আমার প্রিয় পোস্ট

সুপারনোভা - মহাপ্রলয় ঘটাতে সক্ষম, কতটুকু নিরাপদ আমরা - পর্ব ২

২৮ শে মার্চ, ২০০৯ সকাল ১০:৩৬

শেয়ারঃ
0 0 0

সুপারনোভা কি এবং কিভাবে ঘটে সেটা জানতে আগের পর্বটি পড়ুন Click This Link সুপারনোভা -পর্ব ১ : পাদ্রী রবার্ট ইভান্সের বিশ্ব

আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালে মহাবিশ্বের খুবই ক্ষুদ্র একটা অংশ আমরা দেখতে পাই। খোলা চোখে মাত্র ৬ হাজারের মত নক্ষত্র দেখা যায়। আর কোন একটা নির্দিস্ট স্হান থেকে সংখ্যাটা মাত্র দুই হাজারের মত। দূরবীণ দিয়ে দেখলে সংখ্যাটা একলাফে ৫০ হাজারে গিয়ে দাড়ায়।তবে খুবই ছোট একটা ২ ইন্ঞ্চি টেলিস্কোপের সাহায্যে প্রায় ৩ লক্ষ নক্ষত্র দেখা সম্ভব। আর দূরবীনটা যদি হয় ১৬ ইন্ঞ্চির তাহলে নক্ষত্রের বদলে আপনাকে গ্যালাক্সি গুনতে হবে। ইভান্স বাসার পিছনের ডেকে বসে তার ১৬ ইন্ঞ্চি দূরবীণের সাহায্যে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। প্রতিটা গ্যালাক্সিতেই রয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র। সংখ্যাটা খুবই সমীহ জাগানো কিন্তু তার পরেও সুপারনোভারা খুবই বিরল।

লক্ষ কোটি বছর ধরে একটা নক্ষত্র জ্বলতে পারে কিন্তু সেটা একবারই মৃত্যু বরণ করে এবং সে মৃত্যু হয় খুবই তড়িৎ। সে তুলনায় আবার খুবই কম সংখ্যক নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয়। বেশিরভাগেরই জীবন প্রদীপ নিভে যায় নিরবে, ভোর বেলা ক্যাম্প ফায়ারের আগুনের মত। শত শত বিলিয়ন নক্ষত্র সমৃদ্ধ একটা সাধারণ গ্যালাক্সিতে ২ থেকে ৩ শ বৎসরে ১ টা সুপারনোভা সংঘটিত হয়। যার ফলে সুপার নোভার দেখা পাওয়া অনেকটা এ্যাম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের অবজারভেশন ডেকে দাড়িয়ে টেলিস্কোপের সাহায্যে ম্যানহাটনের অগনিত জানালার ফাক দিয়ে কোনও একজনের ২১তম জন্মদিনের কেক কাটার দৃশ্য খুজে পাওয়ার মত।

ইভান্স যখন ১৯৮০ সালে সুপার নোভা খোজা শুরু করেন তখন পর্যন্ত পুরো এ্যাস্ট্রনমিকাল সোসাইটি ৬০টিরও কম সুপার নোভার সন্ধান পেয়েছিলো। আরো ২০০১ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত ইভান্স একাই ৩৪ টি সুপার নোভার সন্ধান পান। ৩ মাস পরেই খুজে পান তার ৩৫তম সুপার নোভার এবং ২০০৩ সালের প্রথম দিকে ৩৬তমটি।

