somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... অর্ধেক আকাশ ধরে রাখা নারীদের গল্প
তিনি সাংবাদিক তাওয়াক্কুল কারমান, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রথম আরব নারী, শান্তিতে কনিষ্ঠতম নোবেল বিজয়ী। মানুষ শ্রদ্ধা ভরে তাঁকে ডাকে, বিপ্লবের জননী। তাঁর নিজেরই রয়েছে তিনটি সন্তান, আর এখন সমগ্র ইয়েমেনি জাতিরই মায়ের ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে তাকে।

পুরস্কারের যথার্থতার ব্যাপারে কারমানের আশ্বাস কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে নির্বাচক কমিটিকে, কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক হিসেবে বিবেচিত এ পুরস্কারটির সাথে বিতর্কের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। একেবারে সম্প্রতি, ২০০৯ সালে ওভাল অফিসে বসতে না বসতেই, বারাক ওবামার নোবেল পাওয়া ছিল বিস্ময়। এর পরের বছরই চীনের ভিন্ন মতাবলম্বী নেতা লু জিয়াওবোকে পুরস্কার প্রদান বিশ্ব জুড়ে জন্ম দিয়েছে সমালোচনার, নরওয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন করেছে চীন।

কারমান পুরস্কার গ্রহণ করেন আরও দুজন নারীর সঙ্গে। তাঁদের একজন লাইবেরিয়া তথা আফ্রিকা মহাদেশের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট এলেন জনসন সিরলেফ; অন্যজন তাঁরই স্বদেশি, সমাজকর্মী লিমা বৌউই। তিন জনের যে বিষয়টি সবার আগে চোখে পড়ে, ব্যক্তিত্বে প্রায় পুরোপুরিই ভিন্ন তাঁরা। সিরলেফ রাশভারী, কথা বলেন ধীর শান্ত স্বরে, যৌথ পরিবারের প্রাচীন দাদিমাদের মতো। লিমা স্পষ্টবাদী, আবেগে ফুটছেন যেন, ঠোঁটকাটা বলেই ভুল হয়। আর সারাক্ষণ কেবল হাসছেন কারমান। কিন্তু দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে অভিন্ন চিন্তা ও সংগ্রাম হৃদয়ের একই বন্ধনে বেঁধেছে তাঁদের। আর এ কারণেই হয়তো, কারমান, বাকি দুজনকে যিনি সরাসরি দেখেননি কখনো, অসলোতে এসেই যে লিমার হাতটি ধরলেন, ছেড়েছেন খুব অল্প সময়ের জন্যই।

সিরলেফ, লিমা ও কারমান পুরস্কার পেয়েছেন অবিচার, যৌন সন্ত্রাস ও নিপীড়ণের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলনের জন্য। "আপনারা প্রাচীন সেই চীনা প্রবাদটির সুনির্দিষ্ট অর্থ দিয়েছেন, নারীরা ধরে রাখে অর্ধেক আকাশ," নরওয়ের নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান থরবিওর্ন ইয়াগল্যান্ড তাঁর ভাষণে বলেন। "আমাদের মধ্যে যে আশার সঞ্চার করেছেন আপনারা, তার জন্য ধন্যবাদ।"

নব্বইয়ের দশকের অধিকাংশ সময় লাইবেরিয়া অতিবাহিত করেছে রক্তপাতের ভেতর দিয়ে। সবচেয়ে করুণ ছিল লাইবেরিয়ার শিশুদের অবস্থা; তাদের একদল হয়ে উঠল নরহত্যাকারী সৈনিক, আরেক দল প্রাণভয়ে ভীত উদ্বাস্তুর মতো পালিয়ে বেড়াতে থাকল বনে-জঙ্গলে। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে চার্লস টেলর ক্ষমতা আরোহণের পর পশ্চিমা আফ্রিকার দেশটিতে সবাই যখন দীর্ঘমেয়াদী রক্তপাতের আশঙ্কা করছিল, কেউই কল্পনাও করতে পারেনি, লাইবেরিয়ার নারীরাই একদিন পরিবর্তনের আলোকবর্তিকাটি নিয়ে আসবেন।

"তুমি যখন কোনো আশা দেখো না, নিজেকে যখন নিঃস্ব দেখো, তুমি যখন ক্রুদ্ধ হও, তখন তোমার সামনে দুটি পথ খোলা থাকে: বন্দুক তুলে নাও হাতে, কিংবা ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা কর। আমি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছি," প্রশ্নোত্তর পর্বে লিমা বলেন। "লাইবেরিয়ার নারীদের গল্পটি সিনডারেলা উপাখ্যানের মতোই।"

লিমা তাঁর সংগ্রামে সমর্থন পেয়েছিলেন নারী আধিকারকর্মী এবং প্রাক্তন অর্থমন্ত্রি সিরলেফের। গ্রিক পুরাণের অতলগহ্বর থেকে লাইবেরিয়ার উত্তরণে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন সিরলেফ, এ বছর দ্বিতীয় মেয়াদে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। "আমাদের শিশুরা পালিয়ে যাচ্ছিল। আমরা তাদের ফিরিয়ে আনলাম, আমরা তাদেরকে আশা দিলাম।" সিটি হলের জনাকীর্ণ কক্ষে ক্ষণিকের জন্য হলেও আর্দ্র হয়ে উঠে রাশভারী এই নারীর কণ্ঠস্বর।

তবে বাকি দুজনের মতো স্বস্তিদায়ক নয় তাওয়াক্কুল কারমানের মাতৃভূমির পরিস্থিতি। যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র আর নিপীড়ণের মাধ্যমে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতা ধরে রাখেন স্বৈরাচারী আলী আবদুল্লাহ সালেহ। দেশ শাসনের বিপদ ও অনিশ্চয়তাকে সালেহ নিজেই আখ্যায়িত করেন, সাপের ফনায় দাঁড়িয়ে নৃত্যের সাথে। তারপরও তেত্রিশ বছর ধরে নেচেই গিয়েছেন সালেহ; আর জীবনের তেত্রিশ বছর পূর্ণ হতে কামরানের এখনও এক বছর বাকি।

সালেহ পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে এখনও ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। "সালেহ মিথ্যাবাদী, এবং তিনি মিথ্যা বলে যেতেই থাকবেন। স্বেচ্ছায় তিনি ইয়েমেন ত্যাগ করবেন না, কিন্তু আটাশ হাজার নিহত ও আহত ইয়েমেনির আত্মত্যাগ নিষ্ফল হতে দিতে পারি না আমরা," দৃঢ়কণ্ঠে বলেন কারমান।

আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না জানতে চাইলে সিএনএনের প্রশ্নকর্তাকেই পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন কারমান, "ইয়েমেনে কি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে? আমেরিকা প্রশাসনকে দয়া করে প্রশ্নটি করবেন আপনারা।" তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যথার্থ পদক্ষেপের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে বিজয়ী হবেন তিনি, হাস্যোজ্জ্বল আত্মবিশ্বাসী তাঁর মুখ।

বিপ্লবের জননী, যিনি উজ্জ্বীবিত হন তাঁর ধর্মবিশ্বাসের সাম্যে, যিনি উজ্জ্বীবিত হন সুপ্রাচীন, বিখ্যাত এক ইয়েমেনি নারীর গৌরবময় ইতিহাস ও কর্মকাণ্ডে, সফল হবেন কি শেষ পর্যন্ত, তাঁর সন্তানদের জন্য? আমরা আশাবাদী, তাওয়াক্কুল কারমানই হবেন আধুনিক ইয়েমেনে প্রাচীন সেবা'র রাণী।
(সিটি হলের অনুষ্ঠান থেকে ফিরে, ১০ ডিসেম্বর ২০১১, অসলো, নরওয়ে)
____________________
* কিছুটা পুরোনো লেখা, সংকলিত পাতায় না দিয়ে মূলতঃ সংরক্ষণের জন্য আমার ব্লগে রেখে দিলাম। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29539703 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29539703 2012-02-12 18:26:53
আর্মেনীয় কবরস্থান
১। কবরস্থানটি ইংরেজি কত সালে কে বা কারা নির্মাণ করেন?

২। এখানে কতজন শায়িত আছেন?
যথাসম্ভব তাদের নাম-পরিচয়, কবরে উৎকীর্ণ সমাধিলিপি (epitaph) পেলে ভালো হয়। একটু দুরূহ কাজ, তবু আংশিকও যদি সম্ভব হয়।

৩। স্থানটিতে আর্মেনীয় জাতিগোষ্ঠি ছাড়া অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠির মানুষের সমাধি আছে কি?

৪। কবরস্থানটির বর্তমান অবস্থা কী?

৫। কবরস্থানটি বর্তমানে কী কী সমস্যা, পরিবেশগত কী ধরণের হুমকির মুখে রয়েছে? রাষ্ট্রীয়ভাবে সংস্কারের কোনো পদক্ষেপ চলছে কি?

৫। অন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য...

আমার বয়স্য একজন নরওয়েজিয়ান বন্ধুকে, যিনি প্রত্নতত্ত্ব ভালোবাসেন খুব, কবরস্থানটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে একটি লেখা উপহার দিতে চাই। তথ্যসূত্র বস্তুনিষ্ঠ হওয়া জরুরি, কারণ কবরস্থানটির উপর চমৎকার কিছু কাজ করতে আগ্রহী তিনি।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29506226 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29506226 2011-12-20 00:59:05
পেলোপনিসীয় যুদ্ধ এবং প্লেগ ও ঘনকের উপাখ্যান ডোরীয়দের পেছন পেছন আসবে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এক, আর আসবে মৃত্যু।—পেলোপনিসীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে এথেন্সে প্রচলিত সাবধানবাণী।


"আগামীকাল প্রত্যুষেই যাত্রা শুরু করবেন আপনারা," অ্যাক্রোপলিসের অভ্যন্তরে নৈশকালীন অধিবেশনটিতে শান্তভাবে তার নির্দেশ ঘোষণা করল পেরিক্লিস। "ক্ষীপ্রগতির পাঁচটি ত্রিসারদাঁড়ি রণতরী সুসজ্জিত হয়ে অপেক্ষা করছে পাইরিয়াস বন্দরে। কেয়া ও কিথনোস দ্বীপের মধ্যবর্তী জলপথ ধরে এগুবেন আপনারা, সিরোস দ্বীপের উপকূল ঘেঁষে অর্ধবৃত্তাকার বাঁক নিয়ে সোজা পৌঁছবেন ডিলোসে। ঘন্টায় আশি স্টেডিয়া হিসেবে আজ রাতের মধ্যেই আপনারা পৌঁছে যাবেন সেখানে। যাজিনীদের শাস্ত্রীয় আচারাদি সাবধানতার সাথে সম্পন্ন করে, মন্দিরের বেদীতে বহুমূল্য উপঢৌকন অর্পণ করে, বিনম্র প্রশ্ন রাখবেন, ভয়ঙ্কর এ মহামারী থেকে পরিত্রাণ পেতে এথেন্সের প্রায়শ্চিত্ত কী।"

বয়স্য মানুষ তিনজনের দিকে তাকায় পেরিক্লিস, ডিলোস দ্বীপে এরাই গ্রহণ করবেন অ্যাপোলোর দৈববাণী। ধীরে ধীরে পেরিক্লিস পুনর্ব্যক্ত করে তার কৌশল, "আপনারা থাকবেন মাঝখানের অর্ণবপোতে; অবশিষ্ট পোত চতুষ্টয় চারদিক থেকে বেষ্টন করে এগিয়ে নিয়ে যাবে আপনাদের। প্রত্যেক যানে থাকবে পনের জন আয়োনীয় পদাতিক যোদ্ধা এবং চার জন শক তীরন্দাজ, যদিও কিকলাডিস দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশে ডোরীয় আক্রমণের আশঙ্কা করছি না আমি, কারণ ল্যাকোনিয়ার উপকূল বরাবর গভীর সমুদ্রে চলাচল করছে আয়োনীয় নৌবহর। সামনের রণতরীতে আপনাদের সমগ্র বহরের নেতৃত্বে থাকবে অ্যালসেবাইয়েডিজ।"

বৃদ্ধ থিওফাস, বয়োজ্যেষ্ঠ দলটির নেতা, কথা বলেন এবার, "বয়স হয়েছে আমার, হে পেরিক্লিস, আয়োনীয়দের মহান নেতা, ওপারের ডাক শুনতে পাই আজকাল। তবু মনে সাধ জাগে বড়, স্টিক্স নদীর খেয়া পার হয়ে, লিথি নদীর জল পান করে জীবনের সব স্মৃতি ভুলে যাওয়ার পূর্বে, শেষবারের মতো আবার উঠুক ঢাল-তলোয়ার হাতে আমার, আরেকবার আমি মুখোমুখি হই ডোরীয়দের। হয়তো প্রথম আঘাতেই ভূলুণ্ঠিত হবে জরাক্লিষ্ট বার্ধক্যদেহ আমার, কোনো হোমার হয়তো গাইবে না প্রশংসাগাঁথা আমাকে নিয়ে, তবু অ্যাটিকার প্রান্তরে সম্মুখসমরেই অবসান হোক জীবন আমার।"

খানিকক্ষণ মৌনতা অবলম্বন করে পেরিক্লিস, স্পষ্টতঃই বুঝতে পারে বৃদ্ধের মনোভাব। পেলোপনিসের যুদ্ধটি শুরু হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই অ্যাটিকার গ্রামাঞ্চলগুলিকে স্পার্টার কবলে ছেড়ে দেয় এথেন্স, নিজেকে গুটিয়ে নেয় তার পূর্ব ও পশ্চিমের দেয়ালগুলির অভ্যন্তরে, গড়ে তোলে তীব্র প্রতিরোধ; আর পাইরিয়াস বন্দর থেকে রণতরীর সাহায্যে ঈজিয়ান সাগরের বাণিজ্যপথগুলি নিয়ন্ত্রণে রাখে নিজের। স্থলযুদ্ধে ডোরীয়দের এড়ানো, কিন্তু নৌযুদ্ধে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া—পেরিক্লিসের এ রণকৌশল এখন পর্যন্ত সফলই বলা চলে, তবু স্থলভাগে স্পার্টার মুখোমুখি না হওয়াটা অনেক এথেনীয়ের চোখে সৃষ্টি করে শ্লেষের। আর এখন, ভয়ঙ্কর এ প্লেগ, যা লাশের পর লাশ ফেলছে এথেন্সের পথেঘাটে, তার জন্য পেরিক্লিসকেই দায়ী করে তারা।


"আপনার শৌর্যবীর্য যুগযুগ ধরে স্মরণ করবে আয়োনীয়গণ, হে শ্রদ্ধেয় থিওফাস, প্রেরণা জোগাবে তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে," দৃঢ়ভাবে বলে উঠে পেরিক্লিস। "পারস্যের বিরুদ্ধে ম্যারাথনের যুদ্ধে আপনারা বীরত্বগাঁথা আজও একইভাবে উজ্জ্বীবিত করে আমাদের তরুণদের, শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও রক্ষা করে যাবে তারা মাতৃভূমির দেয়াল। কিন্তু স্থলভাগের যুদ্ধে স্পার্টার মুখোমুখি হবার সময় হয়নি এখনও। এথেন্সের দেয়ালের বাইরে নিষ্ফল আক্রোশে ফুঁসবে স্পার্টা, আর ল্যাকোনিয়া, কোরিন্থ ও আর্গোসের বন্দরগুলিতে নৌআক্রমণের মাধ্যমে ডোরীয় ও তাদের মিত্রদের জীবন বিষিয়ে তুলব আমরা। এভাবেই শত্রুদের বিরুদ্ধে জয় হব আমরা, শ্রদ্ধেয় থিওক্লিস। কিন্তু জিউসপুত্রের পাঠানো এ প্লেগের হাত থেকে পরিত্রাণ দরকার সর্বাগ্রে। যেকোনো সময়ই আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি ডোরীয়দের উপর, কিন্তু হেলিওসের ক্রোধ দূর করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। "
"তবে তা-ই হোক, হে আয়োনীয়দের মহান নেতা।" থিওফাস সন্তুষ্ট হয় পেরিক্লিসের বক্তব্যে।

"আমরা কেন ডেলফাই-এর মন্দিরে না গিয়ে ডিলোসে যাচ্ছি, মামা?" এবার প্রশ্ন করে অ্যালসেবায়েডিজ। "স্থলপথে ডেলফাই তুলনামূলকভাবে কাছে। এছাড়া সমুদ্রে ঝড় উঠতে পারে যেকোনো সময়, আমাদের সব জাহাজ হারিয়ে যেতে পারে একসঙ্গে। তখন তো ফিরে গিয়ে আপনাকে খবরটি পৌঁছানোরও কেউ থাকবে না।"

মৃদু হাসে পেরিক্লিস, যুদ্ধের প্রতি ভাগ্নের ঝোঁকটি অপ্রত্যাশিত নয়। পেলোপনিসিয়া যুদ্ধের শুরুতেই স্পার্টার ছোট একটি দলের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল অ্যালসেবায়েডিজ, সক্রেটিস না থাকলে সেদিনই নিহত হতো সে। তারপর থেকেই দুয়েকটি ডোরীয় হত্যা করে নিজের বীরত্ব প্রমাণ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে সে।

"তিনটি কারণে তোমাদের ডিলোসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি," পেরিক্লিস ব্যাখ্যা করে। " প্রথমতঃ, আজ রাতেই ঘটবে উত্তরায়ণ, ঈজিয়ানের বুকে আগমন ঘটবে গ্রীষ্মকালের। আর এসময়, প্রতি গ্রীষ্মে, লিশিয়া থেকে বারবার ফিরে আসে অ্যাপোলো তার জন্মভূমি ডিলোসে। জিউসপত্নী হেরার ভয়ে অন্তঃসত্ত্বা লেটো যখন ছুটে বেড়াচ্ছিল ভূমি থেকে ভূমিতে, আর্টেমিস-অ্যাপোলোকে ভূমিষ্ঠ করার জন্য এক টুকরো মাটির খোঁজে, কোনো টেরা ফার্মা কিংবা কোনো দ্বীপ জায়গা দেয়নি লেটোকে। কেবল ক্ষুদ্র এই ডিলোস দ্বীপ, যা ভেসে বেড়াচ্ছিল ঈজিয়ানের বুকে, গ্রহণ করে আর্টেমিস-অ্যাপোলো যমজ ভাইবোনকে। তাই আশা করছি, ডিলোসে বিচরণকালে হৃদয় নরম থাকবে লেটোপুত্রের।

দ্বিতীয়তঃ, এথেন্সের বাইরে অ্যাটিকা, থিবিস, বিওশিয়া থেকে ডেলফাই পর্যন্ত পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে ডোরীয় হাপলাইট যোদ্ধা ও তীরন্দাজগণ। তাদের ভেতর দিয়ে স্থলপথে ডেলফাই পৌঁছার চেষ্টা করা আত্মহত্যারই শামিল। সমুদ্রপথেও এ মুহূর্তে ডেলফাই পৌঁছা অসম্ভব, কারণ তার জন্য পুরো পেলোপনিস ভূখণ্ড ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে ক্যালিডোন উপসাগর দিয়ে ঢুকতে হবে, আর তাতে সময় লাগবে ডিলোসের বহুগুণ বেশি। এছাড়া নিশ্চিতভাবেই ডেলফাই তীরে সমুদ্র খাঁড়ির মুখে পাহারা বসিয়েছে ডোরীয়রা।

তৃতীয় কারণটি হচ্ছে, অ্যাপোলোর সকল দৈববাণীর মধ্যে ডিলোসের বাণী সবচেয়ে সরল ও সহজবোধ্য। ডেলফাই বা অন্য কোথাও গিয়ে দুর্বোধ্য বাণীর মর্মোদ্ধার করার সময় নেই এখন আমাদের।"

একটু থেমে সভার দিকে তাকিয়ে বলে পেরিক্লিস, "এক পক্ষকাল পর্যন্ত আপনাদের জন্য অপেক্ষা করব আমরা। এ সময়ে কোনো সংবাদ না পেলে ধরে নেব অশুভ কিছু ঘটেছে আপনাদের, দ্বিতীয় দল পাঠাব তখন। আজ রাতে তবে বিশ্রাম নিন।" সভার সমাপ্তি ঘোষণা করে পেরিক্লিস।

পরদিন সকালে এথেন্স ত্যাগ করে দলটি, ফিরে আসে এক সপ্তাহ পর। খুব সরল শর্ত দিয়েছে অ্যাপোলো:
"এড়াতে চাও যদি তোমরা প্লেগের স্পর্শে হিমশীতল সমাধি, দ্বিগুণ করো মোর মন্দিরের বেদী।"

