গোলাম আযম
মা বাবার পরিচয় :-
গোলাম আযমের পিতার নাম মাওলানা গোলাম কবির। মাতার নাম সাইয়েদা আশরাফুন্নিসা।
জন্ম:-
গোলাম আযম ১৯২২ সালের ৭ নভেম্বর (বাংলা ১৩২৯ সালের ৫ই অগ্রহায়ন) ঢাকা শহরের লক্ষ্মীবাজারস্থ শাহ সাহেব বাড়িতে(তাঁর মাতুলালয়ে) জন্মগ্রহণ করেন।
শৈশব
শিক্ষা
১৯৩৭ সালে জুনিয়র মাদ্রাসা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এস. এস. সি. পরীক্ষায় মেধা তালিকায় গোলাম আযম ত্রয়োদশ স্থান লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে ইসলামিক ইন্টারভিউ কলেজ থেকে আই এ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে ঢাকা বোর্ডে দশম স্থান অধিকার করেন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের কাজে জড়িয়ে পড়ায় গোলাম আযম পরীক্ষা দিতে পারেননি এবং ১৯৪৯ সালে দাঙ্গাজনিত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে তিনি ১৯৫০ সালে এম. এ. পরীক্ষা দেন এবং দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।
রাজনীতিতে প্রবেশ
জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান
১৯৫৪ সালের এপ্রিলে জামায়াতে ইসলামীতে সহযোগী (মুত্তাফিক) হিসেবে যোগদান করার পর ১৯৫৫ সালে গ্রেফতার হয়ে রংপুর কারাগারে অবস্থানকালেই জামায়াতের রুকন হন। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে তিনি রাজশাহী বিভাগীয় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এর এক বছর পর তাঁকে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এবং রাজশাহী বিভাগীয় আমীরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৭ সালের অক্টোবর মাসে গোলাম আযমকে তদানীন্তন পূর্ব পাক জামায়াতের জেনারেল সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়। একাদিক্রমে এক যুগ তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে তাঁর উপর পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীরের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ভূমিকা
১৯৭১ সালে গোলাম আযম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁর দল জামায়াতে ইসলামীও একই মত ও পথ অনুসরণ করে।
২৫ শে মার্চ রাতে সংঘটিত অপারেশন সার্চলাইট এর ছয় দিন পর গোলাম আযম ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে একটি ভাষণ দেন। এ ভাষণে তিনি ভারতের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, " ভারত সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী প্রেরণ করে কার্যত পূর্ব পাকিস্তানীদের দেশপ্রেমকে চ্যালেঞ্জ করেছে।...আমি বিশ্বাস করি যে, এই অনুপ্রবেশকারীরা পূর্ব পাকিস্তানী মুসলমানদের নিকট হেত কোন প্রকার সাহায্য পাবে না। সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম, ৭ এপ্রিল ১৯৭১।
গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধের শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধিতাই করেননি বরং তিনি এবং তাঁর দল জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য করতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ প্রভৃতি বাহিনী গড়ে তোলেন। এরা পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষে কাজ করে।
৩০শে জুন লাহোরে সাংবাদিকদের কাছে গোলাম আযম বলেন, "তাঁর দল পূর্ব পাকিস্তানে দুস্কৃতকারীদের(মুক্তিযোদ্ধা) তৎপরতা দমন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে এবং এ কারণেই দুস্কৃতকারীদের হাতে বহু জামায়াত কর্মী নিহত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার উদ্দেশ্য ঢাকায় শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। এর সদস্য ছিলেন পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বরা। গোলাম আযম ও এই কমিটির সদস্য ছিলেন।
১৯৭১ সালের ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংগ্রাম এ গোলাম আযমের পশ্চিম পাকিস্তান সফরকালের একটি সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বিবরণ দুই কিস্তিতে ছাপা হয়। এই সাক্ষাৎকারে তিনি মুক্তিবাহিনীর সাথে তার দলের সদস্যদের সংঘর্ষের বিভিন্ন বিবরণ ও পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থতির ওপর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন,
