় বরং বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বের হতে থাকল। কিন্তু এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। কারণ এই কেন্দ্রবিমুখতা প্রবণতাটি নব্বইয়ের কাগজীরা যতটা না আদর্শ হিসেবে নিয়েছে তার চেয়ে বেশি নিয়েছে আবেগ হিসেবে। ফলে এক দশকেই তাদের অনেকেই ঝিমিয়ে পড়েছেন।

নব্বইয়ের কাগজীরা কবিতার কাগজের মধ্য দিয়ে কবিকে ও কবিতাকে নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন ঠিকই। কিন্তু তাদের সে চেষ্টা সফল হয়নি। তাদের কাগজের মধ্য দিয়ে একঝাঁক কবি উঠে এসেছে ঠিকই কিন্তু অবিন্যস্ততা ও পরিকল্পনাহীনতার কারণে কবিতার কাগজ সেভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে নি। কিছু টেকনিক্যাল বিষয়ে কাগজীরা পেশাদারিত্ব আনতে পারেনি। তার মধ্যে প্রধান সমস্যা হলো কবিতার কাগজগুলো পাওয়া যায় এমন কোন একটি স্থান নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসে ঢাকার আজিজ মার্কেটে শামীমুল হক শামীমের উদ্যোগে লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ নামে কবিতার কাগজ পাওয়া যায় এমন একটি কেন্দ্র হয়েছে। কিন্তু এই উদ্যোগটি জেলায় জেলায় হওয়া জরুরি ছিলো যা নব্বইয়ের কাগজীরা তাদের সময়ে করতে পারেনি, এখনো হয়নি। কাগজ সম্পাদকদের বাড়িতে, ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ও কিছু হাতে গোনা বইয়ের দোকানে কবিতার কাগজ পাওয়া যায় বটে কিন্তু সেগুলো একেবারেই অপ্রতুল। সময় এসেছে কবিতার কাগজীদের এরকম উদ্যোগ নেওয়ার। দ্বিতীয়তঃ কোন কাগজই তেমন উল্লেখযোগ্য কোন লেখকগোষ্ঠী তৈরি করতে পারেনি। কবিতার কাগজের জন্য যা ছিলো জরুরি। লেখক গোষ্ঠীর অভাবে সময় মতো কোন কাগজই পাঠকের হাতে পৌঁছতে পারে না। কোন কাগজ যদি কোন গোষ্ঠী তৈরি করেও ফেলে তবে তা ব্যক্তিস্বার্থচরিতার্থতায় পর্যবসিত হয়। সেখানে কোন আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে না। এইসব সীমাবদ্ধতার কারণে এক দশকেই নব্বইয়ের কবিতার কাগজের অন্তসারশূন্য রূপটিও আমাদের দেখতে হলো।

ফলে শঙ্খ ঘোষের ভাষায়- এক দশকেই সঙ্ঘ ভেঙে যায়। দশক যায় দশক আসে। সঙ্ঘ ভাঙে সঙ্ঘ গড়ে। নব্বইয়ের এই অন্তসারশূন্যতার ভেতর দিয়েই শূন্য দশকে কবিতার কাগজের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম যখন শুরু হয় তখন ছিল নিছক জানান দেওয়ার প্রবণতা। ফলে একটু বেশি হাউমাউ, চেচাঁমেচি হওয়াটাই স্বাভাবিক। হয়েছিলও তাই। একটা নতুন উন্মাদনা, অপরিণত আবেগ ইত্যাকার বিষয় শূন্যের কাগজগুলোকে অবিন্যস্ত ও অপরিকল্পিকতভাবে গড়ে তুলেছে। কিন্তু আজ সাত/আট বছর পেরিয়েও আমরা একটি পরিকল্পিত রূপরেখা পাইনি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে- কাগজ কেন করছি? এ বিষয়ে নিজের কাছে সাফ-সুতরো হতে পারছি না। প্রথম দিকে নিজেদের জানান দেওয়ার জন্য দল ভারি করার যে প্রবণতা আমাদের ভেতর ছিলো তার পেছনে আমরা কোন আইডিয়লজিক্যাল ভিউ দাঁড় করাতে পারেনি। পরন্তু কাগজের মেদভূঁড়ি নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছি। কাগজ মোটাতাজা করতে না পারার বেদনায় এখনি কেউ কেউ কাগজ করার চিন্তা বাদ দিয়েছি। নব্বইয়ের কেন্দ্রবিমুখতাকে আমরা জলাঞ্জলি দিয়ে বড় বেশি কি রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি না? যে কাজটি নব্বই করেছিল দশকের শেষে এসে আমরা সেই কাজটি শুরু করে দিয়েছি দশকের মাঝামাঝিতেই। আর এই সমস্ত কারণে নব্বই কবিতার কাগজের যে ন্যূনতম প্ল্যাটফর্মটি আমাদের জন্য তৈরি করেছিল তাও আমরা নষ্ট করতে বসেছি। অথচ নব্বইয়ের অন্তসারশূন্যতা আমাদেরকে সুযোগ করে দিয়েছিলো শিা নেওয়ার। অবশ্য সময় পেরিয়ে যায়নি। ঘুরে দাঁড়ালে এখনো সম্ভব আদর্শিক ভিত্তি থেকে গোষ্ঠী তৈরি করে কবিতার আন্দোলন তৈরি করা। তাতে করে কবিতার কাগজের স্টেজকে কবিতাকেন্দ্রিক লিটলম্যাগ আন্দোলনে পরিণত করা যাবে। জেলায় জেলায় লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ তৈরি করে লিটলম্যাগকে নিয়ে যেতে হবে অনাগতকালের কবিটির কাছে। কবিতাকে নষ্টামি ও নোংরামির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এটা এখন জরুরি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29064811 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29064811 2009-12-24 15:23:06
মুখ ফিরিয়ে নেবার সময়/ এহসান হাবীব
অনুশীলন করে কবি না হতে পারলেও কবির মতো কিন্তু হওয়া যায়। আর চারপাশে এই ‘মতো’ কবিদের প্রাচুর্যে আমাদের কাব্যভূবন ঠাসা। এরাই ধারাবাহিকতার ইতিহাস তুলে কারন এরা জানে অনুশীলন করে যা অর্জন করেছে তা পূর্ববর্তী অনেক কবির দেখানো ভুবন থেকেই আহরিত। এরাই কবিতার বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করে, নামকরণ করে, কবিতায় টেকনিক খাটায়। এদের মধ্যে যারা আবার নতুনত্বের কথা বলে তারা নতুনত্বের নাম করে বিচিত্র সব ভাব-সাবের আশ্রয় নেয়, আতলামিপূর্ণ আলাপ-সালাপকে কবিতা বলে চালিয়ে দিতে চায়-

তবু কবিতা আসে না
প্রতিক্ষণ
মন খুঁজে মন
দেহ চায় দেহ
না-পেয়ে কি লেখালেখি শ্রেয়?
না-খেয়ে কি ুধা
শীর্ষক রচনা লিখবে বোকাচুদা?

যত পার খাও
ইউ এন- এর একটি শাখা ফাও
সেই ফাও-ফাউ না
যতই করি বর্ণনা।
অবশেষে
বলি আধা হেসে
যাকে চিনি- সেই তো অচেনা
ডিভোর্স লেটার আসে
বাড়ি ভাড়ার নোটিশ, আসে টেলিফোন বিল
শুধু কবিতা আসে না ....

কবিতা আসেনা/ টোকন ঠাকুর

আচ্ছা বলুন তো এটা কোন ধরণের কবিতা। বাজারের ভেজাল খাদ্যদ্রব্য নিয়ে দৈনিকে কিছুদিন আগে লেখা হয়েছে ‘আমরা কী খাচ্ছি’? ঠিক এই রকমভাবে এই কবিতাটি নিয়ে লেখা হতে পারে ‘কবিতার নামে আমরা কী পড়ছি’। আমাদের মিডিয়া মহাজনরা আমাদের কী পড়াচ্ছে? মিডিয়া মহাজনদের সাথে এদের আবার দহরম-মহরম ভাব। একজন আরেকজনের পিট চাপড়াচ্ছে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে। এই সমস্ত কবিতার সপে লিখিয়ে নিচ্ছে কবিতা সহজতার দিকে এগুচ্ছে। কবিতা এখন আর শিল্পের কাঠামোগত বলয়ে আবদ্ধ নেই। স্বতঃস্ফূর্তভাবে একজন কবি যাই বলে তাই কবিতা হয়ে যায়। আমাদের মতো দেশে যেখানে (শিক্ষিত জনগোষ্ঠির) পাঁচ ভাগ লোকও শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে না নিদেন পে পাঠকও হতে চায় না সেখানে এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে এখানে খুব সহজেই কবি হওয়া যায়। কবিতা লিখতে পারুক বা না পারুক কোন ক্রমে যদি কোথাও বলে ফেলা যায় যে ‘আমি কবি’ আর মাত্র একজনকেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের রেশ ধরে তার সপে দু’চারটি প্রশংসা বাক্য আওড়ানো যায় তাহলেই কেল্লাফতে। কারন আমরা বাস করি এমন পাঠককূলের মাঝে যারা কষ্ট করে কোন কিছু খুঁজে নিতে চায় না। কেউ একজন চিনিয়ে দিলে তাকে নিয়ে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে যায়। সে সরেস কাঁঠাল না মাকাল তা যাচাই করার সময়টুকু নেই। সাম্প্রতিক কালে ‘উত্তরাধুনিকতত্ত্ব’ বা এরও কিছুদিন আগে বিভিন্ন ইজম বা জেনারেশন নিয়ে যা যা হয়ে গেল তাই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আর এই ফাঁকটিকেই ব্যবহার করছে চারপাশের ‘মতো’ কবিরা আর এই ‘মতো’ কবিদের দলটিই যেহেতু ভারী সেহেতু তাদের পে গলাবাজী করার মানুষের অভাব নেই। এক কবি লিখছেন ‘অমুক’ বাংলা কবিতায় বাঁকের সৃষ্টি করেছেন আবার ‘অমুক’ কবি লিখছেন এই কবি জীবনানন্দ দাশকে অতিক্রম করে গেছেন। এও এক ধরনের অনুশীলন, আর এই অনুশীলনের সাথে মাঝে-সাঝে যদি সহজতার নাম করে কিছু চমকও দেখানো যায় তাহলে সমাজে ‘কবি’ হিসেবে একটা কল্কে সে পেয়েই যায়। পাঠকের চোখও আটকে থকে এদের উপর। ফলে প্রকৃত অর্থের কবিতার সৃষ্টি এবং চর্চা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এতো গেল অনুশীলনের এক ধরণ। এই ধরণের বাইরে আবার আরেক অনুশীলন আছে। এটিকে আমরা সাধনা বলতে পারি। এই সাধনায় একজন পাঠক মগ্ন থেকে কবিতার মতো কিছু উজ্জ্বল পদ্য উপহার দিতে পারে যা সুখপাঠ্য-

তোমাকে মূর্ছিত রেখে চলে গেছে সিংহপুরুষেরা।
কত বাদাবন কত অমৃতের পুষ্করিণী পিছে
ফেলে রেখে যে এসেছি, আগুনের কুণ্ডু জ্বেলে আজ
শুনে না সেইসব? মূর্ছার ভেতরে একদিন
আমিও দেখেছি বটফল, উন্মাদের চিঠি পেয়ে
চলে গেছি জ্যান্ত হয়ে ক্রীড়ারত পুতুলের দেশে।

লীলাচূর্ণ/ মজনু শাহ

আমাদের চারপাশে কবিতার নামে, সহজতার নামে, এক্সপেরিমেন্টের নামে যে সমস্ত কবিতা লেখা হচ্ছে এই কবিতার স্বাদ তার চেয়ে ভিন্নতর। কবিতাকে সুস্বাদু করতে ঐ কবি আশ্রয় নেন বাক চাতুর্যের। সাধনার দ্বারা ঐ কবি নিজের চারপাশে তৈরি করেন শব্দবলয়। আর শব্দের জাদু দিয়ে তিনি বশ করেন এক শ্রেণির হলুদ রোগাক্রান্ত পাঠক- আমরা যাকে বলি এলিট শ্রেণী- সাহিত্যের বেলায় অধ্যাপক পাঠক। ঐ যে কে যেন বলেছিল- ‘শব্দই কবিতা’। সেই দেড়শ বছরের পুরোনো বাক্যটিকে আজও এরা বহন করে চলছে শিরায় শিরায়। ফলে শব্দবাজী এখন বাংলা কবিতার প্রধানতম প্রবণতা। আর এর প্রধান পুরোহিত হলেন আল মাহমুদ। অবশ্য আল মাহমুদ এটি ধার করেছেন জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা থেকে। আশ্চর্যের ব্যপার হলো আল মাহমুদ পরবর্তী প্রজন্ম এই প্রবণতার দিকে ঝুঁকছে। এই প্রবণতার মগ্ন সাধকেরা নিজেদেরকে কবির কাতারে প্রায় খাড়া করেও শেষ পর্যন্ত পা বাড়িয়েছেন অগ্রজদের দেখানো পথে- এক অমোঘ ধারাবাহিকতায়; এর স্বপে তারা যুক্তিও দাঁড় করিয়েছেন- পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা একেবারে অভূতপূর্ব। আপনাদের রক্তের ভেতর, জিনের মধ্যে অভূতপূর্ব কবিতা রচনা করার মতা যদি নাই থকে তাহলে কি অস্বীকার করতে হবে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে? কিংবা বোদলেয়ার? জীবনানন্দ দাশ! কিংবা এই কবিতাটি-

স্বাধীনতা দিবসে
শিশুদের ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় গিয়ে দেখি,
এক শিশু এঁকেছে পৃথিবীর ছবি;
অথচ বিষয় ছিলোঃ স্বদেশের মানচিত্র আঁকা।

শিশুর নিজস্ব মানচিত্র
বয়ে যাচ্ছে এক নদী
নদী-পাশে এক সবুজ বনভূমি
নদী-তীরে শান্ত চোখের মতো নৌকা একখানা
বনভূমির দিকে
নীল আকাশ থেকে
নামছে এক ঝাক পাখি।

কৌতুহলে শিশুকে বল্লাম
ঃ কী নাম ঐ নদীর?
জানাল সহজ উত্তরে ঃ কেন ইছামতি।
আরার বল্লাম ঃ তোমার ছবিতে মানুষ কোথায়?
খুব সহজে দিল উত্তর
ঃ মানুষ আঁকবার কথা মনে আসে নাই।

শিশুর নিজস্ব মানচিত্র/ জাহিদ হায়দার

শব্দবাজির পাশাপাশি অনুশীলনবাদিরা আবার বেশ অনুকরণ প্রিয়ও। ধরা যাক জনৈক কবি দীর্ঘকবিতা লিখতে অভ্যস্ত; লিখে আরামও পান। দীর্ঘকবিতা তিনি লিখতেই পারেন। কবিতার ইতিহাসে আঙ্গিক আর কতটুকুই বা প্রভাব ফেলে। কিন্তু তিনি যদি ঘোড়ার বিচির মতো ঝুলে পড়া দীর্ঘকবিতাটির পে সাফাই গান এভাবে যে, কবিকে চিনতে হয় দীর্ঘকবিতা দিয়ে, যেমন- এলিয়টকে চিনতে হয় ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ দিয়ে গিন্সবার্গকে চিনতে হয় ‘হাউল’ দিয়ে। আর এজন্যই তিনি দীর্ঘকবিতা লিখেন। আর এই অনুকরণবাদিরা বলে থাকেন একজন কবিকে হতে হবে দৃষ্টিপাতের গুণাবলী সম্পন্ন। যারা এই ধরণের কবিতা লেখেন-

তখনও মানুষ ছিলো পৃথিবীতে, কোন জাতিসঙ্ঘ ছিলো না তখনও নিষেধ ছিলো পায়ে পায়ে, আরও ছিলো পুরুত রাজারা। তোমাকে গুহায় রেখে, ধরো, মৃগয়ায় গেছে শিকারী পুরুষ। মৃত হরিণের দেহ কাঁধে নিয়ে সে আর ফিরেনি। ফিরে এলো জাতিসঙ্ঘ বহু-বহু বছরের পর তোমাকে পেলোনা পেল গুহার বিবর।

তখনও মানুষ ছিলো পৃথিবীতে কোন জাতিসঙ্ঘ ছিলোনা/ আবু হাসান শাহরিয়ার

তাদের নাকি দৃষ্টিপাত করার মতা নেই। প্রকৃত অর্থে এই সব অধ্যাপক কবিরা কবিতায় শব্দের চর্চা এমনকী ইতিহাস চর্চাও করেন আরোপিতভাবে। তাদের কে বোঝাবে এই কবিতার মাহাত্ম্য-

এক যোগ এক সমান দুই (১+১=২); এটা ভুল। এক যোগ সমান এক (১+১=১); এটা ঠিক। এক যোগ এক সমান এক লিখলাম। লিখে রহস্য সমাধান করলাম।

হিসেব / আশিক আকবর

যারা বলেন এই কবিতার কবিদের দৃষ্টিপাতের মতা নেই তারা একবার নিজেদের দীর্ঘকবিতাগুলোর পাশে এই কবিতা দু’টো রেখে পড়ুন। তারপর নিজেকে এলিয়ট ভাবুন আর গিন্সবার্গই ভাবুন কোন সমস্যা নাই।