অ্যাপোলো মন্দিরের ঘনক আকৃতির বেদী, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা তার দ্বিগুণ করা হলো দ্রুত। তারপর অপেক্ষা করতে লাগল এথেন্সবাসী, কখন থেমে যাবে মহামারীর ভয়াল থাবা। কিন্তু না, উপশম হলো না প্লেগের, বরং ছড়িয়ে পড়ল তা আরো দ্রুতগতিতে। আবার সভা ডাকল পেরিক্লিস, দৈববাণীর মর্মার্থ উদ্ধার করতে নিশ্চয়ই ভুল হয়েছে কোথাও। হ্যাঁ, সরল শর্তটি পালন করতে পারেনি তারা, বেদী আসলে দ্বিগুণ না হয়ে আটগুণ হয়ে গেছে। দুই চাঁদ পর ডিলোসে পাঠানো হলো নতুন দূত দল।

রুষ্টঃস্বরে অ্যাপোলোর দৈববাণী এবার,
"আমার সাথে লুকোচুরি নিস্ফল, হে এথেন্সবাসী! স্পষ্ট করে শোনো শেষবার: নতুন বেদী করবে নির্মাণ, আকারে ঘনক পূর্বের ন্যায়, আয়তনে তার দ্বিগুণ পরিমাণ।"


দুরুদুরু বুকে ফিরে আসে দৈববাণী সংগ্রাহকগণ, পেরিক্লিস আহ্বান করে এথেন্সের গণিতবিদদের। কিন্তু গত ষাট বছর ধরে প্রথমে পারস্য আর এখন ডোরীয়দের সাথে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত এথেন্সে থেলিজ পিথাগোরাসের জ্যামিতিক স্বর্ণযুগ আর নেই। তবু তারা আশা করেছিল, পিথাগোরাসের সমকোণী ত্রিভুজে অন্ততঃ পাওয়া যাবে সমস্যাটির সমাধান। কিন্তু দিন মাস পেরিয়ে চলে গেল বছরের পর বছর, সমাধান হলো না ঘনকের দ্বিগুণকরণসংক্রান্ত এই ডিলীয় সমস্যা। প্লেগে ধ্বংস হয়ে গেল এথেন্সের এক-তৃতীয়াংশ অধিবাসী।
__________________
ডিলীয়দের ঘনকের দ্বিগুণকরণ (Doubling the Cube) সমস্যার পৌরাণিক উপাখ্যান শেষ করে উঠতেই সারাকা বললো, "কিন্তু বাবা, এথেন্সবাসীগণ প্রথম চত্বরের দ্বিগুণ আয়তনের চত্বর নির্মাণ করতে পারল না কেন?"
"ডিলীয় গাণিতিক সমস্যাটি ছিল বিশুদ্ধ জ্যামিতিক নিয়মে একটি ঘনকের দ্বিগুণ আয়তনের ঘনক নির্মাণ করা। সেটি বুঝার আগে এ ধরণের জ্যামিতিক বিনির্মাণ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। ধরো, তোমার কাছে ১ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের একটি রেখাংশ আছে, এর সাহায্যে ৭ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের একটি রেখাংশ কীভাবে তৈরি করবে?" প্রশ্ন করি আমি।

"এ তো খুব সহজ, বাবা! রেখাংশটিকে পরপর সাতবার শুইয়ে তাদের প্রথম ও শেষবিন্দুদুটি চিহ্নিত করে ফেলব, তাদের মধ্যে দাগ টেনে দিব, যার দৈর্ঘ্য হবে ৭ সেন্টিমিটার।"


"হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। তার মানে তোমার কাছে ১ একক দৈর্ঘ্যের রেখাংশ থাকলে তার সাহায্যে তুমি n দৈর্ঘ্যের একটি রেখাংশ নির্মাণ করতে পারবে, যেখানে n একটি পূর্ণসংখ্যা। এবার বলো তো, মামণি, ১ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের রেখাংশের সাহায্যে কীভাবে ০.৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের রেখাংশ আঁকবে তুমি?" আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করি।

বেশ খানিকক্ষণ ভাবে সারাকা। তারপর বলে, "০.৮ সেন্টিমিটার মানে ৮ মিলিমিটার। সেন্টিমিটারের ফিতায় প্রতি সেন্টিমিটারে ১০টি করে দাগ কাটা থাকে, এক দাগে এক মিলিমিটার। সেখান থেকে ৮টি দাগ নিয়ে ০.৮ সেন্টিমিটারের রেখাংশটি আঁকা যাবে, বাবা।"
"কিন্তু তাতে তো ১ সেন্টিমিটারের রেখাংশটি ঠিক ব্যবহার করা হলো না, মা। এছাড়া সময়মতো মাপার ফিতা পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার সেন্টিমিটার না হয়ে সমস্যাটিতে ইঞ্চি, হাত, বিঘতের কথাও বলা থাকতে পারে। সুতরাং দাগকাটা কোনো বস্তুর সাহায্য নেয়া যাবে না। বিশুদ্ধ জ্যামিতিতে বলতে গেলে, দাগহীন মাপকাঠি (Straightedge) এবং বৃত্তাঙ্কনশলাকা (Compass) কেবল ব্যবহার করতে পারব আমরা।"

একথা শুনে খাতায় বেশ খানিকক্ষণ আঁকাআঁকি করে সারাকা। হাল ছাড়তে হয় একসময়, বলে, "পারছি না, বাবা।"
"মন খারাপ করো না।" মেয়ের মাথায় আলতো হাত ছুঁইয়ে সান্ত্বনা দেই আমি। তারপর কলম নিয়ে খাতায় আঁকতে আঁকতে বলি,
"০.৮ সংখ্যাটি দশমিকে আবদ্ধ অন্যসব সংখ্যার মতোই একটি মূলদ সংখ্যা, তার মানে একে দুটি পূর্ণসংখ্যার অনুপাতে প্রকাশ করা যাবে। আর ত খুব সহজ: ০.৮ = ৮/১০ = ৪/৫। সুতরাং ৪/৫কে আঁকতে পারলেই আমাদের কাজ হয়ে যাবে।"

১ দৈর্ঘ্যের রেখাংশটির সাহায্যে কাগজে আমি প্রথমে ৫ দৈর্ঘ্যের রেখাংশ AB টানি। তারপর A বিন্দুতে আড়াআড়িভাবে ৪ দৈর্ঘ্যের AC রেখাংশটি টানি; এটি যেকোনো কোণে আড় হতে পারে, সমস্যা নেই। C, B যোগ করি। CA থেকে শেষ ১ দৈর্ঘ্যের রেখাংশটির সূচনাবিন্দুটি D হিসেবে চিহ্নিত করি, অর্থাৎ CD = ১। তারপর D থেকে AB-এর সমান্তরাল করে DE রেখাংশ টানি যা CB-কে E বিন্দুতে ছেদ করে। অনুরূপ কোণ সমান করে সমান্তরাল রেখাংশটি টানতে এখানে বৃত্তাঙ্কন শলাকার সাহায্য লাগবে।

"এখন DE রেখাংশের মানই হচ্ছে ৪/৫ তথা ০.৮," আমি বলি।
"কিন্তু এটি কীভাবে হলো, বাবা!" ফিতা ছাড়াই একটি ভগ্নাংশ এঁকে ফেলা দেখে সারাকা বিস্মিত ও আনন্দিত হয়।
সদৃশকোণী ত্রিভুজ CDE ও CAB-এর সাহায্যে প্রমাণ করে দেই, বাস্তবিকই DE = ০.৮। তারপর বলি, "এভাবে ১-এর সাহায্যে n/m জাতীয় যেকোনো ভগ্নাংশও আঁকতে পারবে তুমি, যেখানে n ও m দুটি পূর্ণসংখ্যা। এবার তাহলে ডিলিয়ান সমস্যাটির আরেকটু কাছাকাছি যাই। প্রদত্ত একটি বর্গের দ্বিগুণ ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট বর্গ কীভাবে আঁকব আমরা? ধরো, ছোট বর্গটির বাহুর দৈর্ঘ্য n।"

বীজগণিতে হিসেব করে সারাকা:
মনে করি, বড় বর্গের বাহুর দৈর্ঘ্য x। তাহলে


"ছোট বর্গের বাহুর √২ গুণের সমান করে একটি রেখাংশ টেনে তার উপর বর্গ আঁকব, বাবা।" সারাকা জবাব দেয়।
"প্রদত্ত একটি রেখাংশের ২ গুণ, ৩ গুণ আকারের রেখাংশ সহজেই টানা যায়, কিন্তু মা, √২ গুণ আকারের রেখাংশ কীভাবে টানবে তুমি? √২ একটি অমূলদ সংখ্যা, একে দশমিকে প্রকাশ করতে গেলে দশমিক বিন্দুর পর সীমাহীন ও এলোমেলোভাবে অঙ্ক আসতেই থাকবে, শেষ হবে না কখনো। ফলে ৪/৫-এর মতো কোনো ভগ্নাংশে প্রকাশ করতে পারছ না একে।"
"তাই তো!" এতো কাছে এসে সমাধানটি এত জটিল হবে ভাবতে পারেনি সারাকা। বিষণ্ণ হয়ে উঠে চেহারা তার।

খানিক পর হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠে, "পেয়েছি, পেয়ে গেছি, বাবা! আলাদা করে বিচ্ছিন্ন কোনো রেখাংশ আঁকার দরকার নেই। আমরা জানি, কোনো বর্গের কর্ণের দৈর্ঘ্য তার বাহুর দৈর্ঘ্যের √২ গুণ, কাজেই কর্ণের উপর বর্গ আঁকলেই তার ক্ষেত্রফল আগের বর্গের ক্ষেত্রফলের দ্বিগুণ হয়ে যাবে।"


তীব্র হাসিতে উদ্ভাসিত হয় সারাকার মুখ। বাবাদের জীবন অর্থময় করার কতো আনন্দময় ঘটনাই না রয়েছে জগতে, মেয়ের হাসির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবি আমি।

"ঠিক হয়েছে, মামণি। আমি ভাবতে পারিনি, এত চমৎকারভাবে সমাধানটি ধরে ফেলবে। এবার তাহলে ডিলিয়ান সমস্যাটিই ধরি। একটি ঘনকের দ্বিগুণ আয়তনের ঘনক কীভাবে আঁকব আমরা?" আমি প্রশ্ন রাখি।

আবারও বীজগণিত:
মনে করি, ছোট ঘনকের বাহুর দৈর্ঘ্য n, বড় ঘনকের x। তাহলে


"ছোট ঘনকের বাহুকে ২-এর ঘনমূল দিয়ে গুণ করে তার সমান করে একটি রেখাংশ টানতে হবে।" পরবর্তী ১ ঘন্টা সমস্যাটি নিয়ে মেতে থাকে সারাকা, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরে উঠতে থাকে তার আঁকাআঁকিতে।

মেয়ে আমার ব্যস্ত থাকুক গণিতে, পরীক্ষা হোক ধৈর্য্যের তার। জীবনে সফলতায় প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই, এমনকি প্রচেষ্টার ব্যর্থতাও মানব ইতিহাসে যুগযুগ ধরে জন্ম দিয়েছে যুগান্তকারী সব ঘটনা এবং আবিষ্কারের। আপনি যদি সম্রাট টলেমি ও গণিতবিদ ইউক্লিডের সে আলোচনায় উপস্থিত থাকতেন, স্পষ্ট শুনতে পেতেন ইউক্লিড দৃঢ়ভাবে বলে দিয়েছেন সম্রাটকে, জ্যামিতি শিক্ষায় রাজকীয় কোনো পথ নেই!

গণিতের প্রসঙ্গ রেখে এখন হয়তো আমাকে প্রশ্ন করবেন, শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল এথেন্সের! এ ব্যাপারে বিশদ বলে আপনাদের ক্লান্তি আর বাড়াতে চাই না আমি, কারণ হেলেকারন্যাসিসের হিরোডিটাস (Herodotus) বিস্তারিত বলে গেছেন পারস্য-গ্রিক যুদ্ধের কথা, আর এথেন্সের থুসিডিডিস (Thucydides)-এর কাছে শুনতে পাবেন স্পার্টা-এথেন্সের পেলোপনিসীয় এই যুদ্ধের বর্ণনা। তবে প্রাচীন ইতিহাস কিংবদন্তি পুরাণ পাঠে যথাসম্ভব সতর্কতার কথা নিশ্চয়ই আপনারা অবগত আছেন, সত্যের সাথে উপাখ্যানের পার্থক্য অনেক সময় যেখানে ক্ষীণ। সংক্ষেপে কাহিনী হচ্ছে এই—
এথেন্সের গণিতবিদগণ ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যায় দিন, মাস পেরিয়ে বছরের পর বছর। ডিলোস থেকে দ্বিতীয় দলটি ফিরে আসার পরপরই পেরিক্লিস নিজেই আক্রান্ত হয় প্লেগে, মারা যায় সেই হেমন্তেই। দেয়ালের ভেতর তীব্র প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে থাকে এথেন্সবাসী, আর তাদের রণতরীগুলি পূর্বের মতো পাহারা দিতে থাকে ঈজিয়ানের দ্বীপবন্দরগুলি।

স্থলপথের যুদ্ধে এথেন্সকে আকৃষ্ট করতে না পেরে স্পার্টা অবশেষে মনোনিবেশ করে রণতরী নির্মাণে, কিন্তু এথেন্সের দুর্ধর্ষ নৌবহরের মুখোমুখি না হয়ে দক্ষিণ পূর্ব দিকে ঘুরে পারস্যরাজ সাইরাসের সহায়তায় হেলেসপন্ট (Dardanelles) প্রণালীতে এথেন্সের খাদ্যশস্যের উৎস অবরোধ করে তারা। এথেন্সের ক্ষুধার্ত রণতরীগুলো তখন এসে জড়ো হয় হেলেসপন্টে, কিন্তু তেমন দৃঢ় প্রতিরোধ ছাড়াই এথেন্সের বিশাল নৌবহর ধ্বংস হয় স্পার্টা ও পারস্যের সম্মিলিত বাহিনীর হাতে। ৪০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শেষ হয় পেলোপনিসীয় যুদ্ধ, আত্মসমর্পণ করে এথেন্স।

বিদায় নেবার আগে বলে যাই প্রিয় পাঠকদের, কেবল দাগহীন মাপকাঠি এবং বৃত্তাঙ্কনশলাকা দিয়ে ঘনকের দ্বিগুণকরণ অসম্ভব, এবং এ বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি পেরিক্লিসের প্রায় ২৩০০ বছর পর, মাত্র ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে!

শুভ রাত্রি।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29480437 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29480437 2011-11-10 00:15:51
অ! "আমাগো নবাবের সাথে যুদ্ধ হৈতাছে ইংরাজের।"
"অ...," বলে হালচাষে মনোযোগ দেয় প্রথম বাঙালি।

বিকেল বেলায় থেমে আসে গোলাগুলির আওয়াজ। লাঙল-জোয়াল খুলে বাড়িতে যাবার প্রস্তুতি নেয় কৃষকগণ। প্রথমজন প্রশ্ন করে আবার, "গোলাগুলি থাইমা গেল যে, বিষয় কী, যুদ্ধের কী খবর?"
"আমাগো নবাব হাইরা গেছে।" জবাব আসে।
"অ...," লাঙল-জোয়াল গুছিয়ে গরু নিয়ে গাঁয়ের দিকে হাঁটা দেয় কৃষক।

ইতিহাসে এ দুই কৃষকের অস্তিত্ম হয়তো নাই, তারা আছে কেবল গল্পেই; কিংবা না, তার চেয়েও বেশি, তারা আছে বাঙালির সামগ্রিক জাতিচেতনায়—সমগ্র দেশ যখন পরাধীনতার শৃঙ্খলে নিমজ্জিত হয়ে যায়, তখনও আমরা বলতে পারি, অ!

ন্যায়বিচার সহজ নয়। মৃত্যুদণ্ডের মতো ভয়ঙ্কর শাস্তি নিশ্চয়ই অপছন্দের কাজ, তবু কখনো কখনো মানবগোষ্ঠিকে মৃত্যুদণ্ডের কাজটি করতে হয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যই। সৌদি আরবে আট বাংলাদেশীর শিরশ্ছেদে ন্যায়ের প্রতি সৌদি রাজতন্ত্রের একনিষ্ঠতার কোনো প্রমাণ সাধারণ বিবেচনাবোধে পাইনি আমি, কারণ এরা স্বৈরশাসক, নৈতিক মেরুদণ্ড ভঙ্গুর এদের, ফলে দুর্বল বাঙালি এবং সবল ব্রিটিশ/আমেরিকানদের জন্য ভিন্ন বিচার এদের।

নিচের ছবিটি তীব্র লজ্জিত ও ব্যথিত করে আমাকে,

না, আমি ভুলে যাইনি, মিশরের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পুত্রের ছবির উপর বৃদ্ধ এক বাবার মাথাটি হয়তো ঝুলে আছে। কিন্তু বাংলাদেশীর শিরশ্ছেদ সৌদি আরবের ন্যায়বিচার নয়, ভণ্ডামি। গরীব উভয় পরিবারের জন্যই চূড়ান্তভাবে দুঃখজনক হয়ে থাকবে এ বিচার।

এক বিংশ শতাব্দীর পৃথিবী বড় কঠিন জায়গা। দুর্ভিক্ষে, অরাজকতায় শস্যের পরিবর্তে মারণাস্ত্র সহজলভ্য আজকে। শক্তিমত্ত রাষ্ট্র নিজের ভেতরে চাষ করে শান্তির, সন্ত্রাস পাঠায় অন্যদেশে। সৌদি কিংবা বাইরের বিশ্বকে দোষারোপ করার পূর্বে, নিজেদের নির্লিপ্ত অ-থেকে মুক্তির বড় প্রয়োজন আমাদের। আট বাংলাদেশীর শিরশ্ছেদ যেদিন হয়, সেদিনও দেশের বাইরে নোবেল কমিটির বিরুদ্ধে স্লোগান-মিছিল হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কেন নোবেল পেলেন না। আমাদের সামগ্রিক জাতীয় সচেতনতায় এটি ছোট্ট একটি উদাহরণমাত্র, দুঃখ পেলেও দোষারোপ করি না।

আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা রাজনীতি নয়, বরং আমাদের নির্লিপ্ততা। কিন্তু আশার ব্যাপার, নির্লিপ্ত হলেও শান্তিকামী আশাবাদী মানুষ আমরা। যারা মারা গেছেন, তারা আর ফিরে আসবেন না কোনোদিন। ব্লগে বা আসরে তীব্র ঝড় তুলে কয়েক দিন পর ভুলে যাওয়া স্বভাব আমাদের, এ-ও বড় হতাশার। বিরাট পরিকল্পনা নিয়ে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করাও সহজ কাজ নয়, তাই আমি ঠিক করেছি আমার গ্রাম নিয়ে অন্ততঃ দুটি কাজ করব:
১. যারা দেশের বাইরে আছেন, তাদের নিয়ে একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করব।
২. আগামী বছর থেকে কিছু বৃত্তির চালু করব গ্রামে, যাতে শিশুকিশোরদের সমাজসচেতনতা ও নেতৃত্বের বিষয়টি একটি বড় নিয়ামক হবে।

কিছুদিন আগে নরওয়েজিয়ান এক ভদ্রলোকের সাথে প্রথম দেখা, তিনি যখন শুনলেন আমি বাংলাদেশী, কিছুটা অবাক ও উজ্জ্বল হলো তাঁর চেহারা। তারপর বললেন, "আমি শুনেছি তোমরা বাংলাদেশীরা খুব মেধাবী!" তিনি কিছু উদাহরণও দিলেন।

১ ও ২-এর সাথে আমার ৩নং কাজটি হবে, জাতি হিসেবে নিজেদেরকে আরেকটু বেশি শ্রদ্ধা করা, মূল্যবান ভাবা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29463177 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29463177 2011-10-10 04:55:14
নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০১১—আরব বসন্ত! না, Ellen Johnson Sirleaf, Leymah Gbowee and Tawakkul Karman!

