চট্টগ্রামে গতকাল বুধবার হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে সাত পুলিশসহ ৩০ জন আহত হয়েছে। এ ঘটনায় ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুপুরে নগরের অক্সিজেন মোড়ের কাছে বালুছড়ায় সংঘর্ষের পর সংগঠনের কর্মীরা হাটহাজারীতে সড়ক অবরোধ ও প্রায় ৫০টি যানবাহন ভাঙচুর করেন। অবরোধের কারণে প্রায় আট ঘণ্টা চট্টগ্রামের সঙ্গে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, নাজিরহাট, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকে। রাত নয়টার দিকে ছাত্ররা মাদ্রাসা হোস্টেলে ফিরে গেলে আবার যান চলাচল শুরু হয়।
এদিকে সন্ধ্যায় হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ডের কাছে এক পুলিশ কনস্টেবলের ওপর হামলা করে অবরোধকারীরা একটি রাইফেল ছিনিয়ে নেয়। পুলিশ জানায়, রাত ১২টা পর্যন্ত পুলিশ খোয়া যাওয়া অস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি।
জানা যায়, নবগঠিত হেফাজতে ইসলাম গতকাল বিকেলে লালদীঘি মাঠে সমাবেশ আহ্বান করেছিল। হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসাসহ (বড় মাদ্রাসা) বিভিন্ন মাদ্রাসার কয়েক হাজার শিক্ষক-ছাত্র সমাবেশে যোগ দিতে নগরে যাচ্ছিল। পথে বালুছড়ায় পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং একপর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়।
জানা যায়, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রসহ সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং শিক্ষানীতি বাতিলসহ বিভিন্ন দাবিতে ওই সমাবেশ আহ্বান করা হয়। গত মঙ্গলবার রাত থেকে লালদীঘি মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজও শুরু হয়। তবে সমাবেশের জন্য মহানগর পুলিশের অনুমোদন না নেওয়ার অভিযোগে পুলিশ সকালে মঞ্চের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। সমাবেশে নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকার প্রায় ২৭টি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আনার পরিকল্পনা ছিল। হেফাজতে ইসলামের সভাপতি হলেন হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা আল্লামা আহমেদ শফি বা বড় হুজুর। তবে সংগঠনটি গড়ার নেপথ্যে ছিলেন ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের নেতা মুফতি ইজহারুল ইসলাম। পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সম্প্রতি পুলিশ ইজহারের বড় ছেলে মুফতি হারুনকে গ্রেপ্তার করে। এদিকে সমাবেশে সভাপতিত্ব করা ও আগে বক্তব্য দেওয়া নিয়ে সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কোন্দল দেখা দিলে পটিয়ার মাদ্রাসাসহ কয়েকটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সমাবেশে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান।
পুলিশ ও অন্যান্য সূত্র জানায়, সমাবেশে যোগ দিতে দুপুর দেড়টার দিকে বড় মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্রদের একটি বড় অংশ বাস-মাইক্রোবাসে করে রওনা হন। এ বহরের শুরুতে থাকা একটি মাইক্রোবাসে ছিলেন আল্লামা আহমেদ শফি। ৪০টি বাস ও ২০-২৫টি মাইক্রোবাসের এ বহরটি বালুছড়ায় পৌঁছালে পুলিশ বাধা দেয়। বাধা পেয়ে শিক্ষক-ছাত্ররা সড়কে জড়ো হন। একপর্যায়ে সেখানে একটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। হেফাজতে ইসলামের এক সমর্থকের গায়ে বোমাটি পড়লে তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং বায়েজিদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস সবুর পায়ে আঘাত পান। এর পরপরই পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা করে এবং কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে। তারাও পুলিশের প্রতি ইটপাটকেল ছোড়ে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ শুরু হলে বড় হুজুর মাইক্রোবাসে করে মাদ্রাসায় ফিরে যান। রাবার বুলেট ও লাঠিপেটায় হেফাজত ইসলামের কমপক্ষে ১৬ জন আহত হন। সংঘর্ষে বায়েজিদ থানার ওসি ছাড়াও গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আবু জাফর মো. ওমর ফারুক ও চার পুলিশ সদস্য আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, একপর্যায়ে পুলিশের ধাওয়ায় হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা আশপাশের বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে পড়েন। পুলিশ ওসব বাড়ি ঘেরাও করলে অনেকে ফসলি জমি ও অলিগলি দিয়ে পালিয়ে যান। পরে পুলিশ বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে পড়া ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করে।
