" এক বাঙালী ছেলে দেশ থেকে বিয়ে করে নতুন বউ নিয়ে করাচী গেল । যাওয়ার সময় তার এক বন্ধুকে বলে গিয়েছিল তার জন্য একটি বাসা ঠিক করার জন্য যেন বউ নিয়ে সেখানে উঠতে পারে । এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সিতে করে নতুন বউ নিয়ে সোজা জেকব লাইনসের বন্ধুর বাড়িতে গেল । বন্ধুর বাড়ির সন্নিকটে ট্যাক্সিই যায় না তাই একটু দূরে বউসহ ট্যাক্সি রেখে , ট্যক্সিওয়ালাকে বলে গেল একটু অপেক্ষা করতে ,সে এখনই আসবে । বন্ধুসহ ফিরে এসে দেখে ওখানে ট্যাক্সি নেই , বউও নেই । একি কথা! তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল । অনেক লোক জমা হয়ে গেল । কি করা যায়। অনেকে বলল থানায় এজাহার করতে । থানায় এজাহার করলেও অন্যভাবে এগুতে হবে । চল ইষ্ট পাকিস্তান এসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারীর বাসায় যাই । সবাই মিলে জেরারেল সেক্রেটারীর বাসায় গিয়ে তাকে সব কথা বলল । জেনারেল সেক্রেটারী সাহেব খুব রাগী লোক ছিলেন। সব কথা শুনে রাগে গড়গড় করতে করত স্বামী লোকটাকে খুব জোরে এক থাপ্পড় মারলেন এবং বললেন " এতবড় বোকামী কি মানুষ করে "। (স্মৃতি অম্লান , ১৪ই ডিসেম্বর , ২০০১ . দৈনিক ইত্তেফাক )।
সেই জেনারেল সেক্রেটারী মানুষটা কি বোকা ছিলেন না , বোকার মত মানুষের জন্য ভালবাসা উজাড় করে দেন নি জীবন ভর । অসময়ে চলে যাবার ক্ষন ঘনিয়ে এল তার, স্ত্রীকে ডেকে বললেন , " তোমার জন্য আমি তেমন কিছুই রেখে যেতে পারলাম না , রত্ন রেখে যাচ্ছি -- আমাদের ছেলে মেয়ে " । চলে গেলেন নিজ ঠিকানায়।
তার আদরের ছেলে মেয়েরা কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হল , তবে তাদের মা আপোষহীন সন্তানদের মানুষ করবার জন্য । বললেন , " আমি একাই ওদের বাবা এবং মা ; আগে ওদের কেউ কিছু বললে লক্ষ্য করবার প্রয়োজন ছিল না । এখন ওদের মন ছোট হোক কোনভাবেই চাই না "। তাই এমনকি মামা , বড় ভাই সবার অমতে তার সন্তানদের মানুষ করতে চাইলেন বাবার ইচ্ছে পূর্ন করতে । বললেন ," কষ্ট হোক ,তবু মাথা উঁচু করে বাচঁবে । তোমাদের স্বাধীনতা দেয়া হোল নিজের মত চলার , সদ্ব্যবহার করো সে স্বাধীনতার ।"
পেরেছে বাবা মায়ের সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে তার সন্তানেরা । সব কিছু আছে , আব্বা নেই সেই কবে থেকে । উনি চলে যাবার পরে , অনেক সময় পথে ঘাটে চলতে চলতে ভেবেছি যদি দেখি আছে কোথাও , আল্লাহ সব পারে ; চাইলেই ফিরিয়ে দিতে পারে তাকে পৃথিবীতে , দেয় নি নিয়ম ভেঙ্গে । এক একবার মন খারাপ হয় , মনে পড়ে যায় তার অপত্য স্নেহ ।
ঈদের দিন নতুন চাদর বিছিয়ে তার উপরে সবার কাপড় , জুতো , চুড়ি , ক্লিপ ইত্যাদি আলাদা আলাদা করে সাজিয়ে রাখা ছিল তার কাজ । আমাদের যত্ন নিতে সে কখনো ক্লান্ত হোত না । অনেক কিছু মনে আসছে , লিখতে গিয়ে এগুতে পারছি না । এখন যদি দেখি কারো বাবা নেই , কষ্ট হয় বুকের মধ্যে ।
ঈদে একবার কাপড় এনে বললেন , " এটা মার্কেটের সেরা ড্রেস " ( তেমন কিছু ছিল না সেটি , খুশী করবার জন্য বলা ) । ঈদের দিন সেটা পরে সবাইকে বলেছি , এটা সবচেয়ে ভাল ড্রেস , আব্বাজী বলেছেন ।
