somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... নম্র বচন ৩ ]]> http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29465752 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29465752 2011-10-14 10:06:39 নম্র বচন ২ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29462343 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29462343 2011-10-08 21:06:27 নম্র বচন ১ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29462206 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29462206 2011-10-08 16:37:36 লালন রবীন্দ্রনাথ মুজিবনগর; রাজমিস্ত্রির খপ্পরে কুষ্টিয়ার তিন অনাথ আশ্রম
বাড়িটাকে কি অন্যভাবে সাজানো যায় না? রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক বাড়ি বলেই কি আমরা শুধু পারিবারিক পুরোনো খাটপালঙ্ক চেয়ার আর সব জায়গায় সহজলভ্য কয়েকটা ছবি দেখব? ওখানে সম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথকে দেখানোর কোনো ব্যবস্থা করা যায় না? প্রতিদিন ওখানে যাওয়া হাজার হাজার স্কুলশিশু আর দর্শকদের জন্য ওটাকে কি একটা রবীন্দ্রকেন্দ্র বানানো যায় না?

কে জানে। আমি জানি না। জাদুঘরের নিয়ম নীতি আমার জানা নেই। তার চেয়ে বাউন্ডারির বাইরে পুকুরপাড়ের বকুলতলাটা আমার বরং বেশি ভাল্লাগে। কিন্তু বাড়ি থেকে বের হবার জন্য গেটের দিকে আগালেই উঠানের ডান কোনায় সামনের আর ডানের দেয়ালের বেশ খানিকটা অংশ জুড়ে একটা মঞ্চ আর একটা অফিসঘর। অফিসঘরটা জুড়ে রেখেছে উঠানের বেশ কিছু অংশ আর দুই ফুট উঁচু মঞ্চটা জুড়ে রেখেছে আড়াইফুট উঁচু বাউন্ডারির দুই কোনার বেশ কিছু জায়গা। এই অফিসঘরে বসে ঠাকুরবাড়ির দেখাশোনা করেন সরকারি কর্তাবাবুরা। আর মঞ্চটা?

ওটা হু.মু এরশাদ সাহেবের। তিনি বাংলাদেশে বহু কিছু করার অংশ হিসেবে একবার বড়োসড়ো করে রবীন্দ্রনাথকেও স্মরণ করার জন্য ঠাকুরবাড়িতে আসেন। বাঙালিকে রবীন্দ্রনাথের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তাকে ঠাকুরবাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করতে হয়েছিল। এবং সেজন্য দরকার ছিল উঁচু একটা মঞ্চ। এটা সেই মঞ্চ। ইট সিমেন্ট দিয়ে পাকা করা বক্তৃতার মঞ্চ...

এরশাদকে উঁচু করার জন্য ঠাকুরবাড়ির নাকেমুখে এরকম একটা স্থায়ী মঞ্চ চাপিয়ে রবীন্দ্রনাথের নিশ্বাস বন্ধ না করলে কি একেবারেই চলত না?


ঠাকুরবারিড় বকুলতলায় বাউলদের রবীন্দ্রসংগীতের আসর

০২

বারো কি তেরো বছর পর এলাম মেরেপুরের মুজিবনগর। ঠা ঠা রোদের ঘাম-ধুলা সব এক ঝটকায় মুছিয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নতুন স্ট্যাচুগুলো মনটা ভালো করে দিলো। মূর্তিগুলো মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একেকটা কম্পোজিশন। মুজিবনগর সরকারের শপথ থেকে শুরু করে নিয়াজির আত্মসমর্পণ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সবগুলো ঘটনাই একের পর এক চুনাপাথরের রংয়ে সাজানো। অদ্ভুত সুন্দর এবং নিখুঁত। আমরা মুক্তিযুদ্ধের যেসব ঘটনার ছবি দেখে অভ্যস্ত। এগুলো সেইসব ছবিরই স্ট্যাচু। কিন্তু একটা একটা করে সবগুরো ঘুরে দেখার পর মনে হলো সার্বিক কম্পোজিশন থেকে কিছু একটা যেন মিসিং...


মুজিবনগর সরকারের শপথ এবং প্রথম গার্ড অব অনারের কম্পোজিশনের সামনে ক্ষুদে পর্যটক জয়িতা

অনেকক্ষণ তাকানোর পরে মনে হলো মুক্তিযুদ্ধের এই মূর্তিময় উপস্থাপনার মধ্যে বাংলাদেশের প্রকৃতিটা নেই। মেহেরপুরের আম্রকাননে করা এই কম্পোজিশনের সাথে কি একটা দুইটা কিংবা কয়েকটা প্রাকৃতিক গাছকে অংশ করা যেত না? স্বাভাবিক গাছগুলোকে কেটে পুরোটাই কি ইট দিয়ে মুড়িয়ে দেবার দরকার ছিল?

কম্পোজিশনগুলোর পেছনে স্টেডিয়ামের মতো একটা গ্যালারি। তিন তলা সমান উঁচু। চারদিকে গোল। স্টেডিয়ামের মাঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের থ্রিডি মানচিত্র। সবুজ জমিনের মানচিত্রের বিভিন্ন জায়গায় মিনিয়েচার মডেল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কম্পোজিশন। দেখতে দেখতে মনে হলো সিমেন্টের উপর প্লাস্টিক পেইন্ট ছাড়া প্রাকৃতিক সবুজ দিয়েও হয়ত মানচিত্রটাকে সবুজ করা যেত...

গ্যালারি থেকে নেমে চলে আসি উল্টো দিকের আম বাগানের ভেতরে মুজিবনগর সরকারের শপথ মঞ্চের উপর বানানো স্মৃতিসৌধে। চমৎকার এবং চমৎকার একটা স্মৃতিসৌধ। মুজিবনগর সরকারের শপথ মঞ্চ যেখানে বানানো ছিল সেখানটাতেই স্মৃতিসৌধটি। আশপাশে আম বাগানও নিখুঁত অবস্থায় আছে। আর মঞ্চের ঠিক ডান কোনায় একটা বিশাল মেহগনি গাছ...

- গাছটার বয়স সাড়ে তিনশো বছর। একটুখানি হেসে কথাটা জানালেন স্মৃতিসৌধের বর্তমান কেয়ারটেকার আর ৭১এ শপথমঞ্চ নির্মাণের একজন কর্মী মুক্তিযোদ্ধা সুভাস মল্লিক...

শপথের আগের রাতে বন্য শুকর আর শেয়ালের অবাধ বিচরণভূমিতে মঞ্চ বানানো আর পাশের চার্চ থেকে চেয়ার টেবিল এনে নেতাদের বসার ব্যবস্থা করার বর্ণনা দিতে দিতে বাঁশি বাজিয়ে সৌধের দিকে ধেয়ে গেলেন সুভাস মল্লিক। জুতা মোজা স্যান্ডেল নিয়ে সৌধের স্তম্ভ বেয়ে বেয়ে উঠছে কয়েকটা তরুণ। ধমকে সবাইকে নামিয়ে আবার ফিরে এলেন- সাধারণ নিয়মটাও এদেরকে শেখানোর কেউ নেই। বুঝলেন?

সত্যি সত্যি ভালো লাগার মতো একটা স্মৃতিসৌধ। সৌধ থেকে নেমে গেট দিয়ে বের হবার মুখেই চোখে পড়ল বামপাশের দেয়াল ঘেঁষে দুই ফুট উঁচু একটা সিমেন্টের মঞ্চ। দেখার জন্য এগিয়ে যেতেই একটা ধাক্কা খেলাম। এই মঞ্চটার নাম শেখ হাসিনা মঞ্চ। সামনের দিকে শেখ হাসিনার নাম ধারণ করে স্মৃতিসৌধের দিকে পাছা ঠেকিয়ে দাঁড়ানো মঞ্চটা সম্ভবত তিনি যখন স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করতে এসেছিলেন তখন বানানো হয়...

স্মৃতিসৌধের সামনে নিজের নামে স্থায়ী মঞ্চ বসিয়ে শেখ হাসিনা কি নিজেকে সম্মানিত করলেন নাকি বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথকে অসম্মান করলেন?


সুভাস মল্লিক পর্যটকদের বর্ণনা করছেন সেদিনের শপথমঞ্চ তৈরির কাহিনী

০৩

নিচে বারো চৌদ্দফুট ফাঁকা রেখে উপরে দালান তোলার যে মডেল; বাংলাদেশে তার নাম সাইক্লোন সেন্টার। গোরস্থানে সিমেন্টের কারুকাজ করা ঢিবি জাতীয় যে কবর তা দেখলেই বোঝা যায় কোনো পিরের কবর। আর মসজিদের মডেল তো সকলেরই জানা...

সিমেন্টের একতারাওয়ালা একটা গেটের ওইপারে একটা সাইক্লোন সেন্টার বানিয়ে তার সামনে ছোট একটা মসজিদ তুলে সেই মসজিদের ভেতর একটা পিরের কবর ঢুকিয়ে দিলে যে অবস্থা দাঁড়ায় সেটাই হলো সরকারি হেফাজতে লালন সাঁইয়ের বর্তমান চেহারা। দেখলেই মনে হবে লালন নামে একজন পির এখানে সিমেন্টের মসজিদে বসে আল্লাবিল্লা করে বৃক্ষবিহীন সিমেন্টের উঠান পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে সাইক্লোন সেন্টারে উঠে গিয়ে ঘুমাতেন...


ডানের মসজিদে লালন বন্দী। সামনে সিমেন্টচাপা তার শিষ্যের দল

আজকের স্থাপত্যপ্রকৌশল দিয়ে কালিগঙ্গার পাড়ে ছেউড়িয়ায় লালনকেন্দ্রকে লালনের পরিবেশের মতো সাজানো কি খুব বেশি কঠিন হতো? আর রাজনৈতিকভাবে খুব কি অসুবিধা হতো মৃত লালনকে মসজিদে ঢুকিয়ে না দিলে?
২০১১.০৩.২৪]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29354907 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29354907 2011-04-01 14:43:54
সাকিন সুন্দরবন। সুন্দরবনের জীবনগাথা মাননীয় আদালত আমি সুন্দরবনের কেওড়াশুটির বাঘ। আমি স্বীকারোক্তি দিচ্ছি যে স্বজ্ঞানে এবং আন্তর্জাতিক বাঘাধিকারে মরহুম আব্দুল ওহাব ভাগিনাকে ক্ষিদা নিবারণের মানসে আমি ভক্ষণ করিয়াছি তাই আমার ক্ষতিগ্রস্ত ভাগিনাবধূকে প্রতিশ্রুতিমতো এক লক্ষ টাকা প্রদান করা হউক..

কিংবা

নাচতে নাচতে গাজী সদরুল হাসে- আগে সুন্দরবনের পানিতে ভাসত মরা গাছ। এখন ভাসে পোড়া ডিজেল। ভটভট ভটভট ভটভট... সুন্দরবনের সব নদী এখন ভটভট ভটভট ভটভট। দিন রাত এখন সুন্দরবনে ট্রলার আর জাহাজের মিউজিক বাজে ভটভট। হরিণ পাতা খেতে এসে ট্রলারের শব্দ শুনে দৌড়ায়। বাঘ পানি খেতে এসে জাহাজ দেখে দৌড়ায়। কুমির রোদ পোহাতে ডাঙায় উঠে মানুষ দেখে নদীতে লাফায়। পুরা সুন্দরবনের মালিক এখন ভটভটিওয়ালা পর্যটকরা। বাঘ হরিণ বানর কুমির সবাইকে এখন ভটভটির আওয়াজ থেকে নিজেকে লুকিয়ে খেতে হয়- ঘুমাতে হয় এমনকি সংগমও করতে হয়...


কিংবা


আব্দুল ওহাব একটা চিৎকার দেয়। বাঘটাও একটা বিকট হুংকার ছাড়ে। একটু পরে দুজনেই আবার খাপ ছেড়ে দেয়। দুজনেই একসাথে ঘাড় ফিরিয়ে পেছন দিকে তাকায়। দুজনেই হয়ত পালানোর রাস্তা খোঁজে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপর দুজনেই আবার একসাথে শরীর টানটান করে মুখোমুখি দাঁড়ায়। আব্দুল ওহাব কুড়াল বাগিয়ে ধরে। খাপ ধরে বাঘটাও চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। আব্দুল ওহাব একপা সরে আসে বামে- যা থাকে কপালে আজ... বাঘটাও একপা সামনে বাড়ায়- যা থাকে কপালে আজ...


সুন্দরবনকেন্দ্রিক জীবনের এরকম ছোট ছোট ঘটনায় মোড়া ৯টা ধারবাহিক গল্প নিয়ে সুন্দরবনের জীবনগাথা সাকিন সুন্দরবন। আমার এবারের বই। শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত বইটার মোড়ক উন্মোচন হবে ১৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বিকেল ৫টায় নজরুল মঞ্চে। সময় থাকলে চলে আসেন সবাই...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29328900 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29328900 2011-02-18 00:34:53
সাকিন সুন্দরবন ৫। ঘেরাটোপ
দুবলার চর ঘেঁষে আমাদের ট্রলার যখন যায় তখন আমাদের চোখ আটকে ছিল বিশাল একটা বানর পরিবারে। কেউ আগায় কেউ পিছায় আর সবাই ধরা পড়ে ক্যামেরায়। দুটো কিশোর তাকিয়ে ছিল আমাদের নৌকার দিকে। বিস্ময়ে আমরাও তাকাচ্ছিলাম তাদের দিকে। তারা কাদায় হাত ডোবায় আর মাছ তুলে এনে লুঙ্গির কোঁচড়ে রাখে। মাছ ধরা এতো সহজ। বিস্ময় কাটে না আমাদের। দুবলার চরে এতো মাছ। কাদায় হাত দিলেই মাছ। কিন্তু আমাদের জানা হয় না এই মাছ নদীর মাছ নয়। জাল থেকে পড়ে যাওয়া কিংবা ফেলে দেয়া কাদায় আটকে থাকা মাছ। এই মাছ সেদ্ধই হয়তো দুই কিশোরের আজকের খাবার কিংবা কালকে সকালেরও। তারাও আমাদের দিকে তাকায় আর মাছ ধরে। আমরা নদী দেখি আর তারা ফিরে যায় গ্রামে...

ততক্ষণে আমাদের অনেকেই অন্য ট্রলারে করে নেমে গেছে দুবলার চরে। শহরের দশভাগের একভাগ দামে নিখুঁত শুঁটকির আশায় অনেকেই হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে গেছে চরের অনেক ভেতরে। আমরা চারপাশ ঘুরে এসে যখন চরে নামি তখন প্রায় সন্ধ্যার শেষ বিকাল। মাছধরা সেই দুটো কিশোর এসে আমাদের সামনে দাঁড়ায়। একজনের আছে দুইশো টাকা আরেকজনের আছে তিন শো। এই টাকা তারা আমাদের দিতে চায়। বিনিময়ে শুধু আমাদের জাহাজে করে তাদেরকে নিয়ে কোনো লোকালয়ে ছেড়ে দিতে হবে...

দুটো কিশোরের বাড়ি কক্সবাজার। শুঁটকি মহাজনের সাথে গিয়ে আব্দুল ওহাব সেখানে তাদের সাথে খাতির জমায়। তারা তখন বাজারে এটা ওটা করে আর ঘুরে বেড়ায়। আব্দুল ওহাব তাদের দুবলার চরের কথা বলে। লাখে লাখে মাছ আর হাজারে হাজারে মণ শুঁটকি। যত মাছ ধরবা তত শুঁটকি। যত শুঁটকি বানাবা তত টাকা...

দুই কিশোরের চোখ টাকার লোভে চকচকে হয়ে উঠলে মহাজনের নৌকায় উঠে তারা এসে ভিড়ে দুবলার চরে। এবং তারপর আজ আমাদের সাথে দেখা...

আমাদেরকে খুচরা টাকার লোভ দেখিয়ে অনুনয় করে দুই কিশোর। আমরা তাদের অনুনয়ের ছবি তুলি। আমরা বিস্তারিত জানতে চাই আব্দুল ওহাব তাদের সাথে ঠিক কোন কোন কাজ করে। আমরা জানতে চাই আব্দুল ওহাবের শাস্তির ধরন। কিশোরেরা মুখ কাঁচুমাচু করে বর্ণনা দেয় রাতের আর দিনের আব্দুল ওহাবের। আমরা শুনি আর ছবি তুলি আর দুবলার চর দেখি। আমাদের সাথে দুই কিশোর একটু একটু হাঁটে আর গলা নিচু করে অনুনয় করে। অনুনয় করতে করতে যখন তাদের চোখে সুন্দরবনের খাল বয়ে আসে তখন আমরা- যাবার সময় দেখা যাবে বলে তাদেরকে ঘাটের কাছে দাঁড় করিয়ে এগিয়ে যাই চরের ভেতর। আমরা দেখি শুঁটকি বানানোর কৌশল। আমরা দেখি কোন মাছ শুঁটকি হলে কেমন দেখায়। আমরা দেখি মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আসা কাঁকড়া...

এর মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে আমাদের গার্ড। জাহাজ থেকে নেমে আসে জাহাজের লোক। তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি। তাড়াতাড়ি সবাই ফিরে চলেন বোটে। ডাকাত পড়েছে ডাকাত। সত্তর জনের নতুন এক ডাকাতদল নেমেছে চরে। এরা মানুষ মারে। মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়। মানুষ ধরে নিয়ে আদায় করে মুক্তিপণ...

আমরা কেউ বিশ্বাস করি- কেউ করি না। ফরেস্ট আর টুরিজমের লোকদের কাজই হলো ভয় দেখিয়ে ছোট এক জায়গায় সবাইকে আটকে রাখা। তাতে তাদের কষ্ট কম। ঝামেলা কম। তাই আমরা কেউ এগিয়ে যাই চরের ভেতরে- কেউ ভয় পেয়ে দৌড়াই নৌকার কাছে। আর কেউ এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে এলোমেলো হাঁটি। এর মধ্যেই গলায় মাফলার- মাথায় টুপি দিয়ে বাজার থেকে ঘাটের দিকে এগিয়ে আসে আব্দুল ওহাব। দ্রুতপায়ে আমাদের পাশ কাটাতে কাটাতে আওয়াজ দেয়- ওদিকে যাবেন না আপনারা। ফিরে যান নৌকায়
- কেন কী হয়েছে?

আব্দুল ওহাব গতি কমায় না। আমরা তার গতি ধরে হাঁটি। আব্দুল ওহাব ডানে বামে তাকিয়ে গলা নামায়- কারে বিশ্বাস করা যায় কারে না; জানি না। তবু বলি নতুন একটা দল নেমেছে ওই পাশে। আপনারা ফিরে যান

আব্দুল ওহাবের সাথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা জিজ্ঞেস করি- আপনি কোথায় যান?

আব্দুল ওহাব থামে না। হাঁটতে হাঁটতে বলে- ঘরে গিয়ে নামাজ পড়ব আমি। আপনারা ফিরে যান

আব্দুল ওহাবের সাথে আমরা ফিরে আসতে থাকি নৌকার দিকে। হাঁটতে হাঁটতে তার কাছে জেনে যাই সে ঘরে গিয়ে কিছু টাকা বাইরে রেখে বাকিগুলো লুকিয়ে রাখবে কোথাও। সন্ধ্যা নামার আগেই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা এসে হানা দেবে প্রতিটি অস্থায়ী ঘরে। আসার আগে রাস্তায় কিছু মারধর করতে করতে আসবে জানান দিয়ে। তারপর ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে চাইবে নির্দিষ্ট অংকের টাকা। টাকা আসতে দেরি হলে কিংবা দরদাম করলে কিংবা যদি কোনো ট্যা-ফে বের হয় মুখ থেকে তবে মারধর আর আস্তানা জ্বালিয়ে দেয়া তো নগদ তার সাথে একটা বুলেটও জুটে যেতে পারে পেটে। তাই আব্দুল ওহাব আগেভাগে বাড়ি যায় টাকা বের করে রাখতে....

আমরা উঠে আসি নৌকায়। হয়তো ডাকাতের ভয়ে। হয়তো আব্দুল ওহাবকে দেখে অথবা হয়তো আমাদের উপর বিশ্বাস হারিয়ে সেই দুইটা কিশোর যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে আর নেই। কোস্টগার্ড আর ফরেস্টের লোকজন যারা দুবলার চরে পাহারায় ছিল তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমাদের উপর- এক্ষুনি এই জায়গা ছেড়ে যান। সমস্যা- সমস্যা- অনেক সমস্যা হবে এখানে। চলে যান। তাড়াতাড়ি যান। জাহাজের লোকজনও অস্থির হয়ে উঠে জাহাজ ছাড়তে। কিন্তু আমরা ছাড়তে পারি না। ছবি তুলতে তুলতে চরের ভেতরে ঢুকে যাওয়া তুষারেরা এখনও ফেরেনি ঘাটে

আমরা সবাই উঠে আসি জাহাজে। জাহাজের লোকজন জানিয়ে দেয় মাত্র ঘণ্টাখানেক থাকবে সূর্যের আলো। ঠিক ততক্ষণই অপেক্ষা করবে তারা। তারপর কেউ এলো না এলো না দেখেই জাহাজ ছেড়ে দেবে তারা...

ফরেস্টের লোক আর কোস্টগার্ড বারবার এসে তাড়া দেয়। জাহাজ নোঙর উঠিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নদীর মাঝ বরাবর। আমরা জাহাজের ছাদে দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে থাকি ডাকাত কিংবা চিৎকার কিংবা গোলাগুলি কিংবা তুষারদের দেখার অপেক্ষায়। অন্ধকার হয়ে আসছে চর। এর মাঝে হঠাৎ তাকিয়ে দেখি চরের ঘাটে ছোট নৌকায় দাঁড়িয়ে আছে দুইজন মানুষ। একজন বাপ্পী ভাই আরেকজ ফরেস্টের সেই তরুণ গার্ড সুমন

জনমানবহীন চরে দুটো মানুষ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে ডাকাত পড়া দুবলার চরে নিখোঁজ তুষারদের। জাহাজ থেকে বারবার তাদের ডেকে বলা হচ্ছে চলে আসার জন্য। কিন্তু সব ডাক উপেক্ষা করে দুজন মানুষ আলাদাভাবেই একা একা দাঁড়িয়ে থাকে দুবলার চরের অন্ধকারে...

আমি জানি শ্যাম নগরের গাজী সালাউদ্দিন বাপ্পীকে বনের সকলেই চেনে। তাকে ঘাঁটাবে না কেউ। কিন্তু সত্তরজনের এক ডাকাতদলের সামনে একা একটা চাইনিজ গান হাতে দাঁড়ানো সুমন বড়োই বেমানান। যেখানে কোস্টগার্ড চলে যাচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ে। যেখানে স্থানীয় ফরেস্টের লোকজন সরে গেছে নৌকা নিয়ে। সেখানে একটা বন্দুক নিয়ে এরকম বেয়াড়া লিকলিকে তরুণের দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিই বেয়াদবির সমান

গত কয়দিন সুমনের বেয়াড়াপনায় বিরক্ত আমাদের সবাই- ওখানে যাওয়া যাবে না মানে যাবে না। আর কোনো কথা নেই। আপনাদের সবার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার...

এরকম চটাং চটাং কথাগুলোকে চূড়ান্ত বিরক্তিকর মনে হয় আমাদের কাছে। সুন্দরবনে আনাড়ি কেউ নেই এই দলে। আমরা আমাদের মতো চলতে থাকি। সুমন ফিরে যাবার হুমকি দেয়। ফিরে গিয়ে আমাদের নামে রিপোর্ট লেখার হুমকি দেয়। আমরা পাত্তা দেই না কারণ আমরা জানি সুমন আমাদের বিরুদ্ধে বন আইন ভঙ্গের রিপোর্ট দেবার আগেই নেটওয়ার্কে ঢুকে আমাদের অনেকের একটা ফোনই সুমনকে তার চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেবার জন্য যথেষ্ট। তাই তাকে আমরা উল্টো ধমক লাগাই। সিনিয়র গার্ড তাকে বোঝায়। সুমন গজগজ করে আর রাইফেল বাগিয়ে তাকায় গাছের গোড়া বরাবর। সে জানে বাঘ কোন দিক থেকে আসে। তাই ছবি তোলার জন্য ডাকলে তাকায় না সে। সে তাকিয়ে থাকে তার যেদিকে তার তাকাতে ইচ্ছা করে সেদিকেই...

