somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিজী বিজী জীবনের হিজিবিজি কথা - ১ :``>>

১১ ই অক্টোবর, ২০১৮ সকাল ১০:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০০৩ সাল।

আমি তখন নিউইয়র্কে। সেমিস্টার ব্রেক চলছে। আমেরিকাতে সেমিস্টার ব্রেক হলেই ডর্মেটরি (ছাত্রনিবাস) থেকে সবাইকে বের করে দেয়। বের করে দেয় মানে, ঘাড়টা ধরা বাকি থেকে শুধু। ক্লাস শেষ হলো, তার ২ দিন পরই ব্যাগ গুছিয়ে সবাই আউট! আমেরিকান ছেলেপেলেরা নাহয় ডর্ম থেকে বের হয়ে যে যার বাড়ী চলে যাবে, কিন্তু আমার মতো বাংলাদেশী পাবলিকদের কি হবে?! আমেরিকাতে আমার একূল-সেকূল-কোন কূলেরই কেউ কখনও ছিল না। আমার মতো যাদের কেউ নাই, তারা বস্তা-বাক্স নিয়ে কোথায় যাবে?

আমার কলেজ ছিল পেনসিলভেনিয়াতে। এই স্টেটটি নিউইয়র্কের প্রতিবেশী স্টেট। আসে পাশে কোন আত্মীয়-স্বজনও ছিল না, যে তাদের কাধের উপর গিয়ে উঠব। তাই শেষ কোন গতি না পেয়ে, নিউইয়র্কের একজন দুর-দুর-দুরসম্পর্কের আপার বাসায় গিয়ে উঠলাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে যতই দুর-সম্পর্ক বলি না কেন, আমার সুখ-দু:খের সময় উনারাই কিন্তু কাছে ছিলেন।

পেনসিলভেনিয়া থেকে নিউইয়র্ক সিটি প্রায় ৬ ঘন্টার ড্রাইভ। আমারতো আর গাড়ী ছিলনা যে ড্রাইভ করব, তাই শেষ উপায় বাস! সেই বাস আবার বিভিন্ন শহর ঘুরে ঘুরে যায়। মানে 'ক' থেকে 'খ' তে যেতে চান? - এই বাস ক থেকে যাত্রা শুরু করবে, তারপর আপনাকে 'অ আ ম ন গ ঘ চ ছ জ ঝ ' - সব ঘুরিয়ে তারপর 'খ' তে গিয়ে থামবে। আর কোন রাস্তা না পেয়ে সেই বাসেরই টিকেট কিনলাম। আমার ঐ শহরে আবার মাত্র দিনে ১ বার, ঐ ১টা বাসই আসত। তবে আসত টাইম মতো। মানে বাসের টিকিটে ১২:০৫ লিখা থাকলে, আর আপনি গিয়ে ১২:০৬ এ স্টেশনে পৌছলেন, দেখবেন বাস নাই - ছেড়ে দিয়েছে


গ্রে-হাউন্ড বাস - আমার মতো পাবলিকদের একমাত্র ভরসা!

সকাল সকাল বাসে চেপে বসলাম। পুরো বাসে আমি সহ মোটামুটি ৫/৭ জন যাত্রী। এটা অবশ্য আমেরিকার বড় শহর বাদে সব জায়গারই পরিচিত দৃশ্য। ৬০ জনের সিট, কিন্তু মানুষ ৭ জন। হয়ত রাত ১টা বাজছে কিন্তু সেই বাস ঠিকই ঐ ৭ জন মানুষকে তাদের গন্তব্যে পৌছে দিচ্ছে।

যাইহোক আমার ৬ ঘন্টার রাস্তা (নিজে গাড়ী চালালে), প্রায় হলো ১৫ ঘন্টা - একবার এই শহর তো একবার ঐ শহর। সব জায়গায় ১০ মিনিটের জন্য থামে। ১ জন ওঠে, তো ২ জন নামে। এইসব করতে করতে রাত ১২/১২:৩০টার দিকে গিয়ে নিউইয়র্ক পৌছলাম।



নিউইয়র্ক - আমার খুব পছন্দের শহর। পুরো শহরটার যেন একটা আলাদা প্রান আছে। একটু থামলেই অনুভব করা যায়! এই প্রান দিয়েই নিউইয়র্ক আপনাকে টেনে ধরে রাখবে। একটু খেয়াল না করলেই একদিন হুট করে দেখবেন ২৫টা বছর পেড়িয়ে গেছে, মাথার চুল সব শ্বেত, জীবনটা কোন দিক দিয়ে গেলো - ধরতে পারবেন না। এটাই হচ্ছে স্বপ্নের নিউইয়র্ক!

