somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলা চলচ্চিত্রের একজন খান আতা ও একজন সুভাষদা'র গল্প ঃ

১৩ ই মে, ২০১৩ সকাল ৮:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের অভিনয় করা নায়ক / অভিনেতা ‘আনিস’ , চিত্রপরিচালক ‘প্রমোদকর’ ও সঙ্গীত পরিচালক খানআতা’র নাম বাংলা চলচ্চিত্রের খোঁজখবর রাখেন তারা সকলেই জানেন । মজারব্যাপারহচ্ছে ঐ তিনটি নামের মানুষ একজন মাত্র ব্যক্তি যার নাম খান আতাউর রহমান যিনি খান আতা নামে বহুল পরিচিত (ডিসেম্বর ১১, ১৯২৮- ডিসেম্বর ১, ১৯৯৭) । ১৯২৮ সালের ১১ই ডিসেম্বরখানআতাউররহমানমানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।বাবার নাম জিয়ারত হোসেন খান, মায়ের নাম যোহরা খাতুন।
খান আতা মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।বাবার নাম জিয়ারত হোসেন খান, মায়ের নাম যোহরা খাতুন। তার মা তাকে আদর করে ডাকতেন "তারা"। তার মায়ের পরিবার ছিলেন মাজারের খাদিম তথা তত্ত্বাবধায়ক। ধর্মীয় উরসে তার মামা নানারকম আধ্যাত্মিক সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। ১৯৩৭ সালে ঢাকা জিলা সঙ্গীত প্রতিযোগীতায় খান আতা প্রথম স্থান দখল করেন। তিনি তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র।

শৈশব
তার মা তাকে আদর করে ডাকতেন “তারা”। তার মায়ের পরিবার ছিলেন মাজারের খাদিম তথা তত্ত্বাবধায়ক। ধর্মীয় উরসে তার মামা নানারকম আধ্ম্যাতিক সংগীত পরিবেশন করতেন। ১৯৩৭ সালে ঢাকা জিলা সংগীত প্রতিযোগীতায় খান আতা প্রথম স্থান দখল করেন।তিনি তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র।
শিক্ষাজীবন
খান আতা ১৯৪৪ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশান পরীক্ষা পাশ করেন। ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা দেন ঢাকা কলেজ থেকে। এরপর ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজ এ। ১৯৪৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এসময় তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে পালাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনে তিনি পরিবারের এক সদস্যের চোখে পড়ে গেলে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরেই মেডিকেল ছেড়ে চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়এ ভর্তি হন। এবারো তার বোহেমিয়ান স্বভাবের কারণে তিনি সেখানে থাকলেন না।এ বছরেই তিনি লন্ডনে ফটোগ্রাফি বিষয়ক একটি বৃত্তি লাভ করেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তিনি সেখানে যাননি।১৯৪৯ সালে আবার তিনি বাড়ি ছেড়ে পালাবার চেষ্টা করেন। এবারো উদ্দেশ্য ছিল একই। এবার তিনি প্রথমে মুম্বাই যান। মুম্বাই গিয়ে তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন, চলচ্চিত্র জগতের আনাচে কানাচে গিয়েছেন। এসময় তিনি জ্যোতি স্টুডিওতে ক্যামেরাম্যান জাল ইরানির শিক্ষানবিশ হেসেব কিছুদিন কাজ করেন।


কর্মজীবন
১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে চলে আসেন করাচি। করাচী এসে তিনি যোগ দেন রেডিও পাকিস্তান এ সংবাদপত্র পাঠক হিসেবে। এখানেই আরেকজন প্রতিভাবান বাঙ্গালী ফতেহ্‌ লোহানী এর সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠে।তখনো চলচিত্রের ব্যাপ্রে তার উৎসাহ কমেনি। যার কারনে তিনি প্রায় ই লাহোর যেতেন। এসময় তিনি সারঙ্গী বাদক জওহারি খানের কাছ থেকে তালিম নেয়া শুরু করেন। ফতেহ্‌ লোহানী কিছুদিন পরে লন্ডন চলে গেলে ১৯৫২ সালে খান আতা একটি পোল্যান্ডীয় জাহাজে করে লন্ডন পাড়ি জমান। সেখানে অনেক বাঙ্গালী অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করেন গায়ক এবং অভিনেতা হিসেবে। এখানে এস এম সুলতানের সাথে তার সাক্ষাত হয়। এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের উপকরণ যোগানে সাহায্য করেন তিনি। খানা আতা এবংতার সাথীরা এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের প্রদর্শনী এবং বিক্রয়ের ব্যাবস্থা করেন। লন্ডনের সিটি লিটারেরি ইন্সটিটিউটে তিনি থিয়েটার ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হন। পরের বছরেই তিনি ইউনেস্কো বৃত্তি নিয়ে নেদারল্যান্ডে চলে যান। ১৯৫৫ সালে আবার লন্ডনে ফিরে এসে থিয়েটার রয়াল, ইউনিটি থিয়েটার, আরভিং থিয়েটার এসকল স্থানীয় গ্রুপের সাথে কাজ করতে থাকেন। এসময় তিনি কিছুদিন বিবিসি এর সাথেও কাজ করেছেন। ১৯৫৭ তে ফিরে আসেন ঢাকায়। এসেই তিনি পাকিস্তান অব্জারভারে চাকরি নেন। এরপর রেডিও তে যোগ দেন গীতিকার, সংগীত পরিচালক, আবৃত্তিকার এবং অভিনেতা হিসেবে।
