২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সদ্য ক্ষমতায় আগত মহাজোট সরকারের মুখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ কয়েক ডেসিবেল নিচে নেমে বাজতে থাকে। এ কথা খুব দূর অতীতের নয় যে মহাজোট যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের জনগণকে দিয়ে বিপুল ভোটে জিতে সরকার গঠন করেছে। ক্ষমতায় আসতে না আসতেই সেনাবাহিনীর ৫৭ জন অফিসার [মেজর জেনারেল থেকে শুরু করে ক্যাপ্টেন পর্যন্ত]সহ ৭৪ জনের মৃত্যু এবং পিলখানায় বিডিআর সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত অন্যান্য অপরাধ সরকারের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করে। কোনো সন্দেহ ছাড়াই বলা যায়, এ হত্যাযজ্ঞে বেনিফিশিয়ারিদের তালিকায় যুদ্ধাপরাধীরা রয়েছে।
পুনরায় মানুষের মুখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি গুঞ্জরিত হতে শুরু করে যখন, তখন আমরা লক্ষ করি, পাকিস্তান থেকে তাদের দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও অতীতে সাজা খাটা প্রেসিডেন্টটির এক বিশেষ দূত মির্জা জিয়া আনসারি ঢাকায় এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে একটি বার্তা জানায়, যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রকৃষ্ট সময় নাকি এখন নয়। এই অভব্য অনুরোধ করেই পাকিস্তান ক্ষান্ত হয়নি, আন্তর্জাতিক মহলেও তারা জোর লবিইং করে এই বিচারকে বন্ধ বা বাধাপ্রাপ্ত করার জন্যে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তারপর সৌদি আরব সফরে গেলে একটি গুজব বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয় যে সৌদি আরব এই বিচারের বিরুদ্ধে। যদিও সৌদি সরকার কোনো বিবৃতি দেয়নি, এবং বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জোর গলায় এ কথা অস্বীকার করেছেন।
আমরা ওয়ার্স্ট পসিবল কেইস হিসেবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে অপরাধী পক্ষ পাকিস্তান ও তার সহমর্মী পক্ষ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি রাষ্ট্রকে এই বিচারের বিপক্ষে অত্যন্ত বিরোধী থেকে শুরু করে মৃদু বিরোধী, এই স্পেকট্রামে সাজাতে পারি। পাকিস্তানের তৎকালীন সহযোগী পক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ বিচারের প্রশ্নে কোনো প্রকাশ্য বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেনি, এবং তাদের ভাষ্যমতে তারা এ বিচারকার্যে সহযোগিতায় আগ্রহী।
কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ তার মাটিতে সংঘটিত হওয়া অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার সকল ক্ষমতা রাখে। এ বিচারের প্রকৃতি অনন্য এবং অভূতপূর্ব বলে এর প্রবাহের পথে সকল বিঘ্ন দূর করার জন্যে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা সমমানের আন্তর্জাতিক কেইসগুলি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সহায়তা নিতে পারে।
আমি নিচে কিছু ছাগুপ্রিয়, বরাহপ্রিয় মিথ, প্রশ্ন ও যুক্তি তুলে ধরে সেগুলো খণ্ডন করবো। পাঠকদের কাছে অনুরোধ থাকবে, ফেসবুকে, মেইলগ্রুপে, পথেঘাটে, জলেস্থলেঅন্তরীক্ষে যখন কাছাকাছি ধরনের তর্ক হবে, তখন এই টেমপ্লেটটি উপস্থাপন বা রেপ্লিকেট করার। আপনাদের সংযোজন, বিশ্লেষণ আর সংশ্লেষণ আমি সম্পাদনা করে পোস্টে যোগ করার অভিলাষ জানাই এবং অনুমতি চাই। ধন্যবাদ।
মিথ ০*: দেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই।
স্পষ্টভাবেই আছে।
১৯৭৩ সালে ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আওতায় অনেক পাতি রাজাকার, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সেই সময়ে আনীত হয়নি, তারা ছাড়া পেলেও ১১ হাজারের বেশি রাজাকার আলবদর যুদ্ধাপরাধী দালাল আইনের আওতায় কারাবন্দী ছিলো। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর যারা ক্ষমতায় আসে, তারা এক পর্যায়ে আইনের চোখে অবৈধ ঘোষিত অধ্যাদেশ জারি করে দালাল আইন বাতিল ঘোষণা করার ফলে এই ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধী মুক্তি পায়। এদের অধিকাংশই এখনো বহাল তবিয়তে দেশে বিরাজ করছে এবং তারা যুদ্ধাপরাধী। ফলে দেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই, এই দাবী মিথ্যা।
