নূরুজ্জামান ১৯৭১ সালে ৪ বছর ৯ মাসের শিশু ছিলেন। কিন্তু মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে তিনি এখন প্রথম শ্রেণীর সাব-রেজিস্ট্রার পদে চাকরি পেলেন। তালিকায় তার জন্মতারিখ হচ্ছে ১৯৬৬ সালের ১ জুলাই। মিনতি দাসের বয়স ছিল ৫ বছর। তালিকায় জন্মতারিখ হচ্ছে ১৯৬৬ সালের ১৪ মার্চ। মোঃ মঞ্জুরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪ বছর ৯ মাস। তালিকায় জন্মতারিখ হচ্ছে ১৯৬৬ সালের ১৬ জুন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এরকম ৬০ শিশু মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে গত সপ্তাহে প্রথম শ্রেণীর সাব-রেজিস্ট্রার পদে চাকরি পেলেন। এ নিয়ে গত ৩ মাসে ১৯৫ জন মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে প্রথম শ্রেণীর সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগ দিলেন। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়েও রয়েছে মিথ্যা তথ্য। মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে ১৯৮৫ সালের তালিকায় দেখানো হয়েছে স্নাতক পাস। কিন্তু সনদ অনুযায়ী তাদের স্নাতক সম্পন্ন হয় আরও অনেক পরে।
আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন রেজিস্ট্রেশন পরিদফতরে সাব-রেজিস্ট্রার পদে চাকরিপ্রাপ্তদের তালিকায় বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার এ চিত্র দেখা গেছে। চাকরিপ্রাপ্ত মিনতি দাসের ১৯৮৫ সালের মনোনয়নে দেখানো হয়েছে বিএ অনার্স। কিন্তু সার্টিফিকেট যাচাইয়ে দেখা যায় ১৯৮৮ সালে তিনি বিএ অনার্স পাস করেছেন। এসএম কুদ্দুস মিয়াকে ১৯৮৫ সালে তালিকায় মনোনয়নের সময় দেখানো হয়েছে বিএ পাস। সার্টিফিকেট অনুযায়ী তিনি ১৯৮৯ সালে বিএ পাস করেছেন। মোঃ বদিয়ার রহমান মণ্ডলকে ১৯৮৫ সালের তালিকায় মনোনয়নের সময় বিএ পাস দেখানো হয়। সার্টিফিকেট অনুযায়ী তিনি বিএ পাস করেছেন ১৯৯০ সালে।
মোঃ ফারুককে ১৯৮৫ সালের তালিকায় মনোনয়নের সময় দেখানো হয় বিএ অধ্যয়নরত। কিন্তু সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১৯৮৬ সালে এইচএসসি এবং ১৯৯৩ সালে বিএ। মোছাঃ সুফিয়া খাতুনকে ১৯৮৫ সালের তালিকায় মনোনয়নের সময় দেখানো হয় স্নাতক। সার্টিফিকেট অনুযায়ী তিনি ১৯৮৫ সালে এইচএসসি এবং ১৯৮৮ সালে বিএ পাস করেন।
পারভিন আক্তারকে ১৯৮৫ সালের তালিকায় মনোনয়নের সময় দেখানো হয়েছে বিএ পাস। সার্টিফিকেট অনুযায়ী তিনি বিএ পাস করেছেন ১৯৯৫ সালে। তার জন্মতারিখ দেখানো হয়েছে ১৯৬৪ সালের ২৩ এপ্রিল।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৮৫ সালের যে তালিকা অনুযায়ী তাদের চাকরি দেয়া হয়েছে, তারা কেউ তখন বিএ পাস করেনি। অথচ তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সময় তাদের বিএ পাস দেখানো হয়েছে। প্রায় প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে অসামঞ্জস্য ও মিথ্যা তথ্য রয়েছে। এরকম মিথ্যা তথ্য ধরা পড়ার পরও প্রথম শ্রেণীর সাব-রেজিস্ট্রার পদে তাদের চাকরি দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে তারা গত সপ্তাহে রেজিস্ট্রেশন পরিদফতরে যোগদান করেছেন। প্রথম শ্রেণীর কোনো পদে যাদের আবেদন করারই যোগ্যতা নেই, কোটি টাকার খেলায় সেই অযোগ্য ব্যক্তিরাও এখন গেজেটেড অফিসার পদে বিনা পরীক্ষায় যোগদান করছেন।
সাব-রেজিস্ট্রার চাকরিবিধি অনুযায়ী পদটিতে কেউ চাকরির জন্য আবেদন করতে হলে স্মাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণী থাকতে হয়। পাস কোর্সে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণী থাকলেও কেউ আবেদন করার যোগ্য বলে বিবেচিত হন না। এক্ষেত্রে যে কোনো একটিতে প্রথম শ্রেণী থাকতে হয়। এই যোগ্যতা থাকলেই কেবল আবেদন করা যায়। আবেদনের পর পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই চাকরি পাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হন। কিন্তু মুজিবনগর কর্মচারী হিসেবে যারা চাকরি পেলেন, তাদের মধ্যে প্রায় সবাই তৃতীয় শ্রেণীতে স্নাতক পাস। কোনোরকমের যুক্তি-ব্যাখ্যা ছাড়াই তাদের প্রথম শ্রেণীর চাকরি দেয়া হয়।
আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাইকোর্ট বিভাগের একটি নির্দেশনার দোহাই দিয়ে এরকম মিথ্যা তথ্য পাওয়ার পরও প্রথম শ্রেণীর পদে চাকরিবিধি অনুযায়ী অযোগ্যদের পদায়ন করা হচ্ছে। এর বিনিময়ে একটি চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সূত্রটি জানায়, প্রতিদিনই এখন মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে চাকরি প্রার্থীর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী দাবিদার নতুন নতুন আবেদনকারী প্রতিদিনই আসছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুধু আইন মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রেশন পরিদফতরেই ১৯৫ জনকে চাকরি দেয়া হয়েছে। তারা সবাই প্রথম শ্রেণীর সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেছেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চালাকালীন যারা ছিলেন ৫-৬ বছরের শিশু, তারা তখন কী চাকরি করছেন—সে প্রশ্ন অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীদের চাকরি প্রাপ্তিতে প্রাধান্যের বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের একটি নির্দেশনা রয়েছে। এ নির্দেশনাকে ভিত্তি করে মুজিবনগর কর্মচারী দাবি করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন দায়ের করা হয়। একটি চক্রের মাধ্যমে তৈরি করা তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্তি দেখিয়ে রিট আবেদনের সঙ্গে জমা দেয়া হয়। রিট আবেদনগুলোর সঙ্গে এ পর্যন্ত জমা দেয়া ৪টি তালিকার কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিল নেই। কোন তালিকা প্রকৃতভাবে গণ্য করা হবে—এ বিষয়েও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেই। আইন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের একটি চক্র মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে এ তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি করছে।
মন্তব্য করুন। জনাব ও জনাবা ব্লগার বৃন্দ! !! !!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


