somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আকাশ, মেঘ ও বৃষ্টি

০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ১২:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আকাশ, মেঘ ও বৃষ্টি

আকাশে মেঘ করেছে দেখলেই বৃষ্টির মন চনমনিয়ে ওঠে। বৃষ্টি-পাগল মেয়ে বৃষ্টি। কোন এক বৃষ্টিস্নাত রাতেই তার জন্ম। জন্মের পরে সব শিশুই কাঁদে। সেও কেঁদেছিল। চীৎকার করে কেঁদেছিল। তার কান্না স্বল্পকালের। টিনের চালে তখনো অবিরাম বৃষ্টির ছন্দ। তার জন্মের অভিনন্দন বার্তা। রাতের নিস্তব্ধতাকে আড়াল করে প্রকৃতির বুকে সেই বৃষ্টির করুণ সুর একনাগাড়ে বাজছিল। ঐ টুকুন পুচকে মেয়ের শ্রবণ ইন্দ্রিয় সজাগ ছিল কিনা জানা নেই। তবুও বৃষ্টির ছন্দে তার ঐ ফুটফুটে মুখে অন্য এক মায়াবী ছোঁয়া ছিল। গুটিশুটি হয়ে শুয়ে ছিল সে মায়ের পাশে। একমনে চোখবুজে শুয়ে সে উপভোগ করছিল বৃষ্টির ছন্দ। আকাশ কাঁদলে নাকি বৃষ্টি ঝরে, এমন কথা সে অনেকদিন পর্যন্ত জানেনা। কারো কাছে আগে শোনেনি। সে রাতে কার অমন গোপন ব্যথা বৃষ্টি হয়ে ঝরেছিল বৃষ্টি তা জানেনা। জানবার কথাও নয়। বৃষ্টির রাতে জন্ম বলে তার মা আদর করে তার নাম রেখেছিল "বৃষ্টি"।

শীতের সকাল। বাইরে কুয়াশা। তার উপর আকাশটা আজ মেঘলা। নানা বাড়ীর উঠোনে দাঁড়িয়ে মেঘলা আকাশটা দেখতে বৃষ্টির খুব ভাললাগে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বৃষ্টি বাগানে হাঁটতে বেড়িয়েছে। মহানন্দা নদীর ধারে সুন্দর এই গ্রামটার নাম মনাকষা। এই গ্রামেই বৃষ্টির নানীর বাড়ী। গ্রামের প্রায় অর্ধেকটা জুড়েই নানীর পৈত্রিক সম্পত্তি, ভিটেমাটি। চারিদিকে বিশাল সব আমের বাগান। সবুজ গাছপালায় ঘেরা এই বাড়ীটাও বিশাল। পুরোনো আমলের জমিদার বাড়ী। বেশ নির্জন নিরিবিলি। বৃষ্টির নানা তার মাকে তিন বছরের রেখেই মারা যান। নানী একা কষ্ট করে তার একমাত্র মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেন। বিয়ে দেন এক অনাথ শিক্ষিত ছেলের সাথে। নানী এখনো বেঁচে আছেন। তার একমাত্র মেয়ে আর বিষয় সম্পত্তি দেখাশুনা করেই তার সময় কেটে যায়। শীতের সকালে শিশির ভেজা ঘাসে হাঁটতে হাঁটতে বৃষ্টির মনে হলো আজ বৃষ্টি হলে মন্দ হয়না। যতই শীত করুক সে একটুর জন্য হলেও বৃষ্টিকে একটু ছুঁয়ে দেখবে। বৃষ্টিকে ছুঁলে সে কেন জানি এক অজানা মানুষের ছোঁয়া পায়। কে সেই মানুষ? মনের অজান্তে বাবার ছবিটা ভেসে ওঠে।

