মহান আল্লাহ্ তা'আলা মানব জাতির জন্য নির্ভেজাল ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ এমন এক জীবন ব্যবস্থা দান করেছেন, যা থেকে আমরা যেমন সত্য ও সঠিকের দিকনির্দেশনা পাই তেমনি পাই মিথ্যা ও ভ্রান্তির পরিচিতিও। এটা এ জন্যে যে, দয়াময় আল্লাহ্ আমাদের কল্যাণ চান। তাই কোথায়, কোন পথের কোন বাঁকে ওঁত পেতে আছে অকল্যাণ সে ধারণা আমাদেরকে পূর্ব হতেই জানিয়ে দিয়েছেন; যাতে আমরা সতর্ক থাকতে পারি। কিন্তু তবুও কি মিথ্যার ধ্বজ্জাধারী আর বিভ্রান্তরা থেমে আছে? নেই; থাকতে পারে না, কেননা তারা যে বিক্রিত হয়ে গেছে শয়তানের কুচক্রী ষড়যন্ত্রের কাছে। তাই তাদের প্রত্যেকেই এক একজন শয়তান অথবা শয়তানের প্রতিনিধি হয়ে আমাদের সমাজে নিজেদের ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। কবর পূজারী ও কবরের উপর প্রাসাদ নির্মাণকারীরা এই ব্যাপক গোমরাহ্ গোষ্ঠীর একটা অংশ। গুটিকতক দুর্দান্ত চালাক ব্যক্তিকে শয়তান সম্পূর্ণরূপে ক্রয় করতে সক্ষম হয়েছে এবং তাদের মাধ্যমে মানব সমাজের একটা বিরাট অংশকে মোহাচ্ছান্ন করে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের দোরগোড়ায়। আসুন দেখা যাক, কবরের উপর নির্মাণ-তা দেয়াল হোক কিংবা প্রাসাদ-প্রসঙ্গে ইসলাম কি দিকনির্দেশনা দিচ্ছে আমাদেরকে।
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি:
আল্লাহ্ তা'আলা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে নবী নূহ 'আলাইহিস্ সালাম কর্তৃক তার অবাধ্য জাতির জন্য কৃত বদদো'আ তুলে ধরার মাধ্যমে আমাদেরকে জানাচ্ছেন যে কিভাবে পৃথিবীতে মৃতদের পূজা, তাদের কবরে পূজা ও তাদের মূর্তি বানিয়ে সেসবের পূজা করার সূত্রপাত ঘটেছিল- وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آَلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا ((তারা (নূহের জাতির কর্তৃত্বশীল লোকেরা) বলছে, (সর্বসাধারণের প্রতি) তোমরা তোমাদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না 'ওয়াদ', 'সুওয়া'আ', 'য়াগূছ', 'য়া'উক' ও 'নাসর'কে।)) [সূরা নূহ: ২৩]
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: ((এই সবক'টি মূলত নূহ্ 'আলাইহিস্ সালামের সম্প্রদায়ের কতিপয় নেককার লোকের নাম। তাদের মৃত্যুর পর লোকেরা শয়তানের প্ররোচণায় তাদের ভাস্কর্য নির্মাণ করে প্রতিটি ভাস্কর্যকে আসল নামে ডাকতে শুরু করে। তখনো এগুলোর পূজা করা শুরু হয়নি। কিন্তু তাদের পরবর্তী বংশধরগণ মূর্খতাবশত এগুলোর পূজা করতে শুরু করে।)) [বুখারী হতে ইবনে কাসীর] ইকরিমা, যাহ্হাক, কাতাদাহ্ ও ইবন্ ইসহাক রাহিমাহুমুল্লাহ্ হতেও এই বর্ণনা পাওয়া যায়।
-এখানে সুস্পষ্ট যে, মৃত ব্যক্তিদের প্রতি অতিভক্তি-শ্রদ্ধার কারণে প্রথমে ভাস্কর্য ও পরে মূর্খতার কারণে পূজা-অর্চনা শুরু হয়ে যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: لَا تَجْلِسُوا عَلَى الْقُبُورِ وَلَا تُصَلُّوا إِلَيْهَا ((কবরের উপর (আসন গেঁড়ে বা ইমারত বানিয়ে) বসো না এবং তার দিকে (কবরের দিকে) সালাত আদায় করো না।)) [মুসলিম: ১৬১৩, আবূ দাউদ: ২৮১০, তিরমিযী: ৯৭১, আহমাদ: ১৬৫৮৪] যদি