সুপার নোভাগুলি কয়েক ধরনের হতে পারে। যেমন Ia, Ib, Ic, এবং II. এই বিভাজন গুলি করা হয় সাধারনতঃ তাদের থেকে নির্গত বর্নচ্ছটার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের উপর এবং সময়ের সাথে সাথে আলোর উজ্জ্বলতার যে পরিবর্তন হয় (লাইট কার্ভ) তার উপর ভিত্তি করে। এদের মধ্যে Ia ধরনের সুপারনোভা মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ন। কারণ এ ধরনের সুপার নোভা গুলি সাধারণত একই ভরের হয়ে থাকে এবং এদের বিস্ফোরণের ধরনটাও সবসময় একই রকম হয়। আর এদের উজ্জ্বলতাও সবসময় এক রকম হয়। এ কারনেই এই ধরনের সুপারনোভাগুলিকে একটি স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে ধরে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের সম্প্রসারনের হার নির্নয় করে থাকেন।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের মনে যে প্রশ্নটা আসে সেটা হলো, এ রকম একটা নক্ষত্র আমাদের খুব কাছেই কোথাও যদি বিস্ফোরিত হয় তাহলে কি হবে? আমাদের সবচাইতে কাছের নক্ষত্রটা হচ্ছে ৪.৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্হিত আলফা সেঞ্চুরি। তাই এরকম মনে হওয়াটা স্বাভাবিক যে ওটা যদি বিস্ফোরিত হয় তবে আমাদের হাতে ৪.৩ বছর সময় আছে ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করার। পৃথিবীর বুকে মানুষের জীবন যাত্রা তখন কেমন হবে? যদি মানুষ জানতে পারে যে আর মাত্র ৪ বছর ৪ মাস সময় আছে মহাপ্রলয় হতে, মানুষকি তখনও তার দৈনন্দিন কাজে যাবে? কৃষকেরা কি যাবে ক্ষেতে ফসল বুনতে? কেউ কি যাবে দোকানে প্রয়োজনীয় জিনিষ কিনতে?

আসলে, সেরকম কিছুই ঘটবে না। এর রকম একটা ঘটনার সংবাদ আলোর গতিতে ছুটে চলে, আর সেই সাথে সাথে তার ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ক্ষমতাও। ফলশ্রুতিতে আমরা যে মূহূর্তে জানব এই ঘটনার কথা, সেই একই মূহুর্তে আমাদের মৃত্যুও ঘটবে। কিন্তু এটা নিয়ে আমাদের দুঃচিন্তার কোন কারন নেই। সুপারনোভার বিস্ফোরনের ফলে পৃথিবী ধ্বংস হতে হলে নক্ষত্রটাকে রিডিকুলাসলি আমাদের সন্নিকটে থাকতে হবে।

এধরনের বিস্ফোরনে অনেক ধরনের বিপদ হতে পারে....বিভিন্ন কসমিক রে'র তেজস্ক্রিয়তা সহ আরও অনেক কিছু। বিস্ফোরনের ফলে আধিভৌতিক আলোর তৈরি তিরতির করে কাপতে থাকা একটা চাদরের মত চমৎকার সব আলোর বর্ণচ্ছটা তৈরি হবে। তবে সেটা আমাদের জন্য মোটেও সুখকর কোন সংবাদ হবে না। এই রকম শক্তিশালী প্রদর্শনির ক্ষমতা থাকলে সেটা ম্যাগনেটস্ফিয়ার স্তরকে ছিন্নবিছিন্ন করে দেবে। আর ম্যাগনেটস্ফিয়ার হলো আমাদের বায়ুমন্ডলে অনেক উঁচুতে অবস্হিত একটা স্তর যেটা আমাদেরকে সুর্য্যের ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মি সহ বিভিন্ন ধরনের মহাজাগতিক রশ্মির আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। ম্যাগনেটস্ফিয়ার স্তর ছাড়া কেউ যদি সূর্য্যের আলোর নীচে দাড়ায় তবে মূহুর্তেই সে পুড়ে যাওয়া পিৎজার চেহারা ধারন করবে।

কিন্তু যে কারণে আমরা মোটামুটি নিশ্চিত যে আমাদের গ্যালাক্সিতে এ ধরণের কিছ ঘটবে না সেটা হলো প্রথমতঃ একটা বিশেষ ধরণের নক্ষত্র হলেই শুধুমাত্র বিস্ফোরিত হওয়া সম্ভব। এরকম একটা নক্ষত্রকে হতে হবে সূর্য্যের চেয়ে কমপক্ষে ১০ অথবা ২০ গুন বড় এবং সেটাকে কমপক্ষে আমাদের থেকে ৫০০ আলোকবর্ষের চেয়ে কম দুরত্ব্বের মধ্যে তাকতে হবে। খুশির খবর হলো অতবড় নক্ষত্র আমাদের কাছে ধারে কোথাও নেই। সৌভাগ্যক্রমে মহাবিশ্বটা বিশাল বড়। আমাদের সবচাইতে কাছের সম্ভাব্য প্রার্থী নক্ষত্র হলো বিটেলগিজ, যার বিভিন্ন ধরণের অনিয়মিত কার্যকলাপ থেকে বোঝা যায় যে কিছু একটা ঘটতে পারে সেখানে। কিন্তু বিটেলগিজ আমাদের থেকে ৫০ হাজার আলোকবর্ষ দুরে অবস্হিত।