ইদানিং আবার এই অনুশীলনবাদিদের তরফ থেকে দাবি উঠছে যে, স¤প্রতি বাংলা কবিতা এক বিশেষ বাঁক নিতে যাচ্ছে, বলা বাহুল্য সেই বাঁক তাদের হাত ধরেই আসছে। কিন্তু আসলেই কি কোন বাঁকের লণ আমরা দেখতে পাচ্ছি? আপনারা বলবেন- তুই ব্যাটা অন্ধ তাই বলিয়া প্রলয় বন্ধ থাকিবে কেন? কিন্তু ভাই আমি যে একবারেই অন্ধ না, আপনাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চোখ-মুখ তো কিছুটা হলেও ফুটিয়েছি। সহজতা বলে যে বাঁকটির কথা বলছেন তা কেমন বাঁক- টোকনের কবিতাটা পড়লেই বুঝা যায়। কবিতার বাঁক তো বিষয় ভাবনাতেই বদলায়- আঙ্গিক নিয়ে যে সমস্ত হৈ চৈ চেঁচামেচি হয়েছে তা বাঁকের ভাগাড়েই জমা আছে। আর সেই বিষয় ভাবনার বাঁক কিভাবে নেয় নিচের দুটি কবিতা থেকেই দেখে নিন-
রবীন্দ্রনাথ-

আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান।
না জানি কেন রে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।

এই আলোক চেতনা থেকে যেভাবে বাঁক নেয় জীবনানন্দ দাশ-

অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থেকে
হঠাৎ ভোরের আলোর মুর্খ উচ্ছ্বাসে নিজেকে পৃথিবীর জীব বলে
ভয় পেয়েছি,
পেয়েছি অসীম দুর্ণিবার বেদনা;
দেখেছি রক্তিম আকাশে সূর্য জেগে ওঠে
মানুষিক সৈনিক সেজে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য
আমাকে নির্দেশ দিয়েছে
আমার সমস্ত হৃদয় ঘৃণায়-বেদনায়-আক্রোশে ভরে গিয়েছে;
সূর্যের রৌদ্রে আক্রান্ত এই পৃথিবী যেন কোটি কোটি শুয়োরের আর্তনাদে
উৎসব শুরু করেছে।
হায়, উৎসব!
হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিযে ফেলে
আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি,
অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে
থাকতে চেয়েছি।
কোনদিন মানুষ ছিলাম না আমি।

এবার একবার দেখুন তো এই যে এতসব সহজতা, সরলতা, বোধের বিবর্তনের কথা আপনারা বলছেন; আপনাদের কথিত বাঁকের কবিতাগুলো এই কবিতার চেতনা থেকে কতটুকু বাঁক নিয়েছে- একবার আমাকে বলুন? যদি পাল্টা প্রশ্ন করেন- জীবনানন্দের পর তাহলে আমাদের আর কোন অর্জন নেই? একথা সত্যি দাশ কাব্যের পর রাহমান, মাহমুদ, শক্তি, বিনয় বাংলা কবিতায় অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু এরা কেউই জীবনানন্দের নৈরাজ্যবাদ থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারেনি। অনুবীণ দিয়ে খুঁজলে এদের একটা অস্তিত্ব অবশ্যই ধরা পড়বে তবে এরা চারজন যে গাছটির চারটি শাখা বিভিন্ন বর্ণে ও গন্ধে শোভিত করে তুলছেন সে গাছটির নাম জীবনানন্দ। শাখার দিকে তাকালে এদেরকেই কেবল চোখে পড়ে আর গোড়ায় তাকালে জীবনানন্দ স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। অথচ সা¤প্রতিক বাংলা কবিতার কবিরা পথ হাঁটছেন বাক-চাতুর্যের কবি আল মাহমুদ ও লাইনসর্বস্ব কবি বিনয় মজুমদারের অনুসৃত পথে আর এদের নিয়ে কী মাতামাতিটাই না এরা করছে, তারপরও দাবি করছে নতুন বাঁকের।

যারা না দিয়ে শুরু করে তাদের হয় না কিছুই, যারা হ্যাঁ দিয়ে শুরু করে তারা যেতে পারে বহুদূর। কিন্তু আমি শুরু করেছি ‘না’ দিয়ে তবে শেষ করতে চাই হ্যাঁ দিয়ে। একথা সত্যি যে আমাদের চারপাশের যারা কবিতা লিখতে আসছেন তাদের অনেকেই রক্তের ভেতর কবিত্বশক্তি নিয়েই কবিতা লিখছেন।
নিচের কবিতাটি এর সাক্ষ্য দেবে-

স্বপ্নের ভিতরে আমার জন্ম হয়েছিল

সেই প্রথম আমি যখন আসি
পথের পাশে জিগা গাছের ডালে তখন চড়চড় করে উঠছিলো রোদ
কচুর পাতার কোষের মধ্যে খণ্ড-খণ্ড রুপালি আগুন
ঘাসে ঘাসে নিঃশব্দ চাকচিক্য-ঝরানো গুচ্ছ-গুচ্ছ পিচ্ছিল আলজিভ
এইভাবে আমার রক্তপ্রহর শুরু হয়েছিলো
সবাই উঁকি দিয়েছিলো আমাকে দেখার জন্য
সেই আমার প্রথম আসার দিন
হিংস্রতা ছিলো শুধু মানুষের হাতে,
ছিল শীত, ঠাণ্ডা পানি, বাঁশের ধারালো চিলতা, শুকনো খড়
আর অনন্ত মেঝে ফুড়ে গোঙানি-
আমার মা
স্বপ্নের ভিতর সেই প্রথম আমি মানুষের হাত ধরতে গিয়ে
স্তব্ধতার অর্থ জেনে ফেলেছিলাম,
মানুষকে আমার প্রান্তরের মতো হয়েছিল
যে রাহুভুক।

অন্যমনস্কভাবে আমার এই পূনর্জন্ম দেখেছিলো
তিনজন বিষণœ অর্জুন গাছ।
সেই থেকে আমার ভেতরে আজো আমি স্বপ্ন হয়ে আছি
মা, স্বপ্নের ভিতর থেকে আমি জন্ম নেব কবে?

জাতিস্মর/ আবিদ আজাদ

কেবলই উদাহরণ স্বরূপ আবিদ আজাদকে টেনে আনলাম। শুধু আবিদ আজাদই নয় যারা আজ বাংলা কবিতার শাদা পৃষ্ঠায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা সবাই এমনি সব সতেজ সীসাহীন বাতাসের প্রাচুর্য নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছিলেন। তবে একথাও মনে রাখা দরকার আজকে আমরা যাদেরকে যে যে কবিতাগুলো দ্বারা চিনি সেই কবিতাগুলো তাদের একেবারে প্রথম দিকের রচনা। তখন পর্যন্ত নাগরিক কেদ, চতুরতা আর বিত্তবৈভবের সহজ রাস্তাটির সন্ধান তারা পাননি। যেহেতু এই রাস্তাটির সন্ধান তারা পাননি সেহেতু তারা নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে পেরেছিলেন কবিতার সরলতম মৌলিক সাধনায়। কিন্তু যেই প্রথম কাব্যের ঔজ্জ্বল্যে তারা আমাদের কেবল একটু আশা দিতে পেরেছেন তখনি তাদের চোখ-কান ফুটতে লাগল- রাজধানীর মহাসড়কে এসে কেউ টাকার ধান্ধায় কেউবা শর্টকাট রাস্তায় নাম কুড়ানো ধান্ধায় এই তৃতীয় বিশ্বের র্থাডক্লাস পুঁজিবাদিদের খপ্পরে পড়ে গেলেন। এবং তাদের পোষ মানতে বাধ্য হলেন বা মেনে গেলেন। যেহেতু তাদের হাতেই ছিল আমাদের মিডিয়া সাম্রাজ্য আর কবি হিসেবেই তারা আশ্রয় পেয়েছিল তাদের প্রতিপালকদের কাছে সেহেতু তারা তাদের এই কর্মব্যস্ততার মাঝেও কবিতা লিখতে লাগলেন। এবার আর সাধনা নয় এ পর্যায়ে কবিতা হয়ে উঠলো তাদের কাছে অনেকটা ঐচ্ছিক বিষয় এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া এগুলোকেই কবিতার বাঁক বলে চিহ্নিত করতে থাকল। ফলে কবিতা ঘুরপাক খেতে থাকলো পুনরাবৃত্তিতা, অনুকরণবাদিতা ও চৌর্যবৃত্তিতায়। ব্যাপারটা এখানেই থেমে থাকেনি এরপর তাদের এই অবস্থান ধরে রাখার জন্য তারা নেমে পড়ে নোংরা দলাদলি ও কবিতার নামে কালোবাজারি এবং মাস্তানিতে। তাদের পথ ধরে অনুজরাও একই কায়দায় দ্রুত শিখে নিতে থাকে কেমন করে লুচি খাওয়ালে এক কবি আরেক কবির প্রশংসা করে, কেমন করে ‘তেল মারলে’ সম্পাদক তাকে স্পেশালভাবে তুলে ধরবে অথবা কেমন ভান করলে, কেমন ভাব ধরলে বড় কবি সেজে বসে থাকা যায়। হায় আফসোস ! এরাই না একদিন জেনেছিল- কবিতা এক শুদ্ধতম শিল্প এবং একজন কবির জীবনও কবিতার মতো শুদ্ধ হতে হয়। এই সত্য ভুলে গেলে কবিতার মাঠে একজন কবির জন্য আর কী অপো করে? একজন কবির জন্য অপো করার কথা ছিল কবিতা নাুী এক কুড়ি বছরের টগবগে যুবতী- যার বুকের ভাঁজে লুকিয়ে থাকে জিজ্ঞাসার পাহাড়, যার ঘাড়ের চুলের ভেতর লুকিয়ে থাকে রহস্যের ময়দান যার নাভিমূলে লুকিয়ে থাকে সম্ভাবনার আধার আর যার চোখের ভেতর লুকিয়ে থাকে আশার মুক্তোদানা। অবশ্য আজও বাংলা কবিতার কবিদের জন্য অপো করছে কবিতা নাুী কুড়ি বছরের যুবতী কিন্তু তার দিকে একবার তাকালে দ্বিতীয়বার আর তাকাতে ইচ্ছা করে না। একবার তাকাতেই স্পষ্ট বুঝা যায় এই যুবতী ভুগছে কামশীতলতায়।

অবশ্য আমি বিশ্বাস করি একটা জাতিগোষ্ঠিতে বছরে বছরে কবি পয়দা হয় না। পঞ্চাশ একশ বছরে কিংবা আরো সময়ের ব্যবধানে একজন কবির আবির্ভাব হয়। এই ফাঁকা সময়টাতে এই সব ‘মতো’ কবি এবং ভান-সর্বস্ব কবিদের উল্লম্ফন চলে। কিন্তু যখনই আমাদের সৎ এবং সাহসী কবিটি বেরিয়ে আসবেন সূর্যের আড়াল ছেড়ে তখনি ফেটে চুপসে যাবে এইসব ফাঁপা বেলুন এবং আমি এও বিশ্বাস করি তার সাথে আমার দেখা হবে। আজ নয়তো আগামিকাল।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29044003 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29044003 2009-11-15 20:30:33
কবিতা শুদ্ধতার
আমি বিশ্বাস করি মহৎ কবি মাত্রই সৎ। অথচ সততা সমাজের অন্যান্য সেক্টরের মতো কবি সমাজ থেকেও উঠে যাচ্ছে। কবির ধর্মই হচ্ছে বলা। কবি যা বিশ্বাস করে না, যা ধারণ করে না, অনুধাবন করে না সেইসব চমকিত অনুভব, আদর্শ যদি কবি তার কবিতায় প্রকাশ করেন তবে তিনি পাঠককে, পরিচিত পরিবেশকে ধোকা দেন আর এই ধোকা দেওয়ার নামই হচ্ছে অসততা। কবি পজেটিভ বা নেগেটিভ যাই তিনি ধারণ করুন না কেন তা অকপটে প্রকাশ করাই হলো কবির সততা। এজরা পাউন্ডকে আমি এজন্যই কবি বলি। অসৎ কাউকে আমার কবি বলে মানতে কষ্ট হয়।

স্বতঃস্ফূর্তার নাম করে কবি তার অসততাকে ঢেকে রাখেন। অনেক কবিকেই আমাদের খুব কাছ থেকে দেখা হয় না। ফলে তার স্বতঃস্ফূর্ততা আমাদের বিভ্রান্ত করে। আমি দেখেছি চরম সুবিধাবাদী, মধ্যস্বত্তভোগী লোকটি স্বত:স্ফূর্ততার জোরে নিজেকে কী ভয়ানক প্রগতিশীল প্রমাণ করে ফেলেন। অথচ এমনটি মোটেই কাম্য নয়। এতে করে কবিতা একসময় নির্বাসিত হতে পারে। একটি নির্দিষ্ট কালখণ্ডের কবিদেরকে মানুষ ধোকাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। আপনি কোন লাইলির জন্য মজনু হবেন না অথচ লিখে ফেলবেন ‘লাইলী মজনু’ এও কি হয় কখনো? না কি তা কেউ পেরেছে? আজ তো-পূর্ণিমা কেমন? তা না দেখেই অনেকে আমাদেরকে জোৎøারাতের গল্প শোনায়। আমার বড্ড হাসি পায়। এ না হয় কবিতা, না হয় ভাঁড়ামী। মনে পড়েছে আর্তুর র্যাঁবোর কথা। লিখতে চেয়েছিলেন অনুশাসনহীন কবিতা। তার জন্য তিনি তার ব্যক্তিজীবনকে কী অনুশাসনহীনই না করে তুলেছিলেন। পাগলামীর শেষপ্রান্তে পৌঁছে নিজের জীবনকে জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে কবিতার প্রতিটি পঙক্তিকে, শব্দকে মুক্তি দিয়েছিলেন অনুশাসন থেকে। র্যাঁবোকে অভিবাদন।

গায়ত্রী চলে গেলে আপনি তার বদনাম করে বেড়াবেন আর তারপরও আপনি লিখবেন ‘ফিরে এসো চাকা’ এও কি হয়? অথচ রাখি চলে গেলে তার রেখে যাওয়া চিঠিগুলো বুক পকেটে জমিয়ে জমিয়েই লিখতে হয়-‘আমার বুক পকেট পৃথিবীর ুদ্্রতম জাদুঘর’। লিপি তার স্বামীর সাথে লেপের ওমে ঘুমিয়ে থাকলে পৃথিবীর সব শীত যদি আমি নিজের বুকে ধারণ না করি তবে আমি কি সাহসে লিখব-

অথচ কাল সকালে তোমার গোসল হবে ভেবে
আজ রাতে ভয়ানক কেঁপে উঠেছি বেদনার শীতে।

স্বতঃস্ফূর্তার নাম করে সাকুরায় বসে মদের পেয়ালায় ভর করে এই শীত কি টের পাওয়া যাবে?

যেদিন অনুভূতির শুদ্ধতম প্রকাশ ঘটাবার জন্য ঠাণ্ডায় হিমে জমে না যাব সেদিন শীতের কবিতা আমি লিখব না। যেদিন জীবনের প্রতি অস্থি থেকে নিংড়ে রস বের করে কবিতা লিখতে পারব না সেদিন আমি কবিতাই লিখব না। পথে পথে ঘুরে পাগল হয়ে যাব তবু ঘরে বসে বসে বানিয়ে বানিয়ে কবিতা লিখব না নিজের অনুভূতির সাথে বেঈমানী করব না। এটুকু আস্থা আপনি আমার প্রতি রাখতে পারেন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29035153 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29035153 2009-10-31 12:00:06
অন্ধকার ও বাংলাদেশ " style="border:0;" />
অন্ধকার
১.
মোমটা খুঁজে পাচ্ছিনা, আলোটা- অথচ অন্ধকার একদম স্পষ্ট সহায়কহীন আলো তো নকল, মেকী- চতুর্ভূজের ভীড় আর প্রকৃত কথার মতো অন্ধকারই মৌলিক

অন্ধকারে আমাকে দেখে না কেউ।

অন্ধকারে কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না
এককাঠি চুরুট, একবাক্স দিয়াশলাই
শিশ্নের অগ্রভাগ, প্রিয় নাম, মুখ!

অন্ধকার ভালোবেসে সাধু বসে আছি
হাতড়ালে আমি ছুঁতে পারি পৃথিবীর মুখ।

<img src=" style="border:0;" />
বিরূপাক্ষ

ডানাওয়ালা পরীদের গল্প রূপকথার আঙিনা ছেড়ে মধ্যাহ্নভোজের টেবিলে পরকীয়ায় রত। শাদা ধবধবে, ফর্সা বুক দেখে যাদের নুনুতে জল আসতো তারা আজ হুইল চেয়ারে বসে আমাদের ঔজ্জ্বল্যের খবর শোনায়। কৃষ্ণগহ্বর কি খুব দূরের জন? আতশবাজীতে মজে গেলে মন আর কী কী বাকী থাকে শাদা চুলের রবীন্দ্রনাথ?

