বেশ কিছুদিন ধরে ব্যপারটা মাথায় ঘুরছে। আমাদের জাতীয়তা আসলে কোনটা বাংলাদেশী না বাঙ্গালী?
আসলে, জাতিতে আমরা বাঙ্গালী। আমাদের আচার আচরণ চিন্তা চেতনা সবকিছুতেই ১০০ ভাগ বাঙ্গালিয়ানা রয়েছে। তবু দুঃখজনক ভাবে জাতীয়তার জায়গায় আমাদের বাংলাদেশী লিখতে হয়। বাংলাদেশী বলে কী আসলে কোন জাত আছে?
একটা দেশের জন্ম হয়েছে। এখানে জাতিসত্ত্বার উন্নতি হওয়ার কথা ছিল। হয়েছে তার বিপরীতটা। বাঙ্গালী একটা দেশ পেয়েছে ঠিকই কিন্তু হারিয়েছে তার জাতীয় পরিচয়। বাঙ্গালী জাতটার জন্মের কোন ঠিক দিনক্ষণ নেই। খ্রীষ্টপূর্ব কাল থেকেই আমরা আমাদের পুর্বপুরুষদের হদিস পাই। আরও যেটা পাই সেটা হলো, আমাদের শতবর্ষের একটা বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাস আমাদেরকে সময় সময় মুগ্ধ করে দেয়। আমাদের চিন্তা চেতনাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে।
আমরা মাছে ভাতে বাঙ্গালী। আমাদের দেহ গড়া আলস্য আর তন্দ্রা দিয়ে। আমাদের চোখের নিচে চিরকালই অশান্তির দাগ। সেই কবে যেন চালের সের ছিল ২ আনা। ইবনে বতুতা এসে লিখেছিলেন। কিন্তু তবুও আমরা গরীব ছিলাম। আমরা চিরকালই চাষার জাত। চাষ করে আজ এতটা পথ পারি দেওয়া। আমাদের এখনও সেই অভ্যাসগুলো যায়নি। আমরা যুদ্ধপ্রিয় নই শান্তিপ্রিয়। তাই ইতিহাসের অধিকটা সময় আমরা স্বাধীন একটা প্রদেশ বা কখনও স্বাধীন রাজ্য ছিলাম। কিন্তু সর্বোপরি আমরা বাঙ্গালী। স্পর্ধার আগুনে আমাদের দেহ গড়া। যদিও সেই পুরোনো কালের পুরোহিতের মত মস্তভূড়ি প্রায়শই বয়সকালে আমদের সামনে দিয়ে আগবাড়িয়ে চলে।
যাহোক, বাংলাদেশের জন্ম মানে বাঙ্গালীর একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুত্থান। আমরা আজ স্বাধীন। আমরা বাঙ্গালীরা স্বাধীন। আমাদের জাতীয়তা আমরা যাই লিখি না কেন, আমাদের মাছ আর ভাত খাওয়ার অভ্যাস বদলে যায়নি। সেটা ভারতবর্ষের বাঙ্গালীদের ক্ষেত্রেও একই আছে। তাদের থেকে আমাদের পার্থক্য তেমন একটা নেই। তবু একটা জটিল সীমারেখা টেনে আমরা আমাদের জাতিত্ত্বাকে প্রতারিত করি।
তেমনভাবে একজন ভারতীয় বাঙ্গালী যদি তার জাতীয়তা "ইন্ডিয়ান" লেখেন সেটাও তার জাতিসত্ত্বাকে প্রতারিত করা। আসল ভারতীয়দের থেকে আমদের একটা বিশাল দূরত্ব আছে। সেটা ভুলে যেতে হয় ভারতীয় বাঙ্গালীদের, তবু তারা ভিন্ন। এখনও বাঙ্গালিয়ানা ফুটে ওঠে ওদের নানা আচার আচরণ আর অনুষ্ঠানে। যেটা ভারতীয়দের থেকে অনেক ভিন্ন। এবং অনেক শৈল্পিক।
ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে আমরা ভুলে গেছি আসল রোমান কারা। ইতালিয়ান বলে কোন জাতি কোনকালেই ছিল না। ছিল রোমান জাতি। ইতালি দেশ হতে পারে, কিন্তু রোমানরা বদলে যায়নি। সব থেকে ভালো অবস্থানে আছে গ্রীস। যাদের জাতিসত্ত্বাকে কখনও প্রতারিত করতে হয়না। কারণ গ্রীসের নাগরিকরা গ্রীক নামেই পরিচিত।
এরকম ছোট্ট উদাহরণ আরও টানা যায়। ইংল্যান্ডের অধিবাসীরা আজও ইংলিশ নামে পরিচিত। এটা তাদের দেশ। এবং তাদের জাতিসত্ত্বা দেশের পরিচিত বহন করছে। তেমনই একটি দেশ হলো ফ্রান্স। আরবদের দেশ সৌদি-আরব, তাদের জাতীয়তা আরাবিয়ান। তেমনি আরব-আমিরাতের লোকজন। কিন্তু কুয়েতী আবার কী জিনিস? কুয়েতী বলে কোন জাতি কোনকালে ছিলনা। যা আছে তা হলো আরব জাতি।
আমেরিকান বলে যে জাত আছে তারা হলো জংলী, রেড ইন্ডিয়ান। আমেরিকান বলে আজ যারা নিজেদের দাবী করছেন তারা নানা জাতির সংমিশ্রণ। তাদের শেকড় নেই। তারা একরকমের আগাছা। অন্যের জাতিসত্ত্বাকে ধ্বংস করে নিজেদের নতুন আইডেন্টিটি বানিয়েছে তথাকথিত আমেরিকানরা।
লিবিয়ানরা যাই বলুকনা কেন তারা আরবী, তারা আফ্রিকান নয়। তেমনি মীশরিয়দের দেশ মিশর। তারা মিশরীয়, তারা আরবী নয়। আরবীদের থেকে তাদের জাতিসরত্ত্বার অনেক অমিল আছে।
যখনই আমি বলছি আমি বাংলাদেশী তখনই আমি হারিয়ে ফেলছি রবীন্দ্রনাথকে, নজরুলকে, হারাচ্ছি জীবনান্দ দাশকে, প্রমত চৌধুরীকে, হারাচ্ছি শরৎচন্দ্রকে। তারা কেউই বাংলাদেশী ছিলেন না। তারা বাঙ্গালী।
আমার দেশের সংস্কৃতি ঐতিহ্য নিয়ে আমার জাতিসত্ত্বা নিয়ে আমি সব জাতি থেকে ভিন্ন। আমি বাঙ্গালী।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



