---------------------------------------------------------------------------------
মাহমুদ দারবিশ ১৯৯৬ সালে হাফিয়াতে ফিরে আসার পরে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন
নুরি আল জারাহ। কবিতার পাশাপাশি ব্যক্তি মাহমুদের অভিজ্ঞতার বিষয়গুলোও এই আলোচনায় উঠে এসেছে। নির্বাচিত অংশ পাঠকের জন্যে অনুবাদ করেছেন মানস সান্যাল
-------------------------------------------------------------
প্যালেস্টাইনে আপনার নিজস্ব গ্রামের রাস্তায় আকস্মিক এই প্রত্যাবর্তনের পরে নিজেকে কেমন মনে হচ্ছে? স্বপ্নের মতো এই ভ্রমণের পরে? ফেরার আগেই বা আপনি কেমন ছিলেন বা ফেরার পর কি কিছু পরিবর্তিত হয়েছে?
আমি এখনো নিশ্চিত না আগের আমিটাই আমি এখনো আছি কি না, অথবা কিছু ঘটেছে কি না। অবশ্যই কিছু ঘটেছিলো। আমি কে? কিন্তু সেই আকস্মিক ভ্রমণ আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো তাদের কাছে যাদের কাছে আমি পঞ্চাশ বছর আগে ছিলাম, এটা আমাকে আবার বালক বানিয়ে দিয়েছিলো যে ওখানে খেলতো, ফুলে ভরা মাঠে দৌড়াতো, ফুল তুলতো আর জিজ্ঞাসা করতো তার প্রথম প্রশ্নগুলো। আবার সেই বালককে ফিরে পেয়ে আমি উচ্ছ্বাসে আপ্লুত।
হ্যাঁ, আমি আগের আমিটাই আছি, এবং আমি যা হতে যাচ্ছি।
রাস্তার দুপাশে ফুল নিয়ে গভীর আবেগ নিয়ে যারা দাঁড়িয়েছিলো তারা আপনার দিকে তাকিয়ে কোন মাহমুদকে খুঁজছিলো, যেহেতু আপনি তাদের সাথে বসে একসময় কথা বলতেন? তারা কি সেই মাহমুদকে খুঁজছিলো যিনি লিখেছিলেন :‘‘ লিখে রাখো, আমি একজন আরব”, অথবা যিনি লিখেছিলেন ‘‘ তোমাকে ভালোবাসার জন্যে, অথবা তোমাকে ভালো না বাসার জন্যে”; অথবা তারা কি খুঁজছিলো সেই মাহমুদকে যিনি লিখেছিলে ‘‘ কি বৃষ্টি”?
আমার মনে হয় এই সন্ধানের উৎস দুটো একসাথে পেঁচিয়েছিলো। প্রত্যেকেই এই দুই মাহমুদের একজনের জন্যে অপেক্ষা করছিলো, তবে আমার খুব ক্লান্ত লেগেছিলো যখন আমি দেখলাম তারা একজন প্রতীকায়িত মাহমুদকে খুঁজছে। কিন্তু আমি আমার নিজেকে প্রতীকি মাত্রায় দেখতে চাইনি। আরেকটা বিষয় আমাকে খুব আনন্দিত করেছিলো। তাদের অনেকেই সেই বালকটাকেই খুঁজছিলো যাকে তারা একসময় চিনতো। তাদের অনেকেই সেই যুবকটাকেও খুঁজছিলো যে তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলো, যার যৌবনকে তারা দেখেছে এবং যার কণ্ঠস্বর তারা শুনেছে।
কিন্তু যাদের জন্যে আপনি প্রতীক নির্মাণ করেছেন এবং করে চলছেন তাদের কাছে প্রতীক হিসাবে বিচেচিত হওয়াটাকে তো আর আপনি এড়িয়ে যেতে পারেন না। মনে হয় সমস্যাটা এখানেই যে আপনার জীবনী আপনাকে আপনার লোকজনের বিবেকে পরিণত করেছে। আপনারও কি তাই মনে হয়?
