প্রিয় ব্লগার বন্ধুরা আজ আপনাদের জানাবো দিন দিন একটি মানুষ থেকে 'ভুত' এ পরিণত হওয়া একটি দুর্ভাগা জাতির কথা। আমার আজকের 'ক্যাচাল' এর বিষয় হচ্ছে এটাই যা নিয়ে এখন একটু 'প্যাঁচাল' করবো
মূল ক্যাচাল- আমাদের বাংলাদেশের রয়েছে হাজার বছরের শিল্প ও সংস্কৃতির একটি সমৃদ্ধশালী ভাণ্ডার। যার মাঝে রয়েছে 'বাঙলা গান'। যুগে যুগে সভ্যতার আধুনিকতার ফলে এই বাংলা গানে যুক্ত হয় 'ছায়াছবির গান'। যা বাংলা গানের ভাণ্ডার কে করেছে আরও সমৃদ্ধশালী।
গত শতাব্দীর ৫০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৫৪ সালে প্রয়াত আব্দুল জব্বার এর হাত ধরে প্রথম তৈরি হয় 'মুখ ও মুখোশ' নামের প্রথম সবাক বাংলা চলচ্চিত্র । সেই থেকে শুরু হয় নতুন এক ধারার গানের বিপ্লব। বাংলা ছায়াছবির সবগুলো জনপ্রিয় গান যা যুগ যুগ ধরে দর্শক ও স্রোতাদের মনে থাকবে তা সৃষ্টি হয়েছে ১৯৬০- ২০০০ সাল পর্যন্ত। বাংলা ছায়াছবির গানের কথায় ও সুরে যে কত ভিন্নতা ছিল তা না শুনলে ও না জানলে কেউ বিশ্বাস করবে না । ফোক- ফ্যান্টাসি থেকে আধুনিক, মারফতি, জীবনমুখী, ভাওয়াইয়া, পল্লীগান, রাজনৈতিক প্রতিবাদী,রোমান্টিক, বিরহ,সুখ- দুঃখ, পারিবারিক, দেশাত্মবোধক, ব্যাঙ্গাত্তক কি ছিল না সেখানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল! স্বাধীনতার পর একটি মাত্র রেডিও স্টেশন (বাংলাদেশ বেতার) ও বিভিন্ন জেলা শহরে তার সম্প্রচার কেন্দ্র ছিল। সারা বাংলাদেশের মানুষের জন্য যা সবার কাছে খুব প্রিয় ছিল এই 'বাংলাদেশ বেতার' । একসময় শুধু গ্রামের মানুষ রা রেডিও শুনতো না, শহরের অনেক শিক্ষিত জনেরাও রেডিও শুনতো শুধু বাংলা ছায়াছবির গানগুলো বারবার শুনার জন্য। আর এখন রেডিও অনেক কিন্তু শ্রোতা শুধু মাত্র শহরের এক শ্রেণীর আধুনিক তরুণ তরুণীরা। যেখানে কোন শিল্প নেই ,আছে স্রোতাদের টানার জন্য আজগুবি ' ভুতের গল্প'র মতো বাস্তবতা বিবর্জিত অনুষ্ঠান আর কে কত বেশী ভজঘট গান শুনাতে পারে তার প্রতিযোগিতা । আবার রেডিও'র নামও 'ভুত এফ এম' যার অর্থ যারা সেখানে কাজ করছে তাঁরা সবগুলোই ভুত ও ভুতের বাচ্চা, আর যা শুনছে তারাও 'ভুত ও ভুতের বাচ্চা'!! তাইতো আজ সারা দেশে অপমৃত্যুর ( খুন,সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা) সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিশুকালে গল্পে ছলে মা, খালার মুখে 'ভুতের গল্প' শুনতাম। যা ছিল আমাদের ভয় দেখানোর তাঁদের একটা কৌশল। এক সময় জানলাম 'ভুত' বা 'প্রেতাত্মা ' বলে কোন কিছু নাই। বিভিন্ন মুভিতে দেখানো হতো কোন অপমৃত্যুর ফলে মৃত্যু ব্যক্তিটি 'প্রেতাত্মা ' হয়ে তাঁর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করে যাকে আমরা বলি ' হরর মুভি' । যাই হোক , সেইটা কোন সমস্যা নয়, সমস্যা হলো কোন জাতির প্রচার মাধ্যম যদি 'ভুত' নামে শুরু হয় আর সেখানে ভুত নিয়ে বিভিন্ন গল্প- কাহিনী শুনিয়ে তা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ হয় তাহলে কি আমরা বুঝবো যে ঐ মানুষগুলির উপর 'প্রেতাত্মা' বা' ভুত ' আছর করেছে এবং তাঁরা ভুতের একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাচ্ছে? যাদের মূল টার্গেট হলো আধুনিক 'টিনএজার' বা উঠতি তরুণ তরুণী। যারা আবার সেই বিষয়ে 'ফেইসবুকে'র মতো একটি বিশ্ব যোগাযোগ মধ্যমে স্ট্যাটাস দেয় ' কাল 'ভুত এফ এম' এর গল্প শুনে সারারাত ঘুমাতে পারিনি' অথবা ' আমি এখন বিদায় নিলাম ভুতের গল্প শুরু হয়ে যাচ্ছে তা শুনতে হবে'' এই জাতীয় 'স্টুপিড' টাইপের স্ট্যাটাস আর সেখানে বাকী বন্ধুরা কমেন্ট করে করে দীর্ঘ আলোচনা শুরু করে দেয়। অথচ আমাদের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার এর অনেক কিছু আজ নতুন প্রজন্ম জানে না, যার ফলে তাঁরা সেইসব বিষয়ে রুচিহীন মন্তব্য করে, অথবা তাঁদের কাছে তা শোনা ও জানা টা হলো রুচিহীন অশিক্ষিত শ্রমিক শ্রেণীর কাজের মধ্য পড়ে। এর জন্য দায়ী কে? ঐ আধুনিক উঠতি তরুণ তরুণের চেয়ে দায়ী হলো আমাদের প্রচার মাধ্যমগুলো। আমরা শুধু সবাই দুঃখ করে বলি ' আমাদের দেশের ছবির মান খুব খারাপ'' এইটুকুই পর্যন্ত আমাদের দৌড় তা জেনে দেই বা না জেনে দেই শুধু এই কারণটা বললেই সব মাফ। আরে "ভুতের বাচ্চারা" একবারও কি ভাবলি না যে আমাদের দেশের ছবির বাজার কতটুকু? বাজেট কতটুকু? এই বাজেটে ও এই বাজারে সীমিত কারিগরি সহায়তা দিয়ে যদি হলিউড এর স্পিলবারগ, মেল গিবস,বলিউড এর ফারাহ খান , ফারহান আখতার দেরও ছবি বানাতে বলে তাঁরা দুহাত জোর করে মাফ চাইবে তবু এমন অসাধ্য কাজ তাঁরা করতে চাইবে না। অথচ আমাদের দেশের পরিচালক রা আজো সেই দুঃসাহস করে যাচ্ছেন শুধু শিল্পটাকে একেবারে বিলীন না হয় তার জন্য। এই অল্প বাজেটের ছবিও কত ক্লাসিক ছিল, কত অসাধারণ ছিল তার খোজ আজ আর কেউ নেয়না। সেইসব সল্পবাজেট এর ছবিতে যে কত কালজয়ী গান ছিলা আজ আর কেউ তা শুনে না। আজ সেখানে ঠাই করে নিয়েছে ভজঘট শিল্পীদের উদ্ভট গান আর তা নিয়েই হয় মাতামাতি! অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতের দিকে তাকিয়ে দেখুন তাঁদের নতুন ছবিগুলোর পাশাপাশি তাঁরা কেমন করে সারা বিশ্বে সব পুরাতন ছবিগুলোকে নতুন প্রজন্ম থেকে শুরু করে সবার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। আজকে যদি এই বাংলার কোন আধুনিক তরুণ তরুণী কে জিজ্ঞেস করা হয় ' আবার তোরা মানুষ হো' ছবির পরিচালক কে? সে সঠিক উত্তর দিতে তো পারবেই না বরং প্রশ্নকারীর দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকবে যেন প্রশ্নকারী তাঁরে কোন ভুল কিছু জিজ্ঞেস করেছে যা সম্পূর্ণ মনগড়া! অথবা প্রশ্নকারীর দিকে এমন ভাবে চেয়ে থাকবে যা দেখে ঠাস করে একটা চড় মারতে আপনার ইচ্ছে করবে। আবার ঐ একই তরুণ / তরুণীকে যদি জিজ্ঞেস করেন হিন্দি ' শোলে' ছবির পরিচালক কে সে পরিচালক এর নাম শুদ্ধ মুক্তির সন, তারিখ সহ পুরা গেতি গোষ্ঠীর নাম আনন্দে বলে দিবে যা শুনে মনে হবে ঐ ছবিটা তার দাদা বানিয়েছিল আর সেখানে তার মা খালারা অভিনয় করেছে এমন। হায়রে মানুষ! হায়রে জাতি!