চুল দু’একটা আমারও পাকছে বটে। আর পৃথিবী! ক্রমশ তোমার জৌলুস হারাতে বসেছো বলে চোখে মাখছি অয়েন্টমেন্ট।

<img src=" style="border:0;" />
বাংলাদেশ

১.
আমরা হাঁটছিলাম নদীকে বামে রেখে
দুপুরের রোদে, চরের বালিতে; আমরা চারজন
সারিবদ্ধভাবে।
অগ্রগামী লোকটির কাঁধে ছিলো জাল
পানি ঝরছিলো;
তারপর উদোম গায়ে লেংটি পরা লোকটা ছিলো ধবধবে ফর্সা
দশাসই শরীর;
যাত্রাপালার ভাঁড়ের মতো আমি হাঁটছিলাম
দুই শার্ট গায়ে;
পেছনের লোকটির হাতে ছিলো মাছ, চোখে
শিকারী দৃষ্টি।

নদীকে বামে রেখে আমরা হাঁটছিলাম গ্রন্থসন্দর্ভহীন
গভীর রোদে, গহীন চরায় সারিবদ্ধভাবে
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29029994 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29029994 2009-10-22 12:27:55
কবিতার কুলীনসভা / এহসান হাবীব পূর্বপুরুষেরা কবে ছিলো কোন সম্রাটের দাস বিবেক বিক্রয় করে বানাতেন বাক্যের খোয়াড়, সেই অপবাদে আজও ফুঁসে ওঠে বঙ্গের বাতাস। মুখ ঢাকে আলাওল-রোসাঙ্গের অশ্বের সোয়ার। সোনালী কাবিন-৬/আল মাহমুদ

পৃথিবীতে তবে সম্রটেদের আধিপত্য কখনও অস্ত যায়না বুঝি। তারা বারবার ফিরে আসে নতুন নতুন রূপ নিয়ে। এই মুহূর্তে যে সম্রাট আমাদের চারপাশে উজ্জ্বল উপস্থিতি নিয়ে বিরাজ করছে তার নাম পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদের একচ্ছত্র আধিপত্য পৃথিবীর অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করছে, না কি বিন্যস্ত করছে সে হিসাব অর্থনীতিবিদদের। কিন্তু একটা হিসাব স্পষ্ট যে, যদি হঠাৎ করে কোন নিচু আয়ের ব্যক্তিটির হাতে একটা মোটা অংকের পুঁজি জমা হয়ে যায় আর সেই পুঁজিটি তিনি যথার্থ অর্থে বিনিয়োগ করার যোগ্যতা না রাখেন তবে সেই থার্ডক্লাস পুঁজিবাদটি তখন তার পূর্বের অতীত ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য সমাজে নাম কিনতে চান। এক্ষেত্রে তিনি চেষ্টা করেন সমাজের তথাকথিত সভ্য সংস্কৃতিবান এবং বুদ্ধিজীবী সার্কেলে ভিড়ে যেতে। এই থার্ডক্লাস পুঁজিবাদের কেউ কেউ তখন গায়ক হতে চেষ্টা করেন, অভিনেতা হতে চেষ্টা করেন। এদেশে কবি হওয়া যেহেতু তুলনামূলক সহজ। যদি কোনক্রমে একটা কবিতার বই প্রকাশ করা যায় আর কিছু টাকা খরচ করে একটা পত্রিকা প্রকাশ করতে পরলে কিছু অনুসারী এবং হুঁক্কাহুঁয়া করার মতো কিছু কবিও জুটে যায়। কেউ কেউ আবার বুদ্ধিজীবী পুষেন। যেন কবিওয়ালা আর শায়েরের যুগ শেষ হবার নয়।

ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর এই কবিওয়ালা আর শায়েরদের আবির্ভাব। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দৌলতে কোম্পানীর আনকালচার্ড, অশিক্ষিত গোমস্তা দালালদের দল অসদুপায়ে অর্থ উপার্জন করে রাতারাতি জমিদার বনে গেল। এবং নিজেদেরকে অভিজাত হিসেবে পরিচিত করে তুলতে টাকা দিয়ে পুষতেন কবি, শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীদের। আর এই কবি দলটাকেই বলা হল কবিওয়ালা ও শায়ের। কিন্তু কয়লা ধুলে যেমন ময়লা যায় না তেমনি ওই গোমস্তারা জমিদার হলেও তাদের রুচির পরিবর্তন হয় নি। তারা সাহিত্যের নামে কবিদের কাছে চাইত স্থুলরুচির কামোদ্দীপনাপূর্ণ গান। আর এটও সত্যি যে পোষা পাখি প্রভুর ইচ্ছানুযায়ী বুলিই কেবল আওড়ায়। বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিকরা কেবল ১৭৬০ সাল থেকে ১৮৩০ সাল পর্যন্ত এই কবিওয়ালা ও শায়েরদের চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাব হলো যখন রাষ্ট্রীয় শক্তি সাহিত্যের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করতে শুরু করলো কবিদেরকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠী অথবা ঐসব স্থলচিত্তের পুঁজিবাদীরা বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে শুরু করলো তখন থেকেই এই কবিওয়ালাদের উত্থান এবং আজ পর্যন্ত এর বিস্তৃতি রয়ে গেছে। উদাহরণ স্বরূপ আমরা পড়তে পারি এই কবিতাটি-

আমার চুল বাঁধার কালো-মোটা রাবার ব্যান্ডে বাম হাতের তর্জনী প্রায় ঠেকিয়ে ১৪+ মেয়েটি বলল, মেয়েদের জিনিস লাগাইছেন ক্যান? ‘আরে! আমি তো পারলে মেয়েদেরই লাগিয়ে রাখতে চাই! মেয়েদের লাগাইতে পারছিনা বলেই তাদের জিনিস লাগাইতেছি।
মেয়েদের জিনিস/ মারজুক রাসেল

মারজুকের এই কবিতাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় অতীতের কবিওয়ালাদের কুরুচিপূর্ণ সাহিত্যরস বিবর্জিত, উদ্ভট, স্থুল, অশ্লীল কবিতার কবিতার নামে সেই সব পঙক্তিগুলোর কথা। কবিওয়ালারা যেমন তাদের পূর্ববর্তী কবিদের কবিতার অনুকরনে বা চুরি করে কবিতা বানাতেন। তেমনি মারজুকও যথার্থ কবিওয়ালার মতোই এই কবিতাটি চুরি করেছেন নির্মলেন্দু গুণের ‘খচ্চর’ কবিতা থেকে। দুটো কবিতা একসাথে রেখে পড়লে তা সহজেই বুঝা যায়। কবিওয়ালাদের সেই সব কবিতার সমঝদার ছিলেন সেই নব্য ধনী হওয়া দালাল শ্রেণীটি। তেমনি আজকের যুগের এই কবিওয়ালাদের সমঝদার হলেন সেই থার্ডক্লাস পুঁজিবাদীরা। তাদের সৃষ্ট দৈনিক কিছু সাহিত্য পত্রিকা এমন কী লিটলম্যাগ নামধারী কিছু কাগজও এদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় প্রকৃত কবিরা হয় উপেক্ষিত।

যুগটা যেহেতু বদলে গেছে। আগেকার মতো তো এখন আর কেউ এমনি এমনি কবি বা বুদ্ধিজীবী পুষে অযথা টাকা খরচ করে না। আর টেড হিউজের কল্যাণে কাক পাখিটি জনপ্রিয় হওয়ার পর কাকের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কবির সংখ্যা। সেহেতু এখন পুঁজিবাদীরা বিভিন্ন রকম যাচাই বাচাই করে কাকে দিয়ে তার আরও দু’চার পয়সা কামাই করা যাবে আরো বেশি নতজানু ক্রিড়নকে পরিণত করা যাবে- এসব হিসেব নিকেশ করে তবেই কবিকে তাদের কাঙ্ক্ষিত আনুকল্য দেন। এক্ষেত্রে ‘কৌন বনেগা কালিদাস’ প্রকল্পটি হতে নিয়ে থাকে তাদের নিয়ন্ত্রিত রাজধানী কেন্দ্রিক দৈনিক, সাহিত্য ও কিছু তথাকথিত ভুঁড়িওয়ালা ছোটকাগজ। সারাদেশের তরুণ কবিরাও কলিদাস হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে বিভিন্ন গোষ্ঠিতে ভাগ হয়ে এবং যারা এই দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে যেতে পেরেছে তারা আরও দ্রুত সেই পুঁজিবাদীদের নজরে পড়ার জন্য দশ, পনের জনে ভাগ হয়ে নিজেদেরকে কুলীন বলে ভাবতে এবং রটাতে লাগলো- অর্থৎ আমরা জাতে উঠেছি আমাদের কিনে নিন। তবে এই স্রোতের বিপরীতেও দাঁড়িয়েছিলো কিছু সত্যিকারের কবি যারা রাজধানী কেন্দ্রিক এই ভন্ডামীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, কবিওয়ালাদের মতো বেহায়া হয়ে অসভ্য উল্লল্ফন তারা করে নি বরং; কেন্দ্র থেকে কবিতাকে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রান্তিকে। চেষ্টা করেছিলেন তারা শুদ্ধচারী কবির দাঁড়াবার জায়গা তৈরি করতে।

আর এই সতেজ পলিমাটির উপর দাঁড়িয়েই শুরু হয়েছিলো আমাদের পথচলা। কথা ছিলো এই জায়গাটিকে আমরা বিস্তৃত করবো। কিন্তু ঠিক এক দশকের আগের কবিরা যেখানে সাহিত্য পাতার সম্পাদক হয়ে গেলো কেউ পুরো দৈনিকের প্রায় সম্পাদক হয়ে গেলো, কেউ বা কবিতাকে পণ্য করে সারা দেশ ঘুরে স্টার হয়ে যাচ্ছে- তা দেখে আমরা ‘ঠাস্কি’ খেতে লাগলাম। কেউ কেউ ওদের মতো হব কি হব না- ভাবছিলাম। এমন সময় যারা জানতো- সোজা পথে তাদের কিছুই হবে না তারা ঢুকে গেলো ‘কৌন বনেগা কালিদাস’ প্রকল্পে এবং ঢাকাই বিজলী বাতি, দৈনিকের ছোটখাট রাজত্ব আর মোটাতাজা কাগজের লোভ দেখিয়ে প্রান্তিকের কবির গলায় ফাঁস লাগিয়ে টানতে লাগলো রাজধানী কেন্দ্রিক কবিতার কুলীন সভায়। ফলে প্রান্তিকের কবিটি মুখিয়ে থাকেন ঢাকার মোটাতাজা কাগজটির সম্পাদক তার লেখা চাইবে আর চাহিবামাত্র লেখাটি কম্পোজ করে সম্পাদকের বাসা পর্যন্ত দিয়ে আসে। শুধু তাই নয় সংখ্যাটি প্রকাশ হওয়ার পর সম্পাদক বরাবর তৈলমর্দন করে ব্যক্তিগত পত্র লেখে আর সেই পত্র দৈনিক পত্রিকার সাময়িকী সম্পাদককে দিয়ে (পত্রলেখককে না জানিয়ে) প্রকাশ করালে পত্রলেখক বিব্রত হয়ে বলে- আমার চিঠি বিকৃত করা হয়েছে। অথচ তার পাশের ছোটকাগজ সম্পাদক তার কাছে লেখা চেয়ে ঘুরতে ঘুরতে হতাশ হয়ে যায়। অবশ্য এমনিভাবে আমাদের প্রান্তিকের সম্পাদকরাও কেন্দ্রে অবস্থানকারী লেখকের লেখা ছাপানোর জন্য হাপিত্যেশ করে। অথচ তার পাশের বাড়ির প্রতিশ্রুতিশীল তরুণটির লেখা ছাপতে তার কোন আগ্রহ দেখা যায় না। আর এমনি করেই আজ আমরা ঢুকে যাচ্ছি রাজধানী কেন্দ্রিক কবিতার কুলীন সভায়। কেউবা ঢুকছি অগ্রজদের সভায় মাথা নিচু করে। আর যারা একটু আগেভাগে শাহবাগে এসেছিলো তারা একটু বেশী মাতব্বরি ফলাতে চাইলে অগ্রজদের বিষ নজরে পড়ে যায়। ফলে তারা নিজেরাই গড়ে তুলে এক কুলীনকবিগোষ্ঠী। সাহিত্য যখন থেকে পণ্য হয়ে যেতে থাকলো অর্থাৎ যে সময় থেকে সাহিত্যবিক্রি করে রাষ্ষ্ট্রের বিভিন্ন রকম সুবিধা ভোগ করা যেত লাগল। বিভিন্ন মজলিশে সাহিত্য বিক্রি করে দু’চার পয়সা কামাই করা যেতে লাগল তখন থেকেই মূলত কুলীনকবিগোষ্ঠীর উদ্ভব। এবং আজ পর্যন্ত এরা বহাল তবিয়তেই আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে অতীতের কুলীন কবিটি আজ আর নেই এবং আজকের কুলীনটিও কাল থাকবেনা। যে থাকে সে কবি, এক কথায় কবি। রূপ সনাতনের মতো হাজারো কুলীন কবি হারিয়ে গেছে পৃথিবীর প্রগাঢ় প্রস্রাবের ফেনায়। আর টিকে আছে পথের কবি, প্রান্তিকের কবি চন্ডীদাস, জয়ানন্দ, চন্দ্রাবতী.....


অতএব যারা এখনও ভিড় উজিয়ে হাঁটছেন তাদের আফসোস করার কিছুই নেই কেবল একটু সৎ আর সাবধানি হওয়া প্রয়োজন। আর যারা ভিড়ে মিশে গেছেন তাদেরও কিন্তু ফিরে আসার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় নি। কেবল এটু উপলব্ধি করতে শিখুন। কারণ সজনীকান্ত দাসের ইতিহাসও কিন্তু কবিতার ইতিহাস মনে রেখেছে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29024642 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29024642 2009-10-12 19:22:43
সুউচ্চ পাহাড় চূড়া আর খোদিত ব্যক্তিগত মুখ টীকাভাষ্য
১০.
দূরে, দূরে বেজে ওঠছে ড্রাম। ট্র্যাম্পেট। করুণ বিউগল। নিকটবর্তী কোলাহল আরো দূর মনে হয়। নৈকট্য কেবল পাতার। শালবন কাছে ছিলো। আরো কাছে ধ্বসে পড়া বাড়ি। কাফ্রি বাজারে হঠাৎ ঢুকে গেলে বাইজানটাইন সম্রাজ্ঞী, নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগে। এক আলোকজ্জ্বল নগরীর অন্ধকার গলিপথে ঢুকে পড়ার পরমুহূর্তে দূরে বেজে ওঠছে ড্রাম, করুণ বিউগল- উত্থানরহিত এইসব কূহক ধার করা অবচেতন।

সর্বপ্রাণতার মিলিত প্রবাহে আজ নিজেকে পণ্য ভাবলে, আব্রাহাম! আব্রাহাম! স্উচ্চ পাহাড় চূড়া আর খোদিত ব্যক্তিগত মুখ বড় দূর মনে হয়!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29016936 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29016936 2009-09-28 12:33:01
নতুন কবিতার প্রস্তুতি / এহসান হাবীব
নতুন কবিতা সম্পর্কে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন তা হলো কবিতা কখোনই পুরাতন নয়। যখন জীবনানন্দ দাশ নতুন কবিতা লিলেন তখন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পুরাতন হয়ে পড়েনি। মানুষ র্দীঘদিন যাবৎ রাবীন্দ্রিক কবিতা পড়তে পড়তে কান্ত হয়ে পড়ছিল, ফলে যখন জীবননান্দ দাশ কবিতা লিখলেন তখন মানুষ রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি জীক্ষনান্দকে পড়তে আগ্রহী হয়েছে। আর এটাই হচ্ছে নতুন কবিতার খেলা।

এই নতুন কবিতা আমরা কিভাবে পাব? নতুন কবিতা সাধারণত একটি জাতির কাছে দুইভাবে আসে-
এক.
একটি জাতির কবিতার ইতিহাসের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় অর্থাৎ মানব সভ্যতার পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজের যে অসংগতি, আচার, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে কবিতাও তা ধীরে ধীরে ধারণ করতে থাকে এবং এইভাবে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একসময় কবিতা নতুনত্ব পায়। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি আমাদের প্রাচীন যুগের কবিতা র্চযাপদ যা বৌদ্ধ সাধন সঙ্গীত হিসাবে পরিচিত। এই সাধন সঙ্গীতগুলো ছয়শ বছরে লিখিত। এই দোহাগুলোতে কিন্তু একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ল্য করা যায় অর্থাৎ প্রথম দিকের দোহাগুলো নিরেট র্ধম সঙ্গীত এর পরের গোহাগুলোতে কিছুটা মানুষের কথা ফুটে উঠেছে। ঠিক সেই সময়ের সামাজিক অবস্থাটা পর্যবেন করলে বিষয়টা আরো পরিস্কার হবে। রাজরোষে পড়ে বৌদ্ধরা যখন পালিয়ে বেড়াচ্ছিল তখন সমাজে ধর্মবোধটাই মূখ্য ছিলো ফলে কবিতায় ব্যক্তি মানুষকে ছাপিয়ে ধর্ম ফুটে উঠেছে। ফলে দোহাতে লেখা হয়েছে-
কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল
অন্যত্র
তে তীনি তে তীনি তীনি হো ভিন্না