হয়ত সুমন তার নিজের জন্যই তাকায়। সে জানে বাঘের গায়ে গুলি করার অধিকার নেই তার। তার বন্দুক শুধু শব্দ করে বাঘকে ভয় দেখানোর জন্য। তাই সে যদি আগে দেখতে পারে তবে সে বেঁচে যাবে। দেখতে দেরি হলে থাবা দেয়া বাঘকে সরানোর জন্য কোনো গুলি ছোঁড়ার ক্ষমতা থাকবে না তার। কিন্তু সুমনতো ডাকাতদের জানে। আব্দুল ওহাব যেমন জানে না আশেপাশে ছদ্মবেশে ডাকাতদের কেউ ঘাপটি মেরে বসে আছে কি না। তেমনি সুমন কি জানে না যে অন্ধকারে তাকে দেখছে না কেউ? সুমন তাকাচ্ছে না কেন ডাকাতদের দিকে? সে কি অনুমান করতে পারছে না ডাকাতেরা কোন দিকে আসতে পারে?

সুমন হয়তো জানে। জানে সত্তরজনের একটা দল এলে কী হবে তার। তাই কোনো দিকেই সে তাকায় না। পাটখড়ির মতো শুকনা হাতে শরীরটা টানটান করে রাইফেল বাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে- আসবি যদি আয়। পারব না জানি তবু কয়েকটা তো ফেলা যাবে মরবার আগে....

আমার ইচ্ছা করে সুমনকে ডাক দিয়ে বলি- সুমন উঠে আয় জাহাজে...
কিন্তু তাকে আর ডাকি না আমি। সে থাকুক তার অহংকার নিয়ে। সে অপেক্ষা করুক তুষারদের প্রতি তার দায়িত্ব জেনে। সত্তরজন ডাকাতের বিরুদ্ধে সে একাই দাঁড়িয়ে থাকুক দুবলার চরের অন্ধকারে তার সাহসে ভর করে...


সাকিন সুন্দরবন ১। বনমজুর

সাকিন সুন্দরবন ২। বনপর্যটক

সাকিন সুন্দরবন ৩। মরণখোর

সাকিন সুন্দরবন ৪। ভাতারখাগী ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29312486 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29312486 2011-01-22 23:52:25
সাকিন সুন্দরবন ২। বনপর্যটক
কেউ বিড়াল। কেউ সুন্দরবনকে ফ্রেমে ধরি আমরা। নৌকার লোকজন কাদা ভেঙে পানির জার নিয়ে নেমে যায় ভাঙা ছাউনির পুকুরের দিকে। এবং ডানে- দূরে ছোট্ট একটা নৌকা আমাদের ক্যামেরায় ঢুকে পড়ে। ফ্রেমে আটকাতে আটকাতে দুই মানুষের নৌকাটা এসে ভিড়ে আমাদের নৌকার কাছে। একই ঘাটে

তিন মাথাওয়ালা এক মানুষ এমাথায় বসা। মাথাটা ঢুকে গেছে দুই হাঁটুর ভেতর কিংবা হাঁটু দুটো মাথা হয়ে উঠে গেছে মূল মাথার পাশে। অন্যপাশে বেঁটেখাটো একটা গোঁয়ারমুখো তরুণ; তাগড়া আর ক্ষ্যাপাটে শরীর। দুজনেই বড়ো বড়ো বঁড়শিতে চিংড়ি আর ছোটমাছের টোপ পরাচ্ছে নদীতে ফেলার জন্য

ঠিক তখনই আমাদের নৌকা থেকে কেউ একজন আওয়াজ দেয়- এই তোমরা কোন জায়গার?

তিনমাথাওয়ালা আমাদের দিকে না তাকিয়েই গ্রামের নাম বলে। তখন পর্যন্ত আমাদের সাথের ফরেস্টাররা কেউ লুঙ্গি পরে কেউ খালি গায়ে দাঁড়ানো ছিল। নৌকা দেখেই লুঙ্গির উপর খাকি শার্ট পরে এসে দাঁড়ায়- পাস আছে তোমাদের?

তিন মাথাওয়ালা এবার চমকে তাকায় আমাদের দিকে। পটাপট ছবি তুলছে সবাই; মাঝি নৌকা মাছের টোপ বঁড়শি... আর আমাদের পাশে খাকি পোশাকে ফরেস্টের গার্ড। নৌকায় বনবিভাগের সবুজ পতাকা। মুহূর্তে ঘোলা হয়ে যায় লোকটার চোখ। পরিষ্কার আতঙ্ক নিয়ে লোকটা একটু হাসার চেষ্টা করে- আছে স্যার। পাস আছে আমাদের
- কোন জায়গার পাস?

বিনীত ভয়ে লোকটা কোনো এক ফরেস্ট ফাঁড়ির নাম বলে। জোর করে হাসে- পাস ছাড়া আমরা বনে আসি না স্যার। সেরম লোক না আমরা
তারপর মুখের মধ্যে বঁড়শিগাঁথা মাছের মতো হা ঝুলিয়ে আমাদের প্রত্যেকের দিকে আলাদা আলাদা করে তাকায়। নিশ্চয়ই আমরা সবাই ফরেস্টের কোনো কর্তা কিংবা অফিসারের শালা সম্বন্ধী ভায়রা ভাই
- তোমরা একাই না আরো নৌকা আছে?
- স্যার আমরা মোট তিন নৌকা। দুইটা পেছনে আসতেছে
- এই আতিয়ার একটা পাতিল দে দেখি। কিছু চার নেই

মাছের টোপকে বলে চার। বাপ্পী ভাইর গলা শুনে তিন মাথা চমকে উঠে বাপ্পী ভাইর দিকে তাকিয়ে না শোনার ভান করে আবার চার গাঁথতে থাকে। অতক্ষণ যেখানে সে একেকটা আঙুল সাইজ চিংড়ি কিংবা ছোট মাছ পটপট বঁড়শিতে গেঁথে সাজিয়ে রাখছিল ঝুড়িতে। এবার দেখলাম তার হাত ফসকাল কয়েকবার...

- দেও দিকিনি। এইটাতে কিছু চার দেও তো

বাপ্পী ভাই একটা গামলা ছুঁড়ে মারল লোকটার নৌকায়। গামলাটা তার কোলের কাছে পড়লেও অনেকক্ষণ সেদিকে তাকালই না লোকটা। হাঁটুতে মাথা গুঁজে থাকলেও বাপ্পী ভাইর তার দিকে তাকিয়ে থাকা অনুভব করছিল সে। এবার বাপ্পী ভাইর দিকে তাকিয়ে গামলাটা টেনে নিজের গামলা থেকে বেছে বেছে কেজি দেড়েক চিংড়ি আর বারোয়ারি মাছ তুলে দিয়ে বাপ্পী ভাইর হাতে দেবার জন্য যখন উঠে দাঁড়াল তখনই- অ্যাহ। এইটাতে কী হবে? ওর ওখান থেকেও কিছু দেও...

লোকটা হাত গুটিয়ে বসে পড়ার আগেই আমরা তাকে গামলা ধরে পোজ দিতে বললাম। জেলের হাতে তরতাজা মাছ। দারুণ সমৃদ্ধির প্রতীক... ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে দিয়ে ছবির পোজ দেয়ালাম। তারপর ছেড়ে দিলে লোকটা নিজের জায়গায় বসে গামলাটা নৌকার ভেতর দিয়ে ঠেলে দিল অন্য গলুইয়ে বসা গোঁয়ার ছেলেটার দিকে- দ্যাও। কী দেবা দেও। স্যাররা কিছু চার চায়...

একটু পরে আরো কিছু মাছ নিয়ে গামলাটা তিন মাথার কাছে ফিরে এলে সে বাড়িয়ে দিলো বাপ্পী ভাইকে। খেঁকিয়ে উঠল বাপ্পী ভাই- কী দিলা এইসব? আরো কিছু দেও। আমারাও তো মাছ ধরব...

লোকটা নিজের গামলা থেকে আরো কয়েকটা মাছ তুলে দিলো আমাদের গামলায়। বাপ্পী ভাই অতগুলা মানুষের মাছ ধরার জন্য আরো কিছু চার চায়। লোকটা এবার আর নড়ে না। আমাদের গামলা আর তার নিজের গামলার দিকে তাককায়। তার গামলায় টোপের পরিমাণ আমাদের গামলার অর্ধেক। লোকটা মরিয়া হয়ে উঠে আতঙ্কে- স্যার। আর দিলি আমাগের চার হবে না স্যার...

বহুক্ষণ সে আর নিজের বঁড়শিগুলোতে চার গাঁথার সুযোগই পায় না। নৌকা সামনে নিয়ে- পেছনে ঠেলে- সোজা-ব্যাঁকা বানিয়ে চাহিদামতো পোজ দিতে থাকে আমাদের ছবির...

- মাছ নাই তোমাদের সাথে?
সুন্দরবনের মাঝির বৈঠাধরা হাতও কি কেঁপে উঠে এবার?

লোকটা চমকে উঠে একটা হাসি দেয় শুধু
- কই দেখি। কী মাছ দেখাও তো?

লোকটা মুখের বঁড়শিগাঁথা হা-টাকে আরো বড়ো করে এবার- এই নৌকায় নাই স্যার। পেছনের নৌকায়
- ওরা কই?
- এখানেই আসবে স্যার...

ওর কাছ থেকে পাওয়ার মতো সবগুলো ফ্রেম শেষ হয়ে যাওয়ায় ফটোগ্রাফাররা ওকে ছাড়ে আর আর বাপ্পী ভাইর চোখ পড়ে আইলাভাঙা ফরেস্ট ছাউনির দিকে- এই ওহাব। যা তো দেখি ওখান থেকে কিছু জ্বালানি কাঠ নিয়ে আয়

আব্দুল ওহাব কুড়াল নিয়ে ছাউনির আড়াল থেকে একটা ঘুণে ধরা শুকনো খুঁটি ভেঙে নিয়ে আসে
- বাড়া একটা ভূতে চুদা তুই। কী নিয়া আসছিস এইটা?

ওহাব বেক্কলের মতো তাকায়। বুঝতে পারে না চুলায় জ্বালানোর জন্য এইখানে এর চেয়ে ভালো আর কোন কাঠ?
- যা ওইটা নিয়া আয়

বাপ্পী ভাই আঙুল তুলে শক্ত বড়ো এবং ভেজা কয়েকটা গাছের গুঁড়ি দেখায়। ওহাব বুঝতে পারে জ্বালানি কাঠ মানে কী? শুকনা গাছটা পানিতে ফেলে সে এবার এগিয়ে যায় ছাউনির দিকে...

- কতদিন থেকে আপনারা নদীতে আছেন?

অতক্ষণে আবার চার গাঁথার সুযোগ পাওয়া তিন মাথাওয়ালা আকাশের দিকে তাকিয়ে হিসাব করে- আজকের দিন গেলি আটাশ দিন হবি...
- কতদিন থাকবেন আর?
- আমাদের পারমিট দেড় মাসের

এমন সময় অনেক দূরে জোড় বেঁধে আসা দুটো নৌকাকে ক্যামেরাগুলো কামড়ে ধরে নদীর মাঝখানে। ক্যামেরায় বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে আসে আমাদের ট্রলার পর্যন্ত। জোড় ভেঙে একটা নৌকা এসে যোগ দেয় তিন মাথার নৌকার কাছে। আরেকটা উল্টোদিকে গিয়ে ভিড়ে বিড়াল পাড়ের কাছে

- মাছ কোন নৌকায়?
কেউ উত্তর দেয় না। তিনমাথা নতুন নৌকায় ইশারা দেয়। একটা ছেলে নামে। দীর্ঘ সুঠাম আর টানটান। কালো টিশার্টের নিচে প্রায় স্কিনটাইট একটা শর্টস। ছেলেটা কাছে এলে তিনমাথা কানে কানে কিছু বলে। একটা গামলা নিয়ে ছেলেটা এগিয়ে যায় বিড়ালের পাশে ভেড়ানো অন্য নৌকার দিকে...

শুনেছি বাঘের গতিকে ক্ষিপ্রগতি বলে। গামলা হাতে ছেলেটা যখন ঝপাস ঝপাস পানি ভেঙে এগোচ্ছিল তখন একবারও মনে হয়নি তার পায়ের নিচে পা কামড়ানো কাদাও আছে হাঁটু সমান। একটু সামনে ঝুঁকে ছেলেটার এগিয়ে যাওয়া আমাকে মনে করিয়ে দেয় ছোটবেলায় পড়া গালিভারের গল্প। আমি পরিষ্কার দেখি বিপক্ষ দেশের যুদ্ধ জাহাজগুলোকে সুতায় বেঁধে হাঁটুপানি সমান সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে গালিভার। সুন্দরবনের সব নদীই এই টানটান ছেলের হাঁটুপানি সমান...

কিন্তু বিড়াল নৌকার পাশে গিয়ে হঠাৎ ছেলেটা তিনমাথা হয়ে যায়। শরীরটাকে মুচড়ে কুঁকড়ে গামলা হাতে ঢুকে পড়ে ছইয়ের ভেতর

কিছুক্ষণ পর গামলাসহ একটা হাত বের হয় নৌকার বাইরে। হাত দেড়েক লম্বা চারটা আইড় জাতীয় লোনাপানির মাছ। দুই থেকে আড়াই কেজি ওজন একেকটা অনুমান। বরফের বাষ্প উড়ছে মাছগুলো থেকে। খোলের ভেতরে বরফ দিয়ে রাখ ছিল মাছগুলো

- এইটা কী দিলা। অতগুলান মানুষ আমরা...
ছেলেটা বের হতে হতে আবার ঢুকে যায়। আরেকটু বড়ো সাইজের আরেকটা মাছ রাখে গামলায়। সেখানে বসেছিল আরেকজন। একটু মোটাসোটা কিন্তু চেহারা সেই তিন মাথাওয়ালার। কিছুই দেখছিল না সে অতক্ষণ। এবার কোঁকিয়ে উঠে- স্যার মাছ পাই নাই তেমন। মাহাজনের ট্রলার আসলি দিতি পারব না কিছুই...

ঠিক তখনই কেউ আবিষ্কার করে বিনিমাগনায় মাছগুলো উঠছে আমাদের ট্রলারে...

- এই মাছগুলোর দাম কত?

বোকার মতো তাকায় মোটা তিনমাথা। গামলাটা সেখানেই রেখে সেই ছেলেটা ঝপঝপ পানি ভেঙে আবার চলে গেছে নিজের নৌকায়। কিন্তু মাছের দাম বলে না কেউ
- এই মাছ আমরা খাবো না। বলেন মাছের দাম কত?
- আপনারা এইসবে নাক গলান কেন? পয়সা দিতে হলে আমি দেবো। আপনারা আপনাদের ছবি তোলেন

নেংটি পরা শরীরের উপর আধা সেকেন্ডের জন্য ঝিলিক দিয়ে চোখদুটো আবার মরা ইলিশের চোখ হয়ে যায়। হাতদুটোকে জোড়হাতে মাপ চাওয়ার মতো প্রশ্নকারীর দিকে তুলে মুখ খোলে- না না দাদ-দাদ-দাম ককককিসের? এই মাছ আপনাগের পাপ-পাপ-পাওনা। ফফফরেস্টারের পাপ-পাওনা এই মাছ

হয়ত বা লোকটা এমনিতেই তোতলা। অথবা তোতলাচ্ছে সে। তোতলাতে তোতলাতেই যোগ করল- এই মাছের দাম নেয়া তাদের জন্য পাপ। তারা গিয়ে মহাজনকে বলবে আমাদের মাছ দেয়ার কথা। কারণ ফরেস্টের লোক হিসেবে এই মাছ আমাদের পাওনা...

মাছের দাম নেয়া পাপ। সততার এই শব্দগুলো শুনতে পায় সবাই। কারো ফ্রেমেই ধরা পড়ে না দাম জিজ্ঞেস করার সময় জেলেটার দিকে বাঘের চোখ রাঙানি করা দুইজোড়া চোখের ছবি। ফরেস্টারের কাছে টাকা চাইলে সুন্দরবনে জেলের জীবন কতটা পানির নিচে ডুবতে পারে জেলেটার সেই ভয় পড়তেও পারে না কেউ। জানতেও পারে না ওজন করে ট্রলারে তুলে দেবার আগে পর্যন্ত কোনো মাছের হিসাবই উঠে না মহাজনের খাতায়। এই মাছ দাদনে বান্ধা খাওয়া জেলের বাঘ- কুমির- কামটের ঘর থেকে তুলে আনা মাছ। এই মাছ দিয়ে দাদনের দায় শোধ হয় তার...

- গোসলটা সেরে আসি
ফরেস্ট গার্ড গাজী ভাই হঠাৎ প্যান্ট শার্ট খুলে লুঙ্গি পরে গামছা কাঁধে নিয়ে নিলো
- যাবেন কেমনে? অনেক কাদা তো
- এই যে এই নৌকায় উঠে যাব। ...নৌকাটা কাছে আনো তো
- কিন্তু গোসল করতে করতে তো ওরা চলে যাবে। ফিরবেন কেমনে?
- নাহ। যাবে আবার কই? পরে যাবে

তিনমাথাওয়ালা গাজী ভাইকে গোসল করার জন্য পাড়ে তুলে বসে থাকে চুপ। বিড়াল পাড়ের নৌকা থেকে আরেকজন নামে একটা খালি কলসি নিয়ে। খোঁপা করা দীর্ঘ চুল। কিন্তু রুক্ষ শুকনা রংচটা। হয়ত লোকটা একজন শিল্পী। হয়ত জেলেপাড়ার ফকির আলমগীর কিংবা কবি নজরুল কিংবা মুস্তাফিজ

শিল্পী জেলে ধীরে ধীরে পানি আনতে পুকুরে যায়। ...ভরা কলসি ঘাড়ে করে ফেরে। বঁড়শিতে চার গাঁথা শেষ। কিন্তু হুকুম না হলে যেতে পারবে না তারা। আমাদের একজন তার হাতে একটা রেডিও ধরিয়ে দেয়। বুঝিয়ে দেয় সুন্দরবনের জেলে রেডিও শুনছে সেই পোজ কীভাবে দিতে হবে। সুন্দরবনেও পৌঁছে গেছে টেকনলজির সুবাস। জিন্দাবাদ ডিজিটাল বাংলাদেশ; অনেকগুলো ছবি উঠে; ডানহাতে বৈঠা- বামহাতে রেডিও। বামহাতে বৈঠা ডানহাতে রেডিও। ফটোসেশন শেষ হলে নৌকাটা জায়গায় নিয়ে পাড়ে উঠে একটা দুটো কাঠের টুকরা কুড়ায়। ছোট ছোট শুকনা কাঠের টুকরা। কুড়িয়ে এনে নৌকায় চুলার পাশে রাখে। আর কোনো কাজ পায় না সে। বসে থাকে আমাদের হুকুমের অপেক্ষায়...

বহুক্ষণ হয় গাজী ভাই গোসল করে ফিরেছেন। রোদ পড়তে শুরু করেছে সুন্দরবনে; আমরা আমাদের ক্যামেরায় মগ্ন। হঠাৎ একটা মিনমিনে আকুতি শোনা যায়- আমাগের যে এবার বিদায় দিতি হয় স্যাররা। চার দেবার বেইল চলি যাচ্ছে...
- আরে এরা বসে আছে কেন? এদের কাজতো শেষ... যাও যাও। চলে যাও তোমরা

মুহূর্তে জেলেদের হাতগুলো ঝিলিক দিয়ে উঠে বৈঠায়। কিন্তু তিন মাথার সঙ্গী গোঁয়ার ছেলেটা গোঁ গোঁ করে কী যেন বলে। তিনমাথা বোকার মতো আমাদের দিকে তাকায়। আমরা একটা ভিক্ষুকের মতো আওয়াজ শুনি- খাবার কিছু থাকলি আমাগের দুই এক মুঠো দেন গো স্যারেরা। পোলাপান মানুষ বনের মইদ্যি বহুদিন ভালোমন্দ খাতি পায় না কিছু...

খেঁকিয়ে উঠে বাপ্পী ভাই- এইটা খাবারের টাইম নাকি মিয়া? এখন খাবার পাবা কই?

নৌকা ঘুরিয়ে ওরা রওয়ানা দেয়। যেতে যেতেও আমাদের দিয়ে যায় আরো কিছু ছবি...

সন্ধ্যা নেমে এলে ভদকার বোতল খুলে আমরা অপেক্ষা করতে থাকি রান্নার। খাবার তৈরি হলে ভাতের সাথে আসে সব্জি। সবজির সাথে আঙুল সাইজের চিংড়ি। ছোটমাছ। আমরা খাই। বড়ো বড়ো টুকরো মাছ আসে। আমরা খাই। খেতে খেতে লোনা পানির মাছের টেস্ট শরীরের চর্বি আর মাছেদের নাম নিয়ে আলাপ করি আমরা। তারপর মদে ভাতে একাকার হয়ে ঘুম...

পরেরদিন সকালে শুরু হয় গণ-ডায়রিয়া। দুবার টয়লেট-প্যারেড করে ঘুম দিয়ে উঠে দুপুরে ভাত খেতে বসি। এখনও সেই গতকালের মাছ। এক কোষ ভাত মুখে তুলেই প্লেট রেখে দিয়ে দৌড়ে চলে যাই নৌকার কোনায়- ওয়াক...

ভেতর থেকে বের হয়ে এলো নাড়িভুঁড়ি ছেঁড়া বমি- ওয়াক...

গতকালের যা কিছু সকালেই তা অবিরল ধারায় কমোড বেয়ে সুন্দরবনের নদীতে গেছে। বাকি যে গন্ধটুকু ছিল তাও বের হয়ে এলো। কিন্তু আমি বুঝলাম না কিছুই। কুলি করে আবার এসে খেতে বসলাম। পাশের টুলে রেখে গিয়েছিলাম ভাতের প্লেট। প্লেটটা তুলতে গিয়ে দেখি প্লেটটা ওখানে নেই। পড়ে গেছে। বোকার মতো আমি জিজ্ঞেস করলাম- প্লেটটা কি আমিই ফেলেছি?

আমি ছাড়া আর ফেলবে কে। এটাই ছিল সবার চোখের উত্তর। কিন্তু আমি জানি টুলের ওপরে রাখা প্লেটটায় আমার স্পর্শও লাগেনি একবার...। প্লেটটা আমি ফেলিনি। সুন্দরবন ফেলেছে এই প্লেট। এই ডায়রিয়া- এই বমি- এই ভাতের পাত ফেলে দিয়ে সুন্দরবন আমাকে জানিয়ে দিচ্ছে- মাছ নয়; মাছ নয়; মাঝিদের মাংস এইসব খাবার...

দুপুরের শেষে নৌকা এসে দাঁড়ায় ভুলে যাওয়া নামের আরেকটা ফরেস্ট ফাঁড়ির সামনে। প্রায় আট দশ ফুট বেজের উপরে ইটের বাংলো টাইপ দালান। ওখানে মোবাইলের অ্যান্টেনা আছে। ফোন করার জন্য হুড়মুড় করে নেমে গেলো সবাই। কেউ ফোন করল আর কেউ বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে গেলো যাদের ফোনের তাড়া নেই। আমিও বসলাম বারান্দায়। এবং এক দৌড়ে নেমে গেলাম নিচে। ঘাসের কাছে- ওয়াক...

