"আমাদেরকে বলা হল হিন্দু আর কাফিরদের মেরে ফেল। জুন মাসের এক দিনে, আমরা একটা গ্রাম ঘিরে ফেললাম আর নির্দেশ পেলাম ঐ এলাকার কাফিরদের মেরে ফেলতে হবে। আমরা গিয়ে দেখলাম গ্রামের মহিলারা কুরআন তেলাওয়াত করতেছে, আর পুরুষরা আল্লাহর কাছে বিশেষ মুনাজাতে হাত উঠিয়েছে। কিন্তু কী আর করা, তাদের নসীবই খারাপ, আমাদের কম্যান্ডিং অফিসার বললেন, এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা যাবে না।"
গল্পের কষ্টগুলি খুব সুন্দর হয়। গল্পের কষ্ট পাওয়া মানুষগুলির জন্য আমাদের মায়া লাগে, আহারে, এই কষ্ট যেন আমার না হয়, এই বেদনা যেন আমার প্রিয় মানুষদের না ছোঁয়! আবার খুশিও লাগে, ভাগ্যিস এই কষ্টটা আমাদের হয়নি!
উদ্ধৃতিগুলি গল্পের নয়। ১৯৭১ সালের গনহত্যায় অংশগ্রহণকারী এক পাকিস্তানী সৈনিকের।
"এরা (বাঙ্গালী) হল গিয়ে নীচু এলাকার নীচু জাতের মানুষ," ঘোষণা করে দিয়েছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের প্রধান, ভদ্রলোকের নাম নিয়াজী, লেফট্যান্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী। মৃত্যুর পূর্বে নীচাশয় বাঙ্গালীদের উপর একটি বইও লিখে গেছেন তিনি, বইয়ের নাম The Betrayal of East Pakistan.
নীচাশয় দুরাত্মাদের শায়েস্তা করতে দেশের ভিতর জেগে উঠল কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষ। আল-বদর, আল-শামস নাম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। আল-বদর প্রধানের নাম মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, বর্তমানে জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের আমির। ভদ্রলোক ধর্মশাস্ত্রে সুপন্ডিত, আল-বদর নামটা বেছে নিয়েছেন আরবের বদর প্রান্তে ঐতিহাসিক বদর-যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় থেকে। চাপিয়ে দেয়া একটা অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়ছিল সেই মুসলিমগন, তুলনায় অনেক কম মানুষ নিয়ে কিন্তু স্বর্গীয় প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হয়ে, শান্তির ধর্ম প্রচারে। যুদ্ধে বিজয়ের পরও তারা সহনশীলতা দেখিয়েছিল বিজেতাদের বিরুদ্ধে, কারণ তাদের ধর্ম কোন মানুষের মতবাদ নয়, এটি স্রষ্টার নির্দেশ, যার মানে শান্তি। কিন্তু ধর্মপ্রাণ মতিউর রহমান নিজামী কোনভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, পূর্বপাকিস্তানের এই মুসলমানগুলি আসলে সাচ্চা মুসলমান নয়, তাই যুদ্ধ এদের উপরই চাপিয়ে দিতে হবে, তারপর আল-বদর দিয়ে এদের সাফ করে দিতে হবে।
নিয়াজীর সেনাবাহিনী এবং নিজামীর ধর্মপ্রাণ বাহিনী অনেক পবিত্র কাজ করেছে মুক্তিযুদ্ধে। এর একটি নমুনা পাওয়া যায় খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার চুকনগর এলাকার ঘটনা থেকে। ৭১ এর মে মাসের ১০ তারিখ। সীমান্ত এলাকা চুকনগরে সেদিন জড়ো হয়েছিল ১০০০০ এর উপর মানুষ, সীমান্ত পাড়ি দিবে। সকাল ১০টার সময় কাউতলা এলাকায় (তখন এটি পাটখোলা নামে পরিচিত ছিল) দুইট্রাক পাকিস্তানী সৈন্য আসে। কয়েক মিনিটে পুরো এলাকা...না বরং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকেই শোনা যাক:
"এখানে সেখানে পড়েছিলস্তুপ স্তুপ মানুষ, সব মৃত--মা তার কোলে আকঁড়ে ধরে রেখেছিল শিশুটিকে, স্ত্রী জড়িয়ে ধরেছিল তার স্বামীকে যাতে বুলেটটি স্বামীর গায়ে না লাগে, পিতা আড়াল করে রেখেছিল তার মেয়েটিকে। কিন্তু সে এক মুহূর্ত মাত্র, তারপর সব মানুষ মৃত মানুষ হয়ে যেতে লাগল। রক্তের স্রোত গড়াতে গড়াতে ভদ্র নদীতে গিয়ে পড়ল, ভদ্র নদী হয়ে উঠল শবদেহের নদী। এক ঘন্টা পর, তাদের বুলেট শেষ হয়ে গেল। তারপর তারা বেয়োনেট বের করে এগুতে লাগল।"
এটিএন বাংলার বিরুদ্ধে মানহানিরর মামলা করেছে জামাত, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরায় তাদের মানহানি হয়েছে। আজকাল সহজে চমকাই না। খবরটি শোনার পর শুধু মনে হল, মুক্তিযুদ্ধের এই সত্য কাহিনীগুলি গল্প হয়ে যাচ্ছে, গল্পগুলি এখনও (হয়তো) জমাটবাঁধা কষ্ট দেয় বুকে, তারপর এক সময় সেগুলি ফিনফিনে কষ্ট দেবে, তারপর কষ্টটা আর থাকবে না, তারও পর আসবে আনন্দ--আহ, ভাগ্যিস আমাদের হয়নি! নিজামী ও তার দোসররা সেদিন হয়ে উঠবেন মহান মানুষ।
মহান মানুষগুলি আগামীকাল বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আমি একজন আশাবাদী মানুষ, তাই আশা করি, এই মানুষগুলিকে আগামীকাল ভোট দেয়ার "পাপটি" যদি করি, এবং এর ফলে যেদিন তারা "মহান" বলে পরিচিত হবে, সেদিন নিজেকে "ঘৃণা" করার মত মানসিকতাটুকু যেন থাকে আমার, হে মঙ্গলময় স্রষ্টা।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