এই ধরনের গূঢ় ধর্ম কথা, কিন্তু তারপর সমাজের মানুষ ধীরে ধীরে মানুষকে নিয়ে ভাবতে লাগল র্ধম মানুষের জন্যই এই বোধ যখন কাজ করলো, সমাজে এলো তখন নতুন কবিতাবোধ এবং ছয়শ বছর পরে মধ্য যুগে আরেক ধরনের কবিতা মুখোমুখি হই আমরা, এখানেও র্ধম মুখ্য কিন্তু এই ধর্ম মানুষের জন্য, এই যুগে দেবদেবীর কাহিনী লেখা হয়েছে কিন্তু এই দেবদেবীকে চিত্রিত করা হয়েছে মাটির মানুষ হিসাবে। এই যে ধর্মীয় সাধন সংগীত থেকে কবিতাকে নিয়ে আসা হয়েছে মানুষের উপযেগী করে এটা কবিতার নতুনত্বের প্রথম ধাপ। এটা আমরা পেয়েছি ধারাবহিকতার মধ্য দিয়ে। এবং এরই ধারাবাহিকতায় আমরা পেয়েছি চন্ডীদাসের অমর কবিতা-
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।
দুই.
কবিতায় নতুনত্ব আসে আরেকভাবে তা হলো ব্যাক্তি বা গোষ্ঠি বিশেষের মেধা ও চেষ্টার ফলে। অর্থাৎ কোন কোন কবি এই র্দীঘ সময়ের ধারাবহিকতায় সন্তুষ্ট না থেকে নতুন কবিতা লিখতে চান। আর তা তিনি করেন নিজের মেধার তাগিদে বিস্তর পঠনপাঠনের মধ্য দিয়ে। এই তালিকায় আমরা প্রথমেই পাই মাইকেল মধুসূদন দত্তকে। মাইকেল আমাদের ধারাবাহিকতার ফসল নয়। বরং তিনি তার প্রতিভা ও মেধা দিয়ে বাংলা কবিতাকে একলাফে ছয়শ বছর পার করে দিয়ে গেছেন। মাইকেল যদি ধারাবাহিক ফসল হতেন তবে ভারত চন্দ্র অন্নদামঙ্গল কাব্যে আধুনিকতার ইংগিত দিতে গিয়ে মাটির মানুষকে যতটুকু প্রকাশ করেছেন তাতে করে আমরা মেঘনাদবধ কাব্যে এক মাটির মানুষের বীরত্বের কাহিনীই শুধু পেতাম। কিন্তু আমরা দেখেছি মাইকেল এই কাব্যে ধারণ করেছেন ব্যক্তি মানুষের বীরত্ব, মানবিক প্রেম, নারী স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতার মতো আধুনিক থেকে আধুনিকতম অনুষঙ্গগুলো যা মাইকেল অর্জন করেছিলেন ব্যক্তিগত প্রাপ্তি থেকে। মাইকেলের পর দীর্ঘদিন ধারাবাহিকতার চর্চ্চা হয়েছে এবং সেই ধারাবাহিকতার উজ্জ্বল পুরুষ আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর আবার একজন ব্যক্তি মেধা মননের ধারা এক অন্যরকম বোধ নিয়ে ধারাবাহিকতার ইতিহাস পাল্টে দিয়ে সৃষ্টি করলেন নতুন কবিতা। তিনি জীবনানন্দ দাশ। আশা করি তা বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়বে না। জীবনানন্দের পরে ব্যক্তিগত এবং গোষ্টিগতভাবে নতুন কবিতা সৃষ্টির আয়োজন চলছে দু’এক সময় কিন্তু তা সফল হয়নি, এখনো জীবনানন্দের ভূত আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তারপরও যারা একটি নতুন কবিতার আশায় ছুটছি তাদের প্রস্তুতিটি কেমন হওয়া উচিৎ তা একবার দেখে নেওয়া যাক, একটি নতুন কবিতা সৃষ্টির জন্য একজন কবি বা কোন গোষ্ঠী যে সমস্ত বিষয়গুলো নিজের ভেতরে ধারণ করতে চান সেগুলো হলো-
নিজের সময়- একজন কবিকে অবশ্যই নিজের আর্বিভাবকালকে চিহ্নিত করতে হবে। জানতে হবে নিজের সময়ের চাহিদা ও যন্ত্রণাকে। সেই সঙ্গে জানতে হবে পূর্ববর্তী সময়ের অর্জন ও ব্যর্থতা। পূর্ববর্তী সময়ের অর্জনগুলো ধারণ করে ব্যর্থতা থেকে নিজের পথচলা শুরু করতে হবে। পাশাপাশি তাকে নিজের সময়কে চিহ্নিত করে তাকে বিশিষ্টতা দেওয়া আকাক্সাও থাকতে হবে। এখানেই চলে আসে দশক ভাবনার কথাটি নিজের দশককে যদি কেউ প্রতিষ্ঠিত করতে চান তাহলে তার ভিতরে নতুন কবিতা সৃষ্টির ভাবনাটি ক্রিয়া করবে। দশক ভাবনাটিকে কেবল একটি দশকের মধ্যেই বিবেচনা করলে চলবে না। তিরিশের দশকের যে কাব্য স্টাইল, কাব্যবোধ তা কিন্তু তিরিশেই পরিপূর্ণ বিকশিত হয়নি বরং তিরিশের বোধ, স্টাইল কিন্তু তিরিশের পরেই স্বয়ংসম্পুর্ণ হয়েছে। এখন শূন্য দশকের যদি কেউ নতুন কাব্য স্টাইল নিয়ে আসতে চান তাহলে তিনি যে দশকেই তা করে ফেলবেন এমনটি ভাবা ঠিক নয়। এই দশকেÍ পরে আরো দুই দশক হয়তো লেগে যেতে পারে এই নতুন কবিতা নির্মাণ করতে। সেেেত্র তাদের কাব্যবোধ, স্টাইল নির্মাণের ঘোষণা এখনি দেয়া প্রয়োজন এবং পরীা নিরীায় তা প্রস্ফুটিত হতে হবে। যদি এই নতুন ধারা বিশ বা তিরিশের দশকে প্রতিষ্ঠিত হয় তবে তা শূন্য দশকেরই প্রপ্তি শূন্যের পরবর্তীরা এই ধারাবাহিকতার অনুগামী হবেন মাত্র।

গোষ্ঠী - বিশ্বায়নের প্রভাব, প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্য মানুষের গড়পরতা আই. কিউ. বৃদ্ধি জীবনকে আগের তুলনায় অনেক জটিল এবং চাতুর্যর্পূণ করে তুলেছে ফলে এখন আমরা আবার সমাজবদ্ধ হয়ে পড়েছি। আর এই জন্য এখন একক থেকে আমরা সমষ্টির দিকে এগুচ্ছি ফলে একটি নতুন কবিতা সৃষ্টির জন্য গোষ্ঠীগত চর্চ্চাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কবিতা সম্পুর্ণ একার সৃষ্টি। কিন্তু সৃষ্টির মনন তৈরী করে দিতে পারে গোষ্ঠীগত চর্চ্চা। ফলে যারা নতুন কবিতা সৃষ্টির স্বপ্ন দেখছি তাদের একটি গোষ্ঠীবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। এই গোষ্ঠীর ভেতরে থাকতে হবে মেধা বিনিময়ের আস্থা, মানসিক বয়সের পূর্ণতা এবং দীর্ঘদিন চর্চার মানসিকতা। এখন শূন্য দশকের গোষ্ঠী যদি শূন্য দশকেই শেষ হয়ে যায় তাহলে এ গোষ্ঠীর কোন দরকার নেই। বরং এই গোষ্ঠীর একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন নিয়ে বহুদিন বহুদূর যাওয়ার ল্য থাকতে হবে।

ছোটকাগজ - গত দশকের তুমুল ছোটকাগজ আন্দোলনের পরেও আজকে যারা নতুন কবিতা নিয়ে ভাবছেন তাদেরকে আরেকবার ছোটকাগজ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। গোষ্ঠী এবং ছোটকাগজ অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। কিন্তু ছোটকাগজ কি গোষ্ঠীর মুখপত্র হবে? তাহলেই নতুন কবিতার বারোটা বেজে যাবে? গোষ্ঠী এবং ছোটকাগজের মাঝে আরেকটা জিনিস থেকে যাচ্ছে যা হলো মূল জিনিস আর তা হলো দর্শন, নতুন কবিতা, কাব্যবোধ। লিটলম্যাগ হবে সেই দর্শনের মুখপত্র। যে গোষ্ঠী যে দর্শন বা কাব্যবোধের চর্চ্চা করছে কবিতাটা সেই গোষ্ঠী থেকে নাও আসতে পারে। বরং গোষ্ঠীর বাইরে কোন নিভৃতচারী কবির কলম থেকেও আসতে পারে সেই েেত্র ছোটকাগজ সেই কবিতাটা ছাপতে দায়ংবদ্ধ। আর এই জন্যই ছোটকাগজ কোন গোষ্ঠীর মুখপত্র হতে পারে না, হবে দর্শনের, নতুন কবিতার মুখপত্র। ছোটকাগজ নিয়ে এই সময়ে যে জিনিসটি শংকার তাহলো ছোটকাগজ সম্পাদক ভুলে যাচ্ছেন তিনি একটি কাগজ সম্পাদনা করতে বসেছেন, এবং তিনি তার কাগজের আয়তন নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন আর এই প্রলোভনেই তিনি ঢাউস সংখ্যা বের করছেন আর সেখানে না থাকছে পরিচর্যা, না থাকছে লেখার মানের প্রতি নজর দেয়ার ফুরসৎ। সা¤প্রতিক সময়ের ছোটকাগজ গুলির দিকে নজর দিলে তা স্পষ্ট হয়, অনেক ঢাউস সাইজের ছোটকাগজের যাঁতাকলে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে ছোটকাগজ আন্দোলনের প্রাণ ছোট ছোট অবয়বের কাগজগুলি। নব্বুইদশকের তুমুল কবিতা আন্দোলনকে উসকে দিয়েছিলো ুদ্র আকারের অনুশীলন কাগজটি, পরবর্তিতে অনুশীলনকে ঘিরে আরও কয়েকটি কাগজ সৃস্টি হয়েছিল। একদিন তারা সকল কাগজকে হত্যা করে মিলিত প্রচেষ্টায় বের করে ঢাউস সাইজের কাগজ ময়মনসিংহ জং। যে অনুশীলন বের হয়েছিলো ১৭সংখ্যা সেখানে ময়মনসিংহ জং ৩ সংংখ্যা বের হয়েই মুখ থুবড়ে পড়েছে। শুধু তাই নয় ঢাউস সাইজের কাগজগুলি দেখে ুদ্র অবয়বের কাগজগুলি কি একটু ভয় পেয়ে কি থেমে যাচ্ছে? সিলেট থেকে কাজী জিননূর বের করতো জারুল, সুণৃতর বিশাল অবয়ব দেখে কি সে লজ্জা পেয়ে জারুল প্রকাশ করছে না? তেমনি গুহাচিত্র?

উন্মাদনা - নতুন কবিতা সৃষ্টির জন্য জরুরী হচ্ছে উন্মাদনা। দশক, গোষ্ঠী, ছোটকাগজ এই তিনটি জিনিসের মধ্যে দিয়ে নির্মিত দর্শন কে নিয়ে কবির ভেতরে যদি প্রচণ্ড উন্মাদনা তৈরি হয় তাহলে নতুন কবিতা সৃষ্টির পথটি সুগম হয়। আমাদের দেশে উন্মাদনা আছে তো দর্শন নেই, দর্শন আছে তো উন্মাদনা নেই। এই যে অবস্থা তার উত্তরণ দরকার। ষাটের দশকের দর্শন এবং উন্মাদনা একই সঙ্গে শুরু হয়েছিলো ঠিকই কিন্তু কেন জানি এখন মনে হয় এটি ছিলো ব্যক্তিস্বার্থলোভী মানুষের সামাজিক সুযোগ সুবিধা বাগিয়ে নেওয়ার ফন্দি। এ থেকেও আমাদের সর্তক তাকতে হবে। একটি দর্শন প্রথমে নিজের ভেতরে ধারণ করে পরে তা কবিতায় প্রতিস্থাপন করে সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে। এবং সেই ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য থাকতে হবে উন্মাদনা। এবং নিজের কবিতার দর্শনকে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে যা থেকে সমাজ, কাব্য সমাজ প্রচণ্ড রকম ধাক্কা খায় আর এটি করতে গিয়ে নিজেকে হবে হবে মোহমুক্ত।

মোহমুক্তি - মোহমুক্তি ছাড়া নতুন কবিতা কখনোই সম্ভব নয়। একজন কবি যখন নতুন কবিতা সৃষ্টি করতে চান তাকে অগ্রজ কবি, সমসাময়িক কবি, অনুজ কবি,সামাজিক বিশ্বাস, মূল্যবোধ থেকে অবশ্যই মোহমুক্ত হতে হবে। অগ্রজ কবিদের থেকে আমাদের মোহমুক্তি ঘটেছে ঠিক কিন্তু তা কবিতার জন্য নয় ব্যাক্তিগত কারণে। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন? কবিতার জন্য অগ্রজ সম্বন্ধে আপনার মোহমুক্তি ঘটেছে? সমসাময়িকদের সম্পর্কে মোহমুক্তি আমাদের এখনোও ঘটেনি কারণ এখানে আরাব give & take এর একটি অলিখিত চুক্তি রয়েছে। একজন নতুন কবিতা কর্মীকে অবশ্যই এই মোহমুক্তি ঘটাতে হবে। সামাজিক বিশ্বাস ও মূল্যবোধ থেকে মোহমুক্তি আমাদের ঘটেনি আমারা ভিতরে ভিতরে মৌলবাদী কিন্তু ভান করি প্রগতিশীলতার। আমাদের সময়েই আমাদের নিজেদের শহরেই এমন প্রগতিশীলদের খুঁজে পাওয়া যাবে যিনি নিজেকে এবং নিজের কাগজটিকে প্রগতিশীল বলে দাবী করে অথচ তার কাগজটির প্রথম পেইজেই দেখা যায় তিনি তার কাগজটিকে লালন করছেন প্রতিক্রিয়াশীল এক এমপি’র টাকায়, (পড়ুন শালিক জংশন, সম্পাদক সিদ্ধার্থ টিপু। কাগজটির প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে ঐ এমপিকে যার টাকায় কাগজটি বের করা হয়েছে) আর তখনি বলতে ইচ্ছে করে এমন প্রগতি চাই না। আমরাতো নিজের ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড রকম ঈর্ষাকাতরতা পরশ্রীকাতরতা ধারণ করে সাধু সাজার ভান করি। যে দর্শন আমরা কবিতায় প্রকাশ করতে চাই সামাজিকতার ভায়ে আমরা তা জীবনে ধারণ করতে চাই না। সমাজ থেকে অগ্রজ থেকে সমসাময়িক এমনকি অনুজ থেকেও আমাদের মোহমুক্ত হতে হবে। মনে রাখতে হবে এ পৃথিবীর কোন কিছুই কিছু নয় যতই গোষ্ঠীগত ব্যপার থাকুক সে মূলত একা। এ পৃথিবীর সে হচ্ছে আদিমতম এবং শেষ পুরুষ। তার আগে আর কেউ কিছু বলে নি।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29011426 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29011426 2009-09-16 13:01:21
টীকাভাষ্য : ১ / এহসান হাবীব

দ্রুত সবুজ মাড়িয়ে মাড়িয়ে মনে হয়, অনেকটা দূর চলে এসেছি। ফেরার পথে বনফুল, কাঠঠোকরার শব্দ, বাঁশঝাড় আর অচেনা পোকা, বিচ্ছুদের দেখতে দেখতে মাত্র ঘণ্টাকয়েকের পথ। একেই এত দূ-র ভাবলে তুমি! ধূসর চৈত্রের কাঠফাটা তৃষ্ণা তোমাকে বিভোর করে বিভ্রান্ত করল বুঝি? যতটা সবুজ নৈকট্যে, যতটা ভাব আমাদের প্রাণে- এই কূহকী মায়া- যতটা দূরে আমরা যাইনি ঠিক ততটাই কিংবা আরো বেশি, চেতনায় জাগ্রত করে গেল।

একদিন আমরা- যা তুমি আর আমিতে গড়া- যতটা দূর গিয়েছি, যারা আরো আরো দূর চলে গিয়েছে তারা সবাই এক বুড়ো বটের প্রার্থনাসভায় মিলিত হব- একথা সত্যি। কেননা ফিরলে মাত্র তো ঘণ্টাকয়েকের পথ!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29005097 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/29005097 2009-09-05 15:21:21
সাতটি হোঁচট

তোমরা যখন শালবনের ভিতর দিয়ে ফিরছিলে
তখন যিশু প্রথম হোঁচট খেলেন।
কাঁধ থেকে ক্রুশ সরে গেলে মাথার কাঁটাতার
মগজে বিঁধলো।
সারারাত কয়েকটা মাতাল শুড়িখানার ভেতর
এই দৃশ্য অবলোকন করছে।
ফরফর করে সমস্ত পোশাকি আবরণ খসে গেলে
আবার কে একজন উঠে দাঁড়ায়- গোধুলিকে ভ্রম হয়
আমরা ঈশ্বরের নত মস্তকে চুমু খেয়ে ফিরে আসি।

তোমরা যখন শালবনের ভিতর দিয়ে ফিরছিলে
যিশুর তখন দ্বিতীয় হোঁচট খাওয়ার বয়স
তখন শহরের মানুষেরা রুটি রুজির ধান্দায় ব্যস্ত
আর কয়েকটা শেয়াল হোটেলের ক্যাশবাক্সে
পাহাড়া দিচ্ছিল মস্তকের খুলি-
আমাদের চিরচেনা কয়েন আর টাকার কাছে এইসব নস্যি।

তোমরা যখন শালবনের ভিতর দিয়ে ফিরছিলে
তখন মরিয়ম দৌড়ে গেলেন পতিত যিশুর কাছে
মায়েদের সমূহ যন্ত্রণা আমরা উপো করলাম
এবং আশ্চর্য হয়ে ওখানেও কিছুটা ভেজাল খুঁজে পেলাম
ভেজাল শেরিফ নিজেকে কী কায়দায় বাঁচাচ্ছে- দেশ
জনগন আর পরকালী খোদার গজব থেকে।
একেকটা শেরিফ যখন একেকটা খোদা
একেকটা মানুষ যখন বায়বীয় বিশ্বাসে ভাসে
তখন কয়েকটা কুকুর আমাদের উপরওয়ালা।

তোমরা যখন শালবনের ভিতর দিয়ে ফিরছিলে
সিস্টার মেরির ক্রমাগত ক্রন্দন একজন প্রেয়সীকে
মনে করিয়ে দেয়।
করুণা আর ভালোবাসার আকুতি নিয়ে যারা
তাকায় পৃথিবীর দিকে- তাদের সালাম।

ক্রমাগত ভুল, ভুল, ভুল...ভুলের অতল স্রোতে
চলতে চলতে যেদিন শুদ্ধকেই আমরা ভুল বলতে
শুরু করলাম
মানবেতিহাসে সেদিনই মানুষ প্রথম জয়ের স্বাদ পায়।

তোমরা যখন শালবনের ভিতর দিয়ে ফিরছিলে
যিশু তখন পঞ্চমবারের মতো হোঁচট খেলেন-
বিশ্বাসীরা একটি মোজেযা দেখার অপো করতে লাগলো
কারও একজন ফিরে আসার প্রতীা
নদীদের উল্টে যাওয়া গতিপথের কথা...

