“যুদ্ধ নয়, শান্তি”- এক দুঃস্বপ্ন
একি! আমার পরণে ধর্মযাজকের পোষাক! আমিতো ধর্মযাজক নই। আমি এক সাধারণ বিপ্লবী। বিপ্লবের মন্ত্রে আমি উদ্বুদ্ধ। আমার চেতনায় ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। আমি স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণকারী এক জীবন্ত বোমা। অথচ আজ আমার পরণে সাদা আলখেল্লা। সবার চোখে আমি আজ ধর্মযাজক। আমাকে শান্তির দূত ভেবে আমার হাতে শ্বেত কপোত ধরিয়ে দিলো। অথচ আমার শরীরে লুকানো সময়-নিয়ন্ত্রিত শক্তিশালী বোমা। আমার বুক পকেটে সচল বোমা-ঘড়ি। কাঁটাটা নিঃশব্দে ঘুরে চলেছে নির্দ্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষায়! হাতের পায়রাগুলো কেমন যেন অস্থির! মৃত্যুর অপেক্ষায় ডানা ঝাপটাচ্ছে। শরীরে জড়ানো মরণঘাতি বোমা বিষ্ফোরণের প্রতীক্ষায়। আমার হাত একটুও কাঁপছেনা। পাশের চেয়ারে বসে আছে যুদ্ধবাজ এক নরপিশাচ। মুখে যার তথাকথিত শান্তির বাণী। বিশ্বজয়ের মুকুট তার মাথায় জ্বলজ্বল করছে। অমিত ক্ষমতাধর, প্রচন্ড প্রতাপশালী সে এক যুদ্ধবাজ নেতা। শেষবারের মতো দেখে নিলাম তাকে। বসে আছে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। তাকিয়ে দেখছে আমার হাতে ধরা পায়রাগুলো কখন উড়বে। “যুদ্ধ নয় শান্তি” এই বার্তা নিয়ে খোলা আকাশে পায়রা উড়বে আর সে ওড়াবে শান্তির পতাকা। আমি ধর্মযাজক, আমার মুখে উচ্চারিত হবে শান্তির বাণী, প্রকম্পিত হবে চারিদিক। আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হবে সেই শান্তির বাণী।
নির্ধারিত সময়ে আমি হাতের পায়রাগুলো উড়িয়ে দিলাম খোলা আকাশে। সাথে সাথে আমার একটা হাত দ্রুত চলে গেল বুক পকেটে লুকিয়ে রাখা একটা গোপন বোতামে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম নরপিশাচটার দিকে। কোলাকুলির ছলে জাপটে ধরলাম তাকে। মুহূর্তেই প্রচন্ড বিষ্ফোরণ। মঞ্চ প্রকম্পিত হলো, লন্ডভন্ড হলো চারিদিক। আমি এই প্রথম মৃত্যুর স্বাদ উপলব্ধি করছি। বুঝতে পারছি শক্তিশালী বোমার আঘাতে আমি ছিন্নভিন্ন। দাপাদাপি করছে দেহের টুকরো মাংশপিন্ডগুলো। আত্মাটা এখনো মরেনি হয়তো। বুঝতে পারছি সবই। আমার পাশেই পড়ে আছে সেই যুদ্ধবাজ নরপিশাচের রক্তাক্ত ও বিকৃত ছিন্নভিন্ন লাশ। মনে পড়লো সেইসব অসহায় ও নিষ্পাপ নারী ও শিশুদের। যাদের রক্তে এই যুদ্ধবাজ নেতা বিকৃত উল্লাসে হোলি খেলে আসছিল নিরীহ মানুষের জনপদে। আহ্ কি শান্তি! আজ নিজেই সে আমার পাশে ছিন্নভিন্ন লাশ। আত্মঘাতি এমন এক মৃত্যুর মাঝেও আমি উল্লাসে ফেটে পড়লাম। মৃত ও ছিন্নভিন্ন লাশ হয়েও আমার মাঝে কী এক জীবন্ত অনুভব! আমি ঐ যুদ্ধবাজ নরপিশাচটাকে এভাবেই বধ করবো এমন স্বপ্নই দেখে এসেছি দীর্ঘকাল। আমার মৃত্যুর বিনিময়ে হলেও আমি লাখো মানুষের জীবন ছিনিয়ে আনবো তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এমন এক স্বপ্ন ছিল আমার চোখে।
আশ্চর্য! মৃত্যুর পরেও আমার বোধ কাজ করছে। যদিও আমার গলা শুকিয়ে আসছে। আমি ক্রমশঃ মৃত্যুর কোলে ঢলে পরছি। ক্ষীণস্বরে অথচ দৃপ্ত প্রত্যয়ে বলে চলেছি- “হে শান্তিকামী বিশ্বের মহান প্রতিনিধিগণ, আমাকে ধর্মযাজক ভেবে যে বিশ্বাসে আপনারা ডেকেছেন আমি সেই বিশ্বাসকেই অন্তরে ধারণ করে কিছু কথা বলতে চাই। স্বাধীনতাকামী মানুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে যে অমানবিক আচরণ ও ধ্বংশযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে তা বন্ধের দাবী তুলছি। জাতিতে জাতিতে সংঘের নামে যে সংঘাতে আপনারা মদদ দিচ্ছেন তা এখনই বন্ধ করুন। শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে আর কোথাও যুদ্ধ হবেনা এমন ঘোষণা শুনতে চাই। আজ থেকে বন্ধ হোক তথাকথিত শান্তি মিশনের আড়ালে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। শিশু হত্যার নামে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা বন্ধ হোক চিরতরে"। এই কথাগুলো সবাইকে জানানোই ছিল আমার মিশন। "আমি ধর্মযাজক, আমি জানি আত্মহত্যা মহাপাপ। মানবতাকে যেখানে প্রতিনিয়ত নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে সেই হত্যার কাছে আমার এই আত্মহত্যা অনেক তুচ্ছ একটা ঘটনা। মানবতা বিরোধী এমন বর্বরতার প্রতিবাদে আমি হাজারবার আত্মঘাতি হতে পারে। নিকৃষ্ট ও পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের মাঝে আমার এই আত্মহত্যা কখনোই পাপবিদ্ধ করবেনা"। আমিন”।
আমি মৃত্যুর কোলে ঢলে পরলাম। দূরে ঢং ঢং করে গীর্জার ঘন্টা বেজে চলেছে। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি দূরে কোন এক মাইক থেকে ভেসে আসছে পবিত্র আযানের ধ্বনি। দুঃস্বপ্নের ঘোর কেটে গেল। সারা শরীর আমার রক্তে নয়, ঘামে ভিজে আছে। উফ্! কী ভয়ানক দুঃস্বপ্ন! আমি কী এখনো বেঁচে আছি! তাইতো! বেঁচেইতো আছি!
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই নভেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৫:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



