আমার প্রিয় পোস্ট

প্রদীপ জ্বলা রাত!

১৮ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১:১৮

শেয়ারঃ
0 0 0

তখন মাঝরাত। এইগ্রামটি একেবারেই অন্ধকার। কোন বাতির ব্যবস্থা নেই। অজপাড়াগাঁ। এইখানে বেড়াতে এসেছে নবদম্পতি। অলোক ও তার স্ত্রী পূর্ণা। দুজনের সুখের সংসার।

রাত্রের দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেছে পূর্ণার। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে টের পেল পাশে অলোক নেই। অলোক তখন দখিনের খোলা বারান্দায় বসে। একটা মোমবাতি জ্বেলে আকাশের দিকে চোখ। পূর্ণার কেমন যেন কৌতুহল জাগে। অলোককে এখনও পুরোপুরি চিনতে পারেনি পূর্ণা। তাই ওকে ঘিরে কৌতূহল কমে না কিছুতেই।

অলোকের পাশে এসে পূর্ণা বারান্দার মাটিতে বসে পড়ে। "কি হল"?
অলোক বলে, "মা কে মনে পড়ছে।" এমন সময় মোমবাতিটি শীতের ঠান্ডা বাতাসে নিভে গেল। অলোককে রাতের আলোয় তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। পূর্ণা বলে, তোমার মায়ের কথা বলো শুনি, আমার ঘুম আসছে না।

অলোক পূর্ণার দিকে তাকায়। তারপরে একটা দীর্ঘশ্বাস। বলে যায় অলোক তার স্মৃতিকথাগুলো।

আমার বয়স তখন কম। সবে মাত্র পড়ছি ইন্টারমিডিয়েট। আমি বাবা আর মা। খুব সুখের পরিবার আমাদের। এক কথায় কোন অভাব নেই, কোন কিছুরই কমতি নেই। বাবা মায়ের ভালোবাসায় একাত্ত আমাদের পরিবার। একদিন কলেজ থেকে ঘরে ফিরে দেখি মা দরজা খুলছেন না। অনেকবার ডাকাডাকি করলাম, দরজা ধাক্কালাম। কোন লাভ হয় না। এদিকে টেনশনে দর দর করে ঘামছি। বাবাকে ফোন করা হলো। বাবাও এলেন। এর পরে দু'জনে মিলে দরজার ব্যবস্থা করলাম। খুলে দেখি মা রান্না ঘরের সামনে পরে আছেন। মার কোন হুশ নেই।

সাথে সাথে নেওয়া হলো হাসপাতালে। সেদিন কোন কারণে যেন আমাদের বাসার ছুটা বুয়াটাও আসে নাই। বিপদের উপর বিপদ। হাসপাতালে নেবার পর মা'র জ্ঞান আসে। মা ভালো হয়ে যান। ডাক্তার বলেন কিছু না। হিট স্ট্রোক। বাসায় গিয়ে রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। টেস্ট করাতে দেন কিছু। কিন্তু না করলেও সমস্যা নেই।

আমরা আর টেস্ট করালাম না। বাসায় নিয়ে মা'কে সেবা যত্ন করলাম আমি আর বাবা। বললামই তো বাবার ছিল মার প্রতি অন্ধ ভালোবাসা। সারাটারাত মায়ের হাত পা টিপে দিলেন।

কে জানত? সেদিনই আমার মায়ের মৃত্যুর পথে প্রথম পা। মা'কে মনে পরে, গ্রামের বাড়িতে তখন প্রায়ই আসা হত। মা ছোট্ট মেয়েটির মত উঠানে লাফিয়ে কাজ করত। আর বাবার সাথে ছলনা, মিথ্যে রাগ...

অজ্ঞান হওয়ার ঘটনার পর থেকে মা'কে দেখতাম ধীরে ধীরে চলতে। কতবার জিজ্ঞেস করেছি মা, তুমি ভালো আছো তো?
মা হাসেন, অনেক ভালো আছি রে...তোর বাবা খামাখাই টেনসন করে।
আসলেই বাবার ভালোবাসায় মা অনেক সুখী। আমি যথারীতি পড়াশোনা করছি মন দিয়ে।

দুমাস পর মা'র আবার একই ঘটনা ঘটল। আবার হাসপাতাল। আবার সেই ডাক্তার। আমার ব্যাপারটা ভালো লাগলো না। যদিও ডাক্তারের ভাষ্যে কিছুই হয়নি মার। এদিকে মা দিনে রাতে খাওয়া দাওয়ায় অনিয়ম করত। বাবা সেটা আমাকে বহুবার বললেও কর্ণপাত করিনি।

পরের বার যখন মা'কে ঘরে নিয়ে আসলাম দেখি মা আরও দুর্বল। তার চোখগুলো ডেবে গেছে। অথচ মুখের হাসিটা সেইদিনের মতই। বাবা বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা হলো। জানলাম মায়ের কিছুই হয়নি।

বাবা আমার ছোট খালাকে ঘরে নিয়ে আসলেন। মা'কে দেখাশোনার জন্য। আমার মা তখন অন্য এক মানুষ। বিছানায় শুয়ে থাকে। মাঝে সাঝে উঠে। খাবার সময় মা'কে পাই। অনেক ব্যস্ততার মধ্যে ছিলাম তখন। একদিন রাতের বেলায় বাবা আর আমি খেতে বসেছি। তখন খালা মা'কে ধরে ধরে খাবার টেবিলে নিয়ে এলেন। আমি মা'কে দেখে চিৎকার করে উঠলাম, মা তোমার কি হয়েছে? তোমার এ কি হাল?

বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছি। চোখদিয়ে গড়গড়িয়ে পানি পড়ছে। মা'কে জড়িয়ে ধরলাম, মা বলো তোমার কি হয়েছে?
মা কষ্টে হাসেন। কিচ্ছু হয়নি। আমি ভালো আছি। ঐসব ওষুধ খেতে খেতে দুর্বল হয়ে যাচ্ছি।
বিশ্বাস হলো না। বাবা মায়ের দিকে নিস্তেজভাবে তাকিয়ে আছেন। যেন তিনিও তার বহু পরিচিত মানুষটিকে চিনতে পারছেন না।

আমি বাবার কাছে গিয়ে বললাম, বাবা মা'র কি হয়েছে বল। বাবা বলেন কিছু না। আমি বিশ্বাস করি না। আমি বার বার জিজ্ঞেস করি। পড়াশোনা গোল্লায় যাক, আমি দিনরাত মা'র সাথে থাকব, এই প্রতিজ্ঞা করি বাবার সামনে।

তখন বাবা কেঁদে ফেলেন। তোর মা'র সাথে থেকে লাভ নেই রে...। আমার চোখ বিস্ফারিত, নিশ্বাস নিস্তেজ, বাবা? কী হয়েছে?
জানতে পারলাম মা'র ব্রেস্ট ক্যানসার। লাস্ট স্টেজ। কিছু করার নেই। আচ্ছা বলো পূর্ণা জীবনের সব থেকে প্রিয় মানুষটা বলে মরে যাবে? আমার সামনে? আমি কিছু করতে পারব না? মা'কে জড়িয়ে ধরি, মা'র সাথে করি রাজ্যের গল্প। মা শুয়ে শুয়ে হাসেন। গল্প বলেন। কিন্তু মা' খেতে আসেন না টেবিলে, আমি খেতে পারি না, আমার ভাত মুখে উঠে না...আমার মা মরে যাবে? বল এও কি মেনে নেওয়া যায়?

মা ধুকতে থাকলেন। দিনের পর দিন, রাতের পর...আর ঐসব অসহ্য ওষুধ মা'কে দিনে দিনে দুর্বল করে দিল। মায়ের মাথার চুলগুলো সব পড়ে গেল। তবুও আমার মা...আমি অলোকের গলায় ভার হয়ে আসে। নিজেকে সামলে নেয় ও...কথা আটকে গেছে...কোথায় যেন একটা শূন্যতা। পূর্ণার চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল পরে, মিষ্টি চাঁদের আলোয় জ্বলে ওঠে গাল বেয়ে পড়া জলের ধারা...

তারপর...মা'কে কতবার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। প্রিয় মানুষটাকে জড়িয়ে ধরার উপায় নেই, হাতে সেলাইন, মুখে মাস্ক...প্রত্যেকবার মনে হয় এইবার হাসপাতাল থেকে বুঝি মা'কে নিয়ে ফিরে যাওয়া হবে না।

বলো একটা মানুষ জানে যে সে মরে যাবে...অথচ কেমন করে সে বেঁচে থাকে? প্রতিটা দিন মৃত্যুর কাছে একটু একটু করে যাওয়া। প্রতিটা মুহুর্ত জানতে চাওয়া...আর কতক্ষণ। ঘড়ির কাটাটা যদি ধরে রাখা যেত...যায়নি। কেউ পারে না। আমরাও পারিনি।

রক্ত দিতে দিতে মায়ের ভেইন খুজে পাওয়া দায়। কোথায় সুই ঢুকাবে ডাক্তার? সব ভেইন শুকিয়ে গেছে। আমার মায়ের হাত একটা শুকনো হাড় ছাড়া কিছুই না।

আমি তখন স্বপ্ন দেখতাম। মা ভালো হয়ে গেছে। আবার সেই বড় বড় চুল নেড়ে নেড়ে গ্রামের বারান্দায় কাজ করছে। বাবার সাথে কথা বলছে। হাসছে খিল খিল করে...ঘুম ভেঙ্গে ওহ! কি কঠিন বাস্তবতা। আমার মা আমার পাশে একটা হাড় সর্বস্ব মানুষ...অথচ বোধ আছে। হ্যা বোধ আছে প্রতিটি মুহুর্তে আমার খবর নিচ্ছেন...কি করবে! মায়ের মন। মা তো মায়ই...নিজের কথাটা নিজের কষ্টটা কোনদিনও মুখ ফুটে বলেন নাই। পাছে বাবা আর আমি মানসিক বল হারিয়ে ফেলি।

মা'কে বলি, তোমাকে আমি সেই পাহাড়ের কাছে নিয়ে যাব যেখান থেকে একবার তুমি চিৎকার করে আমার নাম ধরে ডেকেছিলে। মনে আছে? আবার আমাকে ডাকবে ওভাবে...বল ডাকবে না?