দ্বিতীয়বারে খাওয়া পুরো ভাত ঢেলে দিলাম ঘাসে। তখনও আমি বুঝে উঠতে পারিনি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভাষা। প্রকৃতি তার নিজের ভাষায় আমাকে দুবার নিষেধ করলেও আমি অনুবাদ করতে পারেনি বনের শব্দমালা। আমি আবারও ভরপেট সেই মাছ খেয়ে বাংলোর ব্যালকনিতে বসে বিড়ি খাই। যতদূর চোখ যায় সামনে নিজের নিয়মে সাজানো সুন্দরবন। জোয়ারের পানি তখন সন্ধ্যার আগে পা ধুইয়ে দিচ্ছে বৃক্ষরাজির...

তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। পাশে বসা কাউকে দেখতে পাই না আমি। আমার চোখ আটকে আছে নদীর অন্যপাড়ে দূরের একটা বিশাল কেওড়া গাছে। প্রথমে কেওড়া গাছটা তার নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে একটু নড়ে উঠে। তারপর এক ঝটকায় মাটি থেকে নিজের শেকড়গুলো খুলে নিয়ে নদীর উপর দিয়ে হাঁসের মতো ভাসতে ভাসতে আসতে থাকে আমার দিকে। আমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। একটুও নড়তে পারছি না আমি। হাতের বিড়িতেও পারছি না টান দিতে। একজন ঋষি মানুষের মতো ঝাঁকড়া কেওড়াগাছটা নদী পার হয়ে এসে বাংলোর ব্যালকনির নিচে সিঁড়ির কাছে দাঁড়ায়। আমি তাকিয়ে আছি। সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে গাছটা একটা দীর্ঘ ডাল বাড়িয়ে ব্যালকনিতে বসা আমাকে পেঁচিয়ে ধরে গলায়। আমি কিছুই করতে পারছিলাম না তখন। গাছটা আমাকে টানতে টানতে নিচে নামিয়ে নিয়ে যায় তার গোড়ায়। তারপর আমাকে ধরে রেখেই হরিণে পাতা খাওয়া কাঠির মতো আরেকটা ডাল সোজা এনে নলের মতো ঢুকিয়ে দেয় আমার মুখের ভেতর। মুখ থেকে গলা বেয়ে পাকস্থলীতে গিয়ে থামে ডালটা। তারপর পেটের ভেতরে ডালের মাথাটা বাঁকিয়ে হঠাৎ এক হ্যাঁচকা টানে প্যান্টের পকেট ঝাড়ার মতো করে আমার পুরো পাকস্থলীটাকে বের করে নিয়ে আসে মুখের বাইরে। হুড়মুড় করে গাছের গোড়ায় ছিটকে পড়ে পেটের ভেতর যা কিছু ছিল সব। ...চাবানো মাছ। পানি। গলে যাওয়া ভাত...

তারপর অনেকগুলো ছোট ছোট পাতাওয়ালা ডাল এগিয়ে এসে পুরো পাকস্থলীটা মুছে দিতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেখানে একটা টুকরো মাছের গন্ধও থাকে। তারপর আবার এক ধাক্কায় পাকস্থলীটা ভেতর ঢুকিয়ে আমাকে ছেড়ে দিয়ে গাছটা নদী পার হয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে এক ঝটকায় আবার সাধারণ গাছ হয়ে যায়। আর ঘোর ভেঙে আমি নিজেকে আবিষ্কার করি বাংলোর সিঁড়ির নিচে বমিতে মাখামাখি। ... আর ঠিক তখনই আমি আবারও শুনতে পাই- মাছ নয়। মাছ নয়; মাঝিদের রক্তের দলা এই সব;

এই উপলব্ধি কোনোদিনও বুঝবে না সেইসব জেলেরা। শতবার বললেও সেই মাঝিদেরকে বোঝানো যাবে না যে ডাকাতরা নৌকা প্রতি পাঁচশো করে টাকা নিয়েছে তাদের থেকে আমরা সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। নৌকায় বনবিভাগের পতাকা থাকলেও ফরেস্টের কারোই শালা সমুন্দি না আমরা কেউ

এই কথাগুলো কোনোদিনও বুঝবে না সেই জেলেরা। হয়ত দেড় মাসের বনযাত্রা পুরা করার আগেই বাঘ কিংবা কুমিরের পেটে চলে যাবে কেউ। হয়ত ডাকাতের গুলিতে পড়ে থাকবে চরায়। হয়ত সত্যি সত্যি দাদনের টাকা শোধ করে গিয়ে উঠবে আইলাভাঙা গ্রামে। হয়ত অন্যদের থেকে একটু বেশি গল্প তারা নিয়ে যাবে ছেলেমেয়ের কাছে; কামানের মতো ক্যামেরা কান্ধে একদল অন্যরকম ডাকাত। এরা মাছ খায় না বেশি। ক্যামেরা তাক করে খেয়ে ফেলে মাছ ধরা সময়...

আইলাভাঙা ছাউনির সামনে সেই বিড়ালটা চোখে ভাসে আমার। একটা গৃহবাসী বিড়াল কত বছর বনে থাকলে বনবিড়াল হয়? কিংবা কত শতাব্দীর রক্তখাওয়া ইতিহাস থাকলে আমরা নিষ্পাপ মুখেই খেয়ে ফেলতে পারি মানুষের লউ?

সাকিন সুন্দরবন ১। বনমজুর

সাকিন সুন্দরবন ৩। মরণখোর

সাকিন সুন্দরবন ৪। ভাতারখাগী ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29312109 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29312109 2011-01-22 13:25:08
সাকিন সুন্দরবন ৪। ভাতারখাগী 'রাত দুপুরে ঘরের চালে প্যাঁচায় দেলে ডাক বেনবেলা কেন মাথার পরে কা কা করে কাক। শোনো তুমি মা বনবিবি বলি গো তোমারে অভাগিনি শরণ নেলে তোমারই চরণে॥ (ওমা) তোমারই চরণে'

এক নারীর কান্নায় খেঁকিয়ে উঠে অন্য নারী- খা-নকি মা-গি। প্যাঁচা আর কাউয়ার মুখে তুমি তোমার নিজের কম্মের কথা শোনো? নিজের কম্ম তুমি নিজে জানো না? তোমার নিজের কম্ম থেকে বনবিবি এসে বাঁচাবে তোমারে? বনবিবির আর কাজ নাই? তোমারেই বাঁচাতে ঠেকায় আছে সে? কিন্তু নিজের কর্মদোষে তোর মরদটারে যে আইজ বাঘের পেটে দিলি তার কী হবে?

কান্না থামিয়ে উঠে দাঁড়ায় নারী। এখন আর বিলাপ করে কোনো লাভ নেই। বাঘে খাওয়া মরদের বৌয়েরা সকলের জন্যই অপয়া। অলুক্ষুণে কুলক্ষণে মেয়েছাওয়ালের বিলাপ যে শোনে কুলক্ষণ তারেও ধাওয়া করে সুন্দরবনে। যে নারী এই অলক্ষ্মীর মুখ দেখে ও রাক্ষুসি হয়ে গিলে খায় তার মরদের কপাল। তাই অতদিনের সংসারের চারপাশ থেকে আজ একই আওয়াজ- ভাগ হারামজাদি। নরকে গিয়ে পেরাশচিত্তি কর নিজের...

নিজের নারীর যদি কোনো কর্মদোষ না থাকে তবে কোনো মর্দাপোলাই জীবন দেয় না সুন্দরবনে। মা বনবিবি সর্বক্ষণ দেখে রাখেন তারে। বাঘের সাপের থাবা থেকে তিনি আড়াল করে রাখেন তার সকল জোয়ান ছাওয়ালকে। তিনি দেখে রাখেন বাঘ। বাঘের থাবার সামনে হাজির রাখেন হরিণ। তিনি দেখে রাখেন বনের নদী- জোয়ার ভাঁটা- জল- প্লাবন সব। তিনি আলাদা করে দেন সাপের পথ মানুষের পথ। তাই তার সকল সন্তানই তার নাম নিয়ে পা দেয় সুরক্ষিত বনে। তার নামে কৃতজ্ঞতায় বছরে শামিল হয় পূজায়। কেননা তিনি ছাড়া এই বনে সকলেই অসহায়। তাই তিনি সব সময় তাদের পাশে পাশে থাকেন। কী নৌকায়। কী ডাঙায়...

এই বনে আছেন শত পীর আউলিয়া দরবেশ। সফেদ পোশাক আর দাড়ি নিয়ে তারা ঘুরে বেড়ান বন থেকে জলে। এক ফোঁটা জলও ছোঁয় না তাদের। এক কণা কাদাও লাগে না তাদের গায়ে। তারা ঘুরে ঘুরে বেড়ান আর সবাইকে মনে করিয়ে দেন বনের নিয়ম। সে নিয়ম মানে গাছ। সে নিয়ম মানে জলের কামট-কুমির। সে নিয়ম মানে ঝড়-ঝঞ্ঝা সাপ আর সুন্দরবনের বাঘ। সে নিয়মের ব্যত্যয় করে না কেউ। সে নিয়মের ব্যত্যয় করে যদি কেউ তবে অপঘাতে নির্ঘাত মৃত্যু তার। তারা ঘুরে ঘুরে বেড়ান আর সব নিয়ম ঠিক করে এসে নদীর মোহনায় জায়নামাজ পেতে শুকরানা করেন এই বন এই বাঘ আর এই মানুষের জীবনের জন্যি। তারা প্রার্থনা করেন যেন একে অন্যেরে দেখে রেখে বেঁচে থাকে সুন্দরবনের বাঘ কুমির সাপ আর মানুষ। তাই তাদেরই নির্দেশে বনসন্তানেরা বাঘের খাদ্যের জন্য বনে মানত করে মুরগি-ছাগল। তাদেরই নির্দেশে বনসন্তানেরা বনকে পবিত্র রাখে নিজেদের পেশাব পায়খানার উচ্ছিষ্ট থেকে। মানুষের পয়মাল বড়ো অপবিত্র জিনিস। তা ব্যাঘাত ঘটায় পীর দরবেশের সাধনায়। তা ব্যাঘাত ঘটায় সুন্দরবনের পবিত্রতায়। তাই সকল বনসন্তানই পয়মাল পাতায় নিয়ে ভাসিয়ে দেয় সুন্দরবনের খালে। এইসব দরবেশেরা পবিত্র জুম্মাবারে বনকে স্বাধীনতা দেন বনের নিয়মে চলতে। বাঘকে স্বাধীনতা দেন বাঘের নিয়মে চলতে। কুমিরকে ডেকে বলেন তার নিজের নিয়ম মানতে আর মানুষকে বলেন- আজ জুম্মার দিন। আজ তোরা ঘরে থাক। আজ মসজিদে গিয়ে প্রার্থনা কর। আজ খুলে দিয়েছি বনের সকল বাঁধন তাই বনের দিকে ভুলেও পা দিস না জুম্মার দিনে। আজ আমরাও বসব প্রার্থনায় তাই এই বনে আজ তোদেরকে আগলে রাখার আর থাকবে না কেউ...

বনের সকল সন্তানই মানে এই শুক্রবারের রীতি সুন্দরবনে। চোর ডাকাতেরাও মানে সুন্দরবনের নিয়ম। শুক্রবারে সুন্দরবনের বাঘেরা থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন- বেসামাল। তাই শুক্রবার দিনে বনে পা দেয় না কেউ। যারা দেয়। তারাই বেঘোরে মারা পড়ে বাঘের থাবায়। এখন পর্যন্ত যত মানুষ বাঘের পেটে গেছে; সকলেই গেছে অরক্ষিত শুক্রবারের দিনে...

কিন্তু মানুষের ছাওয়াল বাড়ে বাঘেদের থেকে দ্রুত। বাড়ে মুখ। বাড়ে খাবারের পেট। সপ্তায় একদিন বনে না ঢুকলে চুলায় উঠে না হাঁড়ি। সেই কথা বিবেচনা করে বনের পীর আউলিয়া দরবেশেরা এখন কিছুটা সদয়। এখন শুক্রবারের সারাদিন তারা ছেড়ে রাখেন না বনের শিকল। মানুষের ক্ষিদার কথা ভেবে জুম্মার পরে এসে আবার বনকে নিয়ে নেন নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে। তাই শুক্রবারের দিনে জুমার নামাজের পরে কিছু কিছু মানুষ এখন বনে ঢোকার ভরসা পায়। কিন্তু জুম্মার নামাজের আগে সুন্দরবন মানুষের জন্য নিষিদ্ধ হারাম...

কিন্তু কেউ কেউ নিজের কপাল খায় অন্যের দোষে। যে বৌ ঘরে রেখে আসে সে বৌ কী করে বাউলি না জানুক জানতে পারেন এইসব দরবেশ আর বনবিবি নিজে। তখনই তারা সাপ-কুমির-কামট আর বাঘেরে ডেকে বলেন- এ মাগির বাড় বাড়ছে খুব। যা তোরা খুলে আন ওই মরদের জান...

সেই মরদটা তখনই জান দেয় বনে। আর তার নারী টের পায় কর্মদোষের ফল। এমন অলুক্ষুণেরে গ্রামে রাখা দায়। এমন রাক্ষুসিরে ঘরে রাখা দায়। এমন রাক্ষুসিরে মেয়ে বোন ভাবা দায়। তাই সবাই খেদায় তারে। ঘর থেকে- গ্রাম থেকে- সকলের দৃষ্টির সীমানা থেকে....

ঘরে খাবার নেই; দুটো মাছ ধরে আনলে বাচ্চাটা বিকালে কিছু খেতে পায়। এই যুক্তিতে নিজের স্বামীকে সে বনে পাঠিয়েছিল দুইদিন আগে। দুইদিন আর ফিরেনি সে। ভেবেছিল পাস-পারমিট ছাড়া বনে ঢোকায় ভেবেছিল ফরেস্টের লোকজন পুলিশে দিয়েছে তারে। কিন্তু বনে পড়ে থাকা তার লুঙ্গি দেখে অন্য জেলেরা ফরেস্টের লোক নিয়ে তার লাশ ছাড়িয়ে আনে আজ...

এক শিশু হাতে ধরে আর এক শিশু পেটে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় নারী। তার গন্তব্য সুন্দরবনের বিধবাপল্লি। সুন্দরবনের সকল বিধবারা ওখানে থাকে। সকলেই অপয়া। সকলেই রাক্ষুসি। হাতে আর পেটে দুই শিশু নিয়ে আজ ওখানেই গিয়ে দাঁড়াবে সে কারো ছাপড়ার দাওয়ায়। হয়তো পরিচিত পাওয়া যাবে কেউ। পাওয়া না গেলে অপরিচিতদের সাথে নিজের ভাগ্যের মিল দেখিয়ে অনুনয় করবে রাতের জন্য ছাউনির নিচে একটু ঠাঁই দিতে। হয়তো বা দেবে কেউ...

তারপর চেয়ে চিন্তে সরকারি জমিতে একটা ছাপড়া সে নিজেই উঠিয়ে নেবে। তারপর মাঝে মাঝে সরকারি রিলিফ- মাঝে মাঝে রাস্তার মাটিকাটা- মাঝে মাঝে নদী সাঁতরে কাঠ কুড়িয়ে আনা- মাঝে মাঝে কেওড়া কুড়িয়ে বাজারে বেচা- মাঝে মাঝে শাড়ির আঁচল কিংবা ছোট জাল দিয়ে চিংড়ির পোনা ধরে সে বড়ো করে তুলবে তার পেটের এবং কাঁখের ছাওয়ালগুলারে যতদিন পর্যন্ত না সেই ছাওয়ালরাও বড়ো হয়ে তারে রাক্ষুসি গালি দিয়ে বিধবাপল্লি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে জঙ্গলে না হয় ডাকাতের দলে না হয় দুবলার চরে কয়েদখানায়...

- মা তুমি রাক্ষুসি?
হাতে ধরা ছেলের প্রশ্নে শাড়ির আঁচলটা মাথায় টেনে গ্রামের বাইরে পা বাড়ায় নারী- না রে বাপ। তোর বাপ নাই; তোরে-আমারে এখন আর কেউ খাওয়াবে না তাই রাক্ষুসি নাম দিয়ে তারা বের করে দিলো...


সাকিন সুন্দরবন ১। বনমজুর

সাকিন সুন্দরবন ২। বনপর্যটক

সাকিন সুন্দরবন ৩। মরণখোর
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29311722 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29311722 2011-01-21 21:04:44
সাকিন সুন্দরবন ৩। মরণখোর
আমাদের রিজার্ভ করা জাহাজে নয় ছয় বলে গতকাল আরো তিন ডজন লোক ঢুকিয়ে দেবার পর খাবার টেবিলে লাইন- টয়লেটে লাইন- পানির গ্লাসে লাইন দিয়ে সব শেষে যখন আজ সূর্য ওঠার আগে ম্যানেজার চায়ের গ্লাসে লবণ গুলিয়ে দিয়ে চিনি বলে চালিয়ে দিতে চাইল তখন আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে এলো- চোদনা পুরা গ্লাস তোমার ইয়ের মধ্যে ঢুকায়ে দিলে বুঝবা কোনটা চিনি আর কোনটা লবণ....

মাথা মুখে শরীরে এইসব খিটিমিটি নিয়ে জাহাজ ছেড়ে ছোট নৌকায় যখন বনের ভেতরে ঢুকছিলাম তখনও ভয়ে ছিলাম পুরো যাত্রাটা মাটি হয়ে যাবার। কিন্তু বনের ভেতরে ঢুকতেই সুন্দরবনের সবগুলো শ্বাসমূল মাথার সব খিটিমিটি শুষে নিয়ে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো এক অন্য রকমের শুভসকাল

আমরা হাঁটছি শীতের ভেতর দিয়ে গলায় পিঠে ক্যামেরা ঝুলিয়ে। কারো পায়ে বুট- কারো স্যান্ডেল। কারো পায়ে মোজার মতো নরম গোলাপি জুতা। আমরা হাঁটছি জুতায় কাদা লাগার উহুআহা ভয় নিয়ে। আমরা হাঁটছি জুতায় মোড়ানো নরম গোড়ালিতে কাদা-ঠান্ডায় ওরেমারে নিয়ে। আমাদের সামনে পেছনে বনবিভাগের নির্লিপ্ত দুই গার্ড। বেতনের বাইরে ভাতা আর বকশিশের আকর্ষণ ছাড়া এই বন যাদের কাছে পুরোটাই বিরক্তিকর। তারা হাঁটছে সুন্দরবনের যে কেনো গার্ডের মতো বারবার বনের বেশি গভীরে না যাবার সতর্কতা দিয়ে। অক্লান্তভাবে তারা জানিয়ে যাচ্ছে বনের গভীরেও বন ছাড়া কিছু নেই। একই রকম কাদা। একই রকম গাছ। কিন্তু বন যত গভীর ভয় তত বেশি। তাই বেশি ভেতরে যাবারও দরকার নেই কারো...

সাধারণ সতর্কীকরণের পরে সুন্দরবনের যে কোনো বনকর্মীর মতো তারা বেছে নেয় ভয়ের গল্প। চোখেমুখে ভয় জড়ো করে জানায়-গতকাল এখানে এসে বাঘ শিকার ধরে নিয়ে গেছে। যদিও গতকাল এই লোকগুলো আমাদের সাথেই ছিল মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে। তবুও যেন অলৌকিক ক্ষমতায় এরা সবাই গতকালের বাঘের শিকার সংবাদ জেনে যায়...

কিচ্ছু বলি না আমি। বনের ভেতরে চিল্লাচিল্লি অশ্লীল ঠেকে আমার। কিন্তু এবার তরুণ বনকর্মী সুমন আমার কানের কাছে এসে গতকালের বাঘের শিকার কাহিনী আবারও শোনায়। আমি তার দিকে তাকাই- কাল যদি বাঘ শিকার ধরে থাকে তবে আগামী চার দিন এই বনে সবাই নিরাপদ। সুমন একটু হকচকিয়ে গলায় উঁচায়- আপনি কীভাবে জানেন?
- আমি জানি। কারণ বাঘ মানুষের মতো চুতিয়া নয় যে ঘরে খাবার রেখে আবার খাবার কাড়তে বেরোবে। সুন্দরবনের একটা বাঘ এক হরিণ পাঁচ দিন ধরে খায়। সুতরাং বাঘ এইখানে গতকাল শিকার ধরলে আপনার রাইফেল আগামী চারদিন শুয়োর খেদানো ছাড়া কোনো কাজে লাগবে না আর...
সুমন একটু পিছিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে- সবকিছু তারা জানে। আমরা এখানে আছি বাল ছিঁড়তে

সুমন পিছিয়ে গেলে অন্য কৌশল নিয়ে এগিয়ে আসে প্রবীণ বনকর্মী মজিদ। নাকে মুখে আঙুল দিয়ে মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ দেখিয়ে ঘোষণা করে একটু আগে এইখান দিয়ে হেঁটে গেছে বাঘ। ব্যাস। খটাখট ছবি উঠে আর কেউ গিলে ফেলে তার কথা। এই বুঝি এলো বাঘ...

কিন্তু এই টিমের লিডার মুস্তাফিজ ভাই; হাতের তালুর উল্টাপিঠের মতো.চেনে সুন্দরবন। সাথে সাথে পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটিতে একটা আধা গর্ত করে সামনের দিকে আঙুল চেপে আরো দুটো দাগ বানিয়ে সবাইরে দেখিয়ে দেয়- এই দেখো। বাঘের পায়ের ছাপ কিন্তু বানানো যায়। কেউ হাসে- কেউ সাহস পায়- কেউ ছবি তোলে আর বনকর্মীরা হতাশ হয়ে হাঁটে। বিড়বিড় করে তাদের দায়িত্বের কথা মনে করাতে করাতে আবারও আমার সামনে পড়ে। আমি বলি- আপনারা ফিরে যান। এই বনে বাঘ নেই

প্রবীণ বনকর্মী মজিদ এবার সত্যি সত্যি আতঙ্ক নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অনুনয় করে- দয়া করে এই কথা বলবেন না। হরিণ দেখেন। শুয়োর দেখেন। বাঘের পায়ের ছাপ দেখেন। কিন্তু বাঘ নেই কিংবা বাঘ দেখার কথা মুখেও আনবেন না কেউ...

সুন্দরবনের বাঘশিকারী পচাব্দী গাজীর একটা কথা মনে পড়ে যায় আমার। কথাটা নাকি তিনি বাপ্পী ভাইকে বলেছিলেন- যতদিন সুন্দরবনে তুমি বাঘকে ভয় পাবে ঠিক ততদিনই সুন্দরবনে বেঁচে থাকবে তুমি। আর যাই করো বাঘের সাথে মাতব্বরি না...

দুনিয়ার অন্য যে কোনো বাঘ থেকে সুন্দরবনের বাঘ একেবারেই আলাদা। এত কষ্টে দুনিয়ার বাঁচে না কোনো বাঘ। পৃথিবীর অন্য কোনো বাঘ এইভাবে নিত্য জোয়ার ভাঁটা প্লাবন জলোচ্ছ্বাসের সাথে তাল মিলিয়ে বাঁচে না। এই বাঘকে বাঁচতে হয় কখনও কুমির হয়ে গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে- কখনও বানর হয়ে গাছে নাক ভাসিয়ে। এক বনে দুই বাঘ না থাকার প্রবাদ মিথ্যে করে সুন্দরবনের বাঘ মাঝে মাঝেই দল বেঁধে হাঁটে। একাধিক পুরুষ কিংবা একাধিক নারী বাঘ একসাথে দেখা অস্বাভাবিক নয় সুন্দরবনে। খাবার রেখে বাঘের শিকারের নিয়ম না থাকলেও সুন্দরবনের বাঘ মাঝে মাঝে খাবার সংগ্রহ করে দুঃসময়ের জন্য। এই বাঘ বই কিংবা টেলিভিশনের বাঘ নয়। এই বাঘ সুন্দরবনের বাঘ। ভয় করা লাগে তারে সকল সূত্র ছেড়ে...

