ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও চলমান বাংলাদেশের বাস্তবতা
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও চলমান বাংলাদেশের বাস্তবতা
ফকির ইলিয়াস
------------------------------------------------------------------------------
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছিলেন। কথা হয়েছে মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর নিয়ে। তিনি আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা আসছেন। বলা হচ্ছে, এই সফর দুই বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যার মাধ্যমে দু'দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যাপক প্রতিফলন ঘটবে। এই আশাবাদ বাংলাদেশ এবং ভারতের মানুষের মধ্যে নতুন দ্যোতনা ছড়াবে। সেটাই প্রত্যাশা করছেন কূটনীতিক বিশ্লেষকরা।
ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে ব্যাপক সাহায্য-সহযোগিতা দেয়। স্বীকৃতি দিয়ে সরাসরি যুদ্ধ করে বাংলাদেশের পক্ষে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১০ হাজার সদস্য প্রাণ বিসর্জন দেন।
'৭৫-এর পটপরিবর্তন করার নেপথ্য কারিগর যারা ছিল, এরা ছিল চরম ভারতবিদ্বেষী। পনেরো আগস্টের নৃশংসতম হত্যাকান্ডের পর যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে তারা নানা ধুয়া তুলে বাংলাদেশের মানুষকে ভারতের কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। '৭১-এর পরাজিত রাজাকার শক্তিকে সহযোগী করে ধর্মীয় তমদ্দুনের ধ্বজাধারী সামরিকজান্তারা মূলত 'ভারত জুজু'র ভয়-ভীতি তৈরি করতে সচেষ্ট হয় বাংলাদেশে। প্রকারান্তরে তারা সেই পাকিস্তানি মৌলবাদীদের মিত্র শক্তিতেই পরিণত হয়।
এর ফলে ভারত ক্রমেই বাংলাদেশের সংস্পর্শ থেকে মনেপ্রাণে কিছুটা দূরে সরে যেতে থাকে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ভেতরে ভেতরে ভারত তোয়াজকারী 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী' শক্তিগুলো শুধু জনগণের আইওয়াশের জন্যই ভারতবিরোধী নানা কথা বলতে থাকেন সভা-সমাবেশে। অথচ ব্যবসা-বাণিজ্যে তারা সব যোগাযোগই রাখেন ভারতের সঙ্গে।
স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক শক্তি বলে কথিত যারা ক্ষমতায় আসেন, এরা মূলত ভারত বিদ্বেষের নামে দেশে জঙ্গিবাদী, পাকপন্থি সাম্প্রদায়িক শক্তির পোয়াবারো ঘটাতে থাকেন নানাভাবে। '৯০-এর পর ক্ষমতায় থেকে কিংবা ক্ষমতার বাইরে থেকে এই ডানপন্থিরা বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের চরম প্রসার ঘটাতে সমর্থ হন। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সেই পরাজিত শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার অংশও ভোগ করে। এরা কতটা যে বেপরোয়া ছিল, তার প্রমাণ ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের সিরিজ গ্রেনেড হামলা। দেশজুড়ে একযোগে বোমা হামলা। তারপরও ওই সময়ের ক্ষমতাসীনদের একজন মন্ত্রীও দায় নিয়ে পদত্যাগ করেননি। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানও তেমন কোন অনুশোচনা করে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেননি।
তীব্র এক সংকটের জের ধরেই দেশে ওয়ান-ইলেভেনের আবির্ভাব হয়। এর পরের ধারাবাহিকতায় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন।
বর্তমান এই সরকার মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বেশ কঠোর হস্তই রয়েছে বলা যায়। দেশের জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলো বড় কোন ধরনের নাশকতা এ পর্যন্ত চালাতে পারেনি। এটাকে সরকারের একটি সাফল্য বলতেই হবে।
বাংলাদেশ যখন মোটামুটি একটি স্থিতিশীল অবস্থার মাঝে ঠাঁই খুঁজছে, তখনই ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের একটি বক্তব্য তোলপাড় তুলেছে গোটা বিশ্বে। সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মনমোহন সিং বলেছেন, বাংলাদেশে যে কোন সময় পটপরিবর্তন হতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, দেশের পঁচিশ শতাংশ মানুষ একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের আদর্শে বিশ্বাসী।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে দেশে-বিদেশে। আমি মনে করি, মনমোহন সিংয়ের এই বক্তব্যটি চলতি সময়ে বেশ গুরুত্বই বহন করছে এবং তা যেনতেনভাবে উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়।