বিচ্ছিন্নতাবাদীরা জামায়াতকে মনে করতো পহেলা নম্বরের দুশমন। তারা তালিকা তৈরি করেছে এবং জামায়াতের লোকদের বেছে বেছে হত্যা করছে, তাদের বাড়িঘর লুট করছে জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। এতদসত্বেও জামায়াত কর্মীরা রাজাকারে ভর্তি হয়ে দেশের প্রতিরক্ষায় বাধ্য। কেননা তারা জানে 'বাংলা দেশে' ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কোন স্থান হতে পারে না। জামায়াত কর্মীরা শহীদ হতে পারে কিন্তু পরিবর্তিত হতে পারে না। (দৈনিক সংগ্রাম, ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১)
নাগরিকত্ব বাতিল
১৯৭৩ সালের ১৮ই এপ্রিল সরকারী এক আদেশে আরো ৩৮ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে গোলাম আযমকেও বাংলাদেশের নাগরিক হবার অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন
জিয়াউর রহমানের আনুকূল্যে গোলাম আযম পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে সাময়িক ভাবে বাংলাদেশে আসেন এবং কোন ভিসা ছাড়াই ১৯৭৮-১৯৯৪ পর্যন্ত বাস করেন। তিনি অলিখিত ভাবে বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনৈতিক দল যাদের অধিকাংশই ১৯৭১ সালে দেশ বিরোধী কাজে লিপ্ত ছিল তাদের আমীর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তার দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এক মাত্র দল যারা ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের প্রতি এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে যান না, যদিও বাংলা ভাষা দিবসকে জাতি সংঘ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দিয়েছে।
মতিউর রহমান নিজামী
মতিউর রহমান নিজামী (জন্ম ৩১ মার্চ ১৯৪৩) একজন বাংলাদেশী মৌলবাদী রাজনীতিবিদ। তিনি মৌলবাদী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের বর্তমান নেতা বা আমীর। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিজামী আল বদর নামের আধা-সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। পাকিস্তানী বাহিনীর হত্যাকাণ্ডে আল-বদর সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করে, এবং ১৪ই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে।
রাজনৈতিক কর্মকান্ড
মওলানা নিজামী ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে তার ছাত্ররাজনীতি শুরু করেন। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। পরপর তিন বছর তিনি পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রআন্দোলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন । এরপর দুইবার তিনি গোটা পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ।
মওলানা নিজামী ছাত্র জীবন শেষ করে বৃহৎ ইসলামী আন্দোলন জামায়াতে ইসলামী তে যোগদেন । ১৯৭৮-১৯৮২ তিনি ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩-১৯৮৮ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি । ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে সেক্রেটারী জেনার্যেল হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং আমীর নির্বচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত (২০০০সাল) দায়িত্ব পালন করেন ।
যুদ্ধাপরাধ
নিজামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয় ইসলামী ছাত্র সংঘের মাধ্যমে। এই দলটি বর্তমানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির হিসাবে পরিচিত। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিজামী পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তা দেয়ার জন্য আল বদর বাহিনী গঠন করেন। তিনি এই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।[১][২]
আল বদর বাহিনীর নেতা হিসাবে নিজামী সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরে অত্যাচারের ডাক দেন। ১৪ই নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে জামাতের মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকাতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে নিজামী ঘোষণা দেন, "It is our conviction that the day is not far off when, standing side by side with our armed forces, our youth will raise the victorious flag of Islam the world over by defeating the Hindu Army and finishing off Hindustan".[১][৩] বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী কাজকর্মের জন্য নিজামীকে মইত্যা রাজাকার নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।[৪].
