যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই বিশেষ ট্রাইব্যুনালে
ফ কি র ই লি য়া স
----------------------------------------
মৃত্যুবরণ করেছেন পল টিব্বেটস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নায়ক ছিলেন তিনি। ৬ আগস্ট, ১৯৪৫ সাল। পাইলট পল টিব্বেটস সেই মারণাস্ত্র বিমানটি চালিয়ে যান। হিরোশিমায় নিক্ষেপ করেন বি-২৯বোমার ‘এনোলা গে’। যে আণবিক বোমাটি কমপক্ষে সত্তর থেকে এক লাখ লোকের তাৎক্ষণিক প্রাণহানি ঘটায়। রচিত হয় বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণিত হিরোশিমা ট্রাজেডি। পল মারা গেছেন ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যের কলম্বাস নগরীতে। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। মৃত্যুর আগে তিনি বলে গেছেন ‘হিরোশিমা’ ঘটনায় তিনি অনুতপ্ত নন। তিনি আরও বলেছেন, তার যেন কোন ফিউনারেলের ব্যবস্থা করা না হয়। তার সমাধিতে যেন কোন এপিটাক বা ফলক লাগানো না হয়। কেন তার এই ভীতি ছিল? পল কি মনে করেছিলেন, তার মৃত্যুর পরও তার সমাধিতে গিয়ে মানুষজন ভর্ৎসনা করবে? হয়তো তা হতেও পারে। কিন্তু কথা হচ্ছে, হিরোশিমা নাগাসাকি ট্রাজেডির প্রতি বিশ্ব মানবের যে ঘৃণা তা কি কখনও প্রশমিত করা যাবে? প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত- এই ক্ষোভ সঞ্চারিত হতেই থাকবে। হিরোশিমা-নাগাসাকির মর্মবেদী ঘটনা নিয়ে লেখা হবেই প্রবন্ধ-গান-কবিতা।
৯ আগস্ট, ১৯৪৫ সালে নাগাসাকিতে দ্বিতীয় আণবিক বোমা নিক্ষেপিত হয়। ১৪ আগস্ট, ১৯৪৫ সালে জাপানিদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দৃশ্যের যবনিকাপাত ঘটে। প্রথম দৃশ্য এ জন্যই বলছি, কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেশ এখনও বহন করে চলেছে বর্তমান বিশ্ব। এখনও সে যুদ্ধস্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন কেউ কেউ। এর আগে ঘটে যায় আরেকটি বেদনাদায়ক ঘটনা। রোববারের একটি চমৎকার সকাল। ৭ ডিসেম্বর, ১৯৪১ সাল। মার্কিনি যুদ্ধবহরগুলো হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের পার্ল হার্বারে নোঙর করা মাত্র শেষ করেছে। হঠাৎ করেই জাপানি যুদ্ধবিমান হাওয়াইয়ের আকাশ দখল করে নেয়। দু’ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তারা একযোগে বোমা নিক্ষেপ করে। এতে ১৯টি মার্কিনি যুদ্ধজাহাজ এবং প্রায় ২০০ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়ে যায়। নিহত হয় প্রায় ২৪০০ মার্কিনি। ঘটে যায় ‘পার্ল হার্বার ট্রাজেডি’। ইতিহাস বলে, মার্কিনিরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছিল। তাদের যুদ্ধে ঠেলে দেয়া হয়। এর পরের পরিণতি কি তা সবারই জানা। মূল কথা একটিই, যুদ্ধ কোন শান্তি-ই বহন করে না, বইয়ে দেয় রক্তগঙ্গা। কিন্তু সে সংগ্রাম কিংবা যুদ্ধ যদি হয় মুক্তি সংগ্রাম? মুক্তির সংগ্রাম কখনোই ঠেকিয়ে রাখা যায় না। যায় না গণঅধিকার দমিয়ে রাখতে। যারা তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত একটি প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ দেখেছেন তারা বলতে পারবেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কতটা গণহত্যামূলক ছিল। কিভাবে বাঙালি জাতির মেধা-মননকে ধ্বংস করার হীন চক্রান্ত- করা হয়েছিল। ‘মুক্তির গান’ দলিল চিত্রটির প্রায় সবটুকু ফুটেজই বিদেশী সাংবাদিকদের দ্বারা ধারণকৃত। তারা এগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে রেকর্ড করে রেখেছিলেন, তা কেউ বলতে পারবে না। যারা এই নরহত্যা করেছিল আর যারা এদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সহযোগিতা করেছিল এরা উভয়েই যে ঘাতক, তা তো সেসব প্রামাণ্যচিত্রই প্রমাণ করছে। সে সময়ের পত্রপত্রিকা, তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি, ষড়যন্ত্রের নীলনকশার নমুনা সবই সংরক্ষিত আছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সুনামগঞ্জের মাহমুদ আলীর মতো দু-চারজন রাঘব পাক সমর্থক, পাকিস্তানে চলে গেলেও অধিকাংশই থেকে যায় এই বাংলায়। এরা এখানে থেকেই নানাভাবে তাদের নখর শাণ দিতে থাকে।
বিভিন্ন তথ্য এবং দলিল প্রমাণ দেয় ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫-এর আগ পর্যন্ত- প্রায় বাইশ হাজারেরও বেশি রাজাকার, দালাল, আলবদর, আল সামশ, যুদ্ধাপরাধী বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি ছিল। পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলো দশ বছরের মধ্যেই প্রায় বিনা বিচারে এদের ছেড়ে দেয়। রাঘববোয়ালরা বিভিন্নভাবে ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য পেয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে। এই ধারাবাহিকতা চলেছে গেল ছত্রিশ বছর ধরে। এখন এদের অনেকেই মনে করছে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। এটা কে না জানে, যদি কেউ খুনি হয় এবং তা প্রমাণ করা যায়, তবে যে কোন বয়সের খুনিকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব। যেমনটি এখনও হচ্ছে নাৎসিদের বিষয়ে। পঁচাত্তরের নিচের বয়সী খুনি নাৎসি খুঁজে পেলে তাকেই জেলে ঢোকানো হচ্ছে। পঁচাত্তর বয়সোর্ধ্বদের বয়কট করা হচ্ছে সামাজিকভাবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে। বাংলাদেশে আজ ঘাতকদের বিচারের যে দাবি উঠেছে, তা ঐতিহাসিকভাবেই যৌক্তিক। বিএনপি, আওয়ামী লীগ যা পারেনি কিংবা করেনি তা অন্য কেউ করতে পারবে না, এমন কোন কথা নেই। যারা বাংলাদেশে আল্লাহর শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল, তাদের দুর্নীতিবাজ এমপিরা ধরা পড়ে প্রমাণ করেছে সবই ছিল নেহায়েত হিপোক্র্যাসি। কেউ ভাবেনি একসময়ের শীর্ষরা অন্তরীণ হবেন। তাও ঘটেছে বাংলাদেশে। এখন যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি তুঙ্গে, তখনও একটি মহল নানা ধুয়া তুলে এদের বাঁচাতে তৎপর। এই রক্ষাকারী-মুখোশধারী কারা, এদেরও চিহ্নিত করতে হবে। ঘাতকরা আইনের মুখোমুখি হবে, সেটাই প্রধান বিষয়। প্রচলিত আইনে হোক, আর বিশ্বে জেনোসাইড বিচার আইনের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত-মূলক আইনেই হোক, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দোষীদের বিচার করা উচিত। কোন ষড়যন্ত্রকারী, খুনি, ধর্ষক কখনোই একটি জাতির মিত্র নয়। হতে পারে না। সে কথাই তারা প্রমাণ করেছে। সেক্টর কমান্ডাররা সজাগ হয়েছেন। জাতি আজ এক দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনেক অসাধ্য সাধন করেছে; যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিলে জাতি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। হত্যাপরাধ
কখনও তামাদি হয় না। একটি ঐতিহাসিক কাজের শুভ সূচনা যে কোন সময়ই হতে পারে ।
------------------------------------------------------
(উপ সম্পাদকীয়।। দৈনিক যুগান্তর/ ঢাকা/ ১১নভেম্বর ২০০৭)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০০৭ রাত ৮:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


