মারুফ রায়হান
-------------------------------------------------------------------------------
সুখী গৃহীর মতো তৃপ্ত, পাথরসম প্রতিষ্ঠিত কবি-নক্ষত্রদলের ক্ষীয়মান চেনা আলোর বাইরে এ হলো গুচ্ছ গুচ্ছ হঠাৎ দ্যুতির চমক; দাপুটে নামের ভিড়ে সারি সারি প্রায় অশ্র“তপূর্ব নাম; প্রবল প্রচলের বাইরে নতুন ছলাৎছল। বাংলা কবিতার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত- না হলেও বাংলাদেশের কবিতাভুবনের সর্বসাম্প্রতিক প্রেমিকদলের প্রতিনিধিত্বশীল সংগ্রহ এটি। হ্যাঁ, আমি চলমান দশকের ১১৯ জন নবাগত কবির (বয়স ২২ থেকে ৩৩) কবিতাসংগ্রহ ‘শূন্যের কবিতা’-র কথাই বলছি। সোহেল হাসান গালিব সম্পাদিত অস্ট্রিক আর্যুর ‘বাঙলায়ন’ কর্তৃক প্রকাশিত এই সংকলনে জনপ্রতি সমান দু’পৃষ্ঠা বরাদ্দ। এই নির্দিষ্ট পরিসরে বসত গড়া পঙক্তিমালা পাঠ করে ওই কবির মেজাজ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ না হলেও অনেকখানি আঁচ করা সম্ভব।
প্রথমেই আমি একঝাঁক কবিজাতকের কাব্যিক এবং ব্যতিক্রমী নামের প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। নামের প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার। অনিন্দ্য আকাশ, অপূর্ব সোহাগ, আলী প্রয়াস, ত্রিস্তান আনন্দ, অবনি অনার্য, আদিত্য অন্তর, নির্লিপ্ত নয়ন, সজল সমুদ্র, হিমেল বরকত, সোমেশ্বর অলিঃমধুক্ষরা সব নাম। পূর্ববর্তী যে কোনো প্রজন্মের কবিনামের সঙ্গে ব্যবধান রচে দিয়েছে এই অভিনব নাম-মাহাত্য। পিতৃ-মাতৃপ্রদত্ত, নাকি স্বঘোষিত এইসব নাম, সে-অনুসন্ধানে যাওয়া নিরর্থক। কবিতা প্রবেশের আগেই নামগুলো মনে আঁচড় কাটে, এটাই প্রীতিকর।
সম্পাদক তরুণ হলেও অভিমত প্রকাশের ধরন প্রাজ্ঞ প্রবীণের মতোই। তিনি লিখছেন : “আমাদের সময়ের তিনশোর অধিক কবিনামের তালিকা থেকে একশ উনিশ জন কবিকে নির্বাচন করা হয়েছে এ গ্রন্থে। এরও মধ্যে ঝরে যাবে ষাট জন কবি, বিশ জন মারা পড়বে জীবিকার চাপে, দশ জন লিখে যাবে ধুঁকে ধুঁকে, পাঁচ জন লাপাত্তা হবে- এমন ভাবা অন্যায়, নৃশংস; তবু অমূলক হয়তো নয়। নানা যুক্তি, সীমাবদ্ধতা ও বিচারের মানদণ্ডে যারা রয়ে গেলেন এ সংকলনের বাইরে, তাদের মধ্যে দুএকজন সবাইকে তাক লাগিয়ে দশকের শ্রেষ্ঠ কবির তালিকায় উঠে আসবেন।” (সত্যি বটে! আমার জানা নিভৃত চর্চাকারী দু’চারজন এতে অনুপস্থিত, যদিও তারা সিরিয়াস।)
