জীবনের একঘেঁয়েমী দূর করতেই হাসি-তামাশার প্রয়োজন। অর্থাৎ, হাসি-তামাশা করাটা কোন বর্জনীয় কাজ নয়; বরং নিষেধ হলো তার সাথে মিথ্যার মিশ্রণ ঘটানো, সত্যাশ্রিত ঠাট্টা আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামও করেছেন। যেমন, 'বুড়ি মহিলারা জান্নাতে যেতে পারবে না' তার কাছ থেকে একথা শুনে মহিলা তো কান্নায় অস্থির, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মুচকি হেসে জানালেন যে, বুড়িরা জান্নাতী হলে আল্লাহ্ তাদেরকে যুবতী বানিয়েই পরে জন্নাতে প্রবেশ করাবেন। এরূপ অনেক সত্যাশ্রিত ও শিক্ষনীয় তামাশা রয়েছে তার স্ত্রীদের সাথে, জামাতার সাথে ও অন্যান্য সাহাবীগণের সাথে; যা থেকে উম্মাত কিভাবে হাসি-হামাশা করতে হবে সে শিক্ষা যেমন পেল, তেমনি এসবের বিষয়বস্তু হতেও অনেক শিক্ষা বের হয়ে আসে যা থেকে কেয়ামত পর্যন্ত অনুসারীগণ দিকনিদের্শনা পেতে থাকবে। কোন মুসলমানকে অস্ত্র দেখানোটা রাগ হওয়া ছাড়াও হতে পারে এবং হয়ে থাকে। মিছে ভয় দেখানোর ছলে বন্ধু বন্ধুর প্রতি অথবা অন্যান্য সম্পর্কিতরা পরস্পর চাকু, পিস্তল, লাঠি ইত্যাদি নিয়ে তেড়ে যায়। বাহ্যদৃষ্টিতে ও দুর্ঘটনা সংঘটিত হবার পূর্বে এতে দোষের কিছু ধরা পড়ে না, কিন্তু ঘটে গেলেই সকলে তার জন্য আফসোস করে করে ক্লান্ত হয়। খবরে তো এমনও বেরিয়েছে যে, নতুন দুলাভাইয়ের সাথে পানিতে চুবোচুবির তামাশা করতে গিয়ে বেচারাকে মেরেই তবে ক্ষ্যান্ত হলো। কি দুর্ভাগা!
উম্মাত যেন এসব করুণ দুর্ভাগ্য হতে বাঁচতে পারে, তাই দয়ার সাগর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুশমনি থাক বা না থাক কিংবা হাসি ঠাট্টা করেও কারো প্রতি অস্ত্র প্রদর্শন করতে নিষেধ করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ((তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের দিকে অস্ত্র দিয়ে ইশারা না করে, হতে পারে শয়তান তার হাত থেকে তা খুলে নেবে, যার ফলে সে জাহান্নামে পতিত হবে।)) [মুসলিমঃ ১২৬(২৬১৭), ৪/২০] পূর্বেই বলেছি যে, আদম সন্তানদের একজনকে জাহান্নামের পথে নামাতে পারলে তাদের সবচেয়ে বড় ও চির শত্রু শয়তান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। শয়তান সর্বদাই সুযোগ খুঁজতে তৎপর, কিভাবে মানুষকে চরম পতনের কিনারে নিয়ে আসা যায়, তারপর যখনি কোনক্রমে মানুষ সেই ভয়াল স্থানে এসে পড়ে, ব্যস তখন শয়তানের কাজ হয় পতনকে ঊধর্্বগমন দেখানো, অথবা কিঞ্চিত ধাক্কা মারা, আর তাতেই শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটধারী মানব নিমজ্জিত হয় أَسْفَلَ سَافِلِينَ "আসফালা সাফিলীন" বা "তলে অবস্থানকারীদেরও গভীর অতলে"। তদুপরি যদি নিতান্তই অনিচ্ছায়, ঠাট্টায় ঘটে যায় এমন ভয়ানক পরিণতি, তাহলে দুঃখ-যন্ত্রণার মানসিক চাপটা একবার অনুভবে পরখ করে দেখলেই পরিস্কার হবে হাদীসের ভাষ্য।
দু'টি উদাহরণ পেশ করলে হয়ত বিষয়টি সম্পর্কে ধারণায় আরো স্বচ্ছতা আসবে-
