somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দরবেশ - কহলিল জিব্রানের The Prophet-এর বঙ্গানুবাদ : ১

০১ লা মে, ২০০৮ দুপুর ২:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(আমি গত কয়েক বছর ধরে কহলিল জিব্রানের সমগ্র সাহিত্যকম্র্ম অনুবাদ করে চলেছি। এখনও পর্য্যন্ত কোনকিছুই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। আমি এখানে বাংলাদেশের পাঠকের জন্য জিব্রানের বহুখ্যাত The Prophet- এর ধারাবাহিক অনুবাদ প্রকাশ করব বলে মনস্থ করেছি। আপনারা সকলে পড়ে যদি গঠনাত্মক সমালোচনা করেন তবে আমি প্রয়োজন মত পরিমার্জ্জন ও সংশোধন করতে পারি। আশাকরি আপনাদের কাছ থেকে সেই অনুগ্রহ লাভে আমি বঞ্চিত হব না।)

১.
সবার প্রণীত সবার প্রণত আল্ মুস্তাফা সে নিজেই তার দিবসসন্ধ্যার ঊষাউন্মেষ, দ্বাদশবর্ষ ধরে অপেক্ষা করে আছে অর্ফালিজ নগরে তার জাহাজের প্রতীক্ষায়, তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে স্বভূম জন্মদ্বীপে তার।
এবং সেই দ্বাদশ বর্ষের নবান্নের মাস আইলুল সপ্তম দিবস তার সমাগত। নগরপ্রাচীর ছাড়িয়ে পর্ব্বতে আরোহণ করল সে দৃষ্টি প্রসারিত করল বহুদূর সমুদ্র বরাবর, আচ্ছন্ন কুয়াশায় ভেসে আসছে যেন জাহাজ কার।
হৃদয় তার রুদ্ধ আগল ভেঙ্গে বেরিয়ে পড়ল আত্মহারা আনন্দে বিহঙ্গগামী হ’ল বহুদূর সেই সমুদ্রে, নৈঃশব্দে চক্ষুদয় তার মুদ্রিত করল সে প্রার্থনামগ্ন হ’ল ধ্যানস্থতার।

এবং পর্ব্বত পাদদেশে অবতরণ করল যখন সে আত্মমগ্ন বিমর্ষতায় তলিয়ে গেল যেন, অন্তরাত্মায় তার গর্জ্জে উঠল হাজারো ভাবনার কোলাহল:
এ কেমন দুঃখশোকে বিদীর্ণ হ’য়ে শান্তিতে চলে যাব আমি? না, কিছুতেই পারব না আমি এই নগর ছেড়ে চলে যেতে হৃদয়ে যে আমার ক্ষতিবক্ষত হলাহল।
কত বেদনাদীর্ণ দিবসসন্ধ্যা কেটেছে আমার এই নগরপ্রাকারের সান্ন্যিধ্যে, কত নিশিযামিনী কেটেছে আমার নিঃসঙ্গ একাকীত্বে, অননুশোচনায় কেউ কি পারে তার দুঃখবেদনা ও নিঃসঙ্গতা সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে?
কতশত স্মৃতিবিস্মৃতি ছড়িয়ে আছে এই পথ জুড়ে, কতশত নিরাবরণ শিশুসঙ্গে আজন্ম শৈশব আমার হেঁটে বেড়িয়েছে ওইসব দূর পাহাড়-পর্ব্বতে। কী করেই বা পারি আমি নির্ভার দুঃখযন্ত্রণায় সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে।
ছেড়ে চলেছি যা তা তো আমার আবরণ উন্মোচন নয়, এ তো আমার স্বহস্তে গাত্রচর্ম্ম নির্ম্মোচন
এ কি নিজের স্মৃতিবিস্মৃতি পশ্চাতে ফেলে যাওয়া আমার? আমি তো ফেলে চলেছি ক্ষুৎতৃষ্ণায় আর্ত মধুর আমার প্রার্থিত হৃদয়, এ তো আমার আত্ম-বিমোচন।
তবুও আর অপেক্ষা নয়, মুহূর্ত কালও বিলম্ব নয় আর
যে সমুদ্রসিন্ধু সবকিছুকেই নিজের গভীরে সমাহিত করে নেয় আমি আহ্বান পেয়েছি তার, আমাকে যেতেই হবে অচিরাৎ সমুদ্রযাত্রায়, আহ্বান দুর্নিবার।
প্রহর গড়িয়ে নিশান্ত হ’ল, যদি রয়েই যেতে হয় তবে হিমশীতল ষ্ফটিকে গহ্বরিত হব আমি।
ইচ্ছা হয় সঙ্গে নিয়ে যাই ইথাকার সবকিছু, হায়! কেমন করেই বা সম্ভব তা জানে বুঝি অন্তর্যামী।
ওষ্ঠের ডানায় ভর করে জিহ্বা কেমন করেই বা মুখের ভাষায় বয়ে নিয়ে যাবে তাকে, মেঘলোকের সন্ধানে সন্ধানী হতেই হবে যে একাকী তাকে
এবং একাকীত্ব সঙ্গ করেই নীড় ছেড়ে ডানা মেলতে হবে সেই একাকী ঈগলকে।

