somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এক দেশে এক বাবা ছিল , সে মিথ্যে কথা বলেছিল তার ছোট্ট মেয়ের সাথে ।

২১ শে জুন, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

" এক বাঙালী ছেলে দেশ থেকে বিয়ে করে নতুন বউ নিয়ে করাচী গেল । যাওয়ার সময় তার এক বন্ধুকে বলে গিয়েছিল তার জন্য একটি বাসা ঠিক করার জন্য যেন বউ নিয়ে সেখানে উঠতে পারে । এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সিতে করে নতুন বউ নিয়ে সোজা জেকব লাইনসের বন্ধুর বাড়িতে গেল । বন্ধুর বাড়ির সন্নিকটে ট্যাক্সিই যায় না তাই একটু দূরে বউসহ ট্যাক্সি রেখে , ট্যক্সিওয়ালাকে বলে গেল একটু অপেক্ষা করতে ,সে এখনই আসবে । বন্ধুসহ ফিরে এসে দেখে ওখানে ট্যাক্সি নেই , বউও নেই । একি কথা! তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল । অনেক লোক জমা হয়ে গেল । কি করা যায়। অনেকে বলল থানায় এজাহার করতে । থানায় এজাহার করলেও অন্যভাবে এগুতে হবে । চল ইষ্ট পাকিস্তান এসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারীর বাসায় যাই । সবাই মিলে জেরারেল সেক্রেটারীর বাসায় গিয়ে তাকে সব কথা বলল । জেনারেল সেক্রেটারী সাহেব খুব রাগী লোক ছিলেন। সব কথা শুনে রাগে গড়গড় করতে করত স্বামী লোকটাকে খুব জোরে এক থাপ্পড় মারলেন এবং বললেন " এতবড় বোকামী কি মানুষ করে "। (স্মৃতি অম্লান , ১৪ই ডিসেম্বর , ২০০১ . দৈনিক ইত্তেফাক )।

সেই জেনারেল সেক্রেটারী মানুষটা কি বোকা ছিলেন না , বোকার মত মানুষের জন্য ভালবাসা উজাড় করে দেন নি জীবন ভর । অসময়ে চলে যাবার ক্ষন ঘনিয়ে এল তার, স্ত্রীকে ডেকে বললেন , " তোমার জন্য আমি তেমন কিছুই রেখে যেতে পারলাম না , রত্ন রেখে যাচ্ছি -- আমাদের ছেলে মেয়ে " । চলে গেলেন নিজ ঠিকানায়।
তার আদরের ছেলে মেয়েরা কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হল , তবে তাদের মা আপোষহীন সন্তানদের মানুষ করবার জন্য । বললেন , " আমি একাই ওদের বাবা এবং মা ; আগে ওদের কেউ কিছু বললে লক্ষ্য করবার প্রয়োজন ছিল না । এখন ওদের মন ছোট হোক কোনভাবেই চাই না "। তাই এমনকি মামা , বড় ভাই সবার অমতে তার সন্তানদের মানুষ করতে চাইলেন বাবার ইচ্ছে পূর্ন করতে । বললেন ," কষ্ট হোক ,তবু মাথা উঁচু করে বাচঁবে । তোমাদের স্বাধীনতা দেয়া হোল নিজের মত চলার , সদ্ব্যবহার করো সে স্বাধীনতার ।"
পেরেছে বাবা মায়ের সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে তার সন্তানেরা । সব কিছু আছে , আব্বা নেই সেই কবে থেকে । উনি চলে যাবার পরে , অনেক সময় পথে ঘাটে চলতে চলতে ভেবেছি যদি দেখি আছে কোথাও , আল্লাহ সব পারে ; চাইলেই ফিরিয়ে দিতে পারে তাকে পৃথিবীতে , দেয় নি নিয়ম ভেঙ্গে । এক একবার মন খারাপ হয় , মনে পড়ে যায় তার অপত্য স্নেহ ।
ঈদের দিন নতুন চাদর বিছিয়ে তার উপরে সবার কাপড় , জুতো , চুড়ি , ক্লিপ ইত্যাদি আলাদা আলাদা করে সাজিয়ে রাখা ছিল তার কাজ । আমাদের যত্ন নিতে সে কখনো ক্লান্ত হোত না । অনেক কিছু মনে আসছে , লিখতে গিয়ে এগুতে পারছি না । এখন যদি দেখি কারো বাবা নেই , কষ্ট হয় বুকের মধ্যে ।
ঈদে একবার কাপড় এনে বললেন , " এটা মার্কেটের সেরা ড্রেস " ( তেমন কিছু ছিল না সেটি , খুশী করবার জন্য বলা ) । ঈদের দিন সেটা পরে সবাইকে বলেছি , এটা সবচেয়ে ভাল ড্রেস , আব্বাজী বলেছেন ।
আমি ছিলাম তার সবচেয়ে আদরের । আম্মা বলতেন , " ছোটটিকে বেশী আদর না করে গুড্ডুকে ( আমার পারিবারিক নাম ) বেশী আদর করেন কেন "? বলতেন , " তা না হলে যে হিংসে করবে ছোটটিকে "। আসলে সেই ছোটবেলা থেকে আব্বার মত করে সব করতে চাইতাম । মানুষকে ভালবাসতে শিখিয়েছে সে । তাঁর জীবনেও মানুষের ভালবাসা পেয়েছে , মরনের পরেও দেখেছি সে সব ফুরিয়ে যায় নি তার । বিশ্বাস করতেন মানুষকে অত্যন্ত বেশী । কত জন কত ভাবে ঠকিয়েছে । এমনকি অবসরে যাবার পরেও একজন এসে তাঁর কাছে আশ্রয় চাইলো চাকরী দিতে হবে । কাউকে ফেরাতে পারতেন না । সেই লোকটি একদিন আব্বার ব্রিফকেস নিয়ে পালিয়ে গেল । সারা জীবনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল সেটিতে । লোকটি আর ফিরে এল না । কত অসুবিধা হয়েছে আব্বাজীর কাগজপত্র সব হারিয়ে । তবু মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে যায় নি । অদ্ভুত মানুষ ছিলেন , বৈচিত্রে ভরা তার জীবন ।