আমি ছিলাম তার সবচেয়ে আদরের । আম্মা বলতেন , " ছোটটিকে বেশী আদর না করে গুড্ডুকে ( আমার পারিবারিক নাম ) বেশী আদর করেন কেন "? বলতেন , " তা না হলে যে হিংসে করবে ছোটটিকে "। আসলে সেই ছোটবেলা থেকে আব্বার মত করে সব করতে চাইতাম । মানুষকে ভালবাসতে শিখিয়েছে সে । তাঁর জীবনেও মানুষের ভালবাসা পেয়েছে , মরনের পরেও দেখেছি সে সব ফুরিয়ে যায় নি তার । বিশ্বাস করতেন মানুষকে অত্যন্ত বেশী । কত জন কত ভাবে ঠকিয়েছে । এমনকি অবসরে যাবার পরেও একজন এসে তাঁর কাছে আশ্রয় চাইলো চাকরী দিতে হবে । কাউকে ফেরাতে পারতেন না । সেই লোকটি একদিন আব্বার ব্রিফকেস নিয়ে পালিয়ে গেল । সারা জীবনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল সেটিতে । লোকটি আর ফিরে এল না । কত অসুবিধা হয়েছে আব্বাজীর কাগজপত্র সব হারিয়ে । তবু মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে যায় নি । অদ্ভুত মানুষ ছিলেন , বৈচিত্রে ভরা তার জীবন ।
এক একবার তাঁর কথা মনে এলে মন মানে না । প্রতিবেশী মেয়ে ভিখারুন্নেসা স্কুলে পড়ে , সেখানে পড়লে আমাদের সুবিধা হয় । আব্বাজীর হাত ধরে স্কুলের ফর্ম এনেছি , ভিখারুন্নেসা স্কুলের এখনকার মনোয়ারা হাসপাতালের দিকের গেট দিয়ে ঢুকেছিলাম সেবার ; মনে হল বড় মাঠ নেই , কেমন গুমোট লাগছিল । অন্য যে স্কুলটায় গেলাম , সেটার বড় মাঠ দেখে চাইলাম সেখানে পড়বো , ছোট ছিলাম , তবু ইচ্ছাকে আমার অগাহ্য করা হোল না । ছোট ছিলাম , কেমন ভুলিয়ে রাখতে পারতেন । যখন
ক্যানসার ছড়িয়ে গেছে শরীরে , অসুস্থ ভীষন ; স্কুলের হাফইয়ার্লী পরীক্ষার কটা খাতা দেখিয়েছে , বাসায় এসে বললাম , আব্বা , আমি পাচঁটার মধ্যে চারটিতে হাইয়েষ্ট পেয়েছি । শুয়ে ছিলেন , উঠে বসলেন । বললেন , " জান আমার অসুখ অর্ধেক ভাল হয়ে গেছে , তোমার বাকী খাতাগুলো কবে দেবে ? এমন ভাল রেজাল্ট সেগুলোতে হলে আমি পুরো সুস্থ হয়ে যাব "। পুরো বিশ্বাস করেছিলাম কথা তার । তাই অপেক্ষা সইছিল না খাতা পাবার ; কি দিয়ে কি হয়ে গেল । রেজাল্ট ঠিকই আমার ভাল হয়েছিল , তবে আব্বাজী যে বলেছিলেন , অসুখ ভাল হয়ে যাবার কথা , সেটা মিথ্যা বলেছিলেন । আমি তো বিশ্বাস করে খুশী ছিলাম , তাহলে কেন ফাঁকি দিলেন ? বরাবর জানি বাবা মায়েরা মিথ্যা কথা বলেনা । কেন বললেন সেবার । এতটুকু ছোট মেয়ের সাথে মিথ্যা বললেন কেন ? সেই মেয়েটা দিনের পরে দিন অপেক্ষা করেছে তার বাবার জন্য । একসময়ে অসুস্থ হয়ে গিয়েছে তার গুড্ডু , তবু আসেনি , একবারও আসেনি । পারেননি আসতে ।
তা না হলে কি থাকতো অমন করে লুকিয়ে ।
এখনও মাঝে মাঝে মনে হয় , আব্বাজী আছেন , কোথাও আছেন । হঠাৎ এসে পড়বেন , গেটের কাছে এসে জোরে কাশি দেবেন ; তারপরে ঘরে ঢুকবেন ।
(*** সারাদিন চেষ্টা করে এই লেখাটা লিখেছি । অনেক মেয়ের জীবনে মায়ের ভূমিকা অনেক বেশী থাকে , আমার জীবনে আব্বাজী আম্মার চেয়ে কোন অংশে কম নন ; বরঞ্চ তার প্রভাব এবং চারিত্রিক গড়ন আমার ক্ষেত্রে বেশী ।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

