"তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা কিছু নাযিল হয়েছে তা অনুসরণ কর। সেই রবকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে পৃষ্ঠপোষক গণ্য করে তাদের অনুসরণ করো না।"
(সুরা আল আ'রাফ : ৩)
প্রসঙ্গ : ড. ইউনূস ও তার দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়ন
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিশেষ অভিধায় অভিহিত করেছেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। যখন বলেছিলেন তখন তিনি অবশ্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। ছিলেন দেশ, জাতি ও গণতন্ত্র বিরোধী এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী গোষ্ঠী ‘উদ্দিন সাহেবদের’ ধাওয়ার মুখে।
ড. ইউনূস গিয়ে ‘উদ্দিন সাহেবদের’ পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। লম্বা অনেক কথা শোনানোর চেষ্টা করেছিলেন। সেসব কথার মধ্যে রাজনীতি ছিল। ‘নাশ’ নামে একটি দল গঠনের কসরতও করেছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল যেন আওয়ামী শিবিরের ‘নিয়ে আসা’ উদ্দিন সাহেবরা নেত্রীর হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছেন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস শেখ হাসিনার বিকল্প ও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছেন। এতেই তেঁতে উঠেছিলেন শেখ হাসিনা। ড. ইউনূসকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে বিশেষ অভিধায় অভিহিত করে বলেছিলেন, এদের দিয়ে দেশ চালানো যাবে না। অকারণে কথাটা বলেননি শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ আছে। তিনি জানেন, ড. ইউনূস কতটা নিষ্ঠুরভাবে দরিদ্র জনগণকে সুদের বেড়াজালে আটকে ফেলেছেন। কতটা নিষ্ঠুরভাবে জনগণকে শোষণ করছেন।
শেখ হাসিনার কথার ধাক্কাতেই কি না সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু ড. ইউনূস সেবার রাজনীতির মাঠ থেকে রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে কেটে পড়েছিলেন।
কিন্তু সেটা ছিল তার দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ মাত্র। মনে-প্রাণে তিনি যে রাজনীতি করতে চান এবং সে উদ্দেশ্যের মধ্যে যে বাংলাদেশের জন্য কোনো কল্যাণ চিন্তা নেই, এ ব্যাপারে আবারও প্রমাণ দিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ‘উদ্দিন সাহেবদের’ পাশে দাঁড়িয়ে নয়, এবার তিনি গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সম্প্রসারণবাদী ভারতীয়দের পাশে।
এমন সুযোগ অবশ্য সবার ভাগ্যে জোটে না, জোটে কারো কারো ভাগ্যে ভারত যাদের ‘নিজের মানুষ’ মনে করে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস তেমন একজন ‘সৌভাগ্যবান’ ব্যক্তি। তিনি অর্থনীতির আরো সহজ কথায় সুদসর্বস্ব ব্যবসা-বাণিজ্যের, কিন্তু গেছেন রাজনৈতিক তত্ত্ব ‘উগলে’ দিতে। কেউ যখন অন্যের মনের কথা নিজের বলে চালাতে যায় তখন বিষয়টিকে ‘উগলে’ দেয়া বলা হয়। বাংলাদেশে নয়, এই ‘উগলে’ দেয়ার কাজটি ড. ইউনূস করেছেন ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিতে। তাও আবার যেন-তেন ধরনের কোনো অনুষ্ঠানে নয়, ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভার যৌথ অধিবেশনে। গত ৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সে অধিবেশনে তাকে হীরেন মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বার্ষিক স্মারক বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। হীরেন মুখোপাধ্যায় রাজনীতিবিদ ছিলেন বলেই সম্ভবত সুদসর্বস্ব ব্যবসা-বাণিজ্যের মানুষ হয়েও ড. ইউনূস রাজনীতিকে বিষয়বস্তু বানিয়েছেন। মনের ভেতরে বিশেষ উদ্দেশ্য থাকায় হাস্যকরভাবে রাজনীতির অঙ্গনে পায়চারি করেছেন।