এক একবার তাঁর কথা মনে এলে মন মানে না । প্রতিবেশী মেয়ে ভিখারুন্নেসা স্কুলে পড়ে , সেখানে পড়লে আমাদের সুবিধা হয় । আব্বাজীর হাত ধরে স্কুলের ফর্ম এনেছি , ভিখারুন্নেসা স্কুলের এখনকার মনোয়ারা হাসপাতালের দিকের গেট দিয়ে ঢুকেছিলাম সেবার ; মনে হল বড় মাঠ নেই , কেমন গুমোট লাগছিল । অন্য যে স্কুলটায় গেলাম , সেটার বড় মাঠ দেখে চাইলাম সেখানে পড়বো , ছোট ছিলাম , তবু ইচ্ছাকে আমার অগাহ্য করা হোল না । ছোট ছিলাম , কেমন ভুলিয়ে রাখতে পারতেন । যখন
ক্যানসার ছড়িয়ে গেছে শরীরে , অসুস্থ ভীষন ; স্কুলের হাফইয়ার্লী পরীক্ষার কটা খাতা দেখিয়েছে , বাসায় এসে বললাম , আব্বা , আমি পাচঁটার মধ্যে চারটিতে হাইয়েষ্ট পেয়েছি । শুয়ে ছিলেন , উঠে বসলেন । বললেন , " জান আমার অসুখ অর্ধেক ভাল হয়ে গেছে , তোমার বাকী খাতাগুলো কবে দেবে ? এমন ভাল রেজাল্ট সেগুলোতে হলে আমি পুরো সুস্থ হয়ে যাব "। পুরো বিশ্বাস করেছিলাম কথা তার । তাই অপেক্ষা সইছিল না খাতা পাবার ; কি দিয়ে কি হয়ে গেল । রেজাল্ট ঠিকই আমার ভাল হয়েছিল , তবে আব্বাজী যে বলেছিলেন , অসুখ ভাল হয়ে যাবার কথা , সেটা মিথ্যা বলেছিলেন । আমি তো বিশ্বাস করে খুশী ছিলাম , তাহলে কেন ফাঁকি দিলেন ? বরাবর জানি বাবা মায়েরা মিথ্যা কথা বলেনা । কেন বললেন সেবার । এতটুকু ছোট মেয়ের সাথে মিথ্যা বললেন কেন ? সেই মেয়েটা দিনের পরে দিন অপেক্ষা করেছে তার বাবার জন্য । একসময়ে অসুস্থ হয়ে গিয়েছে তার গুড্ডু , তবু আসেনি , একবারও আসেনি । পারেননি আসতে ।
তা না হলে কি থাকতো অমন করে লুকিয়ে ।

এখনও মাঝে মাঝে মনে হয় , আব্বাজী আছেন , কোথাও আছেন । হঠাৎ এসে পড়বেন , গেটের কাছে এসে জোরে কাশি দেবেন ; তারপরে ঘরে ঢুকবেন ।


(*** সারাদিন চেষ্টা করে এই লেখাটা লিখেছি । অনেক মেয়ের জীবনে মায়ের ভূমিকা অনেক বেশী থাকে , আমার জীবনে আব্বাজী আম্মার চেয়ে কোন অংশে কম নন ; বরঞ্চ তার প্রভাব এবং চারিত্রিক গড়ন আমার ক্ষেত্রে বেশী ।)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০০৯ রাত ৯:০৯
৪৩টি মন্তব্য ৩৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×