পিছু হটে মাদ্রাসাছাত্ররা ফতেয়াবাদ মাঠে সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশ করেন এবং পরে হাটহাজারীর দিকে চলে যান। তাঁরা হাটহাজারীতে ফিরে চট্টগ্রাম-নাজিরহাট ও চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক অবরোধ করেন। যানবাহনও ভাঙচুর করা হয়। আহতদের মধ্যে রাবার বুলেটবিদ্ধ আটজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এঁদের মধ্যে সাতজনের নাম জানা গেছে। তাঁরা হলেন শাহ হোসাইন (২৫), সাইদুল ইসলাম (২৫), মোহাম্মদ শামীম (১৮), আশরাফ আলী (২৫), দিদারুল আলম (৩৩), নাসির উদ্দিন (২৫) ও শরিফুল ইসলাম (২৫)। কর্তব্যরত চিকিত্সকেরা জানান, আহত ব্যক্তিরা আশঙ্কামুক্ত। এ ছাড়া মো. দিদার (৩৫), শরীফ উদ্দিন (২৪), আবদুল্লাহ (৩০), মোহাম্মদউল্লাহ (১৮), সাইফুল্লাহ (২৬) ও গিয়াসউদ্দিনসহ আটজন হাটহাজারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রাথমিক চিকিত্সা নেন।
বায়েজিদ থানার ওসি আবদুস সবুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তাঁদের (হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের) ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করি। হঠাত্ পুলিশকে লক্ষ্য করে তাঁরা একটি হাতবোমা ছুড়ে মারেন।’
যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে: জানা যায়, সংঘর্ষের পর পুলিশ যাঁদের গ্রেপ্তার করে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আলী রাজু, মফিজুর রহমান, জাকারিয়া, মাহমুদ, হাসান, সাইফুল ইসলাম, নুর মোহাম্মদ, খোরশেদ আলম, আবুল কালাম, মো. সাব্বির, জোবায়ের আহমদ, শামসুল হুদা, কামরুজ্জামান, সোহেল, জাফর সাদেক, মোশাররফ, আলী বিন মুবারক, শফিক, আবদুল আজিজ, সেকান্দর বাদশা, ইয়ামিন, জুনায়েদ, নাসির, মোজাফফর, সেলিম, নাছির।
সংবাদ সম্মেলন: হেফাজতে ইসলাম বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নগরের সিএমইউজে কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে হাটহাজারী, নাজিরহাট ও রাঙামাটি সড়কে অবরোধের ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি কাল শুক্রবার দোয়া মাহফিল ও ১৩ মার্চ ঢাকার পল্টনে মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া শনিবার পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের প্রচার সচিব আজিজুল হক ইসলামী, সদস্য ফজলুল করিম জিহাদী ও ইলিয়াস ওসমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, তাঁদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলি, টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটায় ৩০ জনের বেশি আহত হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ৫০ জন কর্মীকে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা পুলিশের কাছে সমাবেশের জন্য অনুমতি চেয়েছিলাম। কিন্তু অনুমতি দেয়নি। তবে আমরা মাঠ ব্যবহারের অনুমতি নিয়েছি।’
স্থানীয় ও অন্যান্য সূত্র জানায়, পুলিশি হামলার প্রতিবাদে বিকেল পাঁচটায় হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ডে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। সমাবেশ শেষে মাদ্রাসাছাত্ররা লাঠিসোঁটা নিয়ে বিক্ষোভ করে। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে পুলিশ মাদ্রাসার উত্তর গেটে ছাত্রদের ধাওয়া করলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় দুই ছাত্র আহত হয়। এরপর ছাত্ররা সড়কে অবস্থান নেন।
বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে অবরোধকারীরা রাঙামাটি জেলা পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে হামলা চালায়। এর আগে তাদের ইটপাটকেল নিক্ষেপে কনস্টেবল আনোয়ার হোসেন গুরুতর আহত হন। তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. জেড এ মোরশেদ আলোচনার জন্য হাটহাজারী গেলে সেখানে নেতা-কর্মীরা তাঁর গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করেন। পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) মো. বাবুল আক্তার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার আমেনা বেগম বলেন, ‘মাদ্রাসার কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর বিক্ষোভের মুখে শখানেক পুলিশ অসহায় হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের শান্ত করি। রাত নয়টার মধ্যে ছাত্ররা মাদ্রাসার হোস্টেলে চলে গেছে।’ তিনি বলেন, পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্রটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



