আগের পর্ব পড়ুন।
কাজের জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করে থাকি আমরা: কিন্তু কবরবাসীর জন্য তো আর কোন প্রকার কাজ করারই কোনরূপ সুযোগ নেই, কেননা সে মরে গেছে। তাহলে কাজ করবে কারা? জীবিতরা? কি কাজ করা যায় কবরের উপর? মূলত শুধুমাত্র একটি কাজই করা যেতে পারে, আর তা হলো- মানুষকে ধোঁকা দেয়ার কৌশলাদি সাজিয়ে বসে দিনে দুপুরে লোকদেরকে মোহাচ্ছান্ন করে প্রকাশ্য ডাকাতির কাজটাই করা যেতে পারে শুধুমাত্র। অন্যথা জাগতিক সকল কাজের জন্য এই পৃথিবী অনেক বিস্তৃত, এবং মানুষ সেজন্য অনেক সুবিধা সমৃদ্ধ ও বৈচিত্রপূর্ণ অফিস-আদালত, কল-কারখানা, বাজার ইত্যাদি নির্মাণ করেছে।
ইবাদাতের জন্য মানুষ গৃহ নির্মাণ করে থাকে: অথচ কবরবাসীর নিজের আর কোন ইবাদাত করার বিন্দুমাত্র সুযোগও নেই। যে নেই, সে কিভাবে ইবাদাত করবে? তাহলে ইবাদাত গৃহ কার জন্য? অবশ্যই জীবিতদের জন্য। তারাইবা কার উদ্দেশ্যে ইবাদাত করবে? আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদাত করার জন্য তো মসজিদ সমূহ রয়েছেই এবং সেগুলো অবশ্যই কবরের উপরে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাহলে অর্থ কি এই দাঁড়াচ্ছে না যে, কবরের উপরে নির্মিত মসজিদের ইবাদাতে কবর বাসীর উদ্দেশ্যেও কোন না কোনভাবে কিছু ইবাদাত নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকে কিংবা পুরোটাই। মূলত উপরোল্লেখিত ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অধ্যায়ে কবরের উপরে বসা ও তাতে ইবাদাত করা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। অতএব, যারা কবরের উপর ইবাদাতের জন্য গৃহ নির্মাণ করে থাকে, তারা নিঃসন্দেহে জাহেল বা মূর্খ, গোমরাহ্ বা বিভ্রান্ত, এরা আল্লাহর প্রকৃত দ্বীন ইসলামের দুশমন, কেননা এদের মাধ্যমেই মানুষেরা প্রকৃত-সত্য দ্বীন থেকে বহুদূরে ছিটকে পড়ে। এরাই মানুষকে জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করায় এভাবে কবরের উপর মাজার প্রতিষ্ঠা ও তাতে ইবাদাত করার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে।
সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক যে, কবরের উপর দেয়াল বা প্রাসাদ কেন নির্মাণ করা হয়:
কারণ মূলত দু'টো- ১) ইবাদাত, ২) ব্যবসা ও ৩) সংরক্ষণ।
১) ইবাদাত: একটা গোষ্ঠী আছে যারা অতিভক্তি, ভালবাসা, শ্রদ্ধার সাথে সাথে শয়তান কর্তৃক প্ররোচণায় নিপতিত হয়ে নিজেদের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের ভাস্কর্য নির্মাণ করতে শুরু করে, তারপর পর্যায়ক্রমে তাতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করে, তারপর ঘরে ঘরে তা স্থাপন করে এবং অবশেষে শয়তান তাদেরকে দিয়ে ঐসব ভাস্কর্য তথা মূর্তির পায়ে কিংবা বেদীতে আন্তরিক, নযর-মান্নত এমনকি মস্তক নোয়ানো বা সিজদা করার মত ইবাদাত আদায় করতে সক্ষম হয়। ইসলাম যাকে সুস্পষ্টভাবে বড় শির্ক বলে আখ্যায়িত করেছে এবং যার পরিণতি আক্বীদা-বিশ্বাসে ব্যক্তি ইসলামের সীমানা থেকে বহিস্কার হয়ে যায়, সমাজে তার নাম আব্দুর রহমান কিংবা বদর উদ্দীন যাই হোক না কেন।
২) ব্যবসা: সমাজের কিছু ধূরন্ধর মানুষেরা যখন উপরোল্লেখিত মূর্খ ও বিভ্রান্ত একটা গোষ্ঠীর সন্ধান পেয়ে যায়, তখন শয়তানের চক্রান্তে ও প্ররোচণায় তাদের মাথায় ব্যবসায়ী একটা চিন্তা খেলে যায়। তারা তখন শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী ব্যবসার কাঠামো সাজিয়ে ফেলে এবং মাজার দখল করে বসে। এজন্য দেখবেন প্রত্যেক মাজারে খাদেম রয়েছে, কি কাজ খাদেমের? মৃত ব্যক্তি কি খেদমত নেন তার কাছ থেকে? সে মূলত জীবিত লোকদের চোখে ধোঁয়ার সৃষ্টির খেদমত আঞ্জাম দিয়ে থাকে, সে মূলত মোহ সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অর্থকড়ি খসানোর খেদমত(?) আঞ্জাম দিয়ে থাকে। তারপর গভীর রাতে তাদের নিজস্ব অংশীদারদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে থাকে। এছাড়া যারা শক্তি ও বুদ্ধির দুর্বলতার জন্য বড় বড় মাজারের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না কিংবা বিতাড়িত হয়, তারা তখন হয় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে যে, অমুক সড়ক পথের ধারে তমুক বাবার কবর, কিংবা মাটি উঁচু করে তাতে লালশালু বিছিয়ে বসে যায় ডাকাতির ধান্ধায়। আর এতে তাদের একমাত্র পুঁজি হলো মানুষের ধর্মপ্রীতি, তবে অবশ্যই স্বল্পজ্ঞান ও অজ্ঞান মানুষদেরই কেবল; জ্ঞানী ও দ্বীন সম্পর্কে শিক্ষিতদের দ্বীনপ্রীতি নয় এবং নিজেদের অতি উর্বর মস্তিষ্ক।