সামনে আগাতে থাকি আমরা। কেউ জুতার থেকে পা মূল্যবান ভেবে জুতা ঢুকিয়ে দেয় কাদায়। কেউ জুতার দাম পায়ের থেকে বেশি নির্ধারণ করে জুতা হাতে নিয়ে খালি পায়ে ছোঁয় কাদা। কেউ জুতা আর পায়ের সমান মূল্য ভেবে পা আর জুতা দুটোকেই বাঁচিয়ে একটু শুকনা জায়গা- একটু গাছের গুঁড়ি খুঁজতে গিয়ে জ্যাকেট ক্যামেরাসহ ধপাস। কিন্তু সকলেই আগাতে থাকে। আর গতকালের বাঘের পায়ের ছাপ কিংবা শিকার ধরা কাহিনী কোনোটাই কারো কানে দিতে না পেরে দুইজন বনকর্মী হাঁটতেই থাকে... হাঁটতে হাঁটতে বাঘের পায়ের ছাপ দেখায়- হরিণ টেনে নিয়ে যাবার চিহ্ন দেখায় কিন্তু আমার চোখ গিয়ে পড়ে আব্দুল ওহাবের খালি পায়ের ছাপে

বাঘের পায়ের কাছে আব্দুল ওহাবের খালি পায়ের ছাপ। হরিণের পায়ের কাছে ওহাবের ছাপ। সামনে পেছনে গার্ড নিয়ে আমাদের পেছনে আমাদের বহরের ভিন্ন ভিন্ন জুতার ছাপ। কাদার উপর অনভ্যস্ত পায়ের এলোমেলো ছাপগুলো আমাদের। কিন্তু কাদার উপর বাঘ কিংবা হরিণের মতো অভ্যস্ত যে মানুষের ছাপ নগ্ন-সটান- আত্মবিশ্বাসী- একটানা এবং মোড় ঘোরার আগে পর্যন্ত একই সরল রেখায় ধাবমান; ওই ছাপ আব্দুল ওহাবের ছাপ...

যেখানে বাঘ এসে কাল হরিণ নিয়ে গেছে। যেখানে পাথরের নিচে শঙ্খচূড়। সেখানে খালি পায়ে একা আব্দুল ওহাব কোন পর্যটনে যায়? বনের ভেতরে সূর্যোদয় দেখতে? কুয়াশাভেজা গাছের পাতায় সূর্যের ঝিলিক ক্যামেরাবন্দী করতে? নাকি এই যে সুন্দরবনের পুরো সীমানা জুড়ে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া ছেঁড়া স্যান্ডেল- চিপসের প্যাকেট সিগারেটের ফিল্টার প্রকৃতির কতটুকু ক্ষতি করছে তার খতিয়ান নিতে?

সূর্য ওঠার আগেই আব্দুল ওহাব এই পথ দিয়ে একা চলে গেছে বনের অনেক গভীরে। আমরা জানি না সেই বাঘ আব্দুল ওহাবের সাথে কী আচরণ করেছে। আমরা অপেক্ষা করি কুয়াশা কাটার। আমরা অপেক্ষা করি সূর্য আরেকটু একটু কঠিন হবার। আমরা অপেক্ষা করি আমাদের কাক্সিক্ষত ছবির...

ছবি ওঠে। গাছের সঙ্গে মানুষ। কাদার ভেতরে মানুষ। বনের মধ্যে আমাদের স্মৃতি। শীতে কুয়াশায় কাদায় আমাদের দুরবস্থা- আমাদের অবস্থান- আমাদের আনন্দের ছবি উঠতে উঠতে কুয়াশা কেটে যায়। ডালপালার ফাঁক দিয়ে সূর্য যথেষ্ট আলো পাঠায় ক্যামেরার জন্য। তুষার আর হাসান আর পারভেজ ভাই প্রায় ভিডিও করে বসে প্রত্যেকটা ফ্রেম। একেক ক্লিকে দশ বারোটা ছবি। অন্তত একটা হলেও পাওয়া যাবে শার্প ফোকাস। এখলাস সাবজেক্টের ডানে বামে উপরে নিচে নড়েচড়ে ফ্রেম ঠিক করতে না পেরে যেন গাছকেই বলে বসে- বাবা একটু ডান দিকে সরলে আলোটা ভালো করে পাবি। জিয়া পাখির ছবি তোলার জন্য পাখির কাছে যেতে যেতে পাখিটাকেই উড়িয়ে দেয়। জিলাল সতর্কভাবে খেয়াল রাখে অন্যদের আবিষ্কার করা পজিশন আর ফ্রেমে; তারপর সেখানে গিয়ে কয়েকটা ক্লিক। জাহিদের ক্যামেরা কনফিউজড। ইভেন্ট ফটোগ্রাফির অতি ব্যস্ত জীবনে গাছের ছবি তার কাছে কে চাইতে আসবে? আশিক- রাশেদ আর মাহবুবের ক্যামেরা ছবি তোলে নিজেকে আড়ালে রেখে। সাদেকের দৃষ্টি সুন্দর বনের অস্তিত্বের ক্ষুদ্রপ্রাণের দিকে। তার ক্যামেরা তাক করে ক্ষুদ্র কীট-এক আংটাওয়ালা লাল ক্ষুদ্র লাল কাঁকড়া- লাফানো মাছ- ক্ষুদ্র কীটে। মফিজ ভাই স্টিল ছবি দিয়ে সুন্দরবনকে ধরতে না পেরে ক্যামেরার ভিডিও অপশন চালু করে ডানে বামে ঘোরান। অরূপদা তার শৌখিন ক্যামেরা নিয়ে কিছুটা বিব্রত। বারবার চোখ দেয় এর তার মনিটরে। মিলিয়ে নেয় অন্যের ছবির সাথে নিজের ছবির ভালোমন্দত্ব। আলমগীর নিশ্চিন্ত তার স্মৃতি ধরে রাখার পদ্ধতি নিয়ে। কারো দিকে তাকানোর বালাই নাই। কারো সাথে তুলনার বালাই নাই। সে তার হ্যান্ডি ভিডিও ক্যামেরায় ধরে রাখে সুন্দরবনের স্মৃতি। শাওনের ক্যামেরায় দ্রোণাচার্যের শিক্ষার্থী অর্জুনের চোখ। তীরের নিশানা ঠিক করার সময় সে গাছের ডালে বসা পাখি দেখে না- গাছ দেখে না- পাখির মাথা দেখে না। দেখে শুধু পাখির চোখ যেখানে বিদ্ধ করতে হবে তীর। বিশাল বনকে ঝাপসা রেখে শাওন শুধু ক্যামেরায় তুলে আনে কয়েক ইঞ্চি দৈর্ঘ্য প্রস্থের একেকটা টুকরা। মুস্তাফিজ ভাইর কোনো তাড়াহুড়া নেই। ফ্রেম খোঁজেন না। সাবজেক্ট খোঁজেন না। তিনি জানেন কীসের ছবি তোলা যাবে। জানেন কোনো ক্যামেরায়ই সবকিছু তোলা যাবে না। তাই তিনি আশপাশে তাকান। দেখেন। তার চোখে ধরা পড়ে গাছের পাতার ফাঁকে ছোট্ট একটা পাখি। তার চোখে ধরা পড়ে দূরে কেওড়া গাছের নিচে হরিণের নড়াচড়া। তার চোখে ধরা পড়ে কাদার মধ্যে মিশে থাকা থাবা খাওয়া হরিণের রক্ত। ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে তিনি শুধু দেখেন। এবং তারপর ক্যামেরা তুলে ক্লিক করেন একটা কি দুইটা...

আর আমি গার্ডের সতর্কতা এড়িয়ে তুষাররা যেখানে ছবি তুলতে গেছে সেখানে গিয়ে আবিষ্কার করি একটা গ্রাম্য বাড়ি আর গ্রামের রাস্তা। একেবারে সুনসান একটা গ্রাম্য বাড়ি। একটু নুয়ে গাছের গোড়ার ফাঁকে চোখ দিলে যেন বহু দূরের বাড়িটার ভিটে দেখা যায়। তারপর এই যে বাঁক। এতো আমাদের গ্রামের সেই রাস্তা। যদিও সতর্ক অনুমান দিয়ে জানি এই রাস্তায় সওদা নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য হাঁটে না কেউ...

আর কিছু দেখি না আমি। মুস্তাফিজ ভাই যেদিকে হরিণ দেখান সেদিকে তাকিয়ে বলি- হ্যাঁ ওই তো। আর মনে মনে বলি-হরিণ থাকলেও থাকতে পারে। না থাকলে ওটা গাছের ছায়া। তারপর হাঁটি। মাটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাঁটি। হরিণের ছাপ। কাঁকড়ার দাগ। বাঘের ছোপ। আর সারা বন জুড়ে আব্দুল ওহাবের পায়ের চিহ্ন। আব্দুল ওহাব এদিকেও হেঁটে গেছে একা। হয়ত ওই গ্রামের রাস্তার মতো রাস্তা ধরে হেঁটে গেছে ওহাব। কী আছে ওখানে?

ওদিকে পা বাড়াতেই গার্ডেরা পড়িমরি করে এসে আটকায়- খবরদার...

একটা পায়ের রেখা ধরে চোখ কুঁচকে আমি সামনে তাকাই। কিছুদূর একটা কেওড়া গাছের গোড়ায় গিয়ে পায়ের ছাপগুলো আবার ফিরে এসে অন্য দিকে চলে গেছে। কী করতে আব্দুল ওহাব ওই গাছ পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এসেছে আরেকটা সরল রেখায়? গাছ কাটলে তো গাছ থাকার কথা না এখানে। হরিণ ধরলে তো হরিণ টেনে নেয়ার চিহ্ন পাওয়া যেত। বাঘ মারলে কিংবা বাঘে মারলে দুজনেরই কোনো না কোনো ছাপ থাকতো অক্ষয় কাদায়। কিন্তু আব্দুল ওহাব কেন ওই গাছের গোড়ায় গেল আর ফিরে এসে চলে গেলো অন্য কোথাও?

আব্দুল ওহাবের গাছের দিকে যাবার চিহ্নের পাশে আরেকটা বুটের চিহ্নরেখা তৈরি করে আমি গাছের গোড়ায় আগাই। কী আছে ওখানে? বনের অত গভীরে গাছের গোড়ায় কী?

গাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে গাছ ধরে চারপাশে তাকাই। চারপাশে অক্ষত শ্বাসমূল- লকলকে ঘাস- আইলায় ভাঙা গাছের পচা ডাল- গুঁড়ি গুঁড়ি লাল কাঁকড়া দাগ। কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই- কোনো কাটাকাটির চিহ্ন নেই। সুনসান কাদা। তার মধ্যে ঘাসের ফাঁকে কাদার ভেতরে পেয়ে যাই আব্দুল ওহাবের আসার কারণ। একটা ছোট্ট বাঁশের খাঁচা। তার ভেতরে কাঠিতে গাঁথা তিন ইঞ্চি লম্বা একটা মাছ। আর মাছ খাবার লোভে খাঁচার ভেতরে ঢুকে আটকে পড়া মাঝারি সাইজের চারটি কাঁকড়া...

সূর্য ওঠারও আগে। কিংবা আগের দিন সূর্য ডোবার আগে আব্দুল ওহাব একা এই বন চষে বেড়িয়েছে কাঁকড়ার ফাঁদ নিয়ে। বাঘের ছাপের পাশে পাশে পা ফেলে দূরে দূরে নিয়ে বসিয়েছে কাঁকড়ার ফাঁদ। এক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবারও হয়ত একটু পরে কিংবা বিকেলে সে আসবে কাঁকড়াগুলো নিতে। একেকটা ফাঁদে ধরা পড়বে তিনটা চারটা কিংবা দশটা কাঁকড়া। সারা বন থেকে কয়েক কেজি কাঁকড়া বস্তায় ভরে আবাও একা একা বাঘের-সাপের রাস্তা দিয়ে গিয়ে উঠবে নৌকায় কিংবা কিংবা হয়ত নৌকায় উঠার আগেই সামনে এসে দাঁড়াবে মামা- ভাগিনা। চল তোরে লইয়া যাই বনের গভীরে...

বনবিবির পরে সুন্দরবনের বাকি ক্ষমতার দুটো প্রতীকই পুরুষ। এখানে সব বাঘ মামা। বাঘের সব থাবাই পুরুষালি মামার থাবা। আর বাঘেরাও সবাই পুরুষবাদী এই বনে। আক্ষরিক অর্থেই ম্যানইটার। মানুষখেকো নয়; পুরুষখেকো বাঘ এরা সবাই। এই বনের গভীরে মারতে কিংবা মরতে কোনো নারী আসে না বলেই বাঘেরা যাদের হাতে মরে আর যাদের মারে তারা সকলেই পুরুষ। সুন্দরবন মূলত এক পুরুষালি বন...

আমাদের আশঙ্কা নেই। আমাদের পাহারা দিয়ে রেখেছে ফরেস্টের দুই দুইজন গার্ড। আমাদেরকে বাঘেরা মারবে না কারণ তারা জানে আমরা সবাই প্রকৃতিবাদী এবং পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা হ্রাসে দারুণ শঙ্কিত। আমরা বাঘ সম্মেলনে বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে দেশের চুক্তি সইয়ে দারুণ খুশি। সারা সুন্দরবন আবার বাঘে বাঘে বাঘময় হয়ে গেলে আমরা খুশি। সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় সরকারের প্রতিজ্ঞায় আমরা খুশি। আমরা খুশি সুন্দরবনের ক্ষতি করলে আব্দুল ওহাবকে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে জেলের ঘানি টানতে হবে আরো পাঁচ বছর। আমরা খুশি বাঘ মারলে আব্দুল ওহাবকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা জরিমানা দিয়ে যাবজ্জীবন জেলে কাটাতে হবে শুনে। আমরা এতেও খুশি যে বাঘের থাবায় আব্দুল ওহাব মরে গেলে তার বিধবা বৌ আব্দুল ওহাবের মূল্যবাবত পাবে এক লক্ষ টাকা। জীবিত আব্দুল ওহাব যেখানে সুন্দরবনে একমাস কাঁকড়া ধরে হাজার টাকা বাঁচাতে পারে না সেখানে শুধু বাঘের একটা থাবায় প্রাণ ছেড়ে দিলেই তার দাম হয়ে যাবে এক লক্ষ টাকা। বাহারে আব্দুল ওহাব। এই খবর জেনেই তুমি কাঁকড়া ধরার নামে একা একা বনে চলে গেছ বাঘের থাবার সন্ধানে। যদিও আমরা জানি না বাঘের থাবায় তোমার মৃত্যু প্রমাণের কী বন্দোবস্ত করে গেছ তুমি। সরকারের ঘরে বাঘের হাতে তোমার মৃত্যু প্রমাণের জন্য তোমার বৌয়ের প্রয়োজন হবে তোমাকে বাঘে ধরে নিয়ে যাবার স্থিরচিত্র কিংবা কোনো পত্রিকায় তোমার বাঘে খাওয়া ছবি কিংবা ফরেস্টের নোট কিংবা কমপক্ষে তিনজন সাক্ষী কিংবা নিদেন পক্ষে সরকারি আদালতে বাঘের স্বীকারোক্তি- মাননীয় আদালত আমি সুন্দরবনের কেওড়াশুটির বাঘ। আমি স্বীকারোক্তি দিচ্ছি যে স্বজ্ঞানে এবং আন্তর্জাতিক বাঘাধিকারে মরহুম আব্দুল ওহাব ভাগিনাকে ক্ষিদা নিবারণের মানসে ভক্ষণ আমি করেছি তাই আমার ক্ষতিগ্রস্ত ভাগিনাবধূকে প্রতিশ্র“তিমতো এক লক্ষ টাকা প্রদান করা হউক...

আমরা বাঘের উপরে আস্থাশীল। আস্থাশীল বাঘ আর বাঘি পরিবেশ আইনের উপর। আমরা জানি আব্দুল ওহাবেরা বাঘের জমিতে এসে ঘর তোলে তাই বাঘের সংখ্যা কমে যায়। তারা বাঘের খাবার খেয়ে ফেলে তাই বাঘের সংখ্যা কমে যায়। তারা টাকার লোভে বাঘ মারে তাই বাঘের সংখ্যা কমে যায়। তাই এই নতুন আইন। লুকিয়ে চুরিযে একটা বাঘ মারলে আব্দুল ওহাবেরা পায় হাজার পাঁচেক টাকা তাই তাদেরকে বেশি টাকার লোভ দেখাতে নতুন এই আইন- বাঘ মারলে পাবি পাঁচ হাজার আর বাঘের হাতে মরলে পাবি এক লক্ষ টাকা। এইবার বুঝে দেখ বেটা কোনটাতে লাভ? যতবার মরবি তত লক্ষ টাকা। খালি টাকা আর টাকা। মরতে না পারলেও টাকা। বাঘের হাতে পঙ্গু হলে অর্ধলক্ষ টাকা। বারবার পঙ্গু হ বেটা মরতে যদি ভয়। মামার হাত এখন স্বর্ণের খনি। তোকে ছুঁয়ে দিলেই হাজারে হাজারে টাকা। তাই সরকারও তোর মঙ্গল চিন্তা করে সপ্তায় আড়ইশো টাকা নিয়ে কাঁকড়া ধরার পারমিট দিয়ে তোকে জঙ্গলে পাঠায়। তোমাকে পারমিট দিলে সরকারের লাভ। তুমি কাঁকড়াসহ ফিরে এলে লাভ মহাজনের আর ফিরে না এলে লাভ মামাবাঘা আর তোমার বিধবা বৌয়ের। তাই তোমাকে বনের মধ্যে একা পাঠানো হয় রাইফেল বন্দুক ছাড়া। রাইফেল থাকলেই হাজার টাকার জন্য তুমি বাঘের দিকে বন্দুক তাক করে ফেলতে পারো। কিন্তু না থাকলে মামার ছোঁয়ায় তোমার দাম উঠে যাবে লক্ষ লক্ষ টাকা...

এইসব তুমি ভালো করেই জানো আব্দুল ওহাব। জানো বলেই আমরা রাইফেলধারী গার্ড নিয়ে বনে ঢোকা আগেই তুমি কাঁকড়া ধরার নামে বাঘের হাতে ধরা দিতে গেছো। তুমি জানো এখানে বড়ো বড়ো ক্যামেরা নিয়ে একঝাঁক ফটোগ্রাফার আসবে। মুহূর্তের মধ্যেই তোমার লাশের শত শত ছবি উঠে আসবে ক্যামেরায়। তারপর পত্রপত্রিকা দেশি বিদেশি প্রদর্শনীতে চলে যাবে তোমার বাঘে খাওয়া ছবি। বন্দুকধারী ফরেস্টের গার্ডেরা সাক্ষী দেবে তোমার মৃত্যুর আর তখন... তোমার মৃত্যুর মূল্য কে ফাঁকি দেয়? সুড়সুড় করে সরকার তোমার মূল্যটা গ্রামে গিয়ে তোমার বৌয়ের হাতে পৌঁছে দিয়ে আসবে। কিন্তু ততক্ষণও কি তোমার বৌ তোমার বাড়িতেই থাকবে? নাকি সুন্দরবনের নিয়মে তোমার মৃত্যু দায় নিয়ে ততক্ষণে তাকে চলে যেতে হবে বিধবাপল্লির ডেরায়?


সাকিন সুন্দরবন ১। বনমজুর

সাকিন সুন্দরবন ২। বনপর্যটক

সাকিন সুন্দরবন ৪। ভাতারখাগী ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29307615 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29307615 2011-01-14 20:14:22
ফাঁসপাতাল
তারপর কুঁচকিতে ঘা- মাথায় খুশকি- বৌয়ের সাথে রাগারাগি সব কিছুর জন্যই আমরা সেই মেশিনে ঢুকে জানতে পাই আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পেশাবের রং সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক...

তালের মধ্যে তাল দিয়ে লাফ দিলে তারে বলে নাচ; চিৎকারের সুরে চিৎকার বাঁধলে হয় গান তাই বান্দর মেশিনকে ঘিরে ডাক্তার আর হাসপাতাল নেচে নেচে গায়- লাভেরে লাভ... আর ওদিকে মেশিনে-বণিকে-ডাক্তারে সুর হারিয়ে তাল পাই না বলে আমাদের সব লাফই হয় খিঁচুনি- সব চিৎকারই আর্তনাদ....

২০১০.০৭.১১ রোববার]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29233851 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29233851 2010-09-02 02:04:56
উন্দা
এইসব দেখে আর প্রাণোবন্ধু কয় কিছু টেকা জমাইয়া ব্যাংকে ডাউনলুড দিয়া ফেলাট বুকিং দে। তারপরে ভাড়ার টেকায় কিস্তি দিয়া নিজের একখান বাড়ি কইরা ফালা। বাপে তো অসুধ খাইলেও মরব না খাইলেও মরব। বাপের লাইগা এখন কষ্টের কামাই নষ্ট কইরা কী লাভ? মুই কই বাপের লাইগা কামানের সুমায় কই পাই। সব কামাইতো বাড়িয়ালা খায়। দুস্ত কয় বাড়িয়ালারে খাওয়াইয়া চোখ মুবাইল দুইটা বন্ধ কইরা কিছু টেকা আলগা কর...

আমারে বুঝাইতে বুঝাইতে প্রাণোবন্ধু ব্যাংকে ডাউনলুড দিয়া নগর বাগানে ফেলাট বুকিং দেয়। তার এক বচ্ছর পরে মেস ছাইড়া গিয়া ফেলাটে উইঠা বিয়ার কতা জানায় আর কয় দুস্ত তুমি আমি একই সেইম কিন্তু যেই বউ আমি পাইছি হেইডা কিন্তু তুমি পাইবা না। একবার আইসা দেখোরে বন্ধু আমি কুন জায়গায় আছি আর তুমি আছ কুতায়...

দুস্তের ফেলাট দেখতেও যাইতারি নাই। বিয়াতেও না। আইজ ভাবলাম যাইগা। দেইখ্যা আহি কী সুখে আছে পরানের বন্ধু আমার

ফেলাটের গিয়া গার্ডের কাছে কইত্থন আইছি কই যামু কইবার পর সে আমারে কয় যান। মুই কই কুন দিকে যামু? গার্ডে কয় সুজা গিয়া বামে সিঁড়ি। মুই কই লিফটে কয় তলার বুতাম টিপুম? গার্ডে কয় লিফট অহনতরি চালু হয় নাই। টেম্পরালি সিঁড়ি দিয়া উঠতে হইব আঠারো তালায়। মুই কই সিঁড়ি টেম্পরালি ক্যান? পারমানেন সিঁড়ি নাই? গার্ডে কয় এইডা অইত্যাধুনিক বিল্ডিং। অইত্যাধুনিক বিল্ডিংএ সিঁড়ি থাহে না...