"জাতিতে জাতিতে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বস্থাপন, স্থায়ী সেনাবাহিনীর বিলুপ্তি বা হ্রাসকরণ, এবং শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠান ও প্রবর্তনের ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সর্বোচ্চ কিংবা সর্বোৎকৃষ্ট কাজ করে থাকবেন, তার জন্য এক অংশ..." —১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর পূর্বে এভাবেই শান্তি পুরস্কারের কথা ব্যক্ত করে যান আলফ্রেড নোবেল তাঁর উইলে।

একজন রসায়নবিদ বিজ্ঞানের পাশাপাশি শান্তিকেও কেন বেছে নিলেন পুরস্কারের বিষয় হিসেবে, সঠিক জানে না কেউ; নোবেল নিজেও কিছু বলে যাননি এ ব্যাপারে। নিজের যুগান্তকারী সৃষ্টি ডাইনামাইট পৃথিবীতে শান্তি আনয়ন করবে বলে বড় যে বিশ্বাস ছিল তাঁর, সেটি যখন বরং ধ্বংসাত্মক হয়ে আঘাত করলো হৃদয়ে, তখন নিশ্চয়ই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন,নিরবিচ্ছিন্ন শান্তিই হবে মানবজাতির চূড়ান্ত অর্জন।

শুধু বিষয় হিসেবেই নয়, শান্তি পুরস্কার নির্বাচক সমিতি নিয়েও বিশ্বকে অবাক করেন নোবেল, মাতৃভূমিক সুইডেনকে রেখে এর ভার দেন নরওয়ের সংসদের উপর। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে জীবনের শেষ দিনগুলোতে, নোবেল যখন তাঁর উইলের পরিকল্পনা করেন, নরওয়ে-সুইডেনের রাষ্ট্রীয় সংঘ—যাতে নরওয়ে একপ্রকার সুইডিশ শাসনাধীনই ছিল—পতনের মুখে, দু'দেশের মধ্যে বিরাজ করছে উত্তেজনা। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে, নরওয়ের উপর দায়িত্ব দেয়া তুলনামূলকভাবে ভালো সিদ্ধান্ত, কারণ সুইডেনের মতো সমরবাদী ইতিহাস নেই নরওয়ের (মাথাপিছু মারণাস্ত্র রপ্তানীকারী দেশ হিসেবে সুইডেনের অবস্থান বর্তমানে দ্বিতীয়), শান্তিপূর্ণ মধ্যস্থতা ও আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত নিরসনই মূল লক্ষ্য থাকে তার। তবে এ বছর লিবিয়াতে নরওয়ের বোমারুরা সবচেয়ে বেশি বোমা ফেলে তাদের জাতীয় ঐতিহ্যে বিরাট কালিমা লেপন করে দিয়েছে, যা জ্বলজ্বল করবে আগামী বহু যুগ।

উইল অনুযায়ী, নরওয়ের সংসদ পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট নোবেল কমিটি নিয়োগ করে, যার সদস্যগণ বিভিন্ন মনোনয়ন বাছাই করে চূড়ান্তভাবে বিজয়ী নির্বাচিত করেন। বোমারুদের মতো না হলেও বিজয়ী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত প্রায়ই জন্ম দিয়েছে বিতর্কের। ২০০৯ সালে, ওভাল অফিসে বসতে না বসতেই, বারাক ওবামার নোবেল পাওয়া ছিল বিস্ময়; এর পরের বছরই চীনের ভিন্ন মতাবলম্বী নেতা লু জিয়াবাওকে পুরস্কার প্রদান বিশ্বকে সমালোচনায় করেছে দ্বিধাবিভক্ত, চীনের সাথে নরওয়ের কূটনৈতিক সম্পর্ক ব্যাহত হয়েছে মারাত্মক। এখন দাবি উঠছে কমিটির সদস্য নিয়োগ পদ্ধতিটি বাতিলের, কারণ রাজনৈতিক দলগুলো সংসদে তাদের অবস্থানের ভিত্তিতে দলের প্রাক্তন কোনো নেতাকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে, ফলে পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠে এবং পুরস্কারটিকে নরওয়ের পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখার অবকাশ থাকে, যদিও সদস্যগণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনে সম্পন্ন করা হয়। অভিযোগ অবশ্য অসততার নয়, মানবীয়তার—সদস্যগণ আবেগসম্পন্ন মানুষ এবং তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ রয়েছে।

গত শুক্রবার কমিটি এ বছরের বিজয়ী নির্বাচন করে ফেলেছে, আগামী শুক্রবার ঘোষণা। নানা সমালোচনায় চাপের মুখে থেকে সর্বজনগ্রাহ্য কোনো বিজয়ী নির্বাচন করা অবশ্য খুব সহজ কাজ নয়, তবে কমিটির সভাপতি থরবিয়র্ন ইয়াগলান্দের ভাষ্যমতে, এ বছর বিজয়ী নির্বাচন করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। এ থেকে আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এ বছর পুরস্কার পেতে যাচ্ছে তিউনিসিয়া ও মিশরের আরব বসন্তের সূচনাকারীগণ। ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করলে এগিয়ে থাকবেন,
১. তিউনিসিয়ার ২৭ বছর বয়স্কা ব্লগার লিনা বেন মেহেনি
২. মিশরের ৩৩ বছর বয়স্কা নেত্রী ইশরা আবদেল ফাত্তাহ
তবে দুদেশের জনগণ, বিশেষ করে তিউনিসিয়ার জনগণ, পুরস্কার পেলে সবচেয়ে যথার্থ হবে।

রাশিয়ার মানবাধিকার সংস্থার নেত্রী সভেতলানা গান্নুশকিনাও (৬৯) জোরালো প্রার্থী। তবে রাশিয়ার সাথে দীর্ঘ দরকষাকষি করে ব্যারেন্টস সাগরে নরওয়ে সম্প্রতি ১৭৫,০০০ বর্গমাইলের বিশাল যে জলসীমানা পেয়েছে তেল ও খনিজ আহরণের জন্য, তাতে দু'দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন ভালো; কাজেই ভিন্নমতাবলম্বী সভেতলানাকে নির্বাচিত করা কমিটির জন্য সহজ হবার কথা নয়, বিশেষ করে লু জিয়াবাওসংক্রান্ত বিতর্কের পর।

আফগানিস্তানের চিকিৎসক ও মানবাধিকার কর্মী সীমা সামের-এর (৫৪) নামও শোনা যাচ্ছে বেশ। তবে আরব বসন্ত এতই চমকপ্রদ যে সীমা সম্ভবতঃ আরও এক বছর অপেক্ষা করলেও সমস্যা নেই।

বহু বছর আগে সক্রেটিসের জবানবন্দিতে প্লেটো বলেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের নিজেদের মঙ্গল করার ক্ষমতা নেই। যুক্তিটি এরকম, সাধারণ যেসব মানুষের ভূমি আছে, নিজেদেরকে তারা ভূমিহীন মানুষ থেকে পৃথক করে ফেলবে; সাধারণ যাদের ভুমি আছে তারা আবার নিজেদের মধ্যে পার্থক্য করবে কম ভূমি আর বেশি ভূমির মালিক হিসেবে। এভাবে মানুষ নিরন্তর বিভাজন হবে শ্রেণীতে, এবং চূড়ান্তভাবে গুটি কয়েক মানুষের হাতেই থাকবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা।

প্লেটোর আড়াই হাজার বছর পর এক দেশে গরীব এক ফেরিওয়ালার জিনিসপত্র কেড়ে নেয় নগরকর্তার লাঠিয়াল বাহিনী, নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ করে তাকে নিয়ে। অপমানে অভিমানে নিজের শরীরেই আগুন ধরিয়ে দেয় ফেরিওয়ালা, ক্ষুদ্র সাধারণ মানুষের কী-ই বা করার আছে। মৃত মানুষদের নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় না, কিন্তু প্লেটোকে ভুল প্রমাণ করে ক্ষুদ্র একজন মোহাম্মদ বু আজিজি'র আত্নাহূতি পৃথিবীর ইতিহাসের পথই পরিবর্তন করে দিতে পারে কখনো কখনো।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29460314 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29460314 2011-10-05 05:45:26
পিঁপশঙ্কের রাজ্যাভিযান (সম্পূর্ণ)
[১]
শুনশান নীরব দুপুর, ১৫ ই জানুয়ারি ২০১০ মেঘনা-তিতাসের বাঁক, কাশবনের ধার, গ্রামের জংলা ঝোঁপ

প্রিইইই...
তীক্ষ্ণ চিৎকারে হঠাৎ ভেঙে পড়ে নীরবতা। ক্ষীণতর হয়ে গেল নদীর কুলকুল ধ্বনি, ঝরা পাতার মচমচ শব্দ, কাশবনের সরসর দোল। চমকে উঠে ফারিন, দ্রুত চোখ বোলায় চারপাশে। কিন্তু না, চোখে পড়ছে না কিছুই!

প্রিইইই..., এবার আরো জোরালো হলো শব্দ, আরো কাছ থেকে আসছে মনে হলো।
"এগুবে না, এগুবে না আর! দেখতে পাওনা, একেবারে গায়ের উপর এসে পড়লে যে!"

পায়ের দিকে এবার তাকায় ফারিন। দৃশ্য দেখে হাসি চেপে রাখতে পারে না কোনো মতেই: শুঁড় আর সামনের দু'টি পা উঁচু করে যুদ্ধংদেহী ভঙ্গিতে মুষ্ঠিযোদ্ধার মতো দাঁড়িয়ে একটি পিঁপড়া।

"ভয় পেয়ো না, আমি তোমাকে মারব না। সত্যি বলতে কী, পিঁপড়াদের খুবই ভালোবাসি আমি।" আশ্বাস দেয় ফারিন।
"আমার নাম পিঁপশঙ্ক—পিঁপ অশঙ্ক, মানে অদম্য সেই পিঁপড়া শঙ্কা জানে না যে। ভয় আমি পাইনি মোটেও, কিন্তু তোমরা যদি কাউকে ভালোই বাস, তাহলে তার সাথে কীভাবে উদ্ধত অবজ্ঞার আচরণ করো?"
"এর মানে কী, পিঁপশঙ্ক? অবাক হয় ফারিন।
"এই যে বললে পিঁপড়াদের ভালোবাস তুমি। তাহলে জমিনের উপর দিয়ে এভাবে সংবেদনহীন, অসতর্কভাবে কীভাবে হেঁটে যেত পার? আমি তোমাকে না দেখলে এবং চিৎকার না করলে তো পিষেই ফেলছিলে!" ক্ষোভে-মেশানো কণ্ঠ পিঁপের।
"আসলেই আমার ভুল হয়েছে, আর এরকম হবে না কখনো।" অনুতপ্ত গলায় জবাব দেয় ফারিন।
"আমার নাম ফারিন, আলোকিত ও অভিযানপ্রিয়। আমি তোমার বন্ধু, পিঁপ।" বলতে বলতে পিঁপশঙ্ককে হাতে তুলে নেয় সে।
হাসি ফুটে উঠে পিঁপের ঠোঁটের কোণ, শুঁড় বাড়িয়ে স্পর্শ করে ফারিনের হাতের তালু। "ধন্যবাদ তোমাকে।"

"তুমি কী করছিলে?" ফারিনের প্রশ্ন।
"আমি একজন অনুসন্ধানী পিঁপড়া, বেরিয়েছি আমার গোত্রের জন্য নতুন রাজ্য খুঁজতে।"
"নতুন রাজ্য কেন? আগের রাজ্য কি ধ্বংস হয়ে গেছে?"
"না, ধ্বংস হয়নি। ঐ যে, পাকুড় গাছটা দেখছ, তার পাশে আমাদের বর্তমান রাজ্য। কিন্তু আমাদের জন্যসংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে তো, শিশুদের ভালোভাবে বেড়ে উঠার জন্য নতুন, প্রশস্ত এলাকা দরকার।"
"ওখানেই নতুন বাসা বানিয়ে নাও না কেন তোমরা?"
"আমরা তোমাদের মতো অবিমৃষ্যকারী নই যে সবাই রাজধানীর দিকে ছুটব আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকব।" মানুষের বোকামির কথা ভেবে উষ্ণ হয় পিঁপের কণ্ঠ। "জনসংখ্যার সাথে আমাদের বাসস্থানের আকারের সুনির্দিষ্ট একটি আনুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে। জীবনের সুষ্ঠু বিকাশে অনুপাতটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাই কষ্ট হলেও প্রয়োজনে খোলামেলা রাজ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি আমরা। আমার মতো আরো অনেক স্কাউট বেরিয়েছে চারদিকে, তবে আশা করছি সবার আগে আমিই ভালো একটা জায়গার সন্ধান পেয়ে যাব।" হাসিতে উদ্ভাসিত হয় পিঁপের মুখ।

"কীভাবে রাজ্য খুঁজ তোমরা আমি দেখব।" অনুরোধ করে ফারিন।
"আচ্ছা, হাত থেকে নামিয়ে দাও আমাকে। তারপর আমার পেছন পেছন আস।"
হাতের তালু থেকে পিঁপশঙ্ককে নামিয়ে দিল ফারিন। এগিয়ে যেতে থাকে অদম্য সেই পিঁপড়া শঙ্কা জানে না যে।

বেশ অনেক ক্ষণ হাঁটার পর বিশাল এক অশ্বত্থ গাছের পাশে শক্ত লালমাটির একটি ঢিবি দেখতে পায় পিঁপ। তার ধার বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে সে, তারপর হঠাৎই দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
"পিঁপ, পিঁপ, পিঁপশঙ্ক! কোথায় গেলে তুমি?" চিৎকার করে ডাকে ফারিন।
প্রায় দু'মিনিট পর পিঁপের শুড় দেখা যায়, দুর্বাঘাসের আড়ালে একটি গর্তের মুখে।
"সম্ভাব্য রাজ্য দেখে এলাম একটা, ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা করলাম তার চারপাশটা।" হাসে পিঁপ।
"তুমি তো দেখলাম গর্তের ভেতর ঢুকলে। অন্ধকারে আবার কী পরীক্ষা করলে, কীভাবেই বা করলে!" বেশ অবাক হয় ফারিন।
"হ্যাঁ, ভেতরটা একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আলকাতরার মতো কালো। তবে আমরা তো আর চোখে দেখে কোনো জায়গার ক্ষেত্রফল হিসেব করি না, স্পর্শ করে করে ক্ষেত্রফল বের করি।" রহস্যময় ভঙ্গিতে শব্দ করে হাসে পিঁপ, চোয়াল প্রশস্ত হয় তার।

ফারিনের কাছে আসে পিঁপশঙ্ক। তারপর ঘুরে আবার রওয়ানা দেয় গর্তের দিকে।
"আরে, আরে, কোথায় যাচ্ছ আবার?" অবাক হয়ে প্রশ্ন করে ফারিন।
"আমার কাজ শেষ হয়নি তো এখনও, গর্তে ঢুকতে হবে আরেকবার। তারপরই ক্ষেত্রফলের হিসেব শেষ হবে।"
"ঘাসের ভেতর তো অনেক গর্ত, আগের গর্ত চিনতে পারবে?"
"গর্তের দেয়াল ঘেঁষে আমার শরীর থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থের একটা পথ বানিয়ে এসেছি, যাকে বলে ফেরোমোন ট্রেইল। আমাদের প্রত্যেক স্কাউটেরই রয়েছে যার যার নিজস্ব ফেরোমোন ট্রেইল বানানোর ক্ষমতা, একটির সাথে অন্যটির ঝামেলা হয় না কখনো। গন্ধ শুঁকে আমার সঠিক গর্তটি ঠিকই বের করে ফেলব।" পিঁপের কণ্ঠে দৃঢ় প্রত্যয়।

ঘাসের ভেতর হারিয়ে যায় পিঁপ। এবার বেশ অনেকটা সময় পর বেরিয়ে আসলো সে, মুখের হাসিটি আরো বিস্তৃত হয়েছে তার।
"পছন্দ হয়েছে জায়গাটা, হিসেব করলাম ক্ষেত্রফল। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আর চারপাশের বিন্যাস সব মিলিয়েও চমৎকার। যাই, সবাইকে নতুন রাজ্যের খবর দিয়ে আসি।"
"কিন্তু তোমার মতো আরো অনেকেই হয়তো এরকম নতুন রাজ্যের সন্ধান নিয়ে যাবে, তাই না? কারটা চূড়ান্ত হবে?"
"হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ, ফারিন। আর আমরা পিঁপড়ারা গণতান্ত্রিকও বটে। আমি এখন বেশ কয়েকজনকে রিক্রুট করব জায়গাটা দেখার জন্য, তারাও সেটি পরীক্ষা করে দেখবে। যার রাজ্য সবচেয়ে বেশি পিঁপড়ার পছন্দ হবে, সেটিই নির্বাচিত হবে নতুন নিবাস হিসেবে।"
"কিন্তু ঠিকমতো বাসায় পৌঁছতে পারবে তো তুমি?" ফারিন প্রশ্ন।
"হ্যাঁ," মাথা ঝাঁকায় পিঁপ, "বাসা থেকে এ পর্যন্ত আমি ৩৩,০০০ কদম এসেছি। গুণে গুণে ঠিকই বাড়ি ফিরে যেতে পারব।"

তারপর একটু বিষণ্ণ যেন হয় পিঁপের স্বর। "আচ্ছা, যাই তাহলে, পরে কথা হবে। খুব ভালো লাগল তোমাকে দেখে। ও হ্যাঁ, বাড়ি যাবার সময় একটু সাবধানে, নিচের দিকে তাকিয়ে যাবে কিন্তু।" অনুরোধ করে সে।
মৃদু হাসল ফারিন, "হ্যাঁ, অবশ্যই। কিন্তু নতুন রাজ্যের আয়তনটা কীভাবে বের করলে, বলো না?"
"এটি তোমার জন্য একটি ধাঁধা," দুষ্টু হাসি হাসে পিঁপ, "পরের বার যখন দেখা হবে, উত্তরটা জানাবে আমাকে।"
"ওহ," একটু মনমরা হয় যেন ফারিন, কিন্তু পিঁপের মায়াকাড়া দুষ্টু চেহারা দেখে হেসে ফেলে, "আচ্ছা।"

[২]
তীব্র শৈত্য প্রবাহের রাত, ১৫ই জানুয়ারি ২০১০ মেঘনা-তিতাসের বাঁক, ফারিনের গ্রামের বাড়ি, ড্রয়িংরুম

রাতের খাবার শেষে ভারী পোশাক গায়ে চাপিয়ে সবাই বসে আছি। আমার পাশে ফারিন, তার পাশে ফারিনের বড় বোন সারাকা, আর ওপাশে তাদের মা। তীব্র শীতে কাবু হয়ে পড়া এক রাত। কাঠালিচাঁপার গন্ধে ভরে গেছে সারা বাড়ি। টিনের চালে টুপটাপ শিশিরের শব্দ, মাঝে মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে প্যাঁচার ডাকে। আর বাতাসের বেগ বেড়ে গেলে ভেসে আসছে কৈবর্ত পাড়ার কীর্তনের বিষণ্ণ সুর; সেই সাথে আরো দূরে, মিটমিট আলোতে মেঘনার বুকে ছলছল জেলে নৌকার ছৈয়ের ভেতর থেকে ভাটিয়ালী গানের শব্দ।

আমার হাতে চায়ের কাপ। ফারিনের হাতেও, যদিও মেয়ের চা খাওয়া তেমন পছন্দ করেন না তার মা। তবে মাঝে মাঝে নিয়ম শিথিল হয়, আজকে সেরকম একটি সময়। আজ থেকে বেশ ক'বছর আগে, সারাকার জন্মের পর প্রথম বার তার মুখ দেখে হাসপাতালের বারান্দা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম আমার জীবনের শেষ সিগারেটের প্যাকেটটি। তার কিছু দিন পর শুরু হয় চায়ের ব্যাপারটি। না, একটি নেশাকে কাটানোর জন্য আরেকটি নেশার আশ্রয় নয়; সিগারেট কাটানোর জন্য সারাকার কোমল মায়াবী মুখই যথেষ্ট ছিল। আমি আসলে সেসময় থেকে মাঝে মাঝে রাত জেগে লিখতে শুরু করেছিলাম।

"আচ্ছা, বাবা, ধরো তোমাকে বিশাল একটি গুহায় ফেলে দেয়া হলো। উঁচু-নিচু, এবড়ো-থেবড়ো গুহার দেয়াল, আর ভেতরটা মিশমিশে কালো, কোনো আলো নেই কোথাও।" হঠাৎ ফারিনের এ অদ্ভুত কথায় হাসতে শুরু করল সবাই। তীব্র শৈত্য প্রবাহের রাতে জনমানবহীন অন্ধকার গুহায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার কল্পনা উষ্ণ চায়ের পেয়ালা হাতেও সুখপ্রদ কোনো ব্যাপার নয়; আমি দ্রুত গুহার ভেতর থেকে বের হবার উপায় খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম আমার সমস্যাটি আসলে তার চেয়েও বড়।
"কীভাবে তুমি বুঝবে গুহাটা আকারে কত বড়?" ফারিনের প্রশ্ন এবার।
অন্ধকার গুহায় বসে তার ক্ষেত্রফল বের করার সূত্রটি নিঃসন্দেহে তার ভেতর থেকে বের হয়ে আসার উপায়টি থেকে অনেক বেশি জটিল। আমি মগ্ন হয়ে গেলাম চিন্তায়।