বাস থামল পোর্টঅথরিটিতে - আমাদের গাবতলী বাসস্ট্যান্ড টাইপের জায়গা আরকি। উপরে বাস আর, নিচতলায় সাবওয়ে- পাতাল রেল। সাবওয়েতে চড়ে বসলাম। আর যে স্টেশনে নেমে অন্য একটা সাবওয়েতে চড়ার কথা, সেটা ফেলে কখন যে আরও এগিয়ে গেলাম - আমার কোন খবরও নাই! এদিকে সাবওয়ে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে শহরের অন্য দিকে। আমি যাব ব্রুকলীনে, আর আমাকে নিয়ে যাচ্ছে কুইন্সের দিকে।

একটা সময় সাবওয়ে থামল, আর আমি আস্তে করে বাইরে তাকিয়ে দেখি আমার সাবওয়ের সামনে দেয়াল!!! মানে রাস্তা শেষ - আমিতো আবুল হয়ে গেলাম। পরে তাড়াতাড়ি বের হয়ে ড্রাইভারের জানালা গিয়ে বললাম আমি অমুক স্টেশনে যেতে চাই, কি করে যাব। উনি আমাকে বললেন, উল্টো দিকে যাও, তারপর ঐ স্টেশন থেকে ঠিক সাবওয়ে ধর। একটু কস্ট হলেও আমি ঠিকই সেভাবেই গেলাম।


সাবওয়েতে চড়ে বসি লাল-তারা থেকে, কিন্তু ভূল ট্রেনে ওঠার কারনে সেটা আমাকে নিয়ে যায় নীল-তারা পর্যন্ত। পরে আবার ট্রেন বদলে উল্টো দিকে রওনা দিয়ে শেষ পর্যন্ত আমার গন্তব্যস্থল সবুজ-তারাতে পৌছাই।

রাতের প্রায় ২টার দিকে ব্রুকলীনের সাবওয়ে থেকে বের হলাম, সাথে ২টা বড় বড় সুটকেস - এতেই আছে আমার সব মালামাল, এগুলো টানতে টানতে স্টেশনের পে-ফোন থেকে আপাকে ফোন দিলাম। উনারা ঘুম ঘুম কন্ঠে বললেন "তুমি স্টেশনেই দাড়াও, দুলাভাই আসছেন"। দুলাভাই একটু রাগী টাইপের মানুষ - কিন্তু ঠিকই রাত ২টায় আমাকে স্টেশন থেকে পিক করলেন।

বাসায় এসে আপা জোড় করে খাওয়ালেন - সত্যি কথা বলতে খাওয়ার কথা ভূলেই গিয়েছিলাম। স্টেশন-ট্রেন ভূল করে সব আউলায়ে গিয়েছিল। তাই যখন খেতে বসলাম বুঝলাম কত খিদে পেয়েছিল। আর বাসার একপাশে একটা ছোট রুমে আমার থাকার জায়গা হলো।

সকালে আপার ছোট দুটি পিচ্চির সাথে দেখা হলো। একজনের বয়স ২ বছর, আরেকজন হাটিহাটি পা পা করে। চোখ খুলেই দেখি বড়টা ওর চেয়েও বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। পরে ওরাই আমার বেস্ট ফ্রের্ন্ড হয়। এভাবেই আমার সামারের ছুটি কাটতে লাগল।

আমার বিছানার পায়ের দিকে ছিল মান্দা আমলের স্টিলের একটা আলমারী ছিল। সেটার উপর কিছু বই। আমি যেহেতু একবারেই বেকার ছিলাম, তাই এই বইগুলোর উপরে আমার নজর পড়ল। তারপর সুযোগ বুঝে বইয়ে হাত দিলাম। হুমায়ুন আহমেদের কিছু বই, নাম মনে নেই - তবে সেখানেই আমি প্রথম সুনীল গন্গোপাধ্যায়ের 'পূর্ব-পশ্চিম-১ম খন্ড' বইটাকে আবিস্কার করি।