লিপিবদ্ধ সময়ের ইতিহাস থেকে দেখা যায় মাত্র অর্ধ-ডজনবার এমন সুপার নোভা ঘটেছিলো যেটা খালি চোখে দৃশ্যমান ছিলো। ১০৫৪ সালে ঘটেছিলো এরকম একটা বিস্ফোরণ যেটা থেকে সৃষ্টি হয়েছিলো ক্রাব নেবুলার। সবশেষ সুপার নোভা, যেটা শুধুমাত্র দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে দেখা গিয়েছিলো, ঘটেছিলো ১৯৮৭ সালে। কিন্তু সেটাও ছিলো ১৬৯০০০ আলোকবর্ষ দূরে।



চলবে .....................আগামী পর্বে সমাপ্য




সূত্র: এ শর্ট হিস্ট্রি অব নিয়ারললি এভরিথিং -- বিল ব্রাইসন

 

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১১:৩৯ | বিষয়বস্তুর স্বত্ত্বাধীকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ২৮ শে মার্চ, ২০০৯ সকাল ১১:১২
অনুরনন বলেছেন: সুপারনোভা'কে কি তাহলে নক্ষত্রের মৃত্যু বলা যায়?

পড়ে ভালো লাগলো।
২৮ শে মার্চ, ২০০৯ সকাল ১১:১৮

লেখক বলেছেন: হ্যা.... আর সেই নক্ষত্রের মুল কোরটা নিয়ে তৈরি হতে পারে ব্লাক হোল বা কৃষ্ন গহবরের।

২. ২৮ শে মার্চ, ২০০৯ সকাল ১১:২৭
শান্তির দেবদূত বলেছেন: ভালো লাগলো ......

আচ্ছা, আগে থেকে পর্যবেক্ষণ করে কি বলা সম্ভব, যে এই নক্ষত্রটা সুপার নোভার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে .....আনুমানিক এতবছর পর এটার বিষ্ফোরন ঘটবে ?
২৯ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ২:৫৬

লেখক বলেছেন: সম্ভব। একটা নক্ষত্রের কার্যকলাপের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রটা কখন এবং কিভাবে বিস্ফোরিত হবে সে সম্পর্কে আইডিয়া করতে পারেন। আর এ কাজে বিজ্ঞানীরা গাণিতিক মডেলের সাহায্য নিয়ে থাকেন।

৩. ৩১ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ১২:৩২
প্রায়াপাস বলেছেন: লেখার জন্য সাধুবাদ।
আমি ভাবছিলাম বিজ্ঞানের সাথে এই সম্পৃক্ততার ফলস্বরূপ পাদ্রি সাহেবের ঈশ্বরবিশ্বাস কোনভাবে ব্যহত হয়েছিল কিনা।
তারাদের মৃত্যু নিয়ে একটা আলাদা লেখা চাই।
৩১ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ১:০৯

লেখক বলেছেন: আমি যতদূর জানি হয়নি।

একটা মজার বিষয় লক্ষনীয় যে, অসংখ্য খ্রীস্টান পাদ্রী আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানের উন্নতিতে প্রভূত অবদান রেখেছেন। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, ডারউইন, মেন্ডেল, ইভান্স এবং আরও অনেকের নাম। এটা খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাসের সাথে কোনভাবে সম্পর্কযুক্ত কিনা সেটা ভেবে দেখবার বিষয়।

৪. ৩১ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ২:৩৯
প্রায়াপাস বলেছেন: গুগল ঘেটে পাদ্রি সাহেবের সাথে মাইকেল সোয়ার্যের একটা ইন্টারভ্যু পেলাম, মজা লাগল পড়ে।
ডারউইনের মত পাদ্রি ঘরে ঘরে জন্মাক।
৩১ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ২:৫০

লেখক বলেছেন: ইন্টারভ্যুটা আমরাও পড়তে চাই। লিঙ্কটা দাও।

৩১ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ৩:১৫

লেখক বলেছেন: থ্যাঙ্কু। প্রিন্ট করলাম এখন ট্রেনে বাসায় যাওয়ার পথে পড়ব।

 

মোট সময় লেগেছে ১.০০৫১ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
"..... The universe is governed by scientific laws. These laws must hold without exceptions, or they wouldn't be laws. That...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