নামাজের ওয়াক্তের সংখ্যা নিয়ে দল-উপদলের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে এবং সমূহ মতবিরোধগুলো প্রধানত স্ব স্ব হাদিছের অনুসরণে প্রতিষ্ঠিত।
ছুন্নী সমাজে প্রধানত ৫ ওয়াক্ত অতঃপর বেতেরসহ ৬ ওয়াক্ত নির্ধারিত আছে; অতঃপর অতিরিক্ত তাহাজ্জুদসহ ৭ ওয়াক্ত। ইহা ছাড়াও তারাবী, কসুফ, খসুফ, চাসত্, আশুরা, জায়নামাজ, জানাজা ও শোকরীয়া ইত্যাদি নফল মিলে প্রায় শ’খানেক নামাজ আছে! তা’ছাড়াও ফরজের পাশাপাশি ছুন্নত হিসেবে আরও ৫ ওয়াক্ত, প্রধানত: উল্লেখযোগ্য ১০/১২ ওয়াক্ত! এখানে বলে রাখা ভালো যে, হুযুরদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে বলে ‘৬ষ্ঠ ওয়াক্ত বেতের’ এশার সঙ্গে যুক্ত করে ৬ ওয়াক্তের নামাজ ৫ ওয়াক্তে সারে। অনুরূপ হাস্যকরভাবে শিয়াদের একটি উপদল ৫ ওয়াক্তের নামাজ ৩ ওয়াক্তে সারে। ওয়াক্তের সংখ্যার পার্থক্য ছাড়া শিয়া-ছুন্নী ও আহ্মদিয়াদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতায় কম-বেশি পার্থক্য থাকলেও তা একেবারেই গৌণ; তবে পার্থক্য পার্থক্যই। প্রধানত কোরানে ৩/ ৫/ ১০/১২ বা অগুণতি ওয়াক্তের কোনো প্রমাণ নেই।
নিম্নের সংক্ষিপ্ত আয়াতগুলো হিসাব-নিকাশ করলে পাঠকগণ ওয়াক্তের সংখ্যা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হতে পারেন; অবশ্য যদি আল্লাহর কেতাবের সঙ্গে মনুষ্যরচিত কেতাবের শরিক করা না হয়:
১. সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত; আর ফজরের সময় কোরান তেলাওয়াত করুন-। আর রাত্র জাগরণ করুণ; আপনার জন্য এ হচ্ছে অতিরিক্ত (নফল) ফরজ। কারণ আল্লাহ চান আপনাকে সর্বোচ্যে সমাসীন করতে। [১৭: বনিইস্রাইল-৭৮, ৭৯]
২. ছালাত করবে: দিনের দুই প্রান্তভাগ পর্যন্ত ও রজনীর প্রথমাংশে-। [১১: হুদ-১১৪]
(২০৫)
৩. এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং রাত্রিকালে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং দিবসের প্রান্ত পর্যন্ত। [২০: ত্বাহা-১৩০]
৪. সুতরাং তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর সন্ধ্যায় ও প্রভাতে। [৩০: রূম-১৭]
৫. এবং অপরাহ্ণে [আশিয়ান] ও জুহরের [তুজহেরুনা] সময়; [৩০: রূম-১৮]
৬. এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে। [৩৩: আহযাব-৪২]
৭. -তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর সূর্য়োদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে। তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর রাতের একাংশে এবং সেজদার পরে। [৫০: কাফ-৩৯, ৪০]
৮. এবং তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর সকাল ও সন্ধ্যায়; রাত্রির কিয়দংশে তার প্রতি সিজদাবনত হও এবং রাত্রির দীর্ঘ সময় তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর। [৭৬: দাহর-২৫, ২৬]
৯. -দাস-দাসিগণ ও অপ্রাপ্ত বয়স্কগণ তোমাদের ঘরে প্রবেশ করতে ৩ টি সময় যেন অনুমতি গ্রহণ করে ; ১. ফজরের ছালাতের পূর্বে ২. দ্বিপ্রহরে, যখন তোমরা জামা-কাপড় খুলে রাখ ৩. ইশার ছালাতের পর-। [২৪: নূর-৫৮]
১০. এবং তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর রাত থেকে (মিনাল্লাইল) ও তারকার অস্তগমনের পর। [৫২: তুর-৪৯]