সেটা তিনি করতেই পারেন, কিন্তু আপত্তি উঠেছে তার মূল পরিকল্পনার কারণে। ভারতের পার্লামেন্টে দেয়া ওই স্মারক বক্তৃতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়ন গড়ে তুলতে হবে। এটা হবে এমন এক ইউনিয়ন, যার একটি মাত্র পতাকা থাকবে। সেখানে চলবে একই মুদ্রা। ইউনিয়নের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে হলে কোনো দেশের নাগরিকেরই ভিসা লাগবে না। সীমান্তে বা বিমান বন্দরে কাস্টমসের কোনো লোকজন থাকবে না।
পররাষ্ট্র তথা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নীতি হবে অভিন্ন। অর্থাৎ ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একই পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা হবে। ড. ইউনূস আরো বলেছেন, ২০৩০ সালের পর তার পরিকল্পিত দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়নে নাকি একজন দরিদ্র মানুষকেও খুঁজে পাবে না! কারণ, ওই ইউনিয়ন এমন এক অর্থ ব্যবস্খা বেছে নেবে, যার নাম ‘সামাজিক ব্যবসা’। গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে ড. ইউনূস যে সুদের কারবার চালাচ্ছেন এবং ব্যবসায় শনৈ শনৈ উন্নতি করছেন, তারই নতুন সংস্করণ হবে সামাজিক ব্যবসা। প্রতিটি নাগরিকই নাকি এক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসবে এবং একজন মানুষকেও নাকি চাকরি করতে হবে না! রাজনৈতিক অর্থে ঠাট্টার একটা সীমা থাকা উচিত। কারণ, চাকরি করার মতো মানুষ না পাওয়া গেলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারা চালাবে? শিল্প-কারখানার শ্রমিকরা কি হাওয়ায় ভেসে আসবে? নাকি উৎপাদন বলে কিছুই থাকবে না সে ইউনিয়নে? কারণ, একজন ব্যক্তি বড়জোর একটি পানের দোকান চালাতে পারে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা চালাতে হলে অবশ্যই বহু মানুষের তথা শ্রমিকের দরকার পড়ে। ড. ইউনূস পুঁজিবাদেরও কঠোর সমালোচনা করেছেন।
কারণ, পুঁজিবাদ সর্বোচ্চ পরিমাণ মুনাফা অর্জনকে প্রধান লক্ষ্য করেছে। অন্যদিকে ড. ইউনূসের প্রেসক্রিপশন হলো, সামাজিক ব্যবসার আড়ালে গ্রামীণ ব্যাংকের মতো নিষ্ঠুর সুদের ব্যবসা যেন তিনি সর্বোচ্চ পরিমাণ সুদও খান না! তিনি অবশ্য বলেননি যে, তার পরিকল্পিত দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়নে প্রত্যেককেই সুদের ব্যবসা করতে হবে। বলেননি কারণ, এখনই তিনি ‘ধরা’ পড়তে চান না।
ভারতীয়রা খুশি হলেও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই রাজনৈতিক তত্ত্ব তথা পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। এর একটি আশু কারণ হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ঠিক প্রাক্কালে এ ধরনের বক্তব্য রেখে ড. ইউনূস প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলোকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তার ভাবখানা ছিল এরকম যেখানে মাত্র ২০ বছরের মধ্যে একই ইউনিয়নের পতাকাতলে বসবাস করতে হবে সেখানে নেতা রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে দরকষাকষি করার এবং তিক্ততা বাড়ানোর কোনো অর্থ হয় না! বাংলাদেশের বরং ভারতের কথা মতো চলা এবং ভারতকে সবকিছু দিয়ে দেয়া উচিত!
উল্লেখ্য, ‘উদ্দিন সাহেবদের’ আমলেও এই একই ড. ইউনূস চট্টগ্রাম বন্দর ভারতের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার সুপারিশ করেছিলেন। তখন তিনি বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়েছিলেন যেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষই তার মতো মুনাফার কথা শুনলেই তারা লাফিয়ে উঠবে!
