somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

(বাংলা) শব্দ-রাজ্যে অভিযান (১): বালখিল্যতা

০১ লা ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বৈদিক ধর্মের পুরোধা হিসেবে বিবেচিত সপ্তর্ষির অন্যতম ঋষি কাস্যপ (Kasyapa), বিয়ে করেন প্রজাপতি দক্ষের তের কন্যাকে, কালক্রমে জন্ম হয় দেব, অসুর, নাগ, অপ্সরা ও মানবগোষ্ঠির। পুত্র সন্তান লাভের আশায় একদা যজ্ঞের (sacrifice) আয়োজন করেন কাস্যপ, সে এক প্রকাণ্ড কাণ্ড বটে। দলে দলে যোগ দেয় দেব, গান্ধর্ব্য ও মুনির দল।

যজ্ঞের অগ্নিকাষ্ঠ বয়ে আনার ভার পড়ে দেবরাজ ইন্দ্র (Indra) এবং ৬০,০০০ মুনির এক গোত্রের উপর। বড় বড় বৃক্ষের আস্ত গুঁড়ি নিয়ে যখন অতিকায় স্তুপ বানিয়ে ফেলেন ইন্দ্র, তখন মুনির দল বয়ে আনেন কেবল পলাশ পাতার একটি বৃন্ত কিংবা এক চিলতে কাঠ। মুনি বেচারাদের অবশ্য দোষ নেই, যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন তারা। কিন্তু কী-ই বা করবেন, শারীরিক উচ্চতায় তারা মানুষের বৃদ্ধাঙ্গুলির সমান মাত্র!

নিজের পর্বতসম অর্জনের দিকে দৃষ্টিপাত করেন ইন্দ্র, দৃষ্টিপাত করেন ক্ষুদ্রাকৃতির মুনি, এবং ততোধিক ক্ষুদ্র তাদের অর্জনের দিকে। ক্ষমতায় মদমত্ত ইন্দ্র সংবরণ করতে পারেন না হাসি, মেতে উঠেন উপহাসে।

এত বড় সাহস, এত বড় অপমান! অক্ষম ফেলনা নন তারা, পিতা তাদের সপ্তর্ষির আরেক ঋষি, ব্রহ্মার মানসপুত্র ক্রেতু (Kratu), মাতা তাদের বিখ্যাত কর্দম মুনির ষষ্ঠ কন্যা ক্রিয়া (Kriya)। ক্রিয়া-ক্রেতুর ৬০,০০০ সন্তান তারা, যাদের প্রত্যেকেই বাণপ্রস্থ (vanaprastha) অবলম্বনের মাধ্যমে সংসারজীবন পরিত্যাগ করেন এবং কঠোর কৃচ্ছ্রব্রতের (asceticism) মধ্য দিয়ে লাভ করেন সিদ্ধি; সাধনায় এতই উৎকর্ষ লাভ করেন যে তপশ্চর্যার আত্মিক অগ্নিশিখায় সর্বদাই তীব্রভাবে জ্বলতে থাকেন তারা। সূর্যদেবের চক্র পরিভ্রমণের সময় রথের দিকে মুখ করে অগ্রগামী হয়ে থাকেন তারা, বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক (vedic mantras) পূজা নিবেদন করেন তাকে।

ক্রোধে কাজ বন্ধ করে দেন মুনির দল, অভিশাপ দেন ইন্দ্রকে, "এমন এক পুত্র জন্মগ্রহণ করবে কাস্যপের ঘরে যে হবে সকল সৃষ্টির ইন্দ্র!" তারপর সে ইন্দ্র তৈরি করার জন্য কাতর-প্রার্থনায় (penance) বসে গেলেন তারা।

প্রমাদ গুনেন হতবুদ্ধি ইন্দ্র, শরণাপন্ন হন কাস্যপের, "কী এর প্রতিবিধান, হে কাস্যপ?"
"লক্ষণ বেশি সুবিধার ঠেকছে না আমার কাছে, হে ইন্দ্র! ভালো হয় আপনি ব্রহ্মাকে আহ্বান করলে।" কাস্যপ পরামর্শ দেন।

আকুলভাবে ব্রহ্মাকে (Brahma) ডাকেন ইন্দ্র। সব শুনে নিজের ব্রহ্মতালুতেই উত্তাপ অনুভব করেন ব্রহ্মা, "দেখো হে, ইন্দ্র, অভিশাপটি একেবারে নিষ্ক্রিয় করা যাবে না। আমি বরং একটু পরিবর্তিত করে দেই—এমন এক পুত্র জন্মগ্রহণ করবে কাস্যপের ঘরে যে হবে সকল পক্ষির ইন্দ্র, এবং এক সময় সে বন্ধু হবে তোমার, ফলে তার রোষানল থেকে বেঁচে যাবে তুমি।" কালক্রমে কাস্যপের এক স্ত্রী বিনাতার (Vinata) গর্ভে জন্ম নেয় সে অভীষ্ট পুত্র, যার নাম হয় গরুড় (Garuda), যে দেবালয় থেকে অমৃত ছিনিয়ে আনার সময় সত্যি সত্যি ইন্দ্রকে পরাভূত করে—পূর্ণ হয় ক্ষুদ্র মুনিদের অভিশাপ।

মহাভারত ও রামায়ণ উপাখ্যানের বিভিন্ন অংশে উল্লেখিত, বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের সমান আকৃতির এ মুনিদের সম্মিলিত নাম বালখিল্য (Valakhilya)। শারীরিক ক্ষুদ্রাকৃতি ও ঔজ্জ্বল্যের কারণে এরা দেখতে শিশুসুলভ, যেখান থাকে পরবর্তীতে রূপকার্থে বালখিল্যতা শব্দটির প্রচলন, যার মানে "বয়ষ্ক মানুষের অত্যন্ত শিশুসুলভ আচরণ।"

বালখিল্যতার একই উৎস থেকে বালক, বালিকা, বালসুলভ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা প্রভৃতি শব্দসমূহও বিকাশ লাভ করেছে।

জোনাথন সুইফটের Gulliver's Travels উপন্যাস রচনায় বালখিল্যদের প্রভাব ছিল কি না জানা না গেলেও, আক্ষরিক অর্থে বালখিল্যদের ইংরেজি প্রতিশব্দ হতে পারে Lilliput। _____________________________________________
ইংরেজি শব্দের ব্যুৎপত্তির উপর শব্দ-রাজ্যে অভিযান নামে একটি ধারাবাহিক শুরু করেছিলাম। বেশ কিছু পর্বও হয়ে গেল ইতোমধ্যে। ইংরেজিতে তাই আপাতত সাময়িক বিরতি নিচ্ছি; শুরু করছি বাংলা শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়ে। আজকের পর্ব ছিল বালখিল্যতা

আশা করি, নতুন এ প্রচেষ্টাকে পাঠকগণ আগের মতোই গ্রহণ করবেন, বালখিল্য কোনো প্রয়াস ভাববেন না। :)

পুরাণ সংক্রান্ত তথ্যসূত্রঃ
১। http://en.wikipedia.org/wiki/Kashyapa
২। Click This Link
৩। Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ২:৩৯
৫০টি মন্তব্য ৪৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×