চলচ্চিত্রে খান আতা
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানি পরিচালক এ যে কারদার পরিচালিত ছবি “জাগো হুয়া সাভেরা” তে মূল ভূমিকাতে অভিনয়ের মাধ্যমে তার চলচ্চিত্র জীবনের সূত্রপাত হয়।এ ছবির সহকারী পরিচালক ছিলেন জহির রায়হান। চলচ্চিত্র জগতে তিনি আনিস নাম টি ব্যবহার করতেন।তার অভিনীত প্রথম বাংলা ছবি “এদেশ তোমার আমার” মুক্তি পায় ১৯৫৯ সালে। এহতেশামের এই চলচ্চিত্র এ দেশ তোমার আমার এ তিনি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬০ সালে জহির রায়হানের সাথে গড়ে তোলেন লিটল সিনে সার্কেল। এর পরের বচরগুলোতে জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় তার। অভিনেতা এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন কখনো আসেনি, যে নদী মরুপথে, সোনার কাজলের মতো সফল চলচ্চিত্রে।
তাঁরঅভিনীতছবিগুলোহচ্ছে –
জাগো হুয়া সাভেরা
এ দেশ তোমার আমার
কখনও আসেনি
কাঁচের দেয়াল
সাত ভাই চম্পা
মনের মতো বউ
নবাব সিরাজউদ্দোলা
জীবন থেকে নেয়া
আবার তোরা মানুষ হো
সুজন সখী
সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক খান আতা
সূর্যস্নান ছবিতে ১৯৬২ তে তিনি উপহার দেন পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া রে এরমতো গান। কন্ঠ দেন কলিম শরাফি। ১৯৬৩ সালে জহির রায়হানের কাঁচের দেয়াল ছবিতে তিনি নিয়ে আসেন শ্যামল বরণ মেয়েটি শীর্ষক একটি জনপ্রিয় গান। সূর্যস্নান ছবির গীতিকার হিসেবে এবং কাঁচের দেয়াল ছবির সংগীত পরিচালক হিসেবেপাকিস্তান ফিল্ম ফেস্টিভাল এ ১৯৬৫ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া সংগীত পরিচালক ছিলেন বাহানা, সাগার, আখেরি স্টেশান, মালা প্রভৃতি উর্দু ছবিতে। ১৯৬৯ সালে জহির রায়হানের পরিচালনায় জীবন থেকে নেয়াতে অভিনয় করেন। এই ছবিতে তিনি ” এ খাচা ভাংবো আমি কেমন করে ” শীর্ষক গানের কথা লিখেন এবংনিজেই কন্ঠ দেন। ১৯৭১ এর মুক্তি যুদ্ধে দেশাত্মবোধক গান লিখেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য এবং চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহে সাহায্য করেন।৭০’ এবং ৮০’র দশকে উপহার দেন সাবিনা ইয়াসমীনের কন্ঠে এ কি সোনার আলোয়, শহনাজ রহমতুল্লাহের কন্ঠে এক নদী রক্ত পেরিয়ে এর মতো গান।
তাঁর সুর ও সঙ্গীত পরিচালনায় ছবিগুলো –
এ দেশ তোমার
কখনও আসেনি
কাঁচের দেয়াল
সঙ্গম (উর্দু)
বাহানা (উর্দু)
সাত ভাই চম্পা
অরুণ বরুণ কিরণমালা
নবাব সিরাজউদ্দোলা
জোয়ার ভাটা
মনের মতো বউ
জীবন থেকে নেয়া
আবার তোরা মানুষ হো
সুজন সখী



পরিচালক খান আতা
তার প্রথম পরিচালিত ছবির নাম অনেক দিনের চেনা।ছবিটি ১৯৬৩ সালেমুক্তিপায়। তিনি সিরাজউদ্দৌলা, সাতভাইচম্পা, অরুণবরুণকিরণমালা, আবার তোরা মানুষ হ, সুজনসখি, দিন যায় কথা থাকে, পরশপাথর, এখনঅনেকরাত-সহ অনেক ছবি পরিচালনা করেছেন। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর তৈরি করেন আবার তোরা মানুষ হ যার বিষয়বস্তু ছিল যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতা। ৮০'র দশকের শেষে বানান হিসাবনিকাশ এবং পরশপাথর নামের দুইটি ছবি। ‘পরশ পাথর’ ছবিটি হলে দেখার পর আজো আমি প্রায় সময় গুনগুন করি ‘এসো সবাই মিলে দুখের কথা ভুলে সুখের কথা এসো বলি’ গানটি । অসাধারন একটি গান ছিল এটি । মুক্তিযুদ্ধেরউপর ১৯৯৪ সালেতিনিএখনো অনেক রাত নামের একটি ছবি তৈরি শুরু করেন। ১৯৯৭ সালেছবিরকাজশেষহয়। কিন্তুসেন্সরবোর্ডছবির ৭ টিস্থানেদৃশ্যকেটেফেলারনির্দেশদেয়ায়ক্ষুব্ধহনতিনি।