তোমরা যখন শালবনের ভিতর দিয়ে ফিরছিলে
যিশু ষষ্ঠ হোঁচট খাওয়ার পর
সমস্ত আরাধ্য পৃথিবী খান খান হয়ে যেতে লাগলো
তখন সূর্যের রঙ বদলে গেলো
কতগুলো ঈশ্বর, শিয়াল, কুকুর জোট বেঁধে
আমাদের দৌড়াতে এলো- আমরা মানে
আমি আর আমার হাত পা-
আমরা ক্রমাগত ঘামছি। ঘামছি আর ফুঁসছি
একেকটা ঈশ্বরকে আমি...
একেকটা শিয়ালকে আমি...
একেকটা কুকুরকে আমি...

তোমরা যখন শালবনের ভিতর দিয়ে ফিরছিলে
তখন যিশু অনেক কষ্টে সপ্তম হোঁচটের হাত থেকে
বাঁচার চেষ্টা করছে
একটা দ্রুতগতির বাস শহর ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে
চলে যাচ্ছে মরিয়ম, সিস্টার মেরি, প্রিয় সূর্য।
শুড়িখানার মাতালরা তখন কাঁপছে, কাঁদছে...

আর দিনের আকাশ মেঘলা হতে থাকলে খোদারা এইভাবে যিশুদের
ছেড়ে চলে যায়।

আমরা তখন শালবনের ভিতর দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28993196 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28993196 2009-08-13 13:54:12
আমার প্রিয় পোষা পুষি http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28987119 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28987119 2009-08-01 13:27:59 বাদশা হারুন অর রশিদ/এহসান হাবীব মানুষ যখন বুড়িয়ে যায় তখন তার ভেতরে এক ধরনের রোমন্থন কাজ করে। জীবনের পেছনে পড়ে থাকা দিনগুলো তার স্মৃতিতে সজীব হয়ে ওঠে- এটা প্রৌঢ় জানে। সেলিব্রেটিদের জীবনেও আসে প্রৌঢ়ত্ব, আসে ভাটার টান। সেই টান কী তাহলে তাকে কাবু করে ফেলছে? একটা অদ্ভুত শিরশিরানি সে টের পায় তার মেরুদণ্ডে। বুঝলাম প্রৌঢ়ত্ব তাকে গ্রাস করছে। স্মৃতির জাবর কাটতে কাটতে অনেকটা সময় তার নষ্ট হবে অলস বিকেলে। কিন্তু একটা বিষয়! নিজের জীবনের স্মৃতি, ঘটনা, শৈশব, যৌবনের কথা মনে এলে তার তো ভালই লাগে। কিন্তু এসব তো নয়, বরং কৈশোরে কি শৈশবে, কতকাল আগে পড়া একটা গল্প এক সেলিব্রেটির ব্যস্তজীবনে একটু পর পরই হানা দিয়ে গেলে তাকে একটু বিব্রতকরই হতে হয় বৈকি। তার উপর এই গল্পটা মনে এলে কেমন যেন একটু ভয় ভয় করতে থাকে প্রৌঢ়র।
দিন কয়েকের ভেতর এক প্রৌঢ় সেলিব্রেটির জীবনে আসে পরিবর্তন। প্রৌঢ় সেলিব্রেটি। যিনি শিল্পের একটি মাধ্যমে প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। দেশ এবং দেশের বাইরে যার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো কেশর উচিয়ে দুলতে দুলতে। যৌবনে যার তর্জনীর ইশারায় ডানে বায়ে ঘুরে যেত ময়দানের মানুষের রুচি। যেখানেই সে যেত মনে হত, যেন সে হ্যামিলনের সেই জাদুর বাঁশিওয়ালা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পেছনে তার ভক্তদের মিছিল লেগে থাকত। চারদিক তার 'গুরুজী' 'গুরুজী' সম্ভাষণে মুখর হয়ে উঠত। এতে তার একটুও বিরক্তিবোধ ছিল না। বরং সে এইসব সম্ভাষণ, আপ্যায়ন, স্বাগতমের বাহারকে জীবনে উদযাপন করত। সেই প্রৌঢ়ই আজ এক আবু হোসেনের গল্পের স্মরণে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত। যেন চারদিকের কোলাহল তার শরীরে থেকে থেকে হুল ফুটিয়ে দিচ্ছে। প্রৌঢ় মনেপ্রাণে একটু অবসর চায়, চায় একটু নিশ্চুপসময়। যেন সে গোপনে কিছু ভাবতে চায়। গোপনে, অতিগোপনে সে এই আবু হোসেন আর খলিফা হারুন অর রশিদের গল্পের একটা কিনারা করতে চায়। এই গল্পের কাহিনী এবং কাহিনীজাত ভয় বা অস্থিরতা সে কারও সাথে বিনিময় করতে পারছে না। কেন যেন তার মনে ভয় হয়, বিষয়টি কেউ জেনে ফেললেই সর্বনাশ! জেনে ফেললেই বিপদ। কোথায় যেন একটা ভয়, কোথায় যেন একটা সংকোচ তাকে তাড়া করে ফেরে। প্রৌঢ় গুম মেরে যায়। হঠাৎ করে সে চুপ হয়ে যায়। চারদিকের কোলাহল থেকে সে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজেকে সরিয়ে নেয় সংগোপনে। এবার সে একটু একা একা নিজের জীবনকে ভাবতে চায়। যেন সে ভাবে, তার এইজীবনের গল্প ভাবার মধ্যেই হয়ত লুকিয়ে আছে মুক্তি। তার মনে হয় আবু হোসেন আর খলিফা তার নিজের জীবনের বুকের মধ্যে বসে থেকে এক ধারালো খঞ্জর দিয়ে তাকে খোঁচাচ্ছে অনবরত।

প্রৌঢ় ফিরে যায় জীবনের শুরুতে। খুবশৈশবটা অবশ্য সে ভাবতে চায় না। কারণ তার খুবশৈশবটা শুরু হয়েছিল খুবই শাদামাটাভাবে। সে তো এক গরিব ঘরের সন্তানই ছিল। প্রৌঢ় নিশ্চিত যে, আজকের এই পর্যায়ে আসাটা তার কল্পনায়ই ছিলো না কোনদিন। তার স্পষ্ট মনে আছে তার বয়স যখন সাত কিংবা আট তখন অঞ্জনের সেই বিখ্যাত "একটু ভাল করে বাঁচব বলে" গানের মতই খুব বেশি কিছু নয়, এই একটু ভাল করে বাঁচার জন্যই, দরিদ্রতা, সংসারের নিত্য অভাব আর ঝগড়ার হাত থেকে নিস্কৃতি পেতে একদিন সে তার প্রিয় বাবা আর মাকে ছেড়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
এবং সে নিরুদ্দেশ হয়েই থাকতো যদি না বছর কয়েক পরে আলাদিনের জাদুর চেরাগটা সে পেয়ে যেত। প্রৌঢ়র হাসি পায়। সত্যিই তো একটা আলাদিনের জাদুর চেরাগই সে পেয়েছিলো আর চেরাগের দৈত্য হয়ে এগিয়ে এসেছিল একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। যে কাজটি তাকে করতে হয় তা সে শৈশব থেকে মোটামুটি ভালই পারে। খেয়ে পরে দিন পার করা যেত কিন্তু এতটা ভালো নয় যে তা তাকে সেলিব্রেটির পর্যায়ে পৌঁছে দিবে। নিতান্তই জাদুর চেরাগ আর দৈত্য না হলে তা হয় না। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি যখন একটি কম্পিটিশনের আয়োজন করে তখন সে কতকটা বিনে পয়সায় নাম নিবন্ধনের সুযোগ আর কতকটা কৌতুহলের বশবর্তী হয়েই ওখানে যায়। তারপর প্রাথমিক বাছাইয়ে সে টিকেও যায়। প্রথম দিকে ভালই করছিলো কিন্তু ক্রমশ যখন প্রশিতি ও ঝানু প্রতিযোগিরা মঞ্চে হাজির হতে লাগল তখন থেকেই সে একটু একটু করে পিছিয়ে পড়তে থাকে। ততদিনে সারা দেশ জেনে ফেলেছে তার বাবা মায়ের খবর। অন্যদিকে কোম্পানিও জেনে ফেলেছে যে, এই প্রতিযোগির দারিদ্রকে পুজি করার মতো যথেষ্ঠ কারণ আছে। একদিকে যদি তার দারিদ্রকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করে অন্যদিকে তাকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখা যায় তাহলেই কেল্লাফতে। আসবে কোটি কোটি টাকার এস এম এস যেখান থেকে ল ল টাকা কমিশন আর পণ্যের বিজ্ঞাপন তো হচ্ছেই! কয়েকমাসের মধ্যেই বাজার সয়লাব হয়ে যাবে তাদের পণ্যে।
মূলত এই প্রতিযোগিকে তারা এই অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপনমডেল হিসেবে ধরে নিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারগন চেয়েছিলেন কয়েকটা মাস এই প্রতিযোগিকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে। যাতে করে একটা বিপুল অংকের দর্শক অনুষ্ঠানটির সাথে নিজেদের জড়িয়ে নেয়। তারপর চূড়ান্ত বিচারে বিচারকগণ একজন প্রশিতি এবং সবচেয়ে ভালো প্রতিযোগিকে সেরার মুকুট পড়িয়ে দিক তাতে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি হলো এই কয়েকমাস পরেই। কোম্পানির কোন কোন অধিকর্তার পত্নী আদুরে গলায় তাদের স্বামীদের কাছে আব্দার করে বসলো, এই প্রতিযোগিকেই যেন সেরার মুকুট পরানো হয়। ব্যাস! এবার মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বুড়ো বুড়ো কর্তাদের যুবতী যুবতী বউদের আব্দার । দুনিয়া চুলায় যাক, এই আব্দার তো আর অপূর্ণ রাখা যায় না। অবশ্য এর সবই হচ্ছিল অতিগোপনে যেন অনুষ্ঠানের প্রতিযোগিরাও কিচ্ছুটি না জানতে পারে। ফলে সেই গ্রান্ড ফিনালের রাতে যখন সে সেরার মুকুটটি মাথায় পড়েছিলো তখন সে যতটা হকচকিয়ে গিয়েছিল ততটাই ভড়কে গিয়েছিলো।

এরপর সে দ্রুতই সামলে নিয়েছিলো নিজেকে। সে এখন তারুণ্যের ক্রেজ- এই বোধ তার ভেতরে কাজ করতেই নিজের অজান্তেই হাবভাব চালচলন বদলে গিয়েছিল। নিজের ভেতরে সে অন্য এক অস্তিত্বের অনুভব করে। মাঝে মাঝে খটকা তো একটু লাগতই। নিজের বিদ্যে বুদ্ধির জোর নিজের কাছে পরিষ্কার ছিল কিন্তু তা প্রকাশ করার ইচ্ছে তার কখনই হয় নি। না তা কারও কখনও হয়? নিজের বুকে কেউ কি কখনও নিশানা তাক করে? এই সেলিব্রেটি যৈবনের তেজদীপ্ততায়, তারুণ্যের মদে নিজের দুর্বলতাকে আড়াল করে দিল। কেননা তাকে তো টিকে থাকতে হবে। যে অর্জন সে চায়নি তাই যখন তার হাতে এসে পড়েছে এক তো লালন করতে হবে। তখন তার কাছে মনে হয়েছে টিকে থাকাটাই আসল ব্যপার। টিকে থাকার স্বার্থে যাকিছু করা হোক না কেন তাই সঠিক। যেন সে সার্ভাইভেল অব দ্য ফিটেস্টের জ্যান্ত উদাহরণ। পৃথিবীতে কেবল মানিয়ে নিতে পারটাই আসল কথা। যখন সে মানিয়ে নিতে শিখালো তখন আর কোন সমস্যাই হয়নি। তখন তো সে রীতিমতো নিজেই এক ব্র্যান্ড। নিজের দুর্বলতা আর নাজানাগুলো ব্র্যান্ডের আড়ালে চাপা পড়ে গেল। কোথাও হয়তো সুরের কোন গোলমাল হয়েছে জনরুচি তাকে 'ফ্যাশন' ভেবে নিয়েছে। এই তো ব্র্যান্ডের সুবিধা! কোথাও হয়তো ব্যাকরণে কোন ভুল হয়েছে বোদ্ধামহল তাকে ‘নতুনত্ব’ ভেবে লুফে নিয়েছে। তরতর করে সেলিব্রেটির পাল, উড়ছে তো উড়ছেই! এই তো তার জীবন। কোন অপরাধ তো সে করেনি বরং নিজের এই জীবনটাকে সে 'শাদামাটা' ভাবতেই বেশী পছন্দ করে। কিছু কিছু বিষয়ে সে থ্রিল অনুভব করে বটে কিন্তু সে ভেবে পায়না এমন কী ঘটেছে যে এক আবু হোসেনের গল্প কালবৈশাখির ঝড়ের মতো তার জীবনে আছড়ে পড়ে তাকে দিশেহারা করে দেবে?