এ বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা যাক। মনমোহন সিংয়ের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের ২৫ শতাংশ ওই মৌলবাদী জঙ্গিবাদীদের সমর্থক। তাহলে সিংহভাগ অর্থাৎ ৭৫ শতাংশই মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ধরে নেয়া যায়। ৭৫ ভাগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ২৫ ভাগ কি রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নিতে পারবে? না, হয়তো পারবে না। কিন্তু তারা গোটা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। উদাহরণস্বরূপ পাকিস্তান, আফগানিস্তানকে আমরা দেখতে পারি। এই বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানানোর জন্য সেস্নাগান তো তারাই দিয়েছিল প্রকাশ্যে। 'আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান' এসব সেস্নাগানধারীর ভিডিও ফুটেজ আবারও খতিয়ে দেখার জন্য আমি দেশের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সবিনয় অনুরোধ করি।
আসা যাক ভারত প্রসঙ্গে। আমাদের মনে আছে, এলকে আদভানির বিজেপিও ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিল। এই বিজেপি একটি হিন্দু মৌলবাদী দল হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। ভারতের জনগণ তাদের শাসন দেখেছে। বিজেপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে ভারতের চরম সহিংসতা বাড়তে পারে বলে যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তার শেষ রক্ষা হয়েছিল ভারতের গণমানুষের ঐক্য এবং সৌহার্দের কারণেই। এরপর জনগণের ভোটেই বিজেপি ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয়। কংগ্রেস ক্ষমতায় বসে। এরপর থেকে প্রায় একদশক সময় ধরে ভারতে কংগ্রেসের রাজত্ব চলছে। উগ্রপন্থি গ্রুপ, গোষ্ঠী মতবাদী এবং 'বিচ্ছিন্নতাবাদী'রা যে ভারতে নেই, তা তো বলা যাবে না। এদের অস্তিত্ব সম্পর্কে খোদ মনমোহন সিংও অবগত আছেন বলে মনে করি। তারপরও শুধু গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রবল ইচ্ছার কারণেই কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয় সাধন করে রাজ্যের সরকারগুলো টিকে আছে।
আমি মনে করি, মনমোহন সিংয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং এর গুরুত্ব অন্যখানে। কেউ কেউ বলছেন, মনমোহন সিং মুখ ফসকে এমন কথা বলে ফেলেছেন। তিনি যদি মুখ ফসকেও এমনটি বলে থাকেন, তারপরও আমি মনে করি তা থেকে বাংলাদেশের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর অনেকটাই সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশে কী হচ্ছে, কী হতে যাচ্ছে এমন একটি শঙ্কা নিয়ে তটস্থ দেশের বিশ্লেষকরা। অনেকেই এটা ভেবে সন্দিহান -কী হবে নিকট ভবিষ্যতে।
কারও কারও মতে, দেশে একটি কালো আঁধার ক্রমেই গুমোট হচ্ছে। পঞ্চদশ সংশোধনী পাস, বিএনপির নির্বাচনে না যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া, হরতাল, হানাহানির রাজনীতির পথ ধরে কোন কালো শক্তি ফণা তুলে কি-না তা ভেবে অনেকেই অস্থির। এমনকি চরম নাশকতার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার ভিতে আঘাত হানতে পারে কোন অশুভ শক্তি, এমন ধারণাও অমূলক নয়। মনমোহন সিং কি তেমন কোন বজ্রপাতের পূর্বাভাস পেয়েই এমনটি বলেছেন?
আমরা দেখেছি, মনমোহন সিং এবং তার নীতি-নির্ধারকরা এই মন্তব্যের বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে নানা রকম কসরত ইতোমধ্যে শুরু করেছেন। কিন্তু আমরা তো ভুলে যাইনি, মাত্র কয়েকজন বিপথগামী সেনা অফিসারই পনেরো আগস্টের নৃশংসতম কালো রাতের জন্ম দিয়েছিল।
যারা লুটপাট, দুর্নীতি, ভবন রাজনীতি, ক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার স্বপ্নে বিভোর ছিল, তারা এখনো বিষধর সাপের মতো ফুঁসছে। এদের কারও কারও বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি, ইন্টাপোলের সাহায্য নেয়ার ঘোষণা, দ্রুতবিচার ট্রাইবুনালে বিচার সম্পাদন ইত্যাদি বক্তব্যের পর বর্তমান মহাজোট সরকারকে ঘায়েল করার শেষ মরণ কামড় তারা দিতেই পারে। মনে রাখা দরকার, যে কোন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী এক ধরনের চরমপন্থি মনোভাব নিয়েই এমন হীন কার্যেও লিপ্ত হয়।
মনমোহন সিং যা বলেছেন, তা সত্যে পরিণত হোক তা বাংলাদেশের কোন মুক্তমনা মানুষই চান না, চাইতে পারেন না। তাই সরকার ও জনগণের অত্যন্ত সতর্ক থাকার প্রয়োজন হবে। আমরা খুব ভালো করে জানি, কেউ বাঙালি জাতিকে মূল চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। এ জন্য চাই ঐক্য ও সৌহার্দ। সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এসেই মনমোহন সিং বাংলাদেশকে সোনার পাথরবাটি দিয়ে দেবেন এমন কোন সম্ভাবনা আমি দেখি না। সব আদিমতাকে রুখতে হবে এদেশের মানুষকেই।
নিউইয়র্ক ০৬, জুলাই ২০১১।
--------------------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ / ঢাকা / ৮ জুলাই ২০১১ শুক্রবার
ছবি - সারা জেরিয়াহ
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।