এ প্রজন্মের আগের কথা, তখন পৃথিবীময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাঢোল বাজছিল, সহপাঠী বন্ধুর পিতা ছিলেন বৃটিশ ভারতের সৈনিক। ডিউটি সিডিউলের যু্দ্ধ শেষে দিনান্তে ক্যাম্পে ফিরে দেখলেন যে, তার সহযোদ্ধা ও কামরার অংশীদার বন্ধুটি এখনো ঘুমে বেঘোর, কেননা তার তখন ডিউটি ছিল না। বার কয়েক ডাকার পর না উঠায় গান তাক করে বললেনঃ উঠ্, নইলে গুলি করবো। কারণ, তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, হাতের অস্ত্রে আর কোন গুলি বাকী নেই; যা ছিল সব উড়িয়ে দিয়েছেন প্রতিপক্ষের সীমানায়। অবশেষে এক, দুই করে বন্দুক তাক করা, ট্রিগার প্রস্তুত করা, সব ভয় দেখিয়েও যখন বন্ধুটি নড়লো না, তখনি শয়তান নিশ্চিত করালো তাকে শূট বাটনে চাপ প্রয়োগ করতে। এতদিনের প্রিয় বন্ধুটির বুকে গিয়ে আঘাত করলো তারই ছোঁড়া ঘাতক গুলি, মুহূর্তে চিরতরে নিঃশেষ হয়ে গেল বন্ধুর নাকডাকা নিশ্বাস। অজান্তে, অনিচ্ছায়, ঠাট্টায় প্রিয় হত্যার কষ্টটা লিখে বুঝানো হয়ত সম্ভব নয়; লাশ নিয়েই পড়ে থাকলেন তিনি, পালালেন না, ধৃত হলেন, বিচার হলো, জেল হলো দীর্ঘ মেয়াদী, অবশেষে জীবনের সায়াহ্ন এসে গেল এভাবেই। বৃদ্ধ বয়সটা তিনি আমাদের চোখের উপর দিয়েই পার করলেন। তার ছেলে অর্থাৎ, আমার সহপাঠী বন্ধুসহ আমরা যে বছর দশমের ঘরে পা রাখি, সে বছরই তিনি কবরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যান; আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করুন।
অন্য ঘটনাটি ঘটে আমাদের এলাকারই দু'টি বালকের ক্ষেত্রে। ওরা দু'জন বেশ ভাল বন্ধুই ছিল, এখানে-ওখানে প্রায়ই ওদের দেখা যেত একসাথে, তেমনি একদিন দেখা গেল পুকুর পাড়ে, দুপুর গড়ানো প্রহরে গোসল সারতে এসেছে। তারপর কি যেন ছেলেমানুষী কথা নিয়ে দু'বন্ধুর কথা কাটাকাটি আর এক পর্যায়ে একজনের হাতের ছোট্ট চাকু অন্যজনের দিকে হাঁকাতে শুরু করা ও পরিণামে দ্বিতীয় জনের একটি চোখ হারানোর ঘটনা ঘটিয়ে ছাড়লো শয়তান। হাঁকানো চাকুটা তো মুখে, কপালে, কুনুইয়ে অথবা অন্য কোথাও লাগতে পারতো; লেগেছে একেবারে চোখের মণিতে, প্রথম বালকের কথা অনুযায়ী চাকু লাগার সাথে সাথেই সে তার বন্ধুকে ধরে বসালো আর দেখলো যে, তার চোখ থেকে গাঢ় সাদা কিছু বের হয়ে গেল। থানা শহরের হাসপাতাল, পরে ঢাকার পিজি কেউই আর ফিরিয়ে দিতে পারলো না তাকে তার 'চোখের মণি'। সে এখন যুবক, দু'টি চোখ নিয়ে পৃথিবীতে জন্মালেও সামান্য তামাশার কারণে আজ তাকে পৃথিবী দেখতে হচ্ছে এক চোখে। লোকমুখে সে এখন 'কানা অমুক' উপাধিতে পরিচিত। কি করুণ দৃশ্য!
আল্লাহর একান্ত অনুগত ফিরিশ্তাগণ তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানবের প্রতি এহেন সামান্য অথচ পরিণামে অসামান্য কর্মের কারণে কেন লা'নত বা বদদো'আ করে, উপরের আলোচনায় তা সুস্পষ্ট হয়েছে আশা করি। জীবনের অহরহই তো আমরা পতিত হই এরূপ বদদো'আয়, কেন? হাসি-ঠাট্টায় তো নিষেধাজ্ঞা আসছে না; বরং পন্থা ও পদ্ধতিতেই কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। এই পরিবর্তন আনার নিয়মটাই পাওয়া যাবে জীবন বিধান খুঁজলে, যার নাম ইসলাম, যার প্রাণ কুরআন ও হাদীস, যা আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে সবচেয়ে বড় নেয়ামত। বলুন, কে না চাই এমনতর একটি 'সবচেয়ে বড় নেয়ামত'-এর অংশ না নিতে? তৌফিক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


