somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তারা কজন সহযাত্রী

১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১১:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লং জার্নি তে আমার প্রথম পছন্দ ট্রেন। জানালা দিয়ে কু ঝিক ঝিক শব্দের তালে তালে অবারিত দিগন্ত, মেঠো পথ, আরও কতকিছু দেখা যায়। তাছাড়া ভেতরে অনেক স্পেসও পাওয়া যায়। কেও চাইলে এক বগি থেকে আরেক বগিতে হাঁটতেও পারে। একটা বগিতে কিছু মানুষ থাকে, যারা হন সহযাত্রী, থাকে কত বিচিত্রটা! মানুষ দেখতে এবং তাদের কর্ম কাণ্ড দেখা, আমার বড়ই পছন্দের। যদিও এবারের জার্নি টা ট্রেনের ছিল না, টিকেট না পাওয়ায় বাসের।

পেশাগত কারণে দুইদিনের জন্য ঢাকা আসতে হল। যারা লেখালিখি করে, তারা মনে হয় সব জায়গায় লেখার জন্য কিছুনা কিছু প্লট পেয়ে যান। আমার এই সংক্ষিপ্ত সফরে এমন কিছুই আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব। লিখে আমি আপনাদের কতটুকু আনন্দ এবং বিরক্তি এনে দিতে পারব জানি না, কিন্তু আমি বেজায় বিরক্ত হয়েছি। X(X(

বাসের সহযাত্রী নিয়ে আমি একটা রোমান্টিক গল্পে লিখেছিলাম, এই রকম বাস জার্নিতে, সহযাত্রী দুজন তরুণ তরুণীর মধ্যে খুব নাটকীয় ভাবে একটা ভাবের সূচনা হয়। ঐ গল্পটি লেখার পর, এটাই ছিল আমার প্রথম বাস জার্নি। তাই খুব আশা নিয়ে আমিও একলা ঢাকার পথে যাত্রা করলাম। মনে সদা ভীরু লাজ নিয়ে ভাবতে লাগলাম, কোন এক সুপুরুষ সাথে বসবে, কথা বলে বলে কাটিয়ে দেব সময়। :) :#> :#>

ঢাকা যাওয়ার বাসটি ছিল দুপুর তিনটা। আমার পাশের সিট টা খালিই ছিল। মনে আশা ছিল, সামনের কাউন্টারে নিশ্চয় সেই সুপুরুষের দেখা পাব। অবশেষে ভাটিয়ারী কাউন্টার থেকে এক সহযাত্রী উঠল, কি বলব মনের দুঃখ, সে এক পুঁচকে বালক! আর্মিতে সুযোগ পাওয়া সদ্য এক ক্যাডেট!! ছুটিতে বাড়ি ফিরছে। বয়সে সে আমার ছোট ভাইয়ের ও ছোট। আমার বাড়া ভাতে ছাই। X(X(
পরে ভাবলাম, গল্প করার জন্য সমবয়সী না হলেও চলে, সমমনা হওয়া টা জরুরী।

তার উপর আশে পাশে তাকিয়ে দেখি, সবার হাতে বই এর কলম। বুঁদ হয়ে পড়ছে সবাই! তার মানে আমি যে কাজে ঢাকা যাচ্ছি, বাসের অর্ধেক সহযাত্রী সেই উদ্দেশ্যেই যাচ্ছে। মেজাজ আরও বিলা হল। আমার মেজাজের চোটে সন্ধ্যা নেমে এল। সব পণ্ডিত গুলা আর পড়তে পারলনা, বাসেও বাতি জ্বলল না। আমি বেজায় খুশী।:D:D


আর্মি ছেলেপেলে গুলাকে কেমন যেন রোবট বানিয়ে ফেলে। ক্যাডেট পুঁচকে আমারে ম্যাম ম্যাম বলছে!! বড়ই অস্বস্তি! বললাম, “তুমি আপু ডাকতে পার।” সারা পথ আমারে সে ম্যাম ই ডাকল। এই ছেলে আর্মির মেনারস জনিত ট্রেনিং পুরোপুরি সফল ভাবে পাশ করবে শিওর!!:|:|

যাই হোক, যাওয়ার পথে আর বেশী কিছু হল না।।

এক বুক আশা নিয়ে একদিন পর আমি আবার বাড়ি ফিরব। বাস ছিল সকাল নয় টা। পুরো জার্নিতে দিনের আলো থাকবে, সব সহযাত্রী কে ভালো ভাবে দেখতে পাব, আর এইবার মনে হয় আমার সহযাত্রী কোন এক সুপুরুষ-ই হবে। পুরা কনফিডেন্ট আমি! :):)

অভাগা যেদিক যায়, পানি শুকিয়ে যায়। আমার পাশে বসল, এক অষ্টাদশী সুন্দরী। আমার পেছনের সিটে তার বোন দুলাভাই। শালীকার সহযাত্রী একজন মেয়ে দেখে বোন-দুলাভাই নিশ্চিন্তে তাই রে নাইরে নাই শুরু করল। দুলাভাই দাঁত কেলিয়ে বলল, “যাক ভালো হইচে!”:D:D

বুঝলাম না কিছুই, সর্বত্র জুনিয়ার ভাই বোন!! যা হোক, অনুরোধে সুন্দরী কে জানালার পাশের সিট ছেড়ে দিলাম।

বড় উদাস হয়ে সাথে থাকা একটা বই পড়া শুরু করলাম, এ পি জে কালামের “উইংস অফ ফায়ার।”

কিছুদূর না যেতেই সুন্দরী নিজের সব জানিয়ে ফেলল, সে সদ্য কলেজ পাশ করেছে, এখন ভর্তির জন্য এদিক সেদিক যাচ্ছে, তারপর খুবই লুতুপুতু- ন্যাকামি (টিনেজ দোষ আর কি) সুরে বলে বসল, “আপু কি করেন? ঢাকা কেন গেছিলেন? কার কাছে গেছিলেন? চিটাগং কই থাকেন? ”

খুব ই নিরস কণ্ঠে জবাব দিলাম। কিন্তু একী!! তার প্রশ্ন দেখি বেস্তানুপাতিক হারে বেড়েই যাচ্ছে!! এইবার শুরু করল ঘটক পাখী ভাই মার্কা প্রশ্ন, “আপনি কি সিঙ্গেল? ফ্যামিলি তে আর কে কে আছে? তারা কে কি করে?”

