ফকির ইলিয়াস
==========================
দেহের ভেতর এতো খলবল, এ দেহ নিয়ে আমিও সচল,দেহের সাথে চলছে জবর-দখল; সুখ-দুঃখ আমাকে টেনে রাখছে কুটিল-জটিল আশায়।
যে শরীর আমরা বহন করি, তা সইতে পারে অনেক সুখফুল- অনেক যাতনাফল। আমরা নিমগ্ন হই। দেখি। লিখি। কেটেছেঁটে এঁকে রাখি আঙুলে ভাঁজে-ভাঁজে ছত্র মেলে থাকা প্রিয় মুখ। রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ-স্পর্শসহ প্রিয় স্মৃতির আভা। সে দেহের কথা, আঙুলের কথা, স্মৃতিপ্রিয় মুখের কথাগুলো রং ছড়ে থাকে নিজস্ব স্বকীয়তা, তা হতে পারে কবিতায়। হতে পারে রং-তুলিতে, রংয়ের ডানায়। ভর দুপুরে নদীকূলে দাঁড়িয়ে আমরা যে টলমল ঢেউচিত্র দেখি,তা মনে করিয়ে দেয় বহমান সৌন্দর্যের কথা। ভরাযৌবনে জোয়ার আসে, জোয়ার যায়। কিন্তু নদী থেকে যায় সাক্ষী হয়ে অগণিত স্রোতের ধারায়। একজন কবি তেমনি তার পঙক্তির জবানীতে বপন করে যান যে দেহের সুরত,দেহের ভেতর জেগে থাকা অস্ফূটকথা,দেহের ভেতর কে কথা বলে; দেহের ভেতর কে জেগে রয়, কে বংশি বাজায় পঞ্চমপ্রহর তা কি কেবলই প্রতীকি?নান্দনিক বর্ণনার বিশদে প্রতিটি মানব প্রত্যংগই হয়ে ওঠে, এক-একটি রূপের প্রতিমা।
সম্প্রতি একটি কাব্যগ্রন্থ পাঠে তেমনি কিছু রূপক চিত্রকল্পের স্পর্শ
পেলাম গভীর মমতায়। ''যথা,কথকতা''। কাব্য গ্রন্থটির জনক- সৈয়দ
আফসার। শূন্য দশকের কবি। দশকে বিশ্বাসী নই যদিও, তারপরও বলে রাখি, কাল সম্পাদন করে যায় কবিতার আলোকিত মোম,কালিক ভাবনা। অথবা স্থানিক বুনন। চলমান সময়ে কবিতার কারুকাজে কী নিসর্গ, স্থান পাচ্ছে তাও আমাদেরকে জানান দিয়ে যায় কবিতার অগ্রযাত্রার কথা।
দুই
গ্রন্থটির শুরুতেই রয়েছে যে সিরিজটি, তার নাম ''দেহের সবক''। এই সিরিজে কবি - চুল,মাথা,কপাল,টিপ,ভ্রূ,চোখ,নাক,কান,গাল,মুখ ঠোঁট,দাঁত,জিহ্বা,গলা,হাত,বুক,তিল,স্তন,নাভি,লোম,কোমর,আঙুল,নখ,পা- এর স্তুতি গেয়েছেন নিজস্ব প্রতিভায়।
পড়া যাক এর কিছু পংক্তি .........
আমাকে ভেদ করে জেগে ওঠা রহস্য বিন্দু
আদি শিহরণ সচল হৃদয় কোন মতলবে
খেলছিল ব্যথা-বিচ্ছেদ না-ফোটা কালোতিল
কারো চাহনি কখনও তাড়া করলে আদরের চিহ্নে
[তিল / দেহের সবক ]
কারো বাসনায় ইতঃস্তত লালার ফাঁকে
গড়িয়ে নামবে না জেনে তৃষ্ণা-সম্ভবা-জল
কুড়িয়ে রাখছি; ঢাকছি তোমার করুণা খুলে
বাকিসব সারিবাঁধা আতশ কাঁচের দিকে
ফেনিয়ে উঠছে, চেঁচিয়ে উঠছে; ছোঁয়ালে
জিব্হার স্বাদ লবণহীন দেখছি লালার ফাঁকে
আমাকে টানছে আজ জলপিপাসার দিকে
[জিহ্বা / দেহের সবক ]
অথবা ----
আমার ভেতর কে গো...? দেহজাগা রাত্রিকোজাগর
অথির বেলায় আমাকেও পোড়াও মুখ ও শরীর
ভয়ে ভীত! দৃষ্টিক্ষমতা নিশ্চুপ না-থাকার গরিমায়
মুখ ফুটে কিছুই বলবো না, দেহে জাগুক যত বিস্ময়!