নানীর একমাত্র মেয়ে বৃষ্টির মা। বৃষ্টিও তার মায়ের একমাত্র কন্যা। নানীর এই বিশাল বিষয়-সম্পত্তি দেখাশুনার জন্য বেতনভোগী কর্মচারী রয়েছে বেশ কয়েকজন। সবাই এই গ্রামেরই বাসিন্দা। অনেকে আবার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। বৃষ্টির নানা জমিদারের নায়েব ছিলেন। গ্রামে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। এমন এক প্রভাবশালী পরিবারে বৃষ্টির জন্ম হলেও বৃষ্টি একেবারেই আলাদা। সহজ, সরল, স্নিগ্ধ একটা মেয়ে। গ্রামে তাদের নিজেদের একটা স্কুল আছে। বৃষ্টির বড় নানা সেই স্কুল দান করে গেছেন গ্রামের মানুষদের লেখাপড়ার জন্য। বাবাও নাকি ঐ স্কুলেই পড়তেন। বৃষ্টির মা একদিন কথায় কথায় বলেছিল। বাবা স্কুলের সেরা ছাত্র ছিল। বৃষ্টির বাবা যখন ঐ স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে তখন বৃষ্টির মা পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী। বৃষ্টি তার বাবাকে কখনো চোখে দেখেনি। ছবি দেখেছে। মায়ের সাথে স্টুডিও থেকে তোলা ছবি। বাবার বাম হাতটা মাকে জড়িয়ে ধরা। মা-বাবা দুজনেই দেখতে সুন্দর। সবার ধারণা বৃষ্টি তাদের দুজনের চেয়ে আরো বেশী সুন্দর। মাঝে মাঝে বৃষ্টির মনে আজগুবি সব ভাবনা পেয়ে বসে। আকাশটাকে তার কাছে মনে হয় বাবা আর তার নিজেকে মনে হয় সেই আকাশের এক চিলতে মেঘ। আর সেই মেঘই কোন এক সময় বৃষ্টি হয়ে লুটিয়ে পড়েছে তার মায়ের সমুদ্র কোলে।

বৃষ্টি তার মা-নানীকে বাবার কথা প্রায়ই জিজ্ঞেস করে। বাবার কথা বললেই তারা মুখ নীচু করে থাকে। তেমন কিছু বলতে চায়না বাবা সম্পর্কে। শুধু বলে বাবা নাকি ভীষণ মেধাবী আর আত্মভোলা মানুষ। কম্বিনেশনটা কেমন যেন খাপছাড়া মনে হয় বৃষ্টির কাছে। উচ্চ শিক্ষার জন্য বাবা নাকি তার জন্মের মাস তিনেক আগেই বিদেশ চলে যান। সেখান থেকে একটা বড় চাকরি নিয়ে বিদেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অনেকে বলেন মানবতার সেবায় নাকি তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। সংসারে থাকলে নাকি কোন সেবামূলক কাজ হয়না। তাই কাউকে কোন ঠিকানা দেননি। এমনও শোনা গেছে তিনি তিব্বতের কোন এক দুর্গম এলাকায় ভিক্ষুদের সাথে মেডিটেশন করে শীতকে জয় করার এক অভিনব কৌশল রপ্ত করেছেন। সেই কৌশল প্রয়োগ করে তিনি নাকি অনায়াসে এন্টার্টিকা ঘুরে আসবেন। নানা ব্যস্ততার অজুহাতে তিনি বৃষ্টির মা’কেও কোন চিঠি লেখেননি। বৃষ্টি তার মা’কে এখন আর তেমন কিছু জিজ্ঞেস করেনা। আকাশে মেঘ দেখলেই বাবার কথা মনে হয়। বাবা কে, কেমন সে কিছুই জানেনা। বাবার আদর স্নেহ সে পায়নি। তবুও মনে হয় অন্য সবার মতো তারও একজন বাবা আছেন। যে বাবা তার আদরের মেয়েকে খুব ভালবাসেন, স্নেহ করেন। বাবার হাতের ছোঁয়া বৃষ্টির খুব পেতে ইচ্ছে করে। তাই বৃষ্টি হলেই সে বৃষ্টিকে ছুঁতে চায়, বাবার স্পর্শ অনুভব করতে চায়। একবারের জন্য হলেও সে হিমালয়ের একটুকরো বরফ ছুঁয়ে দেখবে তাতে তার বাবার সামন্যতম উষ্ণতাটুকু যদি পায়। বৃষ্টি প্রাণ ভরে সেই উষ্ণতা নিতে চায়।