গার্ডের দেখাইন্না রাস্তায় সামনে গিয়া দেখি লিফটের গর্তে একখান লুহার মই বিশতলা ছাদেরথন মাটি বরাবর টানাইয়া রাখা। নিচে মানুষ আর মানুষ। চাইয়া দেখি কেউ উঠে না। খালি নামে। বুঝলাম উঠা নামার শিফট আলাদা আলাদা এইখানে। এমুন সময় দেখি নাদিয়া খাড়াইয়া রইছে লাইনে সবার সামনে। আমারে ডাইকা নিয়া কয় আমার পিছনে খাড়াও। তারপর সবারে শুনাইয়া কয় ইনি আমার লগেই লাইনে আছিল। বিড়ি খাইতে গেছিল বাইরে

নাদিয়ারে আমি রুমির লাইগা চিনি। তখন নাদিয়া আমারে টিটকারি মিটকারি দিয়া চোখঠুট উল্টাইয়া কথা কইত বান্ধবীর প্রেমিক ভাইবা। পরে রুমির লগে কাটাকাটি হইলেও রাস্তাঘাটে নাদিয়ার লগে আমার কথাবার্তা হয়

নাদিয়ার আওয়াজ শুইনা কেউ কিছু না কইলেও নাদিয়ার ঠিক পিছন থাইকা একটা মাইয়া কিছু কইতে গিয়াও থাইমা যায় আমারে দেইখা। তারপর আমার দিকে ঠোঁট পাল্টি দিয়া কয় অইন্য কেউ হইলে কিন্তু আমার সামনে লাইন মারতে দিতাম না

এই মাইয়াডারেও আমি চিনি। আমার এক ছুডুদুস্তের বান্ধবী বন্টি। বন্টি পিছন থাইকা চাপ দিয়া আমারে নাদিয়ার লগে ঠাইসা ধরে। নাদিয়ার কোলে একটা মাইয়া। ঠেস খাইয়া নাদিয়া কয় এখন আর চাপেচুপে কুনু ফিলিং হয় না। একটু সইরা খাড়াও। মুই কই সরনের জায়গা নাই। কিন্তু তুমি মনে লয় বহুত মুটা হইছ। নাদিয়া কয় সিজারে বাচ্চা হইছে। তার উপরে বড়িটড়ি খাই। মুটাতো হওনেরই কতা। মুই কই আমারও কিছু মুটা হওয়া দরকার। মোরে কিছু বড়িটড়ি দিও। পিছন থাইকা বন্টি কয় ওই বড়ি খাইলে কিন্তুক পুলাগো যন্ত্রপাতি সব চুলের ফিতার লাহান ঝুইলা যাইতে পারে

নাদিয়ার মাইয়াডা আমারে দেখে। নাদিয়া ওর গালে ঠোনা দিয়া কয় এইডা তুমার একটা মামা। তারপর আস্তে আস্তে আমারে কয় রুমির পিছে না ঘুরলে কিন্তু তুমি এর বাপ হইতে পারতা। মুই কই কতাডা ঠিক না। তাইলে কালাকুলা অইন্য কুনু মাইয়া হইত। নাদিয়া কয় ক্যান? মুই কই তুমিও কালা আমিও কালা। দুইজনের মাইয়া সাদা হওয়ার তরিকাডা কী? নাদিয়া কয় ক্যান? সাদা কুনু বেডার থাইকা ফ্লেগজি লুড নিতাম। কথা শুইনা পিছন থাইকা একটা ঠেস দিয়া বন্টি কয় আমার কিন্তুক কালা পুলাপান পছন্দ। মুই কই তুমিও সাদা আমার ছুডু দুস্তেও সাদা। হেরে বিয়া কইরা তুমি কালা পুলাপান চাইলে তো আমাগো কাছ থিকা ফ্লেগজি লুড নিতে হইব। নাদিয়া কয় তুমি রুমিরেই ফ্লেগজি লুড করবার পারো নাই আর করবা অইন্যেরে। মুই কই লুড করার আগেই আমার চার্জ শেষ হইয়া গেলে আমি কী করুম? নাদিয়া কয় হের লাইগাই রুমি ভাগছে। কয় ঘরে ব্যাটারি থুইয়া বাইরে চার্জার খুজন আমার পুষাইতো না

এমুন সময় পিছন থাইকা কেউ আওয়াজ দেয় উঠেন উঠেন। নাদিয়া কয় চলো

সক্কলের আগে নাদিয়া তারপরে আমি তারপরে বন্টি তারপরে বাকিরা। লুহার মই ধইরা ধইরা উঠতে থাকি। কিছুদূর উঠতেই মই দুলতে থাকে। মুই কুনো কাটাকুটা দেখি না। সব লুকই কি বিশ তলায় উঠব? মুই তো যামু আঠারো তলায়। কাটাকুটা না থাকলে আঠারো তলায় যামু কেমনে? মুই নাদিয়ারে জিগাই। নাদিয়া কয় এইডা টেম্পরালি সিঁড়ি। সবাইরে বিশ তলার ছাদে গিয়া পরে যার যার তলায় নামতে হইব। মুই কই এইডা অইত্যাধুনিক বিল্ডিং। এইডায় তো সিঁড়ি নাই তাইলে যার যার তলায় পাব্লিক নামব কেমনে? নাদিয়া কয় সিঁড়ি নাই তয় একতলা থাইকা আরেক তলায় যাওনের বাঁশের মই আছে। মুই কই বাঁশের মই দিতে পারলে সিঁড়ি দিলে ক্ষতি কী ছিল? নাদিয়া কয় বাঁশের মইরে কয় ইন্টারিয়র। ওইটা অইত্যাধুনিক বিল্ডিংয়ের ডিজাইনের পাট

মাইয়া কোলে নিয়া নাদিয়া আস্তে আস্তে উঠে। একবার উঠে তো মইয়ের মইদ্যে ওর স্যান্ডেলের হিল বসাতেই গিয়া দুইবার পিছলায়। আমরা যত উপরে উঠি নিচে তত লুক মইয়ের মইদ্যে উঠে। মুই চিক্কুর দেই সব্বাই একলগে উইঠেন না। মই ছিইড়া যাইতে পারে। কেউ একজন উল্টা চিক্কুর দেয় উঠোন মিয়া উঠেন। মই নিয়া আপনের চিন্তা করন লাগব না। মুই কই এই সিঁড়ির ক্যাপাসিটি কত? লুকে কয় ভাইঙা পড়নের আগে পর্যন্ত পুরাটাই ক্যাপাসিটি। উঠতে থাকেন। মুই কই ডর লাগে। পাব্লিক কয় উপরে তাকাইয়া উঠেন। ডর লাগব না। মুই কই আমার উপরে শাড়িপরা এক ভদ্রমহিলা। উপরে তাকান ঠিক না। নাদিয়া কয় সমস্যা নাই। কী আর এমন দেখবা। নিচে থাইকা বন্টি কয় মুই কিন্তু পেরায়ই লুঙ্গি পরা পুলাগো নিচে নিচে উঠি দেখার লাইগা। নাদিয়া কয় আমিও উঠি। তল পুলারা টের পাইলে কিন্তু ছাদে নাইমা ফেলাট নম্বর জিগায়। বন্টি কয় আমারে জিগাইলে আমি কিন্তু অইন্য ফেলাটের নম্বর কইয়া দেই

ওরা কতা কয় আর আমার ডর লাগে। মুই কই তুমাগো বিল্ডিংয়ে আগুন লাগলে কী করবা? নাদিয়া কয় অহন তামাইত তো লাগে নাই। মুই কই যদি লাগে তয় কী করবা? বন্টি কয় তখন এমার্জেন্সি এক্সিট ব্যবহার করমু। মুই কই সেইডা কুন দিকে? বন্টি কয় এইডাই। মুই কই এইডা কেমনে এমার্জেন্সি হয়? বন্টি কয় সবাইরে বইলা দেওয়া আছে যেন এমার্জেন্সির সুমায় কেউ মই বাইয়া নামার চিন্তা কইরা বইসা না থাকে। এমার্জেন্সিতে যেন সবাই ছাদে উইঠা সুজা লাফ দেয় নিচে। তাইলে মিনিটের মইদ্যে সাবই নামতে পারব। মুই কই হাত পা গুড়া হইব না? বন্টি কয় তাতে অসুবিধা নাই। আমাগো ফেলাট সমিতিরি হাসপাতাল আছে। সব টিটমেন ফিরি

উপরে যত উঠি মই তত খড়বড় করে। আমি কই ও নাদিয়া বল্টুবাল্টু খুইলা পড়ে কি না দেহো তো। নাদিয়া কয় মাইয়া শাড়ি আর স্যান্ডেল তিনডা সামলাইয়া কূল পাই এখন আবার বলটু দেখুম। পারলে তুমি দেখো। মুই কই আমিতো উপরে তুমারে ছাড়া কিচ্ছু দেখি না। নাদিয়া কয় আমারে বহুত দেখছ। এখন চোখ বন্ধ কইরা মই ধইরা উঠতে থাকো। আর বেশি বাকি নাই

নাদিয়া ছাদে উইঠা জিগায় কুন ফেলাটে যামু। মুই কই আঠারো। নাদিয়া কয় আঠারো কত? মুই কই আঠারো দক্ষিণ। নাদিয়া কয় অইত্যাধুনিক ফেলাটে উত্তর দক্ষিণ থাকে না। এবিসিডি থাকে। মুই কই এবিসিডি তো জানি না। বন্টি কয় মুবাইল লাগান। মুই দুস্তরে মুবাইল করলে সে কাইট্টা দিয়া ব্যাককল কইরা কয় ডি ফেলাট। নাদিয়ারে আমারে উত্তরের কুনা দেখাইয়া কয় ওইখানে সিঁড়ি আছে। ছাদ থাইকা বিশে বিশ থাইকা উনিশে আর উনিশ থাইকা সোজা নাইমা যাইবা আঠারোর ডি। তারপরে কয় আমার জামাই ঘরে না থাকলে তুমারে যাইতে কইতাম। অইন্য একদিন আইসো। বন্টি কয় ফেলাট নম্বর না বইলা আসতে বলা মানে কিন্তু আইস না। নাদিয়া মুখ ঝামটি দিয়া কয় হেয় আমার দুস্ত। আসার আগে আমারে মুবাইল দিবো। তুমার অত জ্বললে নিজের ফেলাট নম্বর কও। বন্টি কয় আমার ফ্লেগজি লুডের দরকার নাই। নিজের কুম্পানিতে প্রিপেইড পরীক্ষা কইরা লইছি। এখন ওইডারেই পুসপেইড বানামু। মুই কই আমি তাইলে যাই। ওরা কয় আইচ্ছা

ছাদের থাইকা একটা বাঁশের মই নাইমা গেছে বিশতলার বারান্দায়। উইঠা নিচের দিকে তাকাইতেই দেখি আমার পাছার মাংস শক্ত হইয়া কাঁপতাছে। বহুত নিচে পিপড়ার মতো মানুষ দেখা যায়। মুই শুইয়া বইসা আস্তে আস্তে নাইমা আসি বিশতলার বারান্দায়। এক লুক আমারে দেখে আর হাসে। বারান্দায় নাইমা খাড়াইতেই কয় বুঝছি আপনে ফেলাট বাড়িতে থাকেন নাই কুনুদিন। তা যাইবেন কই? মুই কই আঠারোর ডি মোর দুস্তের বাড়ি। লুকটায় কয় অত কষ্ট কইরা না আইসা আপনের দুস্তরে কইতে পারতেন নাইমা গিয়া দেখা করনের কতা। মুই কই দুস্তে তার বাড়ি দেখাইতে চায়। লুকটায় কয় মুবাইল ক্যামেরায় বাড়ির ছবি তুইলা দেখাইলেই হইত। মুই কই আইয়াই যখন পড়ছি তখন দেইখ্যা যাই। লুকটায় কয় সেইডাই ভালা। সাবধানে যাইয়েন

উনিশ বাইয়া আঠারোর বারান্দায় খাড়াইয়া দরজায় ধাক্কা দিতেই প্রাণোবন্ধু বাইরাইয়া আইসা আমারে জড়াইয়া ধইরা কয় শেষকালে আইলারে বন্ধু আসো আমার ঘরে। কিন্তুক তুমি কলিন বেল রাইখা দরজায় বাড়ি দিলা ক্যান? মুই কই বেল দেখি নাই। দুস্তে কয় এইডা কুনো কতা না। তুমি দেখো কী সুন্দর বেল। খাড়াও আমি আবার ঘরে যাই তুমি বেল দেও

দুস্ত বেলের বোতাম দেখাইয়া আবার ঘরে ঢুইকা যায়। মুই বোতামে চাপ দিতেই ভিতরে প্যাকপ্যাক কইরা হাসের ডাক শুনা যায়। দুস্ত বাইরাইয়া কয় দেখছ কত্ত সুন্দর আওয়াজ? কিন্তুক অতগুলা বেল দিবার দরকার নাই। বেলের ফিউজ জইলা যায়। একটাই যথেষ্ট। মুই কই ঠিকাছে। এরপর একটাই দিমু। দোস্তে কয় এখন একবার টেরাই দিয়া লও

দুস্ত আবার দরজা বন্ধ কইরা ঘরে ঢুইকা যায়। মুই বেলের মইদ্যে একটা টোকা দেই আর ভিতরে একটা হাসের ডাক শুইনা দুস্ত বাইরাইয়া আইসা কয় এইবার হইছে। ভিতরে আহো। মুই ভিতরে গেলে কয় এই আলনার মইদ্যে জুতা খুইলা থও। ফেলাট বাড়িতে ঘরে জুতা পরার নিয়ম নাই। মুই জুতা খুইলা থুইলে দুস্তে কয় আসো তুমারে ঘর দেখাই। বইলা ঘরবারান্দা টব ফুলদানি সব দেখায়। মুই কই সুন্দার হইছে। দুস্তে কয় এর লাইগাই কই ফেলাট কিনো। মুই কই মই বাইয়া উঠতে আমার ডর লাগে। দুস্তে কয় এইডাতো টেমপোরালি। লিফট হইলে বোতাম টিইপ্যা ঘরের দরজায় আইসা নামবা। মুই কই আমার হাড্ডিগুড্ডি অখন অত শক্ত হয় নাই। এমার্জেন্সিতে লাফ দিলে হাসপাতালের বদলা আমার কব্বরে যাওন লাগব। দুস্তে কয় সেই ব্যবস্থাও আছে। বুকিং দিবার সময় তুমি হাসপাতালের বদলা ফিরি কব্বরের ঘরে টিক দিলেই হইব। মুই কই কব্বর আর হাসপাতাল দুইডা একলগে হয় না? দুস্তে কয় দুইডা দিয়া কী করবা তুমি? মুই কই দুইডা পাইলে হাসপাতালডা দিতাম বাপেরে আর কব্বরটা রাখতাম নিজের লাইগা...

২০১০.০২.২৭ শনিবার]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29115509 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29115509 2010-03-13 15:06:18
বগোডুলের কিচ্ছা। ০৪
বগোডুল দুই গুন্ডার দুই চাকুর দিকে তাকায় আর কাকুতি মিনতি করে- ও বড়োভাই বড়োভাই গো। আমারে মাইরেন না গো ভাই। আমার টেকাপয়সা সুনাদানা মা বাপ কিচ্ছু নাই গো ভাইজান। আমি রাস্তায় ঘুরি আর বস্তায় ঢুকে ফুটপাতে ঘুমাই...

বগোডুল যতই কাকুতি মিনতি করে গুন্ডারা ততই হামতাম করে আর সমানে লাত্থি গুঁতা মারে- টেকা নাই ক্যান? টেকা পয়দা কর। পয়দা কইরা আমাগের দে। নাইলে কিন্তু খাইয়া ফালামু কইলাম

বগোডুল লাত্থি খায় আর চাকুর দিকে তাকায় আর কাকুতি করে কিন্তু গুন্ডারা তাকে মারতেই থাকে। মারতে মারতে এক গুন্ডা আরেক গুন্ডার দিকে তাকায়- ধুশ্শালা মারতে মারতে হাতে পায়ে ব্যথা ধইরা গেলো। চল চাক্কু সান্ধাইয়া দিয়া অন্য মুরগি ধরি...

বগোডুল বুঝে কেইস খারাপ। সে এক ঝটকায় তার বস্তাটা তুলে দুই গুন্ডার উপরে ঝুপুত করে ফেলে ঝেড়ে দৌড় লাগায় উল্টা দিকে...

বগোডুল দৌড়ায় আর পেছনে তাকায় গুন্ডারা তাকে ধরতে আসলো কি না। অন্ধকার রাত্তির কিছু দেখা যায় না। তবু সে সামনে দৌড়ায় আর পেছনে তাকায়। দৌড়াতে দৌড়াতে দৌড়াতে গিয়ে একটা গাছের আড়ালে থামে। থেমে পেছনে তাকায়...

নাহ। কাউকে দেখে না বগোডুল। সে গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে আরো ভালো করে তাকায়। না কেউ নাই। সে আরেকটু আগায় আর আরেকটু তাকায়। কাউকে দেখে না সে। গুন্ডারা মনে হয় চলে গেছে। সে এবার এদিক সেদিক ডানে বামে তাকাতে তাকাতে গিয়ে তার বস্তার কাছে হাজির হয়। আবারো ডানে বামে ভালো করে তাকিয়ে দেখে কেউ নাই। বগোডুল এবার তার বস্তাটা টান দিয়ে তোলে। তুলতেই শোনে চিঁউ চিঁউ চিঁউ। ভাই ভাই ভাই...

বগোডুল এদিক সেদিক চারদিক তাকিয়ে কিচ্ছু দেখে না কিন্তু আবারো শোনে ইন্দুরের বাচ্চার মতো চিঁউ চিঁউ চিঁউ। ভাই ভাই ভাই...

বগোডুল চিঁউ চিঁউ শোনে আর এপাশওপাশ তাকায়। হঠাৎ টের পায় তার পায়ে ইন্দুরের মতো কীসে যেন বিরবির করে। বগোডুল পা ঝাড়ি দিয়ে ইন্দুর সরায় টের পায় পাশের দেয়ালে কিছু একটা গিয়ে ধপ করে পড়ল আর তারপর আবার সেই চিঁউ চিঁউ চিঁউ। ভাই ভাই ভাই...

বগোডুল আস্তে আস্তে দেয়ালের কাছে গিয়ে ভালো করে তাকায়। তাকিয়ে সে বেক্কল বনে যায়। ও মা। সেই দুই গুন্ডা। এখনও তাদের হাতে চাকু ধরা কিন্তু দুইটারই সাইজ হয়ে গেছে তিন আঙুলের সমান। আর তাদের হাতের চাকুগুলা এখন আঙুল থেকে কেটে ফেলা নখের সাইজের চেয়েও ছোট। বগোডুলকে দেখেই দুই গুন্ডা এবার হাউকাউ করে কান্নাকাটি করে- চিঁউ চিঁউ চিঁউ। ভাই ভাই ভাই। আমাগের মাপ কাইরা দেন। আমাগের বড়ো কইরা দেন। কান ধরি আর বেয়াদবি করব না...

বগোডুল তাজ্জব বনে। এইগুলা ইন্দুরের বাচ্চার মতো হইল কেমনে? বগোডুল কোনো কুল কিনারা পায় না। এর মধ্যে দুই গুন্ডা আবারও চিঁউ চিঁউ করে। বগোডুলের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়- হারামজাদারা চাক্কু নিয়া আমারে মারতে আসো আর এখন আমারেই তেল মারো। খাড়াও...

বগোডুল বস্তা থেকে সুতলি খুলে দুইটারে হাতপা নাকমুখসহ ঠেসে বেঁধে ফেলে। তারপর বস্তায় ঢুকে এক ঘুম দিয়ে পরের দিন দুইটারে হাতে ঝুলিয়ে রাস্তায় বের হয়। সে এই রাস্তায় হাঁটে ওই রাস্তায় হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে সে কুত্তা বিলাই খরগোশ কবুতর বিক্রির মার্কেটের সামনে দিয়ে যায়। সে হাঁটে আর হঠাৎ পেছন থেকে এক দোকানি তাকে ডাক দেয়- ওই খাড়া। তোর হাতের মইধ্যে কী?
- হাতের মইধ্যে গুন্ডা
- হাতের মইধ্যে গুন্ডা? দেখি তো দেখি?

দোকানি বগোডুলকে দোকানের মধ্যে নিয়ে শো কেসের উপরে দুই গুন্ডার সুতলি খোলে। সাথে সাথে নখের সাইজের চাকু ধরে তিনআঙলা দুই গুন্ডা চিৎকার করে উঠে- চিঁউ চিঁউ চিঁউ। ভাই ভাই ভাই...

দোকানি হাসে। কর্মচারী হাসে। আশেপাশে জড়ো হওয়া লোকজনও হাসে- আরে বাইসরে বাইস। বীর পুরুষ ফাইটার...

সক্কলে মজা দেখে আর দোকানি বগোডুলের কানে কানে বলে- মাল দুইটা আমারে দে। টেকা দিমু তোরে। বগোডুল ভাবে খারাপ না। সে দুই গুন্ডারে বেচে দেয় আর দোকানি দুই গুন্ডারে একটা খাঁচায় ঢুকিয়ে কুত্তার খাঁচার পাশে রাখে। তারপর টাকাটুকা গুণে দিয়ে বগোডুলরে কানে কানে বলে- এইরাম মাল যা পাইবি সব আমারে দিবি। তোরে টেকা দিমু। বেশি বেশি টেকা...

বগোডুল বের হয়ে আসে আর মার্কেটের সব দোকানি তাকে ডেকে ডেকে কানে কানে বলে- মুই আরো বেশি টেকা দিমু। যা পাবি সব আমারে দিবি তুই...

বগোডুল কাউরে কিচ্ছু বলে না। সে কূলকিনারা পায় না দুই গুন্ডা কেমনে তিনআঙলা হলো। কিন্তু সে কাউরে কিচ্ছু বলে না। ভাব ধরে বের হয়ে এসে বস্তায় ঢুকে একটা ঘুম লাগায়। আর পরের দিন তার ইচ্ছা হয় গুন্ডা দুইটারে দেখতে। সে গুন্ডা বিক্রির টাকায় পেটভরে খেয়েদেয়ে বস্তা বগলে নিয়ে কুত্তা বিলাইর মার্কেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে এক দোকানি এসে তার ডানা ধরে দোকানের ভেতরে নিয়ে যায়- বস বাবা বস। মিষ্টি খা। চা খা। আর যা মাল আছে সব আমারে দিয়া যা

বগোডুল বলে আর কোনো মাল নাই। আমি কাইলকের মাল দুইটা দেখতে আসছি আজ। দোকানি বলে কালকের মাল দুইটা বহু দামে বিক্রি কইরা দিছে ওই দোকানি। আইজ তোরে আমি আরো বেশি টেকা দিমু সব মাল আমারেই দে...

বগোডুল যতই বোঝায় তার কাছে আর কোনো তিনআঙলা নাই দোকানি ততই চাপাচাপি করে। বগোডুল যতই বোঝায় দোকানি যতই চাপাচাপি করে আর তর্কাতর্কি করে। দোকানি তর্কাতর্কি করে আর এর ভুশ করে ক্ষেপে যায়। ক্ষেপে গিয়ে চিৎকার করে আর তার কর্মচারীদের বলে- এই দরজা লাগা আর এরে বাইন্ধা রাখ বাথরুমে নিয়া...

দুই কর্মচারী হুটহাট দরজা লাগিয়ে বগোডুলকে ধরার জন্য এগিয়ে আসতেই সে বুঝে কেইস খারাপ। বগডুল তার বগল থেকে বস্তাটা ঝুপুত করে দুই কর্মচারীর উপর ফেলে দিয়ে দৌড় লাগাতে গিয়ে দেখে দরজা বন্ধ। দরজা খোলার জন্য টান দিতেই টের পায় দোকানি নিজে এসে জাপটে ধরেছে তাকে- হারামজাদা যাবি কই। হয় তিনআঙলা আমারে দিবি না হয় বাথরুমে বান্ধা থাকবি সারাদিন

বগোডুল দোকানির সাথে কুস্তি করে আর ভাবে এখন দুই কর্মচারী এসে ধরলে তার কেইস খারাপ। কিন্তু সে কুস্তি করে আর দেখে কর্মচারীরা কেউ আসে না। হঠাৎ শোনে পায়ের কাছে চিঁউ চিঁউ চিঁউ। তার বস্তার নিচে কীসে যেন নড়াচড়া করে আর চিঁউ চিঁউ করে। কিন্তু দোকানি তাকে ছাড়ে না। দোকানি তার গলা জাপটে ধরে কর্মচারীদের ডাকে। দোকানি তাকে কাঞ্চি মেরে মাটিতে শুইয়ে ফেলে আর হঠাৎ বগোডুল বস্তাটা তুলে নিয়ে ঝুপুত করে দোকানিকে ঢেকে ফেলে। আর হঠাৎ করেই দেখে দোকানি নেই আর আগের দুইটার সাথে এখন তিনটা চিঁউ চিঁউ চিঁউ...

বগোডুল উঠে মাটির দিকে তাকিয়ে দেখে দুই কর্মচারী আর দোকানি সবাই তিনআঙলা হয়ে গেছে। বগোডুল এইবার কেইস বুঝে যায়। সে তার বস্তাটা ভাঁজ করে বগলে নেয় আর দোকান থেকে একটা বিলাইর খাঁচা খালি করে তিনটারে ঢুকিয়ে দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায় আর আরেক দোকানি তাকে ডেকে নিয়ে বলে- তোর হাতের মাল আমারে দে। টেকা দিমু আমি...