সাধারণ অর্থে ধরে নেয়া হয়, তবে কবরের উপর বিরাট ইমরাত নির্মাণ করে সুসজ্জিত করা তো দূরে থাক, আল্লাহর রাসূল এখানে বসতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন। আর বিস্তারিতভাবে বুঝতে হলে কবরের উপর যা কিছু নির্মাণ করা হয় অথবা ইবাদাত-নিয়মপন্থা-নযর-মান্নত-অর্থদান ইত্যাদি করা হয়, শুধুমাত্র যিয়ারতের শরীয়ত সম্মত সঠিক পন্থা ব্যতীত আর সকল কৃতকর্মের ব্যাপারের এখানে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
যদি ধরে নেয়া যায় যে, তারা প্রচণ্ড ভালবাসার কারণে কবরের উপর প্রাসাদ নির্মাণ করে ফেলেছে কিংবা অধিক মাত্রার ভালবাসার কারণেই বার বার তাদের কবরে গিয়ে কান্নকাটি করছে। তবে তাদের আত্মসমালোচনা করা উচিত যে, তারা কি পরম প্রিয় আল্লাহর জন্য তাদের হৃদয়ে তেমন ভালবাসা পোষণ করে? অথচ বান্দার জন্য ভালবাসার সবটুকু কিংবা সর্বোচ্চটুকু হওয়া উচিত তার প্রতিপালকের প্রতি। যেমনটি তিনি বলেছেন:
فَإِذَا قَضَيْتُمْ مَنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَذِكْرِكُمْ آَبَاءَكُمْ أَوْ أَشَدَّ ذِكْرًا
((তারপর যখন তোমরা হজ্জের অনুষ্ঠানাদি সমাপ্ত করবে তখন আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করবে যেভাবে তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণ করে থাক, অথবা তারচেয়েও অধিক।)) [সূরা আল-বাকারা: ২০০] সুতরাং পূর্বপুরুষ বা সম্মানিত কোন ব্যক্তিত্ব যত প্রিয়ই হোক না কেন; আল্লাহ্ বলছেন যে, তার চেয়েও অধিক ভালবাসা বান্দার কাছ থেকে তাঁর প্রাপ্য। বান্দার উচিত অন্তরে তার রবের প্রতি ভালবাসার সর্বোচ্চ মাত্রাকে জাগরিত রেখে তাঁকে স্মরণ করা। অন্যত্র তিনি বলেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آَمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
((আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ্ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তারা তাদেরকে ভালবাসে আল্লাহর ভালবাসার মতই ; পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালবাসে।)) [সূরা আল-বাকারা: ১৬৫] সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, যারা অন্য কোন মানুষকে আল্লাহর আল্লাহর ভালবাসার মত করে ভালবাসে তারা মূলত সেই ব্যক্তিকে নিজ নিজ অন্তরে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে নিয়েছে। আর আল্লাহর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করা সুস্পষ্ট শির্ক। পরন্তু আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে যে, মুমিনগণই শুধুমাত্র আল্লাহকে তাদের অন্তরের সর্বোচ্চতা দিয়ে ভালবাসে অর্থাৎ, এর ব্যতিক্রমীরা ঈমানের দিক থেকে সুস্পষ্ট বিপদাশংকায় নিমজ্জিত। তাহলে একথা সুস্পষ্ট যে, যারা কবরবাসীকে ভালবাসার কারণে কবরের উপরে সুরম্য দেয়াল বা প্রাসাদ নির্মাণ করে অথবা কবরবাসীকে ডাকে তারা প্রকারান্তরে সেই কবরবাসীকে আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। যার ভয়াবহ পরিণাম সুস্পষ্ট শির্ক!
(অসমাপ্ত)
পরের পর্ব পড়ুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

