(পূর্বাপর)
একই জগত ও পরিবেশে উল্লিখিত একের মধ্যে তিন জাতির ধ্যান-ধারণা ও ঈমান, স্ব-স্ব গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং সকলেই জড়, বস্তু ও বাস্তব। পক্ষান্তরে, একে অন্যের কাছে অদৃশ্য অবস্তু ও অবাস্তব বটে! তাদের বিশ্বাস, বিজ্ঞান-গবেষণা পরস্পর বিপরীত। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করলে সবই সন্দেহজনক ও আপেক্ষিক। মুলতঃ প্রত্যেক জীবকে নির্দিষ্ট, সীমাবদ্ধ ও সীমিত জ্ঞান, গুণ ও দর্শন ক্ষমতা দিয়েই তৈরি করা হয়েছে। অতএব স্ব-স্ব দলীয় ঈমান-আকিদা যথাসত্য নয়।
চন্দ্রের আলো, ওটা তার নিজস্ব আলো, সূর্য থেকে ধার করেনি। কোরান দেখুন: হু- আল্লাজী- নূরান [১০: ৫] অর্থ: তিনি সূর্যকে তেজ দীপ্ত ও চন্দ্রকে øিগ্ধময় করেছেন। অর্থাৎ দুটোরই অস্তিত্ব ও গুণের স্বতন্ত্রতার সাক্ষ্য দেয়। বিজ্ঞান বলে পৃথিবীরও আলো আছে। আলো আছে সৃষ্ট-অসৃষ্ট প্রত্যেকটি বস্তু অবস্তুর। আল্লাহু নূরুচ্ছামাঅতে অল আর্দ [২৪: ৩৫] অর্থ: দৃশ্য-অদৃশ্য, বস্তু-অবস্তু, অর্থাৎ আকাশ ও জমিনের জ্যোতি বা জীবনই আল্লাহ্। আলো-আঁধার দেখা যায়, অনুভব ও উপলব্ধি করা যায়, সনাক্ত করা যায় অথচ তা বস্তু বলে কেউ স্বীকার করে না (প্রধানত)। অদৃশ্য অবস্তু বলেও কেউ ঘোষণা করে না। তবে তার পরিচয় বা বিষয় বস্তু কি! এবং কিসের তৈরি তা আজও আবিষ্কৃত হয়নি। জীবনের পরিচয় আজও দূর্ভেদ্য, রহস্যাবৃত। জীব-জীবের দেহ দেখে কিন্তু জীবন দেখে না।
কোন বস্তুতে জীবনের সঞ্চার হলে, জীব নামে আখ্যায়িত হয়। এই জীবনের সুত্রও নিম্নরূপ:
আলিফ-লাম-মিম:
ক) স্থুল জীবন দেহ খ) সূক্ষ্ম জীবন দেহ গ) নূর বা জ্যোতি জীবন দেহ ।
স্থূল জীবন দেহ : হাড্ডি, মজ্জা, রক্ত, মাংস ও রস সম্বলিত জীবন দেহ।
সূক্ষ্ম জীবন দেহ : স্থূল দেহের মধ্যেই তার আসন। স্থূল দেহ ব্যাপীয়াই তার অবস্থান। রূপ, স্বরূপ, আকার আকৃতি সবই অবিকল, অনুরূপ। দুই দেহ একাকার, আবার স্বতন্ত্রও বটে। সূক্ষ্ম দেহ স্থূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইচ্ছা মত প্রয়োজনবোধে স্বাধীন চলাফেরা করতে পারে এবং করে। সহজ ও সরল এবং সংক্ষিপ্ত কথায়: যিনি স্বপ্নে দেখেন, তিনিই সূক্ষ্ম জীবন দেহ। জীবের ঘুম মানেই স্বপ্নে দেখা ; যতক্ষণ ঘুমায় ততক্ষণই স্বপ্ন দেখে। যা দেখে তাই বস্তু, তাই বাস্তব এবং তাইই কট্টর সত্য। ঘুম ভাংলেই তা অবস্তু ও অবাস্তব। অথচ মনে থাকে অনেক কিছু ; আবার ঘুমিয়ে গেলে এই কট্টর, কঠিন ও বাস্তব জগত মুহুর্তের মধ্যেই অবস্তু, অবাস্তব ; এমন কি কল্পনারও বাইরে। ঘুমিয়ে গেলে ধর্ম-কর্ম, আল্লাহ রাছুল, বিজ্ঞান, অবিজ্ঞান সবই মিথ্যা, অর্থাৎ কিছুই না। আর ঐ যে ‘কিছুই না’ তাও কিছু না। ইহাই কোরানে বলছে: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ নাই কিছু, কিছু ব্যতীত; অর্থাৎ এই নাই, এই আছে।
