
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল
এবারের কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখা আমার জন্য ছিল ভিন্ন মাত্রার এক অভিজ্ঞতা।এককালের বনেদী এলাকা পার্ক স্ট্রীটের উল্টোদিকে ময়দানের মধ্যে শ্বেত পাথরের সাদা সফেদ এই সৌধ দৃষ্টি কাড়েনি এমন পর্যটক বিরল। বৃটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে দীর্ঘদিনের শাসক মহারানী ভিক্টোরিয়া পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র দীর্ঘদিন রাজত্ব করা মহিলা সম্রাজ্ঞীও বটে।
১৮ বছর বয়সে বৃটিশ সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহন করে তিনি একটানা ৬৩ বছর সাত মাস(২০ জুন ১৮৩৭ - ২২ জানুয়ারী ১৯০১) আমৃত্যু দোর্দন্ড প্রতাপ আর বিচক্ষনতার সাথে সামাজ্য পরিচালনা করে গেছেন। তার আমলে বৃটিশ সাম্রাজ্যের আয়তন এতখানি বিস্তৃতি ঘটেছিল যে বৃটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায়না বলে একটি প্রবাদ সৃষ্টি হয়েছিল।১৮৭৬ সন থেকে উনি ভারতবর্ষেরও শাসনভার গ্রহন করেন।

রানী ভিক্টোরিয়া
রানী ভিক্টোরিয়া যখন মারা যান তখন ভারতে বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড কার্জন। তিনি তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে এক সৌধ নির্মানের উদ্যোগ নিলেন। তারই ফলশ্রুতিতে কলকাতার ফুসফুস বলে পরিচিত ময়দানের একাংশে ৬৩ একর জায়গা জুড়ে সবুজ বাগান ঘেরা দর্শনীয় এক সৌধ তৈরী হলো নাম যার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।

ভিক্টরিয়া মেমোরিয়ালের মুল হল রুম কুইন্স হলে রানী ভিক্টোরিয়ার মুর্তি
১৮৪ ফিট উচু সাদা শ্বেত পাথরে তাজমহলের অনুকরনে বানানো এই মেমোরিয়াল এখন যাদুঘর। স্থানীয় জনগন ছাড়াও অন্যান্য দেশের পর্যটকদের কাছেও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দারুন আকর্ষনীয়। এখানে রানী ভিক্টোরিয়া ছাড়াও রয়েছে অন্যান্য শাসকদের মুর্তি ,রয়েছে প্রচুর চিত্রকলা, পেপার কাটিং, হাতে লেখা পান্ডুলিপি।
এক কথায় বলা যায় ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের ঐতিহাসিক তথ্যের সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালা। কেউ যদি সেগুলো মনযোগ দিয়ে খুটিয়ে দেখে আর পড়ে তাহলে ভারতবর্ষে বৃটিশদের আসা, তাদের শাসন এবং ভারতের স্বাধীনতা লাভ এর সমস্ত ইতিহাস খুব সহজেই বুঝতে পারবে।

ভারতবর্ষের ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর ভাস্কর্যের নীচে লাগানো ব্রোন্জের এই প্যানেলটি মিন্টোর স্ত্রী পরবর্তীতে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে দান করেন
ভারতবাসীর জন্য ৫ রুপী টিকেট আর বাকী সবার জন্য ১৫০ রুপী। সার্কের অন্তর্ভুক্ত দেশের জন্য এই নিয়ম আমার স্বামীর পছন্দ হলো না। এবার আমরা ভারতের তিনটি রাজ্য ঘুরেছি, সব জায়গায় একই নিয়ম আর আমার স্বামীর গজগজানি।বিদেশী বল্লে পাসপোর্ট দেখাতে হয় নানা ভেজাল।
আমি বল্লাম 'দাড়াও আমি টিকেট কেটে আনি। ঘুলঘুলির সামনে দাড়িয়ে দশ টাকার নোট বাড়িয়ে শুধু বল্লাম 'দুঁটো', সাথে সাথে দুটো টিকিট হাতে চলে আসলো। 'দুইটা' বল্লে খবর ছিল।
ভেতরে কড়া নিরাপত্তা, পাসপোর্ট চেক থেকে শুরু করে শরীর তল্লাসী ক্যামেরা নেয়া বন্ধ ইত্যাদি।এসব পেরিয়ে ঢুকলাম ভেতরে। যদিও আমি এর আগে দুবার গিয়েছি আমার স্বামীর প্রথম। কিন্ত এত সময় নিয়ে কোন বারই দেখা হয়নি। যাদের সাথে গিয়েছি তাদের আমাদের মত এত আগ্রহ ছিলনা।ফলে এক চক্কর দিয়ে বের হয়ে পরতে হতো।কিন্ত আজ আমাদের সারাদিনের প্রোগ্রামই ছিল এই মেমোরিয়াল, সেন্ট পলস চার্চ আর বিদ্যাসাগর সেতু দেখা।