বগোডুল তিনটা তিনআঙলাকে পাশের দোকানে বিক্রি করে বের হয় আর আরেক দোকানদার তারে ধরে নিয়ে যায়- কাইলকে না তোরে কইলাম- যা পাবি সব আমারে দিবি? তাইলে ওই দোকানে বিক্রি করলি ক্যান?

বগোডুল যতই বলে আর পাইলে দিমুনে। দোকানি তত ক্ষেপে। ক্ষেপতে ক্ষেপতে সেও তার কর্মচারীদের নিয়ে বগোডুলের সাথে কুস্তি করে আর বগোডুলও ঝুপুত করে সবগুলারে তিনআঙলা বানিয়ে পাশের দোকানে বিক্রি করে দেয়। আর তারপর ফিরে এসে খেয়েদেয়ে বস্তায় ঢুকে ঘুমায়। কিন্তু সন্ধ্যায় আবার তার ঘুম ভেঙে যায় পুলিশের বাঁশি আর লাঠির ঠেলায়- উঠ বেটা উঠ। মন্ত্রী আসবে এইখানে। যা ভাগ

বগোডুল যতই বোঝায় মন্ত্রী চিল্লাবে রাস্তায় আর সে ফুটপাতে ঘুমায়। অসুবিধা নাই। পুলিশ ততই তারে পিটায়। হঠাৎ বগোডুল ক্ষেপে যায়। পুরা গাড়িসহ পুলিশগুলারে ঝুপুত করে তিনআঙলা বানিয়ে সুতলি দিয়ে বাঁধে। একটু পরে আবারও পুলিশ আসে। সে ওদেরকেও তিনআঙলা বানায়। তারপর আসে মন্ত্রী। এসেই মাইকে দাঁড়িয়ে আগড়বাগড় লেকচার শুরু করে দেয়। কাউরে গালি দেয়। কাউরে তেল মারে। বগোডুলের ঘুম নষ্ট হয়। মেজাজ খারাপ হয়। সে মন্ত্রীর কাছে গিয়ে তার মাইকটাইকসহ ঝুপুত করে তাকে তিনআঙলা বানিয়ে ফেলে। তারপর পুলিশ আর মন্ত্রীকে নিয়ে বিক্রি করে দেয় কুত্তা বিলাইর দোকানে। মন্ত্রী সেখানেও চিঁউ চিঁউ করে বক্তৃতা করে। তাই দেখে দোকানিরা বলে- বাজান এখন থাইকা খালি মন্ত্রী আর পুলিশ দিবি। এতে দামও বেশি পাইবি আর দেশটাও থাকব শান্তিতে...

বগোডুল ভাবে জিনিসটা খারাপ না। তার দেশে পুলিশ আর মন্ত্রীর সংখ্যা সমানে সমান। কত কত মন্ত্রী। চলতি মন্ত্রী। বকেয়া মন্ত্রী। হবু মন্ত্রী...

বগোডুল এইবার বস্তা নিয়ে খালি মন্ত্রী পাড়ায় ঘোরে। মন্ত্রীপাড়ায় পুলিশ আর মন্ত্রী একসাথেই পাওয়া যায়। প্রথমেই গেটের পুলিশগুলারে সে ঝুপুত করে। তারপর ঘরে ঢুকে ঝুপুত করে মন্ত্রীকে। তারপর সাপ্লাই দেয় কুত্তা বিলাইর মার্কেটে। আর শহরের লোকজন বাড়ির টিভি বিক্রি করে সেই পয়সায় পুলিশসহ মন্ত্রী কিনে ড্রয়িং রুমে খাঁচায় ঝুলিয়ে রাখে। মন্ত্রীরা সেখানে বক্তৃতা করে চিঁউ চিঁউ চিঁউ...

দেশ থেকে সব চলতি আর বকেয়া মন্ত্রী সাফ করে দিয়ে বগোডুল গিয়ে দাঁড়ায় বড়োমন্ত্রীর সামনে। তার আশেপাশে তখন একপাল হবু হবু মন্ত্রী। সবগুলা কাউ কাউ করে তাকে ঘিরে। বগোডুল সবগুলারে একসাথে ঝুপুত করে কুত্তার দোকানে সাপ্লাই দিয়ে এসে বস্তায় ঢুকে একটা লম্বা ঘুম দেয়....
২০১০.০২.১৯ শুক্রবার]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29106561 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29106561 2010-02-27 13:18:07
আজ আমার দুটো বইয়ের মোড়ক উন্মোচন। চলে আসেন সবাই সন্ধ্যা সাতটা। বইমেলার নজরুল মঞ্চ

চলে আসেন সবাই

এগারোটি আধাবাস্তব গল্পের সংকলন বেবাট
আর এক্লাইন কিংবা ফেসবুকের স্ট্যাটাস সংকলন ট্যারাটক

দুটোরই প্রকাশক শুদ্ধস্বর
বইমেলার ২৪০ নম্বর স্টল

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29101508 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29101508 2010-02-20 11:30:35
বগডুলের কিচ্ছা। ০৩
লাত্থি খেয়ে বগডুল আবার পাশ ফিরে চুপচাপ ঘুমায়। কিন্তু একটু পরে পরপর আরো দুইটা গদাম। বগডুল ঘুম থেকে উঠে বস্তার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখে উলকুন্দা টাইপের একটা লোক আরেকটা লাথি মারার জন্য পা তুলছে। দেখেই এক লাফে বস্তা থেকে বের হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে মারেন ক্যান?

উলকুন্দা এবার খ্যাকখ্যাক করে উঠে- এইটা আমার জায়গা তুই ঘুমাস ক্যান?

লোকটার যেমন চেহারা তেমন গলা। বগডুল ভয় পেয়ে যায়। সে বস্তাটা পোঁটলা করে বগলে নিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলে- এইটাতো ফুটপাত। আপনার জায়গা কেমনে?

উলকুন্দা এবার খটাস করে একটা চটকনা মারে বগডুলের কানকায়- বলছি যখন আমার জায়গা তখন এইটা আমার জায়গা

চটকনা খেয়ে পড়ে গিয়ে বগডুল আবার উঠে দাঁড়ায়। পেছনে তাকিয়ে দৌড় দেবার জন্য জায়গা দেখে নিয়ে আবার সোজা হয়। তাকে সোজা হতে দেখে উলকুন্দা আরেকটা চটকনা মারার জন্য এগোতেই বগডুল ফচাৎ করে উলকুন্দার পাঁজরে একটা খোঁচা মেরে ঝেড়ে দৌড় লাগায়

দৌড়াতে দৌড়াতে বগডুল শুনতে পায় উলকুন্দার গলা। উলকুন্দা তার পেছনে দৌড়াচ্ছে আর চিল্লাচ্ছে- এইটা আমার জায়গা না। তুই থাক। তুই থাক

বলা যায় না। তাকে থামিয়ে আরো কয়েকটা গদাম দেবার জন্য হয়ত লোকটা চালাকি করছে। কিন্তু তারপরও বগডুল একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। উলকুন্দা কাছে এসে বলতে থাকে- ওইটা আমি মিথ্যে বলছিলাম। ওইটা আমার জায়গা না। তুই থাক। তুই ঘুমা। আমি যাই...

উলকুন্দা চলে যায়। বগডুল আবার ফিরে এসে বস্তায় ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমাতে ঘুমাতে তার ক্ষিদে পায়। উঁকি মেরে দেখে সন্ধ্যা হয় হয়। সে বস্তা থেকে বের হয়ে বস্তাটা পোঁটলা করে বগলে নিয়ে বাবু টাইপের একটা লোকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়- স্যার দুইটা টেকা দেন। একটা রুটি খামু

লোকটা দাঁড়িয়ে তার দোস্তের সাথে গল্প করছিল। সে বগডুলের কথা শোনে না। বগডুল আবার বলে- স্যার দুইটা টেকা দেন। একটা রুটি খামু

লোকটা এবার ধমক লাগায়- যা যা ভাগ
কিন্তু বগডুল ভাগে না। মিনমিন করে আবার বলে- স্যার দুইটা টেকা দেন...
লোকটা এবার বগডুলের দিকে তাকায়- মাপ কর বাবা। টাকা নাই। অন্যদিকে যা...

কথাটা শুনে বগডুলের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বেটা টেকা নাই সেটা আগে বললেই তো হয়। খামাখা ভাব নিলি কেন?

বগডুল পেছনে তাকিয়ে দৌড় লাগানোর রাস্তা দেখে ফচাৎ করে লোকটার ভুঁড়িতে একটা খোঁচা মেরে দৌড় লাগায়। কিন্তু দৌড়াতে দৌড়াতেই শোনে পেছন থেকে লোকটা ডাকছে- টাকা আছে। নিয়ে যা

বগডুল দাঁড়িয়ে ভাবে লোকটা টাকার লোভ দেখিয়ে মাইর দেবে তাকে। সে দাঁড়িয়ে থাকে। দেখে লোকটা এগিয়ে আসছে তার দিকে। পেছনে দৌড় লাগানোর জায়গা ভালো করে দেখে নিয়ে বগডুলও একটু এগিয়ে যায়। লোকটা সামনে এসে তাকে দুইটাকা দিয়ে বলে- আমি মিছা কতা কইছিলাম টেকা নাই। এই নে দুই টেকা...

বগডুল টাকা নিয়ে ফুটপাতের একটা হোটেলে গিয়ে একটা রুটি নেয়। বস্তাটা পাশে রেখে কাঠের বেঞ্চিতে বসে রুটি খেয়ে দোকানিকে দুই টাকা দিতেই সে খ্যাক খ্যাক করে উঠে- তিন টেকা লাগব। রুটির দাম তিন টেকা
- কাইলকে না খাইলাম দুই টেকায়?
- আইজকা রুটির দাম বাইড়া গেছে। এখন তিন টেকা

বগডুলের কাছে আর কোনো টাকা নাই। তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। সে দোকানিকে একটা ফচাৎ করে বসে। সাথে সাথে দোকানি রুটি গরম করার হাতা নিয়ে তেড়ে আসে তার দিকে- টেকা দিবো না আবার মারে? আইজকা খাইছি তরে...

এক দৌড় লাগায় বগডুল। কিন্তু অনেক দূরে গিয়ে টের পায় তার বস্তাটা ফেলে এসছে দোকানে। সে আবার আস্তে আস্তে দোকানের দিকে যায়। দূর থেকে দেখে দোকানি বসে বসে রুটি বানাচ্ছে আর তার বস্তাটা পড়ে আছে আগের জায়গায়। সে পা টিপে টিপে আরেকটু আগায়। দোকানি তাকে দেখে না। বগডুল পা টিপে টিপে বেঞ্চ থেকে বস্তাটা বগলে নিয়ে দৌড় লাগাতে গিয়ে দেখে খপাৎ করে দোকানি তাকে ধরে ফেলেছে- টেকা দিবি না। আবার মারবি আমারে। এইবার তরেই ভাইজা বিক্রি করমু আমি। আয়...

দোকানি ইন্দুরের বাচ্চার মতো বগডুলকে ধরে চুলার দিকে টেনে নিতে থাকে। বগডুল বস্তাটা এক হাতে বগলে চেপে দোকানির হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য অন্য হাতে তার পেটে একটা ফচাৎ করে। সঙ্গে সঙ্গে দোকানি তাকে ছেড়ে দেয়। বগডুল ভাবে এইবার বুঝি তাকে মাইর দেবে। কিন্তু না। দেখে দোকানি তাকে ছেড়ে দিয়ে বলে- যা। রুটির দাম দুই টেকাই। দাম বাড়ে নাই। বেশি লাভের লাইগা কইছিলাম তিন টেকা। যা

দোকান থেকে বের হয়ে বগডুল হাঁটে আর ভাবে। ভাবে আর হাঁটে। লোকগুলা একবার মিথ্যা বলে আবার সত্য বলে। কেম্নে কী? ফচাতের ভেতরে কী একটা আছে। কিন্তু সেটাও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। দোকানিকে একবার ফচাৎ করায় মারতে এলো। আরেকবার ফচাৎ করার ছেড়ে দিলো। ঘটনা কী?

বগডুল আরেকটা লোকের সামনে দাঁড়ায়- স্যার দুইটা টেকা দেন
- টেকা নাই। অন্য দিকে যা
বগডুল দৌড়ানোর রাস্তা দেখে বস্তাটা হাতে নিয়ে একটা ফচাৎ করে। সাথে সাথে লোকটা তাকে দাবড়ানি দেয়। অনেক দূরে গিয়ে বগডুল দেখে লোকটা তাকে আর ডাকছে না। গালাগালি দিচ্ছে। তার মানে ফচাতে কাজ হয়নি। বগডুল আরেক লোকের কাছে যায়। সেই লোকও বলে টেকা নাই। বগডুল বস্তাটা বগলে চেপে এই বেটাকেও ফচাৎ করে দৌড় দেয়। পেছনে তাকিয়ে দেখে লোকটা টাকা হাতে নিয়ে তাকে ডাকছে

বগডুল টাকা নিয়ে ভাবে আর হাটে। হাঁটে আর ভাবে। এক ফচাতে দাবড়ানি আরেক ফচাতে কামাই। কোনটা কী?

বগডুল ভাবে আর হাঁটে। হাঁটে আর ভাবে। কোনো কূল কিনারা পায় না। হঠাৎ তার খেয়াল হয় দাবড়ানি খাওয়া ফচাৎগুলোর সময় তার বগলে বস্তা ছিল না

সে এইবার একটা দোকানে গিয়ে একটা বড়ো রুটি দেখিয়ে দোকানিকে জিজ্ঞেস করে- ভাই এইটার কিনা দাম কত পড়ছে?
- কিনা দাম? কিনা দাম পড়ছে পঁচিশ টেকা
বগডুল বস্তা বগলে নিয়ে দোকানিকে একটা ফচাৎ করে। সঙ্গে সঙ্গে দোকানি কথা পাল্টে ফেলে- না ভাই। মিছা কইছিলাম। এইটার কিনা দাম পড়ছে আঠারো টেকা...

বগডুল বুঝে যায় বস্তাটা বগলে নিয়ে ফচাৎ করলে মানুষ সত্য কথা বলে। তারপর সে টাকা চাওয়ার সময় ফচাৎ করে। টাকা খরচের সময় ফচাৎ করে আর বস্তার ভেতরে গুটিসুটি মেরে ঘুমায়। কিন্তু একদিন মাইকের আওয়াজে তার ঘুম ভেঙে যায়। বস্তা থেকে উঁকি দিয়ে দেখে ফুটপাতের পাশের রাস্তা আটকে এক রাজাকার গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দিচেছ- দেশের স্বাধীনতার জন্য আমরাও যুদ্ধ করেছি। ভাষার জন্য লড়াই করেছি আমরাও...

বগডুল বক্তৃতার অতকিছু বোঝে না। তার মেজাজ খারাপ হয় মাইকের আওয়াজে। রাজাকারটার সামনে অনেক লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনছে আর হাত তালি দিচ্ছে। বগডুল বুঝে যায় এইখানে সে ঘুমাতে পারবে না। তার খুব মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ লোকটাকে তার একবার ফচাৎ করতে ইচ্ছা করে। সে বস্তা বগলে নিয়ে আস্তে করে মঞ্চের পেছন দিকে যায়। কেউ তাকে খেয়াল করে না। রাজাকারটা তখনও বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছে। বগডুল বস্তাটা বগলে চেপে এক লাফে স্টেজে উঠে পেছন থেকে রাজাকারটাকে একটা ফচাৎ করে দৌড় লাগায়। একটু দূরে গিয়ে দেখে রাজাকরটা থেমে গেছে। থেমে এদিক সেদিক তাকিয়ে আবার বক্তৃতা শুরু করেছে- ভাইসব। আমি অতক্ষণ যা বলেছি তা মিথ্যা। আসোলে আমি যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ধরে মিলিটারিদের হাতে দিতাম। স্বাধীনতা চাইনি আমরা। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছিলাম মুক্তিযুদ্ধ ঠেকানোর...

বগডুল দূরে দাঁড়িয়ে দেখে রাজাকারটা এইসব কথা বলছে আর হুড়মুড় করে পাবলিক গিয়ে উঠে যাচ্ছে মঞ্চের উপর। উঠেই যে যেভাবে পারে লাত্থি কিল জুতা কইন গদাম দিয়ে মঞ্চের সবগুলোকে রাস্তার উপরে এনে ফেলছে চিৎ করে। বগডুল খুব মজা পায়। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। কয়েক মিনিটের মধ্যে লোকজন রাজাকারগুলাকে রাস্তার মধ্যে চ্যাপ্টা করে ফেলে। আর মাইকও বন্ধ হয়ে যায়। আর বগডুল আবার তার বস্তার ভেতরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ে....
২০১০.০২.১২ শুক্রবার]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29101034 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29101034 2010-02-19 14:55:42
বগডুলের কিচ্ছা। ০২
তার কামটাও খুব কষ্টের। সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে অনেক উপরে তাকে মাথায় করে ছাদ ঢালাইয়ের সিমেন্ট বালু তুলতে হয়। সূর্য উঠা থেকে সূর্য ডোবা পর্যন্ত ইট বালু বয়ে তুলে দিলে ঠিকাদার তাকে খাবার দেয়

একদিন ভোরবেলা খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বগডুলের মোটেও ইচ্ছা করছিল না কামে যেতে। তবুও একবার সে জোর করে উঠে বসে বস্তার ভেতর। কিন্তু বস্তা থেকে উঁকি দিয়ে বাইরের বৃষ্টি দেখে আবার ধুপ করে শুয়ে পড়ে। কামের দেরি হয়ে যাচ্ছে। বগডুল আবার উঠে বসে। কিন্তু বস্তা থেকে উঁকি দিতেই আবার তার ঘুমাতে ইচ্ছা করে। সে ধুপ করে শুয়ে পড়ে আবার

এভাবে কয়েবার করে তার খেয়াল হয় কামে না গেলে ঠিকাদার তাকে খাবার দেবে না। সে নিজেকে জাগানোর জন্য নিজের চুল মুঠি করে ধরে একটা ঝাঁকি দেয়- উঠ ব্যাট উঠ। কামে যা কামে যা কামে যা

চুলে ধরে নিজেকে টেনে তুলতেই বগডুল দেখে বস্তার ভেতরে তার পেছন দিকে কী যেন একটা তাকে ধাক্কা দিচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে অবিকল তার মতো আরেকটা বগডুল বসে আছে বস্তার ভেতর। বগডুল ভয় পেয়ে যায়। সে এক লাফে বস্তা থেকে বের হয়ে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পরে দেখে বস্তা থেকে নকলা বগডুল আস্তে আস্তে বের হয়ে আসছে। বগডুল দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে নকলাকে। নকলা বের হয়ে এদিক সেদিক তাকায়। ঠিক সে যেমন করে বস্তা থেকে বের হয়ে। তারপর কারো সাথে কোনো কথা না বলে নকলা হাঁটতে থাকে যে দালানটার কাজ হচ্ছে সেদিকে। বগডুলও আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে নকলার পেছন পেছন। বগডুল দেখে দালানটার সামনে গিয়ে নকলা সিমেন্ট বালি নেবার গামলা নিয়ে বালি ভরতে থাকে। বগডুল দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। দেখে নকলা সারাদিন একটা কথা না বলেই কাজ করে। খাবারের সময় ঠিকাদারের কাছ থেকে খাবার নেয়। তারপর খাবারটা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বগডুলের দিকে এগিয়ে আসে। খাবারটা বাড়িয়ে দেয় বগডুলকে। বগডুলের পেটে তখন প্রচণ্ড ক্ষিদে। সে গপাগপ সবগুলো খাবার খেয়ে নেয়। খাবার শেষ করে তাকাতেই দেখে আশেপাশে নকলা নেই। সে নকলাকে খুঁজতে খুঁজতে দালানের সামনে যেতেই ঠিকাদারের সামনে পড়ে যায়। তাকে দেখে ঠিকাদার বলে উঠে- আজকে তোর কামে খুব খুশি আমি। যা বাড়ি যা। কাল সকাল সকাল আসবি

বগডুল বুঝে যায় নকলাকে ঠিকাদারও চিনতে পারেনি। কিন্তু সে গেলো কই?
ভাবতে ভাবতে আর নকলাকে খুঁজতে খুঁজতে বগডুল আবার এসে বস্তায় ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু পরের দিন সকালে উঠে তার খুব দুঃখ হয়। কেন যে নকলাকে যেতে দিলো। নকলা থাকলে তো আজকেও তাকে কামে যেতে হতো না। মনের দুঃখে সে নিজের চুল মুঠি করে একটা টান দেয়। সাথে সাথে দেখে পেছন দিক থেকে তাকে কেউ ধাক্কা দিচেছ। বগডুল ফিরে দেখে নকলা। সে আজ চুপচাপ বসে থাকে। দেখে নকলা আস্তে আস্তে বস্তা থেকে বের হয়ে কামে যাচেচ্ছ। বগডুল কতক্ষণ হা হয়ে বসে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। হঠাৎ পেটের ক্ষিদায় তার ঘুম ভাঙে। তার খেয়াল হয় এখন ঠিকাদারের খাবার দেবার সময়। সে দৌড়ে বস্তা থেকে বের হতে গিয়ে দেখে দেখে বস্তার সামনে খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নকলা। সে নকলার হাত থেকে খাবার নিয়ে গপাগপ খেয়ে ফেলে। তারপর মুখ তুলতেই দেখে নকলা নেই

মনের দুঃখে বগডুলের আবারও চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা হয়। চুল ধরে টান দিতেই দেখে পেছনেই নকলা দাঁড়িয়ে আছে। বগডুল এবার এমনি এমনি নিজের চুলে একটা টান দেয়। সাথে সাথেই নকলা নাই হয়ে যায়। আবারও নকলাকে নাই করে দেবার দুঃখে বগডুল চুলে টান দেয়। দেখে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে নকলা। সে এবার মজা পেয়ে যায়। একবার চুলে টান দেয়- নকলা আসে। আরেকবার টান দেয়- নকলা নাই

খুশিতে বস্তায় ঢুকে এক ঘুম দিয়ে সকালে শুয়ে শুয়ে নিজের চুলে একটা টান দেয় বগডুল। সাথে সাথে নকলা বস্তা থেকে বের হয়ে কামে চলে যায়। বগডুল আবার ঘুমিয়ে পড়ে

তারপর একদিন বগডুল গিয়ে অন্য ঠিকাদারের সাথে নগদ টাকার চুক্তি করে। পরের দিন নকলা গিয়ে সেই ঠিকাদারের কাজ করে বগডুলকে টাকা এনে দেয়। তারপর আরেকদিন গিয়ে বগডুল আরেক ঠিকাদারের সাথে নাইট ডিউটির চুক্তি করে। এখন নকলা সকালে এক ঠিকাদারের আর রাতে আরেক ঠিকাদারের কাম করে। আর বগডুল বস্তার ভেতরে শুয়ে খালি ঘুমায় আর ঘুমায়
২০১০.০২.০৭ রোববার]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29095793 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29095793 2010-02-12 02:15:52
বগডুলের কিচ্ছা। ০১
একদনি বগডুল রাস্তায় একটা পাঁচ টাকার কয়েন কুড়িয়ে পেল। এর আগে সে কোনোদিন টাকা দেখেনি। তাই সে বুঝতে পারছিল না জিনিসটা কী? চকচকে কয়েনটা তার খুব পছন্দ হয়ে গেলো। তার খুব জানতে ইচ্ছে করল জিনিসটা কী? কিন্তু কাউকে দেখালে যদি কেড়ে নিয়ে যায় এই ভয়ে কাউকে সে জিজ্ঞেসও করে না। বস্তার ভেতরে ঢুকে লুকিয়ে লুকিয়ে কয়েনটা দেখে আর মনে মনে ভাবে জিনিসটা কী? কেমনে বানাইল এত সুন্দর জিনিস

বগডুল একদিন একটা বুদ্ধি বের করল। সকাল বেলা ইস্কুলের সামনে ভালো করে দেখল কোন পিচ্চির গায়ের জোর তার থেকে কম হবে। কোন পিচ্চি তার কাছ থেকে জোর করে জিনিসটা কেড়ে নিতে পারবে না। তারপর একেবারে রোগাসোগা হালকা পাতলা এক পিচ্চির সামনে কয়েনটা মুঠোর ভেতরে ধরে জিজ্ঞেস করল- বলোতো আমার হাতে কী?
পিচ্চি বলল- চকলেট
বগডুল বলল- হয়নি। আবার বলো
পিচ্চি বলল- মার্বেল। বগডুল বলল আবার বলো। এভাবে পিচ্চি একশোটা জিনিসের নাম বলল। কিন্তু প্রতিবারই বডডুল বলে- হয়নি। আবার বলো। শেষে রেগে মেগে পিচ্চি বলল- ঘোড়ার ডিম। তোমার হাতে কিছুই নেই...
বগডুল বলল- আছে। কিন্তু তুমি বলতে পারো না...
পিচ্চি বলল- দেখি তো কী আছে তোমার হাতে?

