কারা হারছে, কারা জিততে চাইছে
ফকির ইলিয়াস
==========================
একটা বেশ বড় ধকল গেল যুক্তরাষ্ট্রের উপর দিয়ে। হ্যারিকেন আইরিন। এদেশের প্রশাসন প্রস্তুতি নিয়েছিল খুব শক্ত হাতে। ১৭০০ বিদ্যুত-গ্যাস কর্মী নিউইয়র্কে স্ট্যান্ডবাই ছিল। আরও ৭০০ এসে যোগ দিয়েছিল অন্যান্য অঙ্গরাজ্য থেকে।
শেষ পর্যন্ত হালকা ভাবেই ৫৫ মাইল বেগে বয়ে যায় নিউইয়র্কের উপর দিয়ে।এই যে প্রস্তুতি, তা ছিল স্মরণ কালের একটি বড় আয়োজন। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ওবামা ছিলেন বিচলিত।
এই দেখলাম একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রস্তুতি। আর বাংলাদেশে ! না, মন্ত্রীপরিষদে সহসাই রদবদল হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ধৈর্য ধরুন। রেখে যাওয়া অনেক জন্জাল। আমরা ওগুলো সাফ করছি। সাফ করতে কতদিন লাগবে তার কোনো হিসেব নেই। আমাদের শীর্ষরা এভাবেই বলেন। সময় যে যাচ্ছে, তা তারা দেখেন না। দেখলে ব্যবস্থা নিতেন। এটা জাতির দুর্ভাগ্য।
যোগাযোগ মন্ত্রী বলে দিয়েছেন ঈদের জন্য মহাসড়কগুলো তৈরি ! কী আলাদিনের চেরাগ ছিল তার হাতে ! এত চটজলদি সব তৈরি হয়ে গেল !
একটা খবরের দিকে আমরা নজর দিতে পারি। ভারতের দুর্নীতি বিরোধী নেতা আন্না হাজারে কে স্যালুট দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ। বলেছেন,‘সরকার লোকপাল বিল নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত। সংসদে আলোচনা শেষে বিলটি স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠান হবে।' অনশন ভাঙার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, 'তার আদর্শকে শ্রদ্ধা জানাই, তার প্রতি আমার ‘স্যালুট’। আন্নাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তাকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানাচ্ছি।'
শেষ পর্যন্ত আন্নার দাবী মেনে নিয়েছে সরকার। তিনি অনশন ভেঙেছেন। এই ঘটনা কি প্রমাণ করছে ? প্রমাণিত হলো, বিবেকের জয় সুনিশ্চিত। না, আমাদের সরকার প্রধানরা তা মোটেও অনুসরণ করেন না। যদি করতেন , এই দেশের ভাগ্য অন্যরকম হতো।
টিভিতে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর সমাপনী ভাষণ দেখলাম। তিনি বলেছেন, তার সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা যেন করা হয়। তাঁর মন্ত্রীরা সিরিয়াসলি কাজ করছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এসব কাজের উদাহরণ কি ? সড়কব্যবস্থা কী দুচারমাসে ভেঙে পড়েছিল ? শেয়ার বাজার কী কয়েকদিনের মন্দা বহন করছে ? কাঁচামরিচের কেজি ৫০০ টাকা ! কা'কে কী বলছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী !
আর আওয়ামী লীগের ভেতরের কোন্দলের কথাই যদি বলা হয়, তা চলছে দেশে-বিদেশে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ যুক্তরাষ্ট্র সফরে করে গিয়েছেন।তাঁর সামনেই মারমুখি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের দুটো গ্রুপ।
ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। ইউএস পুলিশ এসেছে। হানিফ নিজেও বিরক্ত হয়ে সভাস্থল তয়াগ করেছেন। এসব কিসের আলামত ?
কথা রয়েছে, জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানন্ত্রী ১৭ সেপ্টেম্বর'২০১১ নিউইয়র্ক আসবেন। সে সময় যাতে যৌথভাবে তাঁকে সংবর্ধনা দেয়া যায় তার ফিল্ড ওয়ার্ক করেছেন মাহবুবুল আলম হানিফ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে। এখন আওয়ামী লীগে মাঠকর্মী নেই বললেই চলে। কর্মী নেই। সবাই নেতা। নেতা হতে চায়।
দলের ভেতরে 'চেইন অব কমান্ড' যে মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে তা কী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুধাবন করছেন না ? কেন করছেন না ?
