(ঢাকা মহানগরীর চারশত বছর পূর্তী উৎসব উপলক্ষে ঢাকা সম্পর্কে আমার এই স্মৃতি চারণ এবং ঢাকার ইতিহাস নিয়ে যারা ঘাটাঘাটি করেন বা করবেন তাদের উদ্দেশ্যে আমার কিছু প্রশ্ন নিয়ে এই লেখা। ঢাকার মনিপুরী পাড়া ছিল মনিপুরীদের খুংগং, আর প্রত্যেকটি মনিপুরী পরিবারের আবশ্যকীয় অনুসংগ ছিল তুলশী গাছ । তুলসি গাছ না বলে মনিপুরীরা বলতো তুশী পাম্বী। আর যেখানে তুলসি গাছ কে সংরক্ষন করে রাখা হতো সেই জায়গাটুকু মনিপুরীরা বলতো তুশিবোং। কিন্তু আধুনিক নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার সাথে মানিয়ে নিতে পারলো না ঢাকাবাসী মনিপুরীরা, একে একে সবাই ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেন আসামে, মনিপুরে, সিলেটে। না-কি চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল তা আগামী দিনের ঐতিহাসিক - গবেষকরাই বলতে পারবেন। তারপরও কয়েকটি মনিপুরী পরিবার নব্বই এর দশক পর্যন্ত ঢাকার আদি মনিপুরীদের তুশীবোং রক্ষা করে রেখেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা করতে পারিনি।কালের গহ্বরে হারিয়ে গেল ঢাকার তুশিবোং, ঢাকাবাসী মনিপুরী রা। এরই মধ্যে বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন গ্রাম থেকে লেখাপড়া এবং কাজে 'র সন্ধানে ঢাকায় মনিপুরীদের আগমন শুরু হয়। শুরু হয় আরেক অধ্যায় - এসব নিয়েই আমার এই আত্মকথন। )
সময় কাল ১৯৮৮-১৯৯৮
ঢাকায় তখন আমার বছর পাঁচেক হলো বসবাস। ঢাকার বিভিন্ন অলিগলির সাথে বেশ মানিয়ে নিতে শিখেছি। গুলশান-বনানী- বারিধারার বিভিন্ন শাদা বাংলোর অন্দর মহল ঘুড়ে ঘুড়ে, রমনা-শ্যামলী-ধানমন্ডির বিভিন্ন ড্রয়িং রুমের চা-নাস্তা খেয়ে, গুলিস্তান-নবাবপুর-বাংলাবাজার-চকবাজারের বিভিন্ন দোকান-পাঁটি ঢুঁ মেরে, শাহবাগ-নিলক্ষেত-কলাবাগানের হাওয়া খেয়ে, তেঁজকুনি পাড়া-রাজাবাজার-মোহাম্মদপুর এ তুমুল আড্ডা দিয়ে আমরা ক'জন মনিপুরী পাড়ায় এসে আচ্ছা মতন ঘুম দিতাম। সংক্ষিপ্ত করে বল্লে, এই হলো আমার ঢাকার ব্যস্ত বর্ণিল (!) জীবন।
গুলশানের এক শো-রুমে ফুল টাইম জব। এসিসট্যান্ট সেলস এক্সিকিউটিব না-কি মার্কেটিং এক্সিকিউটিব এসিস্টেন্ট ঠিক কি যে আমার ডেজিগনেশন ছিল - এখন আর ষ্পষ্ট মনে নেই। আসল কথা হলো সেলস্ ম্যান- দোকানদারী করা। শো-রুমটা ছিল একটা নন-প্রফিট অর্গানাইজেশনের, এন জি ও না। কথাটি আমার না, আমাদের ডিরেক্টরের ডিকটেশন, মানে আমার সাদা ( ব্যাটা, আগে কোন এক মিশনের পাদ্রী ছিলেন ) বসের কথা। এদিকে আমার নৈশ বিভাগের স্নাতোকোত্তর শেষ পর্বের শেষ পরীক্ষাটা তখনও শেষ করতে পারিনি। তাই মনে বড় অশান্তিও ছিল।