নিজের পরিকল্পনাকে শক্তি যোগানোর উদ্দেশ্যে উদাহরণ দিতে গিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইউরোপীয় ইউনিয়নের কথা বলেছেন। তিনিই প্রথম নন, এ দেশের অন্য অনেক ভারতপন্থীও কথায় কথায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদাহরণ তুলে ধরেন। কিন্তু যেহেতু ভারতের স্বার্থে ভূমিকা পালন করছেন সেহেতু তারা কিছু সত্য পাশ কাটিয়ে যান, অনেক কঠিন সত্যের উল্লেখ করেন না। যেমন তারা বলেন না যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কোনো রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রের জন্য থ্রেট বা হুমকি নয়। প্রতিটি রাষ্ট্রেরই রয়েছে একই ধরনের ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এসব দেশের কোনোটি পরাজিত হয়েছিল, কোনোটি হয়েছিল বিজয়ী। কিন্তু বিজয়ী-পরাজিত নির্বিশেষে প্রতিটি রাষ্ট্রই বিশ্বযুদ্ধের ধকল সামলাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিল। দেশগুলো আসলে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে এসব দেশের জন্য কমন এনিমি বা হুমকি হয়ে উঠেছিল অধুনালুপ্ত সোভিয়েট ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া)। বস্তুত সোভিয়েট ভীতিই দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে দেশগুলো একটি একক ইউনিয়ন গঠনের দিকে পা বাড়িয়েছিল।
কিন্তু সেটাও রাতারাতি কিংবা ইউনূসের পরিকল্পিত ২০ বছরের মধ্যে হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের লক্ষ্য নিয়ে ২৭টি দেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫১ সালে। তারা প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৯২ সালে স্বাক্ষরিত ম্যাসট্রিস চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রাতিষ্ঠানিক অবস্খানে পৌঁছেছে। সবশেষে ২০০৭ সালে স্বাক্ষরিত লিসবন চুক্তির ভিত্তিতে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে ইউনিয়ন।
অর্থাৎ শুরুর সময় থেকে দীর্ঘ ৫৬টি বছর সময় লেগেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন করতে। আর ড. ইউনূস চাচ্ছেন মাত্র ২০ বছরের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়াকে তিনি স্বর্গের কাছাকাছি অবস্খানে নিয়ে যাবেন!
বলা দরকার, ড. ইউনূসরা সুকৌশলে এড়িয়ে গেলেও ইইউভুক্ত প্রতিটি দেশ কিন্তু এখনো ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাসহ সকল বিষয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্খান বজায় রেখে চলেছে। ইউরো নামের একক মুদ্রার প্রচলন করা হলেও প্রতিটি দেশের রয়েছে নিজস্ব মুদ্রা। যেমন ব্রিটেনে এখনো পাউন্ড-স্টার্লিংই প্রধান মুদ্রা। একই ট্রেন সকল দেশের মধ্য দিয়ে চলাচল করলেও এক দেশের চালককে অন্য দেশে ট্রেন চালাতে দেয়া হয় না। ব্রিটেনের চালকরা ফন্সান্সের সীমান্তে গিয়ে নেমে পড়ে, চালকের আসনে গিয়ে বসে ফন্সান্সের চালকরা। তাদের আবার জার্মানির সীমান্তে গিয়ে নেমে পড়তে হয়। সেখানে দায়িত্ব নেয় জার্মান চালকরা।
এভাবে সমানে সমানে তথা স্বতন্ত্র অবস্খান বজায় রেখে চলেছে বলেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্খাই প্রায় এক রকম। সবাই সমৃদ্ধ। তাদের মাথাপিছু আয় ৩০ হাজার ডলারের ওপরে ভারতে বা বাংলাদেশে যা কল্পনাই করা যায় না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস কিন্তু তেমন কোনো ইউনিয়নের কথা বলেননি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদাহরণ টানলেও তিনি বলেননি যে, তার পরিকল্পিত দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়ন গঠন করা হলে বাস্তবে তা হয়ে উঠবে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন। ড. ইউনূসের পরিকল্পিত ইউনিয়নে জাপান ও কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোকে রাখা হয়নি। বিশাল দেশ গণচীনের কথাও বলেননি তিনি। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরও নেই তালিকায়। এর মধ্য দিয়েও ড. ইউনূসের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়েছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্পূর্ণ ‘ঋণ’ই তিনি প্রধানত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পরিশোধ করতে চাচ্ছেন! ড. ইউনূস যে ইউনয়নের প্রস্তাব রেখেছেন সেখানে সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ভুটান ও নেপাল। দুই মুসলিম রাষ্ট্র আফগানিস্তান ও পাকিস্তানও গুরুত্ব পায়নি তার কাছে।
দেশগুলোর পার্থক্য লক্ষ্য করা দরকার। যেমন ভারতের আয়তন যেখানে ১২ লাখ ৭০ হাজার বর্গমাইল সেখানে বাংলাদেশের আয়তন ৫৬ হাজার বর্গমাইল। মালদ্বীপের আয়তন আরো কম মাত্র ১১৫ বর্গমাইল।
ভারতের জনসংখ্যা যেখানে প্রায় ১২০ কোটি, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের জনসংখ্যা সেখানে যথাক্রমে ১৫ কোটি এবং তিন লাখ নয় হাজার! ভুটানের অবস্খা আরো খারাপ আয়তন ১৪ হাজার ৮২৪ বর্গমাইল এবং জনসংখ্যা মাত্র ছয় লাখ ৯৭ হাজার! এসব দেশের পক্ষে যে ভারতের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় সেকথা একমাত্র ড. ইউনূস ছাড়া সবাই বোঝেন!
বড় কথা, ভারত এমন একটি সম্প্রসারণবাদী দেশ যার সঙ্গে অন্য প্রতিটি দেশেরই নানামুখী সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত সমস্যার শেষ নেই। গঙ্গা ও তিস্তাসহ প্রধান নদ-নদীগুলোর পানিবন্টন, ফারাক্কাসহ কয়েক ডজন ভারতীয় বাঁধের ধ্বংসাত্মক কুফল, বাণিজ্য বৈষম্য কমানো, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, দক্ষিণ তালপট্টির মালিকানা, ছিটমহল এবং সীমান্ত সমস্যার মীমাংসা হয়নি ৩৯ বছরেও।
শেখ মুজিবুর রহমানের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও প্রভাবশালী নেতার সঙ্গেও ভারত প্রতারণা করেছে।
চুক্তি করে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। বাণিজ্য বৈষম্য কমানোর ঘোষণা দিলেও এ পর্যন্ত কোনো সরকারই কথা রাখেনি। সীমান্তে প্রতিদিন বাংলাদেশীদের হত্যা করছে বিএসএফ।
ভারতের সঙ্গে একই ধরনের সমস্যা রয়েছে প্রতিটি দেশেরই। এমন যেখানে সম্পর্ক সেখানে ভারতের নেতৃত্বে ইউনিয়ন গঠিত হলে বাংলাদেশসহ অন্য দেশগুলোর পরিণতি কেমন হতে পারে তা সহজেই কল্পনা করা যায়। কিন্তু সব জেনে-বুঝেও ড. ইউনূস ধ্বংসাত্মক সে পরিণতির দিকেই বাংলাদেশকে ঠেলে দিতে চেয়েছেন।
এখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিপরীত একটি উদাহরণেরও উল্লেখ করা দরকার। সে ইউনিয়নের নাম সোভিয়েট ইউনিয়ন। এটা রাশিয়ার নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সোভিয়েট ইউনিয়নও ড. ইউনূসের পরিকল্পিত দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়নের মতোই ছিল। সেখানে অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রের আলাদা পতাকা থাকলেও কাস্তে-হাতুড়ি মার্কা কমিউনিস্ট রাশিয়ার পতাকা ছিল একক পতাকা। কিন্তু সে ইউনিয়ন ৭৩ বছরের বেশি টেকেনি। রাশিয়ার সঙ্গে লাটভিয়া, আজারবাইজান, জর্জিয়া, তাজিকিস্তানের মতো ক্ষুদ্র দেশগুলো মানিয়ে নিতে পারেনি। রাশিয়া সবার ওপর খবরদারি করেছে, প্রতিটি রাষ্ট্রকে শোষণ করে শুধু নিজেকে স্ফীত করেছে। পারমাণবিক অস্ত্রের সামান্য ভাগও কোনো রাষ্ট্র পায়নি। সবই রাশিয়া নিয়েছে নিজের দখলে।