তিনি বাংলার কবি জসীমউদ্দীন, গঙ্গা আমার গঙ্গা, গানের পাখি আব্বাস উদ্দিন সহ বেশ কিছু তথ্যচিত্রও তৈরি করেছেন।
তাঁর পরিচালিত ছবিগুলো

* অনেকদিনেরচেনা
* সিরাজউদ্দৌলা
* সাতভাইচম্পা
* অরুণ বরুণ কিরণ মালা
* আবার তোরা মানুষ হ
* সুজনসখী
* দিন যায় কথা থাকে
* পরশ পাথর
* এখনো অনেক রাত

ব্যক্তিগত জীবনে খান আতাউর রহমান তিনবার বিয়ে করেন।লন্ডনে থাকাকালীন সময়ে তিনি শার্লি নামক এক ইংরেজ মেয়ের সাথে পরিচিত হন এবং তাকে বিয়ে করেন।বাংলাদেশে আসার পর তাদের একটি সন্তান হওয়ার পরে খান আতা এবং শার্লির মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় এবং শার্লি সন্তান নিয়ে লন্ডনে ফিরে যান।এরপর খানআতা মাহবুবা হাসনাতকে বিয়ে করেন।একটা বেতার কেন্দ্রে তাদের পরিচয় হয়েছিল।তাদেরএকটিমেয়েহয়। মেয়েরনাম রুমানা ইসলাম।১৯৬৮ সালে খান আতা বাংলাদেশের প্রখ্যাতকন্ঠ শিল্পী নিলুফারইয়াসমিনকেবিয়েকরেন।খান-আতা এবং নিলুফারের ছেলে আগুন বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় সঙ্গীতশিল্পী।১লা ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে এই কিংবদন্তী ইন্তেকাল করেন ।


‘১৯৫৭ সাল। ইন্ডিয়ান হাই কমিশনের উদ্যোগে একটি ফিল্ম শো’র আয়োজন চলছে ওয়ারিতে। সেখানে দেখানো হবে সত্যজিত রায়ের ‘পথের পাঁচালী’। ছবি দেখছি আর মুগ্ধ হচ্ছি। কখন যে ছবির মধ্যে হারিয়ে ফেলেছি নিজের মন তা বলতে পারবো না। ছবি শেষ হবার পরও অনেকক্ষণ আমি বসে ছিলাম স্থানুর মতো। পরে সিনেমাহলের এক গার্ড এসে জানালো, ভাই, ছবি শেষ হয়েছে অনেক আগে। বাড়ি যাইবেন না? আপনি এখনো বসে আছেন কেন। সত্যজিতের সেই ছবি দেখেই আমি ঠিক করলাম, সিনেমায় কাজ করব।‘ ……… এভাবেই একটি পত্রিকার সাক্ষাতকারে চলচ্চিত্রে আসার পেছনের গল্পটি বলেছিলেন সুভাষ দত্ত । যিনি বাংলা চলচ্চিত্রে সবার কাছে ‘সুভাষদা’ নামে পরিচিত । সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের প্যাঁচালী’ ছবি দেখেই চলচ্চিত্রে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন । এরপর বাংলা চলচ্চিত্রে সুভাষ দত্ত নামটি একটি ইতিহাস,একটি অধ্যায় ও একজন কিংবদন্তী হয়ে গেলেন । এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে তিনি একাধারে চলচ্চিত্র অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও শিল্প নির্দেশক ছিলেন। এবং এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর সৃজনশীল কর্মের ঈর্ষণীয় সাফল্য।
সুভাষ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন মামার বাড়িতে ১৯৩০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের মুনশিপাড়া নামক স্থানে। তাঁর পৈতৃক বাসস্থান বগুড়া জেলার চকরতি গ্রামে। বসবাস করতেন ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের নিজ বাড়িতে।
সুভাষ দত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ও সুশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও চলচ্চিত্র নির্মাণের কৌশল শিখতে ভারতের বোম্বেতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে একটি ছায়াছবির পাবলিসিটির ষ্টুডিওতে মাত্র ত্রিশ টাকা মাসিক বেতনে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে ভারত থেকে ঢাকায় ফিরে যোগ দেন প্রচার সংস্থা এভারগ্রিন-এ। এরপর তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে পদার্পণ করেন চলচ্চিত্রের পোস্টার আঁকার কাজের মাধ্যমে। ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ এর পোস্টার ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন তিনি। ‘মাটির পাহাড়- নামে এক সিনেমায় আর্ট ডিরেকশনের মধ্যে দিয়ে আমার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু। এরপরে ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিতে এলো প্রথম অভিনয়ের সুযোগ। ১৯৫৮ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম এর এ দেশ তোমার আমার চলচ্চিত্রে একজন দুষ্ট নায়েব (কানুলাল) এর ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। এটি মুক্তি পায় ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি। ষাটের দশকের শুরুর দিকে নির্মিত বহুল আলোচিত হারানো দিন চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেছিলেন। মুস্তাফিজ পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি মুক্তি লাভ করে ৪ আগস্ট, ১৯৬১ এবং এটি বাংলা ভাষার প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে এক পেক্ষাগৃহে পঁচিশ সপ্তাহ প্রদর্শনের রেকর্ড তৈরী করে। এরপর তিনি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রে তিনি কৌতুকাভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেও বেশ প্রশংসা অর্জন করেছিলেন।
১৯৫৭ সালে ভারতের হাই কমিশনের উদ্যোগে একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে ওয়ারিতে। সেখানে দেখানো হয় সত্যজিৎ রায়'র পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রটি। এবং পথের পাঁচালী দেখেই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৬৩ সালের মে মাসে তিনি নির্মাণ শুরু করেন সুতরাং চলচ্চিত্রটি এবং ১৯৬৪ সালে এটি মুক্তি দেন। এর প্রধান অভিনেতা হিসেবে তিনি অভিনয় করেন সেই সময়কার নবাগতা অভিনেত্রী কবরী'র বিপরীতে। এবং এটি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সম্মাননা লাভ করেছিল। ১৯৬৮ সালে জহুরুল হক ও প্রশান্ত নিয়োগির লেখা কাহিনী নিয়ে আবির্ভাব চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন সুভাষ দত্ত এবং ছবির একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন তিনি।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একবার আটক করে সুভাষ দত্তকে। তবে কয়েকটি উর্দু ছবিতেও অভিনয় করার কারণে তখন পাকিস্তানেও তিনি পরিচিত মুখ। সেই সুবাদে সেদিন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন তাঁকে ছেড়ে দিতে বলেন। এবং প্রাণে বেঁচে যান সুভাষ। এরপরে সুভাষ দত্ত চলে যান বোম্বে।

১৯৭১ সালে সুভাষ দত্তের সঙ্গে দেখা হয় সত্যজিত রায়ের। সুভাষ দত্ত আগে থেকেই ক্যামেরাম্যান ঠিক করে রেখেছি ছবি তুলবেন বলে। কিন্তু সত্যজিৎ সুভাষ বললেন,’ তোমার সঙ্গে আমি যদি দাঁড়িয়ে ছবি তুলি, তবে ছবি কেটে যাবে। কারণ আমি অনেক লম্বা আর তুমি অনেক খাটো। বরং আমি বসি আর তুমি আমার পাশে এসে দাঁড়াও।‘ সত্যজিৎ ক্যামেরাম্যানকে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে ছবি তুলতে হবে। সেদিনের এই ঘটনাটি সুভাষ দত্তের জীবনের সেরা ঘটনাগুলোর একটি। এরপর আরো একবার ঢাকায় দেখা হয় সত্যজিৎ রায় ও সুভাষ দত্তের।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মাণ করেন অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, যাকে তার বানানো অন্যতম সেরা ছবি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭৭ সালে আলাউদ্দিন আল আজাদের বিখ্যাত উপন্যাস '২৩ নম্বর তৈলচিত্র' অবলম্বনে বসুন্ধরা নামের যে চলচ্চিত্রটি সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেন- তা আজো চলচ্চিত্র সমালোচকদের আলোচনার বিষয়। সত্তর দশকের শেষের দিকে ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকীর লেখা গল্প গলির ধারের ছেলেটি অবলম্বনে তিনি নির্মাণ করছিলেন ডুমুরের ফুল চলচ্চিত্রটি। এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে তিনি একাধারে চলচ্চিত্র অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও শিল্প নির্দেশক ছিলেন। এবং এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর সৃজনশীল কর্মের ঈর্ষণীয় সাফল্য।
চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি প্রচুর মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন। এরমধ্যে ঢাকার আরণ্যক নাট্যদলের প্রথম প্রযোজনা কবর নাটকে তাঁর প্রথম মঞ্চাভিনয় ১৯৭২ সালে।

পরিচালিত চলচ্চিত্র
• সুতরাং - (১৯৬৪)
• আবির্ভাব - (১৯৬৮)
• কাগজের নৌকা
• পালাবদল
• আলিঙ্গন
• আয়না ও অবশিষ্ট
• বিনিময় - (১৯৭০)
• আকাঙ্ক্ষা
• বসুন্ধরা - (১৯৭৭)
• অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী - (১৯৭৯)