"আচ্ছা, আরেকটু সহজ করে দেই," ফারিন আশ্বস্ত করে আমাকে, "তুমি ইচ্ছে করলেই টিকটিকি বা তেলাপোকার মতো বুকে ভর দিয়ে গুহার দেয়ালের উপর চলতে পার। তবে তোমার সময় কিন্তু মাত্র দু'মিনিট।"
"একটা কাজ করা যায়," নিজেকে স্পাইডারম্যানের মতো খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললাম আমি, "দেয়ালের পরিসীমা হিসেব করে মোটামুটি ক্ষেত্রফলটি বের করা যায়। যত বেশি পরিসীমা, তত বেশি ক্ষেত্রফল।"
"ওহ, তাই!" একটু যেন দমে যাওয়া কণ্ঠ ফারিনের, হয়তো বা সমাধানটির এতটা পরিষ্কার সারল্য আশা করেনি সে। তবু পরীক্ষা করে নিশ্চিত হবার জন্য টেবিল থেকে পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে আসলো।

আর তখনই আমার মনে পড়ে গেল কী হাস্যকর ভুলটিই না করেছি আমি! "না, না, এভাবে হবে না," অনেকটা চিৎকার করে উঠলাম। "কারণ শুধু পরিসীমার মানের উপরই ক্ষেত্রফল নির্ভর করে না, পরিসীমাটির আকৃতি কীরূপ, আয়তকার, বৃত্তাকার, ডিম্বাকার, না অন্য কোনোরূপ, এটিও একটি বড় ব্যাপার। যেমন, নিচের চিত্রে, আয়তকার ক ও খ গুহার পরিসীমা প্রায় সমান, প্রত্যেকটি ৬ ইঞ্চির কাছাকাছি, কিন্তু ক-এর ক্ষেত্রফল, খ-এর ক্ষেত্রফলের দ্বিগুণ।



"এছাড়া গুহার ভেতর কোনো জায়গায় যদি খুব সরু, লম্বা ফাটল থাকে, তাহলে পরিসীমা অনেক বেড়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু সে অনুযায়ী ক্ষেত্রফল তেমন নাও বাড়তে পারে।"
"হ্যাঁ, বাবা, এভাবে হবে না।" ফারিনের গলার স্বরে খুশির পরিবর্তনটি সুস্পষ্ট।

এবার আমার মনে পড়ে গেল একাদশ শ্রেণীতে পড়া রসায়নের ক্লাসের কথা। স্পাইডারম্যান থেকে—না, রসায়নের ছাত্র নয়, বরং আবদ্ধ কোনো পাত্রে ছুটন্ত গ্যাসের অণু হয়ে গেলাম আমি, ক্রমাগত ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছি পাত্রের দেয়াল থেকে দেয়ালে। এক দেয়াল থেকে ধাক্কা খাবার পর গুণে যাচ্ছি কত কদম পর আবার আরেক দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছি। এভাবে অনেকক্ষণ ধরে একটি ধাক্কা ও তার পরবর্তী ধাক্কার মধ্যবর্তী দূরত্বের হিসেব রেখে একটি গড় দূরত্ব বের করা যায়, যার উপর ভিত্তি করে গড় মুক্ত-পথের সূত্র অনুযায়ী গুহার ক্ষেত্রফল বের করা যেতে পারে। গড় মুক্ত পথের দূরত্ব যত বেশি হবে, গুহার ক্ষেত্রফলও সে অনুযায়ী বেশি হতে থাকবে।

কাগজে বেলনাকৃতির জায়গায় একটি অণুর ছবি এঁকে সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম ফারিনকে।

বেশ মনোযোগ দিয়ে ছবিটি দেখার পর ফারিন বলল, "তার মানে এ পদ্ধতি কাজ করবে যখন গুহার দেয়ালের অভ্যন্তরটি বাঁধাহীন, মুক্ত হয়, তাই না?"
"হ্যাঁ, তাই।" সায় দিলাম আমি।
"কিন্তু, বাবা, মনে করো, গুহার মাঝ বরাবর খুব পাতলা একটা পর্দার মতো ঝুলিয়ে দেয়া হলো। পর্দার দু'পাশে একদম অল্প করে মাত্র জায়গা রাখা হলো যাতে তা গলে গুহার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে গুহার ক্ষেত্রফল তেমন কমলো না বললেই চলে, কিন্তু প্রাণীটি এখন আগের চেয়ে আরো তাড়াতাড়ি গুহার দেয়ালে ধাক্কা খেতে থাকবে, তাই না? আর তখন হিসেবেও ভুল হয়ে যাবে।"


মমতামাখা বিস্ময়ে আপ্লুত হলো আমার হৃদয়, একটু গর্ববোধও। আলতো করে নেড়ে দেই ফারিনের চুলগুলো। পৃথিবীতে আশাবাদী, সুখী হবার কতই না অসংখ্য অপার বিষয় রয়েছে আমাদের, এবং চারপাশে।

[৩]
শান্ত রোদের হিমেল সকাল, ১৬ই জানুয়ারি ২০১০ মেঘনা-তিতাসের বাঁক, ফারিনের গ্রামের বাড়ি, উঠোন

মেয়েদের অনুরোধে গণিত কাহিনী চলছে—
১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে, সর্বকালের অন্যতম সেরা গণিতবিদ গাউস জন্মগ্রহণ করেন যে বছর, বুগেই নামক ফরাসি বিস্কুট নিয়ে নিজ বাসগৃহে অদ্ভুত এক পরীক্ষা চালান ফ্রান্সের লুই লেকলার্ক কমতে দ্য ব্যুফন। হাতে বুগেই ধরে বৈঠকখানার দরজায় এসে দাঁড়ান ব্যুফন, তারপর কাঁধের উপর দিয়ে সেটি ছুঁড়ে মারেন পেছন দিকে, বৈঠকখানার ভেতরে। দরজা থেকে সরে এসে বুগেই খুঁজতে থাকেন তিনি, পাবার পর দেখে নেন কোথায় পড়েছিল তা। আয়তকার ফালিফালি তক্তা গায়েগায়ে ঠেকিয়ে বৈঠকখানার মেঝে মোড়ানো, তাদের পারস্পরিক সংযোগস্থলে হালকা চিড়। খাতায় টালিচিহ্নের সাহায্যে লিখে রাখেন ব্যুফন: কত বার তিনি বুগেই ছুঁড়লেন আর তাদের মাধ্যে কত বার বুগেইটি চিড়ের উপর পড়ল।


বেশ কিছুক্ষণ পরপর টালি যোগ করে যথাযথ সংখ্যাগুলো লিখে রাখছেন, সাড়ে তিন ঘন্টা পর নিচের টেবিলটি তৈরি হলো:


টেবিলের দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ কী ভাবেন ব্যুফন, তারপর ডানপাশে আরও দুটি কলাম যোগ করে সেখানে কিছু ভাগের কাজ করেন:


সর্ব ডানের কলাম দেখে ভূত দেখার মতোই চমকে উঠেন ব্যুফন, π = ৩.১৪১৫৯২...! ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী লাঠিবিস্কুট বুগেই আর কাঠের তক্তার সরলরৈখিক চিড়ের সাথে যুগযুগান্তরের রহস্যময় সংখ্যা π-এর কী সম্পর্ক থাকতে পারে!
"কিন্তু, বাবা, পাই তো জ্যামিতির বিষয়, বৃত্তের পরিধি আর ব্যাসের সম্পর্ক। এখানে তো ঘটনা হচ্ছে, একটি জিনিস কত বারের মধ্যে কত বার দাগে পড়ল; বৃত্ত তো দূরের কথা জ্যামিতিরই কিছুই নেই। এমনকি হতে পারে, ভাগফলটি এমনি এমনি পাই-এর কাছাকাছি মিলে গেল?" সারাকার চিন্তা ও প্রশ্ন আনন্দিত করে আমাকে।

"ব্যুফনও প্রথমে তাই ভেবেছিলেন, মামনি। তাই বিভিন্ন আকারের বুগেই নিয়ে পরীক্ষাটি করেন তিনি। স্বাভাবিকভাবে আমরা বলতে পারি, তক্তার প্রস্থের (d) তুলনায় বুগেই-এর দৈর্ঘ্য (l) যত ছোট হবে, তত কমসংখ্যকবার এটি চিড়ের উপর পড়বে, অর্থাৎ সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ এটি কোনো একটি তক্তার মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে, তাই না?"
"হ্যাঁ, বাবা। বুগেই ছোট হলে সে অনেক সময়ই পুরো তক্তা অতিক্রম করতে পারবে না, বিশেষ করে যখন আড়াআড়িভাবে পড়বে।"

"ব্যুফন বিস্ময়ে লক্ষ করেন যে, এই কমসংখ্যকবারটিও সুনির্দিষ্ট অনুপাতেই কমছে, ফলে l/d এবং n/N ও π-এর সম্পর্কটি থেকেই যাচ্ছে, এবং সম্পর্কটি নিম্নরূপ:


l ও d আমাদের সহজেই মেপে নিতে পারি, আর n ও N পরীক্ষার সময় লিখে রাখলেই হলো। সুতরাং এ পরীক্ষা থেকে সবসময় আমরা π-এর মান নির্ণয় করতে পারি।
ব্যুফনের প্রথম পরীক্ষায় বুগেইয়ের দৈর্ঘ্য ছিল তক্তার প্রস্থের অর্ধেক, অর্থাৎ l = d/2
=> d = 2l
এক্ষেত্রে (1) থেকে পাই,
, যা ব্যুফনের টেবিলের ডান কলামের সাথে মিলে যায়।
মনে রাখতে হবে, (1) সমীকরণটি সরাসরি সূত্রের সাহায্যেও প্রমাণ করা হয়েছে, যেখানে কোনো উপাত্তের দরকার নেই।"
"তারমানে এখানে সত্যিসত্যিই পাই আছে! কীভাবে সম্ভব!" বিস্ময় কাটে না মেয়ের।
"জগতের বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের বিভিন্ন জ্ঞান থাকলেও, মানুষ যখন গভীরভাবে জগতকে উপলব্ধি করতে শুরু করে, তখন সম্ভবতঃ সে আবিষ্কার করে, জগতের সকল জিনিসের মধ্যে অনন্য এক একাত্মতা বিদ্যমান।" সারাকা কী বুঝল জানি না, কিন্তু দর্শন ছাড়া অন্য কোথাও তার উত্তর পাই না আমি।

ব্যুফনের চমকপ্রদ পরীক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন গণিতবিদগণ, বুগেইয়ের পরিবর্তে সূঁই নিয়ে, সূঁই রেখে বাকানো আংটি নিয়ে, আয়তাকার তক্তা বাদ দিয়ে কাগজে সমান্তরাল সরলরেখা টেনে, রেখাগুলোকে প্যাঁচিয়ে বক্ররেখা বানিয়ে, বিভিন্ন ধরণের জ্যামিতিক ক্ষেত্রে নানান জিনিস ছুঁড়ে দিয়ে দিয়ে—সুদৃঢ় হয় জ্যামিতিক সম্ভাব্যতার (Geometric Probability) ভিত্তি।

কিন্তু শুধু π-এর মান নিয়ে বসে থাকেন না গণিতবিদগণ। বিপরীতদিক দিয়েও অগ্রসর হন তারা: π, n, N, l-এসব থেকে বের করেন তক্তার প্রস্থ d, প্রস্থ থেকে নির্দিষ্ট সমান্তরাল রেখাংশের মধ্যবর্তী আবদ্ধ ক্ষেত্রফল A। এভাবেই এক সময় তাঁরা আবিষ্কার করেন,
কোনো একটি আবদ্ধ ক্ষেত্রে যদি এলোপাতাড়িভাবে প্রথমে একটি বক্ররেখা টানা হয়, তারপর ঐ ক্ষেত্রে এলোপাতাড়িভাবে আরেকটি বক্ররেখা টানা হয়, তাহলে দ্বিতীয় বক্ররেখাটি অনেক জায়গা দিয়ে প্রথমটিকে অতিক্রম করে যাবে এবং তাদের মধ্যে নিচের সম্পর্কটি পর্যবেক্ষণ করা যাবে:

যেখানে l1 প্রথম বক্ররেখার দৈর্ঘ্য, l2 দ্বিতীয় বক্ররেখার দৈর্ঘ্য, n বক্ররেখাদ্বয় যত বার পরস্পরকে ছেদ করেছে তার সংখ্যা এবং A হচ্ছে সেই আবদ্ধ ক্ষেত্রফল যেখানে এলোপাতাড়িভাবে রেখা দুটি আঁকা হয়েছে।

আর সে মুহূর্তে বিদ্যুত চমকের মতো আমার মনে পড়ল...

[৪]
উত্তুঙ্গ বাতাসের বিষণ্ণ বিকেল, ১৬ ই জানুয়ারি ২০১০ মেঘনা-তিতাসের বাঁক, কাশবনের ধার, গ্রামের জংলা ঝোঁপ

পাকুড় গাছের নিচে শুরু হয়েছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। পিলপিল করে বেরিয়ে আসছে লক্ষ লক্ষ পিঁপড়া, লাইন ধরে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। ফারিন কাছে যেতেই থমকে দাঁড়ায় দলটি, বেঁকে যায় এক পাশে। কিছু তরুণ পিঁপড়া দাঁড়িয়ে যায় যুদ্ধংদেহী ভঙ্গিতে, হুল ফুটানোর প্রস্ততি নিচ্ছে। হঠাৎ দু'পাশে সরে যায় তরুণদের দলটি, রাজকীয় ভঙ্গিতে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে আসে পিঁপশঙ্ক।

স্নিগ্ধ হাসিতে উদ্ভাসিত হয় ফারিনের মুখ, হাতে তুলে নেয় পিঁপকে। ফারিনের হাতের তালুতে কিছুক্ষণ শুঁড় নাড়ে পিঁপ, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ছোট একটি মুকুট জ্বলজ্বল করছে তার মাথায়।

"নতুন রাজ্যে চলে যাচ্ছি আমরা। আমার নির্বাচিত রাজ্যই চূড়ান্ত হয়েছে।" আনন্দে ঝলমল করছে তার মুখ।
"নিজের জাতিকে পথ দেখিয়ে সামনে নিয়ে যাওয়া গৌরবের ব্যাপার, পিঁপ। তোমার গৌরব থাকুক সারা জীবন।" হাসিমুখে ফারিন বলে।
হাতের তালুতে শুঁড় বুলিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
"ওহ, হ্যাঁ। তোমরা কীভাবে নতুন রাজ্যের ক্ষেত্রফল বের কর, জানতে পেরেছি আমি।"
"তাই নাকি? বলো তো দেখি?" দুষ্টুমি খেলে যায় পিঁপের চোখে।
"প্রথমবার নতুন জায়গাটি পরীক্ষা করার সময় এলোমেলো কিন্তু নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের একটি ফেরোমেন ট্রেইল রেখে আস তোমরা। এ ট্রেইলটি তৈরি করতে বেশি সময় লাগে না তোমাদের। দ্বিতীয় বার আবার প্রবেশ কর জায়গাটিতে, এলোমেলোভাবে আরেকটি ট্রেইল বানাতে থাক, কিন্তু সেসময় যখনই প্রথমটিকে অতিক্রম কর, একটু থেমে হিসেব করে নাও, ফলে দ্বিতীয় ট্রেইলটি শেষ করতে বেশ সময় লাগে তোমাদের। এখন দ্বিতীয় ট্রেইলটি প্রথমটিকে যতবার অতিক্রম করে তার উপর ভিত্তি করে এলাকার ক্ষেত্রফল বের করে ফেল তোমরা।


সংক্ষেপে হিসেবটা হলো, দুই ট্রেইলের পারস্পরিক ছেদের সংখ্যা যত বেশি হবে, রাজ্যের ক্ষেত্রফল তত কম হবে [A এবং n পরস্পর ব্যস্তানুপাতিক]। আমাদের মতো কাগজ-কলম নিয়ে তো আর তোমরা হিসেব কর না, কিন্তু তোমাদের বিস্ময়কর মস্তিষ্কে রয়েছে জ্ঞান, যাকে অন্যেরা যা-ই বলুক, আমি বলব প্রগাঢ় শ্রদ্ধার গাণিতিক জ্ঞান; এর কারণে তোমরা পারস্পরিক ছেদের তথ্য থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষেত্রফল বের করে ফেল।"

গভীর আনন্দে শুঁড় নাচতে থাকে পিঁপের, গুঞ্জন উঠে পিঁপড়ার দলে। সুদক্ষ নেতার মতো দ্রুতই আত্মনিয়ন্ত্রণ চলে আসে পিঁপের ভেতর, ফারিনকে অনুরোধ করে মাটিতে নামিয়ে দেয়ার জন্য।

শেষ বিকেলের ম্লান আলোতে দীর্ঘতর হয় পাকুড় গাছের ছায়া, তার পাশ দিয়ে এগিয়ে চলে পিঁপড়ার দল, এক সময় হারিয়ে যায় ঢিবিতে। জগতে সবারই রয়েছে নিজের মতো জ্ঞান, আর তা-ই হলো সত্যিকারের জ্ঞান হদয়ে যা সৃষ্টি করে মমতার। ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে খুব সাবধানে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় ফারিন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29454078 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29454078 2011-09-24 09:53:39
গণিতের নোবেল, আবেল পুরস্কার ২০১১-এর উৎসবে
গত ২৪শে মে নরওয়ের অসলোতে উদযাপিত হয় আবেল পুরস্কার ২০১১-এর উৎসব। নরওয়ের বিজ্ঞান পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানটিতে গণিত ও সঙ্গীতে চমৎকার এক অপরাহ্ন কেটেছিল সেদিন, এ লেখাটি তার উপর।

নোবেল ও আবেল পুরস্কার
ডাইনামাইট আবিষ্কার করার সুইডিশ রসায়নবিদ আলফ্রেড নোবেল (Alfred Nobel) আশাবাদী হয়ে উঠলেন, পৃথিবীতে যুদ্ধ-হানাহানির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বিবদমান দুটি সৈন্যদল যখন উপলব্ধি করবে এক নিমেষে তারা পরস্পরকে ধ্বংস করতে সক্ষম, তখন পৃথিবীর সভ্য জাতিগণ নিশ্চয়ই তাদের সেনাবাহিনী রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে না আর। কিন্তু পরিহাস, জীবনের শেষ দিনগুলোতে পৃথিবীতে শান্তি দেখে যাননি নোবেল; তার একটি বড় কারণ, ডাইনামাইট! মৃত্যুর পর তাঁর উইল শুনে বিস্মিত হয় পৃথিবীর মানুষ—সারা জীবনের অর্জিত বিশাল সম্পদের প্রায় পুরোটা তিনি দিয়ে গিয়েছেন সাহিত্য, পদার্থ, রসায়ন, শারীরবৃত্ত/চিকিৎসা এবং শান্তিতে মানবতার কল্যাণে বৃহত্তর অবদানের পুরস্কার হিসেবে। (উল্লেখ্য, অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রকৃতপক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক নোবেল নয়।)

নোবেলের তালিকায় গণিতের নাম নেই, এ আরেক বিস্ময়। মহান মানুষদের ব্যক্তিগত জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ কিংবা সম্ভাবনা অনেককে অশ্লীল আনন্দ দেয়, কাজেই একটি গুজব চালু হয়ে যায় দ্রুত—কোনো এক গণিতবিদের কারণে ভেঙে গিয়েছিল নোবেলের সংসার, তাই প্রতিহিংসাপরায়ণ নোবেল বাদ দিয়েছেন গণিত। বাস্তবে নোবেল কখনো বিয়ে করেননি এবং প্রতিহিংসা তাঁর সঙ্গে যায় না, যদিও গুজবটি মরে না, কারণ দুঃখজনক হলেও আজকাল অধিকাংশ মানুষের মতামত ঠিক করে দেয় সংবাদপত্র, টিভি কিংবা ইন্টারনেট। নোবেলের জীবনের বিভিন্ন নথিপত্র পড়ে বোঝা যায়, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞানের ফলিত শাখাগুলোকে পুরস্কৃত করা; গণিত কিংবা বিজ্ঞানের তত্ত্বীয় দিকে তিনি তেমন আগ্রহী ছিলেন না।