আজ আবার আকাশটা কেন জানি মেঘলা। কোথাও কী বৃষ্টি হচ্ছে? জন্মের সেই রাতের কথা মনে হয় বৃষ্টির। বৃষ্টি তখন এক অবুঝ শিশু। সারাটা আকাশজুড়ে সেদিনও ছিল মেঘ। অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছিল। মা তার শিওরে একা। প্রসব বেদনায় কাতর। সেই রাতে কী বৃষ্টির মাঝে তার মায়ের কান্না লুকিয়ে ছিল? স্বামী হারা এক স্ত্রীর নীরব কান্না। যে প্রিয়তম পুরুষের অমোঘ আলিঙ্গনে তার গর্ভে সন্তানের অস্তিত্ব- সেই সন্তান আজ তার ভূমিষ্ট হতে যাচ্ছে অথচ সেই মানুষটি তার কাছে নেই। তার প্রিয়তম স্বামী আজ তার কাছে নেই। আজ কেউ নেই তাকে আদর করার, শান্তনা দেবার। কেউ নেই তার প্রসব বেদনার প্রচন্ড কষ্টকে উপলব্ধি করার। ব্যথা ও বেদনায় কাতর এক অসহায় নারী আজ সত্যিই একা। ঠিক একা নয়। একমাত্র এক বুড়ি দাইমা তার পাশে। পাশের ঘরে মমতাময়ী মা তার জায়নামাজে বসা। বৈঠকখানায় ইমাম সাহেব উপস্থিত। ছেলে সন্তান হলে আযান দেয়া হবে সেই কারণে। বৃষ্টির মনের ভেতর এইসব কথা অনেক আগে থেকেই গাঁথা হয়ে আছে। অনেকবার শুনেছে। একটা পুত্র সন্তানের জন্য আকুল নানী বৃষ্টিকে অনেকদিন সে কথা বলেছেন। বৃষ্টিকে পেয়ে তিনি দুঃখ পেয়েছেন এমনটা যদিও তার কথায় মনে হয়নি। তবুও বৃষ্টির ধারণা তার নানীর খুব সাধ ছিল তার ঘরে একজন নাতি আসুক। বৃষ্টি আভাষে ইঙ্গিতে এমনটাই ধারণা করেছে।

সেই রাতে বৃষ্টির মায়ের চোখের এক কোণায় বৃষ্টির মত দু’এক ফোঁটা জল গড়িয়েছিল কিনা বৃষ্টি জানেনা। বৃষ্টি এখন বড় হয়েছে। অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছে। তার স্নেহময়ী মা আশে পাশের অনেক মানুষের অনেক উপহাস উপেক্ষা করে তাকে পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছে। এক ফুটফুটে দুধের মতো শিশুকে তার বাবার কোলে তুলে দেবার সাধ হয়তো তার পূরণ হয়নি। তবে বৃষ্টি জানে তার মা তাকে পেয়ে একাকীত্বের যাতনা অনেকখানি ভুলে গেছেন। বৃষ্টি এখন অনুভব করে সেই রাতের সেই অবিরাম বর্ষণ হয়তোবা এক মায়ের করুণ কান্না হয়েই ঝরেছিল। প্রসব বেদনায় কাতর এক মায়ের আর্তি প্রকৃতির নির্ঘুম শব্দ ভেদ করে অন্য কারো কানে না পৌঁছালেও বৃষ্টি একা শুয়ে শুয়ে সেদিন তা শুনেছিল। বৃষ্টির কান খোলা ছিল। শুধু হাত বাড়িয়ে সেই বৃষ্টিকে ছুঁতে পারেনি। বলতে পারেনি- বাবা আমি তোমাকে একটিবাবের মতো ছুঁতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। আমার গালে মায়ের দু’ফোটা অশ্রু জমা হয়েছিল। তার উষ্ণতা আমি টের পেয়েছি। তুমি আমায় ছুঁয়ে গেছে। আমি ঠিক টের পেয়েছি বাবা- মায়ের চোখে সেদিন তুমিই ছিলে। বাবা তুমি মাকে কাঁদিয়েছো। আমাকেও কী এভাবে কাঁদাবে?
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১০:৫৬
১৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×