ড. ইউনূসের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশসহ অন্য সবারই অবস্খা হবে লাটভিয়া প্রভৃতির মতো। ফুলে ফেঁপে উঠবে শুধু ভারত।
তাছাড়া পাকিস্তানের প্রদেশ হিসেবেও তো বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা মোটেই প্রীতিকর নয়। এজন্যই মুসলিম রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশকে রীতিমতো যুদ্ধ করে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। সে দেশটিকেই ড. ইউনূস চাচ্ছেন ভারতের অধীনস্খ করে ফেলতে!
উল্লেখ্য, সোভিয়েট ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৫টি রাষ্ট্র। এই প্রক্রিয়াতেও রাশিয়া তার সম্প্রসারণবাদী তৎপরতা চালিয়েছে। চেচনিয়ার ভয়ংকর পরিণতির কথা স্মরণ করা দরকার। সেখানে রাশিয়ার রক্তক্ষয়ী অভিযানে হাজার হাজার মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে। ধ্বংস হয়ে গেছে রাজধানী গ্রোজনীসহ অসংখ্য শহর-নগর। চেচনিয়া এখনো স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশীয় ইউনিয়নের নামে ড. ইউনূস বাংলাদেশকেও চেচনিয়ার পরিণতির দিকেই ঠেলে দিতে চাচ্ছেন।
এমনটা কোনো দেশপ্রেমিকের পক্ষে চাওয়া বা কল্পনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ‘কৃতী সন্তান’ ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেটা শুধু চেয়েই থেমে যাননি, এজন্য আনুষ্ঠানিকভাবে পরিকল্পনাও হাজির করেছেন। তাও আবার ‘নেতা রাষ্ট্র’ ভারতের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়ে।
ড. ইউনূস আসলে সবকিছু ভালোভাবে জেনে-বুঝেই করেছেন। কারণ তিনি ‘সাধারণ’ মানুষ নন। এ ধরনের ব্যক্তিদের ‘ডাভোসম্যান’ বলা হয়। ডাভোস সুইজারল্যান্ডের একটি নগরীর নাম। এই ডাভোসকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্খাগুলো ঋণ ও সাহায্যের আড়ালে সুদের জমজমাট ব্যবসা চালাচ্ছে। সংস্খাগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। সুদের ব্যবসা শুধু নয়, এই ব্যবসা ও সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে দেশে দেশে তারা রাজনীতিতেও হস্তক্ষেপ করছে।
উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। পাঠকদের মনে পড়তে পারে, ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের এই ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সম্মেলনে বিভিন্ন মুসলিম দেশসহ শতাধিক দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশ নিয়েছেন। কিন্তু বেছে বেছে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ, আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এবং ইরাকের উপ-প্রধানমন্ত্রী বারহাম সালিহর সঙ্গেই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদকে বিবিসি’র এক প্যানেল আলোচনায় বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। বিষয়টি গুরুতর। কারণ, অন্য তিনটি দেশেই পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে ইসলামী উগ্রবাদীরা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল যদিও ইরাক ও আফগানিস্তানে আসলে সাম্রাজ্যবাদী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। দেশ তিনটির নেতাদের পরিচিতিও তাৎপর্যপূর্ণ।