আসলে আমার মনে হয় প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হওয়াটাকে আমি এড়িয়ে যেতে পারি না। নিজের লোকজনের সাথে আমার সম্পর্কটাকে আমি যেভাবে ব্যাখ্যা করি আসলে আমি সেরকম হতে চাই না। আমি একজন ব্যক্তির আবেগটাকে অনুভব করতে চেয়েছিলাম যে তার দেশ ছেড়ে যায়নি। আমার মনে হয়েছিলো যে আমি কখনোই দেশ ছেড়ে যাইনি; সেই সময় আর ভৌগোলিক সীমারেখা যা আমাকে বাধ্য করেছিলো পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবকে ছেড়ে যেতে তাকে আমি ভাষার চাতুর্য ভাবতে চেয়েছিলাম। কারণ আমি সবসময়ই সেখানে ছিলাম। এমনকি যখন আমি পৃথিবীর অন্য কোণার চলে গিয়েছিলাম তখনো আমি সেখানে ছিলাম। কারণ আমার দৃষ্টিকোণ সবসময়ই সেখানে ছিলো, আমার হৃদয় সেখানে ছিলো, আমার প্রথম ভাষাও সেখানে ছিলো।
বহুদিন পরে প্রত্যাবর্তন করার ফলে সম্ভবত আমাকে বুকে জড়িয়ে পরিবারের লোকজন একের ভেতরে অনেককে খুঁজছিলো। দেশত্যাগ করার জন্যে তাদের কেউ আমাকে কোন কথা বলেনি, কারণ মনে হয় তারা জানতো আমি কখনোই দেশ ছেড়ে যাইনি। তারা তাদের কণ্ঠকে খুঁজছিলো যা তাদের মাঝেই বেড়ে উঠেছে অথচ বহু দিগন্ত ঘুরে এসেও নিজের উৎসকে ত্যাগ করেনি। ওটা অন্যরকম অনুভূতি। দ্বিতীয় অনুভূতিটা নিজের ভেতরে তাদের প্রয়োজনের কথা ভাবার দায়িত্ববোধ তৈরি করে নেবার। আমি সবসময়ই এমন একজন কবি থেকেছি যার কাছে দাবি জানানো যায়। এধরনের কবি হওয়ার কারণে আমার অভিযোগও ছিলো একসময়। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার বিবেক তাদের দাবির দিকে আমাকে ঘুরিয়ে দিচ্ছিলো। আমাকে বার বার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলো যে তাদের ভেতরেই থাকা উচিৎ ছিলো আমার। ফুটবল মাঠে জড়ো হওয়া হাজার হাজার লোকের সাথে তারা যখন আমাকে কথা বলতে বললো, আমি কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যদিও বিগত চলিশ বছরে এটাই আমার কাজ ছিলো। আমি কেবল বলতে পেরেছিলাম ‘‘ আমি প্রতিজ্ঞা করছি আমি এখানেই থাকবো, তোমাদের সাথে”।
আপনার আগমনের বাস্তবতা সম্পর্কে আপনি লিখেছিলেন “আমি এতোটা আনন্দিত যে নিজেকে আমার হিংসা হচ্ছে”। কতোটা আনন্দিত হয়ে আপনি ওই কথাগুলো লিখেছিলেন?