কাউকে বাঁধিনি ঋণে আহা! মাংস খুলে যাবার ডরে
মনের উপভাষা মৌচাকে তালা, দেহের অভ্যন্তরে
নিজেকেই পাঠ করি রক্ত ও হাড়ে
আয়নার বিপরীতে বেঁধে রাখো হৃদয়, দ্বিধা সংশয়
মুখ খুললেই বায়না ধরো ওই বে-ভোলা হাওয়ায়
[মুখ / দেহের সবক]
কবির চোখ সবসময়ই ভেদ করে রহস্যের ওপার। তাকিয়ে দেখা কোনো
সূর্য যখন কবিকে অনুসরণ করে তখন কবিও ছিটিয়ে দেন সূর্যের প্রতি
নিজস্ব আলো। এ আলো বৈভবের । এ আলো বিকিরণের। কবি সৈয়দ
আফসার স্বকীয় মহিমায় সেই আলো নির্মাণ করতে পেরেছেন তার
কবিতায়। উপমার উৎপল আনন্দে যেমন ভেসেছেন নিজে, তেমনি ভাসিয়েছেন তার পাঠক-পাঠিকাকেও।
যতদিন বৃষ্টিপাত হয়নি ততদিন জলতৃষ্ণায় লতা-পাতা ঝরে
হৃদপিণ্ডের কাঁটাছেঁড়া দাগ শুকায়নি তবু যন্ত্রণায় থোড়া-থোড়া জমে
চোখ তৃপ্ত হলে কুয়ো জলে যাবে না চোখ; ছোঁবে না আদরে
[মিলেমিশে ]
কী চমৎকার তার তৃষ্ণার উজান! একধরনের নেশাঘোর এসে এভাবেই
কবিতার প্রকৃত রসদ দিয়ে যায় মাটিপ্রিয় মানুষকে।
তিন
সৈয়দ আফসার কী একজন আবেগতাড়িত কবি? এ প্রশ্নটি আসতেই
পারে তার কবিতা পাঠে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন মনে
করি। তা হচ্ছে- ইমোশন হ্যাভ নো মোশন -এর যৌক্তিকতা।
এ বিষয়ে মার্কিন কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস এর একটি বাণী
প্রণিধান যোগ্য ।
তিনি বলেন- স্থির নদীও একটি স্পন্দনের প্রতিনিধিত্ব করে। আর তা হচ্ছে জলের অন্তরালে চন্দ্র-সূর্যের কিরণ।আমি বলি আবেগই গতি। যে গতি নিয়ন্ত্রণ করে মানবশক্তির প্রেমসত্তা।
তুমি যে কাঁধে রেখেছিলে হাত
ধীরে ধীরে সেখানেও জমবে ময়লা—
-ঘাম
যে পথ হেঁটে এসেছি, সে পথে
রাতেও আলো ফুটে আমাদের দু’হাতে
আমরা শুধু তার পেছনই জানতাম
-আগাম
[টুকরো পাতার গল্প-৮]
কী চমৎকার উৎসকে উসকে দিয়েছেন কবি! জানিয়ে গেছেন তার মনের আকুতির সাথে হাজারো মনের আকুতির কথা।
সৈয়দ আফসারের 'বোবা সিরিজ' ,'পরিবর্তন সিরিজ'এর কবিতাগুলো
একগুচ্ছ প্রেমপাপড়ি হয়ে ভালোবাসার পরশ দেয় কবিতাপ্রেমীদেরকে।
এক অনাবিল পরমতা আর নিঝুম মুগ্ধতার মিশেলে প্রতিটি পঙক্তির
পরতেই কবি এঁকে গেছেন যে মুখাবয়ব, তা সমগ্র মানব মনেরই ছবি
বলা যায়।
পড়া যাক এর কিছু অংশ ...
আহা! ... কিছুই বলবো না তবু, হলুদ সন্ধ্যে মানে এই তো বেলায় বেলায় কথকতা... তার মানে কি পিছনের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা! আসন্ধ্যা-রাতে এখনো বাঁ পাজরে ব্যথা জমে, হাত পাতার ছলে জলসিঁড়ি বেয়ে আজো শিখিনি মূঢ়বার্তাপাঠ কিংবা হাতের তালুতে জাগা জলপাহাড়ের রাত।
[বোবা সিরিজ]
অনেক জল গড়ালো ঠোঁটে নাওনি খুঁটে
ক্লান্তি দোষে বসে আছো পাশাপাশি
বলা যায়; জলপূর্ণ কলসে জেগেছো
জলের তাড়ায়; কার ইশারায়?
