কিন্তু আজ হঠাৎ ঘুম ভেঙেই মনে হল, এই সেই মহেন্দ্রক্ষণ ! মহাকালের এই সেই সুবর্ণ সুযোগ ! আমার এই আদিম সত্ত্বাকে মুক্ত করার এইতো সময়! এই আত্মার বয়স কত শত বছর হবে কে জানে? পাঁজরে বন্দী করে রাখা প্রাণ পাখিটাকে মুক্তি দেবার সময় এটাই !
ব্যাপারটা সোজা ভাষায় সুইসাইড, আত্মহত্যা! সবাই সুইসাইড নোট বলে কিছু একটা লিখে যায়, ওতে থাকে কিছু কারণ, কিংবা দর্শন। কিন্তু আমি কি লিখব? কাকে লিখব? আমারতো কোন কারণ নেই, দর্শন তত্ত্ব ব্যাখ্যা করার মতো নেই কোন জ্ঞান। গর্ভবতীর যেমন হঠাৎ এটা সেটা খেতে ইচ্ছে করে, আমারও ঘুম ভেঙে তেমন ইচ্ছে হল।
কোন বিষণ্ণতায় পায়নি আমায়, আমি প্রতারক কিংবা প্রতারিত ও নই, করিনি কোন আদিম পাপ- যার জন্য গ্লানি হবে, শোক হবে। মাতম করার মতো নেই অভিযোগ, মেরুতে পাথর বোঝাই করা নেই কারও অভিশাপ। গোপনে, লোকচক্ষুর আড়ালে স্পর্শ করিনি কোন মানব শরীর। উৎসাহ দিইনি কাওকে নরক যাত্রায়। কিংবা নীরবে চেপে যাইনি নিজের, অথবা বন্ধু- স্বজনের পাপ- চতুরতা। নই আমি মাতাল, চেশাতুর, ভণ্ড বা ভাবুক। নেই জ্ঞানীর চশমা, কবির কাঁধ ঝোলানো থলে, সাধুর জট বাঁধা চুল। হতভাগ্য, পরিচয়হীন, বা এতিম—কিছুই নই আমি। নই ভাগ্যনিপীড়িত বারবনিতা।
বিশ্বায়নের প্রতিযোগীয় আমার কোন আগ্রহও নেই। দেশ- সমাজ, ধর্ম- সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণও দায়িত্বও কেউ আমার কাঁধে তুলে দেয়নি। “ থাকবো নাক বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগতটাকে” – এই বলে কোন সংকল্পও আমি করিনি নিজের কাছে। চাতকের মতো কেও নেই আমার সুধা পানের আশায়। আমিও কারও পানে পথ চেয়ে বসে নেই স্বর্গদুয়ারে।
ভূমণ্ডলের একজন আমি, প্রকৃতির একটা অংশ আমি। শক্ত করে আঁকড়ে ধরার জন্যে দুটো হাত আছে, বিপদে দৌড়ে পালাবার জন্যে আছে পা, দিনরাতের তফাৎ বোঝার জন্যে আছে দৃষ্টি, ঘ্রাণের জন্যে আছে নাসিকা, কামনাকে স্পর্শ করার জন্যে আছে অনুভূতি। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সুস্থ- মানবিক এক আদমসুরত।
তবুও আজ আমি আত্মহনন করব। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসেছে আমার মৃত্যুগুহায়। আহা! কি মধুর। যেন সব আয়োজন আমার মৃত্যুর আনন্দে! সব ঠিকঠাক মতোই এগুচ্ছে। মৃত্যু পরবর্তী একটা দৃশ্য ও কল্পনা করে ফেলেছি।
আমার পরিবার, বন্ধু- স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী সবাই নিশ্চয়ই মুষড়ে পড়বে। অবশ্য শোকের বয়স দুদিন, এ দুদিন খুব ঝড় বয়ে যাবে তাদের উপর। অতি উৎসাহী কেউ কেউ মৃত্যু কারণ উৎঘাটনে ব্যস্ত হয়ে যাবে। দাঁড় করাবে নানা ব্যাখ্যা। প্রেম, হতাশা, বিষণ্ণতা, কেউবা বলবে বদ্ধ পাগল! নিন্দুক বলবে, মরে অনুকম্পা নিতে চাইল আর কি, কাপুরুষ! কারও কাছে আমি হব মানসিক রোগী। অতি কাছের বন্ধুরা মাতম করবে এই বলে, কি হল, কেন হল কিছুই তো জানতে পারলাম না, দুদিন আগেওতো দেখেছি, কথা বলেছি। মা নিশ্চয় বেশী কাঁদবেন। আহারে!
আচ্ছা আমার কি জানাজা হবে? গোসল হবে? শুনেছি হয় না। তাই আমি নিজেই পাক পবিত্র হয়ে সুগন্ধি মেখে নিয়েছি। মরার সময় আমার চোখ গুলো কি খোলা থাকবে? কিংবা জিবহা বের হয়ে থাকবে? আমায় কি খুব বীভৎস লাগবে?
নাহ! মৃত্যুপরবর্তী চিন্তা আমার শোভা পায়না এই মুহূর্তে। ওটা ভবিষ্যৎ। আমি তো অতীত- ভবিষ্যতে কখনোই বিশ্বাসী ছিলাম না। বর্তমান ই জীবন- এটাই সত্য। আর সত্যটা হচ্ছে মরণ।
আর সময় নষ্ট করা যাবে না।
শেষবারের মতন নিজেকে দেখে নিলাম। অনন্ত যাত্রার পথিককে আয়নায় দেখছি আমি। তাকিয়ে আছি অপলক দৃষ্টিতে। মা যেমন মায়া আর দোয়া মিশিয়ে তাকিয়ে থাকে সন্তানের দিকে, মুগ্ধ প্রেমিক যেমন বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়ে থাকে প্রেমিকার দিকে, বিশ্বাস নিয়ে বন্ধু যেমন তাকিয়ে থাকে বন্ধুর দিকে।
একি!! এটা কি? আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। যেন এক প্লাবন! কি সুন্দর এই ঝড়! কত মায়া! কত ভালোবাসা! কারও জন্য নয়। যা আছি, যেভাবে আছি, পেয়ে- না পেয়ে আছি। এই আমি- কেবল আমিই আমাকে ভালোবাসি।
ভালোবাসার মানুষটাকে কিভাবে কষ্ট দিই? কি করে তাকে হত্যা করি?? আহত করি? ধ্বংস করি? ভালবাসলে কেও কি পারে তা?? আমি পারিনি।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০১১ রাত ৯:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