পর্ব্বতের সানুদেশে এসে দৃষ্টি প্রসারিত করল সে সমুদ্র বরাবর আবার, জাহাজ ভিড়তে চলেছে বন্দরে
পোতশীর্ষে নৌবাহিকের দল আর তার স্বদেশবাসী, সম্মুখ সমুন্দরে।

চিৎকার করে উঠল সে তার অন্তরাত্মায়:
হে আমার আদিম মাতৃকার সন্তান সকল, জোয়ারের সওয়ার উদ্দাম উত্তাল হাওয়ায়
কতশত বার আমার শয়নে স্বপনে পাল তুলেছ, কতশত বার তোমরা ফিরে এসেছো আবার আমার জাগরণের গভীরতর স্বপ্নে, বিভোর নিদ্রালসতায়।
প্রস্তুত আমি, আকুল ব্যাকুলতা যতসব পাল তুলে আছে পবনবাতাসের প্রতীক্ষায়
এই নিস্পন্দ মলয়বাতাসে আর একটি বারের জন্য নিঃশ্বাস নেব আমি, আমি শুধু আর একটি বার পিছন ফিরে তাকাবো প্রেমার্দ্রতায়, করুণা বিগলিত জাহ্ণবী ধারায়।
তারপর তোমাদের মাঝে গিয়ে দাঁড়াবো আমি, সমুদ্রযাত্রীর মধ্যে আরও একজন আমি সমুদ্রাভিলাষী যাত্রী
আর তুমি বিপুলা বারিধি অকূল পাথার আমার নিদ্রাঘাত জননী ধরিত্রী।
তুমিই সকল স্রোতোস্বিনী ঝর্ণার শান্তিস্বস্তি ওজস্বিনী
এই স্রোতোস্বিনী আরও একবার কোন বাঁকে মোড় নেবে, আরও একবার মর্ম্মরিত হবে বনবীথি তেজস্বিনী
তৎণাৎই তোমার সামীপ্য লাভ করব আমি যেন নির্বাধ এক পতনবিন্দু অবাধ অসীম মহাসিন্ধু সাগরে।
যেতে যেতে লক্ষ্য করল সে নারীপুরুষের দল সব ছুটে আসছে দূরদূরান্ত থেকে ত্রস্তপদে নগরপ্রাকারের দিকে তাদের শস্যক্ষেত্র তাদের দ্রাক্ষাবাগিচা ছেড়ে
শুনতে পেল সে তারা তার নাম ধরে আবাহন করছে, দিগ্বিদিগ জুড়ে তারা তার জাহাজ আগমনের বার্তা সকলকে বিদিত করছে সোচ্চারে।
এবং স্বগোতোক্তিতে বলল সে নীরবে:
এই বিচ্ছেদের দিন কখনও কি মহাসম্মেলনের দিন হবে?
এই সায়াহ্ণবেলা আমার সত্যই কখনও কি প্রত্যুষের কিরণে কিরণিত হবে?
শস্যক্ষেত্র ছেড়ে লাঙ্গল ফেলে ছুটে এসেছে যে তাকে কী দিয়ে যাব আমি?
পেষাইযন্ত্র থামিয়ে দ্রাক্ষাক্ষেত ছেড়ে ছুটে এসেছে যে প্রতিদানে তাকেই বা কী দিয়ে যাব আমি?
হৃদয়বৃক্ষ কি আমার আনত হতে পারে না ফলভারে যে তাদের জন্য ফল ঝড়িয়ে দেব অকাতরে?
যা কিছু ইচ্ছা অভিলাষ আমার ফল্গুধারার মত দিতে পারে না কি তাদের শূন্য পেয়ালা ভরে অকাতরে?
আমি কি সেই বাদ্যবীণা গুঞ্জিত হব সেই সর্ব্বশক্তিমানের হাতের ছোঁয়ায়, না কি আমি সেই সুরবাঁশী যাতে রণিত হবে তাঁর শ্বাসবায়ু?
পরম নৈঃশব্দ খুঁজে ফিরে নৈঃশব্দের আশ্চর্য্য ঐশ্বর্য্য লাভ করেছি আমি, পরম বিশ্বাসে বিলিয়ে দিয়ে যাব কি আমি সেই পরম পরমায়ু?
এই যদি ফসল তোলার দিন হয় আমার তবে কিভাবেই বা জানব আমি কোন সেই বিস্মৃত ঋতুতে বীজ ছড়িয়েছি আমি কোন সেই জমিতে?
এই যদি লন্ঠন তুলে ধরার মুহূর্ত হয় আমার তবে তার সেই প্রজ্জ্বলিত শিখা তো আমার নয় কোন মতে
আমি তুলে ধরব প্রগাঢ় অন্ধকার সেই শূন্য লন্ঠন
যাঁর হস্তে রাত্রির অভিভাবকত্ব সমর্পিত তিনিই তাতে জ্বালানী তেলে আলোক সংলাপ করবেন, অন্ধকারের অনবগুন্ঠন।
(ক্রমশঃ প্রকাশিতব্য...)
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মে, ২০০৮ রাত ১২:০৭
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×