রমজান মাস আনন্দের পূণ্যের
মনসুর আজিজ
আকাশের এক ফাঁলি চাঁদ দেখার জন্য সবাই ব্যাকুল থাকে। নতুন চাঁদ দেখার আনন্দই আলাদা। সব নতুন চাঁদের গুরুত্ব কিন্তু সমান নয়। ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দই আলাদা। কিন্তু ঈদের চাঁদ দেখার আগে একমাস রোজা রাখতে হয়। তাই রমজান মাসের চাঁদের জন্য ছোট বড় সবাই ব্যাকুল থাকে। রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেলেই রোজা রাখতে হয়। রোজা শেষ হলেই তবে আসে আকাশ ভরা খুশির ঈদ। রোজার আরেক নাম সিয়াম। রমজান মাসের উদ্দ্যেশ্য হল রোজা পালন। চাঁদ একটা উপল্য মাত্র। আত্মার পরিশুদ্ধি হল রোজার উদ্দেশ্য। আত্মার পরিশুদ্ধিটা আবার কি? হয়তো এ ভাবনা সবার মনে। নদীতে ময়লা ফেললে যেমন নদী দুষিত হয়, ধোয়া কার্বনে যেমন বাতাস দুষিত হয়, যেখানে সেখানে মল-মূত্র বা আবর্জনা ফেললে যেমন পরিবেশ দুষিত হয়; তেমনি অন্যায়, অসৎ আর পাপের কাজ করলে আত্মা দুষিত হয়। কলুষিত হয় মন। ময়লা আবর্জনা সরিয়ে নিয়ে পরিবেশ দুষনমুক্ত করা যায়। শব্দ কম করলে শব্দ দুষন হয় না। নদীতে ময়লা আবর্জনা না ফেললে নদীর পানি হবে টলটলে। আর পাপ না করলে, মিথ্যা কথা না বললে, ভালো কাজে মশগুল থাকলে অন্তর থাকবে পবিত্র। আত্মা থাকবে পরিশুদ্ধ। আমরা আত্মার শান্তির কথা শুনি আবার কখনো নিজেরা আত্মা শান্তি পাক কথাটি বলি। মানুষ যখন পাপ করে তখন তার মনটা ছটফট করে। কারো জন্য ভালো কিছু করলে মনটা ফুরফুরে লাগে। চড়–ই পাখির মতো নাচতে গাইতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পাপ করলে; দেয়ালে বৃষ্টি ভেজা কাকের মতো হয় আমাদের অবস্থা। মুখে হাসি নেই, অন্তরে খুশির গুঞ্জরণ নেই । কেমন একটা চুপচাপ ভাব। এই চুপচাপ মনমরা ভাবটা কাদের হয়? যারা বোধ বুদ্ধি ও জ্ঞান রাখে তাদের হয়। জগতে এই বোধ-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের সংখ্যাই বেশি। নির্বোধের সংখ্যা কমই হয়। আর কিছু মানুষ আছে যারা কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করে না। অর্থ আর শক্তির জোড়ে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়ায়। অপরকে মেরে তারা আনন্দ পায়। পরের অনিষ্টেই তাদের সুখ। তারা মনে করে দুনিয়াতে তারা চিরদিন বসবাস করবে। তারা অয় ও অমর। কোন মৃত্যু ভয়ও তাদের নেই। সেই কারণে মানুষ হত্যার মতো কাজও তারা নির্দ্বিধায় করতে পারে। কিন্তু কারো ভিতর যদি আল্লাহর ভয় বর্তমান থাকে। পরকালের শাস্তির কথা যদি তার মনে থাকে, তাহলে সে যা খুশি তা করতে পারবে না। সে পাপের ভয় করবে। পূণ্যের আশা পুষে রাখবে মনে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই সে কাজ করবে।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন আর অন্তরকে পবিত্র করার জন্য রজমান মাসের রোজা রাখতে হয়। এটি একটি সাধনার কাজ। সেইজন্য রোজা পালনকে বলা হয় সিয়াম সাধনা। একমাস ব্যাপি সিয়াম সাধনা করার পর তার অন্তর হয় কলুষমুক্ত। বাকি এগার মাস যাতে সে কলুষমুক্ত থাকতে পারে সেজন্য সিয়াম সাধনা করতে হয়। সুবহে সাদিকের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে মুক্ত থাকার নামই সিয়াম পালন। তবে শুধুমাত্র পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম কিন্তু সিয়াম পালন নয়। এটাকে স্রেফ উপোস থাকা বলা যায়। আমরা জানি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ। ইমান, নামাজ, রোজা, হজ্ব, জাকাত । ইসলামের উপর ইমান এনেই মুসলমান হতে হয়। একজন অমুসলিমের নামাজ রোজা করার মধ্যে পাপ পূণ্য কিছুই নেই। কিন্তু একজন মুসলমান নামাজ না পড়লে আর মুসলমান থাকে না। কারণ মুসলমান আর অমুসলমানের মধ্যে নামাজ হল পার্থক্য সৃষ্টিকারী। নামাজ মসজিদেই পড়তে হয় । জামায়াতের সাথে পড়তে হয়। সেজন্য নামাজ পড়লে সবাই দেখে। হজ্ব করতে হয় দল বেঁধে। তাই হজ্ব পালনকারীকে সবাই দেখে। জাকাত দিলে কম করে হলেও জাকাত দাতা ও গ্রহিতা দুজনে জানে। কিন্তু রোজা! সে কেবল আল্লাহ ও রোজা পালনকারী ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না। কেউ যদি চুপি চুপি খেয়ে নেয় তার পর মুখটা মলিন করে রাখে, তবে সে যে খেয়েছে এটা কারো পে বোঝা সম্ভব নয়। বাথ রুমে ঢুকে গোসলের সময় একটু পানি পান করে নিলে কেউই জানতে পারবে না। শুধু একজন সককিছু দেখেন। সবকিছু জানেন। তিনি আল্লাহ। সমুদ্রের তলদেশের খবরও তার কাছে আছে আবার আকাশের পর অন্যআকাশে যা কিছু আছে তাও তার জানা। সেজন্য আল্লাহর ভয় যার ভিতর আছে তার রোজাই খাঁটি রোজা। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই রোজা রাখতে হয়। রোজা রাখলে মা বাবা খুশি হবেন, ভাইয়া আপু খুশি হবেন এমন নিয়ত করে রোজা রাখলে রোজা কবুল হবে না। রোজা শুধু আল্লাহর জন্যই রাখতে হবে। আর রোজাদারের পুরস্কারও আল্লাহ নিজ হাতে দেবেন। বেহেশতের মধ্যে একটি বিশেষ দরজা আছে। শুধু রোজাদাররাই সে দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে। সেটির নাম রাইয়ান। তাই বুঝতেই পারছো রোজাদার আল্লাহর কাছে কতো সম্মানিত। দুনিয়াতে ভালো কাজ করলে সবাই ভালো বলে। খুশি হয়। আদর করে। পুরস্কার দেয়। তেমনি আল্লাহর কাজ করলে আল্লাহ খুশি হন। বান্দাকে ভালোবাসেন। তার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করেন।
রোজার একটি বিশেষ মূহুর্ত হল ইফতার। নানান বাহারি ইফতারি ইফতার থরে থরে সাজানো থাকে প্লেটে। চমৎকার শরবত গ্লাসে। কিন্তু পিপাসা থাকার পরও কেউ পান করে না সে শরবত। সবাই অপো করতে থাকে কখন আজান হবে। এসময়টা আল্লাহর কাছে খুব পছন্দের। বান্দার ধৈর্য দেখে আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন- দেখ আমার বান্দারা কতো ধৈর্যশীল। সামনে সুস্বাদু খাবার পেয়েও তারা খায় না। আমি নিজ হাতে তাদের এ ধৈর্যের পুরস্কার দেবো। অনেকে ইফতারিতে অপচয় করে। খাবারের প্রতিযোগিতায় নেমে যায়। যার কারণে সারাদিন রোজাদার পানাহার থেকে বিরত থাকার পরও জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। রমজানে খাবারের অপচয় রোধ করতে হবে। পেটুকের মতো খেয়ে অনেকে তারাবির নামাজ পড়তে পারে না। রমজানের শিক্ষা হল খাও কম এবাদত করো বেশি। রমজানে আল্লাহ সব এবাদতের সওয়াব বাড়িয়ে দেন। নফল করলে ফরজের সওয়াব পাওয়া। সেজন্য ফরজের সাথে সাথে নফল এবাদতও এ মাসে বেশি করতে হয়। রমজান মাসেই কোরাআন নাজিল হয়। সেজন্য এ মাসে বেশি করে কোরআন পড়তে হবে। শুধু পড়ে গেলেই চলবে না। তার অর্থ বুঝতে হবে। না বুজে কোরআন পড়লে কোরআনের শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব নয়। কোরআন হচ্ছে সমস্ত জ্ঞানের মূল। সেজন্য রমজান মাসেই পরিকল্পনা করো যাতে আগামী রমজান আসার আগে সমস্ত কোরআন একবার অর্থসহ পড়া হয়ে যায়। গড়ে বিশটি আয়াত পড়লে একবছরে সমগ্র কোরআন অর্থসহ পড়ে ফেলা সম্ভব। একটি ক্রিকেট খেলা দেখা বিংবা একটি নাটক দেখতে যে সময় লাগে সে সময়ে একসপ্তাহের কোরআন পড়া হয়ে যাবে। পরিকল্পনা করো দেখবে কত সহজে কাজটি হয়ে গেছে। মনীষীরা বলেন পরিকল্পনা হচ্ছে কাজের অর্ধেক। সেহরী খাবার সময়টাকে এবাদতে কাজে লাগানো যায়। পড়াশোনায়ও কাজে লাগানো যায়। প্রতিদিন ঘড়িতে বা মোবাইলে এলার্ম দিয়ে রাখলে যদি পনের মিনিট আগে ওঠা যায় তবে এ সময় তাহাজ্জোদ নামাজ পড়া যায়। শেষরাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শেষ আসমানে নেমে আসেন। এ সময় তিনি বান্দাহর যে কোন আর্জি কবুল করে নেন। দোয়া কবুলের এটি একটি উৎকৃষ্ট সময়। ইফতারের সময়ও আল্লাহ দোয়া কবুল করেন। রমজান হচ্ছে বান্দার জন্য একটি ট্রেনিং ক্যাম্প। এটাকে যে যেভাবে কাজে লাগাবে সে সেভাবে ফল পাবে। রমজানের রোজা শেষেই আসে খুশি ভরা ঈদ। ঈদ আসে রোজাদারের জন্য। যারা রোজা পালন করে না তাদের ঈদের খুশি আল্লাহ কবুল করে না। তারা স্রেফ আমোদ প্রমোদই করে। কিন্তু রোজাদারের ঈদের আনন্দটাও এবাদত। তাই রমজান মাস হোক আমাদের জন্য আনন্দের, পূণ্যের ও কলাণ্যের।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



