লুৎফুর রহমান
তাঁর জন্মটা হয়েছিলো সেই উল্লেযোগ্য সাল ১৯৪৭ এর শেষদিন। ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৭ সালে পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখেছিলেন আর ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। কালের এই মুক্তিকামি বাঙালি পুরুষের নাম মোহাম্মদ আব্দুল বাসিত। জন্মেছেন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ছোটদেশ (টাইটিকর) এ। বাবা মরহুম মোহাম্মদ আইয়ব আলী ও মা মরহুমা মোছাম্মৎ আমিনা খাতুন। কালের এই অনন্য বাঙালি সন্তান একজন মুক্তিযোদ্ধা। একজন প্রতিথযশা সাংবাদিক। ১৯৬৬ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত এশিয়ার সফল আঞ্চলিক সংবাদপত্র যুগভেরীতে শিক্ষানবিশ সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিক জীবনের শুরু। পরে যুগভেরীর সহকারি সম্পাদক হিসাবে কাজ করেছেন অনেক দিন। লিখেছেন মা, মাটি ও মানুষের প্রাণের কথা। দেশের কথা, দশের কথা। সময়ের চক্করে একসময় চলে যান রাজধানী ঢাকায়। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক পূর্বদেশ এ স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার টানে নিজের কলম চালান স্বাধীন বাংলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে। ভয়াল একাত্তুরে ভারতের করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক জয়বাংলা’ পত্রিকার সহকারি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে মুক্তিযুদ্ধের খবর ছাপাতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ‘সোনারবাংলা’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। নিজের শেষ কর্মজীবন প্রবাসে অবস্থানকালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানা, সাপ্তাহিক বাঙালি ও সাপ্তাহিক বাঙলা পত্রিকার সহকারি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া লন্ডনে অবস্থানকালে সেখা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
ক্ষণজন্মা এই পুরুষের শিক্ষাজীবন শুরু ছোটদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রাবস্থায় কঠিন টাইফফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার এখানেই ইতি ঘটে। কিন্তু মৌলিক পড়াশুনার ইতি ঘটাননি বলেই পাঠকমনে স্থান করে নিয়েছেন তাঁর লেখনি দিয়ে। বিশেষ করে বাংলা বানান নিয়ে তাঁর যে সচেতনা তার সাক্ষি হালের অনেক উচ্চশিক্ষিতরাও। লেখালেখিতে তাঁর পাকা হাতের ছোঁয়ায় এলাকার অনেক দাবি দাওয়া বাস্তবায়িত হয়েছে। সিলেট বিভাগ বাস্তবায়নে তাঁর লেখা কতোটা কাজে লেগেছে তা লিখে শেষ করা যায়না। তিনি কলাম লিখেছেন অনেক। চলার পথে অসঙ্গতি আর সা¤প্রদায়িতার দৃষ্টিভঙি তাঁকে খুবই কষ্ট দিতো। বাঙালি চেতনায় গড়া নিজের মন-মানসিকতা নিয়ে লিখেছেন দেশ-বিদেশের পত্রিকায় অনেক কলাম। তার মধ্যে সাপ্তাহিক যুগভেরীতে (বর্তমানে দৈনিক) সিলেটের পাঁচালী এবং সুজন বাদিয়ার ছস্মনামে সহস্র বিস্মৃতিরাশি, দৈনিক বাংলা বাজার পত্রিকায়-রাজনীতির রঙ্গকথা ও টক ফ্রম দ্যা জাঙ্গল, দৈনিক জালালাবাদ পত্রিকায়-তিন্তিড়ি পলাণ্ডু লঙ্কা শর্করা। এছাড়াও বাংলার বাণী, সাপ্তাহিক গ্রাম সুরমা, দৈনিক সিলেটের ডাক, দৈনিক আজকের সিলেট, সাপ্তাহিক দেশবার্তা, সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠ সহ বিভিন্ন পত্রিকায় নানা রঙের কলাম লিখে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছেন তিনি। বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এই মুক্তিমনা মানুষ। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে সম্মান জানাতে এগিয়ে আসেন বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আব্দুর রউফ খান মিষ্টু (বর্তমানে মরহুম)। ২০০৫ সালে জন্মভূমি বিয়ানীবাজারে এক নাগরিক সবংর্ধনা দেয়া হয় তাঁকে। সেই সাথে ২০০৬ সালে ৪০৮ পৃষ্ঠার মোহাম্মদ আব্দুল বাসিত রচনাবলী “সহস্র বিস্মৃতিরাশি’ নামে বইটি প্রকাশিত করে নাগরিক সবংর্ধনা পর্ষদ।
সংবর্ধনা পাবার ৪ বছরের মাঝেই তিনি পরকালে চলে গেছেন। রেখে গেছেন স্ত্রী নুরুন্নাহার বেগম, দুই মেয়ে -মোছাম্মৎ হাফছা জাহাবী, মোছাম্মৎ নুছরাত জাহাবী এবং দুই ছেলে আহমদ আফজাল সাদেকীন (দুবাই প্রবাসী) ও আহমদ সাফায়াত সাদেকীনসহ অসংখ্য গ্রুণগ্রাহীদের। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ছিলো তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। বিশেষ করে বঞ্চিত ও খেটে খাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিজে খুব সম্মান করতেন এবং অন্যদেরও সম্মান করতে উৎসাহিত করতেন তিনি। নিজে একাত্তুরে দেশ ও মাটির জন্যে কলম চালিয়েছেন বিনিময়ে চেয়েছেন স্বাধীন দেশ। তা পেয়েছেন এটাই ছিলো তাঁর স্বার্থকতা। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে একটি বাড়ি উপহার দিতে গেলে তিনি তা সম্মােেনর সাথে প্রত্যাখান করেন। বিরল স্বভাবের এই মানুষটির বড়ই অভাব আজকের সমাজে, আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে।
লেখক: সম্পাদক, মাসিক মুকুল, দুবাই। [email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