নোবেলের উইলে গণিতের উল্লেখ না থাকায় নরওয়ের বিখ্যাত গণিতবিদ সোফাস লাই (Sophus Lie) উদ্দ্যোগ নিলেন নরওয়ের ক্ষণজন্মা গণিতবিদ নীলস হেনরিক আবেলের (Niels Henrik Abel) নামে অনুরূপ একটি পুরস্কার চালু করার। ইউরোপ থেকে অনুদানের ব্যাপক সাড়াও পেলেন লাই, কিন্তু ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যাবার পর প্রচেষ্টাটি মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে আবেলের জন্মশতবর্ষ উদযাপন কালে সুইডেন-নরওয়ের রাজা দ্বিতীয় অস্কার আবেলের সম্মানার্থে একটি পুরস্কারে আগ্রহী হন; ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে সুইডেন-নরওয়ের মধ্যকার রাষ্ট্রীয় সংঘের সমাপ্তি ঘটলে এ উদ্দ্যোগটিও বাতিল হয়ে যায়, কারণ ইউরোপীয় অনুদান সত্ত্বেও নরওয়ের সে সময়কার অর্থনৈতিক দরিদ্রাবস্থায় এত বড় পুরস্কার চালু করা অসম্ভব ছিল।

পরবর্তী বছরগুলোতে ডাকটিকেট ও ব্যাংকনোটে প্রতিকৃতি ছাপানোর মধ্য দিয়ে আবেলের প্রতি সম্মান জানিয়ে যেতে থাকে নরওয়েবাসীরা। ২০০০ সালে আবেলের জীবনীকার আরিল্ড স্টুবহাগ ও টেলিনরের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী টরমড হারম্যানসনের প্রচেষ্টায় ধূলোবালির আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে পুরস্কারের প্রস্তাবটি এবং নরওয়ে সরকারের অনুদানে ২০০৩ সালে প্রথম আবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারটি, যার আর্থিক মূল্যমান ৬ মিলিয়ন নরওয়েজিয়ান ক্রোনার (প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার) সাধারভাবে গণিতের নোবেল হিসেবেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

আবেল ও পঞ্চঘাতী সমীকরণ (Quintic Equation)
জন্ম ১৮০২, সচ্ছলতায়; মৃত্যু ১৮২৯, তীব্র দারিদ্রে, যক্ষ্মায়। আর চার মাস বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো ঠিক ২৭, অবশ্য জন্মদিন পালন করার জন্য পাশে থাকত না কেউ। করূণ অপমানজনক অবস্থায় মারা গেছেন বাবা, বড় ভাই হারিয়ে ফেলেছেন মানসিক ভারসাম্য, মদ পানের মধ্য দিয়ে শোক ভোলার চেষ্টা করছেন মা। ইউরোপের গণিত সফরটিতে বড় ব্যর্থ হয়েছেন তিনি, শুধু সেই মেয়েটি, যাকে ভালবাসতেন, আয়ার কাজ করে যাচ্ছেন প্রাণপণে যাতে শীঘ্রই বিয়ে করতে পারেন তাঁরা। প্যারিস থেকে একসময় খবর আসে, পাওয়া গেছে তাঁর হারানো অভিসন্দর্ভটি আর পৃথিবীর মানুষ জানতে শুরু করে, নীলস হেনরিক আবেল করে ফেলেছেন গণিতের এমন কিছু কাজ, যা পার্থিব ক্ষুদ্র জীবনের বিনিময়ে তাঁর অমরত্বকে কেবল দীর্ঘায়িত করেই যাবে। অবশ্য মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ নেমে আসে তার পূর্বেই। জীবনের শেষ দিনগুলোতে কেবল মেয়েটির চিন্তা আচ্ছন্ন করে রাখত তাঁকে, প্রিয় বন্ধুকে অনুরোধ করে যান, মেয়েটির যেন দেখাশোনা করেন। আবেলের মৃত্যুর দেড় বছর পর বিয়ে করেন তাঁরা এবং শোনা যায়, বাকি জীবন সুখেই কাটে তাঁদের।


ব্যবহারিক জীবনের নানাবিধ সমস্যা সমাধানে গণিতের চমৎকার সৌন্দর্যময় শাখা বীজগণিত, যার একটি মূল উদ্দেশ্য সমস্যাকে সমীকরণে প্রকাশ করে তার সমাধান করা। 2x+7=0 একঘাতী এ সমীকরণটির সমাধান, আমরা সবাই জানি, x=-7/2। সাধারণভাবে, ax+b=0 সমীকরণের সমাধান হবে x=-b/a, যেখানে a ও b'কে বলা হয় সমীকরণের সহগ (coeffcient)।

বীজগণিতের জনক আল-খোয়ারিজমি (Muḥammad ibn Musa Al-Khwarizmi) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ কিতাব আল যাবর ওয়াল মুকাবেলা-তে দ্বিঘাত সমীকরণ (Quadratic Equation) সমাধানের সাধারণ নিয়ম ব্যাখ্যা করে যান। আজকে যারা অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে, তারা জানে x^2+7x+12=0 সমীকরণ কীভাবে সমাধান করতে হয়। তারা মধ্যপদ 7xকে বিস্তৃত করে উৎপাদকে বিশ্লেষণ করবে অথবা সরাসরি সহগসংক্রান্ত সূত্রটি ব্যবহার করবে।

কিন্তু ত্রিঘাত (Cubic) সমীকরণকেও কি এভাবে বীজগাণিতিকভাবে সূত্রের সাহায্যে, সহগের মাধ্যমে সমাধান করা যায়, যেখানে কেবল চারটি প্রাচীন গাণিতিক প্রক্রিয়া +, -, × ও ÷ এবং √ (করণী) ব্যবহার করা হবে? সমীকরণ সমাধানের এ পদ্ধতিটিকে বলা হয় মূল-করণীর মাধ্যমে সমাধান (solution by radical), যার সন্ধানে গণিতে রচিত হয় হাজার বছরের অভিযান গাঁথা।

কবি ও গণিতবিদ ওমর খৈয়াম জ্যামিতিকভাবে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেন বটে, কিন্তু বীজগাণিতিক সমাধান অধরাই থেকে যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী। ওদিকে আল-খোয়ারিজমির গণিত ইউরোপে বয়ে নিয়ে যান লিওনার্দো ফিবোনাচ্চি, আদেলার্দ অব বাথ ও রজার বেকনের মত মনীষিগণ এবং খোয়ারিজমির পাঁচশ বছরেরও অধিক সময়কাল পরে প্রথমে ইটালির ডেল ফেরো, এবং পরে নিকোলো তার্তাগলিয়া ও জেরোলামো কার্দানো ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান বের করতে সক্ষম হন। এর ঠিক পরপরই কার্দানোর ছাত্র লুদোভিকো ফেরারি চতুর্মাত্রিক (Quartic) সমীকরণ সমাধানের সূত্র আবিষ্কার করেন। গণিতের ইতিহাসে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান একদিকে বড় অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে এর সাথে জড়িত আছে অপমান ও প্রতিহিংসার করূণ এক ইতিহাস; সে কাহিনী বলব আরেক দিন।

পঞ্চঘাতী সমীকরণের সমাধানে এবার ঝাঁপিয়ে পড়ে গণিতবিদগণ। গণিত ততদিনে এগিয়ে গেছে বেশ, ডেকার্তে, ফার্মা, গাউস ও অয়লারের মতো গণিতবিদগণ চলে এসেছেন পৃথিবীতে, কিন্তু পঞ্চঘাতী সমীকরণ উন্মোচন করে না তার রহস্য। ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইটালির পাওলো রুফিনি অসম্পূর্ণভাবে চেষ্টা করেন এবং ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে আবেল প্রমাণ করেন, সহগ-করণীর মাধ্যমে পঞ্চ কিংবা তার অধিক ঘাতের সমীকরণ সমাধানের সাধারণ কোনো সূত্র নেই! কিন্তু এ অসম্ভাব্যতাই সুদৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গণিতের নবীন একটি শাখার, যার নাম গ্রুপ থিওরি। ফ্রান্সের আরেক অস্থির মেজাজী গণিতবিদ এভারিস্ত গ্যালওয়া মাত্র ২১ বছর বয়সে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে এর উপর আরো কিছু কাজ করে যান।

জন মিলনর–২০১১ সালের আবেল পুরস্কার বিজয়ী
অশীতিপর, সৌম্য চেহারার বৃদ্ধ, দেখলে বাচ্চাদের ভালোবাসে এমন দাদুর চেহারা ভেসে উঠে মনে। কথা বলেন ধীরে, লাজুক ভঙ্গিতে নরম স্বরে। পুরস্কার পান, বিজ্ঞান পরিষদের ভাষায়, 'for pioneering discoveries in topology, geometry and algebra'। অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ, গণিতের নানা শাখা সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন দশকের পর দশক। তাঁর বিষয়সমূহ বেশ উচ্চতর লেভেলের, কাজেই টপোলজি নিয়েই দুয়েকটি প্রাথমিক কথা বলা যাক।

নরওয়ের রাজা পঞ্চম হ্যারাল্ডের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করলেন জন মিলনর
টপোলজি (গ্রিক topos মানে জায়গা, logos মানে বিদ্যা) গণিতের প্রধান একটি শাখা যা বিভিন্ন জ্যামিতিক বস্তু, যেমন বক্ররেখা, তল, ত্রিমাত্রিক বস্তু প্রভৃতির আকৃতি নিয়ে আলোচনা করে থাকে। একটি বস্তুকে ক্রমাগত বাঁকিয়ে, টেনে বা দুমড়ে-হিঁচড়ে (ছেঁড়া বা জোড়া লাগানো ছাড়া) আকৃতি পরিবর্তন করলেও তার যেসব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকে, সেসব টপোলজির মূল বিষয়। টপোলজিতে বৃত্ত হয়ে যায় উপবৃত্তের সমতুল্য কারণ বৃত্তের ব্যাসের দু মাথায় ধরে চাপ দিলে বা টান দিলে বৃত্তের গোলাকার পেট চ্যাপ্টা হয়ে উপবৃত্তের আকার ধারণ করে। এটি মোটামুটি বোঝা যায়, কিন্তু আরো অবাক করা মজার বিষয় আছে, এখানে ঘনক ও গোলক সমতুল্য, ডোনাট ও এক হাতলওয়ালা চায়ের মগ সমতুল্য।




পুরস্কার বিতরণী শেষে হালকা কথা বলি মিলনরের সাথে। এক সময় শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব, উঠে আসে নানা কথা, হাসির ফোয়ারা ছুটে দর্শকদের মধ্যে। নিজেকে তিনি বিবেচনা করেন ধীর গতির গণিতবিদ হিসেবে, মাথায় বেশি হিসেব করতে পারেন না, দরকার হয় কাগজ কলম; তবে কোনো জিনিস, জ্যামিতিক কোনো চিত্র, ভালো দেখেন। ১৯৫৬ সালে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার 'সপ্তমাত্রিক Exotic Sphere'-এর দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করা হয়, মানুষ যেখানে মাত্র তিনটি মাত্রা দেখতে পায়, সেখানে তিনি কীভাবে সাতটি মাত্রা দেখেন? স্মিত লাজুক হেসে তিনি জবাব দেন, না না, সেটি চোখ দিয়ে দেখা নয়, নিজের ভেতর থেকে অনুভব করা, মনের চোখ দিয়ে দেখার মতো।

গণিত ও পদার্থবিদ্যার মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, বিজ্ঞান ধ্রুব নয়, পদার্থবিদ্যার সবচেয়ে সুন্দর সূত্রটিও আগামীকাল ভুল প্রতীয়মান হতে পারে, কিন্তু গণিত ধ্রুব, সবসময় ধরে রাখে তার সৌন্দর্য।

শিশু ও কিশোরদের প্রতি তার আহ্বান, তারা যেন ভালোবেসে গণিত শিখে, তাহলে গণিত সহজ হবে। তাঁর মতে, অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার জন্য না বুঝেও গণিত মুখস্ত করতে বাধ্য হয়, আর এ শিক্ষাটা হয়ে উঠে ঘৃণার। ঘৃণার কোনো জিনিস ভালো ফলে বয়ে আনে না, তিনি বলেন, এবং শ্রেণীকক্ষকে আনন্দময় ও প্রাণবন্ত করার জন্য শিক্ষকদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেন।

অনুষ্ঠান শেষ হয় এক সময়, চলে যান সৌম্য চেহারার মানুষটি, রেখে যান স্নিগ্ধ অমলিন হাসি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29450849 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29450849 2011-09-19 02:05:16
সোফা ও এলিভেটর সমস্যা—সাময়িক ও ব্যবহারিক পোস্ট :-) " style="border:0;" />



এলিভেটরের গভীরতা: ১৪২ সে. মি.
প্রশস্ততা: ১০৫ সে. মি.
উচ্চতা: ২১০ সে. মি.



সোফার উচ্চতা: ৮৩ সে. মি.
প্রশস্ততা: ৯৫ সে. মি.
দৈর্ঘ্য: ২২৮ সে. মি.

সোফাটি এলিভেটরে বহন করা যাবে কি? <img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29421928 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29421928 2011-07-29 03:49:26
হাঙ্গেরি—দানিয়ুব মুক্তার দেশে
পোপ প্রথম লিও দূত পাঠান তাদের সম্রাটের কাছে, রক্তযজ্ঞ শুরু হওয়ার আগে একান্তে কিছু কথা বলতে চান তিনি। রোমের দেয়ালের বাইরে দাঁড়িয়ে কী কথা বলেছিলেন পোপ লিও, কেউ জানে না, কিন্তু শকদের(Scythian) সম্রাট, অ্যাটিলা—অ্যাটিলা দ্য হান (?–৪৫৩ খ্রি.), পশ্চিমা ইতিহাসবিদগণ যাকে স্রষ্টার চাবুক (Scourge of God) হিসেবেই অভিহিত করেন, ঘুরিয়ে নেয় তার অশ্বের মুখ, বেঁচে যায় পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য। এর অনতিকাল পরেই মারা যায় অ্যাটিলা।

শিল্পীর চোখে অ্যাটিলা

হান সাম্রাজ্যের জার্মান গোত্রগুলোর প্রতিশোধ নেবার পালা এবার, শুরু হয় হান-জার্মান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। দানিয়ুব নদীর কার্পাথিয়ান অববাহিকার পূর্ব তীরের হান বসতিগুলো পাহারা দিতে থাকে যেকেলি গোত্র, আর অ্যাটিলার পুত্রগণ চালিয়ে যেতে থাকে হান সাম্রাজ্যের শত্রুদের বিরুদ্ধে একের পর এক যুদ্ধ। অ্যটিলার কনিষ্ট পূত্র সাবা ফিরে যায় পূর্ব দিকে, কথা দেয় যেকেলিদের—শক্তি সংগ্রহ করে শীঘ্রই ফিরে আসবে সে, রক্ষা করবে তার হান ভাইদের, প্রাণপণে তারা যেন টিকিয়ে রাখে হান দেয়ালগুলো। সাবা তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিল।

এমনকি আকাশের তারকারাজিদের মধ্যে সাবা তার পূর্বপুরুষদের সাথে মিলিত হবার বহু যুগ পরও অদম্য হান সেনারা বার বার ফিরে আসে ওপারের জগত থেকে, আকাশগঙ্গার তারকাখচিত পথ ধরে, হাঙ্গেরিয়ানরা যাকে বলে হাদাক উৎযা, যোদ্ধাদের পথ।

শিল্পীর চোখে, আকাশগঙ্গার পথ ধরে যুগে যুগে হানদের আগমন

অ্যাটিলার মৃত্যুর সাড়ে চারশ বছর পর পূর্ব দিক থেকে সাতটি ভয়ঙ্কর গোত্র আসে দানিয়ুব অববাহিকায়, তাদের যুবরাজ আরপাদের (Árpád, আনু. ৮৪৫–আনু. ৯০৭ খ্রি.) নেতৃত্বে। এদের আগমন ঘটে এমন এক স্বপ্নের হাত ধরে, যা অবলোকন করেছিলেন ইমেস, আরপাদের দাদী, বহু বছর আগে। পবিত্র তুরুল পাখি আসে ইমেসের স্বপ্নে, ইমেসের শরীর থেকে বইতে থাকে স্ফটিকস্বচ্ছ এক জলের ধারা, সে ধারা বইতে থাকে পশ্চিমে, বড় হয় ধারা, এক সময় তা পরিণত হয় বিশাল এক স্রোতস্বিনীতে। তোমার গর্ভ জন্ম দেবে এক রাজবংশের, হানদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করবে তারা, যাদের আবাস হবে পশ্চিমে, একদা যেখানে ছিল অ্যাটিলার রাজধানী—গোত্রের জ্ঞানীপুরুষেরা ব্যক্ত করে স্বপ্নের বেদ।

আরপাদের গোত্রসমূহ, নিজেদের যারা বলে মাদিয়ার (Magyar), এভাবেই নিশ্চিত করে হানদের সাথে তাদের রক্তসম্পর্ক, এবং সেই ভবিষ্যদ্বাণী, মাদিয়ার গোষ্ঠি একদিন পুনর্দখল করবে তাদের পিতৃপুরুষের ভূমি, অ্যাটিলার সুবিশাল হান সাম্রাজ্যের যথার্থ উত্তরসূরী হিসেবে।

শিল্পীর চোখে, কার্পাথিয়ান অববাহিকায় আরপাদের নেতৃত্বে মাদিয়ার তথা হাঙ্গেরীয়দের সাতটি গোত্রের আগমন

কিন্তু এসবই কিংবদন্তি আর পুরাণের কথা!

বাস করে ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে, অথচ ঠিক ইউরোপিয়ানদের মতো নয় তারা। কথা বলে জটিল অনন্য এক ভাষায়, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার সাথে যা মেলে না মোটেও, যার কিছুটা মিল পাওয়া যায় সুদূর বাল্টিক তীরের ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়া এবং নরওয়ের উত্তরে সামী গোত্রের ভাষার সাথে। কেবল ভাষাগত মিল দেখে ইতিহাসবিদগণ বলেন, আরপাদের পূর্বপুরুষগণ বাস করত দক্ষিণ উরাল পর্বতের পাদদেশে, সেখান থেকেই এসেছে তারা; কিন্তু তাদের কিংবদন্তি ও পুরাণ বলে, তারাও বিশ্বাস করে, তাদের পূর্বপুরুষেরা এসেছে এশিয়ার শকভূমি (Scythia) থেকে, এবং হয়তো মেসোপটেমিয়া (Iraq) থেকে পার্থিয়া (Iran) হয়ে।

ইতিহাস পুরাণ রেখে একটু হাঁটা যাক:

বুদাপেস্ট (Budapest)
বুদা, অবুদা ও পেস্ট—তিনটি শহর মিলে বুদাপেস্ট, আজকের হাঙ্গেরির রাজধানী। পশ্চিম তীরে নির্জন পাহাড়ী পৌরাণিক বুদা, পূর্ব তীরে তুলনামূলক আধূনিক ব্যস্ত পেস্ট, মাঝখানে প্রবাহমান স্নিগ্ধ দানিয়ুব। মানুষ আদর করে বুদাপেস্টকে ডাকে দানিয়ুবের মুক্তা—রাতের ঝলমলে আলোয় শান্ত নদীর দিকে তাকালে কথাটি সত্যিই মনে হয়। আহ্, বুড়িগঙ্গা, আহ্‌ ঢাকা!

বুদা শহরে ঢোকার মুখের সুড়ঙ্গ
সুড়ঙ্গের বাম পাশে ছোট্ট একটি গাছের গোড়া হচ্ছে হাঙ্গেরির শূন্য বিন্দু—দেশের সকল পথ এখানে এসে মিলিত হয়, রোমে নয়। এখান থেকেই হাঙ্গেরির বিভিন্ন স্থানের দূরত্ব পরিমাপ করা হয়।

সুড়ঙ্গের উপরে পাহাড়ের উঁচুতে দালানটি হাঙ্গেরির রাষ্ট্রপতির ভবন, শান্দর পালোটা (Sándor palota)। ১৮০৬ সালে নির্মিত এ ভবনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যায়, পরে ২০০২ সালে নতুন করে নির্মাণ করা হয়। সুড়ঙ্গের বাম পাশ থেকে রজ্জুরেলে (funicular) চড়ে কিংবা সিঁড়ি ধরে পাহাড়ে উঠা যায়, আবার সুড়ঙ্গের উল্টোপ্রান্ত থেকে সরাসরিও আসা যায়। তবে রজ্জুরেল ভ্রমণের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে।

বামপাশে উড়ন্ত যে পাখিটি দেখা যাচ্ছে, তার নাম কী?