আমার প্রাক্তন বস, মানে ডিরেক্টর ছিলেন একজন অষ্ট্রেলিয় বংশদ্ভোত হোয়াইট ম্যান। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ ঘুরে ঘুরে নব্য স্বাধীন প্রাপ্ত বাংলাদেশে লাক ট্রাই করতে এসে এরশাদ-আজিজ ভাই দের সাথে সখ্য গড়ে তুলে বেশ লাকী হয়ে উঠছিলেন। উনার পূর্বপুরুষেরা অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসী নিয়ে বিভিন্ন মহৎ (???) কর্মের জন্য সুখ্যাতি ( না-কি কুখ্যাতি ) ছিলেন। মাঝে মধ্যে উনি খুব গর্ব করে বলতেন যে, তিনি আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের আদিবাসীদের উদ্ধার করতে এসেছেন। সে আরেক প্রসংগ, অন্য আরেকদিন বলা যাবে। গুলশান-বনানী-বারিধারার প্রায় সবকটি বাংলোয় আমার মানে আমাদের (সেলস্ম্যানদের ) যেতে হতো বিভিন্ন উশিলায়। এনটিক ফার্নিচারের ডেলিভারী দেয়া থেকে ট্রাইবেল বেকষ্ট্র্যাপ লুমের তৈরী কটন কার্টেনের মাপজোক করা সহ নানাবিধ কাজে আমাদের টানাটানি চলতো। সে এক বিতিকিচ্ছিরি জীবন।
এদিকে আবার মুক্তবুদ্ধি চর্চাসহ নানাবিধ আঁতেলামীর টুকটাক দোষ ছিল। তখনও আজিজ মার্কেট তেমন জমে উঠেনি। তাই আমার যাতায়াত ছিল মহানগরীর বিভিন্ন বুদ্ধিজীবির আস্তানায়, বিভিন্ন কাগজের - পত্রিকার আফিসগুলোতে, ব্যবসায়ী প্রফেসর-ম্যাডামদের ড্রয়িং রুমে। চরিত্র বলতে আমার তখন কিছুই ছিল না, যার পাল্লায় পরি তার পিছু পিছু যেতাম। একটু উদাহরণ দেয়, শ্যামলীর আমাদের শ্রদ্ধেয় কবি শামসুর রাহমানের বাসায় যেমন মাঝে মধ্যে যেতাম, আবার ঠিকই সুযোগ পেলে উবিনিগ-নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা'র ফরহাদ মাজহারের (তখনও ফরহাদ ভাইয়ের নয়াকৃষি আন্দোলন তেমন পরিচিতি পাইনি) ওয়াজ শুনে আসতাম। অন্যদিকে ` আজকের কাগজ' - `ভোরের কাগজ' এর সম্পাদকীয় অফিসে মাঝে মধ্যে হাজিরা দিলেও ঠিকই ' সংবাদ' কি ` ইনকিলাব' সহ বিভিন্ন মূখপাত্রের পত্রিকাগুলোতেও লেখা নিয়ে হাজির হতাম। আর গুলশানের একজন শিল্পপতির অর্থানুকুল্যে আমরা কয়েকজন `` বিজ্ঞান চেতনা পরিষদ'' নামে একটি মুক্তবুদ্ধি চর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলার নানা ফন্দি-ফিকিরও তখন চলছিল। শেষ পর্যন্ত সংস্থাটি দাঁড়িয়ে যায়, আর আমরা ক'জন জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে এদিক ওদিক ছিটকে পরি।
ঢাকার সাংবাদিক এবং সাহিত্যিকদের সাথে চেনা-জানা শুরু হয় কবি আবিদ আজাদের " শিল্পতরু " র ছাপাখানায় `ইপোম' ছাপাতে গিয়ে। তখন ` ''ইপোম '' এর সম্পাদক ছিলেন মনিপুরী কবি সনাতন হামোম। (এখন '' ইপোম'' আবার কন্থৌজম সুরঞ্জীত এর জীম্মায়। ) আমাকে লেখা যাচাই-বাছাই থেকে শুরু করে প্রুফ রিডিং -গেটআপ-মেকআপ পর্যন্ত করতে হতো। তখনও ছাপাখানায় কম্পিউটার সহজ লভ্য ছিল না, তাই আমাদের কাজ করতে হতো ম্যানুয়ালী। আর ইপোম'এর অধিকাংশ লেখা ছিল মনিপুরী ভাষার কিন্তু বাংলা হরফের। বাংলা হরফে লেখা হলেও অর্থোদ্ধার করতে না পারায় কম্পোজিটরদের মহাঝামেলায় পরতে হতো, আর প্রুফ রিডিং করতে হতো আমার মতো নাদানদের যার প্রুফ রিডিং সম্পর্কে কোন অ-আ-ক-খ জ্ঞান ছিল না। সেখানেই পরিচিত হয় " শিল্পতরু'' কেন্দ্রিক সাহিত্যিক গোষ্ঠীর বিভিন্ন কবি-লেখকদের সাথে। আর আমার পরাবাস্তব কবিতা লেখার হাতেখড়িও সেখান থেকে। বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছিল কবি আহমেদ মুজিদ এবং গল্পকার মণি হায়দারের সাথে। আবার মাঝে মধ্যে সনাতন হামোমের সাথে নির্মলেন্দু গুণ-মহাদেব সাহা-রফিক আজাদ সহ ঢাকার সিনিয়র কবিদের আস্তানায় হানা দিতাম। আমি শুধু উনাদের কথোপকথন শুনে যেতাম আর মনে মনে কবিতা আওড়াতাম। পরে বিভিন্ন কারণে শিল্পতরু' র সাথে যোগাযোগ ক্রমশ শিথিল হয়ে যায়।