খান আতাউর রহমান, সত্য সাহা, সুবল দাস, আনোয়ার পারভেজ, আলম খান, সুজেয় শ্যাম, আলাউদ্দিন আলী ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এর মতো সুরকার সব কালে সব দেশে একসাথে পাওয়া যায় না। কিন্তু মহান সৃষ্টিকর্তা এই বাংলায় তাঁদের একযুগে একসাথে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা আমাদের সম্পদ কে সমৃদ্ধশালী করেছিলেন। দিয়ে গেছেন সব কালজয়ী গান যা দিয়ে তাঁরা বাংলার হৃদয়ে মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকবেন। কিন্তু আমরা এমনই এক দুর্ভাগা জাতি যারা সেই সম্পদ গুলোকে কালের বিবর্তনে ভুলে যেতে বসেছি! হারিয়ে ফেলেছি! পারিনি সেই সম্পদগুলো কে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে, পারিনি তা সম্পর্কে তাঁদের জানাতে।পারিনি পৃথিবীর সব প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে ! প্রমাণ করতে পারিনি পৃথিবীর 'শ্রেষ্ঠ ভাষার শ্রেষ্ঠ গান' হলো বাংলা গান, বাংলা গান ও বাংলা গান!মৃত্যুর পরপরেই তাঁদের কে শুধু নয় তাঁদের সেরা সৃষ্টিগুলোকে ও আমরা ভুলে গেছি। এই কথা যদি তাঁরা আগে বুঝতেন তাহলে তাঁদের জীবনের পুরো মূল্যবান সময়টা তাঁরা সেই সৃষ্টির জন্য ব্যয় করতেন না। পারিনি পৃথিবীর সব প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে ! এই জাতির ধ্বংস জন্য পৃথিবীর অন্য কেউ দায়ী নয়, এই জাতিই তার নিজ কর্ম ও দেশবিমুখতাই যথেষ্ট। যে পুরো জাতিকে আজ 'ভুত' আছর করেছে আর অপমৃত্যুর মিছিলে যোগ দিয়ে সবাই 'ভুত' হয়ে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। যেখানে মানুষের হৃদয়ে আজ কোন দয়া মায়া নেই। থাকবে কি করে? আমরা তো আমাদেরই জানি না! জানি শুধু অপরের কি আছে ,কি করছে আর আমাদের কেন তা নেই এই নিয়ে আক্ষেপ!!!! সবশেষে শুধু সেই ভুতদের শুভকামনা জানিয়ে বলি "এগিয়ে যাও সব ভুতেরা , ভুতের জাতি গড়তে
ডিজিটাল যুগে তোমরাই পারবে এই দেশকে এগিয়ে নিতে"!!!!!!!!!!!!!!!!
এবার দেখুন মানুষ থাকাকালীন সেই জাতির সমৃদ্ধশালী কিছু গানের সামান্য নমুনা -
আপনি যদি নিজেকে মনুষ্য সভ্যতার একজন মনে করে থাকেন তাহলে নিচের লিঙ্কে লাইক দিয়ে (যদি আগে লাইক না দিয়ে থাকেন )সাবস্ক্রাইব করে প্রমাণ করুন- একটি শিক্ষিত রেডিও
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১২:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



