বন্ধু হতে চাই (বন্ধু দিবসের করচা)
এই ব্যস্ত শহরের আলো ঝলমলে ভূবনে আমার থাকা না থাকা এখন এক পুরোনো বৃক্ষের মত। বাড়তি উচ্ছাস নেই, অকারণ কোন বিষাদ নেই, ঠিকমত যত্ন নেই, আবার মায়ার কারণে কেটে ফেলতেও আপত্তি। এসবই প্রকৃতির বিধান। তাই আলাদা করে ভাল বা মন্দ থাকার কথা লিখতে মন চাইছে না। বেঁচে আছি এটুকুই সান্তনা। জীবনের বেশীর ভাগ সময় কেটে গেছে নানা ভুলভ্রান্তির মধ্যে দিয়ে। উপলব্ধির সীমানায় পৌঁছানোর আগেই বয়ে গেছে অনেক জলের ধারা। মেধা, সময়, অর্থ ও ভালবাসা বিলিয়ে যা কিছু অজর্ন করেছি-আমাদের তথাকথিত সমাজে তার এক কানাকড়িও মূল্য নেই। তাই কোন বন্ধু বা হিতৈষীর পাঠানো একটা মেইল বা এসএমএস পড়ে যখন নিজের অজান্তেই হেসে উঠি তখন সমাজের অতি হিসেবী মানুষগুলো ভ্রু কুঁচকে বলবে, "কী একটা পাগল মানুষরে বাবা। বোকা কোথাকার!”
তারা যদি আজ আমার নিকট অতীতে হারিয়ে যাওয়া সময়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়াতো তবেই এর মূল্য বুঝতো। আমার শুকনো ফুলের মত নেতিয়ে যাওয়া অনুভূতির সামান্যটুকু তারা যদি ধারণ করতো, তাহলে বুঝে নিতো একটা মেইল বা এসএমএস কী বিপুল পরিমাণ ভাললাগা নিয়ে হাজির হয় হৃদয়ের মরু প্রান্তরে। কী প্রচন্ড নাড়া দেয় এই হৃদপিন্ডকে। সেটা আমি উপলব্ধি করতে পারি। তৃষ্ণার্ত চাতক পাখীর মত এই যাযাবর জীবনের বিরান উঠোনটা সাজিয়ে বসে থাকি। উন্মুখ হয়ে থাকি একটা মেইল বা একটা এসএমএস-এর জন্য। পৃথিবীর নানা প্রান্তে আমার যে সব প্রিয়জনেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদেরকে নিমিষেই কাছে পাই। অনুভব করি তাদের একান্ত সান্নিধ্য। ভাবি দূরে থেকেও তারা এই মুহূর্তে কত কাছে!
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মনে হয় এই বুঝি সেই কাঙ্খিত বৃষ্টি! আমি যার অপেক্ষায় আছি। সেই তরঙ্গবাহী ইথারের বার্তা আমার মনের শুষ্ক জমিন ভিজিয়ে দিয়ে যায় এক পশলা আন্তরিক জলের ধারায়। আমি সেই জলে মিটিয়ে নেই আমার বুকে জমে থাকা প্রচন্ড তৃষ্ণা। বার্তা পড়া শেষ হলেই বুকের মধ্যে জেগে ওঠে এক চাপা হাহাকার। মনে মনে ভাবি একদিন আমিও ছিলাম সবার জন্য তেমনি এক জলের উৎস। এমনও ভাবি- আবার কখনও কী ফেরা হবে সেই শেকড়ে? আবার কী জমবে সেই উৎসবের মেলা? আবার কী প্রিয় কোন চেনা মুখ হাজার মানুষের ভীড়ে হাত নেড়ে ডেকে বলবে, তোমাকে খুঁজে পাবো ভাবিনি। আবারও কী কারও বিশ্বস্ত কাঁধে হাত রেখে হেসে উঠতে পারবো- ফেলে আসা সেই অতীতের মতো?
কালের বির্বতনে অতীত ফিরে আসে শুনেছি। তবে এক জীবদ্দশায় তা হয়তো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই চলার পথে আমি অদ্ভুত আর বিচিত্র সব দুঃখবোধগুলো কুড়িয়ে নেই। সময়ের কোলে কোলে একদিন তা বড় হবে এই ভেবে। একদিন সেইসব দুঃখের পালক এক এক করে খসে পড়বে। আমার সকল শুভাকাঙ্খীর মাথায় সেইসব পালকে সাজানো মানবতার মুকুট শোভা পাবে। সেদিন তারা ঘরের কোণে রেড ইন্ডিয়ানদের মত সৌভাগ্যের প্রতীক ভেবে সাজিয়ে রাখবে সেই সব দুঃখ-পালক।
আমার চারপাশে সময় নামের কাঁটাতারের বেড়া। আমি হাজার চেষ্টা করেও সেই বেড়া টপকাতে পারিনা। তাই কাছে দূরের অনেকের সাথেই পাশাপাশি বসে প্রাণভরে কথা বলতে পারিনা। আমার হাতে কোন শেকল নেই, পায়ে কোন বেড়ী নেই- তবুও কী অদ্ভুত এক বন্দীশালায় আমার জীবন কেটে যাচ্ছে। মনের মত মানুষ বিবর্জিত কোন জায়গা যে বন্দীত্বের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে তা এই প্রথম টের পেলাম। আমার চারিপাশের মানুষের সাথে আমার মানবিক দূরত্ব হয়তো তেমন একটা নেই। তবে মানসিক দূরত্বটা অনেক বিশাল। মানুষের মাঝে থেকেও নিজেকে মানুষ ভাবতে ভয় হয়। কী এক অদ্ভুত মানসিকতা আমার ভেতর সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিজেকে মনে হয় পরিবেশের সাথে খাপ না খাইয়ে নিতে পারা বিলীন প্রজাতির কোন ডাইনোসোর।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। শ্রেষ্ঠত্বটুকু বাদ দিলে শুধুই জীব। আর জীব মানেইতো পশু। আমি পশুত্বকে বর্জন করতে চাই। পশুত্ব বাদ দিলে তবেই পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবো। আমি আমার কাছের সবাইকে মানুষ ভাবতে চেষ্টা করি। আমার আশেপাশে পরিচিত সবাই নির্দ্দিষ্ট কোন এক সামাজিক গন্ডির মধ্যেই আবর্তিত হয়। তাদের পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক বলয় ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্ন। তাদের সাথে আমার মানসিক তফাৎ থাকাটা স্বাভাবিক। তবুও কাউকে এড়িয়ে যেতে পারিনা। অনেকেই হয়তো সম্পর্কের সূক্ষ্ম দেয়াল তুলে পারস্পারিক ব্যবধান রচনা করে। আমি অনেক সময় সেই দেয়াল ভাঙ্গতে বা অতিক্রম করতে পারিনা। আর পারিনা বলেই মানসিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। অদৃশ্য এক পার্থক্য বা দ্বন্দ্ব অনেক সময় মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে নষ্ট করে দেয়। আমি তা কখনোই চাইনা। আমি বৃত্তের বাইরে থেকে নয় বৃত্তের মধ্যে থেকেই তাদের মানসিক দূরত্বগুলো ঘুচাতে চাই। আর এই দূরত্ব ঘুচানোর নিমিত্তেই সবাইকে বন্ধু ভাবতে চাই। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে চাই।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০০৯ সকাল ১০:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