মার চোখে পাহাড়ের আঁকাবাকা পথ। চোখের কোণে পানি টলটল করছে। হাত তখন নিস্তেজ চোখের জলটাও মুছতে পারেন না। আমি মুছে দেই। কি অদ্ভুত আমার চোখে কোন জল নেই। আমি একেবারেই কঠিন মানুষ।

সেদিন আকাশে কালো করে মেঘ করেছে। আমি টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ফিরেই মা'র কাছে যাই। মা অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন, বাবা খেয়েছিস...বলি হ্যা মা। অথচ মুখে কিছু দিতে পারি নাই। মা'র হাত ধরে গল্প বলি। মা'কে আমি পাহাড় দেখাব, সমুদ্র দেখাব। বলতে বলতে অনুভব করি মায়ের হাত শক্ত হয়ে গেছে। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে মায়ের শরীর।

চিৎকার করে ডাকি, খালা, বাবা...মামা সবাই এসে পরে। আমি মা'কে জড়িয়ে ধরে আমার চোখের জল ফেলছি। সেদিন যে এত পানি কোথা থেকে এসে জমেছিল আমার চোখে! বলতে পারব না। আমার চোখের পানিতে ভিজে গেছে বিছানার অর্ধেকটা।

মা'কে যখন উঠিয়ে খাটিয়ায় রাখে, চিৎকার করে বলছিলাম, বাবা ওরা মা'কে এভাবে ধরছে কেন? মা ব্যাথা পাবে। বাবা তখন অন্যখানে। নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। কোন কথা নেই। মা কত ব্যাথা পেয়েছেন? জানতে পারিনি। মা'কে মনে পরে খুব।

এমন সময় পূর্ণার পাশে রাখা মোমবাতি জ্বলে উঠে বাতাসের তোরে। অলোক সেটার দিকে তাকিয়ে বলে, মা এসেছে। মা আজকে আসবে জানতাম তাই তো বাইরে বসেছি। শুধু একটাই দুঃখ, মা'কে জড়িয়ে ধরা হয়না। মা'কে পেলে কত অভিযোগ করতাম জানো? করা হয় না। ওসব অভিযোগ শুধু মায়ের কাছেই চলে, আর কারও কাছে না।

পূর্ণা তখন চোখের পানিতে ভিজে একাকার। অলোককে একবার জড়িয়ে ধরতে খুব ইচ্ছে হয়। কিন্তু পারেনা। অলোক কেমন কঠিন হয়ে আছে।

বিঃদ্রঃ ব্রেস্ট ক্যানসার! একটি মরণ ব্যাধি। প্রতিবছর হাজার হাজার ছেলে তার মা'কে হারায়। স্বামী হারায় তার স্ত্রী। অথবা মা তার মেয়েকে। একটু সচেতন হলেই আমরা পারি এ রোগ প্রতিরোধ করতে। ব্রেস্ট ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এর চিকীৎসা আছে। শুধু সমস্যা হলো আমরা সময়মত মেডিক্যাল টেস্ট করিনা।

আমার আশেপাশের একটা ঘটনা অবলীলায় গল্পের আকারে বলার চেষ্টা করেছি। আসুন আমরা সচেতন হই!

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): ছোটগল্প! ;
প্রকাশ করা হয়েছে: ছেড়া কাগজ  বিভাগে । বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৮ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১:৩৭
সবাক বলেছেন:
গুডপোস্ট।

শুভেচ্ছা ইমরোজ :)
২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ৯:৫২

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ সবাক ভাই। অনেক শুভকামনা আপনাকে!

২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ৯:৫২

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ!

২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ৯:৫২

লেখক বলেছেন: থ্যাঙ্কু!

২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ৯:৫৩

লেখক বলেছেন: অনেকদিন পর আপনার মন্তব্য পেলাম। কেমন আছেন?

৫. ১৮ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ২:৫৭
কঁাকন বলেছেন: ভালো লিখা তবে আপনি এরচেয়ে অনেক বেশি ভালো লিখতে পারেন

কেমন আছেন?
২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ৯:৫৩

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ কাঁকন।

এইতো আছি। চলে যাচ্ছে একরকম!

৬. ১৮ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৩:০৪
ভেবে ভেবে বলি বলেছেন: আপনার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ৯:৫৪

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে!

২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ৯:৫৪

লেখক বলেছেন: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ!

৮. ২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ৯:৫৪
ভাঙ্গন বলেছেন: আপনাকে স্যালুট,
দারুন বিষয় তুলে আনার জন্য।
২০ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ৯:৫৪

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ ভাই!

ভালো থাকুন!

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৪৬৪ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আমার আমি।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