১১. তোমরা সালাতের ওপর/প্রতি যত্নবান হবে, বিশেষত মধ্যবর্তী সালাতের এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা বিনীতভাবে দাঁড়াবে। [২: বাকারা-২৩৮]
উল্লিখিত ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী ওয়াক্তের সংখ্যা নিরূপণ
১-১: এখানে ‘ছালাত’ শব্দটি আছে। আয়াতে সূর্য হেলা থেকে অর্থাৎ ১২টার পর থেকে শুরু করে ঘন অন্ধকার বা আনুমানিক রাত ৮/৯টা পর্যন্ত দীর্ঘ একটি ওয়াক্ত পাওয়া যায়; কিন্তু কর্মবহুল জীবনে তা কোনো প্রকারেই সাধারণের পক্ষে সম্ভব নয় এবং কেউ তা করেও না; সুতরাং ‘সূর্য হেলে পরার পর থেকে’ মানেই সূর্য হেলা শেষ হলে পরে অর্থাৎ যাকে প্রচলিত মাগরিব বলা হয়; কিন্তু শরিয়ত সম্ভবত ইহাকে ‘আছর’ সাব্যস্ত করে; আর সকালবেলার পাঠ বা কোরান পাঠ বিশেষভাবে হৃদয়ঙ্গম হয়; তথাপি এখানে মাগরিব ও ফজর এই ২টি ওয়াক্তের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
ক. এখানে ‘ছালাত’ শব্দটি নেই। অতিরিক্ত হিসেবে গভীর রাত (তাহাজ্জুদ) পর্যন্ত ধ্যান/সাধনায় রত থাকার ইংগিত আছে, যা এশা নামে প্রচলিত। কিন্তু নির্দেশটা একমাত্র রাছুলের জন্যই বলে মনে হয়; তবে যারা রাছুলের মতোই প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় (চিন্তার বিষয়) তারাও তা অতিরিক্ত হিসেবে অনুসরণ করতে পারে।
২-২: এখানে ‘ছালাত’ শব্দ আছে। আয়াতের মূল শব্দ ‘তারাফিন্নাহার ও যুলাফাম্মিনাল্লাইল;’ যথাক্রমে দিনের দুই প্রান্ত ও রাতের নৈকট্য বা কিছু অংশ বুঝায়; অর্থাৎ দিনের দুই প্রান্তের শেষ অংশে রাতের সামান্য অংশ পর্যন্ত । মূলত: শব্দদ্বয়
একক ভাবার্থের বিপরীতার্থক শব্দ; অর্থাৎ দিন-রাতের দুই প্রান্ত অর্থাৎ ফজর ও মাগরিব ওয়াক্তের কথাই স্পষ্ট। কারণ ৫/১০ মিনিটের নামাজের কথা কোরানে নেই।
পক্ষান্তরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনূদিত কোরানে লেখা আছে: দিনের প্রথম প্রান্তভাগে ফজরের ছালাত, দ্বিতীয় প্রান্তভাগে জুহর ও আছরের ছালাত এবং রাতের প্রথমাংশে মাগরিব ও ইশার ছালাত। মোট এই পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরজ- (সূত্র: ১১: ১১৪ নং আয়াতের ফুটনোট নং-১০৮- ইবনে কাছীর; ই. ফা.।)
হতাশার বিষয় যে, উল্লিখিত ব্যক্তি বা দলীয় তফছির/ফতোয়ার সঙ্গে আলোচ্য আয়াতের কোনোই সম্পর্ক নেই; জুহর, আছর বা ইশা আরবি শব্দত্রয়ও সেখানে নেই।
৩-৩: এখানে ‘ছালাত’ শব্দ নেই। তবুও গত আয়াতের আলোকে ছালাতেরই ইঙ্গিত সঙ্গত বটে! আয়াতে ‘তুলুএস সামছ ও গুরুবেহা’র অর্থ সূর্যোদয় ও অস্তাচল সময় অর্থাৎ ফজর ও মাগরিব।
তারপর আবার সেই একই কথার ভিন্নভাবের পুনরাবৃত্তি মাত্র: ‘আনাইল্লাইলে বা রাতের অংশ, আতরাফান্নাহার বা ‘দিনের কিনারায়’ অর্থাৎ ফজর ও মাগরিব।
কিন্তু এখানেও ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনূদিত কোরানে লেখা আছে: সূর্যোদয়ের পূর্বে ফজর, সূর্যাস্তের পূর্বে আছর রাত্রিকালে মাগরিব ও ইশা এবং দিনের প্রান্তে অর্থাৎ সূর্য পশ্চিমে হেলে যাওয়ার পরে জুহর এই পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের বিবরণ এখানে দেওয়া হইয়াছে (সূত্র: ২০: ১৩০ আয়াতের ফুটনোট নং-৪৮৯; ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ)।
উদ্বেগের বিষয় যে, পূর্ববৎ ফতোয়াটির সঙ্গে আয়াতের কোনোই যুক্তি-সমর্থন নেই; সম্ভবত: শরিয়ত হাদিছে বর্ণিত ৫ ওয়াক্ত রক্ষার জন্য ব্যর্থ চেষ্টা করেছে।