• ডুমুরের ফুল
• সকাল সন্ধ্যা
• ফুলশয্যা
• আবদার
• নাজমা
• সবুজসাথী
• স্বামী-স্ত্রী
• ও আমার ছেলে (২০০৮)

অভিনীত চলচ্চিত্র
• এ দেশ তোমার আমার - কানুলাল - (১৯৫৯)
• হারানো দিন - (১৯৬১)
• সুতরাং - (১৯৬৪)
• আবির্ভাব - (১৯৬৮)
• ক্যায়সে কুহু
• পয়সে
• কলকাতা ’৭১
• নয়া মিছিল
• কাগজের নৌকা
• পালাবদল
• ফুলশয্যা
• আকাঙ্ক্ষা
• বসুন্ধরা - (১৯৭৭)
• বাল্য শিক্ষা - পথ-গায়ক
• আয়না ও অবশিষ্ট
• ডুমুরের ফুল
• বিনিময়
• সকাল সন্ধ্যা
• আলিঙ্গন
• রাজধানীর বুকে
• সূর্যস্নান
• চান্দা
• তালাশ
• নদী ও নারী
• হারানো সুর
• আয়না - (২০০৫)
• বাবা আমার বাবা - (২০১০)
সুভাষ দত্ত শুধু সৃজনশীল নির্মাতাই ছিলেন না, তারকা তৈরির মহান কারিগরও ছিলেন। সুচন্দা, কবরী, উজ্জ্বল, ইলিয়াস কাঞ্চন, আহমেদ শরীফসহ অসংখ্য খ্যাতিমান তারকা তার হাত ধরেই চলচ্চিত্রে এসে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।
প্রথম পরিচালিত ছবি ‘সুতরাং’ আন্তরজাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয় যা ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম কোন আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ । ১৯৬৫ সালে ফ্রাংকফুর্ট চলচ্চিত্র উৎসবে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে পুরস্কৃত হয়। এ ছাড়া মস্কো চলচ্চিত্র উৎসব (১৯৬৭, ১৯৭৩ ও ১৯৭৯) ও নমপেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও (১৯৬৮) পুরস্কৃত হয়েছে তাঁর চলচ্চিত্র। শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসবে (১৯৬৫)।
তিনি ১৯৭৭ সালে ঘোষিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এ তার প্রযোজনা-পরিচালনার বসুন্ধরা চলচ্চিত্রটির জন্য সেরা পরিচালক ও প্রযোজকসহ এটি মোট পাঁচটি পুরস্কার লাভ করে । এছাড়াও পুরস্কার ও সম্মাননার মধ্যে আছে একুশে পদক (১৯৯৯), বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা (২০০৩) ইত্যাদি।
স্ত্রী সীমা দত্ত ২০০১ সালের অক্টোবরে পরলোকগমন করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে, দুই মেয়ে, পুত্র-পুত্রবধূ, নাতি নাতনী রেখে গেছেন। বড় ছেলে শিবাজী দত্ত দেশে থাকেন, আর ছোট ছেলে রানাজী দত্ত থাকেন সুইডেনে।, বড় মেয়ে শিল্পী দত্ত বরিশাল এবং ছোট মেয়ে শতাব্দী দত্ত রংপুর স্বামীর বাড়িতে।শ্রী সুভাষ দত্তের ভাই বোনেরা ৫ জনঃ শ্রী সুভাষ দত্ত (সবার বড়), শ্রীমতি আরতী ধাম (মৃত, সন্তানাদি ভারতে বসবাস করছেন), শ্রী বিকাশ দত্ত (সুভাষ দত্তের ইউনিটের প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন তাঁর জীবনের সর্বশেষ ছবি পর্যন্ত, স্ত্রী পুত্র কন্যা সমেত একই ভবনের আলাদা ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন), গীতু তরফদার এবং ডাঃ শ্রীমতি ঝরনা দত্ত (পেশায় চিকিৎসক, সুভাষ দত্তের মৃত্যু অবধি তাঁর পাশে ছিলেন)। সুভাষ দত্ত ১৬ নভেম্বর, ২০১২ , শুক্রবার ১২ রামকৃষ্ণ মিশন রোড়, ঢাকার নিজ ফ্ল্যাট ৫ম তলার সত্যাশ্রয়ে সকাল ৭টায় ৮২ বছর বয়সে হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ১৭ নভেম্বর সকাল ৯টায় তাঁর মৃতদেহ নিজ বাসভবন থেকে থেকে নিয়ে যাওয়া হয় রামকৃষ্ণ মিশনে এবং সেখানে ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান শেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। তাঁর মৃতদেহ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রাখা হয় শহীদ মিনারে। এ সময় পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, কবি, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ এখানেই তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এবং সেখানে তাঁর স্মরণে খোলা হয় একটি শোক বই। গূণী এই শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক বইয়ে অনেকেই লিখেন শিল্পীর গৌরবের কথা। শহীদ মিনারে তাকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা গার্ড অব অর্নার প্রদান করা হয়। শহীদ মিনার থেকে তাঁর মৃতদেহ দুপুরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি)-তে। সেখানে তাঁকে একনজর দেখার জন্য এফডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারি, শিল্পী, কলাকুশলীরা ভিড় জমান। এফডিসিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাঁর মৃতদেহ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় পোস্তগোলা শ্মশানে। এবং সেখানেই চির শায়িত করা হয় তাঁকে। তথ্যসুত্রঃ (উইকিপিডিয়া ও সাপ্তাহিক চিত্রালী) লেখক ঃ ফজলে এলাহী , তারিখঃ ১০/০২/১৩
