শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি আমাদের অসীম কৃতজ্ঞতা
ফকির ইলিয়াস
=======================================
বুক থেকে পাথর নেমে গেলে মানুষের মনটা কখনো কখনো বেশ ভালো হয়ে যায়। মনে হয় কিছুটা দায়মুক্তির নিশ্বাস নিচ্ছি। মনে হয়, সামান্য হলেও প্রতিদান পরিশোধ করতে পেরেছি।
২৫ জুলাই ২০১১ দিনটিও বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। একটি ঋণ শোধের দিন। এদিনটিতে বাংলাদেশ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করল তার জন্মচেতনায় উদ্বুদ্ধ একজন অকৃত্রিম বন্ধুকে, একজন সতীর্থকে; যিনি এই মাটির স্বাধীনতার জন্য অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জয় হোক।
তিনি শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। হ্যাঁ, বাংলাদেশের মানুষ তাকে ভোলেনি। সেই এককোটি শরণার্থী এবং তাদের উত্তরসূরিরা ভোলেনি। শ্রীমতী গান্ধী কত ধৈর্য আর সাহসিকতার সঙ্গে সেদিন শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, শিবির থেকে শিবিরে ছুটে বেড়িয়েছিলেন আর গোটা ভারতবাসীকে বলেছিলেন, তোমরা যে যেভাবে পার বাংলাদেশের শরণার্থীদের প্রতি হাত বাড়িয়ে দাও।
হ্যাঁ, গোটা ভারতবাসী সেদিন হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রতিটি খাতে অতিরিক্ত কর আরোপ করেছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। সর্বশ্রেণীর মানুষ সানন্দে সেই কর দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। যারা সিনেমা দেখতে ছায়াছবির হলে গিয়েছিল তারাও অতিরিক্ত কর দিয়ে কিনেছিল সিনেমার টিকিট।
ভারত সর্বশক্তি দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিল, মানসিকভাবে শুরু থেকেই। আর এ কাজটি করতে যিনি প্রহরীর ভূমিকা নিয়েছিলেন, তিনি শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী।
তিনি বিদেশের বিভিন্ন অঙ্গনে তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশের মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার কথা। বলেছিলেন, হে বিশ্ববাসী দেখে যাও কীভাবে বাংলাদেশে গণহত্যা করা হচ্ছে। কীভাবে গোটা দেশটিকে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বাঙালির পক্ষে দাঁড়িয়ে কীভাবে দেনদরবার করেছিলেন, তার প্রমাণ আমরা সে সময়ের ভিডিও ফুটেজগুলো দেখলে এখনো সহজেই অনুমান করতে পারি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ভারতের এই যে নৈতিক সমর্থন, তার জন্য কি ভারত সরকারের কোন বৃহৎ স্বার্থ ছিল? এ বিষয়টিকেই নানা রঙে রং লাগিয়ে প্রচার করেছিলে সে সময়ের রাজাকার-আলবদর, শান্তি কমিটির পাষন্ডরা।
উল্লেখ্য বিষয় হচ্ছে, এই চিহ্নিত সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীই তথাকথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের ধুয়া তুলে রায়ট ঘটিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসকরা ছেড়ে যাওয়ার শুরুতেই হিন্দু-মুসলিম পরিচয় তুলে রক্তগঙ্গা ভাসিয়ে দিয়েছিল। মতলববাজ এই মহলটির মূল লক্ষ্য ছিল, গোঁড়ামির শিকলে মানুষকে বেঁধে রাখা।
একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তারা দোহাই দিয়েছিল ধর্মের। বলেছিল ভারত একটি মুসলিম রাষ্ট্রকে দ্বিখন্ডিত করে দিচ্ছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সুনামগঞ্জের মাহমুদ আলীর মতো হাতেগোনা কিছু নেতা পাকিস্তানে চলে গেলেও আলবদর, রাজাকারদের প্রধান হোতা কমান্ডাররা এই বাংলাদেশেই থেকে গিয়েছিল। অথচ একাত্তরে এরা নানা রকম কুৎসা ছড়াচ্ছিল, ইন্দিরা গান্ধী ও তার সরকারের বিরুদ্ধে।
বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন একাই একশ'। তিনি তার সহকর্মী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের আদেশ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, যাতে কোন শরণার্থী বাঙালির কোন প্রকার অসুবিধা না হয়। মন্ত্রীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ম্যানেজ করেছিলেন খুব দ্রুত।