৩) সংরক্ষণ: একথা ঠিক যে, অনেকেই প্রিয়জনদের কবরকে সংরক্ষণ করার জন্য কবরের চারপাশে দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করে থাকেন। নিয়ত ঠিক থাকলেও শরীয়ত-পরিপন্থী হওয়ার কারণে এটাও বর্জনীয়। যুক্তি তর্কে গেলে অনেক কথাই বলা যায় যে, পৃথিবীর আদি থেকে যদি মৃতদের কবরগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে সংরক্ষণ করার জন্য দেয়াল দেয়া চলতে থাকতো, তবে পৃথিবীতে হয়ত জীবিতদের থাকার জন্য ঘর নির্মাণ করার মত কোন জায়গা থাকতো না। বরং সেদিকে না গিয়ে আমাদের দেখতে হবে যে, প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে কী দিকনির্দেশনা দান করেছেন আমাদেরকে। তিনি একবার আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে প্রেরণ করেন এই বলে যে, মদীনার সকল উঁচু কবরগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে আস; তিনি তাই করলেন। এ ব্যাপারে আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর ভাষ্য হলো: ((তিনি (আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু) আবুল হাইয়াজ আল আসাদীকে বলেছিলেন 'আমি কি তোমাকে এ জন্য পাঠাবো না যে জন্য আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠিয়েছিলেন?)) সুতরাং আলাদা দেয়াল অথবা প্রাসাদ নির্মাণের তো কোন প্রশ্নই আসে না; বরং কবরকে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত উঁচু করে রাখাও সঠিক পন্থা নয়। তাই উচিত হবে সম্পূর্ণ কবরস্থানকে ঘিরে দেয়াল অথবা বেড়া করে দেয়া যাতে গবাদি পশু ও অন্যান্য সকল প্রকার অনিষ্টতা থেকে কবরগুলোকে রক্ষা করা যায়। এটাই সঠিক ও উত্তম পন্থা।
অতএব, বিস্তারিত আলোচনা থেকে এটাই সুস্পষ্ট হলো যে, কবরের উপর দেয়াল নির্মাণ, প্রাসাদ নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণ, কবরকে ঈদগাহ বা উৎসবের স্থান বানানো, কবরের উপরে বসা, কবরের প্রতি সালাত আদায় করা, নযর-মান্নত করা, মোমবাতি দেয়া, দূর-দূরান্ত থেকে সেদিকে সফর করা, কবরে রাখা লালশালু ঢাকা মটকায় অর্থকড়ি দান করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড সুস্পস্ট শির্ক বা আল্লাহর সাথে অংশীবাদ, জাহেলী বা মূর্খতা, দ্বলাল বা গোমরাহী বা পথভ্রষ্টতা এবং কুসংস্কারও বটে।
পরিশেষে: মুসলমানদের কবর পবিত্র রাখার স্থান, তাই সংরক্ষণ করা ভাল এবং প্রয়োজনও কিন্তু তা আলাদা আলাদা করে প্রত্যেকটি কবরে দেয়াল তুলে নয়; বরং পুরো কবরস্থানকে ঘিরে অপচয়হীন দেয়াল তুলে দেয়া যেতে পারে যাতে প্রাণীকুল কিংবা দুষ্ট লোকেরা সেখানে কোনরূপ খারাপ কিছু সংঘটিত করতে না পারে। তদ্রূপ কবর যিয়ারত করা যেতে পারে যেভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন- আখেরাতের ভাবনা জাগরিত করার জন্য এবং সঠিক পন্থায় সঠিক দো'আ পড়ার মাধ্যমে; কমও নয় বেশীও নয়। তাতেই যাবতীয় কল্যাণ নিহিত রয়েছে আমাদের জন্য। অন্যথা হলে তা কোন না কোনভাবে শির্ক, বিদ'আত কিংবা ভ্রস্টতার পর্যায়ে যেতে বাধ্য! তাই আসুন, কবর ও কবরবাসীদের ব্যাপারে সাবধান হই। তাদেরকে তাদের যথাযথ অবস্থান দান করার মাধ্যমে কবরবাসীকেও নিষ্কলুষ রাখি এবং নিজেরাও নিরাপদ থাকি শির্ক থেকে, গোমরাহী থেকে ও কুসংস্কার থেকে, এমনকি অর্থকড়ির অপচয়মূলক জাগতিক ক্ষতি থেকেও। যেমনটি আল্লাহ্ আমাদের সম্পর্কে বলেছেন: ((তাদেরকে এ ছাড়া অন্য কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত আদায় করবে; এটাই সঠিক দ্বীন।)) [সূরা আল-বাইয়্যিনাহ: ৫] আল্লাহ্ তা'আলাই একমাত্র তৌফিক দাতা।
২৯.০৮.২০০৭, মদীনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব।
(সমাপ্ত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