৪-৪: এখানেও ‘ছালাত’ শব্দ নেই। তুমছুনা ও তুছবিহুন (ছোবহ): সন্ধ্যায় ও প্রভাতে, অর্থাৎ ফজর ও মাগরিব।
৫-৫: এখানেও ‘ ছালাত’ শব্দ নেই। লক্ষণীয় যে, ব্রাকেটে আসিয়ান অর্থ: সন্ধ্যা বা দিনের শেষ প্রান্ত অর্থাৎ মাগরিব (দ্র: আধুনিক আরবি-বাংলা অভিধান, মা. মুহিউদ্দীন খান) এবং তুজহেরুন বা জাহের, জাহির, এজহার এর অসংখ্য অর্থের মধ্যে প্রধান অর্থ: প্রকাশ, স্পষ্ট, পরিষ্কার, বাহির, আবির্ভাব; জাহিরা/জাহিরাতুন= মধ্যদিন (যা আয়াতে নেই) (দ্র: আরবি-ইংরাজি অভিধান, জে এম কাউয়ান; দ্বিপ্রহর, পরবর্তী সময় (দ্র: আরবি-বাংলা অভিধান, মা. মুহিউদ্দীন খান)
বর্ণিত অর্থ এবং অন্যান্য আয়াতের আলোকে ‘জাহের’ অর্থে সূর্যের প্রকাশ বা ভোরকেই বুঝা অধিক সঙ্গত; দর্শনটির পক্ষে অতিরিক্ত সাক্ষি: মা আমিনার গর্ভ থেকে মুহাম্মদকে প্রকাশ/বের হয়ে আসার জন্য প্রসূতি ঘরে উপস্থিত ফেরেস্তাগণ ‘এজহার ইয়া রাছুলাল্লাহ’ বলে শ্লোগান দিয়েছিল! যা আজও প্রচলিত মিলাদে অনুকরণ করা হয়। সুতরাং এখানেও পাওয়া যায়: ফজর ও মাগরিব।
৬-৬: এখানেও ‘ ছালাত’ শব্দ নেই। ওয়াক্ত পাওয়া যায়: ফজর ও মাগরিব।
(২০৭)
৭-৭: এখানেও ‘ ছালাত’ শব্দ নেই। অনুবাদটি কিছুটা রূপক মনে হয়; তবে ফজর-মাগরিব স্বচ্ছ; পরবর্তী আয়াতে ‘মিনাল্লাইলে ফাছাব্বেহ,’ রাত বা রাত থেকে তার পবিত্রতা জপ কর; অনুবাদে ‘রাতের কিছু অংশ’ মূল আয়াতে নেই; তবে ১ নং আয়াতের মতো ঐচ্ছিক তাহাজ্জুদকে ইঙ্গিত করতে পারে।
৮-৮: এখানেও ‘ ছালাত’ শব্দ নেই। ওয়াক্ত পাওয়া যায়: ‘বুকরাত-আছীল বা সকাল-সন্ধ্যা অর্থাৎ ফজর-মাগরিব। অতঃপর ১ নং আয়াতের মতোই বলা হয়েছে: ‘রাতের দীর্ঘ সময়’ বিনয়াবনত হয়ে একাগ্রচিত্তে সাধনায় মশগুল থাকতে, রাছুল যেমন হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানে মগ্ন থাকতেন।
৯-৯: এখানে ‘ছালাত’ শব্দটি আছে। সকাল-সন্ধ্যাকালীন (ইশা=দ্র: ৫/৫ নং) নামাজ অর্থাৎ: ফজর ও মাগরিব।
১০-১০: এখানেও ‘ ছালাত’ শব্দ নেই। -রাত থেকে অর্থাৎ রাতের শুরু থেকে এবং তারকারাজির অস্ত গমনের পর অর্থাৎ: ফজর ও মাগরিব।
১১-১১: এখানে ‘ ছালাত’ শব্দটি আছে। অতীব লক্ষণীয় যে, আয়াতটিতে মধ্যবর্তী ওয়াক্তের কথা বলা হয়নি! বলা হয়েছে মধ্যবর্তী ছালাতের কথা! আরও লক্ষণীয় যে,ব্যবহৃত ‘বিশেষত বা স্পেসাল’ শব্দটি মূল আয়াতে নেই। তবুও সকল অনুবাদকগণ ঐ গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি কোন্ যুক্তিতে যুক্ত করেছেন তা বোধগম্য নয়।
‘মধ্যবর্তী ছালাত’ বলতে: ছালাতের মধ্যে যা বলা হয় তা রক্ষা করতে বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে দল-উপদলীয় মুছলমানগণ কেউ কেউ ৩/৫/৭ ইত্যাদি বেজোড় ওয়াক্ত নির্ধারণ করে বিশেষ ছোয়াবের আশায় মাঝের ওয়াক্ত রক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয় এবং সে অনুসারে চাকুরির মহান দায়িত্ব ছেড়ে মসজিদে হাজির হয়। সুতরাং আয়াতটি মূলার্থ সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া দরকার। তাছাড়া এক বা একাধিক নামাজের মধ্যের বিষয়বস্তু বা বক্তব্য রক্ষা না করে মাত্র মধ্যের ওয়াক্ত বা হাজার ওয়াক্ত রক্ষায় কোনোই অর্থ বহন করে না, বরং মুনাফিকের পর্যায় ফেলে দেয়।------।
বিনীত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



