১ম দিন
ভদ্র মহিলা, ভদ্র মহোদয়গনঃ
আপনাদের সামনে আবার এসেছে রোমাঞ্চকর সেই প্রতিযোগিতা, তৃতীয় বারের মতো। এবারের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র অতলান্তিক মহাসাগর। কানাডার নোভাস্কশিয়ার সেইন্ট লরেন্স উপসাগরের হিম শীতল জলরাশি থেকে যাত্রা শুরু করবে সাঁতারুগন, গন্তব্য ৬০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে, ক্যারিবীয়ার উষ্ণ উপকূল। অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল এই অভিযান, আপনারা জানেন, পদে পদে রয়েছে মৃত্যুর হাতছানি—মৎস্য শিকারীদের বর্শি, হিংস্র জলজ প্রাণী, এবং প্লাস্টিকের মতো পরিবেশ দুষণকারী নানা পদার্থ। তবে আশা করছি, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অভিযানটি হবে মহাকাব্যের ন্যায়, আর আপনারা গভীর স্মরণ করবেন প্রতিযোগীদের ত্যাগ ও দৃঢ় মনোভাবের কথা। চলুন তাহলে, পরিচিত হয় নিই সাঁতারুদের সাথে, যারা রচনা করতে যাচ্ছে ইতিহাস।
১। ব্যাকস্পেসার (Backspacer)
মেয়ে, দৈর্ঘ্য ৫ ফিট, প্রস্থ ৩ ফিট ৯ ইঞ্চি, ওজন ৩৭৫ কেজি।
ব্যাকস্পেসারের মনে সারাক্ষণই খেলা করে নানান চিন্তা ভাবনা। প্রতিযোগিতায় তার অংশগ্রহণের কারণ মূলত রোমাঞ্চকর ভ্রমণের হাতছানি; সেই সাথে মুক্ত পৃথিবীর পথে বেড়িয়ে পড়ে জেনে নেয়া, এত দিন কোথায় ছিল সে, এরপর কোথায়-ই গন্তব্য তার। তার অভিযান শুরু হবে সবচেয়ে উত্তর প্রান্তে, সেইন্ট লরেন্স উপসাগরের গভীর পানি থেকে।
২। বিলি (Billy )
পুরুষ, দৈর্ঘ্য ৫ ফিট, প্রস্থ ৩ ফিট ৯ ইঞ্চি, ওজন ৪৪০ কেজি।
বিলি পূর্ণবয়স্ক এক পুরুষ চর্মপৃষ্ঠ। অতলান্তিক মহাসাগরের অন্য চর্মপৃষ্ঠদের সাথে যখন কোনো প্রতিযোগিতা থাকে না, তখন মার্লিন আর সোর্ডফিশ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে, গালগল্প করেই সময় কাটে তার। বিলির মেয়ে কাজিন—তার নামও বিলি (Billie)—২০০৭ সালের প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, রানার আপ স্টেফানি কোলবার্টলকে কোনোমতে হারিয়েছিল সে।
৩। কালি (Cali)
পুরুষ, দৈর্ঘ্য ৪ ফিট ১০ ইঞ্চি, প্রস্থ ৩ ফিট ৬ ইঞ্চি, ওজন ৩৪০ কেজি।
শুধুমাত্র অদম্য স্পৃহাই মৃত্যুর মতো ঝুঁকিপূর্ণ এক অব্স্থা থেকে বাঁচিয়ে এনেছে কালিকে। কানাডার বিজ্ঞানীরা যখন তাকে খুঁজে পেলেন, মাছ ধরার বর্শিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আর সাঁতার কাটতে পারছিল না সে। কিন্তু "আমিও পারব" এই দৃঢ় মনোভাবের কারণে, এবং মানুষের সহায়তায়, আবারও প্রতিযোগিতায় ফিরে এসেছে কালি।
৪। এস্তেবান (Estéban)
পুরুষ, দৈর্ঘ্য ৫ ফিট ১ ইঞ্চি, প্রস্থ ৩ ফিট ৯ ইঞ্চি, ওজন ৩৮৫ কেজি।
এস্তেবানের আদি নিবাস লাতিন ক্যারিবীয়া। বন্ধুদের কাছে বেশ জনপ্রিয় সে; তাকে যখন প্রতিযোগিতার ট্যাগ পড়ানো হচ্ছিল, বন্ধুরা নৌকার চারদিকে মনের আনন্দে সাঁতার কাটছিল। দেখা যাক, এখনও সে আগের মতো ক্যারিবীয় পার্টিগুলির মধ্যমণি বিবেচিত হয় কিনা।