হুগলী নদীর উপর বিদ্যাসাগর সেতু , কলকাতা
প্রথমেই ঢুকলাম রয়েল গ্যালারীতে। সেখানে প্রথমেই আমার দৃষ্টি কেড়ে নিল অনেক অনেক ছবির মধ্যে কিছু চিত্রকলা। নিচে লেখা ক্যাপশন আর শিল্পীদের নাম। ছবি তোলা নিষেধ। আমি অবাক হয়ে ভাবছি এত নিখুত, সুন্দর আর আকর্ষনীয় করেও কি মানুষ ছবি আঁকতে পারে! ছবিগুলো ছিল ৩৬ বছরের চাচা টমাস ড্যানিয়েল আর তার ১৬ বছরের ভাতিজা উইলিয়াম ড্যানিয়েলের আঁকা সে সময়কার ভারতবর্ষের চিত্র। ভারতবর্ষের যে স্থানগুলোর সাথে আমি অত্যন্ত পরিচিত সে সব জায়গা ছাড়াও না দেখা যে শহরগুলোর বর্ননা যা আমি বিভিন্ন বইয়ে পড়েছি হাজার বার তা আজ আমার চোখের সামনে ক্যনভাসে শিল্পীর তুলিতে আঁকা।পথের পাঁচালী বইতে উল্লেখ করা দশাশ্বমেধ ঘাট, কাশীর বৃন্দাবন, প্রাচীন বাংলার গৌড় নগরী। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিবিষ্ট মনে ছবি দেখতে আর পড়তে লাগলাম ক্যাপশনগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মত।

টমাস ড্যানিয়েল আর উইলিয়াম ড্যানিয়েল
১৭৮৬ খৃষ্টাব্দের প্রথমদিকে বৃটেন থেকে টমাস ড্যানিয়েল আর উইলিয়াম ড্যানিয়েল পাল তোলা জাহাজে চেপে চীন হয়ে ভারতবর্ষের কলকাতা এসে পৌছান। টমাস ড্যানিয়েল প্রথমেই কলকাতার বৃটিশ বসবাসকারীদের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য শহরের ১২টি বিখ্যাত দালানের খোদাই চিত্র আঁকার পরিকল্পনা করেন। এ ব্যাপারে তাদের কোন পুর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা স্থানীয় শিল্পীদের সহায়তা নিয়ে ১৭৮৮ সালে ছবিগুলো শেষ করেন, এবং ভালো দামে বিক্রী করতে সক্ষম হন।
এরপর তারা দুজনই দক্ষিন ভারত সফরের এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেন। হয়তো তারা উইলিয়াম হজের সংগ্রহে থাকা ভারতের অপুর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি দেখে অনুপ্রানিত হয়ে এই দুঃসাহসিক পরিকল্পনা করেন।

প্রাচীন বাংলা যা গৌড় নামে পরিচিত ছিল সেই প্রাচীন নগরীর ভেঙ্গে পরা এক দালানের চিত্র ।শিল্পী টমাস ড্যানিয়েলের আঁকা
১৭৮৯ খৃস্টাব্দে টমাস ও উইলিয়াম ড্যানিয়েল যাত্রা শুরু করেন নৌকায়।নদীপথে মুর্শিদাবাদ হয়ে ভাগলপুর সেখান থেকে কানপুর হয়ে স্থলপথে দিল্লী, আগ্রা, ফতেহপুর সিক্রী, মথুরা যান।সে বছরের এপ্রিল মাসেই তাদের ভ্রমন সুচীতে অন্তর্ভুক্ত হয় হিমালয় কন্যা কাশ্মীরের শ্রীনগর আর গাড়োয়াল ।