মিথ ১: ৩৮ বছর আগে কী হয়েছে না হয়েছে, তা নিয়ে জাতিকে বিভক্ত করার কোনো মানে হয় না
৩৮ বছর আগে, ১৯৭১ সালে আমাদের দেশে যা ঘটে গেছে, তা একটি নৃশংস অপরাধ। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তার এ দেশীয় সহযোগী, যথাক্রমে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ও মুসলিম লীগের নেতৃ- ও কর্মীবৃন্দ এবং তাদের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় পরিচালিত রাজাকার বাহিনী, আল বদর ও আল শামস, বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনতার ওপর গণহত্যা, হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, জেণ্ডারসাইড, পরিকল্পিত জাতিধর্ষণ, পরিকল্পিত জাতিনিধনের মতো অপরাধ করেছে। এসব অপরাধ আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে স্বীকৃত, এবং ফৌজদারি অপরাধ তামাদি হয় না বলে এখনও বিচারযোগ্য। জাতি এই অপরাধের বিচার নিয়ে ঐক্যবদ্ধ, যার প্রমাণ সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রতিশ্রুতির পক্ষে প্রদত্ত ভোটের অনুপাতে মেলে। অল্প কিছু সংখ্যক শুয়োরের বাচ্চা এই বিচারের বিরুদ্ধে।
মিথ ২: শেখ মুজিবর রহমান তো যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, এখন আবার কথা কীসের?
শেখ মুজিবর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেননি।
১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি "দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ" জারি করা হয়। একই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারী, ১ জুন ও ২৯ আগস্ট তারিখে তিন দফা সংশোধনীর পর আইনটি চূড়ান্ত হয়।
দালাল আইন জারির পর ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৩৭ হাজার ৪৭১ দালালকে গ্রেফতার করা হয়। ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এদের বিচার কাজ চললেও ২২ মাসে মাত্র ২ হাজার ৮৪৮টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়। এ-রায়ের মাধ্যমে ৭৫২ জন বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হন।
১৯৭৩ এর ৩০ নভেম্বর বহুল আলোচিত সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। এ-ঘোষণার মাধ্যমে ২৬ হাজার ব্যক্তি মুক্তি পান। বাকীদের বিচার অব্যাহত থাকে।
সাধারণ ক্ষমার প্রেস-নোটে বলা হয়,
উদ্ধৃতি
ধর্ষণ. খুন, খুনের চেষ্টা, ঘর-বাড়ী অথবা জাহাজে অগ্নি সংযোগের দায়ে দণ্ডিত ও অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন প্রযোজ্য হবে না।
মিথ ৩: ৩৮ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার এখন সম্ভব নয়
ভুল। অবশ্যই সম্ভব। প্রথমত, ফৌজদারি অপরাধ তামাদি হয় না। দ্বিতীয়ত, এই অপরাধের ভিক্টিমরা এখনও অনেকে জীবিত ও সাক্ষ্যের জন্যে প্রস্তুত রয়েছেন। তৃতীয়ত, এই অপরাধ সংক্রান্ত বহু দলিলপত্র বর্তমানে অবমুক্ত করা হয়েছে [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান সরকার]। চতুর্থত, পৃথিবীতে এখনও প্রায় ৭০ বছর আগে ঘটে যাওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। আমাদের আলোচ্য অপরাধ মাত্র ৩৮ বছর আগে ঘটা।
মিথ ৪: এই বিচারের দাবি মূলত রাজনৈতিক বিদ্বেষ প্রসূত এবং জামায়াতে ইসলামিকে বিপন্ন করার বাকশালী পাঁয়তাড়া
জামায়াতে ইসলামি দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিলো, এবং এর তৎকালীন নেতৃবৃন্দের সকলে যুদ্ধাপরাধের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলো বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। তাদের বর্তমান নেতৃত্বেও যুদ্ধাপরাধের অপরাধে অভিযুক্তরাই রয়েছে। তারা যদি বিপন্ন হয়, তাহলে এই বিপদের পেছনে তাদের অতীত ইতিহাসই দায়ী।
মিথ ৫: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি সেখানে কর্মরত বাংলাদেশীদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে
জামায়াতে ইসলামির নেতৃবৃন্দের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির হৃদ্যতা রয়েছে, এবং এমন একটি গুজব তাদের উৎসাহেই ছড়ানো হয়েছে যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গেলে মধ্যপ্রাচ্য আমাদের ওপর গজব নাজিল করবে। তবে প্রকৃত সত্য হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাংলাদেশ বর্তমান সরকারেরও জোরালো সম্পর্ক রয়েছে, এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে এমন অশুভ উদ্যোগ ঠেকানোর ক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে।
প্রশ্ন ১: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হলে কি বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়বে? অপরাধ কমবে? দুর্নীতি কমবে? বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমবে? ওয়াসার পানিতে গুয়ের গন্ধ দূর হবে?
পাল্টা প্রশ্ন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা না হলে কি বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়বে? অপরাধ কমবে? দুর্নীতি কমবে? বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমবে? ওয়াসার পানিতে গুয়ের গন্ধ দূর হবে?
উভয় ক্ষেত্রেই একই উত্তর।
প্রকৃতপক্ষে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম আমাদের প্রাত্যহিক জনজীবনের ওপর কোনো নেতিবাচক বা তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। অপরাধের বিচার কেবল তাৎক্ষণিক প্রভাবের কথা ভেবে করা হয় না, করা হয় সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যে। এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাবের মধ্যে রয়েছে, সার্বভৌম বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধের বিচার নিষ্পত্তি করার মাধ্যমে বিচারব্যবস্থার উত্তরণ লাভ এবং প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অন্যান্য অপরাধের বিচারের সাথে এ অর্থে তুলনীয়, যদি তাদের বিচারের বিরোধিতা করা হয়, তাহলে আজ প্রতিটি খুনী, ধর্ষণকারী, লুণ্ঠনকারী ও অগ্নিসংযোগকারী এই একই ছাড় পাবার দাবিদার।
প্রশ্ন ২*: আওয়ামী লীগ তো আগে একবার ক্ষমতায় এসেছিল। তারা তখন বিচার করে নাই কেন? শেখ হাসিনা একটা সময় জামায়াতের সাথে হাত মিলিয়েও রাজনীতি করেছিল। তখন যুদ্ধাপরাধী বিচারের ইস্যু কোথায় ছিল?
প্রশ্নটির মধ্যে একটি ভুল তথ্য রয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আওয়ামী লীগ দুইবার ক্ষমতায় আসে। প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর তখনকার সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়, এ লক্ষে আইন প্রণয়ন করে এবং তার ভগ্নাংশ পরিমাণ বাস্তবায়নও করে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা ক্ষমতার বলয়ে প্রবেশ করে, তারা যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে ক্ষমতা পোক্ত করার আশায় আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণয়ন করা আইনগুলি বাতিল করে।
১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়নি, এর পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে তাদের তৎকালীন নেতৃত্বে দূরদর্শিতার অভাব। এ দূরদর্শিতার অভাবের মূল্য আওয়ামী লীগকে শোধ করতে হয়েছে ২০০২-২০০৭ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন জোট সরকারের শাসনামলে বারবার আক্রান্ত হয়ে। দেশের মানুষ দুই ভূতপূর্ব আলবদর নেতাকে মন্ত্রী হিসেবে দেখে অপমানিত বোধ করে, এবং সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে, এ প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে আওয়ামী লীগকে পুনরায় আরেকটি সুযোগ দেয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্যে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা না করা আওয়ামী লীগের একান্ত এখতিয়ার নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের দাবি। অতীতে এ দাবি পূরণে ব্যর্থতার অর্থ এই নয় যে বর্তমানে তা পূরণ করা যাবে না।
প্রশ্ন ৩*. স্বাধীনতার পর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তো সঠিক ভাবে হয়নি, চুনোপুঁটির বিচার হয়েছে, কিন্তু রাঘব-বোয়াল ছাড়া পেয়েছে। এবারও কি তা হবে না?