আশির দশকে আমরা যারা কবিতা-সাম্পানে উঠেছিলাম তাদের বেশির ভাগকেই কি হারিয়ে ফেলিনি? আজকের কবিবৃন্দ ভাগ্যবান, তারা দলেবলে আছেন সুশোভনভাবে এই গ্রন্থে। দু’দশক আগে দশকওয়ারি এমন স্বাস্থ্যবান বই বেরয়নি। ১১৯ জনেরই ই-মেল অ্যাড্রেস, সেলুলার ফোন নাম্বারসহ হ্রস্ব পরিচিতি রয়েছে এতে। ফলে আগ্রহীরা চাহিবামাত্র সংযোগে সমর্থ হবেন।
আমি অন্তত দশ জন কবির চরণ উচ্চারণ করতে চাই।
১.কৈশোরে রাজহাঁসের পালক থেকে সূর্যোদয় হতো (অতনু তিয়াস);
২.বাঘ একটি ডোরাকাটা অধ্যায়/ এর চোখের প্রতি পৃষ্ঠায়/ হরিণ এক নতুন কবিতা (আমজাদ সুজন);
৩.মৃত্যুকে প্রেমের জন্য উপাত্ত ভেবো না (কাজী নাসির মামুন);
৪.আমি তো কেবল ঘাসফুল হয়ে ফুটে আছি/ ফড়িং দেখার লোভে (চন্দন চৌধুরী);
৫.যুদ্ধের যৌবন খুলে খায় বিড়ালের চতুর থাবা (নিতুপূর্ণা);
৬.যেদিকে কসাইখানা, সেদিকেই ফুলের বাজার। রক্ত আর পাপড়ির পাহাড়। (পিয়াস মজিদ);
৭.কামিনীফুলের বাড়িতে খোয়া গেছে কৌমার্য আমার (মাজুল হাসান);
৮. ঘোড়া মূত্রের গন্ধে ভরা এই নৈশ স্কুলে, তোমার ফোটানো শরীর ছাতায়, জীব থেকে ব¯' হয়ে বৃষ্টি-শাবলের ছদ্ম পতনের ভারে ঝরে মিশে যাই গভীর নিরর্থ রসাতলে। (মৃদুল মাহবুব);
৯.আমি আজ মণিহারা ফণী/ বীজহীন কীটদষ্ট করুণ ফলের/ মহীরুহ জন্ম দেবার বাসনা কেন চেয়েছিল আমাকে জড়াতে? (মাদল হাসান);
১০.হিংস্র নৈশরেখাগুলো পাশ কাটাতে পারলেই/ পাওয়া যাবে আকাশের ঘ্রাণ (ইশরাত জাহান মিতিলতা)
ছন্দ-ছোঁয়া, ছন্দছুট, ছন্দকে স্বচ্ছন্দে তুড়ি মারা- যে ফর্মেই লেখা হোক না কেন এই গ্রন্থের কবিতায় মিলবে খানিকটা হলেও তাজা হাওয়া, মরমী সুর এবং সদ্যোজাত অমলধবল সংবাদ। এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার উপসংহারে অনুজ সবুজ ১১৯ জনকে টুপি খুলে বলি, সুস্বাগতম। শূন্যের কবিতা শূন্যগর্ভ নয়, গর্ভে তার স্বর্ণচূর্ণ- এমন মন্তব্যে দ্বিধা নেই। তবু না বলা অসমীচীন হবে যে, নতুন সহস্রাব্দের সহস্র জটিল অশ্বখুর গ্রন্থস্থ কবিতাবলীতে আছড়ে পড়েনি; কালের পাশ ফেরার আশ্চর্য ইশারায় এই কবিগোত্রের সংখ্যাগুরু অংশই সাড়া দেননি। নবীন কুঁড়িদলের সর্বোচ্চ মেধা-বিচ্ছুরণ, ফুলভার ফলভার আমাদের কবিতা-ইতিহাসের জন্যেই জরুরি। ভুলে যাচ্ছি না, কবিতায় নতুন রক্ত সঞ্চালন করেন ব্যক্তি-কবিই, সমষ্টি নয়। সেই স্বতন্ত্র প্রতিভার প্রতি থাকবে কবিতাপিয়াসিদের সাগ্রহ নজরদারি, এতে কোনো সংশয় দেখি না।
----------দৈনিক যুগান্তর সাময়িকী। ৯ মে ২০০৮ শুক্রবার প্রকাশিত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

