ফিরে আসা (৩য় পর্ব)
(একটা উপন্যাস লেখার অপচেষ্টা এভাবেই শুরু করেছিলাম। কিন্তু লেখার আলসেমির কারণে আর এগুতে পারিনি। যতটুকু লিখেছি পাঠকদের সাথে সেটুকুই শেয়ার করছি। একটু কঠোর ও বাস্তবধর্মী মতামত/মন্তব্য আশা করছি।)
জানালা দিয়ে আলো ঢুকতেই ঘরটা অনেকটা আলোকিত হয়ে উঠলো। সবকিছুই এখন দৃশ্যমান। ঘরের এক কোণ জুড়ে বিশাল এক মেহগনী কাঠের খাট। পালঙ্ক বলা যায়। পাশেই মাঝারী আকারের একটা কাঠের টেবিল। পাশে সেগুন কাঠের একটা চেয়ার। দরজার পাশ ঘেঁষে পুরোনো একটা খোদাই করা কাঠের আলমিরা। অঞ্জন জানে ঘরের এই আসবাবপত্রগুলো মায়ের খুব প্রিয়। এই ঘরে এগুলো ঢোকার আর কখনই তা বাহিরে বের করা হয়নি। টেবিলের পাশের চেয়ারটায় বসে মা লিখতেন। কী লিখতেন সেটা জানা হয়নি। প্রয়োজন হয়নি কখনো। তবে তার কাছে যেসব চিঠি মা লিখতেন তা এই টেবিলে বসেই লিখতেন তা সহজেই বলা যায়। অঞ্জন বিদেশে চলে আসার পর নিয়মিত বিরতিতে মায়ের চিঠি পেতো। বাড়ীতে যেহেতু কম আসা হতো তাই চিঠিতেই মায়ের সব খোঁজ খবর পেতো।
দেশে ফিরলেও অঞ্জন কখনো একটানা বেশীদিন থাকতে পারতোনা। অল্পকিছুদিনের ছুটিতে আসতো। মা সেই সময়টায় সকল কাজ ফেলে অঞ্জনকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। তাকে ভাল-মন্দ খাওয়ানো, এটা সেটা রান্না করে দেখতে দেখতেই সময় চলে যেত। দাদীও তাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তার বিদেশ জীবনের, হোস্টেল জীবনের, বিদেশী মেয়েদের সম্পর্কে নানান গল্প শুনতেন। তার কাউকে পছন্দ হয়েছে কিনা সেটাও জানতে চাইতেন। অঞ্জন এসব কথায় লজ্জা পেত। আজ সব ভাবনা ছাড়িয়ে অঞ্জনের একটাই প্রশ্ন মা তাকে কি যেন বলতে চেয়েছিলেন। কি বলতে চেয়েছিলেন জানতে হবে। মায়ের না বলা কথাগুলো নিশ্চয়ই তার জন্য লিখে রেখে গেছেন। অঞ্জন সেই লেখাগুলো খুঁজে বের করতে চায়। সেই লেখাগুলো সে সাথে করে নিয়ে যাবে। আরো একটা প্রিয় জিনিষ সে নিয়ে যেতে এসেছে- বাবার হাতে আঁকা মায়ের একখানা ছবি।
দেয়ালের দিকে চোখ যেতেই অঞ্জনের চোখ খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মায়ের সেই ছবিটা আজো তেমনি আছে। ঠিক সেভাবেই দেয়ালে টাঙ্গানো আছে। মা যেন তার দিকে তাকিয়ে হাসছেন, বলছেন- “কি রে খোকা এলি! এতোদিন পর মা’কে মনে পড়লো!” অঞ্জন হাত বাড়িয়ে মায়ের ছবিটা ছুঁয়ে দেখলো। মায়ের ছবির চোখের নীচে হাত বুলিয়ে দিল। অঞ্জন বিড় বিড় করে বলে ওঠে, “মা আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমাকে শেষ দেখাটা দেখতে পারিনি। তোমার কবরে এক মুঠো মাটি দিতে পারিনি। আজ আমি ফিরে এসেছি। তোমাকে এবার সাথে করে নিয়ে যাবো। তোমাকে চব্বিশ ঘন্টা আমার চোখের সামনে রেখে দেবো। মা আমাকে দোয়া করো”।
ছবির সামনে থেকে সরে এলো অঞ্জন। এরপর ধীরে ধীরে টেবিলের সামনে গেলো। টেবিলের দুদিকে দুটো ড্রয়ার যুক্ত। টেবিলের ঠিক ওপরেই বেলজিয়াম কাঁচের গোলাকৃতি একটা আয়না। টেবিলের উপর ধূলোর পুরু আস্তরণ। সেই ধূলোয় ঢাকা পড়ে আছে কিছু খাতা, কিছু পুরোনো বই- গীতাঞ্জলী, গীতবিতান, বিষের বাঁশী, মেজ বউ, কপাল কুন্ডলা আর পথের পাঁচালি। টেবিলের এক কোণে কালি শুকিয়ে যাওয়া কালির দোয়াত পাশেই কলমদানি। সেই কলমদানিতে গোঁজা একটা ঝর্ণা কলম। টেবিলের অন্য কোণে- উলের কাঁটা, সূঁচ-সূতোর বাক্স, কাঁচি, চুলের কাঁটা, ফিতে, কাজলদানি আরো কিছু টুকটাক জিনিষ। অঞ্জন সবকিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলো। সব কিছুতেই তার মায়ের হাতের স্পর্শ অনুভব করলো। চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে গেল অঞ্জনের। চোখ বেয়ে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। মনে মনে উচ্চারণ করলো, “আই লাভ য়্যু মাম, আই মিস য়্যু, আই রিয়্যালি মিস য়্যু মাম”।
চলবে কিনা জানিনা-----

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