নিজামীর নেতৃত্বে আল বদর বাহিনী বাঙালিদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হয়। ১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে আলবদর ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী সারা দেশে শত শত চিকিৎসক, শিক্ষক, লেখক, প্রকৌশলী, ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়, এবং সুপরিকল্পিত ভাবে তাদের হত্যা করে।
নিজামীর অপকীর্তি সম্পর্কে ১৯৭১ সালে পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য
দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় ১৩ এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে প্রকাশিত "ভারতীয় চক্রান্ত বরদাস্ত করব না" শিরোনামের খবরে শান্তি কমিটির মিছিলের ছবি সম্পর্কে বলা হয়,
"মিছিলের পুরোভাগে নেতৃত্বের মধ্যে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের জামাতে ইসলামী প্রধান অধ্যাপক গোলাম আযম, খান এ, সবুর, পীর মহসেন উদ্দীন ও ইসলামী ছাত্র সংঘের জনাব মতিউর রহমান নিজামী।"
গ্রেফতার
ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতিতে আঘাত করেছে, এমন অভিযোগে ২১ মার্চ, ২০১০ তারিখে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমির রফিকুল ইসলাম খান ও ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) ছাত্রশিবিরের সভাপতি আ স ম ইয়াহিয়ার নামে মামলা করেন। ২৯ জুন, ২০১০ তারিখে রমনা থানা পুলিশ প্রেসক্লাবের সামনে থেকে মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেপ্তার করে।
দেলোয়ার হোসেন সাঈদী
ঝাঁপ দাওদেলাওয়ার হোসেন সাঈদী বাংলাদেশের একজন মৌলবাদী রাজনৈতিক নেতা। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এর একজন শীর্ষ নেতা ও বর্তমানে দলটির মূল নীতিনির্ধারক গোষ্ঠীর (মজলিশ-এ-শুরা) সদস্য। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সাথে জোটবদ্ধ অবস্থায় নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদের একজন সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পক্ষাবলম্বন করেন এবং যুদ্ধাপরাধসহ বিভিন্ন দুষ্কর্মে জড়িত ছিলেন।
জন্ম
দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী জন্ম পিরোজপুরে।
রাজনৈতিক জীবন
দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্র শিবিরের সভাপতি ছিলেন।[১] পরবর্তিতে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নেতা হন এবং তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এর সাথে জোট গঠন করলে তিনি জাতীয় সংসদ এর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
যুদ্ধাপরাধ ও অন্যান্য অভিযোগ
• অভিযোগ রয়েছে যে দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী তৎকালীন সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার ফায়জুর রহমান কে হত্যার সাথে জড়িত ছিলেন।[২]
• ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত একটি গণ তদন্ত প্রতিবেদনে দাঈদী কে আল বদর বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাথে যুক্ত থাকার জন্য অভিযুক্ত করা হয়।[৩] মানিক পশারী নামে একজন ২০০৯ সালের ১২ই আগস্ট পিরোজপুরে সাঈদী সহ আরও চার জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। [৪] মানিক পশারী অভিযোগ করেন যে দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর নেতৃত্বে তাদের বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করা হয়েছিল এবং বাড়ির তত্বাবধায়ক কে হত্যা করা হয়েছিল।[৫]
• আরও একটি মামলা পিরোজপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তার নামে দায়ের করা হয়। এ মামলা দায়ের করেন মহিউদ্দীন আলম হাওলাদার নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা।[৬] [৭]
• দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী দাবী করেন আদালত ফতোয়া (ধর্মীয় অনুশাসন) নিয়ন্ত্রণ করবে না, বরং ফতোয়াই আদালতকে নিয়ন্ত্রণ করবে।[৮].
• তাবলীগি কর্মকান্ডের আড়ালে তিনি বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য প্রদান করেন।[৯].
• ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সাঈদীর ভূমিকার কথা লেখার কারনে তিনি বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার পিরোজপুরের স্থানীয় সাংবাদদাতাদের হুমকি দেন।[১০]
বিতর্কিত বিদেশ ভ্রমণ
২০০৬ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্যের যথাযথ কতৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদনের পর সাঈদী যুক্তরাজ্যে যান লন্ডন ও লুটনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখার জন্য। [১১] যদিও তার এই লন্ডন প্রবেশ ছিল বিতর্কিত। কিছু ফাঁস হওয়া ইমেইল নিয়ে দি টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখান থেকে জানা যায় যে একজন উপদেষ্টা, এরিক টেইলর বলেছেন, "যুক্তরাজ্যে সাঈদীর পূর্ববর্তী ভ্রমণেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে তার অনুসারীদের আক্রমণাত্নক আচরণের জন্য।" [১২]
২০০৯ সালের ২৪শে জুলাই হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা সাঈদীকে বিদেশ ভ্রমণে বাধা দেন। তার বিদেশ ভ্রমণের উপর সরকারের এই বিধিনিষেধ আরোপকে অস্বীকার করে সাঈদী হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন ফাইল করেন ২৭শে জুলাই। চেম্বার জজের সামনে এটর্নী জেনারেল বিধিনিষেধের সপক্ষে যুক্তি দেখান যে, ১৯৭১ সালে সাঈদী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন এবং সাঈদীকে যদি বিদেশ যেতে বাধা না দেওয়া হয় তাহলে তিনি যুদ্ধাপরাধীদেরকে আদালতে অভিযুক্ত করার সরকারের যে উদ্যোগ, এর বিরূদ্ধে বিদেশে প্রচারণা চালাতে পারেন। [১৩]
ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রচার
বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচার ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে বৃটিশ মিডিয়া যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সাঈদীর ভিসা বাতিলের জন্যে অনুরোধ জানায়। [১৪]
গ্রেফতার
"ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতিতে আঘাত করেছে" মর্মে অভিযোগে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ২১ মার্চ তারিখে দায়েরকৃত বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর মামলার প্রেক্ষিতে ঐ বছর ২৯ জুন তারিখে রাজধানীর শাহীনবাগের বাসা থেকে পুলিশ দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে গ্রেপ্তার করে।[১৫]
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান
মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বাংলাদেশের ধর্মনিবিত্তিক রাজনিতক দল জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি জামায়াতের মুখপত্র হিসাবে বিবেচিত খবরের কাগজ দৈনিক সংগ্রামের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক।
অভিযোগ রয়েছে যে, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় কামারুজ্জামান দখলদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পক্ষাবলম্বন করেন এবং সক্রিয়ভাবে মুক্তিকামী জনতাকে দমনের জন্যে পাকিস্তার সরকারের নির্দেশানুযায়ী আল বদর বাহিনী গঠনে এবং এ বাহিনীর যুদ্ধাপরাধমূলক কার্যকলাপে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালে শেরপুর জেলা সদরে জন্মগ্রহণ করেন। এ সময় শেরপুর ছিল তদানীন্তন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহুকুমার অন্তর্গত একটি থানা।
যুদ্ধাপরাধ
১৯৭১ সালে কামারুজ্জামান ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ-এর ময়মনসিংহ জেলার প্রধান। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামালপুরে প্রথম যে আলবদর বাহিনী গড়ে ওঠে, তার প্রধান সংগঠক ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বেই ময়মনসিংহ জেলার সকল ছাত্রসংঘকর্মীকে আলবদর বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।[১]
কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে শেরপুরের সূর্যদি গণহত্যাকাণ্ড এবং নকলার মুক্তিযোদ্ধা হন্তার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।[কখন?]
১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট তারিখে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, 'পাকিস্তানে ২৫তম আজাদী দিবস উপলক্ষে গত শনিবার মোমেনশাহী আলবদর বাহিনীর উদ্যোগে মিছিল ও সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় মুসলিম ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এই সিম্পোজিয়ামে সভাপতিত্ব করেন আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠক জনাব কামারুজ্জামান। এক তারবার্তায় প্রকাশ, সিম্পোজিয়ামে বিভিন্ন বক্তাগণ দেশকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত দুশমনদের সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।'[২]