প্রশ্ন শুনে ঘুমের ভাব ধরে চোখ বন্ধ করলাম। |-) |-) |-) |-)

কিছুক্ষণ পর ফিস ফিস কি যেন শব্দ পেলাম। পাশে তাকিয়ে দেখি, এক (বোধ করি কক্সবাজারে যাবে, কারণ বাসটা চিটাগং হয়ে কক্সবাজারে যাবে) হানিমুন কাপল!! তাদের কথা আর কি বলব, সেন্সর হয়ে যাবে!! তাদের ভয়াবহ ভালোবাসা, যা স্থান, কাল, পাত্রও আটকিয়ে রাখতে পারে না; মানে তাদের ‘তুচ্ছ করি বাকী দুনিয়া’ মার্কা প্রেম দেখে মনের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আহারে!! 8-| 8-| 8-| 8-| ডানের একটা কবিতা রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করে বলেছিল, ‘’ দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর, ভালো বাসিবার দে মোরে।” এটা মনে করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম।

তার পরের সিটে বসেছে (বোধ করি) দুই বন্ধু। তারা তাদের নিয়েই যার পর নাই মুগ্ধ! শেয়ার বাজার নিয়ে তারা শুরু করছে মালের গোষ্ঠী উদ্ধার মিশন!! :-/:-/

আমার সিটটা মোটামুটি প্রথম সারির। তাই সবাইকে খুব একটা দেখা যায় না। অবশ্য আমার সামনের সিটেই চশমা পরা এক যুবক বসেছে। মোটামুটি চুপচাপ আছে। দেখতে জ্যান্তেল ম্যান টাইপের। আমার থেকে জিজ্ঞেস করে পেপার টাও নিয়েছে। মনে হয় ফোন নম্বর (আমার গল্পের আকাশের মতন) লিখে দেবে! ;);)

সুখ চিন্তা করে ভাবছি, আর তখনি পাশের সুন্দরীর ফোন আসল। ইয়া আল্লাহ্‌! কি হবে এই ডিজুস জাতির!! “এই জান, তুমি ঘুম থেকে উঠছ? ব্রাশ করছ? নাশ্তা খাইছ? আমি এইতো বাসে, চিন্তা করোনা পাশে একটা সুইট আপু বসেছে। হি হি !” চিক্কুর দিয়ে উঠতে মন চাইছে। তার পর থেকে নন স্টপ এই মেয়ের ফোন আসছে। এক এবং একাধিক ভঙ্গীতে তাকে কথা বলতে দেখলাম। এত জনের হিসাব রাখে কেমনে এই জুস জাতি!! :|:|/:)/:)

তুমুল বৃষ্টি নামল। এসিতে বাস আরও ঠাণ্ডা হয়ে গেল, পাশের লাভ বার্ড এইবার কম্বলে আচ্ছাদিত। বাকিটা অনুমান করে নেন। ;);)

আমি কানে গান বাজিয়ে বই পড়ছি। সুন্দরী আমার বই দেখে বলে বসল, “এ পি জে কালাম নতুন রাইটার নাকি আপু? কেমন লিখে? উপন্যাস টা কেমন? নায়ক নায়িকা কজন??” আমি অতি শোকে পাথর হয়ে গেছি!! মেয়েটা এক্কেবারে পারফেক্ট বিম্বো ( মেধাহীন সুন্দরী)!! :-/:-/

বাসের টিভি তে এক নাটক ছাড়ল। নাম “বয়রা পরিবার,” কাতুকুতু দিয়ে হাঁসানোর বৃথা চেষ্টা আর কি! বাংলা ডায়ালগের চেয়ে এই নাটকে হিন্দি ডায়ালগ বেশী!! কি আজব কয়েক জন গান, নাচের শিক্ষক, টার সুন্দরী ছাত্রী কে হিন্দি ভাষা, হিন্দি গান, নাচ শেখাচ্ছে, এই থিম নিয়ে নাটক কেমনে অন এয়ারে যায়?? X((X((

কুমিল্লায় বিরতি তে সামনে বসা যুবক আমাকে পেপার ফিরিয়ে দিতে আসল। বলল, “থ্যাংকস” আমি লাজুক হাসি দিয়ে বললাম, “ওয়েলকাম।“ তারপর নিজে থেকেই বলে। “চিটাগং থাকেন?”
“জি!”
“ হুম ভালো, অবশ্য চিটাগং আমার শ্বশুর বাড়ি। আমি যাচ্ছি, বউ কে আনতে।“
“ও আচ্ছা!!”

তারপর বাকী পুরোটা পথ ই কেটেছে আমার হেড ফোনে বাজতে থাকা গান শুনতে শুনতে। এদিক সেদিক, আর কোন দিকেই তাকাইনি। :|:|

বাস থেকে নামার সময় ড্রাইভার কে বললাম, ‘ধন্যবাদ ভাই। নিরাপদে আমাকে পৌঁছে দিলেন।“

ড্রাইভার, সুপারভাইজার কিছুক্ষনের জন্য হ্যাঁ করে তাকিয়ে ছিল।।
৩৮টি মন্তব্য ৩৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×