জেলেদের বেষ্টনী (Fisherman's Bastion)
দানিয়ুব ও পেস্ট শহরের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য দেখতে চাইলে পর্যটকদের জন্য বুদাতীরবর্তী জেলেদের বেষ্টনীতে যাওয়া অবশ্য কর্তব্য। সুড়ঙ্গের ডান দিকে, রাষ্ট্রপতি ভবনের উল্টো দিকে অনতিদূরে এ চত্বরটি অবস্থিত। এটিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, পরে সংস্কার করা হয়।

মধ্যযুগে এ পাড়ের জেলেরা বুদার দেয়ালগুলোকে রক্ষা করত, তাদের সম্মানার্থে চত্বরটির এরূপ নামকরণ। চত্বরটিতে মোট ৭টি গম্বুজ রয়েছে, যার প্রতিটি আরপাদের নেতৃত্বে বসতি গড়া মাদিয়ারদের ৭টি গোত্রের একেকটিকে নির্দেশ করে।

দরবেশ সম্রাট ইস্তবান (Stephen I of Hungary)
জেলেদের বেষ্টনীতে ঢোকার মুখেই দাঁড়িয়ে আছেন সম্রাট ইস্তবান (আনু. ৯৬৭—১০৩৮ খ্রি.), আরপাদের পৌত্র, হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। পোপের আশীর্বাদপুষ্ট পবিত্র মুকুট পরিধান করে সিংহাসনে আরোহণ করেন তিনি, তাঁর সময়েই হাঙ্গেরিতে খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটে। ইস্তবানের পবিত্র মুকুট পরিধান করাকে হাঙ্গেরিবাসীগণ বিশ্বাস করে অ্যাটিলাকে দেয়া পোপের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন: আজকে যদি রোমকে ধ্বংস না করে ফিরে যাও তুমি, তোমার বংশধরদের মস্তকে শোভা পাবে একদিন পবিত্র মুকুট।

ম্যাথিয়াস গির্জা (Matthias Church)

ইস্তবানের মূর্তির ঠিক সামনেই 'চার্চ অব আওয়ার লেডি' ভবন, সাধারণভাবে ম্যাথিয়াস গির্জা নামে পরিচিত। জনশ্রুতি আছে, ইস্তবান এটি প্রথম নির্মাণ করেন, যদিও ত্রয়োদশ শতকের পূর্বে এখানে গির্জার অস্তিত্মের প্রমাণ পাওয়া যায় না। পঞ্চদশ শতকের জনপ্রিয় সম্রাট ম্যাথিয়াস এর ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন, তাই বর্তমানে এটি তাঁর নামে পরিচিত।

শৃঙ্খল সেতু (Chain Bridge )
সুড়ঙ্গের ঠিক উল্টো দিকে, বুদা ও পেস্টের সংযোগকারী প্রথম সেতু, ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে উন্মুক্ত হয়। পরে অবশ্য আরো ৮টি সেতু নির্মিত হয়, কিন্তু হাঙ্গেরিতে এর মর্যাদা অনন্য।

বিকেলের দানিয়ুব

শৃঙ্খল সেতুর বুদা প্রান্ত থেকে তোলা। বাম পাশে পেস্টের তীরে হাঙ্গেরির সংসদভবন দেখা যায়।

ইস্তবান ব্যাসিলিকা (St. Stephen's Basilica)

পেস্ট শহরে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এ ভবনটি হাঙ্গেরির সবচেয়ে জনপ্রিয় গির্জা। উচ্চতায় এটি হাঙ্গেরির সংসদভবনের সমান, যা পার্থিব ও আধ্যাত্মিক চিন্তার সমান গুরুত্ব নির্দেশ করে। এর ভেতরে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে সম্রাট ইস্তবানের মমিকৃত ডান কব্জিটি সংরক্ষিত।

বীরদের চত্বর (Hősök tere)

দানিয়ুব থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে পেস্ট শহরে অবস্থিত হাঙ্গেরির জাতীয় চত্বর। 'আরপাদের নেত্বত্বে মাদিয়ারদের আগমনের সহস্র বর্ষ' উদযাপনকালে, ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মিত হয়।

সামনের উঁচু কলামটিতে ফেরেশতা গ্যাব্রিয়েল ইস্তবানের পবিত্র মুকুট ধরে রেখেছেন। কিংবদন্তি বলে, ইস্তবানের স্বপ্নে গ্যাব্রিয়েল দেখা দিয়ে তাঁকে মুকুট উৎসর্গ করেন।

গ্যাব্রিয়েলের নীচে আরপাদের নেতৃত্বে মাদিয়ার গোত্রসমূহের নেতাগণ অশ্বপৃষ্ঠে আসীন। পেছনে, বামে ও ডানে বৃত্তচাপের মধ্যে হাঙ্গেরির জাতীয় বীর ও বিখ্যাত সম্রাটগণ।

রাতের দানিয়ুব

পেস্ট তীরে একটি জলযান থেকে তোলা, শৃঙ্খল সেতুর একাংশ, দুর্গ জেলা এবং ম্যাথিয়াস গির্জার একটি গম্বুজ।

দুর্গ জেলা (Castle Hill/District)

বুদা সুড়ঙ্গের উপরে দুপাশে বিস্তৃত, এককালে হাঙ্গেরির প্রধান দুর্গ হিসেবে কাজ করত। পেছন দিকে রোমান আমলের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। হাঙ্গেরি রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমা হিসেবে বহু বছর খ্যাত ছিল, তখন এর নাম ছিল প্যানোনিয়া। বর্তমানে এখানে রয়েছে জাতীয় শিল্পভবন, জাতীয় গ্রন্থাগার, ঐতিহাসিক জাদুঘর, রাষ্ট্রপ্রধানের ভবন।

ভবনে ঢোকার মুখেই পাহাড়া দিচ্ছে পূর্বে দেখা সেই তুরুল পাখিটি, তার থাবায় চকচকে তলোয়ার। হাঙ্গেরির সবচেয়ে জনপ্রিয় পাখি তুরুল, জাতীয়তাবাদের প্রতীক।

ম্যাথিয়াস ঝর্ণা
বিশাল এলাকা নিয়ে দুর্গ শহর, দেখার আছে অনেক কিছু। ফেরার পথে একটি স্থাপত্য আর কিংবদন্তি মন খারাপ করে দিল খুব।

তরুণ ম্যাথিয়াস, হাঙ্গেরির সবচেয়ে জনপ্রিয় সম্রাট, বের হয়েছেন গোপন মৃগয়ায়, সঙ্গে পারিষদবর্গ, সৈন্য-সামন্ত। রাজার সামনে হঠাৎ পড়ে যায় গাঁয়ের কৃষকের মেয়ে, সেপ ইলোনকা। মেয়েটি ভালোবেসে ফেলে তরুণ সম্রাটকে, কিন্তু যখন বুঝতে পারে অপরিচিত এ যুবক আসলে তাদেরই রাজা, গভীর কষ্টে ভেঙে যায় তার বুক—এ মিলন যে হবার নয়। ভগ্ন হৃদয়েই মারা যায় একদিন অভাগী মেয়েটি।

ঝর্ণার উঁচুতে মৃত হরিণের উপর দাঁড়িয়ে রাজা, নীচে ডানপাশে আলো-আঁধারিতে সেপ ইলোনকা।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29411467 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29411467 2011-07-12 05:00:10
হিংসা–জিঘাংসার ত্রিঘাত সমীকরণ

ব্রেশা অঞ্চলের নিকোলোর প্রতি কৈ অঞ্চলের জুয়ান্নের পত্র
সিনিওরে নিকোলো,
আমি ব্রেশা অঞ্চলের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত আছি। গণিতের সমস্যা সমাধানে আপনার অতীব দক্ষতার কথা অত্র এলাকায় সুবিদিত। এরই উপর ভরসা করে, আপনার ক্ষুরধার বুদ্ধির কাছে দুটি সমস্যা পেশ করলাম। এদের সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন, মনে বড় আশা।
(এক) এমন একটি সংখ্যা বের করতে হবে যাকে তার মূল তিন দ্বারা বৃদ্ধি করে গুণন করলে ফলাফল দাঁড়ায় পাঁচ।
(দুই) এমন সংখ্যাত্রয় বের করতে হবে যার দ্বিতীয়টি প্রথমটি থেকে দুই বেশি, তৃতীয়টিও দ্বিতীয়টি থেকে দুই বেশি, এবং তাদের সম্মিলিতি গুণফল ১০০০।

কৈ অঞ্চলের জুয়ান্নের প্রতি ব্রেশা অঞ্চলের নিকোলোর পত্রোত্তর
সিনিওরে জুয়ান্নে,
আপনি আমার কাছে দুটি এমন সমস্যা পাঠিয়েছেন যেন তাদের সমাধান করা অসম্ভব হয় কিংবা অন্ততঃপক্ষে সমাধান আমার জানা না থাকে। কারণ, বীজগণিতের সাহায্যে অগ্রসর হয়ে আমি উপলব্ধি করলাম, প্রথমটির জন্য এক ঘন ও ৩ সেনসি = ৫—এ সম্পর্কের উপর কাজ করতে হয়, আর দ্বিতীয়টির জন্য করতে হয়, এক ঘন, ৬ সেনসি ও ৮ কোসা = ১০০০—এর উপর।
[অর্থাৎ, (এক) x^3 + 3x^2 = 5; (দুই) x^3 + 6x^2 + 8x = 1000]

স্বর্গত যাজক-ভ্রাতা লুকা প্যাসিওলি তাঁর সুম্মা দি অ্যারিথমেটিকা জিওমেত্রিয়া প্রোপোর্তিওনি ইত প্রোপর্তিওনালিতা [Summa de arithmetica, geometria, proportioni et proportionalita] গ্রন্থে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে গেছেন—এ ধরণের সমীকরণ সমাধানের সাধারণ নিয়ম বের করা অসম্ভব, যেরকম অসম্ভব বৃত্তের বর্গকরণ; অন্যদেরও একই অভিমত। আসলে, সিনিওরে, আপনার ধারণা, এরূপ প্রশ্ন করে আপনি নিজেকে আমার চেয়ে জ্ঞানী প্রমাণ করতে পারবেন, সবাই মনে করবে আপনি খুব উঁচু মাপের গণিতবিদ। আমি শুনেছি ব্রেশা অঞ্চলের বিজ্ঞানের সকল শিক্ষকের সাথে আপনি এ ধরণের আচরণ করে থাকেন, যাতে তারা আপনার প্রশ্নে ভীত হয়ে কোনো কথা বলার সাহস না পায়; প্রকৃতপক্ষে হয়তো তারা আপনার চেয়ে বেশিই জানে।

জুয়ান্নের দ্বিতীয় পত্র
সিনিওরে নিকোলো,
আপনার উত্তরখানি আমি ততটুকুই বুঝতে পেরেছি, ঠিক যতটুকু আপনি আমাকে লিখেছেন, এবং আপনি মনে করেন ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান অসম্ভব।

নিকোলোর উত্তর
সিনিওরে জুয়ান্নে,
আমি বলছি না এদের সমাধান অসম্ভব। সত্যি বলতে কী, এক নম্বর সমস্যাটির ক্ষেত্রে, যেখানে ঘন ও সেনসি মিলে সংখ্যা হয়, আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে সাধারণ সূত্রটি আমি সম্প্রতি আবিষ্কার করে ফেলেছি। তবে সমাধানটি আপাতত গোপন রাখাই আমার অভিপ্রায়। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে, যেখানে ঘন, সেনসি ও কোসা মিলে সংখ্যা হয়, আমি স্বীকার করছি এখন পর্যন্ত সাধারণ কোনো নিয়ম বের করতে পারিনি; কিন্তু সেসাথে আমি এটি বলতে চাই না যে, এখন পর্যন্ত কোনো নিয়ম আবিষ্কার না হওয়ার মানে এটি একেবারেই অসম্ভব।

যা হোক, আপনার সাথে ৫ ডুকাটের বিপরীতে আমি ১০ ডুকাট বাজি রেখে বলতে পারি, আপনার পাঠানো দুটি সমস্যার একটিও আপনি সাধারণ কোনো নিয়মে সমাধান করতে পারবেন না। এবং এটি এমন একটি গর্হিত ব্যাপার যার জন্য লজ্জিত হওয়া উচিত আপনার—নিজে যা জানেন না অন্যেকে তা প্রশ্ন করে বেড়ান আর ভান করেন যে জানেন, যাতে সবাই আপনাকে বড় ভাবে।

ব্রেশা অঞ্চলের নিকোলোর প্রতি বোলোনিয়া অঞ্চলের অ্যান্তোনিও ফিওরের পত্র
সিনিওরে নিকোলো,
লোকমুখে জানতে পারলাম, আপনি নাকি জনে জনে বলে বেড়াচ্ছেন যে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান পৃথিবীতে আপনিই প্রথম আবিষ্কার করেছেন! যত আনন্দ-আস্ফালনই করুন, আপনি জেনে রাখুন, এই সমীকরণের সমাধান আপনারও বার বছর পূর্বে আমার শিক্ষক স্বর্গত দেল ফেররো আর আমি মিলে করে রেখেছি। এক যুগ ধরে সমাধানটি সযত্নে আগলে রাখছি, আর আপনি কোত্থেকে এসে দুম করে দাবি করে বসলেন, আপনিই প্রথম! আমি অবশ্য ঠিকই খবর রাখি, লোকজন আপনার আবিষ্কারে কান দিচ্ছে না, বরং হাসাহাসি করছে তা নিয়ে। চালবাজির প্রতি মানুষের আচরণ এরূপ হওয়ারই কথা। আপনি যদি প্রতারক মিথ্যাবাদী চালিয়াৎ না হন, তাহলে জনসমক্ষে সমীকরণ সমাধানের প্রতিযোগিতায় নামতে আহ্বান করলাম আপনাকে; আশা করি, লেজ গুটিয়ে পালাবেন না।

বোলোনিয়া অঞ্চলের ফিওরের প্রতি ব্রেশা অঞ্চলের নিকোলোর পত্রোত্তর সিনিওরে ফিওর,
বার বছর পর্যন্ত এত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার চেপে রেখেছেন, আর এখন কি না আমার কথা শুনে তা রাষ্ট্র করার সময় হলো আপনার, আশ্চর্য বিষয়ই বটে! এছাড়া যতদূর জানি, পাটিগণিতের মানুষ আপনি, বীজগণিত আপনার বিষয় নয়। জীবনে অবশ্য জিঘাংসাপূর্ণ মানুষের কম দেখা পাইনি আমি, সিনিওরে, যাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্যের অবদানকে নিজের বলে চালিয়ে দেয়া। আপনার চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহণ করলাম, সিনিওরে, ভেনিসের মাটিতেই ফয়সালা হবে কে সেরা আর কার মর্যাদা মাটিতে লুটায়। কীভাবে প্রতিযোগিতায় নামতে চান, সত্বর জানাবেন।

ফিওরের দ্বিতীয় পত্র
সিনিওরে নিকোলো,
আপনি লেজ গুটিয়ে পালাননি দেখে খুশি হলাম, যদিও এটিই হতো আপনার জন্য মঙ্গলজনক। যা হোক, আমাদের প্রতিযোগিতা এরূপ হবে যে, ভেনিসের ময়দানে আমি আপনাকে গণিতের ৩০টি সমস্যা দেব, অনুরূপভাবে আপনিও আমাকে ৩০টি সমস্যা দিবেন। ত্রিশ দিন সময়কালে আমাদের মধ্যে যে বেশি সংখ্যক সমস্যা সমাধান করতে পারবে, অপরজন অবনত মস্তকে তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নেবে আর প্রতি সমস্যায় ব্যর্থতার জন্য কিছু আর্থিক দণ্ডও প্রদান করবে।

(প্রথম পর্ব)

_____________________________
*রেনেঁসার যুগে, যখন এখনকার মতো বীজগাণিতিক চিহ্নের প্রচলন ঘটেনি, অজানা কোনো রাশিকে ইটালির ভাষায় বলা হতো কোসা, তার বর্গকে বলা হতো সেনসি।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29398985 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29398985 2011-06-19 06:10:40
নরওয়ে—অরোরা বোরিয়ালিসের দেশে
নরওয়ের অজলোতে আমার মোবাইলে তোলা কিছু ছবি। ছবি তোলার ব্যাপারে আমার ধারণা একেবারেই কম, কিন্তু আজ প্রথম বুঝতে পারলাম, ছবি যারা তোলেন, তাদের ভেতর এ নিয়ে কী অসম্ভব আবেগ কাজ করতে পারে। দুয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি ক্যামেরা কেনার পরিকল্পনা আছে, ক্যামেরা ও ছবি তোলার ব্যাপারে অভিজ্ঞদের মতামত পেলে খুব খুশি হব।


শহরকেন্দ্রের ঠিক কাছেই নরওয়ের জাতীয় নাট্যশালা। বাস থেকে নেমে একটু ঘুরে সামনে গিয়ে ছবি তুললাম, রাগী চেহারার এক ভদ্রলোক হঠাৎ ডানদিক দিয়ে ফ্রেমের ভেতর ঢুকে পড়লেন।


ভদ্রলোকের একক ছবি তোলার জন্য তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, নেমপ্লেটে বর্নস্টার্ন বিয়র্নসন (Bjørnstjerne Bjornson) লেখা দেখেও কিছু স্মরণ করতে পারলাম না। পরে অবশ্য তাঁর পরিচয় জেনে অভিভূত হয়েছি: নরওয়ের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা এবং ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী।


বিয়র্নসনের উল্টোপাশে শ্মশ্রুমণ্ডিত শান্ত সমাহিত, কিছুটা চিন্তামগ্ন, আরেকজন মানুষ; দু হাত পেছনে রেখে হেঁটে যাচ্ছেন আপনমনে, প্রথম দেখায় বাগদাদের বাজারে হেঁটে যাওয়া আরব্যরজনীর কোনো চরিত্র মনে হয়। নাম দেখে এঁকে সহজেই চিনে ফেললাম, ভূবনবিখ্যাত নাট্যকার, আধুনিক নাট্যতত্ত্বের জনক, হেনরিক ইবসেন (Henrik Ibsen, ১৮২৮–১৯০৬)। তাঁর A Doll’s House আমাদের বেইলিরোডে নিয়মিত অভিনীত হয়।


ইবসেনকে ছাড়িয়ে সামনে সদম্ভে দাঁড়িয়ে আছেন হেনরিক ভার্গেল্যান্ড (Henrik Wergeland, ১৮০৮–১৮৪৫), নরওয়ের জাতীয় কবি— আমাদের ঝাঁকড়া চুলের নজরুলের সাথে বেশ মিল তাঁর। বিদ্রোহ করেছেন নরওয়ের উপর সুইডিশ শাসনের বিরুদ্ধে, দিয়েছেন জ্বালাময়ী বক্তৃতা, লিখেছেন আগুনঝরা কবিতা। সুইডিশ-শাসনের পূর্বে ডেনমার্কের অধীনে প্রায় ৪০০ বছর কাটে নরওয়ের, ফলে ভাইকিংদের কাছ থেকে পাওয়া প্রাচীন নর্স মাতৃভাষাটি হারিয়ে ফেলে নরওয়ে, ডেনিশ থেকে উদ্ভূত বুকমল (bokmål)‬ বা "বইয়ের ভাষা" হয়ে উঠে শিক্ষিত শ্রেণীর ভাষা। ভার্গেল্যান্ড সংগ্রাম চালিয়ে যান নরওয়ের গণমানুষের আঞ্চলিক কথ্যভাষাগুলোর একটি প্রমিত লিখিতরূপ প্রতিষ্ঠা করতে। আর এ কারণেই নরওয়েতে বর্তমানে দুটি রাষ্ট্রীয় ভাষা চালু রয়েছে, একটি ডেনিশউদ্ভূত বুকমল এবং অন্যটি প্রাচীন নর্স প্রভাবে সৃষ্ট আঞ্চলিক ভাষাগুলোর প্রমিতরূপ, নেনর্সক (Nynorsk) বা "নতুন নরওয়েজিয়ান"। বুকমল ও নেনর্সক সমর্থকদের মধ্যে গত দু'শ বছর ধরেই চলে আসছে সুতীব্র দ্বন্দ্ব, যা এখনও প্রতিনিয়ত নরওয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে যায়।