বগডুল ভাবলো এইবার পিচ্চিকে জিনিসটা দেখানো যায়। তা হলে জিনিসটার নাম জানা যাবে। এই ভেবে বগডুল একটু দূরে গিয়ে হাত খুলে পিচ্চিকে দেখালো। পিচ্চি ঠোঁট উল্টে ভেংচি দিয়ে বলল- আগেই তো বলেছি তোমার হাতে টাকা

জিনিসটার নাম জেনে বগডুল এক দৌড়ে গিয়ে তার বস্তার ভেতরে ঢুকে গেলো। সে শুনেছে টাকা থাকলে অনেক খাবারদাবার এমনকি ঘরবাড়িও পাওয়া যায়। বগডুল মনে মনে ভাবলো সবার আগে তার একটা বাড়ি দরকার। সে বস্তা থেকে বের হয়ে বিশাল এক বাড়ির সামনে গিয়ে আওয়াজ দিলো- টাকা দেবো। বাড়ি দেবে?

তার চিল্লাচিল্লি শুনে বাড়িওয়ালা বের হয়ে এসে জিজ্ঞেস করল- দেখি। কয়টাকা আছে তোর
বগডুল হাতের মুঠো বের করে কয়েনটা দেখালো- এই যে টাকা। এইটা নাও আর বাড়িটা দাও
তার কথা শুনে বাড়িওয়ালা ঠাঠা করে হেসে উঠলো- হা হা হা। পাঁচ টাকায় বাড়ি কিনবে? যা ব্যাটা ভাগ...

তাড়িয়ে দিলেও বগডুল নতুন দুটো জিনিস টাকা ছাড়াই জেনে গেলো। তা হলো- তার হাতের টাকাটা পাঁচ টাকা। আর পাঁচ টাকায় বাড়ি পাওয়া যায় না

সে এবইবার একটা হোটেলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আওয়াজ দিলো- পাঁচ টাকা দেবো। খাবার দাও
তার কথা শুনে হোটেলওয়ালা দিলো এক দাবড়ানি- যা ব্যাটা ওই ফুটপাতে যা। পাঁচ টাকায় হোটেলে কিছু নাই

বগডুল দাবড়ানি খেয়ে আরেকটা জিনিস জেনে গেলো। পাঁচ টাকায় ফুটপাতে খাবার পাওয়া যায়

সে এবার ফুটপাতের একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আওয়াজ দিলো- টাকা নাও। খাবার দাও

ফুটপাতি দোকানদার পাঁচ টাকার কয়েনটা নিয়ে একটা বনরুটি দিলো। আর পাতলা একটা এক টাকার কয়েন ফিরত দিলো

বগডুল এক টাকার কয়েন আর বনরুটি নিয়ে এসে ঢুকে গেলো আবার ব্স্তার ভেতরে। বস্তায় ঢুকে এক টাকার কয়েনটা পাশে রেখে বনরুটিটা খেয়ে হাত থেকে বনরুটির গুঁড়া ঝাড়ার জন্য দুইহাতে বাড়ি দিলো- খটাস খাটাস
ওমা। খটাস খটাস করতেই দেখে তার দোকানির দেয়া ছোট কয়েনটার কাছে তার আগের পাঁচ টাকার কয়েনটাও পড়ে আছে

বগডুল এবার দুটো কয়েন নেড়েচেড়ে দেখে। সত্যি সত্যি নতুন কয়েনটার সাথে তার পুরোনো কয়েনটাও তার হাতে। অনেক্ষণ কয়েন দুটো নাড়াচাড়া করতে করতে বগডুলের ক্ষিদে পেয়ে যায়। সে আবার কয়েনদুটো নিয়ে ফুটপাতের দোকানে যায়। দোকানি কয়েন দুটো নিয়ে তাকে একটা বনরুটি দেয় আর একটা কাগজের দুইটাকার নোট ফেরত দেয়। বগডুল আবার বস্তায় ঢুকে বনরুটি খেয়ে যেই না দুই হাতে খটাস খটাস করেছে। সাথে সাথে দেখে দুই টাকার নোটের পাশে তার আগের কয়েন দুটোও পড়ে আছে...

এইবার বগডুল বুঝে যায় টাকা দিয়ে ফিরে এসে হাতে খটাস খটাস করলে টাকা আবার ফেরত চলে আসে। সে আবার দোকানে যায়। আবার জিনিস কিনে আর ফিরে এসে বস্তায় ঢুকে দুইহাতে খটাস করে। তারপর সে সেই হোটেলে গিয়ে খায় আর ফিরে এসে খটাস করার সাথে সাথেই তার টাকা তার বস্তায় ফিরে আসে। তারপর বিভিন্ন জিনিস কিনে আর খটাস করে। খটাস করতে করতে সে শিখে যায় যে পুরো টাকার জিনিস একসাথে কিনলে লস বেশি। পাঁচশো টাকার নোট দিয়ে কিনতে হয় একশো টাকার জিনিস। তাহলে দোকানি ফেরত দেয় চারশো টাকা আর খটাস করলে নিজের পাঁচশো ফিরে এসে হয়ে যায় নয়শো টাকা। এইভাবে কয়েকদিনের মধ্যে বগডুলের অনেক টাকা হয়ে যায়। টাকা দিয়ে সে বাড়ি কেনে। গাড়ি কেনে। আরামে খায় দায় ঘুমায় আর বস্তার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে খটাস করে আরো আরো টাকা কামায়...
২০১০.০২.০৩ বুধবার]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29093681 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29093681 2010-02-08 22:22:52
ট্যারাটক এক সময় দৌড়ের উপরে মাথায় কোনো আউলা চিন্তা এলেই কাগজে টুকে রাখতাম পরে গুছিয়ে কিছু লিখব বলে। তারপর শুরু করলাম কম্পুতে নোট নেয়া। তারপর গত দুই বছর ধরে সেই নোটগুলো ফেসবুকের স্ট্যাটাসে লেখা শুরু করলাম। তারপর তাকিয়ে দেখি কাগজে- কম্পুতে- নেটে হাজারে হাজারে নোট কিন্তু কিছুই আর গোছানো হয়নি। লেখাও হয়নি কিছুই। হওয়ারও সম্ভাবনা নেই

এবং তারপর হঠাৎ খেয়াল করলাম- এক লাইনেই যদি যা বলার তা বলে দেয়া যায় তবে হাজার লাইন লেখার দরকারটাই কী?

কোনো দরকার নেই
তারচে সহজ বুদ্ধি হলো এক লাইনগুলোকে গুছিয়ে বই করে ফেলা
দৌড়ের উপরে লেখা দৌড়ের উপর পড়ে ফেলে দৌড়াতে দৌড়াতেই ভাবতে পারবে লোকজন কী হইল আর কী হয় নাই

তাই করে ফেললাম
এক্লাইন এক্লাইন লেখা দিয়ে এক্টা বই করে ফেললাম। ট্যারাটক

...........
ট্যারাটক
৪৪টা এক্লাইন বাক্য সংকলন
প্রকাশক শুদ্ধস্বর। বইমেলার ২৪০ নম্বর স্টল ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29090960 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29090960 2010-02-04 00:30:42
বেবাট

মাঝ রাত্তিরে কিছু লোক ঘুমের মধ্যে হাঁটে। দরজা-মরজা খুলে বাইরে চলে যায়। গোয়াল থেকে গরু খুলে রওয়ানা দেয় মাঠে অথবা পুকুরে পানিতে ডুবে মরে কিংবা গাছে উঠে পিপড়ার কামড়ে হুশ ফিরে পেলে চিক্কুর দেয়- মাইওগো... মুই কনে?...

নাগরিক শহরে এরা নাইটগার্ডের ধাক্কায় জেগে উঠে ভদ্রতা বজায় রেখে একটা চাপা গোঙানি দেয়-ঞ্যাঁ...?

তারপর কেউ হার্টমার্ট এ্যাটাক করে না হয় গার্ডদের কাছে মাতাল বনে গিয়ে বাসায় ফিরে ঝিমায়...

গত তিনমাস ধরে আমি যারে পাই তারে জিগাই এই লোকগুলারে আপনার অঞ্চলে কী বলে?

অতি বুদ্ধিমানরা সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে উঠে- খাড়ান খাড়ান এইটার একটা নাম আছে। ... কিন্তু সেই নাম কেউ আর মনে করতে পারে না...

মাঝারি বুদ্ধিমানরা বলে উল্টাপাল্টা নাম। কম বুদ্ধির লোকজন বলে ইংলিশ নাম আর বুদ্ধিমানরা সরাসরি বলে- জানি না...

এই রোগে বাঙালি ডাক্তার দেখায় না। টুটকা ফুটকা কবিরাজ পির ফকির তান্ত্রিক ধরে পানিপড়া জড়িপড়া তাবিজ কবজের জন্য

আমি গিয়ে ধরি এক টুটকাবাজকে। এদেরকে কী বলে
সে সোজা উত্তর দেয়- জ্বিনে মুমিনে ধরা
আমি জিজ্ঞেস করি বাংলায় কী বলে?
সে সোজা উত্তর দেয় জ্বিন আর মুমিনের কোনোদিন বাংলা নাম হয় না

এইবার গিয়ে ধরি একট অমুমিন টুটকাবাজকে। সে কী একটা সংস্কৃত শুনিয়ে আমাকে বলে এইটা একটা শনি
- এর বাংলা নাম কী?
- এইগুলার তো দাদা বাংলা হয় না

আমি মনে মনে খুব খুশি হই। শনি শয়তান জ্বিনের আসর থেকে বাংলাভাষা পুরাপুরি মুক্ত। কিন্তু তারপরেও এইসব আরবি-সংস্কৃত বাতাসের কবলে বহু বাঙালি আক্রান্ত...

ঘুমের মধ্যে হাঁটে। ঘুমের ঘোরে কথা বলে। ঘুমের মধ্যে ঘটিয়ে ফেলে বহুকিছু। তারপর জেগে উঠলে আর কিছুই মনে করতে পারে না কেম্নে কী ঘটলো...

এদের একটা নাম দরকার আমার। কারণ আমার ২০১০এর গল্পের বইটা পুরাটা এদেরকে নিয়ে কিংবা এদের ঘটনা নিয়ে কিংবা এই রোগে ধরা খেয়ে আমার লেখা। সুতরাং এদের নামটাই হবে আমার বইয়ের নাম...

লেখাগুলার আগামাথা ঠিক নাই। ঘোরের মধ্যে কম্পুর বোতাম টিপে টিপে গিয়ে যা দাঁড়ায় তাই। ভদ্র ভাষায় বললে খাপছাড়া। কিন্তু শব্দটা আমার আগেই দখল করে বসেছেন সুকুমার

একবার নিজে নিজে আওয়াজ দিলাম- শব্দটা কি সুকুমারের বাপের জমিদারি নাকি যে আমি ব্যবহার করতে পারব না?

- না মোটেও না। উপেন কিশোরের জামিদারির তালিকায় শব্দটা নেই। সুতরাং এইটাই আমার বইয়ের নাম...

ফাইনাল। ফাইনাল। ফাইনাল
মুস্তাফিজ ভাই প্রচ্ছদ করে ফেলেছেন এই নামে। আমি ফাইনাল এডিট শেষ করে ফেলেছি এই নামে। বইমেলার ব্রোশিয়ার ছাপা হয়ে গেছে এই নামে। কিন্তু ট্রেসিং বের করতে গিয়ে দেখি পুরা কম্পু জুড়ে গোল গোল চশমার ফাঁক দিয়ে সুকুমারের চোখ ভাসে। ঘুমের মধ্যে তেড়ে আসে সুকুমারি চিড়িয়াখানার সবগুলা বকচ্ছপ আর রাম গরুঢ়ের ছানাপোনা...

আমি ট্রেসিং বের করি না। বই ছাপা বন্ধ করে দেই। আবার এরে তারে জিগাই- ও বাঙ্গাল ভাই। ঘুমের মধ্যে যারা হাঁটে তাদের বাংলায় কী কয়?

বাঙালরা আবারও ইংরেজি কপচায় অথবা ভাব ধরে মনে করতে পারে না। আমিও খুঁজি কিছু ভদ্র লোকের শব্দ। তারপরে নিজেই নিজেরে খাঁটি সিলেটিতে গালি দেই- শালা বেবাট। আস্ত একটা বেবাট না হলে পুরা বই লিখে নামের জন্য ছাপা আটকায় কারো?

ধুম করে নিজের গালিটা নিজের কানে লাগে। বেবাট। যার কোনো বাট নাই সে বেবাট। যারে কোনোভাবেই বাটে ফেলা যায় না সেও বেবাট

আমার বইটাও তাই
আস্ত একখান বেবাট রচনা
আধা ঘুম আধা স্বপ্ন আধা জাগারণ আধা বাস্তব...

ফাইনাল...
এবারের গল্প বইটা বেবাট...
১১টা আধাবাস্তব ছোটগল্পের সংকলন
প্রকাশক শুদ্ধস্বর। বইমেলার ২৪০ নম্বর স্টল]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29090378 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29090378 2010-02-03 00:40:57
বেঢপ
পুরো পূব পাড়াতে আমাদের জাতের একটাই ঘর। বাপদাদারও দাদার আমল থেকেই এই এক ঘরই। অন্য পাড়াগুলোতে একসাথে আমাদের অনেক জাতি পরিবার থাকলেও আমরা এখানেই থেকে গেছি। অন্য পাড়ার জাতিরা অনেকবার আমাকেও বলেছে- একা একা থাকার অনেক সমস্যা। চলে আয় এখানে। কিন্তু আমি যাবার কোনো কারণ দেখিনি। বাবারও এক কথা। এটাইতো আমাদের আদিবাস। এটা ছাড়ার দরকার কী? আর মানুষগুলা তো আত্মীয়ের থেকেও বড়ো আত্মীয়। চোখের সামনেই মানুষগুলা জন্মা নিচ্ছে বড়ো হচ্ছে আবার বুড়ো হচ্ছে। খালি জায়গাগুলোতে বাড়ি উঠছে। সামনে যেতে যেতে কার বাড়ি দেখার জন্য দাঁড়ালে হয়ত বাড়ির মালিক বের হয়ে আসছে- মামা নতুন বাড়ি করে আমি এখানে উঠে এলাম। পুরান বাড়িতে আর সবার জায়গা হচ্ছে না...

দেখা গেলো এটা অমুক বাড়ির মেজো কিংবা বড়ো ছেলে। কেউ পাড়া সম্পর্কে ভাগ্নে কেউ ভাতিজা কেউ ভাই। কাউকে ডাকি নাম ধরে। কাউকে মাসী। কাউকে দাদু...

একদিন সকালে শুনলাম কোন পাড়ায় নাকি আমাদের জাতের সাথে মানুষদের মারামারি লেগেছে। এটা অবশ্য হয়। কোথাও কোথাও আমাদের জাতের পাড়াতে দুয়েক ঘর মানুষ থাকে। আবার কোথাও কোথাও মানুষদের পাড়াতে দুয়েক ঘর আমাদের জাতি থাকে। মারামরি হতেই পারে; হলে পত্রিকা পড়ে হয়ত কেউ আমাকে জানায়- তোর বাবাকে গিয়ে বলিস- ওমুক পাড়ায় তোদের চারটা জাতিভাই মারা গেছে মানুষের হাতে। তোদের কোনো আত্মীয় কুটুম হয় কি না খোঁজ নিতে বলিস। তোর বাবার নানার বাড়িতো ওদিকটাতেই...

আবার কোনোদিন হয়ত শুনলাম কোনো পাড়ায় আমাদের জাতির কামড়ে অনেক মানুষ জখম হয়েছে। তখনও কেউ হয়ত খরবটা দেয়। হয়ত আমাদের জাতকে গালাগালিও করে। কিন্তু সেজন্য আমাদের কেউ কোনাদিন কোনোকিছু করেনি। করবেই বা কেন? আমাদের তো আর কারো সাথে কোনো গ্যাঞ্জাম নেই...

কিন্তু গত এক বছর ধরেই শুনছিলাম পশ্চিম পাড়ায় জাতিরা মানুষদের কামাড়াচ্ছে খুব। পশ্চিম পাড়ায় আমাদের জাতি বেশি। আগে অবশ্য ছিল না। যে সকল জায়গায় জাতির সমস্যা হচ্ছিল তারা সবাই গিয়ে পশ্চিম পাড়ায় আস্তে আস্তে জড়ো হওয়ায় এখন পশ্চিম পাড়াতে মানুষদের থেকে আমাদের জাতির সংখ্যা অনেক বেশি। আবার পশ্চিম পাড়া থেকেও অনেক মানুষ চলে এসেছে পুব পাড়ায় মানুষদের সাথে থাকবে বলে

অন্য পাড়া কিংবা পশ্চিম পাড়াতে গন্ডগোল হলেও আমাদের পাড়া যেমন চলছিল তেমনই চলছে। হঠাৎ একদিন এক চ্যাঙড়া ছেলে আমাকে লেজে ধরে রাস্তা থেকে মাঠে ছুঁড়ে মারল জাহান্নামে যা বলে। আমি তাকে আর কিছু না বলে তার বাবাকে গিয়ে বললাম। তার বাবাকে আমি মামা ডাকি। মামা শুনে আমাকে একটা মাছ খাইয়ে বললেন কিছু মনে না করতে। ছেলেটার একটু মাথা গরম...

এরকম দুয়েকটা ঘটনা অবশ্য গত এক বছর ধরে ঘটছে। আমি রাস্তায় বের হলে অনেকে দেখি গলায় জোর এনে আমাদের জাতিকে গালাগলি করে। করুক। আমার কী? আমি তো আর কাউকে কামড়াইনি

কথাটা বাবাকে বলায় বাবা বললনে এগুলোতে কান না দিতে। কারণ পশ্চিম পাড়ায় যেহেতু মানুষেরা আমাদের জাতির কামড়ে আক্রান্ত হচ্ছে সেই কারণে এ পাড়াতেও আমাদের উপর মানুষের রাগ থাকতে পারে। এটা কিছু না। কেটে যাবে। আর এ পাড়ায় আমাদের কে না চেনে। এ পাড়ায় সবার বসবাসের যত বয়স আমাদের বসবাসের বয়স তার থেকে কোনো অংশে কম নাকি যে আমাদরে কেউ চিনবে না?

কিন্তু কয়েকদিন ধরে বুঝতে পারছিলাম কোথায় যেন অনেক কিছুই বদলে গেছে। রাস্তায় বের হলে সবাই একটু এড়িয়ে চলে। অনেকে গালাগালি করে। আবার মাঝে মাঝে চ্যাঙড়ারা লাথি টাথিও দেয়। পরে অবশ্য সরি বলে। বাবা বলল একটু মানিয়ে চলতে হবে কয়দিন। অন্য পাড়ায় থেমে গেলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু প্রতি দিনই অন্য পাড়ার গন্ডগোলের নতুন খবর শুনি। এখন সাধারণত কারো বাড়ির কাছাকাছি যাই না। কারণ একদিন এক বাড়ির গোলাঘরে ইদুর ধরতে গেলে বাড়ির দাদু আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। বললেন আর যেন আমাকে তার বাড়ির আশেপাশে না দেখেন। অথচ এই বাড়িতে কিছুদিন আগেও ডেকে নিয়ে আমাকে মাছ দেয়া হয়েছে। তারপর থেকে আমি কারো বাড়িতে যাই না। ড্রেনে থেকেই ব্যাঙটাং ধরে খাই

আজ সকালে বের হতেই সুমন কাকা আমাকে ডাক দিলেন। সুমন কাকা একটু মাতাল টাইপের। সারাদিন দোকানের সামনে বসে বসে ঝিমায়। কেউ পাত্তাটাত্তা দেয় না। কিন্তু তার ডাকটা আমার পছন্দ হলো না

এমন না যে সুমন কাকা আমার নাম জানেন না। তিনি আমাকে নাম ধরেও ডাকতে পারতেন। কিন্তু জাতি ধরে ডাক দেয়ায় আমি তার ডাক না শোনার ভান করে গড়াতে গড়াতে ড্রেনের দিকেই যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি দৌড়ে এসে আমাকে একটা লাথি ঝেড়ে চিৎকার করতে থাকলো- বেয়াদবের বাচ্চা বেয়াদব। ডাকলে কানে যায় না?
- কিন্তু কাকা তুমি আমাকে মারছ কেন?

আমিও এবার দাঁড়িয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে দেখি সুমন কাকা চিৎকার শুরু করল আশেপাশে তাকিয়ে- কে কোথায় আছো তাড়াতাড়ি আসো। ইয়ের বাচ্চা আমার দিকে ফনা তুলছে
- আমি ফনা তুললাম কই? আমি জিজ্ঞেস করলাম...

ধাম করে আরেকটা লাথি পড়লো একপাশ থেকে। আমি যতই বোঝানোর চেষ্টা করি ততই দেখি লাথি লাঠি জুতা পড়ছে আমার উপর। সঙ্গে গালাগালি

এর মধ্যে শুনলাম সুমন কাকার গলা- তাড়াতাড়ি বাইরে আসো সবাই- রায়ট লেগেছে। রায়ট....

লাঠি ঢোল সড়কি বল্লম। মুহূর্তের মধ্যে সবগুলো এসে জড়ো হয়ে গেলো আমার পাশে। পাড়ায় যে অত অস্ত্র আছে আমার ধারণাতেই ছিল না। আমি সাবইকে চিনি। সবার কাছে গিয়ে আমি যত বোঝাতে চেষ্টা করি ততই লাথি গুঁতা কিল এসে পড়ে আমার উপরে

এমন সময় সুমন কাকার গলা শুনলাম আবার- এটা একটা যুদ্ধ। আমাদের পাড়ায় থেকে আমাদের দিকে ফনা তোলে... যুদ্ধ....
- ও কাকা। কিসের যুদ্ধ? আমার একার সাথে তোমরা অতগুলা মানুষ কী যুদ্ধ করবে? আমার কথা শোনো
- কথা শোনার কিছু নেই। পশ্চিম পাড়ায় মানুষদের কামড়ানোর বদলা নেবার যুদ্ধ এটা

ঘ্যাঁচ করে একটা বল্লম কোমরের দিকে আমাকে মাটির সাথে গেঁথে ফেলল। সুমন কাকা সাবধান করে দিলো যাতে এখনই আমাকে কেউ মেরে না ফেলে। যুদ্ধের উৎসব করতে হবে। সবাইকে সাজগোজ করতে হবে

চারপাশে ঢোল বাজতে থাকলো। সুমন কাকা ঘরে গিয়ে মাথায় পালকের একটা মুকুট পরে এলো। সাথে একটা মরচে পড়া তলোয়ার। এগুলা তার বাড়িতে দেখেছি আমি। তার কোন পূর্ব পুরুষ নাকি রাজা ছিল। সে এটা ব্যবহার করতো

সুমন কাকা আমার সামনে এসে তলোয়ার নিয়ে নাচতে শুরু করলো ঢোলের তালে তালে- যুদ্ধ যুদ্ধ যুদ্ধ... আ-বা বা বা বা...। মুখের উপর হাত বাড়ি দিয়ে শব্দ করে নাচতে থাকলো সুমন কাকা

বর্শা বিদ্ধ মাজা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু আমার কথা কেউ শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। আমি সমানে চিৎকার করে যাচ্ছি- ও কাকা। ও মামা। ও দাদু। আমাকে তোমরা মারছো কেন?