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা উভয়ই সদ্য স্বাধীন দেশকে প্রায় ধ্বংসস্তুপ থেকে টেনে তোলার কাজে ব্যস্ত ছিলো। তারপরও দু'টি অত্যন্ত শক্তিশালী আইন প্রণীত হয়েছিলো এবং তার আওতায় বিচারও শুরু হয়েছিলো। ১৯৭৩ সালে ঘোষিত সাধারণ ক্ষমায় যে সকল রাজাকার ছাড়া পেয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ আনীত হয়নি। কিন্তু রাঘব-বোয়ালদের ছাড়ার প্রশ্ন আসে না, কারণ রাঘব-বোয়ালরা তখন পলাতক ছিলো এবং তাদের নামে সুনির্দিষ্ট অভিযোগও ছিলো। তখন স্বল্প লোকবল ও পরিকাঠামো নিয়ে বিচারে যে অসামঞ্জস্য ছিলো, এখন তা অনায়াসে দূর করা সম্ভব, কারণ ৩৮ বছরে বাংলাদেশের বিচার ও প্রশাসন কাঠামো এখন অনেক সংগঠিত। তাই যুদ্ধাপরাধীদের পালের গোদাদেরও ধরা যাবে এবং ধরা হবে।
প্রশ্ন ৪*. বিচারের দাবী শুধু প্রাকনির্বাচন আর আওয়ামী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ কেন?
এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে এবার যত মানুষ ভোট দিয়েছে, তারা সকলেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সমর্থক নয়। নির্দলীয় বা অন্যদলীয় সবাই এই বিচারের দাবী জানাচ্ছে। বরং নিজেকে প্রশ্ন করুন কেন বিচারের দাবীতে আপনিও সরব হচ্ছেন না। প্রাকনির্বাচনী প্রচারণা এক দিকে যেমন রাজনৈতিক দলকে বাধ্য করে যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিতে, অন্যদিকে সংসদকে যুদ্ধাপরাধীমুক্ত রাখতেও সহায়তা করে। এতে ভবিষ্যতে যুদ্ধাপরাধীদের মনোনয়ন দেবার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোও নিরুৎসাহী হবে।
প্রশ্ন ৫*. এত বছর পর দেশকে এটা নিয়ে ভাগ করার দরকার কী?
ভাগ হচ্ছে না তো, দেশের লোক একাট্টা হচ্ছে কতিপয় খুনি-ধর্ষকের বিচারের দাবীতে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার মানে তো আর দেশের জনগণকে ভাগ করা নয়। খুনির বিচার, ধর্ষকের বিচার মানে যদি দেশ ভাগ করা হতো তাহলে তো দেশে আইন-আদালত দরকার হতো না। জেলখানা তুলে দিয়ে খুনি-ধর্ষককে বাসার লজিং মাস্টার নিয়োগ করা হতো।
প্রশ্ন ৬*. হাসিনার বেয়াই তো যুদ্ধাপরাধী। তারপর আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী ১৯৯১ সালে গোআ'র কাছে দুআ চাইতে গিয়েছিলেন। সুতরাং আওয়ামী লীগের এই বিচারের ব্যাপারে সততা কতটুকু?
যেমনটা আগে বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তো আর আওয়ামী লীগের একান্ত এখতিয়ারের বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের দাবি। যুদ্ধাপরাধীর দলীয় পরিচয় বিবেচ্য নয়, কৃত কুকর্মই বিবেচ্য। যুদ্ধাপরাধ যে আইনের অধীনে বিচার করা হবে, সে আইনের আওতায় আপনি স্বচ্ছন্দে আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তির নামেও অভিযোগ তুলতে পারেন।
-----------------------------------------------------------------
সচলায়তন থেকে হিমু-র ব্লগ
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ৩:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