ভার্গেল্যান্ডের বাড়ানো হাতের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে নরওয়ের সংসদভবন (Stortinget), আমাদের সংসদ ভবনের তুলনায় বেশ ছোট আকারের; ১৬ কোটি মানুষের সংসদ এবং ৫০ লাখ মানুষের সংসদে এ পার্থক্য অবশ্য অস্বাভাবিক নয়।


সংসদ থেকে উল্টা দিকে আবার জাতীয় নাট্যশালার দিকে রওয়ানা দিলাম, অজলোর প্রধান রাস্তা কার্ল লোহান (Karl Johan) সড়ক ধরে। ডান পাশে চোখ পড়ল অজলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ক্যাম্পাস, আইন অনুষদটি এখনও এখানেই আছে।


কার্ল লোহান সড়কের মাথায় দু'পাশে উদ্যান, বা'দিক দিয়ে ঢুকলাম। সামনে এগুতেই দেখি নীলস হেনরিক আবেল (Niels Henrik Abel, ১৮০২–১৮২৯), মহাশূন্যে পাড়ি দেয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। গ্যালওয়া বেঁচেছিল মাত্র ২১ বছর, আবেল ২৭, রামানুজন ৩১; পৃথিবীর ক্ষুদ্র জীবন তাদের অমরত্বকে দীর্ঘায়িতই করেছে কেবল।


আবেলের পেছনেই অজলো রাজবাড়ি, সামনে অশ্বপৃষ্ঠে আসীন নরওয়ে-সুইডেনের এককালের রাজা কার্ল লোহান (১৭৬৩-১৮৪৪)।


এঁর রাজা হওয়ার কাহিনী বড়ই চমকপ্রদ। সুইডেনের রাজা ত্রয়োদশ চার্লস বৃদ্ধাবস্থায়ও নিঃসন্তান রয়ে গেলে রাজ্য জুড়ে হাহাকার পড়ে গেল। রাজা মারা গেলে সুইডেন আর বুক ফুলিয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশকে বলতে পারবে না, আমাদেরও রাজা আছে—কী দুঃখের কথা! সবাই শলাপরামর্শ করে শেষে রাজার আস্তাবলের সবচেয়ে বড় হাতিটিকে ছেড়ে দিল; হাতি এ রাজ্য সে রাজ্য ঘুরে কোত্থেকে যেন কার্ল লোহানকে শূঁড়ে করে এনে সুইডেনের সিংহাসনে বসিয়ে দিল। লোহান অবশ্য যুদ্ধবিগ্রহে বেশ পারদর্শী ছিলেন। অতীতে পূর্বদিকের যুদ্ধে রাশিয়ার কাছে ফিনল্যান্ডকে হারায় সুইডেন; লোহান ক্ষমতায় এসেই পশ্চিমে ডেনমার্ককে চেপে ধরে যেন নরওয়েকে সুইডেনের হাতে দিয়ে দেয়। ছোটখাট দুয়েকটি যুদ্ধের পর নরওয়েকে হস্তান্তর করে ডেনমার্ক, কিন্তু নরওয়ে এ সময় তার স্বাধীনতা ঘোষণা করে। বল ও কৌশলে সুইডেনের সাথে নরওয়েকে যুক্ত করে রাখেন কার্ল লোহান বেশ অনেক বছর, যদিও নরওয়ে তখন থেকেই তার স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে আসছে। আগামী ১৭ই মে আসছে সে দিবস।

আচ্ছা, আমি বোধহয় এখানে একটু রূপকথা ঢুকিয়ে দিয়েছি, ঐ যে হাতির অংশটুকুতে। তবে আপনারা কার্ল লোহানের সত্যিকারের ইতিহাস পড়লে উপলব্ধি করবেন, আমার রূপকথা সত্য থেকে বেশি দূরে নয়!


রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় দেখা হয় ক্যামিলা কলেট (Camilla Collett, ১৮১৩–১৮৯৫)–এর সাথে, হেনরিক ভার্গেল্যান্ডের বোন, নরওয়ের প্রথম আধুনিক ঔপন্যাসিক, আমাদের প্যারিচাঁদ মিত্র ও বঙ্কিমের প্রায় সমসাময়িক। নারীজাগরণের পথিকৃত, সারা জীবনই লড়েছেন তিনি তাঁর চারপাশের প্রতিকূলতা ঝড়-ঝঞ্ঝার বিরুদ্ধে। প্রবল ঝোড়ো হাওয়ায় গায়ের উপর কাপড়টি এখনও শক্ত করে ধরে রেখেছেন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29375465 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29375465 2011-05-05 05:09:34
একিলিস–কচ্ছপ এবং আলেফ–নাল

থেসালি
থেসালি নগরীর উপকণ্ঠে, ঈজিয়ান সাগরের তীরে একদা রোদ পোহাচ্ছিল একিলিস। মনটা বেশ ফুরফুরে তার, টানা সপ্তম বারের মতো অলিম্পিক দৌঁড়ে জিতেছে কিছুদিন আগে, জলপাই পাতার মুকুটটি তরতাজা এখনও। ঠোঁটের কোনে তার প্রাচীন গ্রিক সঙ্গীতের গুনগুন, মাঝেমাঝে সে নেড়েচেড়ে দেখছে জলপাতার মুকুট। এমন সময় পণ্ডিত চেহারার এক কচ্ছপ এসে হাজির হল তার কাছে।

"কী চাস?" অবজ্ঞাভরে তাকায় একিলিস। মেজাজ খানিকটা চড়ে উঠে তার, কচ্ছপ ব্যাটা রোদটা একেবারে আড়াল করে ফেলেছে।
"তোমাকে নাকি সবাই ক্ষীপ্র পায়ের একিলিস, Achilles of the nimble feet, বলে?"
"তো?" চোখের ভ্রু'র পেশীগুলি নড়েচড়ে উঠে একিলিসের।
"তারা ভুল বলে," কচ্ছপের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি। "আমি তোমাকে দৌড়ে হারিয়ে দিতে পারি।"
"তাই নাকি?" মেজাজ বেশিই খারাপ হ্য় একিলিসের। ইচ্ছা করে বেয়াদব কচ্ছপটির গালে একটি চড় লাগিয়ে দিতে।
"হ্যাঁ, যদি তুমি আমাকে একটু আগে থেকে শুরু করতে দাও আর কি।"
"কতটুকু চাস?"
"এই, ধরো, ১০ হাত।"
"তোকে আমি এক নগর আগে থেকে দিতে পারি।"
"না না, কী বলো! অতটা লাগবে না।" বিনয় ঝরে পরে কচ্ছপের চেহারায়। "১০ হাতই যথেষ্ট আমার জন্য।"
"চল তাহলে, শুরু করি।"

"আচ্ছা একিলিস, তোমার তো, যতদূর জানি, বুদ্ধিশুদ্ধি ভালোই আছে, আর গণিতও তুমি জানো মোটামুটি" গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে পড়ে গেছে, এমন ভাব করে কচ্ছপ বলে। "খামোখা আমরা না দৌঁড়ে, যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দিচ্ছি যে তোমাকে আমি হারাতে পারি। ঠিক আছে?" কচ্ছপের স্বরে একটু খোঁচা মনে হলো।
"আচ্ছা, দেখা।" রেগে যায় একিলিস।
"ধরো, তুমি আমাকে ১০ হাত অগ্রযাত্রা দিলে। তুমি কি বলবে যে আমাদের মাঝের এই ১০ হাত তুমি খুব তাড়াতাড়ি অতিক্রম করে ফেলবে?"
"অবশ্যই, খুব দ্রুত।" একিলিসের ঝটপট জবাব।
"এবং এই সময়ে, তোমার কী মনে হয়, আমি কতটুকু এগিয়ে যাব?"
"হয়তো ১ হাত, তার বেশী নয়।" এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলে একিলিস।
"খুব ভালো," উত্তর দেয় কচ্ছপ। "অতএব আমাদের মাঝে এখন ১ হাত দুরত্ব। আর এই ১ হাত তুমি খুব দ্রুত অতিক্রম করে ফেলবে, তাই না?"
"আসলেই খুব দ্রুত অতিক্রম করে ফেলব।"

"তা সত্ত্বেও, এ সময়ে আমি তো আর বসে থাকব না, আরো একটু এগিয়ে যাব। আর এর ফলে তোমাকে ঐ নতুন দূরত্বটুকুও যেতে হবে, তাই না?"
"হ্যাঁ," একটু আস্তে আস্তে বলে একিলিস।
"এবং তুমি যখন আমাকে ধরতে আসছ, তখন আমি আরো একটু এগিয়ে যাব, আর এর ফলে প্রতিবার আমাকে নতুন জায়্গায় ধরার চেষ্টা করবে।" ক্চ্ছ্প মসৃণভাবে বলে। একিলিস চুপ।

"তাহলে তুমি দেখো, প্রতি মুহূর্তে তোমাকে আমাদের মাঝের দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে, এবং সে সময়ে আমিও তোমার জন্য নতুন দূরত্ব যোগ করতেই থাকব। প্রক্রিয়াটির পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে, কখনো শেষ হবে না, যাকে বলে একেবারে অসীমসংখ্যক (infinity) বার। দূরত্ব, তা যতই ছোট হোক না কেন, সে দূরত্ব তোমার সামনে থেকেই যাবে।" দাঁত বের করে হাসে কচ্ছপ।
"তাই তো দেখি।" আমতা আমতা করে একিলিস।
"আর তাই তুমি কখনো আমাকে ধরতে পারবে না," সহানুভূতির স্বরে বলে কচ্ছ্প।
ক্ষীপ্র পায়ের একিলিস, অলিম্পিকের মাঠে জিউসের হাত থেকে জলপাই পাতার মুকুটগ্রহণকারী একিলিস, ভেঙে পড়ে একেবারে। ঈজিয়ানের মর্মর ধ্বনি ছাড়া কয়েক মুহূর্ত আর কোনো শব্দ শোনা যায় না।

লম্বা গলা বাড়িয়ে একিলিসের পিঠ স্পর্শ করে কচ্ছপ, সমবেদনার স্বরে বলে, "বুঝলে, একিলিস, হাঁটুর বুদ্ধির চেয়ে মাথার বুদ্ধি বেশি কাজের জিনিস। তবে হতাশ হয়ো না, একজনের ঠিকানা দিচ্ছি তোমাকে। এঁর কাছে যাও, অসীম-এর ব্যাপারে ভালো কিছু বিদ্যাশিক্ষা হবে তোমার, আশা করি।
ঝিনুকের খোলে গোটা গোটা করে ঠিকানা লিখে কচ্ছপ: জেনো, এলিয়া নগর। ঠিকানা পেয়েই এলিয়া'র উদ্দেশ্যে দৌঁড় শুরু করে একিলিস।

এথেন্স
আনাতোলিয়া (Turkey) ভূখণ্ডের আয়োনিয়ান গ্রিকরা পারস্যরাজের তাড়া খেয়ে দশ বছর ঘুরে বেড়ায় ঈজিয়ান সাগরে, তারপর একদিন বসত গেড়ে এই এলিয়া নগরে। ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে এলিয়ার প্রাণচাঞ্চল্য, গড়ে উঠে সক্রেটিসপূর্ব যুগের দর্শনের শক্তিশালী এক ধারা, এলিয়াটিক স্কুল। এলিয়াটিকরা বিশ্বাস করত, "জগতে সবকিছুই আসলে এক, কিন্তু মানুষের ইন্দ্রিয় জগতের ব্যাপারে ভ্রান্ত ধারণা দেয়। গভীর চিন্তাভাবনার মাধ্যমেই কেবল ইন্দ্রিয়ের ভ্রান্তি এড়িয়ে মানুষ পেতে পারে পরম সত্যের সন্ধান।" পারমেনাইদেস (Parmenides) প্রতিষ্ঠা করেন দর্শনের এ ধারাটি, জেনো (Zeno) তার সুযোগ্য শিষ্য ও প্রচারক।

এলিয়া নগরে এসে একিলিস শুনতে পায় এক মাস পূর্বেই এথেন্স চলে গেছেন জেনো; সাথেসাথেই ফিরতি পথে এথেন্সের রাস্তা ধরে সে। আগে জানলে অবশ্য অনেকটা পথ কমে যেত, কিন্তু জীবনে এই প্রথম বার একিলিস জানার রোমাঞ্চকর আনন্দ অনুভব করতে লাগল।

অ্যাগোরায় বিতর্ক ভাষণ শেষে তার চত্বরে আগুনের কুণ্ডলী জ্বালিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসে আছেন জেনো, বৃদ্ধ গুরু পারমেনাইদেস ঘুমিয়ে পড়েছেন অনেক ক্ষণ। এথেন্সবাসীদের সাথে দীর্ঘ আলোচনায় ক্লান্ত আনন্দময় কেটেছে সারা দিন। এথেন্সের সক্রেটিস ছেলেটি জেনোর মন কেড়েছে বেশ—তীক্ষ্ণধী, কালে কালে বড় এক নৈয়ায়িক (ন্যায়শাস্ত্র বা dialectic-এ পারদর্শী) হবে নিশ্চিত।

হঠাৎ পায়ের শব্দে পিছন ফিরে তাকান জেনো।
"কে, কে ওখানে?"
"আমি, একিলিস।" নম্র স্বরে বলে একিলিস।
"থেটিসপুত্র একিলিস, তুমি এখানে!" অবাক হন জেনো।
"আমি আপনার কাছেই এসেছি, জনাব।" ধীরে ধীরে সব ঘটনা খুলে বলে একিলিস।
"হা হা হা," অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন জেনো। লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে উঠে একিলিস।
"কচ্ছপ ঠিকই বলেছে," জেনো দৃঢ়ভাবে বলেন। "আসলে কচ্ছপের সাথে প্রতিযোগিতা কেন, তুমি নিজে একা একা দৌঁড়েও কখনো কোনো মাঠ পেরুতে পারবে না।"
"এ আপনি কী বলেন, জেনো! পরপর সাত বার অলিম্পিক দৌঁড়ে পদক জিতলাম আমি, দেবরাজ জিউস স্বয়ং পুরস্কৃত করেন আমাকে।" একিলিসের স্বরে সুস্পষ্ট অভিমান।

"ঠিক আছে, প্রমাণ দিচ্ছি আমার কথার। ধরো, একটি মাঠ অতিক্রম করতে চাও তুমি। মাঠের এক মাথা থেকে যাত্রা শুরু করলে এবং মাঠের অর্ধেক, অর্থাৎ ১/২ অংশ অতিক্রম করলে। তোমার সামনে আর কতটুকু পথ রইল?" জেনো শুরু করেন।
"মাঠের ১/২ অংশ বাকি থাকবে আর," উদ্বিগ্নতার সাথে জবাব দেয় একিলিস।
"বাকি অর্ধেকেরও অর্ধেক অতিক্রম করলে তুমি, এবার তাহলে কতটা পথ রইল?"
"মাঠের ১/৪ অংশ।"
"চমৎকার," একিলিসের হিসেব করার ক্ষমতাকে প্রশংসা করেন জেনো। "এখন এই ১/৪ অংশেরও অর্ধেক যদি অতিক্রম করে ফেলো, কত থাকে বাকি?"
"পথের আর ১/৮ ভাগ বাকি থাকবে।"

"ঠিক বলেছ। এভাবে পরের ধাপে তোমার সামনে বাকি থাকছে মাঠের ১/১৬ অংশ; এরপর ১/৩২, ১/৬৪, ১/১২৮, ..., এরূপ অংশ বাকি থাকছে তো থাকছেই। তাই না?"
"হ্যাঁ," ক্ষীণ স্বরে বলে একিলিস।
"অতএব দেখতেই পাচ্ছ, অবশিষ্ট অংশটি কখনো একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে না, ক্রমাগত ছোট হচ্ছে কেবল, আর চলবে তা অনন্তকাল ধরে। ১/১২৮ বলো, ১/২৫৬ বলো, ১/৫১২ বলো, এভাবে যত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশই পাও না কেন, কখনো তা শূন্য হবে না!" রহস্যময় নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলেন জেনো, রাতের ধূসর আকাশে অনন্ত নক্ষত্রবীচির ফাঁকে তার দৃষ্টি আবদ্ধ।

"হিসেব বা যুক্তির মারপ্যাঁচ যা-ই বলি, এ তো সত্য নয়, মহান জেনো!" একিলিস প্রতিবাদ করে মৃদু। "আপনার খোঁজে গত দু'মাস, বলা যায় একটানাই দৌঁড়েছি আমি। দৌঁড়ে যদি কোনো মাঠই পার হতে না পারি, তাহলে থেসালি থেকে এলিয়া, এলিয়া থেকে এথেন্স কীভাবে আসলাম আমি?"
মৃদু হাসেন জেনো। বয়স্করা বাচ্চাদেরকে প্রবোধ দেন যেভাবে, সেভাবে বলেন, "হে থেটিস-পুত্র, পঞ্চ ইন্দ্রিয় মানুষের চারপাশে নিরন্তর ভ্রান্তির জাল বিছিয়ে রাখে, ফলে মানুষ যা দেখে ভুল দেখে। জিতেন্দ্রিয় মানুষই কেবল সন্ধান পায় পরম সত্যের। পৃথিবীতে গতি (motion) বলে কিছুই নেই, সবই স্থির— গতি, সে তো মায়া, সে তো বিভ্রম (illusion)!" উদাস হয়ে উঠেন জেনো।
একিলিসের চোখে তখনও সন্দেহের দোলাচল। জেনো বলেন, "আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। তোমার হাতের বর্শাটি ছুঁড়ে মার ঐ ঝোঁপে।" বর্শা নিক্ষেপ করে একিলিস।

"তুমি কি বলবে বর্শাটি গতিময় ছিল, একিলিস?" প্রশ্ন করেন জেনো।
"হ্যাঁ। তা না হলে ওখানে কীভাবে গেল?"
"বর্শা ছুঁড়ে দেয়ার পর কোনো একটি মুহূর্তের (instant) কথা চিন্তা করো। ঐ মুহূর্তে বর্শাটি চলমান থাকতে পারে না, কারণ মুহূর্তের কোনো সময়কাল (duration) নেই, অর্থাৎ একটি মুহূর্ত শূন্য সময়কালের (zero duration) একটি ব্যাপার। কাজেই বর্শাটি যদি সে মুহূর্তে গতিশীল থাকে, তার মানে হবে, শূন্য সময়কালে [অর্থাৎ আসলে একই সময়ে] দু'টি ভিন্ন জায়গায় অবস্থান করছে সেটি—এ তো অসম্ভব! এভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অসীমসংখ্যক মুহূর্তের কথা চিন্তা কর, দেখবে কোনো মুহূর্তেই বর্শাটি গতিশীল থাকতে পারে না।" মুচকি হাসেন জেনো।

অসীমকে জানতে গিয়ে বরং আরো জটিল ধাঁধায় পড়ে গেল একিলিস, অনেকক্ষণ কথা জোগায় না তার মনে। একসময় সাহস সঞ্চয় করে একিলিস বলে, "অনন্ত অসীমের ব্যাপারে জানতে এসেছিলাম আপনার কাছে।"
"এ-ই তো অনন্ত অসীম, হে পেলেউসপুত্র। জীবনে চলার পথে যেকোনো কাজ করতে গেলে, অর্ধেক অর্ধেক করে অসীমসংখ্যক বার একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছ তুমি। অসীম সংখ্যকবার কোনো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছ তুমি, ফলে তা সমাপ্ত হচ্ছে না কখনো।"

ঢাকা
"কিন্তু জেনোর যুক্তিতে সমস্যা কোথায়, বাবা?" সারাকা প্রশ্ন করে আমাকে।
"একিলিসের একা একা মাঠ পেরুনোর ধাঁধাঁটির কথা চিন্তা করো। ধরো, মাঠের প্রথম ১/২ পেরুতে একিলিসের সময় লাগল ১/২ মিনিট, তাহলে বাকি অর্ধেকের অর্ধেক, অর্থাৎ সম্পূর্ণ মাঠের ১/৪ অংশ, পেরুতে একিলিসের কত সময় লাগবে?"
"যদি গতিবেগ একই থাকে, তাহলে অর্ধেক পথে অর্ধেক সময়। তার মানে বাকি ১/৪ পেরুতে একিলিসের সময় লাগবে ১/৪ মিনিট।"
"ঠিক বলেছ। এবং এরপর বাকি ১/৮ অংশ পেরুতে তার সময় লাগবে ১/৮ মিনিট, তাই তো?"
"কিন্তু এখানেও সমস্যা কোথায়, বাবা? পথ যেমন ছোট হচ্ছে, সময়ও তেমনি ছোট হচ্ছে, কিন্তু বাকি পথ যেহেতু নিঃশেষ হচ্ছে না, সময়ও তো শেষ হচ্ছে না।"

