একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, রুটি-রুজির যোগান।
আবুল কাশেম : একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, রুটি-রুজির যোগান। গত সোয়া এক বছরে দেশের প্রায় এক লাখ পাঁচ শ’ ৬৩টি মিল-কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ৪০ লাখ ৭৮ হাজার শ্রমিক। এক বছরে সরকারি সিদ্ধান্তে বন্ধ হয়েছে চারটি পাটকল। আর কাঁচামালের অভাবে বন্ধ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ চিনিকল। বন্ধ হওয়া শিল্প কারখানা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রায় সাড়ে চার শ’ গার্মেন্টস কারখানা, এক শ’ রি-রোলিং ও স্টিল মিলস, ৮০ হাজার মুরগির খামার, ২০ হাজার চাতাল, ঢাকার একটি পত্রিকা ও একটি টিভি চ্যানেল। চলতি মাসের মধ্যেই কাঁচামালের অভাবে আরও চিনিকলের বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, ওয়ান-ইলেভেনের প্রভাব ও সিডরের কারণে কোরবানি কম হওয়ায় তিন থেকে চার লাখ চামড়া কম পেয়েছেন তারা। দু’-তিন মাসের মধ্যে চামড়া আমদানি করতে না পারলে এ খাতেও বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার চিংড়িঘেরের বেশির ভাগই বন্ধ রয়েছে পুঁজির অভাবে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে মিল-কারখানা ও শিল্প খামার বন্ধ হওয়ার তালিকা আরও দীর্ঘ হবে। এমনিতেই দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ কমছে। সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতিও নিম্ন। এরই মধ্যে একের পর এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে বেকারত্ব আরও বাড়বে। শ্রমবাজারের হাহাকার ক্রমশ গ্রাস করবে দেশের কর্মজীবনকে।
বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের চারটি বৃহৎ পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে। এতে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন। বন্ধ হওয়া পাটকল চারটির মধ্যে রয়েছে সিরাজগঞ্জের কওমী জুট মিল, খুলনার পিপলস জুট মিল, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী জুট মিল ও ফোরাত কর্ণফুলী জুট মিল। এর মধ্যে খুলনার পিপলস জুট মিলে তিন হাজার তিন শ’ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। বিজেএমসি’র এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বন্ধ হওয়া পাটকলগুলোতে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক ছিলেন।
দেশের চিনিকলগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ চিনি শিল্প করপোরেশন সূত্র জানায়, দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে পাঁচটি কলই বন্ধ আছে কাঁচামালের অভাবে। বন্ধ হওয়া চিনিকলগুলোর মধ্যে রয়েছে সেতাবগঞ্জ সুগার মিল, শ্যামপুর সুগার মিল, রংপুর সুগার মিল, জয়পুরহাট সুগার মিল ও রাজশাহী সুগার মিল। এসব মিলে কর্মরত স্থায়ী শ্রমিকরা বেতন-ভাতা পেলেও চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ১২ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক। করপোরেশন জানায়, কাঁচামালের অভাবে বাকি মিলগুলোও দু’এক মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে। আখের মওসুম শুরু হলে আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে অবশ্য এসব মিল আবার চালু করা হবে।
দেশের বৃহত্তম শিল্পখাত তৈরী পোশাক শিল্পের (গার্মেন্টস সেক্টর) প্রায় সাড়ে চার শ’ কারখানা নানা কারণে বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার কমে যাওয়া, আস্থাহীনতা, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এসব কারখানা বন্ধ করছে মালিকপক্ষ। গত রোববার রাজধানীর রোকেয়া সরণির ইয়ং মিং গার্মেন্টস মালিক কারখানাটি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। গার্মেন্টসটিতে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। কয়েক মাস আগে তেজগাঁওয়ের পদ্মা কারখানা বন্ধ হয়। ওই কারখানায় প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক চাকরি করতেন। এছাড়া দেশের অন্যতম বৃহৎ কারখানা নাসা গার্মেন্টসও বন্ধ করে দেয় মালিকপক্ষ। গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ থাকা গার্মেন্টসগুলোর প্রত্যেকটিতে দু’ শ’ থেকে পাঁচ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন।
বাংলাদেশ রি-রোলিং স্টিল মিলস ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাসাদুল হক মাসুদ জানান, কাঁচামালের সঙ্কট আর উচ্চমূল্যের কারণে গত দুই বছরে তাদের শতাধিক রি-রোলিং স্টিল মিল বন্ধ হয়েছে। এতে ১০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আলী হোসেন জানান, কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হওয়া কারখানার সংখ্যা আরও বেশি। কাঁচামালের দাম কমানোসহ অভাব মেটাতে না পারলে বেশির ভাগ মিলই বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
বর্তমান সরকারের আমলেই একটি সংবাদপত্র ও একটি টিভি চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে। এ দু’টি হচ্ছে জেমকন গ্রুপের দৈনিক আজকের কাগজ ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন সিএসবি। প্রতিষ্ঠান দু’টির প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত হাজারেরও বেশি কর্মীর বেশির ভাগই এখনও বেকার রয়েছেন। এছাড়া মীনা বাজার নামে রাজধানীর ধানমন্ডি ও মালিবাগের দু’টি সুপার শপও বন্ধ হয়েছে এক বছরের মাথায়। এতে আরও পাঁচ শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন।