স্থূল দেহ অনেক ক্ষেত্রেই সূক্ষ¥ দেহের অধীন বা তার প্রতিচ্ছায়াও বলা যায়। এর সঙ্গে সম্পর্ক যত গভীর ও নিবীড় হয়, স্বপ্ন ততই স্মরণ থাকে ; এমন কি জাগরণ অবস্থায়ই স্বপ্ন দর্শন স্বাভাবিক হয়ে যায়। তখন স্বপ্ন আর স্বপ্নই নয় বরং বাস্তব হয়ে যায়। ঘুমন্ত অবস্থায়ও অনুরূপ চেতন থাকে। ঠিক উভয়চরের মতই। এর নামই চৈতন্য প্রাপ্তি। চৈতন্য প্রাপ্তি হলে অতীত ও ভবিষ্যতে ভ্রমণ করা যায় বা কাল একাকার হয়ে যায়। এই চেতনাপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এ যাবত ধর্মা-ধর্মের যাই করা হলো তা সবই পন্ডশ্রম অর্থাৎ কোন ছোয়াব বা পুণ্য (লাভ) হয়নি।
বস্তু, অবস্তু, জড় বা জীব প্রত্যেকেরই এই সূক্ষ¥ দেহ আছে। অধিকাংশ কাজ-কর্ম এই সূক্ষ¥ দেহ পূর্বে ঘটায় ; স্থূল দেহ অবিকল ও অতঃপর ঘটায় এবং এই সূক্ষ দেহই জ্বিন। উভয়ই ধর্মা-ধর্ম ও জন্ম- মৃত্যুর অধীন। এরা এক ও অভিন্ন, আবার ভিন্ন ও স্বতন্ত্র। স্থূল দেহের মৃত্যু মানেই সূক্ষ্ম জগতে জন্ম ; সূক্ষ্ম জগতের মৃত্যু মানেই স্থূল জগতে জন্ম। কোন জগতে কে কত মিনিট থেকে কতকাল থাকবে তা নির্ভর করে স্ব-স্ব চেতনা জ্ঞান, নূর বা ছোয়াব অধিকারের উপর, অর্থাৎ নূর বা জ্যোতি দেহের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
কোন একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে না পৌঁছা পর্যন্ত স্থূল থেকে সূক্ষ্ম ; সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে, জন্ম-মৃত্যুর এই চক্র জালের যাঁতাকলে অবিরত নিষ্পেষীত হতে হবে। অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর চক্রে অবিরত ঘুরতে থাকবে। এ কথাটিই আল্লাহ-রাছুল কোরানে বেশ কয়েকবার ঘোষণা করেছেন:
১. তুলিজ্বু ল্লাইলা-হিছাব। [৩: ২৭] অর্থ: তুমিই দিন থেকে রাতে এবং রাত থেকে দিনের জন্ম দান করো। তুমিই মৃতদের মধ্য থেকে জীবিতদের টেনে বার করো এবং জীবিতদের মধ্য থেকে মৃতদের টেনে বার করো। তুমি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত (দীর্ঘ) জীবন [নূর] দান কর। [ এসম্বন্ধে ‘জন্মান্তরবাদ’-এ প্রচুর আয়াত আছে]
মৃত্যু থেকেই জীবন, জীবন থেকেই মৃত্যু ; মরাগণ জীবীত হয়, জীবীতগণ মরে। এটাই প্রকৃতির জন্ম মৃত্যুর চক্র জাল। স্পষ্টভাবে এই তথ্যটি প্রায় সাত হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহ- রাছুুলগণ গীতায় ঘোষণা করেছেন, “হি জাতস্য মৃত্যু: ধ্রব মৃতস্য চ জন্ম ধ্রবং ; তাষ্মাত্ ত্বং শোচীতুং ন অহর্সি” [গীতা-শ্লোক-২৭] অর্থ: যে জন্মে তার মরণ নিশ্চিত, যে মরে তার জন্ম নিশ্চিত। সুতরাং অবশ্যাম্ভাবী বিষয় তোমার শোক করা উচিৎ নয়।
সাধক লালন শাহ্’র বাণী:
কত লক্ষ যোণী
ভ্রমণ করেছো তুমি
মানব দলে মনরে তুমি
এযে কি করিলে।
জ্যোতি জীবন দেহ:
স্থুলের মধ্যে সূক্ষ্ম ও সূক্ষ্মের মধ্যে জ্যোতি বা নূর দেহ ইহাই ‘সে‘ অর্থাৎ আল্লাহ। এই তিন দেহের সমাহারে একটি জীবন বা মানুষ। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে লীণ ; রূপ, স্ব-রূপ এক অভিন্ন ও অবিকল ; অথচ প্রত্যেকেই আবার স্বতন্ত্র ও ভিন্ন। এই জ্যোতি দেহের বর্ণনা আল্লাহ-রাছুল কোরানে নিুরূপ ইঙ্গিত দিয়েছেন:
আল্লাহু- আলীম। [২৪: ৩৫] অর্থ: আল্লাহ [উপাস্য] দৃশ্য-অদৃশ্যের বস্তু-অবস্তুর জ্যোতি বা জীবন। তাহার জ্যোতির পরিচয়, যেন একটি দ্বীপাধার, যাহার মধ্যে আছে একটি প্রদ্বীপ। প্রদ্বীপটি একটি কাচের চিমনির মধ্যে স্থাপিত ; কাচের চিমনিটি একটি উজ্জল নক্ষত্র সাদৃশ্য ; ইহা প্রজ্জলিত হয় পুত পবিত্র জয়তুনের তেল দ্বারা, যাহা সৃষ্ট কোন তেল নয়। অগ্নি সংযোগ ছাড়াই উহা উজ্জ্বল জ্যোতি প্রদান করে। জ্যোতির উপরে জ্যোতি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এই জীবনের জীবন, জ্যোতিদেহ [আল্লাহ] সম্বন্ধে জ্ঞান দান করেন। মানুষের বোঝার জন্য আল্লাহ নানা রকমের উপমা দিয়ে থাকেন। আল্লাহ সর্ব বিষয় সর্বজ্ঞ।
সংক্ষেপে এরাই ক্ষমতাভেদে যথাক্রমে: ইনছান, জ্বীন-ফেরেস্তা, আল্লাহ; অর্থাৎ স্থূল মানুষ, সূক্ষ্ম মানুষ ও জ্যোতি মানুষ ; এরা ধনাত্বক দল। স্থুল ও সূক্ষ্ম দেহধারী জীবিত ও মৃত অবাধ্য, অনিষ্টকারীগণই শয়তান ; শয়তান অর্থ: বিদ্রোহী, ধ্বংসকারী, অবাধ্য; এদের মধ্যে ‘সে’ বা জ্যোতি মানুষ অবলুপ্ত, অকর্মণ্য বিধায় এরা ঋণাত্বক দল। অর্থাৎ একদল সৃষ্টির বিকাশ-প্রকাশ ঘটায় ; অন্য দল তা পুনঃ গোপন করে অর্থাৎ ধংসের লীলা ঘটায়। বিষয়টা মুখ ও পাছার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যেমন: মুখ যা গ্রহণ করে, পাছা কালের বিবর্তন ক্রিায়ায় উহাই ত্যাগ করে। ফলে ‘আমি’র অস্তিত্ব বজায় থাকে। আবর্তন-বিবর্তন, লয়-প্রলয়, সৃষ্টি-ধ্বংস, ধর্মাধর্ম সবই স্থুল ও সূক্ষ্ম জগৎ ব্যপীয়া, সে বা নূর জগতে এর কোন বালাই নেই।
বিজ্ঞানীগণ (আউলিয়াগণ) যখন প্রকৃতির মূখ ও পাছার সন্ধান পাবেন তখন বিগ ব্যাং ও ব্লাক হোল এর ধারণা সুত্র পরিবর্তিত হয়ে অকল্পনীয় জ্ঞান ও মহাকাল ও কল্যাণের সুত্র আবিষ্কারে সক্ষম হবেন।
‘আমি’, ‘তুমি’, ‘সে’ দ্বারা হিন্দু, মোসলেম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ইত্যাদি পার্থক্য করেনা। ইহা মহাপ্রকৃতি গ্রন্থ, সৃষ্টি তথ্য ও তত্ত্বের সন্দেহাতীত কালোত্তীর্ণ সুত্র।
প্রেরণাপ্রাপ্ত মজিবুল হকের বাণী:
আলিফ লাম মিম
Is the only way
To be seen
To reach the position
You all dream.
সুতরাং সৃষ্টির ধর্ম:
১. অদৃশ্যের ধর্ম দৃশ্যতর হওয়া।
২. দৃশ্য, জড় বা বস্তুর ধর্ম জীবন।
৩. জীবের ধর্ম স্বয়ংক্রিয় জীবন।
৪. স্বয়ংক্রিয় জীবের ধর্ম মনুষ্যজাতে পদার্পণ।
৫. মনুষ্য জাতের ধর্ম জ্যোতি বা নূর দেহ বা আল্লাহময় (রাব্বানী) হওয়া।
৬. আল্লাহ বা অদৃশ্যের লক্ষ্য পুনঃ দৃশ্য হওয়া।
এ সুত্রই কোরান কালাকাল যাবত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষনা করে:
হু অল আউয়ালু অল আখিরু অজ্বাহিরু
অল বাতিনু অহুঅ কুল্লি সাইয়ীন আলীম
অর্থ:
‘সে’ই শুরু ‘সে’ই শেষ;
‘সে’ই প্রকাশ, ‘সে’ই গোপন
এবং ‘সে’ই সর্ব জ্ঞানের আঁধার।
অর্থাৎ একাকার সর্বেশ্বরবাদই সকল ধর্মের মূল ধর্ম। শেষ।
বিনীত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