জাতীয় সংসদের সমাপণী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, "আমেরিকায় অনবরত, ইতালিতে হরদম ঘটছে ছিনতাই। আমরা বসে নেই। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। সমস্যা হলো- আমাদের পুলিশের সংখ্যা কম।"
আইন শৃংখলা প্রসঙ্গে তাঁর এই বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য , তা আলোচনার দাবী রাখে।
২৭-২৮ আগস্টের উইকএন্ডে হ্যারিকেন আইরিন তান্ডব চলতে পারে এই আশংকায় তটস্থ ছিল যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। শহরের মেয়ররা আদেশ জারী করেছিলেন, সকল জরুরী বিভাগ যেন চালু থাকে। ডাক্তার, পুলিশ, উদ্ধারকারী, অগ্নিনির্বাপক, স্বেচ্ছাসেবক সবাইকে স্ট্যন্ডবাই থাকতে বলা হয়েছিল । এই যে প্রস্তুতি , সেটাই তো সরকারের কাজ।
বিদেশে ভাঙা গর্তে পা আটকে কেউ পা মচকালে সিটি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলা করে। বাংলাদেশে কী তেমন ব্যবস্থা আছে ? না নেই । আর নেই বলেই কারো ভয় ও নেই যে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা হবে।
এভাবেই খুঁড়িয়ে চলছে গণতন্ত্র ! এভাবেই পঙ্গু হয়ে এগুচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা !
একটি বিষয় মনে রাখা দরকার,মানুষ রুখে দাঁড়ালে দমানো কঠিন হয়ে পড়ে। কানসাট, শনির আখড়া কিংবা সাভার-গাজীপুরের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে অদূর অতীতে যে গণবিদ্রোহ হয়ে গেল তা নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদ। বৈষম্যের বিস্ফোরণ। মানুষের পুঞ্জীভুত ক্রোধ, প্রতিবাদই ভেঙে খান খান করে দেয় পুঁজিপতির উঁচু দালান। মানুষ যখন তার অধিকারের জন্য সমান কাতারে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ হয়, তখন শোষকদের না পালিয়ে কোন উপায় থাকে না। যেমন অতীতে পালিয়েছেন সাংসদ সালাউদ্দিন। যেমন একসময় তছনছ হয়ে গিয়েছিল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সিংহাসন।
বিশ্বে প্রগতির প্রবাহ বইছে। বাংলাদেশে এই প্রবাহকে থামিয়ে দেয়া হচ্ছে। তা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। কারণ রাজনীতিকরা মনে করেন সাধারণ জনতা যদি সোচ্চার, শিক্ষিত এবং বলীয়ান হয়ে যায় তাহলে তাদের রাজনীতি করার ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে যাবে। তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বুলি আর কেউ শুনবে না। তাদের জনসভায় প্রখর রোদে কিংবা আষাঢ়ের প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকবে না। এতে জনগণের কোন ক্ষতি হবে না। ক্ষতি হবে রাজনীতিকদের। যেমনটি হয়েছে জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল এরশাদের। তার কর্ম হারিয়ে গেছে তার প্রাপ্ত স্বৈরশাসন সনদের আড়ালে। এই সনদ তার ‘রাজনীতিক’ স্বীকৃতি ম্লান করে দিয়েছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশে অর্জন এভাবেই ম্লান হয়ে যায় । গেল সংসদ নির্বাচনে বড় কষ্টে এরশাদ ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। আর বিএনপি ? 'হাওয়া ভবনের' অধিকর্তাদের দৌরাত্ম্য , জঙ্গীবাদের প্রত্যক্ষ মদত আর লুটপাটের স্বর্গরাজ্য বানাবার কারণেই এদেশের মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে চাররদলীয় জোটের দিক থেকে।
এগুলো সবই হলো রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশ। মানুষ, হিসেবে ভুল করে না। ভুল করেন রাজনীতিকরাই । তবে ভোগান্তি মানুষেরই বাড়ে। একথা বিবেচনায় না রেখে যারা রাজনীতি করেন তারা কতটা সফল হবেন বা টিকে থাকতে পারবেন তা ও বিবেচনার বিষয়।
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, বর্তমান সরকারের অর্জন গুলোও ক্রমশঃ ম্লান হচ্ছে। মিডিয়াকে দোষ দিলে শাসকগোষ্টি মনের তৃপ্তি পান ঠিকই । তবে তারা নিজেদের চেহারা আয়নায় দেখতে চান না। সভ্য গণতন্ত্রের জন্য তা শুভ সংবাদ নয়।
বাংলাদেশে এই যে দোষারোপ কিংবা মন্ত্রীদের পিঠ বাঁচানোর কসরত করা হচ্ছে, তাতে
কারা জিতছে ? আর হারছে কারা ? বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় রাখা দরকার মনে করি। ইতিহাস পাঠে আমরা জানি , রাজনীতিকরা হারলে দেশে দেউলিয়াপনা নেমে আসে। আর জনগণ হারলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্থায়ী পঙ্গুত্ব নেমে আসে।
নিউইয়র্ক / ১ সেপ্টেম্বর ২০১১
-----------------------------------------------------------------------------
দৈনিক ভোরের কাগজ/ ঢাকা / ৩ সেপ্টেম্বর ২০১১ শনিবার
আলোচিত ব্লগ
শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এমন কেন?
একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।
শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।