বাংলাদেশের বিজয়ের মাত্র ক'দিন আগে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দেয়ার আগে গোটা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভারত স্বীকৃতি দিচ্ছে, আপনারাও তৈরি হন। সে সময়ে মার্কিন শাসকগোষ্ঠী এবং চীনা-পাকিস্তানি প্রভুচক্র ভারতের এই স্বীকৃতিকে কিছুটা হলেও হিসেবে নিয়েছিল। বিশেষ করে ভারতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ, মার্কিনি বুদ্ধিজীবী সমাজের চোখ খুলে দিতে রেখেছিলেন অগ্রণী ভূমিকা। পন্ডিত রবিশংকর, অন্নদা শংকর রায়, প্রমুখ বুদ্ধিজীবী তাদের কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন একটিই ধ্বনি, 'জয় বাংলা'।
শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতা সম্মাননা তুলে দেয়া হয়েছে তারই পুত্রবধূ, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর হাতে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এই সম্মাননা তুলে দিয়েছেন।
ভাবতে অবাক লাগে, শ্রীমতী গান্ধীর মতো একজন শ্রেষ্ঠ বন্ধুকে সম্মান জানাতে বাংলাদেশের চল্লিশ বছর লেগেছে। এর কারণ কী? তাহলে কি বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি এখনো তাদের শত্রু-মিত্র চিনতে পারেনি? যদি না পেরে থাকে, তবে সেটা তো ভয়াবহ কথা! কারণ কোন জাতি তার শত্রু-মিত্র পরখ করতে না পারে তবে সে জাতি সামনে এগোবে কী করে?
সম্মাননা গ্রহণ করে সোনিয়া গান্ধী খুব গভীর স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে ফিরে আসার পথে জাতির জনককে কীভাবে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সোনিয়া বলেছেন, এ সম্মাননা গোটা ভারতবাসীর। তা তো বটেই। ভারতবাসী রক্ত দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে। যে ঋণ বাংলাদেশ কোনদিনই শোধ করতে পারবে না।
আমি বিশ্বাস করি, এ সম্মননা, এ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীবন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে। এটা বিশ্ববাসী ভুলে যায়নি, '৭৫-এর ১৫ আগস্টে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পর এদেশে চলেছে নানাভাবে নারকীয় সামরিক শাসন। ফলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তো দূরের কথা, দেশের মৌলিক ভিত খান খান করে দিতে ব্যস্ত থেকেছে উর্দি পরা শাসকগোষ্ঠী। পরে সেই পরাজিত রাজাকার শক্তির উত্থান এবং এদের হাত ধরে নব্য ডানপন্থিদের ক্ষমতায়ন বাংলাদেশকে বার বারই পিছিয়েছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যে রাজনৈতিক দলটির সুযোগ্য নেতৃত্বে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই কৃতজ্ঞতার দায়মোচনের দায়িত্বও তারাই পালন করবেন, সেটাই প্রত্যাশিত। কারণ মৌলবাদী, জঙ্গিবাদীদের পৃষ্ঠপোষকরা জাতীয় কৃতজ্ঞতাবোধ কোনদিনই প্রকাশ করবে না।
যারা কথায় কথায় ভারতবিরোধিতা করেন তাদের অবগতির জন্য একটি কথাই স্পষ্ট করে বলা যায়- বিশ্বের কোন দেশেই যুদ্ধের মিত্ররা তাদের বাহিনী সহজে সেই ভূখন্ড থেকে ফিরিয়ে নেয় না। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর পুরোপুরি প্রত্যাবর্তন ঘটেছিল ইন্দিরা-মুজিব পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই। আর সেই বোঝাপড়া ছিল একান্তই বাঙালি জাতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট। মার্কিনিরা তাদের বাহিনী অনেক রাষ্ট্র থেকেই এখনো ফিরিয়ে আনেনি-সে ইতিহাস আমাদের অজানা নয়।
বাঙালি জাতির প্রতি শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর দরদ কোন দিনই ভোলা যাবে না। তাকে মরণোত্তর 'স্বাধীনতা সম্মাননা' সে তুলনায় সামান্যই। এই যে কৃতজ্ঞতা, সেটাই বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম সম্প্রীতি, সৌহার্দের সিঁড়ি। শ্রীমতী গান্ধী, পরপারে থেকেও আপনি আবার পনেরো কোটি বাঙালির সশ্রদ্ধ প্রণাম গ্রহণ করুন।
নিউইয়র্ক , ২৭ জুলাই ২০১১
----------------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ / ঢাকা / ২৯ জুলাই ২০১১ শুক্রবার প্রকাশিত
শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি আমাদের অসীম কৃতজ্ঞতা
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।