এই তো প্রৌঢ় সেলিব্রেটি। জীবনের উদ্বাহু নৃত্যের সময় সে পার করে এসেছে। আজ এই পড়ন্ত সময়ে কিছুটা হিসাব নিকাশের প্রয়োজন আছে। সে ভাবে, একটু নির্জনে নিরিবিলিতে আয়েশ করে বাকি সময়টা কাটাতে। তবে জনতা তার পিছু ছাড়ে না। বয়সের একটা দাম আছে তো। বিচিত্রপেশার মানুষ, বন্ধুমহল, মিডিয়াকর্মীরা আসে তার কাছে গল্প শুনতে, শিল্পের গভীর গূঢ় তত্ত্বকথা তার কাছ থেকে জানতে। নবিশ শিক্ষার্থীরাও আসে দীক্ষা নিতে। প্রৌঢ় এবার নিজের দীনতা টের পায়। সময়ের কাছে সে এত নিষ্ঠুরভাবে ফেঁসে যাবে তা তার কল্পনায়ই আসেনি কখনও। নিজেকে তার খুব অসহায় লাগে। এর উপর আবার যদি মাঝে মাঝেই বাদশা হারুন অর রশিদ আর আবু হোসেনের গল্প হুড়মুড়িয়ে তার মস্তিষ্কে ঢুকে পড়ে তার মনে ভয় ধরিয়ে দেয় তাহলে তার আর কী করার থাকে? প্রৌঢ় ভাবে সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? বুড়ো বয়সে মানুষের 'বাহাত্তুরে' রোগ হয়। তারও কী এমন হয়েছে! পাগলা বাতাস তার উপর ভর করেছে? মাঝে মাঝে প্রৌঢ় ক্ষেপে যায়। হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর মতো করে সে এই গল্পটাকে তার মাথা থেকে তাড়িয়ে দিতে চায়। পারে না। যতই চেষ্টা করে ততই গল্পটা জাঁকিয়ে বসে। এবার সে উল্টো পদ্ধতি প্রয়োগ করে। সে ভাবে একে যখন তাড়াতে পারছি না তখন একে আরো ভাল করে জমিয়ে নিই। গল্পটাকে সে জমায়। একটা দৃশ্যময়তার ভেতর সে নিজেকে ছেড়ে দেয়। হারুন অর রশিদের ইশারায় আবু হোসেনকে তুলে আনা হলো বাদশাহর হেরেমে। এই তো পরিচারিকার জাঁহাপনা সম্ভাষণে আবু হোসেন কেমন হকচকিয়ে যাচ্ছে। তার মনে পড়ল গত রাতেই সে চেয়োিছলো বাগদাদের খলিফা হতে আর আজ সে সত্যি সত্যি খলিফা। এ কি তামাশা! কেউ কি তার আবেগ আর চাওয়াকে নিয়ে খেলছে! সে কী কোন অদৃশ্য হাতের পুতুল? নিজের হাতে চিমটি কেটে আবু হোসেন পরখ করতে চায় এ স্বপ্ন না বাস্তব? বাস্তব বুঝতে পেরে সে সত্যি সত্যি খলিফার মতো দরবার পরিচালনা করে। পরের সকালেই আবার নিজের ঘরে তাকে দেখতে পেয়ে সে বুঝতে পারে এক সুচতুর বাদশা তার দারিদ্রকে পুজি করে তার আবেগকে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে খেলেছে। সে সে ছিলো আসলে বাদশার একদিনের বিনোদনের সামগ্রী । এবার প্রৌঢ় মজা পাচ্ছে। আবু হোসেনের জন্য তার মমতা বোধ হচ্ছে। খেয়ালি বাদশাহর প্রতি কিছুটা রাগ টের পাচ্ছে প্রৌঢ়। আবার এই অবস্থাগুলো তার খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে। সে ভেবে পায় না কোথায় সে এরকম একটা নাটকের মঞ্চায়ন দেখেছিল। খুব ভয়ে ভয়ে সে ভাবে, তার নিজের জীবনের সাথে এই ঘটনার কোথায় যেন একটা মিল আছে। আবার সে পরিস্থিতির দৃশ্যায়ন করে। ঐ তো খলিফার দরবার হল! যেন গ্র্যান্ড ফিনালের রাত! অদ্ভুত আতঙ্কে প্রৌঢ় মঞ্চে আবু হোসেনরূপী নিজেকেই দেখতে পাচ্ছে। ঘৃণায় ক্ষোভে লজ্জায় মুখ বিকৃত করে প্রৌঢ় ভাবতে থাকে গ্র্যান্ড ফিনালের সেই সুচতুর রাতে আবু হোসেনের মত তারও যে কখন সবকিছু হারিয়ে গেছে সে বুঝতেই পারে নি। কোন নতুন বাদশার খপ্পরে পড়ে তার আবেগও যে কখন বিনোদনের উপভোগ্য পাত্র হয়ে উঠেছিল বাদশাহর হেরেমে, তা যদি সে ঘুনারেও জানতে পারত?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28969385 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28969385 2009-06-25 15:19:51
'নিজেকে বদলাতে আগে' প্রথম আলো কি বদলেছে? লাউডস্পিকারে ততোধিক গম্ভীর স্বর- বলছি
- ঘুমোচ্ছেন?
বেশ রাগতস্বর- রাত দু'টো কি জেগে থাকার সময়?
- না।
বলে বন্ধুটি একটু থামল। আবার বলল
- তবে স্বাক্ষী থাকলাম জাতিকে জেগে থাকতে বলে আপনি নিজে ঘুমোচ্ছেন। বলে খট করে রিসিভার নামিয়ে রাখল।
আমরা তিনজনই এবার সশব্দে হেসে ওঠলাম। যদিও বিষয়টি নিছকই মজা করে হয়েছিল তথাপি অন্যকে জেগে থাকতে বলে নিজে ঘুমিয়ে পড়ার মতো বিষয় এই বঙ্গদেশে নেহাতই কম ঘটে না।
এই যেমন সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলে ঢাকঢোল পিটিয়ে সারাদেশ ঘুরে নিজেকে বদলে দিয়ে পুরো জাতিকে বদলে ফেলার মহান ইজারার কাজটি শেষ করে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে প্রথম আলো নিজে কতটুকু বদলেছে?
শপথ নেয়ার আগে এবং পরে দুইটি ঘটনার উল্লেখ করি।
ঘটনা ১.
গতবছরের এপ্রিল মাসের কথা। আমার এক পরিচিত দুররোগ্যব্যাধিতে আক্রান্ত হলে আমরা কয়েকজন তার চিকিৎসার ব্যায়ভার লাঘবের জন্য কিছু উদ্যোগ নিই। তার মাঝে একটি উদ্যোগ ছিল পত্রিকায় সাহায্যের আবেদন করে বিজ্ঞপ্তি দেয়া। ঢাকার অনেকগুলি দৈনিক এই আবেদনের বিজ্ঞপ্তি ছেপেছিল। কিন্তু প্রথম আলোর ময়মনসিংহ প্রতিনিধি আমাদের যে বক্তব্য শুনিয়েছিল তা শুনে আমরা রীতিমতো ঠাসকি খেয়েছিলাম। ময়মনিসংহ প্রতিনিধি নিয়ামুল কবির সজল বলেছিল- "দেখেন এইসমস্ত বিজ্ঞপ্তি ছাপানো খুবই কঠিন। ঢাকা অফিসে খুবই উপরের লেভেলে যদি লোকটুক থাকে তাহলে এগুলো ছাপা হয় আর নাহলে এগুলো ডেস্কেই পড়ে থাকে।" প্রথম আলোর খতরনাক চরিত্রের কথা মোটামুটি দেশের লোকজন ভালই জানে। আমিও কিছুটা জানতাম। তাই এবিষয়ে আর কথা না বাড়িয়ে চলে আসি।
ঘটনা ২.
২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে এদেশের মানুষ যতটা আওয়ামি লীগের পক্ষে রায় দিয়েছে তার চেয়ে বেশি রায় ছিল বিএনপি জামাত জোটের বিপক্ষে। ফলে এই নির্বাচনের পর জাতি আশা করেছিল বিএনপিজামাতের খপ্পর থেকে জাতি এবার মুক্তি পাবে। সারাদেশে যখন যোদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী জোরালো হয়ে ওঠছে তখন ময়মনসিংহে স্থানীয় জামাতের এক নেতা স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় আওয়ামি লীগের কয়েক নেতাকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে ট্রাস্ট পরিচালিত একটি বেসরকারি কলেজ দখল করে নিজের কব্জায় নিয়ে নেয়। কলেজের প্রকৃত ট্রাস্টিগণ এবিষয়ে মামলা দিতে গেলে থানা মামলা নিতে টালবাহানা করে। পরবর্তিতে তারা সাংবাদিকদের দ্বারস্থ হন। কারণ তারা ধারণা করেছিল যে, জামাত নেতার বিরুদ্ধে থানা মামলা নিচ্ছে না এটি অবশ্যই অন্ততপক্ষে এইসময়ে সংবাদমূল্য পাবে। যাই হোক কয়েকটি পত্রিকা এবিষয়ে নিউজ করলেও প্রথম আলোর সজল আবারো সেই পুরনো প‌্যাঁচাল শুরু করে। " এখন পত্রিকা ঘূর্ণিঝড় আইলা নিয়ে ব্যাস্ত, এখন কি আর এবিষয়ে নিউজ করা যাবে?" ইত্যাদি। অথচ পরদিন প্রথম আলোয় মুক্তাগাছায় গরুচুরির উপরেও নিউজ ছাপা হয়েছিল। পরে জানা গেল স্থানীয় আরেক সাংবাদিকের মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে জামাতনেতা টাকা বিলিয়ে অনেক সাংবাদিককেই ম্যানেজ করে নিয়েছিল। তার মাঝে সজলও আছে। বিষয়টি প্রথম আলোর সম্পাদক জনাব মতিউর রহমানকে সরাসরি মোবাইল ফোনে জানানো হলেও এবিষয়ে কোন ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া কিছুই পাওয়া যায়নি। তার মানে কী? মতিউর রহমান নিজেও কী ম্যানেজ? বড় বিচিত্র এই দেশ! বাংলাদেশ বলে কথা! কতকিছুই সম্ভব এখানে। নিজের পুরনো খতরনাক চরিত্র ধরে রেখে জাতিকে বদলে ফেলার কী হাস্যকর প্রয়াস!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28968904 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28968904 2009-06-24 15:14:04
বইমলোয় আজ উড়ছে শাদা প্রজাপতি শাদা প্রজাপতি
এহসান হাবীব

প্রকাশক : পাঁচিল
প্রচ্ছদ : তৌহিন হাসান
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৫৬
মূল্য : ৭০ টাকা
ISBN : 984-8320-78-4
প্রাপ্তিস্থান : বইমেলার- লিটলম্যাগ চত্বর(ময়মনসিংহ জং-এর স্টলে), ভাষাচিত্র'র স্টল এবং সাহিত্য বিকাশের স্টলে।


শাদা প্রজাপতি আমার প্রথম বই। বেশ কয়েকদিন যাবৎ প্রায় দেড় বছর আগে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে বই করবো কি করবো না - এমত দোটানায় ভুগে শেষ পর্যন্ত অগ্রজ সমসাময়িক এবং কয়েকজন অনুজের তাগাদায় বইটি প্রকাশ করেই ফেললাম। কয়েকজন অনুজই সব খাটাখাটুনি করে বইটি প্রকাশ করেছে। প্রকাশকও দুই অনুজ। একজন ছোটকাগজ পাঁচিল-এর সম্পাদক ইলিয়াস কমল অন্যজন ঢাবি'র বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী রাশেদ শাহরিয়ার।

কবিতার পাঠক এক শুদ্ধচারি অলৌকিক মানুষ। তাদের প্রতি নিবেদিত পঙক্তিগুলো থেকে একটি তুলে ধরছি এখানে-

আমার জন্য

নিজেকে খুশি করা ছাড়া আমার আর কোন কাজ নাই।

সমস্ত নিরীহ বর্বরতা আমার সহজ সাধ্য কাজ
পূনর্বার ভুল করে ছুঁয়ে আসি বিষের বোতল
দিন দিন আরো জমা হোক, উঁচু হোক ব্যক্তিগত পাপ।
হাজারো মিথ্যার বাহার আর দু'একটা কড়া সত্য-
খুব সহজে হাজার লোকের ভীড়ে কষে একটা চড় মারার মতো
সত্য আর মিথ্যেয় ভরে থাকুক জীবন।

গোয়ার্তুমিতে সুখ খুঁজে পাওয়া গেলে মেনে নেওয়া যাক-
অকাল বৈধব্য অথবা সদর স্ট্রিটে, পার্কে উন্মুখ মানুষের মুখে
ছিটিয়ে দেয়া যাক থু থু অথবা সারাটা দিন তোমার পায়ের কাছে
বসে থাকি। যদি খুশি হওয়া যায় তবে অকেশে মাতম করো
আমাকে ছেড়ে যাওয়া শাদা প্রজাপতিটির জন্য।

আমাকে খুশি করা ছাড়া, এই খুশির ভাঁড়ার পূর্ণ করা ছাড়া
পৃথিবীতে আমার আর কোন কাজ নাই। ছিলো না কখনো।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28908713 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28908713 2009-02-09 13:36:10
আমি ভালোবাসি আশ্চর্য পৃথিবী/ এহসান হাবীব

গত বর্ষার শেষ প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা হলো না
এই যেমন পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকার কারণ,
রোদ বাড়তেই আমার কেন হাঁটতে ইচ্ছে করে?

এই বর্ষায় জমা হয়ে যাচ্ছে আরো কিছু প্রশ্ন
সে নেই তবু আমি কেন অন্য একটি অচল আধুলিকে
লকেটে পুরে ঘুরি?
রাত্রি এলেই আমার কেন গান গাইতে ইচ্ছে করে
আর মজনুই বা কেন গহীন বনে লাইলিকে নেয়নি শেষ পর্যন্ত?
আমার তো খুব জানতে ইচ্ছে করে-
মেঘ, আশ্চর্য মেঘ কেন উড়ে যায় সুদূরে?

আর এইসব অমীমাংসিত রহস্যের জন্য
পৃথিবীকে আমার বড় ভালো লাগে। ?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28908429 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28908429 2009-02-08 20:07:42
ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রজাপতি ঝিম ধরানো গান এহসান হাবীব

এ এক গোপন অসুখ
নিজেকে শিকার ভেবে কী নিপুণ ল্যভেদ!

কী অকেশে!
চমৎকার! আনন্দময় শিকার উৎসবের দিন-
এই ছটফটানি রেখে
শিয়রে আগুন জ্বেলে
নিজেই পুরছি মুখে নিজেরই দাওয়াই।

আমারি আমি সে
তবুও অন্য কারও বাস অন্য জানালায়
লটকে থাকা দিন-
যেন পুড়ছে বহুদিন; আমারি বিড়ির আগুন
এক লহমায় রঙিন।
ছুঁইনি যদিও তাকে নাড়িয়ে গেল হাওয়ায়
সকাল বেলার ঋণ।

আর যতসব গোয়ার্তুমি রেখে
দাঁড়িয়েছি নিজেরি পায়ের ভরে
অমনি কেন বাস নিকট হতে ছুটে?
আমার সঙ্গে আমারি ছলচাতুরী
আমার রক্তে আমিই আজ লাল!

নিজের খুনি নিজেই উন্মাতাল
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28905628 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28905628 2009-02-02 11:34:49
জীবনানন্দ দাশের প্রতি একটি শাদা প্রজাপতি নমস্কার এহসান হাবীব


একটা কাটা ঘুড়ির লেজ ধরে দৌড়তে দৌড়তে
আমি যাকে পাই সে আসলে কেউ না। আমারি
অন্য সংস্করণ, বোধহয় কুড়িতম। আমি জীবন
বাবুকে নমস্কার জানাতে জানাতে চূঁড়ায় তাকাই
আহা! কত হাহাকার পড়ে আছে চূঁড়ায় আটকে
পড়া কাটা ঘুড়ির লেজে।

এমন শাদামাটা ঘুড়ির গল্প প্রতিদিন শোনা যায়।
যারা শোনেনি অথবা ভাবে এ এক আশ্চর্য রূপকথা
তাদের জন্য বলে- ঢালিয়া নামে এক বিল
আছে সেখানে কৈ আর মাগুরের সাথে কিছু
কৈবর্ত বালক প্রতিদিন ঘুড়ি ওড়ায় আর তার কিছু
কেটে যায় সুতো।

এমন একটি ঘুড়ি তোমরা আকাশপথে উড়ে যেতে
যেতে চূঁড়ায় আটকে থাকতে দেখে শহরময় ফেরি
করে বেড়াও জীবনবাবুর গৌরবগাঁথা।

জীবনবাবুকে নমস্কার, বলি;
এই সেই ঘুড়ি, যা একদা আমিই উড়িয়েছিলাম কৈবর্ত পাড়ায়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28904846 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28904846 2009-01-31 16:44:35
স্বীকারোক্তি যখন প্রজাপতি হয় কনফেশান এহসান হাবীব

কোত্থেকে শুরু করা যায়, বলুন?
ঠিক কখন কোন আবর্তের ভেতর দিয়ে শুরু করেছিলাম-
শৈশব কৈশোর ধর্তব্যের মধ্যে নয়- অবাধ স্বাধীনতার দিন...
যখন ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকি একটা নীল দেয়াল আর গোলাপী আকাশের ভেতর।

হ্যাঁ, দেয়ালটা ছিলো নীল আর আকাশটা গোলাপী
যিশুর কসম! তোমাকে আমি তুলে দিয়েছিলাম হিব্রু পণ্ডিতদের হাতে,
আর উহুদের প্রান্তরে আমিই মুহম্মদের দাঁত উপড়ে ফেলেছিলাম।

পাখিদের মত ভূ-গোল না জানা মিথ্যেবাদী
এই আমিই সুচতুর হানা দিয়েছি পড়শীর নিরাপদ আশ্রয়।
খুব হিসাব করে বলতে হচ্ছে, সত্য আমি কদাচিত বলি-

যে খেয়ে গেছে কুমারজীবন তার প্রতি কোন অভিযোগ নেই,
যে সেবিকা কোমল হাতে সারিয়েছে হৃদপিণ্ডের ফোঁড়া
তারও প্রতি ছিলো না কোন প্রত্যাশা;
কে জানে নিজেরই খেয়ালে কখন রাতদুপুরে আমার বাঁশি বাজাতে ইচ্ছে করছিল?
মুখপোড়া হনুমানের মতো লেজে আগুন জেনেও
দ্বিতীয়বার...

দ্বিতীয়বার আমি গ্রামে গিয়েছিলাম
দ্বিতীয়বার আমি জন্মেছিলাম অসম্ভব রূপবতী একটি দেশে
দ্বিতীয়বার আমি পাঠশালায় গিয়েছিলাম, মিথ্যের জবরজঙ জগৎ
দ্বিতীয়বার আমি কবি হয়ে জন্মেছিলাম, ভুল ব্যকরণ আর ভুল অনুকরণ
দ্বিতীয়বারও আমি অস্বীকার করেছি জন্মলগ্নের কথা
পিতা ও ভাই, মা আর বোনের সাথে পরিচিত হইনি দ্বিতীয়বারও
দ্বিতীয়বারও আমি বোদলেয়ার!
বন্ধু আর প্রণয়িনীর গলায় নিষ্ঠুর চেপে ধরেছি হাত,
তাই না?

হ্যাঁ, দ্বিতীয়বারও আমি আঙিনা থেকে দূর দূর তাড়িয়ে দিয়েছি শাদা প্রজাপতি,
ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসা কবুতর রাঙিয়ে দিয়েছি রক্তে।
দ্বিতীয়বারও একটা অচল আধুলির পাশে দাঁড় করিয়ে রেখেছি চকচকে পাথর
দ্বিতীয়বারও জমিয়েছি জহর, ফোঁটা আর ফোঁটায়।
দ্বিতীয়বারও আমি সেই গ্রামে গিয়েছিলাম যে গাঁয়ে আমার কোন ঘরবাড়ি ছিলো না।
দ্বিতীয়বারও মিথ্যা আর মিথ্যেয় ভরেছি জীবন।
লেজে আগুন জেনেও দ্বিতীয়বার ছূঁয়ে দিয়েছি সেবিকার মুখ।

দ্বিতীয়বারও গোয়ার্তুমি... দ্বিতীয়বার বায়ান্ন... দ্বিতীয়বার একাত্তুর... দ্বিতীয়বার চিৎকার... দ্বিতীয়বার ভুল... দ্বিতীয়বার ভালোবাসি... দ্বিতীয়বার আধুলি... দ্বিতীয়বার পাথর... দ্বিতীয়বার যিশু এবং মুহম্মদ কাউকে না পেয়ে ফালি ফালি করে কেটেছি নিজেরি কলিজা... দ্বিতীয়বার... দ্বিতীয়বার...

এবং তৃতীয়বারও আমি এমনটিই করবো।

নাও, এই যে তুলাদণ্ড, আর হত্যা করো আমাকে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28903462 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28903462 2009-01-28 14:55:42
দু'টি শাদা প্রজাপতি আমাদের কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই এহসান হাবীব

বাপুরাম বলে যে সাপুড়ে ছিলো সে এখন ডিসকভারি চ্যানেলে।
জহরের লোভে পড়ে যে কি-না হারিয়েছিলো নামধামসমেত স্থায়ী ঠিকানা
এক ভূবনডাঙার চিল ছাড়া যার আর কোন বান্ধব ছিলো না।
গোখরার প্রেমে মজে গিয়ে যে কি-না নিজেকে লুকাতো শর্বরীর দেহে;
দেহের মোচড়ে পড়ে আটমাস থেকে যেতো বেউলার ঘরে-
সেই আজ ফিরে এসেছে ডিসকভারি চ্যানেলে- কোট টাই পড়ে।

সাপ কি জানতো? সাপ কি জানে?
কামতার বনে যেসব হরিনীরা ঘুরে বেড়ায়- সাপেদের সহোদরা
এমন বিজ্ঞাপনে ক্যামন ভোগ্যপণ্য- এই মহাভারত।
বেদেরও ঠিকানা মেলে, মেলে কিছু খুচরো পয়সা। মেলে না-কী?

আয় বাবা বাপুরাম!
স্থায়ী ঠিকানার অভাবে আজো পারিনি যেতে ডিসকভারি চ্যানেলে।


এলেবেলে এহসান হাবীব

আমাকে জিজ্ঞেস করো-
অকারণ রোদে ভিজে হাঁটাহাঁটির কারণ

এত ঢাকঢোল পিটানোর কিছু নেই
কোন কোন সময় বালিতে সূঁচ পাওয়া যায়
তেমন পেয়ে গেলে ভাবো, আহ্ কী সৌভাগ্য!