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘাতক বাহিনী 'আলবদর'-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য নিয়ে নির্মিত 'আলবদর : এ কিলিং স্কোয়াড অব পাকিস্তান আর্মি, ১৯৭১' নামের প্রামাণ্যচিত্রে কামারুজ্জামানের যুদ্ধাপরাধ উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, জামালপুরে কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর যে সাতটি ক্যাম্প ছিল, তার মধ্যে শেরপুরের সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়ির ক্যাম্পটি ছিল সবচেয়ে বিভীষিকাময়। ক্যাম্পটির তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন কামারুজ্জামান। অন্তত ৮০-৯০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এই ক্যাম্পেই। দিনের পর দিন ক্যাম্পের অন্ধকার কুঠুরিতে আটকে রেখে চালানো হয়েছে অসহ্য নির্যাতন। এসব নির্যাতন আর হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিলেন আলবদর বাহিনীর জামালপুর সাবডিভিশনের প্রধান আবদুল বারী এবং সদস্য নাসির ও কামরান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আশরাফের সহযোগী আবদুল বারীর একটি ডায়েরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, বন্দি ও হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এই আশরাফেরই অন্য সহযোগী ছিলেন কামারুজ্জামান। ডায়েরিতে কামারুজ্জামানের নির্দেশেই যে টর্চার ক্যাম্পে বন্দি গোলাম মোস্তফা তালুকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়, সে কথার উল্লেখ আছে।[৩]
মামলা ও বিচার
শেরপুরের বাসিন্দা ফজলুল হক তাঁর ছেলে বদিউজ্জামানকে হত্যার জন্য কামারুজ্জামানকে দায়ী করে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২ মে বদিউজ্জামানের বড় ভাই হাসানুজ্জামান বাদী হয়ে নালিতাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ১৮ জন আসামির অন্যতম ছিলেন কামারুজ্জামান। মামলাটির নম্বর ২(৫) ৭২ ও জিআর নম্বর ২৫০ (২) ৭২।'[৪]
২০১০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে সংগঠিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রক্রিয়া সূচিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৩ জুলাই, ২০১০ তারিখে কামারুজ্জামানকে পল্লবী থানা এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যার একটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।[৫] তার বিরূদ্ভে আনীত অভিযোগের তদন্ত চলছে।
আব্দুল কাদের মোল্লা
আব্দুল কাদের মোল্লা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের বর্তমান সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় কাদের মোল্লা ঘাতক পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পক্ষাবলম্বন করেন এবং সক্রিয়ভাবে মুক্তিকামী জনতাকে দমনে এবং যুদ্ধাপরাধমূলক কার্যকলাপে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
যুদ্ধাপরাধ
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে একাত্তরে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। গণতদন্ত কমিশনের কাছে সাক্ষ্যদানকারীরা আরো জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে কাদের মোল্লা মণিপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের অবাঙালিদের দিয়ে একটি নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী গঠন করেছিলেন। এই বাহিনীই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে ধরে এনে শিয়ালবাড়ী, রূপনগর, বালুঘাট প্রভৃতি স্থানে গুলি করে নির্বিচারে হত্যা করে।[১]
গ্রেফতার
১৩ জুলাই, ২০১০ তারিখে কাদের মোল্লাকে পল্লবী থানা এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যার একটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়।