এদিকে গত এক বছরে দেশের ৪৭টি জেলায় ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ে বার্ড ফ্লু ভাইরাস। দেশের দু’শ’ ২৯টি খামারে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পায় পশু সম্পদ মন্ত্রণালয়। আর চার শ’ ৪২টি খামারের ১৩ লাখ হাঁস-মুরগি নিধন করে তারা। এতে বেকার হয়েছেন প্রায় ১৫ লাখ শ্রমিক। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আর সিনহা গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেজর (অব.) আতিকুল হাফিজ গতকাল জানান, বার্ড ফ্লু’র প্রভাবে দেশের ৬০ শতাংশ পোল্ট্রি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ৪০ শতাংশও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিনি বলেন, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৩০ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছে। তিনি জানান, দেশে প্রায় দেড় লাখের মতো ছোট-বড় পোল্ট্রি খামার ছিল। এতে ৫০ লাখ শ্রমিক কাজ করতেন। এদিকে ধানের অভাবে দেশের প্রায় ২০ হাজার চাতাল বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। গত আমন মওসুমে উৎপাদন কম হওয়ায় জানুয়ারি মাসেই বন্ধ হতে থাকে চাতালগুলো। প্রতিটি চাতালে গড়ে ১০ থেকে ৫০ জন শ্রমিক কাজ করতেন।
এছাড়া সিডরে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার চিংড়ির ঘের ধ্বংস হয়েছে। পুঁজির অভাবে তার বেশির ভাগই নতুন করে শুরু করা সম্ভব হয়নি।
শ্রমিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী প্রতিষ্ঠান বিলস জানায়, শুধু নির্মাণশিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা ১৫ লাখ। এর সঙ্গে কাঠমিস্ত্রী, রঙ মিস্ত্রিসহ অন্যান্য শ্রমিকদের হিসাবে আনলে সংখ্যা দাঁড়াবে ৫০ লাখেরও বেশি। তবে বর্তমান সরকারের সময় যে পরিমাণ নির্মাণকাজ হচ্ছে তাতে দুই লাখ শ্রমিকও কাজ পাচ্ছেন না। পুরো শীতকাল পার হলেও সরকার রাস্তা-ঘাটের উন্নয়নে প্রতিবারের মতো কাজ হাতে নেয়নি। নির্মাণশিল্পের দাম বাড়ায় বেসরকারি কার্যক্রমও স্থবির। রাজউকের অনুমোদন পাওয়ার পরও প্রায় ১৬ লাখ বাড়ির কাজ শুরু হচ্ছে না। রিহ্যাব-এর সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী তানভিরুল হক প্রবাল বলেন, নির্মাণশিল্পের দাম বাড়ায় শীতকালে ভবনের ভিত্তি স্থাপনের উপযুক্ত সময় হলেও এ মওসুমে কোন কাজ হয়নি। শ’ শ’ বাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি খুঁড়ে রাখা হয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম না কমায় কাজ শুরু হচ্ছে না। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হারও গত কয়েক বছরের তুলনায় সবচেয়ে কম। এতে প্রান্তিক লেবেলে অর্থের সরবরাহ হচ্ছে না। এজন্য প্রতিবারের তুলনায় চলতি বছর দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক কমে গেছে।
চামড়া কারখানা মালিক সমিতির মহাসচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, ওয়ান-ইলেভেন ও সিডরের কারণে এবার কোরবানির সময় তিন থেকে চার লাখ চামড়া কম পেয়েছেন তারা। মে মাসের মধ্যেই এসব চামড়া শেষ হয়ে যাবে। ওই সময়ের মধ্যে ভারত থেকে চামড়া আমদানিতে ব্যর্থ হলে তাদের বেশির ভাগ কারখানাই বন্ধ হয়ে যাবে।
বেকার শ্রম শক্তির বাজারে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় বেকারত্বের সংখ্যা আরও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। গত ১৩ই মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) জানায়, দেশে শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় সাত কোটি। এর মধ্যে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বেকার রয়েছেন। শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আনোয়ারুল ইকবাল ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদ (বিআইডিএস) প্রকাশিত স¤প্রতি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি, শিল্প ও নির্মাণ খাতে গত এক বছরে মানুষের আয়ের পরিমাণ দুই থেকে পাঁচ শতাংশ কমেছে। আর গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় গত ডিসেম্বরে মানুষের প্রকৃত আয় কমছে তিন দশমিক ৯৫ শতাংশ। এই সময়ে কৃষিখাতে শ্রমিকের মজুরি কমেছে চার দশমিক ছয় শতাংশ। ননফার্ম শ্রমিকদের মজুরি হার (ওয়েজ রেট অভ নন ফার্ম ওয়ার্কার্স)-২০০৭ জরিপে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানায়, এ ধরনের শ্রমিকের মজুরির পরিমাণ এক হাজার টাকা থেকে ছয় হাজার টাকার মধ্যে।
অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ জানান, মিল কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় মানুষের অবস্থা খুবই খারাপ। বিভিন্ন এলাকায় মানুষ জীবন্মৃত অবস্থায় রয়েছে। দারিদ্র্যের গভীরতাও বাড়ছে। তিনি বলেন, মিল-কারখানা বন্ধ হলে শুধু ওইসব প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীরাই বেকার হয় না আশপাশের দোকানদারসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। মিল-কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ব্যবসায়ীদের আস্থার অভাব, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, আমেরিকায় তৈরী পোশাকের বাজারেও মন্দা প্রধান কারণ। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে দেশীয় শিল্প-কারখানা রক্ষা ও বিনিয়োগ বাড়াতে আটকে রাখা ব্যবসায়ীদের মুক্তি দিতে হবে উল্লেখ করে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, সরকার বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেছে শুধু খাদ্যপণ্যের আমদানি বাড়াতে। তারা দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কিংবা বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বলেন, অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হলে ট্রুথ কমিশন গঠন করেই হোক বা অন্য কোন ভাবেই হোক ‘আনক্লিন ব্যবসায়ী’দের মুক্তি দিয়ে তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোসহ শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সরকার কিংবা দেশের পক্ষে কয়েক বছরেও ‘ক্লিন ব্যবসায়ী’ সৃষ্টি করা যাবে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