ও, আরেকটি কথা, এস্তেবানের কাজিন স্টেফানিই ২০০৭ সালের প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছিল। আর এবার, এস্তেবানও বেশ কিছু গোপন কৌশল আয়ত্ত করেছে।
৫। গ্রেম্বো জোনস (Grembo Jones)
মেয়ে, দৈর্ঘ্য ৪ ফিট ১০ ইঞ্চি, প্রস্থ ৩ ফিট ৬ ইঞ্চি, ওজন ৩৩৫ কেজি।
হাসিখুশি এক উচ্ছল সাতারু গ্রেম্বো জোনস। ক্যারিবীয়ার উষ্ণ স্রোতে দাপিয়ে সাঁতার কাটতে একেবারে উদগ্রীব হয়ে আছে সে। অতলান্তিকের জলরাশিতে যখন তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে না, এবং নিজের অবকাশ সৈকতটিতেও রোদ পোহাতে যায় না সে, তখন বন্ধুদের সাথে রসিকতা করেই সময় কাটে তার। কাজেই অন্য প্রতিযোগীদের উচিত তার উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা।
৬। লিনবাল্ড দি এক্সপ্লোরার (Lindblad the Explorer )
মেয়ে, দৈর্ঘ্য ৫ ফিট ৩ ইঞ্চি, প্রস্থ ৩ ফিট ৯ ইঞ্চি, ওজন ৪৪০ কেজি।
দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় লিনবাল্ড কোনো অপরিচিত নাম নয়। গত কয়েক বছরে অতলান্তিকের সুবিশাল জলরাশি পাড়ি দিয়েছে সে, কোস্টারিকায় তার প্রিয় নিবাস থেকে কানাডার খাদ্য ভূমিতে। অসমসাহসী এক অভিযাত্রী লিনবাল্ড, আগেও এ পথ পাড়ি দিয়েছে সে। সুতরাং পূর্ব অভিজ্ঞতা তার জন্য বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে।
৭। নাইটসুইমার (Nightswimmer)
মেয়ে, দৈর্ঘ্য ৫ ফিট ৩ ইঞ্চি, প্রস্থ ৩ ফিট ৯ ইঞ্চি, ওজন ৪৪০ কেজি।
নাইটসুইমার সবচেয়ে বিশালদেহী প্রতিযোগীদের একজন, এবং রক ব্যাণ্ড আর.ই.এম-এর একজন গভীর অনুরাগী। বেশ ভ্রমণপিপাসু সে, ইতোমধ্যেই আর.ই.এম-এর ট্যুর উপলক্ষে ঘুরে বেরিয়েছে দূর দূরান্তে। কিন্তু ব্যাণ্ডের মতোই, নাইটসুইমারের মনে সব সময় বিচরণ করে জর্জিয়ার কথা।
৮। নুয়েভা এসপেরেনজা (Nueva Esperanza)
মেয়ে, দৈর্ঘ্য ৫ ফিট, প্রস্থ ৩ ফিট ৮ ইঞ্চি, ওজন ৩৭৫ কেজি।
নিউফাউণ্ডল্যাণ্ডের দূরবর্তী তীর থেকে যাত্রা শুরু করলেও, অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে নুয়েভার কাছে দূরত্ব কোনো ব্যাপারই নয়। যদিও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তার, স্পেনিশ ভাষায় নুয়েভা এসপেরেনজা মানে "নতুন আশা", আর এ জিনিসটিই তার প্রচেষ্টাকে সকলের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে তুলে ধরে।
৯। সীবিস্কিট (Seabiscuit)
পুরুষ, দৈর্ঘ্য ৫ ফিট ৬ ইঞ্চি, প্রস্থ ৪ ফিট, ওজন ৪৯০ কেজি।
প্রতিযোগীদের মধ্যে সর্বপ্রথম ট্যাগ পরিধান করে সীবিস্কিট। এছাড়া তার খোলকের সম্মুখভাগে রয়েছে অদ্ভুত এক চিহ্ন, যার কারণে সহজেই শনাক্ত করা যায় তাকে। যদিও দাগটি কীভাবে তার শরীরে আসল জানা যায়নি, এ থেকে প্রতীয়মান হয়, সুদীর্ঘ জীবনে যত কিছুরই মুখোমুখি হোক না কেন, খুব দৃঢ় মানসিকতার অধিকারী সীবিস্কিট।