আশ্বাস পেতে পারো ঘোমটা খুলো বাঁশবনে
দেখবে জীবনগাঁথা বাঁশের জোড়ায় জোড়ায়
[ পরিবর্তন সিরিজ - ৫]
কবিতা অনন্ত সময়ের ধারক। মহৎ কবিতাগুলো কালে কালে হৃদয় জয়
করতে পারে পাঠকের। কবিতার প্রসারিত বাহুর সাথে সমৃদ্ধ হয় পাঠকের
মননও । ঈপ্সিত আলোর কাছে একটি মন যখন সমর্পিত হয়, তখনই
কবিতার উত্তীর্ণ আকাশ ছায়া দেয় তাকে। বুকে ঘাঁই দিয়ে যাওয়া সেই
শব্দগুলো বলে যায়- লিখিত লতাগ্রহ সবুজের আভা নিয়েই সাজায়
সংসার, সংবেদ। প্রেম ও মানুষ একে অন্যের পরিপূরক মাত্র । আর এই
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির পথ মাড়িয়ে কবি লিখেন-
চেয়ে থাকলে চোখের সৌন্দর্য বাড়ে না
দৃষ্টির অধীরতা নিয়ে কাঁপছে ভুরু
দৈনন্দিন চোখে লুকিয়ে থাকে অশ্রু
সন্তাপ; অর্থহীন উন্মাদনা
চোখ তোলে দেখবে না কেউ
জল গলে গলে কেন বাড়ছে জলের ফেনা
না-দেখার উত্তাপে কতটা বাড়ছে পরস্পর কল্পনা
[দৃষ্টি ]
দেখার সৌন্দর্যের মাঝে যে নক্ষত্র ফুটে থাকে, তা আঁকতে আঁকতেই
এগিয়ে যান প্রকৃত কবি। লিখে রাখেন, আত্মগত সুরের সংলাপ। যে
কথা কিংবা কথকতা নির্মাণ করে পরিচিত প্রতিবেশের সমাজচিত্র।
চার
এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই স্বতন্ত্র চিত্রকল্পের শক্তিতে বলীয়ান। শূন্য
দশকের একজন কবির এই তীক্ষ্ণ জীবনভেদী পদচারণা আশার ঝলক
দেখায়। আর তার এই বিশিষ্টতাকে স্বোপার্জিতই মনে হয়েছে আমার কাছে।
স্বপ্ন একমুঠো মাটি... দু’মুঠোজল... পোড়াকয়লা, তারপর জানি না
পুরোনো কষ্টগুলো ভালো থেকো, মৃত্যু হলে শেষকৃত্য হবে না
পৃথিবী যত সুন্দর, তারচে সুন্দর চোখ- তোমার হাসি
যদি ইচ্ছে ধ্বংস করো, যতদূরে মরে-পচে-ভাসি
[স্বপ্নহীন]
একই উজ্জ্বলতায় উদ্ভাসিত হয়েছে- 'স্নানঘরে একা' , 'পাঁজরের হাড়ে'
'একটি দৃশ্য দেখে' , 'ভাব' , 'দেহ বৃন্দাবন' কবিতাগুলোও ।
কবির কিছু উপমা এখানে তুলে দেয়া দরকার, মনে করছি।
ক.
লাটিম ঘুরে ঘুরে চূড়ান্ত যাত্রায়
মাটি চিরে ব্যথাচিহ্ন খুঁজে
খ.
শাদা পাথর সেও বোকা, কারো হাত ধরে
সেও মূল্যবান সম্পদ হয়ে শৌখিন মানুষের
গ.
এযুগে এসে ভাঁটফুলে ফুটে আছো এ-আশা পুরাটাই ভুলে গেছি
খোঁজাখুঁজি; পাতার আড়ালে ছায়া মনমরা হয়ে থাকতে পারে না
ঘ.
দ্বিধা কি ছোঁব একা? নাকি উল্টে রাখবো দেহের বোয়াম
খরায় পুড়ে না তাই ছলে খুলেছি জলের বোতাম
সাহিত্যের প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে ভাবতে হয় যে কোনো কবিতাকর্মীকেই।
কোথায় কি হচ্ছে, সেই সমকালকে জানা ও জানানোরও একটা দায়
থাকে কবির। সৈয়দ আফসার সে কাজটি করতে পেরেছেন বেশ দক্ষতার
সাথে। মৃত্তিকার সাথে তার যোগাযোগ বেশ রোমান্টিকতার সাথেই উঠে
এসেছে তার কাব্যভাষ্যে।
কালের গতি সবসময়ই অনুভবের। কালমগ্ন চেতনা ধারণ করে শুদ্ধাচারী
কবিই পারেন পৌঁছে যেতে যাপিত প্রেমের গহীনে। তিনি তা পেরেছেন,
তা বলা যায় সানন্দে।
কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে- নিসর্গ। প্রকাশকাল, একুশে বইমেলা ফেব্রুয়ারি
২০০৯। মনকাড়া প্রচ্ছদ এঁকেছেন- রতন পাল রনি । মূল্য রাখা হয়েছে
- ষাট টাকা।
গ্রহণের আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকে মাটি। কবি, মাটির বরপুত্র। তাই
তারও প্রাণে আনন্দ জাগে গ্রহণের নবম ঋতুতে । যে ঋতু- কাব্যঋতু।
কবি সৈয়দ আফসার কালে কালে পাঠকের কাছে গৃহীত হবেন, আপন
দ্যোতনায়- আমি সে প্রত্যাশাই করছি। #
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ সকাল ১০:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