২৫ জানুয়ারি, ২০১০ তারিখে পল্লবীর দুয়ারীপাড়ার বাসিন্দা আমীর হোসেন মোল্লা বাদী হয়ে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লা, কেন্দ্রীয় নেতা সরদার আবদুস সালাম, খাজা আমিনউদ্দিন (মৃত), আকতার গুণ্ডাকে (পাকিস্তানে পলাতক) আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিদের সঙ্গে আরও অপিরিচিত ৬০-৭০ জন অবাঙালিকে নিয়ে কাদের মোল্লা নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। তাঁরা গণহত্যায় অংশ নেন। মামলার বিবরণে আরও বলা হয়, ১৯৭১ সালের আমীর হোসেন মোল্লা মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে ১০০-১৫০ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আসামিদের আস্তানা আক্রমণ করেন। তখন কাদের মোল্লার নেতৃত্বে নিজামী, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, মীর আবুল কাশেম, সরদার আবুল কালামসহ অন্য আসামিরা ভারী অস্ত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর গুলি চালায়। এতে বাদী আমীর হোসেন মোল্লার সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তার শহীদ হন। বাদীর ডান পায়ে ও ডান হাঁটুতে গুলি লাগে। পরে স্বজনদের খুঁজতে এসে অনেকেই ঘাতক আল-বদরদের হাতে নিহত হন।[২]
আলী আহসান মুজাহিদ
আলী আহসান মুজাহিদ জামাত-ই-ইসলামী বাংলাদেশের বর্তমান সাধারণ সচিব। তিনি ২০০১-২০০৭ সময়কালে চারদলীয় জোট সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেন এবং যুদ্ধ চলাকালে তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেন। তিনি একাধারে গণহত্যা, লুটপাট, ধর্ষণে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সহাযোগিতা দান এবং ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বদানের দায়ে অভিযুক্ত। ১৪ ডিসেম্বর তারিখটি শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস নামে পরিচিত।
১৯৭১ সালে তার জীবন
১৯৭১ সালে মুজাহিদ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের প্রেসিডেন্ট এবং রাজাকার বাহিনীর স্থপতি, আল বদর প্রধান। রাজাকার এবং আল বদর বাহিনীর প্রধান কাজ ছিলো স্বাধীনতাকামী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে তাঁদের পাকিস্তানী সেনাবাহিনীরহাতে তুলে দেয়া। কখনো কখনো তাঁদের নির্যাতনপূর্বক হত্যাও করা হতো।
স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষিত হওয়া মাত্র তিনি তার আজ্ঞাবহ রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। অতঃপর তিনি জনৈক ফিরোজ মিয়াকে এ বাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করে তাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। মুজাহিদ ছিলেন এ সংগঠনের সামরিক এবং অর্থনৈতিক মূল চালিকাশক্তি।
তার স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকান্ড তৎকালীন সংবাদপত্রসমূহে প্রকাশিত বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ এ ফরিদপুরে ইসলামী ছাত্র সংঘের এক জনসমাবেশে তিনি বলেন যে সমগ্র ভারত হস্তগত করার আগে তার উচিত ছিলো আসাম (ভারতীয় প্রদেশ) দখল করা।
যুদ্ধ চলাকালে মুজাহিদ ১৮১, ফকিরাপুলে ফিরোজ মিয়ার বাড়িতে অবস্থান করেন। জাতীয় পার্টি নেতা আবদুস সালাম, সাংবাদিক জি এম গাউস এবং মুক্তিযোদ্ধা ও কলামলেখক মাহবুব কামালের সাক্ষ্যমতে ফিরোজ মিয়া ছিলেন রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার।
ফিরোজ মিয়ার বাড়ি সে সময় এলাকার রাজাকারদের প্রধান কার্যালয় এবং মুক্তি বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্রের ভূমিকা পালন করত। এলাকাবাসীদের তথ্যমতে অনেককে সেখানে চোখ বেঁধে নিতে দেখা যেত এবং নির্যাতিতদের আর্তচিৎকারও শোনা যেত। মুজাহিদ ছিলেন এর মূল হোতা।
সেপ্টেম্বর থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পরাজিত হতে শুরু করলে মুজাহিদ তার কর্মপদ্ধতি পরিবর্তন করেন। তিনি মুক্তিকামী সাধারণ বাংলাদেশী জনগণের পরিবর্তে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবি ও পেশাজীবিদের হত্যা শুরু করেন। তিনি এবং তার দল ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরে নিহত বুদ্ধিজীবিদের সম্পর্কে তথ্য সরবরাহকারীর ভূমিকা পালন করেন। গাউসের বক্তব্য মতে, মুজাহিদ নির্ধারিত বুদ্ধিজীবিদের হত্যার উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘেরাওকর্মে মুজাহিদ ছিলেন অন্যতম নেতা।
মুজাহিদের কীর্তি সম্পর্কে ১৯৭১ সালে পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য
১৫ অক্টোবর, ১৯৭১ এ "দৈনিক সংগ্রাম"-এ প্রকাশিত মুজাহিদের বক্তব্য:
"রাজাকার, আল-বদর এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর তরুণেরা জাতিকে ভারতের যৌথবাহিনী এবং গুপ্তচরদের হাত থেকে রক্ষা করতে কাজ করছে। কিন্তু, সম্প্রতি দেখা গেছে যে কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক নেতৃ যেমন জুলফিকার আলী ভুট্টো, কাওসার নিয়াজী, মুফতি আহমেদ এবং আসগর খান এই দেশপ্রেমিকদের নামে অসম্মানসূচক মন্তব্য করছেন।"
১৯৭১ পরবর্তী জীবন
বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হওয়ার পর মুজাহিদ কয়েক বছর আত্মগোপন করে ছিলেন। শেখ মুজিবর রহমানের হত্যাকান্ডের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এলে মুজাহিদ পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হন। ২০০১ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে চার দলীয় জোট সরকারের সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রী হন, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ঘটনা হিসেবে গণ্য।
মুনীর মম্তাজ
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু হলে পাকিস্তানি হায়েনাদের সঙ্গে যোগ দেয় তাদের দোসর বাংলাদেশেরই কিছু বিশ্বাসঘাতক নরপশু। যাদেরকে পরবর্তীতে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্ প্রভৃতি নামে চিহ্নিত করা হয়। এদের মধ্যে একদিকে যেমন ছিল নিজামী, মুজাহিদের মতো বিকৃত মস্তিষ্কের কিছু দালাল, অন্যদিকে আবার ছিল কিছু শিক্ষক নামের কলঙ্কÑ যারা সমাজের (তথাকথিত) বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক জড়িত ছিল পাকিস্তানি হায়েনাদের দালালিতে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষক এ সময় পাকিস্তানি গণহত্যাকে সমর্থন করে। শুধু সমর্থনই নয়, বেশ কিছু শিক্ষক পাকিস্তানি বাহিনীকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতাও করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১ অক্টোবর ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিভিন্ন মেয়াদে বাধ্যতামূলক ছুটি, চাকরি থেকে বরখাস্ত ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সমস্ত দালাল শিক্ষকের অনেকেই বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বরের পর ৩৫০, নাখালপাড়ায় আল-বদর বাহিনীর প্রধান আশরাফুজ্জামান খান যে বাড়িতে থাকত, সেখান থেকে তার ব্যক্তিগত ডায়েরিটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ডায়েরির দুটি পৃষ্ঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ জন বিশিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ডা. গোলাম মূর্তজার নাম এবং বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে কত নম্বর বাড়িতে তারা থাকতেন তা লেখা ছিল। এ ২০ জনের মধ্যে মোট ৮ জন ১৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন। এরা হচ্ছেনÑ মুনীর চৌধুরী (বাংলা), ড. আবুল খায়ের (ইতিহাস), গিয়াসউদ্দিন আহমেদ (ইতিহাস), রশিদুল হাসান (ইংরেজি), ড. ফয়জুল মহী (শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট) এবং ডা. মূর্তজা (চিকিৎসক)।
তার গাড়ির ড্রাইভার মফিজুদ্দিনের স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, আশরাফুজ্জামান খান এদের নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিল। মফিজুদ্দিনের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে রায়ের বাজারের বিল এবং মিরপুরের শিয়ালবাড়ী বধ্যভূমি থেকে অধ্যাপকদের গলিত বিকৃত লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। ডায়েরিতে এ ছাড়াও আরো যাদের নাম ছিল তারা হচ্ছেনÑ ওয়াকিল আহমদ (বাংলা), ড. নীলিমা ইব্রাহিম (বাংলা), ড. লতিফ (শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট), ড. মনিরুজ্জামান (ভূগোল), ড. কে এম সাদউদ্দিন (সমাজতত্ত্ব), এ এম এম শহীদুল্লাহ (গণিত), ড. সিরাজুল ইসলাম (ইসলামের ইতিহাস), ড. আখতার আহমদ (শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট), জহিরুল হক (মনোবিজ্ঞান), আহসানুল হক (ইংরেজি), সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (ইংরেজি) এবং কবীর চৌধুরী (ইংরেজি)।
ডায়েরির আরেকটি পৃষ্ঠায় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ষোলোজন দালাল অধ্যাপকের নাম। আল-বদর হাই কমান্ডের সদস্য আশরাফুজ্জামানের ডায়েরিতে দালাল হিসেবে উল্লিখিত ষোলো শিক্ষকসহ মোট ২৯ জন শিক্ষক ও ৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামের তালিকা পাওয়া যায়।
১৯৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বর্বর পাকবাহিনীর আক্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল এ দেশের ছাত্র-বুদ্ধিজীবী সমাজ। ২৫ মার্চের নারকীয় হত্যাকা-ের সূচনা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে এবং হত্যাকা-ের প্রথম দিনেই শহীদ হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপকবৃন্দ। বুদ্ধিজীবীদের ওপর উৎপীড়ন নিগ্রহ যুদ্ধের নয় মাস অব্যাহত ছিল এবং হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রাক্কালে আল-বদরদের সহায়তায় ব্যাপক বুদ্ধিজীবী হত্যাসম্পন্ন হয়। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী সচেতনভাবে পাকিস্তানি গণহত্যাকে সমর্থন করেছিল। এই সমস্ত বুদ্ধিজীবীর নৈতিকতা ও বিবেকবোধ কোন পর্যায়ে নেমেছিল তার একটি উদাহরণ দিলে বোঝানো যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার বিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক আহমদ হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার অঙ্গনে জনসমক্ষে ঘোষণা দিয়েছিলেনÑ “পাকিস্তানি বাহিনী যদি বাঙালি নারীদের শ্লীলতাহানি করে তবে তাদের কোনো পাপ হবে না, কারণ তারা ইসলাম রক্ষার জন্য ‘জেহাদে’ নিয়োজিত। তাদের জন্য এই কাজ মুতা বিবাহের পর্যায়ে পড়ে” (দৈনিক গণকণ্ঠ- ২৬ এপ্রিল ১৯৭২)।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকাভুক্ত দালাল-শিক্ষক ও কর্মচারীদের কর্মকা- সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।
ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন
বিশ্ববিদ্যালয় দালাল শিক্ষকদের মধ্যে মুখ্য ব্যক্তিটি ছিলেন ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে তিনি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ জন বাঙালি অধ্যাপক এবং ২ জন বাঙালি অফিসারের একটি তালিকা তৈরি করে সামরিক হেডকোয়ার্টারে দাখিল করেন। এই তালিকায় অধ্যাপকদের ৪টি শ্রেণীতে বিভক্ত করে চার ধরনের শাস্তির ১. হত্যা ২. কারাদ- ৩. চাকরি থেকে বহিষ্কার ৪. ধরে নিয়ে গিয়ে প্রহার করার সুপারিশ করা হয়। দ-প্রাপ্ত অধ্যাপকদের অনেকেই আল-বদর বাহিনীর হাতে নিহত অথবা নির্যাতিত হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রস্তুত সমাপ্ত হওয়ার পর প্রাদেশিক গবর্নর টিক্কা খানের নির্দেশে সাজ্জাদ হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।
সাজ্জাদ হোসেনের প্রস্তুতকৃত এই তালিকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী হত্যাকা- তথ্যানুসন্ধান কমিটির হস্তগত হলেও এর কোনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি। সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সৌদি আরব চলে যান এবং সেখানকার কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। (দৈনিক আজাদ- ৭ ফেব্রুয়ারি ’৭২)
ড. মীর ফখরুজ্জামান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মীর ফখরুজ্জামান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি কমিটির সাধারণ সম্পাদক। বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের নায়ক জেনারেল রাও ফরমান আলীর মেয়ে তার বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। সেই সূত্রে রাও ফরমান আলীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি তার মুখ্য সহচর হিসেবে কাজ করেন। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব নিহত হওয়ার পর ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট হওয়া সত্ত্বেও একই সঙ্গে তাকে জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট করা হয়। তিনি জগন্নাথ হলের নাম পরিবর্তন করে এর মুসলিম নামকরণের প্রস্তাব করেছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষ লগ্নে বঙ্গোপসাগরের সপ্তম নৌবহর প্রবেশের খবরে আনন্দিত হয়ে তিনি গরু জবাই করে কাঙ্গালিভোজের আয়োজন করেছিলেন। গবর্নর ডা. আবদুল মুত্তালিব মালিকের প্রতিরক্ষা তহবিলে অর্থ সংগ্রহের জন্য শিক্ষকদের কাছে বাধ্যতামূলক চাঁদা আদায়ের ব্যাপারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশপন্থী শিক্ষক এবং ফজলুল হক হলের নেতৃস্থানীয় ছাত্রদের নামের তালিকা তিনি জেনারেল রাও ফরমান আলীর কাছে সরবরাহ করেছিলেন বলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের অভিযোগ ছিল। মনোবিজ্ঞান বিভাগের বাংলাদেশমনা যে সমস্ত শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন, বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার পূর্বমুহূর্তে তিনি তাদের টেলিগ্রাম করে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এর পর সমস্ত শিক্ষকদের বাড়িতে আল-বদর বাহিনী হানা দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে অন্যত্র পালিয়ে যান বলে তারা রক্ষা পেয়ে যান। (দৈনিক আজাদ- ২৯ জানুয়ারি ’৭২)
Hdesr
এ এফ এম আবদুর রহমান
গণিত বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম আবদুর রহমান আরো একজন উল্লেখযোগ্য পুনর্বাসিত স্বাধীনতা বিরোধী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গোড়া থেকেই তিনি এর বিরোধিতা করে এসেছেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে যে ৫৩ জন বুদ্ধিজীবী পত্রপত্রিকায় রবীন্

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