ইরাক ও আফগানিস্তানে পশ্চিমাদের পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ওদিকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ যুক্তরাষ্ট্রের খাস সেবাদাস হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অমন তিনজন পুতুল ও সেবাদাসের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে এক কাতারে বসিয়ে দেয়ার ফলে ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের’ চোখে বাংলাদেশও একই ধরনের পরিচিতিতে পরিচিত হয়েছিল। অর্থাৎ ইসলামী উগ্রবাদীদের সশস্ত্র তৎপরতার কারণে বাংলাদেশকেও ওই তিনটি দেশের মতোই ‘বিপজ্জনক’ মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
সে কম্মটুকু করেছিল ডাভোস যা শুধু একটি নগরী নয় বরং সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে ইসলাম বিরোধী আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে যার প্রমাণিত পরিচিতি রয়েছে। হামিদ কারজাইদের সঙ্গে ফখরুদ্দিন আহমদকে বসিয়ে দিয়ে ডাভোসের বাংলাদেশ সম্পর্কিত পরিকল্পনার কথাও বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশও রয়েছে পশ্চিমাদের তালিকায়।
বস্তুত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মাধ্যমে দিল্লির পার্লামেন্টে ডাভোসের সে বার্তাটাই আবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের এই ‘কৃতী সন্তান’ সববিছু খোলাসা করে বলেছেন। ড. ইউনূসের মতো অর্থনীতিবিদ নামধারী সুদের ব্যবসায়ী-মহাজনরা প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্ব ব্যাংক-আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সুদখোর সংস্খাগুলোর অনুচর হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
রেহমান সোবহান থেকে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য পর্যন্ত আরো অনেক ‘ডাভোসম্যান’ রয়েছেন বাংলাদেশে। তারা নিজেদের কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের নাগরিক মনে করেন না। গোটা বিশ্বই তাদের রাষ্ট্র এবং তারা নাকি আন্তর্জাতিক নাগরিক! নিজেদের দেশ বঞ্চিত ও শোষিত হলেও, এমনকি স্বাধীন অস্তিত্ব হারিয়ে ফেললেও ড. ইউনূসদের তথা ‘ডাভোসম্যান’দের কিছুই যায়-আসে না। ‘ডাভোসম্যান’রা বুঝতেই পারেন না যে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফসহ বিভিন্ন সংস্খা এবং এসবের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রগুলো তাদের ‘চাকর-বাকরের’ মতো ব্যবহার করে। এই না বুঝতে পারার কারণ, মালিক-প্রভুদের সাহায্যে ও অনুগ্রহে ড. ইউনূসরা দারিদ্র্য বিমোচনের দোহাই দিয়ে সুদের ব্যবসা চালাতে পারছেন।
দরিদ্র মানুষ আরো বেশি দরিদ্র হলেও এবং ড. ইউনূসদের খপ্পরে পড়ে সহায়-সম্বল হারালেও রাজধানীতে তাদের বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। গরীব মানুষের অর্থে তারা নিজেদের স্ফীত করেছেন। অর্থাৎ সঠিক অর্থেই তারা ‘ডাভোসম্যান’ বনে গেছেন। এবার এসেছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ‘চাকর-বাকরের’ ভূমিকা পালন করার নির্দেশ। এজন্যই ড. ইউনূস ভারতের পার্লামেন্টে গিয়ে হাজির হয়েছেন। একই সূত্রে গাঁথা রয়েছে বলেই ভারতও তাকে সুযোগ দিয়েছে। ড. ইউনূস নিজের দেশকেও ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়ার ভয়ংকর উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি মিষ্টি-মধুর কথা শুনিয়েছেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ সংগ্রামী মানুষের দেশ যারা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে, লাখে লাখে প্রাণ দিয়েছে। এখানে দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে সুদের ব্যবসা চালানো যেতে পারে কিন্তু দেশ ও জাতিকে ধ্বংস করার চেষ্টার ফল ভালো হবে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

