রোজকার মত আজও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাবলিক বাসে করে চললাম রাজধানী ঢাকার দিকে। উদ্দেশ্য আমার এক বন্ধুর অফিস। রওনা দিলাম ১১টার দিকে। প্রতিদিনের মত আজও সাভারে এসে যানজট। মানে ১৫ মিনিট নষ্ট। সাভারের রাস্তা (ঢাকা – আরিচা মহাসড়ক) অনেক চওড়া, পাশাপাশি তিনটা গাড়ি চলতে পারে - এতটা। এর পরও এখানে প্রতিনিয়ত জটের সৃষ্টি হয়। কারণ এখানে রাস্তার উপরে কাচা বাজার, রিকশা থাকে হাজার হাজার। এছাড়া লোকাল গাড়িগুলোর যত্রতত্র দাড়ানো, রাস্তায় দাড়িয়ে যাত্রী তোলা তো আছেই। এসব ভাবতে ভাবতে বাটার সামনে চলে এলাম। এখানে রাস্তার উপরে স্তুপকারে ময়লা ফেলা হয়। আমার নজর চলে গেল সেদিকে। কারণ আবর্জনা নয়, আবর্জনার স্তুপে বসে এক পাগল মানুষের ফেলে দেয়া খাবার খাচ্ছে। খাবার সম্ভবত পোলাও, কোন প্যাকেটে ফেলা হয়নি, ফেলা হয়েছে সরাসরি ময়লার মধ্যে। সেখান থেকেই খাবার বেছে বেছে খাচ্ছে কোন কুকুর বা অন্য কোন জন্তু নয়, আমারই মত আরেকজন মানুষ, হোক সে পাগল। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমরা যে বিলাসবহুল খাবার না খেতে পেরে ফেলে দিয়েছি তাই ময়লা থেকে তুলে খাচ্ছে আরেকজন মানূষ! নিজেকে বা নিজের কোন আত্নীয়কে ঐ জায়গায় কল্পনা করার চেষ্টা করলাম, মন সেদিকে বেশী দুর এগুলোনা। লোকটার চিন্তা মাথায় কিছুক্ষন ছিল, পরে আবার অন্য ভাবনায় ডুবে গেলাম।
দীর্ঘ যানজট পেরিয়ে ফার্মগেটে গাড়ি থামল। এখানে অনেক মানুষ। কিছু পিচ্চি ছেলে এবং কিছু বয়স্ক মানুষ এখানে আমাদের সময় ও ভোরের ডাক পত্রিকা বিক্রি করে। আমাদের গাড়ির সামনের গেট দিয়ে এক পিচ্চি উঠে চেচাতে থাকল। পরে পেছনের গেট দিয়ে এক যুবক হকার উঠে বিক্রি শুরু করল। পিচ্চি পেছনে এগুতে গিয়ে তার এক প্রতিদ্বন্দিকে দেখে ক্ষেপে গেল। বলল, ‘ওই, আমি যে সামনে আছি, দেখলি না?’ কথাটা রাগ মেটাতে আরও দুইবার বলে সে নেমে গেল। আমার মন আবারও খারাপ হয়ে গেল। কতইবা বয়স হবে ওর? ৮/৯? আরও ভাতিজার বয়স। অথচ এই বয়সে নিজের জীবন বাচানোর তাগিদে বাবার বয়সী এক লোককে তুই তোকারি করল! আবারও মেলাতে চেষ্টা করলাম নিজের ভাতিজাকে ওর জায়গায় বসিয়ে। কোনমতেই চিন্তাটাকে ভালো লাগাতে পারলাম না।
ফার্মগেট সিগনালও পার হয়নি, সর্বশেষ সিগনালে দাড়িয়ে (যারা আসাদগেট থেকে ফার্মগেট হয়ে যাতায়াত করেন, তারা জানেন এখানে নুন্যতম ৪ বার সিগন্যালে পড়তে হয়), উঠল আরেক ছেলে। এর বয়স ১০/১১। হাতে কোন পণ্য নেই। উঠে বাসের ইন্জিন কভারে বসে গান শুরু করল। গানের কথাগুলো এরকম...
‘আমরা চলি পায়ে পায়ে, তোমরা চল গাড়িতে
আমরা থাকি ফুটপাতে তোমরা থাক বিল্ডিংয়ে।।
তোমরাও মানুষ, আমরাও মানূষ.............’
এর পরে সে সবার কাছে ভিক্ষার হাত পাতলো। মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল ....... ....... .... ..... ....।
সারাদিন নানা ব্যস্ততায় সব ভুলে গিয়েছিলাম। এখন রুমে বসে ‘সামু’তে বসে ঘটনাগুলি মনে হল। ভাবলাম লিখে ফেলি।
প্রতিদিনই এমন কত লোককে দেখছি, ভাবছি, কিন্তু কিছু কি করছি এদের জন্য? এদের জন্য কি আমাদের কিছুই করার নেই। মাঝে মাঝে ভাবি জীবনে বিয়ে শাদী করবনা, পথশিশুদের নিয়ে কাজ করব। অন্তত ১০ টা ছেলেকে যদি মানুষ করতে পারি, সেটাই হবে জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। নানা ব্যস্ততায় কিছুই করা হয়না। আদৌ কি কিছু করতে পারব এদের জন্য?
মনের মধ্যে এখনও বাজছে এক অসহায় শিশুর গান....
‘তোমরাও মানুষ, আমরাও মানুষ.......................’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