সূঁচের কদর ছিলো আমরা জানি;
আধুলি ফুটো হয়ে গেলে লকেটের গিঁট দেওয়া ছাড়া
তাঁতিপাড়ায় সূঁচ আর খোঁজে না কেউ।

আমাকে জিজ্ঞেস করো
পাহাড় দাঁড়িয়ে থাকার কারণ?





]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28901000 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28901000 2009-01-22 17:36:54
হৃদগভীরে ঘাইমারা অনুভূতিগুলো / এহসান হাবীব
ক.
ঘুমোতে ঘুমোতে যারা যায় আর ঘুমোতে ঘুমোতে আসে তারা ভ্রমণে হাই তোলে- ধুৎ! বিরক্তিকর, বলে- 'বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ তর্কে বহুদূর'। আমি তো দেখতে দেখতে যাই আর দেখতে দেখতে আসি ফলে কৃষ্ণে মন নেই। মন পড়ে আছে দুধবালিকার ঘরে।

ভ্রমণে ক্লান্তি নেই তর্কে তর্কে উঠে পড়ি দূরগামী ট্রেনে।

খ.
'ও আমার দেশের মেয়ে তোমার প'রে ঠেকাই মাথা'- পাশ থেকে এমন একটি সুর গুনগুনিয়ে উঠলে মুহূর্তেই সমস্ত ক্লাশ ফাঁকা হয়ে যায়। তখন কী করে বুঝাই অর্ধ-শিক্ষিত অধ্যাপিকার বকবকানি শুনার চেয়ে ছাত্রী হস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টাঙ্কি মারা কত পুণ্যময় আর রিয়েলিস্টিক।

বাৎস্যায়ন জেনেছি আমি জনমের দোষে তাই থোড়াই কেয়ার ঐ অধ্যাপিকা- গুরুজনে ভক্তি নেই, চোখ বিঁধে আছে সহপাঠিনীর স্তনে।

গ.
বাতি নিভিয়ে দিলে সব অন্ধকার। শাদা-কালো সমান। অন্ধই কেবল চোখে দেখে তখন। পৃথিবীতে কেবল হোমারই আলো আর অন্ধকারে সমান জ্যোতির্ময়। মুখভরা গাল নিয়ে যারা বসে আছো তারা অধ্যাপিকা ভালো। আলোতে আরো ভালো। আরো ভালো চন্দ্রের সমাজ।

চোখে আমার গ্রহণ লেগেছে বড়, মূর্খতর, সাজিয়াছি আদিম সূঁচকুমার...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28883862 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28883862 2008-12-17 17:15:52
আমি তোমাকে পূজো দিতে চাই/এহসান হাবীব
আঠারো শতকের প্রথমার্ধ বাংলা সাহিত্যের জন্য একটি বিশেষ মাইলফলক হয়ে আছে। এই সময়েই সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে। মুদ্রণ শিল্পের প্রচলন ও প্রসার সাহিত্যের জন্য খুলে দিল এক বিস্তৃত পৃথিবীর দরোজা। এরপর গত হয়ে গেল দুইশ বছর। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বাংলা সাহিত্যের জন্য অবশ্যই সম্ভাবনার দরোজা খুলে দিয়েছিলো। কিভাবে? - তা বিস্তৃত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। মুদ্রণ শিল্পের অভাবনীয় প্রয়োগের কল্যাণে হাতের কাছেই আজ তার প্রমাণ ও দলিল দস্তাবেজ।

সাহিত্যের জন্য যারা একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর তাগিদ অনুভব করলেন তারা অবশ্যই সৃষ্টিশীল ছিলেন এবং সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর দিয়েই মাইকেল অপ্রাতিষ্ঠানিক চেতনার উন্মেষ ঘটালেন। আর রবীন্দ্রনাথ তো প্রাতিষ্ঠানিকতার ধারায় রীতিমতো ইতিহাস। পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে এসে যারা সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টা করলেন -তারাও সৃষ্টিশীলতার তাগিদ থেকেই তা করলেন। প্রমথ চৌধুরীই আমাদের প্রথম দেখালেন অপ্রাতিষ্ঠানিকতার প্রকৃত স্বরূপ। এরপর ত্রিশের সুধীন দত্তের কথাও স্মরণে আনা যেতে পারে। এরপর অবশ্য আমাদের সামনে অপ্রাতিষ্ঠানিকতার ধারনাটাই বদলে গেল। ষাটের দশকের প্রতিষ্ঠানবিরোধীতার কল্যাণে প্রতিষ্ঠান বিরোধীতাকেই আমরা অপ্রাতিষ্ঠানিকতা বলে ভাবতে লাগলাম। প্রতিষ্ঠানও যে প্রতিষ্ঠানের বিরোধীতার করতে পারে তা আমরা বুঝতে চাই নি। তো যাই হোক, এই দুইশ বছরে বাংলা কবিতা কম তো দেখলো না? প্রাতিষ্ঠানিকতা, অপ্রাতিষ্ঠানিকতা, প্রতিষ্ঠানবিরোধীতার পর বাংলা কবিতা এক্সপেরিমেন্টাল যুগও দেখেছে। কিন্তু এই দুইশ বছরে বাংলা কবিতার প্রায় হাজার খানেক কবিতালিখিয়ে কী চেয়েছে? এই দুইশ বছরে তারা আজকের বাংলা কবিতাকে কোথায় নিয়ে এসেছে?

এবার আমি একটা স্থুল বিষয়ের ভেতর ঢুকব। এই যে হাজার খানেক কবিতালিখিয়ে দুইশ বছর ধরে রিমের পর রিমের কাগজ আর ড্রামের পর ড্রাম কালি খরচ করে ফেললেন, তা কাকে অর্ঘ্য দেওয়ার জন্য? এখানে নন্দনতত্ত্বের একটা বিষয়ের সাথে আমার মতবিরোধ আছে। নন্দন তত্ত্বের একটা দিক বলছে, শিল্পী তার নিজের মনের আনন্দে শিল্প সৃষ্টি করেন। পাখি যেমন নিজের মনের আনন্দে গান করে। আমি নন্দনতত্ত্ব বিশারদদের মনে করিয়ে দিতে চাই সেই গল্পটির কথা। দৈত্যের বাগানের গল্প। যে বাগানে জনমানুষ তো দূরের কথা শিশুদেরও প্রবেশাধিকার ছিলো না। আর সে বাগানে পাখিও গান গাইতো না, ফুলও ফুটতো না। তাহলে দেখা যাচ্ছে- পাখিও শ্রোতা চায়, ফুলও দর্শক চায়। কবি কবিতা লেখার মুহূর্তটুকুতেই কেবল নিজের মনের আনন্দে কবিতা লেখেন, এরপর কবির মন আনন্দে ভরে ওঠে তখন যখন তা পাঠক সমাজের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। সাধু সন্ন্যাসীর ভাব করে যারা পাঠক সমাজকে গৌণ করে ফেলেন তারা নিবিড় রাত্রিতে অন্ধকার ঘরে বুকের উপর হাত রেখে বলুন, পাঠক আপনার কতটা আকাক্সিত জন। হোমার থেকে রবীন্দ্রনাথ, আবু হাসান শাহরিয়ার থেকে রবার্ট ব্রাউনিং সকলেই তো এক পাঠককে অর্ঘ্য দিতে চেয়েছেন।

একটি সভ্য কম্যুনিটিতে 'পাঠক' একটা আলাদা শ্রেণি হিসেবে পরিগণিত হয়। অবশ্য সেক্ষেত্রে কম্যুনিটিরও কিছু দায় থাকে। সে দায় আমাদের কম্যুনিটি মিটিয়েছে। আমাদের মুদ্রণ শিল্প পৃথিবীর যে কোন দেশের প্রকাশনামানের সাথে পাল্লা দিতে পারে। আমাদের কবিরা প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, নিরীক্ষা ও প্রচল সব ক'টি ধারাতেই তো গত দুইশ বছর ধরে চেষ্ঠা চালিয়েছে পাঠকের দ্বারে যাওয়ার জন্য। তবু আজও এই দেশে সচেতনভাবে একটি পাঠক শ্রেণি গড়ে ওঠলো না। এ পর্যায়ে আমরা দুইটি মতবাদের দেখা পাবো। এক মতবাদের লোকেরা বলছে- পাঠক নেই একথা ঠিক নয়, বাংলা কবিতার এখনও প্রচুর পাঠক। এ পর্যায়ে আমি একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরতে চাই, বাংলাদেশের সর্বাধিক বিক্রিত কবিতার বইয়ের এক মুদ্রণে প্রকাশিত কবিতার বই সর্বোচ্চ দুইহাজার কপি, আর কোন কবিতার বইয়ের পঞ্চম মুদ্রন হয়েছে এমন নজিরও বিরল। আর গড়ে এক মুদ্রণে কবিতার বই ছাপা হয় পাঁচশ কপি। তো এই দুইহাজার ও পাঁচশ'র মাঝে যে বইগুলো বিক্রি হয় তার অধিকাংশ ক্রেতাই কোন না কোনভাবে কবিতাকর্মী। তাহলে শ্রেণি হিসেবে পাঠক'র অস্তিত্ত্ব কোথায়? সাম্প্রতিক এক আড্ডায় আমার এক বন্ধু বলেছিলো যে, কয়েকদিন পূর্বে পত্রিকায় প্রকাশিত একটা ছবি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেই ছবিটি ছিলো জাপানের একটি চলন্ত ট্রেনের অভ্যন্তরের দৃশ্য। সেখানে সারি সারি মানুষ ট্রেনে বসে আছে আর সকলেই এক একটা বই নিয়ে মেতে আছে। চিন্তা করা যায় বাংলাদেশের কোন ট্রেনের দৃশ্য এটি? ৫০ কোটি ইংরেজি ভাষাভাষির মাঝে গিনস্বার্গের 'হাউল' ৩ মাসে বিক্রি হযেছিলো প্রায় ১ লাখ কপি। সেখানে ২১ কোটি বাংলা ভাষাভাষির মাঝে শক্তি বা আল মাহমুদের কবিতার বই গত ৫০ বছরে বিক্রি হয়েছে কত কপি? তাহলে আমাদের সমাজে পাঠক শ্রেণিটি কোথায়? একটি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শহরের কয়েকটি গণগ্রন্থাগারের চিত্র তুলে ধরি- টাকা দিয়ে কিনে নয়, টাকা দিয়ে সদস্য হয়ে নয়, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ আছে এই গ্রন্থাগারগুলোতে। সেখানে আমি দেখেছি দিনের কর্মব্যাস্ততায় তো বটেই বিকেলের অবসরেও গ্রন্থাগারগুলো খা খা করে। প্রায় দু'ইঞ্চি পুরো ধূলোর আস্তরণের ভিতর আমি উঁইপোকার খাবার হতে দেখেছি মাইকেলের মেঘনাদ বধ, রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, তারাশংকরের কবি, বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড়, মোবাশ্বের আলীর শিল্পীর ট্র্যাজেডি'র মতো বই। এতো আমাদের পাঠক শ্রেণির কীর্তিই।

দ্বিতীয় মতবাদ হলো- বাংলা কবিতা আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, ফলে পাঠক বাংলা কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাদের জন্য বলি, মানলাম আমি এহসান হাবীব না হয় 'বালছাল' লিখি কিন্তু উপরে উল্লেখিত উঁইপোকায় খাওয়া কবিতার কবিরা কী দোষ করেছে? না কি তাদেরও কিছু হয় নি?

যখন একটা কম্যুনিটিতে সচেতনভাবে কোন পাঠক শ্রেণি গড়ে ওঠে না, তখন শুরু হয় সাংস্কৃতিক দালালী। বিভিন্ন রকম এজেন্ডা নিয়ে শুরু হয় গোষ্ঠী কেন্দ্রিক নোংরামি, প্রকাশনা সংস্থাগুলো লিপ্ত হয় ফড়িয়াবাজীতে। পাঠক শ্রেণি না থাকলে কবিকে কবিতা লেখার পাশাপাশি নানা রকম অসাহিত্যিক কাজেও লিপ্ত থাকতে হয়, যেমন- তাকে সময় করে একবার সম্পাদকের কাছে ধর্ণা দিতে হয়, প্রকাশকদের পিছনে স্যান্ডেলের তলি ক্ষয় করতে হয়, তাকে জনসংযোগ তো করতে হয়ই পাশাপাশি তাবলিগও করতে হয়। প্রকৃত কবি এতে ক্লান্তি বোধ করেন। এতসব ঝক্কি-ঝামেলা পোহানোর চাইতে তিনি ছেড়ে পারেন কবিতা লেখাই। এতে কবির কিছুই যাবে আসবে না, সভ্যতা বঞ্চিত হবে তার কবিতা থেকে। সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে কবিকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরী।

পাঠক! আমি তোমাকে পুঁজো দিতে চাই। এবার তুমি দিনের আলোয় একটু দেবতা হও তো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28873032 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28873032 2008-11-23 14:30:25
এই যে তুমি/এহসান হাবীব যেখানে চোখ বন্ধ করলই চোখের তারায় তুমি হাজরি
সেখানে সেলুলয়েডের ফিতার কী কাজ?
এই যে এখন বিমূর্ত তুমি কথা বলছো, গাইছো, হাসছো
হাওয়া আসছে, ঝড় বইছে, সাটপাট খুলে যাচ্ছে জানালা দুয়ার।
আর তোমার সে হাসির শব্দ টেপ করার জন্য
কোন প্লাস্টিক রিবরে জিঙ্কের প্রলপে লাগাই না।

আমি তো চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেই স্পষ্ট শুনতে পাই
লক্ষ কোটি ঝর্ণার কলকল ধ্বণি
আর কী হড়বড় বলে যাও অমর কবিতাখানি!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28863015 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28863015 2008-11-01 16:11:55
টিকাভাষ্য / এহসান হাবীব
১.
আলস্যে যাওয়া হয়না তোমার কাছে। আলসেমিতে ভরে গেলে সারাটা দুপুর হাতের কাছে প্রয়োজনীয় কাজও জমা হয়ে পড়ে থাকে স্তুপাকারে। আটপৌরে পোশাক- জমা হয়, ময়লা হয়। দাস প্রথা ছিলো বলে- এখনো আলস্যে বেড়ে ওঠে নখ, দাড়ি। প্রতিদিন আয়নায় বেড়ে ওঠা দাড়ি কিছুটা শোভা ছড়ালে, কেমন মায়া পড়ে যায়। এতসব আলসেমির ভিড়ে মায়ার টানে কিছুটা সময় করে যত্ন করি অনুজ্জ্বল দাড়ি, অপাংক্তেয় নখের।

প্রতিদিন যত্ন করে বাড়িয়ে তুলি প্রিয় দাড়ি- একদিন যত্ন করে কাটবো বলে।


২.
তোমাকে মনে রেখে, শ্রদ্ধায় নত হয়ে আমি মাফ চাই খৈয়ামের কাছে। যে পাপ প্রতিদিন লালন করি পালন করি, করার আগে সেই তো আমাকে শিখিয়েছে আরো একবার 'না করার শপথ' করে নিতে। তোমাকে মনে রেখে আমি তার কাছে যাই। প্রতিবার বলি, এ আমার শেষকৃত্য। তাকেও বলিনা কিছু। তুমুল অভিনয়। মঞ্চ ঝিমিয়ে এলে আমি মাফ চাই। বলি, এই তো শেষবার। দীক্ষা দাও প্রাণের পুতুল। বাঁচার আর্তি। তোমাকে মনে রেখে আমি তার কাছে যাই। শ্রদ্ধায় নত হয়ে আমি মাফ চাই, এই শেষবার।

যতবার আমি শেষবার বলি, মাফ চাই, আমিও বুঝিনি আগে, এ ছিলো আমার প্রতিবার শুরুর সম্ভাষণ।




৩.
অপরাধ মাথা পেতে নিয়েছি। সমস্ত পাপ স্বীকার করে নিতে নিতে মনে হলো কারো প্রতি কোন অভিযোগ জমা রাখিনি। উত্থিত যৌবনের সবটুকু সময় আমি চেয়েছি কেবল; চৌষট্টি পদ্মপাতায় আমি নাচাতে চেয়েছি অচল আধুলি, উচু উচু পর্বতের পাদদেশে বেঁধে রেখেছি নূহের নৌকা। তাহলে এই অভিযোগ স্বীকার নিতে পারি, কলার সমস্ত প্রকার জেনে নিতে আমি খুইয়েছি সরল হাফপ্যান্ট। প্রায়শ্চিত্য করিনি, প্রয়োজনও দেখিনি, বুকের বসন উদোম করে পেয়েছি মহামতি বৃক্ষের নাম, জ্ঞান।

শৈশব যদি আমি মোহনীয় করে রাখতাম, তাহলে কি মাতৃগর্ভে থেকে যাওয়াটাই আমার জন্য অধিক লোভনীয় হতো না?