সেকি বই!!! নায়কের আন্দোলন, পরিবার নিয়ে পালানো, ভাই-ভাইয়ের ভালোবাসা - চোখে পানি নিয়ে আসে। একদম জোস মূহুর্তে বইয়ের ১ম খন্ড শেষ হয়ে যায়। তখন আমি পুরো নিউইয়র্কের যত বাংগালী বুক-স্টোর ছিল সব চষে ফেললাম। একদিন জ্যাকসন হাইটসে আলাউদ্দিন রেস্টুরেন্টের উপরের তলায় একটি ছোট দেশীয় বইয়ের দোকানে খুজে পাই 'পূর্ব-পশ্চিম ২য় খন্ড'। $২০ দিয়ে কিনে ফেলি, যদিও বাংলাদেশী টাকায়ে বইটার দাম কোনভাবেই ৩০০-৪০০ টাকার বেশী ছিল না।

না পড়া থাকলে, পড়ে দেখতে পারেন। গল্প আপনাকে ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে যাবে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে।

এখন তো ইন্টারনেট থেকেই ডাউনলোড করা যায়। তখনতো ইন্টারনেটে এতটা বেশী প্রসার ছিল না।

(পি.এস. আমি খালি সিরিজ শুরু করি...শেষ আর করা হয় না!)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১৮ সকাল ১০:৩৬
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বলো দুর্গা মা কি... 'জয়'

লিখেছেন অর্পিতা সাহা., ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৮ বিকাল ৫:০২



অবশেষে, সেফ ব্লগারের খাতায় আমার নামটাও উঠলো:
ব্লগের সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা। মডুদের থেকে গ্রীন সিগন্যাল পেয়েছি। মডারেশন স্ট্যাটাস সেফ, মানে আমি নিরাপদ ব্লগার। ভাবতেই কেমন লাগছে!... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রিবিউট টু 'এবি'

লিখেছেন কি করি আজ ভেবে না পাই, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:৫০



'সেই তুমি' আর গাইবেনা কেউ
সেই দরাজিয়া স্বরে;
'রুপালী গিটার' ঠিকি ফেলে আজ
চলে গেলে চিরতরে।

'শেষ চিঠি' হায় শুনিয়েই গেলে
এই ঘুম ভাঙ্গা শহরে;
পালাতে চাইলে পালানো কি যায়
হৃদে যে দাপটে রহো রে।

কষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলায় পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন /// অনন্যসাধারণা রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও অদিতি মহসিনের রবীন্দ্র সঙ্গীত

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৮ রাত ৮:০৬



১৯৮৯ সালের মার্চ-এপ্রিলে সিলেট শহর থেকে আমি প্রথম ওয়াকম্যান কিনি এবং ঐদিনই ৩টা ক্যাসেট কিনি যার মধ্যে একটা ছিল রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার অ্যালবাম (নাম মনে নাই)। ৩টা ক্যাসেটই ঘুরেফিরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হেমন্তিকা

লিখেছেন মনিরা সুলতানা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৮ রাত ১০:০০




এই যে অঝোর রাত্রি নিশীথ যাচ্ছে কেটে ভালোবেসে
বাড়ছে নেশা মেহুল সুবাস বাড়ছে তৃষা শব্দে সুহাস;
কি আসে যায়!
আজকে যদি শরত কাশে রোদ্দুরে রূপ তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিশাচর

লিখেছেন কথার ফুলঝুরি!, ১৯ শে অক্টোবর, ২০১৮ রাত ১:০৩



রাত ১১-৫০ । বেস্ট ফ্রেন্ড কে অনলাইন এ ম্যাসেজ দিলাম

কি করিস ?
এইতো এখন ঘুমুতে যাবো। তুই কি করিস ?
মিস করি, তাকে :#|

ফ্রেন্ড এর রিপ্লাই
দূরে গিয়া মর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×