নিজের ভেতরে আমি একটা নৈতিক শক্তি অনুভব করতে পারছিলাম কিন্তু এটাকে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় আমার জানা ছিলো না। এই ভ্রমণের পরে একমাস আগের আমিটা আর আমি নেই। আমার মনে হয় একটা নতুন জীবনের দিকে আমি এগিয়ে যাচ্ছি, মনে হয় আমি আমার জীবনধারাকে আবার সাজিয়ে নিতে পারবো কারণ প্রকৃতপক্ষে আমি মাত্রই জন্মগ্রহণ করেছি, এবং প্রথমবার জীবনকে দেখার মতো আমি জীবন যাপন করছি কেননা ওই স্থানের মাধুর্য্য আর লোকজনের সৌন্দর্য আমাকে নতুন জীবন পাওয়ার মতো আবেগে উদ্বেলিত করে দিয়েছে। এভাবেই আমি সুযোগ পেয়েছি আমার জন্মের সাথে পুনরায় পরিচিত হবার। আগে আমার কখনোই এরকম সুযোগ আসে নি।
আপনি যেরকম বলেছিলেন যে কবির ভেতরে একটা বিশৃংখলা তৈরি হয় যখন সে তার নিজের ভেতরে অন্য আরেকটি অদৃশ্য সুতো আবিষ্কার করে এবং ওই সুতোকে আরো আলোতে নিয়ে আসতে চেষ্টা করে - এটা আপনি বলেছিলেন আপনার কবিতায়। আপনি আরো বলেছিলেন আপনার কবিতার চোখ থাকবে সরল সাধারণ মানুষের দিকে কোনো মিথিক্যাল নায়কের দিকে নয়। নিজের ভূমির কাছে অসম্ভব প্রত্যাবর্তনের পর আপনার ভেতরে যে অবসেশন তৈরি হয়েছে তা তো মিথিক্যাল নায়কের নয়, সাধারণ মানুষের। কীভাবে এটা কবিতায় আসতে পারে?
এর দুটো দিক আছে। প্রথমটা হলো কবিতা এবং ভাষা নিজেদের শেকড়ের কাছে ফিরে গিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে আমি একজন আদিম মানুষ, প্রথমবারের মতো মানবীয় চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখছি, অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্ববান হয়েছি। মানুষ হিসাবে এটা আমার ভাবনার একটা স্তর। এই ধরনের অভিজ্ঞতা এ্কটা বিষ্ময়ের বোধ জাগায় যা কবিতার জন্যে খুবই প্রয়োজনীয় এবং আরম্ভ ছাড়া তো আসলে কোনো কবিতাই হয় না। কবিতা যখন ভাষা থেকে বিচ্যুত হয় তখন তা আর কবিতা থাকে না।
দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতগুলো আমাদের সব সময়ই মানব অস্তিত্বের কাছে ফিরে আসার কথা বলে এবং সরল সাধারন জীবনের কথা বলতে বলে কারণ কেবল আমাদের কবিতাতেই নয় সারা পৃথিবীর কবিতাতেই মিথ তার সর্ব্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছে গেছে। সাহিত্যের মুহূর্তগুলো এখন প্র¯'ত করে সরল মানুষ। ক্লাসিক্যাল অর্থে এখন আর কোনো হিরোইজম নেই। নতুন নায়ক হচ্ছে সাধারন মানুষ যে বেঁচে থাকার উপকরণগুলো খুঁজে বেড়ায় এবং যে তার মানবীয় চিন্তাগ্রস্ততা নিয়ে থাকে।
আপনি কীভাবে আপনার ঘরে প্রবেশ করেছিলেন? চৌকাঠ পেরুনোর সময় কোন স্মৃতি আপনাকে তাড়িত করেছিলো?
আমি জানি না আমি আমার নিজের দুই পায়ে ভর দিয়েই ঘরে ঢুকেছিলাম কিনা, আমার হৃৎপিণ্ড দুষ্ট চড়াই পাখির মতো লাফাচ্ছিলো। আমি সবধরনের আদর পাচ্ছিলাম আবার ভুলেও যাচ্ছিলাম। আমার একটাই কথা ছিলো - তা হলো চোখের পানি। আর একটাই কথা আমি স্মরণ করতে পারি - “ থ্যাংক গড”।
============================================
দৈনিক ভোরের কাগজ । ২৯ আগষ্ট ২০০৮ শুক্রবার প্রকাশিত
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৫:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