আমাদের পরিবারের ছোট্ট একটি কুটির শিল্পের ব্যবসা ছিল, জ্যোষ্ঠ সন্তান হিসাবে ঐ ব্যবসার প্রতি আমার একটা দায়িত্ববোধের কথা বাবা মাঝে মধ্যে স্বরণ করে দিতেন। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে বাবার পণ্যের বাজারজাতকরণে আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা (!!) থেকে টুকটাক পরামর্শ- কাঁচামাল সরবরাহ কারী কিংবা সাপ্লাই চ্যানেলের নেটওয়ার্ক এ কিভাবে সুবিধা করতে হয়- এ সম্পর্কীত ফ্রি কলসালটেন্সি দিতে দিতে এবং মার্কেট নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে করতে নতুন ঢাকার বিভিন্ন মহাসড়কের সাথে সাথে পুরান ঢাকার চিপাগলিতেও অনায়াসে ঢুকে যেতাম। আবার বৃটিশ কাউন্সিল থেকে শুরু করে শিশু একাডেমী- শিল্পকলা একাডেমী - বাংলা একাডেমী হয়ে এশিয়াটিক সোসাইটি পর্যন্ত নানা সভা-সেমিনার- ওয়ার্কশপ এ অনিয়মিত হলেও সময়-সুযোগ এবং ফাঁকা আসন পেলে ঠিকই দখল করে বসে পরতাম। দ্বৈত জীবনযাপন কাকে বলে তখন আমি ঠিক ততটা বুঝিনি, তারপরও কেমন যেন মানিয়ে নিয়েছিলাম।
এর মধ্যে এল শজিবু- বৈশাখ। রমনার বটমূলের বৈশাখী মেলায় এটা-ওটা করে সারাদিন কাটিয়ে, সন্ধ্যায় ঠিকই হাজির হতাম মনিপুরী পাড়া'র এস সি সিনহার ( তখন সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট ছিলেন, মনিপুরীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি উঁনার বাসাতে বেশ জমিয়ে পালন করতেন।) বাসায় লীকোন শানাবা ( কড়ি খেলা) 'র আসরে। সেখানেই পরিচয় হয় লতা'দির সাথে। পুরনো ঢাকাবাসী এক মনিপুরী পরিবারের মেজ কন্যা । মাকে নিয়ে আসতেন, আমাদের সবার সাথে পরিচয় করে দেয়ার জন্য। কিছুটা লাজুক- কিছুটা আড়ষ্টতা, তাই প্রথম সাক্ষাতে তেমন আলাপ জমে উঠেনি। খেলার আসর এবং অন্য সবার সাথে গল্পগুজবে সময় চলে যাচ্ছিল। গল্পগুজবের এক ফাঁকে লতা'দির মার সাথে কথা হয়। কথা প্রসঙ্গে মনিপুরী ভাষায় জিজ্ঞেস করলাম, ঢাকাবাসী মনিপুরীদের বিভিন্ন সুখ দুঃখের কথা। কোথায় কোথায় মনিপুরীদের গ্রাম ছিল, অন্য সবায় চলে গেলেও তারা কেন গেলেন না, কি কি সমস্যার মোকাবেলা করতে হয় ইত্যাদি ইত্যদি। আমি উঁনাকে ডেকেছিলাম ''ইনে'' বলে, মানে বাংলায় পিসিমা । সেদিন ঢাকাবাসী মনিপুরীদের গল্প তেমন জমে উঠলনা। আরেকদিন বাসায় যেতে বল্লেন। তখন সব কিছু আলাপ করা যাবে জানালেন। এভাবে শুরু হলো, ঢাকার পুরনো মনিপুরী অধিবাসীদের সম্পর্কে আমার জানাশোনা। (চলবে )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