অবশ্য এটি কোনো বিস্ময়েরও ব্যাপার নয়, কারণ সীবিস্কিট তার নামটি পেয়েছে বিখ্যাত সেই রেসের ঘোড়ার কাছ থেকে, ট্র্যাকে যার বীরত্বপূর্ণ দক্ষতা গ্রেট ডিপ্রেশানের সময় আমেরিকাবাসীকে করে তুলেছিল উজ্জ্বীবিত। এক বিংশ শতাব্দীর সীবিস্কিটও অনুসরণ করতে চায় তার পূর্বসুরীর পদাঙ্ক, এ সময়ে যা খুবই প্রয়োজন।
১০। সার্চার (Searcher)
মেয়ে, দৈর্ঘ্য ৪ ফিট ৭ ইঞ্চি, প্রস্থ ৩ ফিট ৪ ইঞ্চি, ওজন ২৭৫ কেজি।
সার্চার, হতে পারে প্রতিযোগিতার ক্ষুদ্রতম প্রতিযোগী, কিন্তু বড় আলোড়ন তুলতে একেবারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার মসৃণ, দ্যূতিময় খোলকের সাহায্যে দ্রুতই সে ধাবিত হতে পারবে ক্যারিবীয়ার দিকে, এবং গভীর সমুদ্রের উপর তার জ্ঞান তাকে "গভীরতম ডুবুরি" হিসেবে এগিয়েই রাখবে প্রতিযোগীদের মধ্যে।
১১। ওয়াওয়া বীয়ার (Wawa Bear)
মেয়ে, দৈর্ঘ্য ৫ ফিট ৯ ইঞ্চি, প্রস্থ ৪ ফিট ১ ইঞ্চি, ওজন ৬০০ কেজি।
নোভাস্কিয়ার পানিতে ধৃত সর্ববৃহৎ সে চর্মপৃষ্ঠ সে, বাস্তবের অধিকাংশ ভল্লুকের চেয়েও বিশালদেহী। এ থেকে তার নামের বীয়ার অংশটি বুঝা যায়। আর ওয়াওয়া অংশটুকু আসে তার দাদীর নাম থেকে, যে নামে সে দাদীকে ডাকত খুব ছোটবেলায়।
কানাডা ও ক্যারিবীয়ার মধ্যে নিয়মিতই ভ্রমণ করে থাকে ওয়াওয়া। ১৯৯৩ সালের পর থেকে প্রতি ২ বছর পর পর ফরাসী গায়ানাতে অবকাশ যাপন করে আসে সে। দৃঢ়চেতা ওয়াওয়া বীয়ার এমন কেউ নয় যে পথের মধ্যে কাউকে থামিয়ে গন্তব্য জানতে চায়।
১৪শ দিন
ভদ্র মহিলা, ভদ্র মহোদয়গন
এই মাত্র শেষ হলো দুই সপ্তাহব্যাপী রুদ্ধশ্বাস সেই প্রতিযোগিতা। ইতোমধ্যে প্রতিযোগিতার ফলাফল আমাদের হাতে এসে গেছ। খুব শীঘ্রই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আরো বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্ট আপনাদের সামনে প্রদর্শন করা হবে। আপাতত আমরা দেখি, কারা বিজয়ী হলো।
আপনারা দেখেছেন, কী দুর্দম এই সাতারুগুলি! আধুনিক কোনো প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই পাড়ি দিয়েছে শ্বাপদসঙ্কুল হাজার হাজার মাইল। অবশ্য এ আর নতুন কিছু নয়, এ কাজটি তারা করে এসেছে যুগ যুগ ধরে।
আজকে সৃষ্টিজগতের বিস্ময়কর প্রাণী, চর্মপৃষ্ঠ এই কচ্ছপগুলি বিপন্নপ্রায়। আপনার একটু মমতাই তাদের রক্ষা করতে পারে বিরাট বিপর্যয় থেকে। এ কোনো করুণা নয়, মানুষ হিসেবে জগতের প্রতি আপনার ঋণ শোধ মাত্র।
সূত্রঃ Click This Link অবলম্বনে
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মে, ২০০৯ রাত ১২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