এর মধ্যে তারা একটা নিয়ম তৈরি করল। কেউ আমাকে লাঠি দিয়ে এখন শরীরে আঘাত করবে না। লাঠিগুলা আড়াআড়ি করে আমার শরীরের উপর দিয়ে অন্যপাশের মাটিতে মারবে। তাতে মারের শখও মিটবে আবার আমিও সহজে মরবো না...

আমাকে বর্শা দিয়ে গেঁথে শুরু হলো ঢোলের তালে তালে মাইরের উৎসব। নেচে নেচে সবাই লাঠি তলোয়ার চালাচ্ছে আমার উপর দিয়ে চারপাশের মাটিতে। কেউ কেউ লাঠি দিয়ে আমার মাথাটা একটু উঁচু করে চিৎকার করে উঠছে- এই ফনা তুলেছে। ফনা। ছোবল মারতে চায়। মারো মারো মারো...

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলল এই উৎসব। পাড়ার এমন কেউ নেই যে এখানে আসেনি। এমন কেউ নেই যাকে আমি চিনি না। কিন্তু সবাই চুপ। কেউ এসে লাঠি ধরছে। কেউ পাথর। আর কেউ এসে চুপচাপ ফিরে চলে যাচেছ। কিন্তু কেউই আমার চোখের দিকে তাকাচ্ছে না। তাকালেই সম্পর্ক বের হয়ে যাবে...

সুমন কাকা হঠাৎ পরনের জামা খুলে মাথায় বেঁধে ফেলল। প্যান্টের পা গুটিয়ে রান দুইটা বের করে চাপড় মারতে মারতে আবারও মুখে আ আ আ চিৎকার করে উঠলো। সাথে সাথে সবাই আ আ আ...
- কাপড় খোলো। কাপড় খোলো। কাপাড় খোলো সাবই। পোশাক পরে যুদ্ধ হয় না। মদ নিয়ে আসো। মাতাল না হলে যুদ্ধ হয় না। নিয়ে আসো মদ

সঙ্গে সঙ্গে সবাই আ আ আ শব্দ করতে করেত অর্ধ উলঙ্গ হয়ে গেলো মুহূর্তে। একদল ছুটে গিয়ে নিয়ে এলো বালতি বালতি মদ। ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল আ আ আ... যুদ্ধ যুদ্ধ যুদ্ধ...

মদে গোসল করে টলতে টলতে সুমন কাকা আমার সামনে হাঁটু গেড়ে তলোয়ার দিয়ে একটা খোঁচা মারলো- তুই একটু রাগ টাগ না দেখালে আমাদের যে রাগ উঠছে না রে বাপ। একটু ফোঁস-ফাস কর
- আমি কোনোদিনও ফোঁসফাস করি না কাকা। তুমি ভালো করেই জানো
- আরে বেটা এখন তো যুদ্ধের সময়। ধরে নে তুইও আমাদের সাথে যুদ্ধ করছিস। একটু ফোঁস কর। তুই না হারলে যে আমরা বিজয় মিছিল করতে পারবো না। আমাদের আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে
- কাকা আমাকে না মেরেও তোমরা বিজয় মিছিল করতে পারো। তোমরা তো এমনিতেই জিতবে
- দূর বেটা তোকে না মেরে বিজয় মিছিল করলে কি আর সেই জোশ আসবে? যুদ্ধ জয়ের জন্য অন্তত একটা না একটা লাশতো লাগাবেই। তোকে মরতেই হবে...

সুমন কাকা তলোয়ার দিয়ে আমার মুখের উপর আরেকটা খোঁচা দিয়ে উঠে দাঁড়ালো আ আ আ...। এবার হত্যা করা হবে। শত্রু হত্যা। জন্মের মতো হত্যা... আ আ আ... এবার বোঝানো হবে মানুষের দিকে ছোবল তোলার ফল। আ আ আ...
- ও কাকা আমি ছোবল তুলিনি
- তুই না তুললে তোর জাত তুলেছে
- আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও কাকা
- ছাড়া ছাড়ি নেই। প্রতিশোধ হবে। ফনা তোলার প্রতিশোধ। বিষ ঢালার প্রতিশোধ
- আমার বিষ নাইরে ভাই। আমি কাউকে কামড়াই না। আমাকে ছেড়ে দাও
- আ আ আ...

আবার চিৎকার করে উঠলো সবাই। সুমন কাকা আমার সামনে এলো- দেখি চান্দু তোমার বিষদাঁতটা একটু বের করো তো
- আমার কোনা বিষদাঁত নাই কাকা
- নাই মানে কী? থাকতেই হবে। দেখি তো...

সুমন কাকা তার মরচে ধরা তলোয়ারটা আমার মুখের মধ্যে ঢুকিযে দিলো- বিষদাঁত। বিষদাঁত কীভাবে ভাঙতে হয় এইবার দেখো...

দাঁত নয়। সুমন কাকার তলোয়ারে মোচড়ে টুকরো হয়ে বের হয়ে এলো আমার জিব। এর মধ্যে একজন চিৎকার করে উঠলো- দেখো দেখো। বিষদাঁত ভাঙা হয়েছে কিন্তু লেজ দিয়ে বাড়ি মারতে চায়। মারো...

কেউ একজন কুড়ালের এক কোপে আমার লেজটা আলগা করে নিলো শরীর থেকে। জিব ছাড়া আমি মাথা তুলে সুমন কাকার দিকে তাকালাম- কাকা...

খপাস করে তলোয়ারের উল্টো পিঠ দিয়ে আমার মাথার মধ্যে বাড়ি মারলো সুমন কাকা- কত্ত বড়ো সাহস। এখনও ছোবল মারতে চায়...

মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছি আমি। লেজ নাই। জিব নাই। মাজা পর্যন্ত বর্শা দিয়ে মাটির সাথে গাঁথা। চারপাশে হাজারো মানুষ। চিৎকার...। গড়াগাড়ি দিতে দিতে নিজের একটা দোষ খোঁজার চেষ্টা করলাম। অন্তত একটা দোষ খুঁজে পেলে এই মাইরগুলোকে নিজের কাছে যুক্তিসংগত করতে পারবো আমি। আমি নিজের একট দোষ খুঁজে পেলাম। বোকামির দোষ। বোকার মতো একা একা মানুষদের মাঝে থাকার সাহস করা একটা দোষ। মারাত্মক দোষ। চারপাশে সুমন কাকারা চিৎকার করে অস্ত্রে শব্দ করে নাচছে। তাদের সাথে গলা মিলিয়ে জিব ছাড়া মুখে নিজেও চিৎকার করে নিজেকে দোষ দিতে থাকলাম- ঢোঁড়ার বাচ্চা ঢোঁড়া। বিষ নাই তবু তোর সাপ হবার শখ ছিল কেন?

আমার চিৎকারে সুমন কাকা আরো জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো অন্ধকারে- এখনও কামড়াতে চায়। মারো....

আ বা-বা বা বা
সম্মিলিত একটা চিৎকারের ভেতর সুমন কাকা তার মরচে পড়া তলোয়ারটা মাথার উপরে তুলে এক ঝটকায় নামিয়ে আনলো আমার ঘাড়ের উপর- খপাৎ

২০০৯.১২.২৩ বুধবার]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29086346 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29086346 2010-01-26 23:48:18
জলসন্ধ্যা
একটু পরেই সুকন্যা হাত ভরা চুড়ি পরে বের হয়ে গেলো। সে কুশিয়ারা যাচ্ছে। কুশিয়ারায় যাবার সময় সে দুই হাতে চুড়ি পরে যায়...

মুকুল বহুদিন ধরে বলছিল পিকনিকে যাবে। তাকে ফোন করে বললাম সবাইকে নিয়ে চলে আসতে। কুশিয়ারা পার হয়ে আমরা পিকনিকে যাব

পরদিন আমাদের পিকনিক। মোট বারোজন। মুকুল গাড়ি ঠিক করে সবাইকে নিয়ে আসবে। আমি উঠব শেরপুর ব্রিজ থেকে। কিন্তু সকালে ব্রিজে উঠার মুখে দেখি মুকুল আমার পাশে পাশে হাঁটছে। গাড়ি ঠিক করতে গেছে আরেকজন

ব্রিজটা এখন আর রাস্তা হিসেবে ব্যবহার হয় না। ওটা এখন ছোট ছোট মাইক্রো আর টেম্পুর স্ট্যান্ড। এ পারের গাড়ি যাত্রীদের ব্রিজের অর্ধেকে নামিয়ে দেয়। যাত্রীরা হেঁটে গিয়ে আবার ওইপারের গাড়িতে উঠে ব্রিজের অন্যে অর্ধেকের টেম্পু স্ট্যান্ড থেকে

মুকুল আর আমি যখন হাঁটছি তখন সুকন্যা পেছন থেকে দ্রুত আমাদের ক্রস করে ব্রিজের দিকে চলে গেলো। মুকুল আমার দিকে তাকায়- সুকন্যা এখানে?
- হ্যাঁ
- তোর সাথে কথা বলল না কেন?
আমি কিছু বললাম না। কারণ অন্য কারো সামনে আমরা কথা বলি না এটা তো আর অন্য কাউকে বলা যায় না

রবি যে গাড়িটা নিয়ে এলো সেটা আমি পছন্দ করলাম না। আরেকটা আনতে বলে ব্রিজের বাম রেলিংয়ের মাঝামাঝি উঠে বসলাম। এখান থেকে নিচে সুকন্যার বাড়ি দেখা যায়

কুশিয়ারা নদীটাকে গুটিয়ে এনে পুকুর বানিয়েছে সুকন্যা। ব্রিজটা এখন তার পুকুরের উপর। সুরমা নদী থেকে চাঁদনীঘাটের সিঁড়িটা খুলে পাইকারদের বাঁশের ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে এসে বসিয়েছে তার কুশিয়ারা পুকুরে। সুরমাতে যেমন ছিল; নদী পার হয়ে শহরে ঢুকতে বাম পাশে চাঁদনীঘাট। ঠিক তেমনি; ব্রিজ পার হয়ে সুকন্যার বাড়ি ঢুকতে বাম পাশে বসিয়েছে ঘাট। ঘাটটা সুকন্যার বাড়ির উঠান থেকে সটান নেমে গেছে পানিতে

সুকন্যা চাদর মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি হয়ে ঘাটে বসে চুড়িতে শব্দ তুলে পানিতে হাত নাড়ছে। তার চারপাশে ঘাই দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার কুশিয়ারার বোয়াল

আগাগোড়া একটা তলোয়ারের মতো সাদা এই কুশিয়ারার বোয়াল। যে রাতকানা মাছের কাঁটা বাছতে পারে না তাকে দেয়া হয় এই এক কাঁটার এক মাছ; কুশিয়ারার বোয়াল। ছোট রান্ধুনির মাছ কুটা শেখার সময় এনে দেয়া হয় আঁশহীন এই বোয়াল। সন্তানের মুখেভাতের অনুষ্ঠানে দু দানা ভাতের সাথে অনিবার্য এই মাছ। শিশুর আদুল বাদুল হাতে নিজের খাবার নিজে তুলে খাওয়ার প্রথম দিনেও থাকে কুশিয়ারার এই এক টুকরা বোয়াল। আর নতুন জামাইয়ের প্লেটের পরিধি পার হয়ে মাছের যে টুকরোটা মসলা দিয়ে পাঞ্জাবি পর্যন্ত ভরিয়ে দেয়; সেও এই কুশিয়ারার বোয়াল; যার পুরো চামড়াটাই চর্বি আর চর্বির নিচে কাঁটাহীন এক কোষ মাংসের শরীর

কিন্তু জমির বিষ- নৌকার ডিজেল ঢুকে যাচ্ছে বোয়ালের মগজে; শরীরে ফোসকা আর অনেকের পেটেই গেঁথে আছে পুরোনো বড়শি...

আরেকটা গাড়ি নিয়ে এলো আরেকজন। এবার সরাসরি ঝামেলা বাঁধালাম- আমি যাব না। তোমরা যাও। এইসব গাড়িতে আমি যাই না
- গাড়িতে কী সমস্যা?

গাড়িতে কী সমস্যা সেটা না বলে সবাইকে গালাগালি করতে করতে আমি হাঁটা শুরু করলাম ব্রিজের ঢালুর দিকে। পেছন থেকে সবাই ডাকছে। এক সময় মুকুলের গলা শুনলাম- থাক। ও না গেলে না যাবে। চলো...

আরো দুয়েকবার আমাকে ডাকাডাকি করে গাড়িটা চলে গেলো। আমি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি। বোয়ালের সাথে খেলতে খেলতে আমার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসলো সুকন্যা। আমি হাসিটা দেখলাম না। সে আবার গুনগুন করে গাইতে গাইতে পানিতে হাত নাড়তে লাগলো। বোয়ালগুলো এখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে পিঠের ঝিলিক আর পানির উপরে সুঁড়–গুলো নড়াচড়ার একটা শিরশিরে কণাকণা ঢেউ

আমি ব্রিজ থেকে নেমে আস্তে আস্তে গিয়ে ঘাটে বসলাম। সে আমার দিকে তাকালো না। কিন্তু কাউকে না দেখার ভান করলে মানুষের কানে শিরশির করে। সে আমার দিকে না তাকিযে কানের কাছে চুল ঠিক করল। আমি এবার পানিতে হাত নামিয়ে নাড়তে লাগলাম। সাথে সাথে একটা বড়ো সাইজের বোয়াল লেজ দিয়ে ঠাস করে হাতে একটা বাড়ি মারলো। বাড়ির চোটে ছিটকে ঠাণ্ডা পানি আমাকে প্রায় ভিজিয়ে দিলো। আমি উঠে পানি ঝাড়া শুরু করলে সে মুচকি হেসে তাকাল- মাছেরাও ছোটলোক চেনে
- ছোটলোকের ছোটমাছ। ভালো মানুষ জীবনে দেখেনি এরা

এবার খিলখিল করে হেসে উঠলো সুকন্যা- ছোটমাছ বললে কিন্তু গুঁড়ামাছ বোঝায়। বোয়াল মাছেরা বড়ো মাছের কাতারে পড়ে
- তোমার যুক্তি শুনতে আসিনি আমি। এই শীতের দিনে তোমার মাছ আমাকে পুরা ভিজিয়ে দিলো
- এভাবে হৈচৈ করলে তো ঠাণ্ডা লাগবেই। ঘাটে বসে আস্তে আস্তে পানি ছোঁও। প্রথমে আঙুল তারপর হাতের কব্জি পর্যন্ত। দেখবে ঠাণ্ডা লাগবে না। মাছেরাও তোমাকে চিনে ফেলবে

মুখ আর শরীর থেকে পানি ঝেড়ে আমি আবার বসলাম। একটা আঙুল ছোঁয়ালাম পানিতে। আস্তে আস্তে নাড়তে লাগলাম। একটা মাছ আমার আঙুল ছুঁয়ে গেলো। আস্তে আস্তে হাতের কব্জি পর্যন্ত ডোবালাম। বোয়ালের সুঁড়–গুলো শিরশির করে খেলা করতে শুরু করল আমার হাতের সাথে
- আঙুললগুলো ফাঁকা করে রাখো পানির নিচে
- কেন?
- মাছেরা গোসল করবে
- মানে?
- মাছেদের তো তোমার মতো হাত নেই যে ঘষে ঘষে শরীরের ময়লা পরিষ্কার করবে। আঙুলগুলো ফাঁকা করে রাখলে ওরা তোমার আঙুলের ভেতর ঘষে যেতে যেতে শরীরের ময়লা পরিষ্কার করতে পারবে। মাছেরা আঙুলের ফাঁকে ঢুকলে আঙুলগুলো একটু চেপে দিও

আমি দশটা আঙুল ফাঁকা করে পানির নিচে নাড়তে লাগলাম। সত্যি সত্যি মাছগুলো এবার আঙুলের ফাঁক দিয়ে শরীর ঘষে ঘষে একপাশ থেকে আরেকপাশে বের হয়ে যেতে থাকলো। সুকন্যাকে দেখলাম দুযেকটা মাছ হাতের তালুতে নিয়ে অন্য হাত দিয়ে ঘষে দিচ্ছে। আমিও একটা তুলতে গেলাম কিন্তু লাফ দিয়ে পড়ে গেলো। সুকন্যা আবার হাসলো- তোমার হাতে সেদ্ধমাছের গন্ধ লেগে আছে। তাই তারা তোমাকে পুরোপুরি ভরসা করতে পারে না

সুকন্যা গুনগুন করে গাইছে। আমি হাত নাড়ছি পানিতে। এখন আর শীত লাগছে না। সুকন্যা আমার দিকে তাকালো- আমি পীর হতে চাইলে তুমি আমাকে হেল্প করবে?
- হঠাৎ করে পীর হবার শখ হলো কেন?
- পীর না হলে এই মাছগুলোকে বাঁচাতে পারবো না। নদীটাকে পুকুর বানিয়ে ফেলায় মাছগুলোর পালাবার পথও এখন আর বেশি নেই। মানুষেরা যে কোনোদিন মাছগুলো ডাকাতি করতে পারে
- কিন্তু তুমি পীর হলে মানুষ মাছ চুরি করবে না তোমাকে কে বলল?
- করবে না। আমি মাছগুলোর অন্য একটা অলৌকিক ইতিহাস বানাব। সবাইকে বলব এরা মাছ নয় এরা জলদেবতা
- এই যুগে মানুষ এসব কাহিনী বিশ্বাস করবে না
- করবে। বোস্তামির পুকুরে কচ্ছপ। খানজাহানের কুমির। শাহজালালের গজার- কবুতর আর নিমাত্রার রাজহাঁসকে মানুষ এখনও দেখে রাখে। এখনও মারে না। প্রতিদিন খাবার দেয়। আমার বোয়ালগুলোকেও আমি মানুষের খাদ্য তালিকা থেকে সরিয়ে নিতে চাই। না হলে এরা বাঁচবে না। তুমি আমাকে হেল্প করবে?

ব্রিজের উপর ভটভট শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি মুকুলরা ফিরে এসছে। গাড়ি থেকে নামছে হুড়মুড় করে। সঙ্গে আরো কয়েকজন অচেনা লোক। গাড়ি ছেড়ে সবাই হৈ চৈ করে ঘাটের দিকে চলে এলো। সবার সামনে মুকুল। আমি তাকাতেই বিশাল একটা হাসি দিয়ে মুকুল লাফিয়ে উঠল- ধরিব মৎস্য খাইব সুখে...

কাছে এসে বলল- তোর জন্য পিকনিটাই যখন মাটি হলো তখন চিন্তা করলাম খরচ উঠিয়ে নেয়া দরকার। এজন্য পিকনিকে না গিয়ে মাইমল নিয়ে এলাম। এই বোয়ালগুলো বিক্রি করে খরচ উঠাবো
- না। এগুলো ধরা যাবে না
চিৎকার করে উঠলো সুকন্যা

- মুকুল ধমকে উঠলো- তুমি না বলার কে? এগুলো নদীর মাছ। নদীকে পুকুর বানানোর দায়ে তোমাকে আমি পুলিশে দেবো। ... এই জাল ফেলো

মাইমলরা ততক্ষণে জাল রেডি করে ফেলেছে। মুকুল বলার সাথে সাথে আটটা উড়াল জাল উড়ে গিয়ে পড়লো পানিতে। সাথে সাথে সুকন্যাও ঝাঁপ দিলো পানিতে। ডুব দিয়ে নিজেই গিয়ে ঢুকে গেলো একটা জালের ভেতর। পানিতে দাঁড়িয়ে জালের মুখ খুলে চিৎকার করতে থাকলো- পালা পালা তোরা...

কিন্তু সে একটা জাল কেটে দেয় তো সাতটা জাল তুলে আনে শয়ে শয়ে বোয়াল। সে পানি থেকে উঠে এসে দু হাতে মাছগুলো ধরে ছুঁড়ে মারতে থাকে পানিতে। কিন্তু সেগুলো গিয়ে ধরা পড়ে আরেকটা জালে। সে একবার পানিতে গিয়ে জাল রুখে দেয় তো আরেকবার পাড়ে উঠে এসে খাঁচা উল্টে ফেলে মাছগুলোকে ছেড়ে দেয় পানিতে

মুকুলের সঙ্গের লোকজন এবার ঘাট থেকে বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই তুলে নেয় হাতে। সুকন্যা তখন সাঁতরাচ্ছিল মাছগুলোকে লুকানোর জন্য। একসাথে আট দশটা পাথরের চাঁই গিয়ে পড়ে তার উপর। পানি লাল হয়ে উঠে রক্তে। সুকন্যা তখনও সাঁতরাচ্ছে। আরো পাথরের চাঁই পড়ে তার উপর। এবার একটা জাল তাকে আটকে ফেলে পানিতে। সুকন্যা জালটা ছাড়াতে যায়। কিন্তু মাইমলরা জাল বয়ে নেবার মোটা মোটা বাঁশের লাঠি দিয়ে সমানে পিটাতে থাকে জালে আটকানো সুকন্যাকে। সুকন্যা প্রায় নিস্তেজ হয়ে আসে। আস্তে আস্তে তাকে তুলে আনা হয় পাড়ের দিকে। অন্য সাতটা জাল আবার ঝপাঝপ তুলে আনতে থাকে শয়ে শয়ে মাছ। সুকন্যা আমার দিকে তাকায়- তুমি প্লিজ পুকুরের পাড়টা কেটে পুকুরটাকে আবার নদী বানিয়ে দাও। আমার মাছগুলোকে অন্তত পালানোর কিছু জায়গা করে দাও...

সুকন্যার শরীর থেকে তখন অঝোরে রক্ত বের হচ্ছে। এই অবস্থাতেই সে গড়ান দিয়ে মাছের খাঁচার কাছে চলে যায়। শরীরের এক ধাক্কায় পুরো খাঁচাটা পানির মধ্যে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠে- তোরা যা। শিংমাছ হয়ে কাদার মধ্যে লুকিয়ে থাক। যা...

সুকন্যার নিস্তেজ দেহটা গড়িয়ে পড়ে পানিতে। মুকুলরা পুরো পুকুর খালি করে মাছগুলো নিয়ে চলে যায়। শুধু সুকন্যাই টিকে থাকে শিংমাছ হয়ে কাদার নিচে লুকিয়ে থাকা বোয়াল হবার জন্য কুশিয়ারায়....

২০০৯.১২.২৩ বুধবার]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29078075 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29078075 2010-01-14 01:04:44
এক্লাইন। ২০ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29076029 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29076029 2010-01-10 23:47:01 এক্লাইন। ১৯ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29075358 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29075358 2010-01-09 23:18:18 এক্লাইন। ১৮ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29074758 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29074758 2010-01-09 00:20:19 এক্লাইন। ১৭ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29073333 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29073333 2010-01-06 23:22:09 এক্লাইন। ১৬ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29072558 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29072558 2010-01-05 22:04:36 এক্লাইন। ১৫ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29071979 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29071979 2010-01-05 01:34:10 এক্লাইন। ১৪ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29071289 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29071289 2010-01-03 22:57:51 এক্লাইন। ১৩ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29070696 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29070696 2010-01-03 00:52:24 এক্লাইন। ১২ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29070109 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29070109 2010-01-02 00:09:48 এক্লাইন। ১১ http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29068670 http://www.somewhereinblog.net/blog/Leelenblog/29068670 2009-12-31 01:08:28