শ্রীনগর এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য, শিল্পী টমাস আর উইলিয়াম ড্যানিয়েলের আঁঁকা
দশটি বছর টমাস আর উইলিয়াম ড্যানিয়েল সেসমযের প্রতিকূল যাতায়াত ব্যবস্থায় নৌকা, পাল্কী, গরুর গাড়ী, ঘোড়া চড়ে এমনকি হেটে হেটে গিয়েছিলেন ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। দেখেছিলেন কন্যাকুমারী থেকে দুর্গম হিমাচল, কলকাতা থেকে দিল্লী পর্যন্ত শিল্পীর চোখ দিয়ে ভারতবর্ষের অপার সৌন্দর্য্য ।
তারপর ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে আঁকেন সেই সব দুর্লভ চিত্রকলা যা ইংল্যান্ডের শিল্পকলার জগতে এক প্রচন্ড আলোড়ন তুলেন। সেসময় বৃটেনের অভিজাত সম্প্রদায় গ্রেইকো- রোমান সংস্কৃতি ও শিল্পকলার সাথে পরিচিত ছিল। ড্যানিয়েল দের চিত্রকলার মাধ্যমে তারা জানতে পারেন ভারতবর্ষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ছাড়াও স্থাপত্য আর শিল্পকলায় কত সমৃদ্ধ।

ভারতের বিখ্যাত গুহা মন্দির অজন্তা ঈলোরার সন্মুখভাগের চিত্র
এই ছবিগুলো আঁকতে ড্যানিয়েলরা যে মাধ্যামগুলো ব্যাবহার করেছিলেন তা ছিল জল রং, তেল রং আর ধাতুর উপর ছাপ দিয়ে তৈরী যা ইংরাজীতে Aquatints নামে পরিচিত।এর মাধ্যমে তারা একেছেন মাদ্রাজের সমুদ্র তীর থেকে গাড়োয়ালের পাহাড়ের সারি। সেসময় কার গঙ্গা তীরের কলকাতা থেকে দিল্লীর জুমা মসজিদসহ বিভিন্ন ছবি।
নীচে তারই কিছু নমুনা রইলোঃ


নওরতনের ধ্বংসাবশেষ , সাসারাম, বিহার

মাদ্রাজের সমুদ্র উপকুল থেকে সেন্ট জর্জ দুর্গের দক্ষিন-পুর্ব দিকের দৃশ্য।শিল্পী টমাস ড্যানিয়েল

খরস্রোতা পাহাড়ী নদীর উপর দড়ির ব্রীজ, শ্রীনগর। টমাস ড্যানিয়েল

প্রাচীন দরওয়াজা শিল্পী টমাস ও উইলিয়াম ড্যানিয়েল

মসজিদের দরওয়াজা

যমুনার পাড়ে তাজমহল। শিল্পী টমাস ড্যানিয়েল

দশাশ্বমেধঘাট উত্তর প্রদেশ

শিকারের জন্য যাত্রা উইলিয়াম আর টমাসের আরেকটি শিল্প কর্ম

টমাস ড্যানিয়েলের আঁকা বাঘ শিকারের প্রস্ততি

রাজপুত্র খসরুর সমাধি সৌধ এলাহাবাদ, পেন্সিল আর জলরঙ্গে আঁঁকা

বৃন্দাবনের মন্দির। শিল্পী টমাস ড্যানিয়েল

পেন্সিলে আঁঁকা এলাহাবাদ দুর্গের একটি অংশ
ল্যান্ডস্কেপ। শিল্পী উইলিয়াম ড্যানিয়েল ১৭৮৯- ৯১
পরবর্তীতে তারা দুজনই ইংল্যান্ডের রয়েল একাডেমীর সদস্যের মর্যাদা লাভ করেছিলেন।
আমার কাছে তাই এবারের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ভ্রমন ছিল সত্যি অন্যমাত্রার।
শিল্পীদের আঁকা অসামান্য চিত্রকলাগুলো নেট থেকে নেয়া। কারন ক্যামেরা
নিয়ে প্রবেশ শাস্তিযোগ্য অপরাধ । বাকি ছবিগুলো আমাদের ক্যামেরায় তোলা।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০১৮ রাত ৮:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