৪.
এই জটিল প্রশ্ন নিয়ে আমি এখন ভাববো কিছুক্ষণ। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যাবো। জেগে আবার বসবো জটিল ধাধাটি নিয়ে। পৃথিবীর অঃনিশেষ জটিলতা নিয়ে আজ ঘর হতে বের হবো। সারা দুপুর ঘামে ভিজে পায়ে হেঁটে ঘুরবো শহর, জটিল ধাধাটি নিয়ে। যে প্রশ্ন- চায়ের কাপে পড়ে থাকবে মরা মাছিটির মতো। সে প্রশ্ন নিয়ে কাটিয়ে দেবো সুন্দর বিকেল- চায়ের দোকানে। প্রশ্নটি নিয়ে তুমুল তর্ক জুড়বো তার সাথে। ভারী ভারী বুদ্ধিজীবী, কবি, আমলাদের মধ্যরাত অবধি বসিয়ে রাখবো, যতক্ষণ না তারা এর একটা আপাত মিমাংসায় পৌঁছেন।

এই জটিল প্রশ্নটি নিয়ে আমি চেনা পৃথিবী জ্যামে আটকিয়ে রাখবো বহুক্ষণ যতক্ষণ না আমি 'দূর শালা' বলে উঠে পড়বো।






৫.
সেইসব সরল প্রেমোক্তিগুলো স্মরণ করো, ভাবো, বর্ষার কথা। প্রতিটি ফোঁটায় ঝরে পড়তো যে আকাঙ্ক্ষা, সে আজ কোথায়? দেখার বাসনাগুলো যাঞ্ছা করো, আর দেখো গভীর কালো চোখ, মায়াবতী, যে তোমাকে প্রতারিত করে মুহূর্তেই। দৃষ্টি, এক মায়াবী কূহক। যে বিভ্রম তোমাকে দেখায়, জন্মান্ধের কাছে তার প্রবেশাধিকার নেই। কল্পনায় পরাজিত যার মুখ দৃষ্টির অগম্য সে। স্বপ্ন নিয়ত পরিবর্তিত। কল্পনা আরো দ্রুত সঞ্চরণশীল। সেইসব সরল প্রেমোক্তিগুলো স্মরণ করো, ভাবো-

মিথ্যে অহমিকা! দেখার বাসনা নয়, বাঁচারও আর্তি নয়। আমরা এক যাপনের ক্রিড়নক।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28860000 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28860000 2008-10-26 14:24:14
আমার প্রথম মেয়ে/ এহসান হাবীব
আমরা একটা ইংরেজী মুভি দেখছিলাম। বাইবেল। ঈসা মসীহর উপর নাজেলকৃত আসমানী কিতাব ঈঞ্জিল শরীফের কাহিনী নিয়ে বাইবেল মুভিটি তৈরি। আদম ও ঈভের র্স্বগমর্ত্যরে কাহিনী নিয়ে মুভিটি শুরু হলেও মুভিটি খোলস ছেড়েছে নূহ'র জীবনীকালে এসে। নূহ'র প্লাবনের কথা আমাদের মোটামুটি সবারই জানা। কয়েক হাজার বছর ধরে চলে আসা এই গল্প এখন কেচ্ছায় পরিণত হয়েছে। চল্লিশ দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টিপাত! আর সে কী প্লাবন! সমস্ত পৃথিবী যেন পানিতে ভাসছে। তার মাঝে বিচিত্র প্রাণীসব নিয়ে নূহের নৌকা। অর্পূব! আমরা তন্ময় হয়ে দেখছিলাম।
আমি আর আমার সঙ্গিনী। আমরা দুই বছর ধরে একসঙ্গে আছি। আমদের চারপাশে এতবেশি দেয়াল, লোকনিন্দা, ভয়, সমাজ- ক্রমশ আমাদের সংকোচিত করে ফেললে আমরা রিফ্রেশমেন্ট-এর জন্য এখানে চলে আসি। বেশ নিরিবিলি একটা বাড়ি। আসলে এটা কোন বাড়ি নয়। এটা একটা স্কুল ঘর। চারতলা বিল্ডিং-এর এই নিচতলাটা বাচ্চাদের স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উপরের ফ্যাটে স্কুলের পরিচালক থাকেন। বছর তিনেক ধরে আমি তার আশ্রিত। এই শহরেই আমার বাবা মা থাকলেও আমি তার আশ্রয়ে থাকতেই বেশি স্বছন্দ্য বোধ করি। দুপুরের পর স্কুল ছুটি হয়ে যায়। আর এই সময়েই আমি আমার সঙ্গিনীকে নিয়ে এখানে আসি। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন মুভি আমরা দেখি। মুভি দেখতে দেখতেই আমরা স্বপ্ন বিনিময় করি।
বেশ লম্বা সময় নিয়ে তৈরি মুভিটি। নূহ’র ভূমিকায় অভিনয় করেছেন যিনি (নামটা অবশ্য জানা হয়নি)- চাপ দাড়ি সমেত, মোটা বস্ত্র পরিহিত- তিনি অনবদ্য ফুটিয়ে তুলেছেন চরিত্রটি। তো প্লাবনের পর হঠাৎ আমরা খেয়াল করলাম মুভিতে একটা অদৃশ্য আওয়াজ হচ্ছে- নোয়া! নোয়া! অপূর্ব মায়াবী সে আওয়াজ! আর নূহকে দেখলাম কেমন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বাতাসে কান পাতছে। মনে পড়লো প্লাবনের আগেও এরকম একবার হয়েছিল। তখনও আমরা জানি না নূহকেই ডাকা হচ্ছে নোয়া বলে। এইবার বুঝতে পারলাম ঈশ্বর নূহকে ডাকছে নোয়া বলে। ঈশ্বর যখন নূহকে ডাকে তখন নূহ'র মুখটা কেমন বোকা বোকা শিশু শিশু হয়ে যায়। দেখতে আমার খুবই ভালো লাগে। দেখলাম আমার সঙ্গিনীর ও ঐ মুর্হূতটা খুব পছন্দ। আমি সঙ্গিনীর দিকে তাকালাম। তোমাকেও আমি এখন থেকে 'নোয়া' বলে ডাকবো। সে তৎক্ষনাত রাজি এবং কয়েকটা আনন্দের অভিব্যক্তি ঘটালো।
এরপর যখনই আমি তাকে 'নোয়া' বলে ডাকি সে ঠিক নূহর মতো শূন্যে কান পাতে। শিশুর মতো ভাব করে। আমার ভারি আনন্দ হয়। একদিন আমরা দু’জনে মিলে ঠিক করি- আমাদের কন্যার নাম হবে নোয়া। সেই থেকে আমি নোয়ার বাবা। ওকে ডাকি নোয়ার মা বলে। প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হয় আমাদের নোয়া। আমরা কোথাও বাইরে বেড়াতে গেলে ও আমাকে তাগাদা দেয় তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে কিন্তু, বাসায় নোয়া একা। আমি হাসি। হাসতে হাসতেই নোয়া বড় হয়। আমার প্রথম কন্যার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা স্বপ্নের ভিতর।
নোয়া একটু একটু করে বড় হয়ে উঠতে লাগলো। ওর শরীরের গঠন কাঠামোর সাথে চেতন কাঠামোও স্পষ্ট হতে লাগলো। নোয়া মুখের আদল পেয়েছে ওর মা’র। নাকটা একটু চ্যাপ্টা। গোলগাল মুখ। ছোট ছোট হাতের আঙুল। আবার আমার মতো অল্পতেই রেগে যায়। কোন ব্যাপারে আনন্দিত হলে তার প্রকাশ ঘটে একটু বাড়াবাড়ি রকমের উল্লাসের ভেতর দিয়ে। ওর মা প্রতিদিন দুপুরে ওকে সময় করে গোসল করায়, খেতে দেয়, ঘুম পাড়িয়ে আমার জন্য অপো করে। আমি একটু জোরে শব্দ করলেই ও আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়- নোয়া ঘুমুচ্ছে, আস্তে কথা বলো, জেগে যাবে তো। ওর জন্য আমি নানা রকম খেলনা নিয়ে আসি। আমার সঙ্গিনী সেগুলো ঘরময় ছড়িয়ে রাখে, নোয়াকে নিয়ে নিজেই খেলতে বসে। নোয়া একটু একটু দুষ্টুমি করতে শিখেছে। ওর মা’র কাজের সময় সে পিছন থেকে মা’র গলায় ঝুলে পড়ে। বেশি দুষ্টুমি করলে সঙ্গিনী ওকে শাসায় - নোয়া, এরকম করতে হয়না। পরণেই আবার মোলায়েম গলায় বলে- এই সমাজে মেয়েদের একটু সাবধানে চলতে হয়রে, মা ; নোয়া ফোকলা দাঁতে হাসে। ওকি আর এত কিছু বোঝে? হামাগুড়ি দিয়ে আমার বুকে এসে ঝাপিয়ে পড়ে। কারন নোয়া জানে শত ঝামেলা করলেও বাপি ওকে কিছু বলবে না। পরণই আমার সঙ্গিনী নোয়ার পাশে এসে বলে, এখন যদি নোয়ার কিছু হয়ে যায় তাহলে আমি বাঁচবো না। বিশ্বাস করো, নোয়াকে ছাড়া এখন আমার রাতে ঘুমই হয় না।
দিনে দিনে নোয়ার বয়স তিন হলো। ততদিনে আমাদের পারস্পরিক আদরে অনেকটাই ভাগ বসিয়েছে নোয়া। একদিন আমার সঙ্গিনী বললো-'এই শোন, এবার কিন্তু নোয়াকে স্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে'। আমি হেসে ফেললাম, 'এতটুকুন মেয়ে! এখনি কী স্কুলে দেবে?' ওর জোর আব্দারে বললাম, ' ঠিক আছে, আগামী বছরেই ওকে স্কুলে ভর্তি করে দেব। দিন যায়। নোয়া ক্রমেই আমাদের মাঝে রক্ত মাংসময় হয়ে ওঠে। নোয়ার মা'র সাথে আমার কখনো মনোমালিন্য হলে, সে নোয়ার উপর রাগ ঝাড়ে। কখনো বা আমিই সঙ্গিনীর প্রতি অভিমানবশত নোয়াকে নিয়ে একাই বেড়াতে যাই। ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ নোয়া চার বৎসরে পা রাখলো। জানুয়ারিতে আমরা নোয়াকে নার্সারিতে ভর্তি করে দিয়ে এলাম। নোয়ার স্কুল খরচ মেটানোর জন্য আমাকে তখন একটু বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ফলে দিনের বেলায় সঙ্গিনীর প্রতি এতোটা মনোযোগ দেওয়া হয়না। সেও রুষ্ঠ না। সকালে আমি একটা কোচিং সেন্টারে পড়াতে যাই। ও সারাদিন নোয়াকে নিয়েই থাকে।
মে মাসের ১৩ তারিখ করে নোয়ার মা’র সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। লোকচুর অন্তরালে, সমাজের শত চোখ রাঙানি উপো করে আমরা ছিলাম ছয় বছর একত্রে। এই ছয় স্বপ্নের যে বাড়ি আমরা তৈরি করেছিলাম আপাত দৃষ্টিতে তার কোন ভিটে ছিলে না। কিন্তু এই ভিটেহীন বাড়ি পরীক্ষিতভাবে সামাল দিয়েছে অনেক ঝড়। মানুষ যত রহস্যের আধার তার চেয়ে রহস্যময় মানুষের জীবন। আর মানুষের সম্পর্ক সে এক অন্তহীন রহস্যের অকূল পাথার। আমি তার কতটুকু বুঝি? তাহলে কোন সাহসে আজ বলি তার চলে যাওয়ার কারণ? সুখ? না! আমিতো জানি চরম অসুখেও সে আমার পাশে ছিলো। যে ঝগড়া থেকে সে চলে যায় এরকম ঝগড়া আমরা প্রতিদিনই করতাম। অনেক সময় আমরা ইচ্ছে করেই করতাম। কোনদিন কোন কারণে ঝগড়া নাহলে সন্ধ্যায় আমরা একজন আরেকজনকে বলতাম, আজ আমাদের কী কাজটা যেন করা হয় নি? তারপরও খুব সামান্য একটা বিষয় নিয়ে অভিমান, রাগ তারপর খুব দ্রুতই ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। জীবনে কতকিছুই না হয়! নোয়া রইল আমার কাছে। কে জানে আমাদের এই স্বপ্নের কন্যাটিকে সাথে করে সেও নিয়ে গিয়েছিলো কি না? সঙ্গিনী চলে যাওয়াতে আমি কতটা বিরহে, কতকটা অপমানে অনেকটাই কাতর হয়ে পড়েছিলাম। সেই কাতর দিনগুলোতে আমাকে অনেকটাই নির্ভার করেছিলো পুরনো দিনের এক বান্ধবী। আমাদের পাড়াতেই থাকত সে, ফলে আমার র্সাবণিক দেখ ভাল করতে শুরু করলো। কাতরতা কেটে গেলে একদিন আমি তাকে সময় করে নোয়ার কথাটা বলি। ও তো হেসেই উড়িয়ে দিলো ব্যাপারটা। আমি তাকে সিরিয়াসলি বুঝাতে চেষ্টা করলাম যে, ব্যাপারটা শুধুই কল্পনার নয়, স্বপ্নের নয়। নোয়া এখন রক্ত মাংসময় মানুষ, তার বয়স সাড়ে চার, সে নার্সারীতে পড়ে এবং প্রতিতিরাতে মাকে কাছে পাওয়ার জন্য আমার কাছে মিনতি করে। এখন আমি ওকে মা এনে দেই কোত্থেকে? আমার গলা ধরে এলো। সম্ভবত চোখে পানিও এসে পড়ছিলো। আমার চোখের পানি ওকে প্রভাবিত করে। ও নোয়ার দায়িত্ব নিতে রাজি হয়। নোয়ারও দেখলাম আমার বান্ধবীকে বেশ পছন্দ। আন্টিকে কাছে পেলে ও মা'র কথা ভুলে যায়। সেদিন থেকে নোয়া আন্টির বাড়িতে থাকে। পরদিন সকাল হতেই আমি বান্ধবীর বাড়ীতে যাই। গিয়ে দেখি ওদের দু'জনের বেশ ভাব হয়েছে। রাতে একটুও কাঁদে নি । আগে যাকে আন্টি ডাকতো এখন তাকে দিব্যি 'ছোট মা' বলে ডাকতে শুরু করেছে।
বান্ধবীর স্বামী আবার থাকতো অন্য শহরে। খুব ঘন ঘন আসা হতো না তার। মাঝে মাঝে আসতো। আমার অবশ্য জানা ছিলো না ওর স্বামী বেচারা আমার প্রতি কিছুটা জেলাস ফিল করে। বেচারার আর দোষ কী? নিজের স্ত্রীকে এভাবে অন্যের সেবায় পড়ে থাকতে দেখলে কার না রাগ হয়? বেচারা স্ত্রী-অন্ত প্রাণ, স্ত্রীকে কষ্ট দিতে চায়নি, ফলে সমস্ত রাগ গিয়ে পড়েছে আমার উপর। ভদ্রলোক অবশ্য আমাকে কিছু বলে নি। আমার সাথে বেশ হাসি খুশি আন্তরিক ব্যবহারই করেন। তার রাগের গল্পটি আমাকে বলেছে বান্ধবী।
একদিন নোয়া আমাকে বলে, 'জানো বাবা, ছোট মা না আমাকে বলেছে আঙ্কেলকে বাবা ডাকতে। তুমি ছোট মাকে বলে দিয়ো আমি আঙ্কেলকে বাবা ডাকতে পারবো না। ' শুনে তো আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করতেই বললো, 'এটা আমি নোয়ার নিরাপত্তার জন্য করেছি। তা নাহলে তো ও নোয়াকে আমার কাছে রাখতে দেবে না।''তাই বলে ও আরেকজনকে বাবা ডাকবে?'' আমি নোয়াকে নিজের কাছে নিয়ে এলাম। সেই রাতে আমি অনেকক্ষণ ভেবেছি। নিজেকে বারবার বুঝিয়েছি, নোয়া আমার মনের একটা অসুখ মাত্র। নোয়া বলে আসলে কিছু নেই। একটা স্বপ্ন, একটা ব্যার্থ কল্পনা। একে বয়ে বেড়ানোর কিছু নেই।
সকাল হতেই মনে হলো আমি কি গত রাতে একটা খুন করে ফেলেছি? আমি একটা খুনি- এই বোধ আমার ভেতরে ক্রমশ ডালপালা ছড়াতে লাগলো। একটা খুনীর অবয়ব নিয়ে আমি উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। ভয়ংকর রকমের একটা তাড়না আমাকে তাড়িয়ে ফিরতে লাগল। আমি একটা খুনী। আমি একটা রক্ত মাংসময় জ্যান্ত মানুষকে খুন করে ফেলেছি, যে কিনা- আমারই সন্তান। তারও পূর্বে আমরা দু’জনে মিলে আরো একবার খুন করেছিলাম নোয়াকে। নোয়া, মা আমার, আমাদের মা করো। বেঁচে থাকলে তুমি আজ কত বড় হতে ?
এই ঘোর, এই মায়া কাটতে আমার অনেকদিন লেগেছিলো। তবুও মাঝে মাঝেই এখনও আমার সেই অনাগত কন্যাটি আমাকে আক্রমন করে, স্মৃতিভারাতুর করে তোলে। যখন বিছানায় আমার দু'টি ফুটফুটে কন্যা হাসে, লুটোপুটি খায়, মেঝেতে আমার সাথে ছোড়াছুড়ি খেলে আমি তখন হঠাৎ আনমনা হয়ে যাই। এদের মুখের ভিতর নোয়ার মুখ খুঁজি। এদের কোনটা নোয়ার মতো দেখতে? একটা অতৃপ্তি ভর করে না।
না। এদের ভেতর কোনটাই নোয়ার মত নয়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28858721 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28858721 2008-10-23 18:58:47
অক্ষর খেলা বিষয়ক / এহসান হাবীব
ছেলেবেলায় আমরা একটা অদ্ভূত খেলা খেলতাম।
আমাদের ঘরে বাঁশের বেড়ায় দৈনিক পত্রিকা লেপ্টে থাকতো
আমি পত্রিকা থেকে লুকানো অক্ষর খুঁজে নিয়ে
তোমাকে বলতাম, আমি যা দেখি তুমি তা দেখ?
তুমি হয়রান হয়ে লুকানো অক্ষর খুঁজে বের করতে।
এরপর আমার পালা।

এই খেলা খেলতে খেলতে আজ আমি বুঝি
তুমি যা দেখ না আমি তাও দেখতে পাই।

ফলে তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে
আজ আমাকে কষ্ট করে কোন অক্ষর খুঁজে নিতে হয় না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28857841 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28857841 2008-10-21 19:09:29
এই তো আছি ভালই http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28847491 http://www.somewhereinblog.net/blog/Ehabib13/28847491 2008-09-24 20:23:59