ছবি: একজন সুভাষদা’র গল্প ঃ কবি ও কাব্য ‘১৯৫৭ সাল। ইন্ডিয়ান হাই কমিশনের উদ্যোগে একটি ফিল্ম শো’র আয়োজন চলছে ওয়ারিতে। সেখানে দেখানো হবে সত্যজিত রায়ের ‘পথের পাঁচালী’। ছবি দেখছি আর মুগ্ধ হচ্ছি। কখন যে ছবির মধ্যে হারিয়ে ফেলেছি নিজের মন তা বলতে পারবো না। ছবি শেষ হবার পরও অনেকক্ষণ আমি বসে ছিলাম স্থানুর মতো। পরে সিনেমাহলের এক গার্ড এসে জানালো, ভাই, ছবি শেষ হয়েছে অনেক আগে। বাড়ি যাইবেন না? আপনি এখনো বসে আছেন কেন। সত্যজিতের সেই ছবি দেখেই আমি ঠিক করলাম, সিনেমায় কাজ করব।‘ ……… এভাবেই একটি পত্রিকার সাক্ষাতকারে চলচ্চিত্রে আসার পেছনের গল্পটি বলেছিলেন সুভাষ দত্ত । যিনি বাংলা চলচ্চিত্রে সবার কাছে ‘সুভাষদা’ নামে পরিচিত । সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের প্যাঁচালী’ ছবি দেখেই চলচ্চিত্রে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন । এরপর বাংলা চলচ্চিত্রে সুভাষ দত্ত নামটি একটি ইতিহাস,একটি অধ্যায় ও একজন কিংবদন্তী হয়ে গেলেন । এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে তিনি একাধারে চলচ্চিত্র অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও শিল্প নির্দেশক ছিলেন। এবং এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর সৃজনশীল কর্মের ঈর্ষণীয় সাফল্য। সুভাষ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন মামার বাড়িতে ১৯৩০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের মুনশিপাড়া নামক স্থানে। তাঁর পৈতৃক বাসস্থান বগুড়া জেলার চকরতি গ্রামে। বসবাস করতেন ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের নিজ বাড়িতে। সুভাষ দত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ও সুশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও চলচ্চিত্র নির্মাণের কৌশল শিখতে ভারতের বোম্বেতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে একটি ছায়াছবির পাবলিসিটির ষ্টুডিওতে মাত্র ত্রিশ টাকা মাসিক বেতনে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে ভারত থেকে ঢাকায় ফিরে যোগ দেন প্রচার সংস্থা এভারগ্রিন-এ। এরপর তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে পদার্পণ করেন চলচ্চিত্রের পোস্টার আঁকার কাজের মাধ্যমে। ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ এর পোস্টার ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন তিনি। ‘মাটির পাহাড়- নামে এক সিনেমায় আর্ট ডিরেকশনের মধ্যে দিয়ে আমার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু। এরপরে ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিতে এলো প্রথম অভিনয়ের সুযোগ। ১৯৫৮ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম এর এ দেশ তোমার আমার চলচ্চিত্রে একজন দুষ্ট নায়েব (কানুলাল) এর ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। এটি মুক্তি পায় ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি। ষাটের দশকের শুরুর দিকে নির্মিত বহুল আলোচিত হারানো দিন চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেছিলেন। মুস্তাফিজ পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি মুক্তি লাভ করে ৪ আগস্ট, ১৯৬১ এবং এটি বাংলা ভাষার প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে এক পেক্ষাগৃহে পঁচিশ সপ্তাহ প্রদর্শনের রেকর্ড তৈরী করে। এরপর তিনি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রে তিনি কৌতুকাভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেও বেশ প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে ভারতের হাই কমিশনের উদ্যোগে একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে ওয়ারিতে। সেখানে দেখানো হয় সত্যজিৎ রায়'র পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রটি। এবং পথের পাঁচালী দেখেই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৬৩ সালের মে মাসে তিনি নির্মাণ শুরু করেন সুতরাং চলচ্চিত্রটি এবং ১৯৬৪ সালে এটি মুক্তি দেন। এর প্রধান অভিনেতা হিসেবে তিনি অভিনয় করেন সেই সময়কার নবাগতা অভিনেত্রী কবরী'র বিপরীতে। এবং এটি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সম্মাননা লাভ করেছিল। ১৯৬৮ সালে জহুরুল হক ও প্রশান্ত নিয়োগির লেখা কাহিনী নিয়ে আবির্ভাব চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন সুভাষ দত্ত এবং ছবির একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন তিনি। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একবার আটক করে সুভাষ দত্তকে। তবে কয়েকটি উর্দু ছবিতেও অভিনয় করার কারণে তখন পাকিস্তানেও তিনি পরিচিত মুখ। সেই সুবাদে সেদিন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন তাঁকে ছেড়ে দিতে বলেন। এবং প্রাণে বেঁচে যান সুভাষ। এরপরে সুভাষ দত্ত চলে যান বোম্বে। ১৯৭১ সালে সুভাষ দত্তের সঙ্গে দেখা হয় সত্যজিত রায়ের। সুভাষ দত্ত আগে থেকেই ক্যামেরাম্যান ঠিক করে রেখেছি ছবি তুলবেন বলে। কিন্তু সত্যজিৎ সুভাষ বললেন,’ তোমার সঙ্গে আমি যদি দাঁড়িয়ে ছবি তুলি, তবে ছবি কেটে যাবে। কারণ আমি অনেক লম্বা আর তুমি অনেক খাটো। বরং আমি বসি আর তুমি আমার পাশে এসে দাঁড়াও।‘ সত্যজিৎ ক্যামেরাম্যানকে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে ছবি তুলতে হবে। সেদিনের এই ঘটনাটি সুভাষ দত্তের জীবনের সেরা ঘটনাগুলোর একটি। এরপর আরো একবার ঢাকায় দেখা হয় সত্যজিৎ রায় ও সুভাষ দত্তের। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মাণ করেন অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, যাকে তার বানানো অন্যতম সেরা ছবি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭৭ সালে আলাউদ্দিন আল আজাদের বিখ্যাত উপন্যাস '২৩ নম্বর তৈলচিত্র' অবলম্বনে বসুন্ধরা নামের যে চলচ্চিত্রটি সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেন- তা আজো চলচ্চিত্র সমালোচকদের আলোচনার বিষয়। সত্তর দশকের শেষের দিকে ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকীর লেখা গল্প গলির ধারের ছেলেটি অবলম্বনে তিনি নির্মাণ করছিলেন ডুমুরের ফুল চলচ্চিত্রটি। এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে তিনি একাধারে চলচ্চিত্র অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও শিল্প নির্দেশক ছিলেন। এবং এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর সৃজনশীল কর্মের ঈর্ষণীয় সাফল্য। চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি প্রচুর মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন। এরমধ্যে ঢাকার আরণ্যক নাট্যদলের প্রথম প্রযোজনা কবর নাটকে তাঁর প্রথম মঞ্চাভিনয় ১৯৭২ সালে। পরিচালিত চলচ্চিত্র • সুতরাং - (১৯৬৪) • আবির্ভাব - (১৯৬৮) • কাগজের নৌকা • পালাবদল • আলিঙ্গন • আয়না ও অবশিষ্ট • বিনিময় - (১৯৭০) • আকাঙ্ক্ষা • বসুন্ধরা - (১৯৭৭) • অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী - (১৯৭৯) • ডুমুরের ফুল • সকাল সন্ধ্যা • ফুলশয্যা • আবদার • নাজমা • সবুজসাথী • স্বামী-স্ত্রী • ও আমার ছেলে (২০০৮) অভিনীত চলচ্চিত্র • এ দেশ তোমার আমার - কানুলাল - (১৯৫৯) • হারানো দিন - (১৯৬১) • সুতরাং - (১৯৬৪) • আবির্ভাব - (১৯৬৮) • ক্যায়সে কুহু • পয়সে • কলকাতা ’৭১ • নয়া মিছিল • কাগজের নৌকা • পালাবদল • ফুলশয্যা • আকাঙ্ক্ষা • বসুন্ধরা - (১৯৭৭) • বাল্য শিক্ষা - পথ-গায়ক • আয়না ও অবশিষ্ট • ডুমুরের ফুল • বিনিময় • সকাল সন্ধ্যা • আলিঙ্গন • রাজধানীর বুকে • সূর্যস্নান • চান্দা • তালাশ • নদী ও নারী • হারানো সুর • আয়না - (২০০৫) • বাবা আমার বাবা - (২০১০) সুভাষ দত্ত শুধু সৃজনশীল নির্মাতাই ছিলেন না, তারকা তৈরির মহান কারিগরও ছিলেন। সুচন্দা, কবরী, উজ্জ্বল, ইলিয়াস কাঞ্চন, আহমেদ শরীফসহ অসংখ্য খ্যাতিমান তারকা তার হাত ধরেই চলচ্চিত্রে এসে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। প্রথম পরিচালিত ছবি ‘সুতরাং’ আন্তরজাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয় যা ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম কোন আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ । ১৯৬৫ সালে ফ্রাংকফুর্ট চলচ্চিত্র উৎসবে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে পুরস্কৃত হয়। এ ছাড়া মস্কো চলচ্চিত্র উৎসব (১৯৬৭, ১৯৭৩ ও ১৯৭৯) ও নমপেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও (১৯৬৮) পুরস্কৃত হয়েছে তাঁর চলচ্চিত্র। শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসবে (১৯৬৫)। তিনি ১৯৭৭ সালে ঘোষিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এ তার প্রযোজনা-পরিচালনার বসুন্ধরা চলচ্চিত্রটির জন্য সেরা পরিচালক ও প্রযোজকসহ এটি মোট পাঁচটি পুরস্কার লাভ করে । এছাড়াও পুরস্কার ও সম্মাননার মধ্যে আছে একুশে পদক (১৯৯৯), বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা (২০০৩) ইত্যাদি। স্ত্রী সীমা দত্ত ২০০১ সালের অক্টোবরে পরলোকগমন করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে, দুই মেয়ে, পুত্র-পুত্রবধূ, নাতি নাতনী রেখে গেছেন। বড় ছেলে শিবাজী দত্ত দেশে থাকেন, আর ছোট ছেলে রানাজী দত্ত থাকেন সুইডেনে।, বড় মেয়ে শিল্পী দত্ত বরিশাল এবং ছোট মেয়ে শতাব্দী দত্ত রংপুর স্বামীর বাড়িতে।শ্রী সুভাষ দত্তের ভাই বোনেরা ৫ জনঃ শ্রী সুভাষ দত্ত (সবার বড়), শ্রীমতি আরতী ধাম (মৃত, সন্তানাদি ভারতে বসবাস করছেন), শ্রী বিকাশ দত্ত (সুভাষ দত্তের ইউনিটের প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন তাঁর জীবনের সর্বশেষ ছবি পর্যন্ত, স্ত্রী পুত্র কন্যা সমেত একই ভবনের আলাদা ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন), গীতু তরফদার এবং ডাঃ শ্রীমতি ঝরনা দত্ত (পেশায় চিকিৎসক, সুভাষ দত্তের মৃত্যু অবধি তাঁর পাশে ছিলেন)। সুভাষ দত্ত ১৬ নভেম্বর, ২০১২ , শুক্রবার ১২ রামকৃষ্ণ মিশন রোড়, ঢাকার নিজ ফ্ল্যাট ৫ম তলার সত্যাশ্রয়ে সকাল ৭টায় ৮২ বছর বয়সে হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ১৭ নভেম্বর সকাল ৯টায় তাঁর মৃতদেহ নিজ বাসভবন থেকে থেকে নিয়ে যাওয়া হয় রামকৃষ্ণ মিশনে এবং সেখানে ধর্মীয় আচারানুষ্ঠান শেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। তাঁর মৃতদেহ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রাখা হয় শহীদ মিনারে। এ সময় পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, কবি, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ এখানেই তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এবং সেখানে তাঁর স্মরণে খোলা হয় একটি শোক বই। গূণী এই শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক বইয়ে অনেকেই লিখেন শিল্পীর গৌরবের কথা। শহীদ মিনারে তাকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা গার্ড অব অর্নার প্রদান করা হয়। শহীদ মিনার থেকে তাঁর মৃতদেহ দুপুরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি)-তে। সেখানে তাঁকে একনজর দেখার জন্য এফডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারি, শিল্পী, কলাকুশলীরা ভিড় জমান। এফডিসিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাঁর মৃতদেহ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় পোস্তগোলা শ্মশানে। এবং সেখানেই চির শায়িত করা হয় তাঁকে। তথ্যসুত্রঃ (উইকিপিডিয়া ও সাপ্তাহিক চিত্রালী)
লেখক ঃ ফজলে এলাহী , তারিখঃ ১০/০২/১৩

৭টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×