"জেনো'র যুক্তি চিন্তায় ভুল নেই। কিন্তু বাস্তব জগতে স্থান (space) বা সময়কে (time) তুমি এভাবে ক্রমাগত ভাগ করে যেতে পার না। বাস্তব জগতে তুমি হয়তো অত্যন্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র (infinitesimal) দৈর্ঘ্যের একটি স্থান পাবে, কিন্তু তার চেয়ে ক্ষুদ্রতর আর কোনো স্থান জগতে নেই।" আমি বলতে থাকি।
"কল্পনা করো, পৃথিবীতে বালখিল্য নামে অত্যন্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি প্রাণী আছে আর প্রাণীটি তার স্বাভাবিক একটি পদক্ষেপে ঐ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যটি, যার নাম আমরা দিলাম এক বালখিল্য দূরত্ব, অতিক্রম করতে পারে। এখন বালখিল্য তার পরবর্তী পদক্ষেপে চাইলেও কিন্তু ঐ দৈর্ঘ্যের অর্ধেক অতিক্রম করতে পারবে না, তাকে কমপক্ষে উক্ত দৈর্ঘ্যের সমান অতিক্রম করতে হবে। সে অবশ্য ইচ্ছে করলে পরবর্তী পদক্ষেপে লাফিয়ে হয়তো আগের দ্বিগুণ তিনগুণ দূরত্ব চলে যেতে পারবে।

জেনো স্থান'কে অর্ধেক অর্ধেক করে অসীম সংখ্যক ক্রমাগত ছোট ছোট পদক্ষেপে চিন্তা করেছিলেন; তারপর ভেবেছিলেন অসীম সংখ্যক পদক্ষেপের জন্য অসীম সময় লাগবে। কিন্তু যেহেতু সর্বনিম্ন দৈর্ঘ্যের একটি পদক্ষেপের চেয়ে আর ছোট কোনো পদক্ষেপ দেয়া যায় না, কাজেই জেনো চাইলেও অসীমসংখ্যক পদক্ষেপ বাস্তব জীবনে কারো পক্ষে সম্ভব নয়, তা জিনিসটি যত ক্ষুদ্রই হোক।

কাজেই কেউ যদি ভাবে স্থান অসীমসংখ্যকভাবে বিভাজ্য (infinitely divisible), তাহলে ভুল হবে। বরং স্থানকে ভাবতে হবে আমাদের এই বালখিল্যদের পদক্ষেপের মতো। অর্থাৎ ভাবতে হবে একিলিস ও কচ্ছপের সামনে অসীম নয়, হয়তো ১ লাখ বালখিল্য পদক্ষেপ আছে, প্রতিবারে যার একটি বা একাধিক অতিক্রম করতে হবে, একিলিস এবং কচ্ছপ উভয়কে।

এমনি ভাবে সময়েরও সর্বনিম্ন একটি কাল (duration) আছে, যার চেয়ে ছোট কাল বাস্তব জগতে সম্ভব নয়। তার মানে সময় আসলে নদীর স্রোতের মতো ক্রমাগত বয়ে যায় না, বরং থেমে থেমে লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ে।
"অদ্ভুত তো!" সারাকা বলে।

"সর্বনিম্ন সময়কে ধরা যাক এক বালখিল্য কাল," আমি চালিয়ে যাই আলোচনা।
"এখন বালখিল্যরা ১ বালখিল্য কালে দেয় ১ বালখিল্য পদক্ষেপ।
বিভিন্ন প্রাণী বা বস্তুর গতির ভিন্নতার কারণে, একিলিস ১ বালখিল্য কালে দিয়ে ফেলবে হয়তো ১,০০০ বালখিল্য পদক্ষেপ, কচ্ছপটি হয়তো দিবে মাত্র ১০০ বালখিল্য পদক্ষেপ। সুতরাং প্রতি বালখিল্য কাল পর একিলিস ও কচ্ছপের মধ্যে দূরত্ব কমে যাবে ৯০০ বালখিল্য পদক্ষেপ। কাজেই ১ লাখ বালখিল্য পদক্ষেপ অতিক্রম করতে বেশি সময় লাগবে না একিলিসের।"
"কিন্তু, বাবা, ৯০০ দিয়ে ১ লাখকে কি পূর্ণসংখ্যায় ভাগ করা যায়?"
মেয়ের প্রশ্নের তাৎপর্য ও গভীরতা মুগ্ধ করে আমাকে। "ঠিক ধরেছ, এখানে নিঃশেষে বিভাজ্য হচ্ছে না। এক বালখিল্য দূরত্ব পরপর একটি করে বিন্দু চিন্তা কর। সুতরাং একিলিস প্রতি বার যাচ্ছে ১০০০ বালখিল্য বিন্দু, কচ্ছপ যাচ্ছে ১০০ বালখিল্য বিন্দু। তার মানে একিলিস কচ্ছপের ফেলে আসা সব বিন্দুর উপর দিয়ে যাচ্ছে না। এক সময় একিলিস কচ্ছপের খুব কাছে, পেছনে চলে আসবে, পরবর্তী বালখিল্যকালে সে কচ্ছপের বিন্দু না মাড়িয়ে তার উপর দিয়ে হঠাৎ সামনের বিন্দুতে চলে এসে কচ্ছপকে অতিক্রম করে ফেলবে।"

"দুনিয়া কত অদ্ভুত!" চিন্তামগ্ন হয় সারাকা। একটু পর প্রশ্ন করে, "কিন্তু বাবা, এরকম বালখিল্য কাল বা বালখিল্য দূরত্ব কী আসলেই আছে জগতে?"
"হ্যাঁ, মামনি। বিজ্ঞানীরা একে বলেন, প্ল্যাঙ্কের সময় (Planck time), প্ল্যাঙ্কের দূরত্ব (Planck length); তাদের মতে যার চেয়ে ছোট কোনোকিছু কোনো অর্থ বহন করে না।
"কিন্তু এদের চেয়েও ছোট দূরত্ব বা সময় তো আমরা তারপরও কল্পনা করতে পারি।"
"হ্যাঁ, মা। ফলে জেনো'র ধাঁধাঁটি মানুষকে ভাবাবে যুগযুগ। তবে সে কল্পনা যেন তোমাকে জগতের গূঢ় রহস্য উদঘাটনে ধাবিত করে, জগতের প্রতি ভালোবাসা সহমর্মিতা সৃষ্টি করে।"

কিছুক্ষণ চিন্তামগ্ন হয়ে কথাটি মনে গেঁথে নেয় সারাকা। তারপর বলে, "জগতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনিসের কথা জানলাম, বাবা। এবার সবচেয়ে বড় জিনিসের কথা বলো। সে জিনিসটি কি অসীম?"
"আচ্ছা, বলো তো জগতে জোড় সংখ্যা বেশি, না বিজোড় সংখ্যা বেশি?" আমি পালটা প্রশ্ন করি।
জোড় মানে ০, ২, ৪, ৬, ..., যার কোনো শেষ নেই, অসীম; বিজোড় মানে ১, ৩, ৫, ৭, ..., এরও শেষ নেই, এ-ও অসীম।" ভাবে সারাকা। তারপর বলে, "দুটোই সমান, বাবা।"
'হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। এবার বলো তো, {১, ২, ৩, ... ... অসীম পর্যন্ত} এখানে বেশি পদ আছে, নাকি {১০১, ১০২, ১০৩, ... ... অসীম পর্যন্ত} এখানে বেশি পদ আছে?"

খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলে, "এ তো বোঝাই যাচ্ছে, প্রথমটিতে পদের সংখ্যা দ্বিতীয়টির চেয়ে ১০০ বেশি।"
মিটিমিটি হাসি আমি, "গণিতবিদগণ এখন বলেন, দুটোতেই পদের সংখ্যা সমান।"
"মজার ব্যাপার তো! তার মানে দুটো জিনিস অসীম মানেই হচ্ছে তারা সমান?" সারাকা সিদ্ধান্তে আসতে চায়।
"না, অসীম নিয়ে গণিতে যুগান্তকারী কাজ করা গণিতবিদ ক্যান্টর বলেন, জগতে অসীমের মধ্যেও ছোট বড় আছে!"
"অদ্ভুত, অদ্ভুত!" সারাকা জানতে চায় আরো। কিন্তু জরুরি একটি কাজে বেরুতে হবে দেখে আপাতত আলোচনার সমাপ্তি টানতে হলো।
_________________________
* একিলিস পৌরাণিক, জেনো ঐতিহাসিক, সুতরাং তাদের সাক্ষাতকারটি কাল্পনিক।
* জেনোর সময়ে গ্রিসে গাণিতিক সংখ্যা শূন্যের ধারণা ছিল না। তাঁর শূন্য ছিল "কিছুই না" "শেষ হয়ে গেছে" এ ধরণের। এ ছাড়া জেনো মূলতঃ
দার্শনিক ছিলেন।
* বালখিল্য প্রাণীটি একিলিস বা কচ্ছপের চেয়ে দ্রুত গতির হলেও, জেনো'র ধাঁধাঁর বাস্তব সমাধানে সমস্যা নেই, তার মূল কারণ স্থান বা সময় অসীম বিভাজ্য নয়। সুতরাং একিলিস ও কচ্ছপকে বালখিল্যবিন্দু ধরে ধরেই যেতে হবে, এবং যেকোনো সময়কালে একিলিস কচ্ছপের চেয়ে বেশি বিন্দু অতিক্রম করবে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29297683 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29297683 2010-12-28 17:32:17
সেবার মাধ্যমে বিজয়ের প্রকাশ—যে গল্প বলে যেতে হয় ষাটের দশকের শেষ ভাগের কথা। প্রথম বারের মতো বিজলি বাতির আগমন ঘটেছে নাইজেরিয়ার প্রত্যন্ত এক গ্রামে। প্রতি কুঁড়েতে একটি করে বাতি, উন্নয়নের সুস্পষ্ট নিদর্শন। যদিও পড়ার মতো কিছুই ছিল না গ্রামবাসীদের, আর অনেকে পড়তেই জানত না, তবু সমস্যা শুরু হলো রাতের বেলায়, যখন নিজেদের কুঁড়েতে বসে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কারটির দিকে আবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে থাকত তারা। বিজলি বাতি যখন ছিল না, খোলা আকাশের নিচে আগুনের কুণ্ডলি জ্বালিয়ে তা ঘিরে বসত গ্রামবাসীরা। মায়েদের কোলে তাদের গলা জড়িয়ে থাকত শিশুর দল, আর গোত্রের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলে যেতেন তাদের গোত্রের ইতিহাস, আনন্দ বেদনা আর আশার গল্প। কিন্তু এখন কয়েকটি বিজলি বাতির আলোর আড়ালে হারিয়ে যেতে লাগল একটি গোত্রের সুপ্রাচীন ইতিহাস।

পড়ছিলাম Leadership Is An Art, লেখক ম্যাক্স দ্য প্রী (Max De Pree)। লিডারশিপ, স্ট্র্যাটেজি, ম্যানেজমেন্ট–এ ধরণের বিষয়ের উপর লিখা খুব বেশি বই দাগ কাটেনি মনে। এর কারণ এই নয় যে বইগুলো সুলিখিত কিংবা সুচিন্তিত ছিল না; আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লেখকরা বিষয়গুলোকে এত জটিল তাত্ত্বিক করে তুলেন, একজন লিডার, স্ট্র্যাটেজিস্ট কিংবা ম্যানেজার'কে তখন আর চিনতে পারি না।

ম্যাক্সের ছোট্ট চমৎকার বইটি একেবারেই দলছুট। আমি নিজে গল্পপাগল মানুষ, কাজেই ম্যাক্স, যিনি নেতৃত্ব দিয়ে তাঁর পৈত্রিক কোম্পানিকে One of the most admired companies-এ পরিণত করেন, যখন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নাইজেরিয়ার সেই গল্পকথকদের অপূরণীয় অবদান ও অতুলনীয় প্রয়োজনের কথা বলেন, আমিও আমার চারপাশে খুঁজে ফিরি আমাদেরই কোনো গল্পকথক, যে আমাকে শোনাবে আমার কিংবদন্তি, আমার ইতিহাস, আমার পূর্বপুরুষের গল্প।

কমিউনিটি অ্যাকশন (http://ca-bd.org/), বাংলাদেশের বিভিন্ন বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠন, যখন সেবার মাধ্যমে বিজয়ের প্রকাশ-এর ব্রত নেয়, তখন আমার সামনে উদ্ভাসিত হয় সেই গল্পকথকের মুখ। তাদের মহান এ ব্রত শাশ্বত হোক।

আপনিও হতে পারেন একজন গল্পকথক, প্রিয় মাতৃভূমির জন্য। গল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে নিরন্তর বলে যেতে হবে তাদের কথা।
http://www.facebook.com/cvtv71

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29286723 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29286723 2010-12-10 00:34:30
প্রাচীন মিশরে ফারিনের গাণিতিক অভিযান (১)



গভীর মনোযোগ দিয়ে আমি তাকাই ছবিগুলোর দিকে, পাখি সাপ বাক্স...। বিচ্ছিন্ন ছবি, আদৌ কোনো মানে আছে?
"পারছি না মামনি, হায়ারোগ্লিফের (hieroglyph) মতো লাগছে একেবারে।" ছবিগুলোর দুর্বোধ্যতা ভ্রমণের ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয় আমার, হাল ছেড়ে দেই আমি, কিন্তু মেয়ের জন্য চেহারায় তীব্র কৌতূহলটি ধরে রাখি।
"হায়ারোগ্লিফই তো! কিন্তু কী লেখা আছে এতে, বলো।" মিটিমিটি হাসে মেয়ে।

প্রাচীন মিশরীয় চিত্রলিপি হায়ারোগ্লিফের কথা মনে পড়ে আমার। hiero- মানে পবিত্র, আর -glyph হচ্ছে লিপি, কিন্তু হায়ারোগ্লিফ শব্দটি আমি ব্যবহার করেছি এর দুর্বোধ্যতায়, আজকাল যে অর্থে শব্দটি দৈনন্দিন কথাবার্তায় বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে, পবিত্রলিপি অর্থে নয়। ঠিক যেরূপ hierarchy শব্দটি এককালে ধর্মগুরুদের রাষ্ট্রশাসনব্যবস্থা (-archy, রাষ্ট্রশাসন) বুঝিয়ে থাকলেও বর্তমানে এর মানে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা ধাপ। মেয়ের আনন্দ ও চ্যালেঞ্জ আর আমার কাকতালীয়তায় হাসি আমি।

"এ হচ্ছে হায়ারোগ্লিফে তোমার আর আম্মুর নাম।" ঠোঁট টিপে গাল প্রসারিত করে ফারিন বলে।
"আরেব্বাস, তাই নাকি!" মেয়ের প্রশংসায় আশ্চর্যান্বিত হই আমি, প্রশ্ন করি, "কিন্তু তুমি কখন কীভাবে শিখলে? বই পড়ে?"
"শান্তির আত্মা'র কাছ থেকে শিখেছি আমি।" রহস্যময়ভাবে বলে সে।
ভালো করে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলাম প্রাচীন এক মিশরীয়'র সাথে দেখা হয়েছিল তার, সে-ই শিখিয়েছে এসব।

ফারিনের গল্প
"কে তুমি, মেয়ে? কোত্থেকে এসেছ?" প্রশ্ন করে বৃদ্ধ, শান্ত, মায়াভরা দৃষ্টি তাঁর।
"আমার নাম ফারিন, যার মানে আলোকিত এবং অভিযানপ্রিয়," উত্তর দেয় ফারিন। "বঙ্গ-সাগরের তীরে, অনেক নদীর দেশ থেকে এসেছি আমি, অনেক সুন্দর সে দেশ। তোমার নাম কী?"
"আমি খু-এন-হোতেপ, মানে শান্তির আত্মা। আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে আই-এম-হোতেপ নামে বহু শাস্ত্রে পণ্ডিত, মহাজ্ঞানী এক মানুষ ছিলেন আমাদের দেশে। খুব সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও বুদ্ধি আর প্রচেষ্টার দ্বারা তৃতীয় রাজবংশের রাজা ফারাও জোসের-এর প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত হন তিনি, পরে রাজা থেকেও বিখ্যাত হয়ে যান। তাঁকে আমরা বলি, 'শান্তির সময়ে আগমন যাঁর।' তাঁর নামের সাথে মিলিয়েই বাবা মা আমার নাম রাখেন খু-এন-হোতেপ।"

"এমনিতে তুমি কী কর? আর এত নির্জন কেন এখানে?" প্রশ্ন করে ফারিন।
বিষাদের ছায়া পড়ে বৃদ্ধের সৌম্য চেহারায়। "আমি একজন লেখক-শিক্ষক, আমাদের ভাষায় শিক্ষা দিতাম ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে। বাবা-মা মারা গেছেন বহুদিন আগে, আত্মীয়স্বজনও তেমন নেই আমার। শিশুদের নিয়েই ছিল জীবন, কিন্তু তারাও আজ আসে না আর।" বলতে থাকে বৃদ্ধ, "গ্রিক-রোমান ভাষার প্রভাবে হারিয়েই গেছে আমাদের মাতৃভাষা, সেসব ভাষাই এখন শিখছে মানুষ, তাতেই চলে চাকরি আর ব্যবসা। আমার পাঠশালাটি ভেঙে গেছে, চারপাশে বেড়ে উঠছে লতানো পাতার জঙ্গল।" দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে খু-এন-হোতেপ।

শুধু পাঠশালা নয়, খু-এন নিজেও ভেঙে পড়ছে দেখে দুঃখিত হয় ফারিন, সান্ত্বনা দেয় সে, "মাতৃভাষা হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট আমি বুঝি। কিন্তু হতাশ হয়ো না, তোমাদের ভাষা একেবারে শেষ হয়ে যাবে না। আমি শিখব তোমাদের ভাষা ও গণিত, তুমি কী শিখাবে আমায়?"
"সত্যি শিখবে!" উজ্জ্বল হয়ে উঠে বৃদ্ধের মুখ, "শোনো তাহলে, বলছি—কৃষ্ণ ও লোহিত মৃত্তিকার দেশের এ মহান গল্প এক!"

"আমাদের দেশের প্রাচীন নাম খেমেত, মানে কৃষ্ণভূমি; নীলের উর্বর পলিমাটির রঙের কারণে এ নাম। আবার নীলের দু'পাশে এবং পূর্ব সাগরের তীরে যে মরুভূমি, তার কারণে দেশকে আমরা দেশরেত, অর্থাৎ লোহিতভূমিও বলি। আনুমানিক চল্লিশ হাজার বছর আগে মানব বসতি শুরু হয় এখানে। তারপর মানুষ যখন বাড়ল, দূর-দূরান্তে খবর পাঠানোর প্রয়োজন হলো, তখন থোথ নামে এক জ্ঞানীমানব স্রষ্টার কাছ থেকে আমাদের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে আসে এক লিখন পদ্ধতি; একে আমরা বলি মেদু নেতজার বা স্রষ্টার বাণী। গ্রিকরা আমাদের এ ভাষাকে বলে হায়ারোগ্লিফ, তাদের ভাষায় হায়ারো- মানে পবিত্র, -গ্লিফ মানে লিপি বা খোদাইকৃত লেখা।"
"কেমন ছিল সেই লিখন পদ্ধতি?" ফারিন জানতে চায়।
"বিভিন্ন জিনিসের ছবি এঁকে এঁকে শব্দ বা সংখ্যা লিখতাম আমরা। ছবিগুলোকে আমরা দু'ভাবে ব্যবহার করতাম: একটি ছবি পুরো একটি শব্দকে বুঝাতে পারে, আবার কোনো একটি ধ্বনিও বুঝাতে পারে। যেমন, সাপ বুঝাতে তুমি সাপের এ চিহ্নটি এককভাবে ব্যবহার করতে পার,


আবার স আ প-এ তিনটি ধ্বনির জন্য সংশ্লিষ্ট এ তিনটি ছবিও সমন্বয় করে ব্যবহার করতে পার:


"কিন্তু হায়ারোগ্লিফের এসব সূক্ষ্মচিত্র আঁকা বেশ পরিশ্রমসাধ্য ও সময়ের ব্যাপার, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানে এতে দেখা দেয় নানা সমস্যা। কাজেই হায়ারোগ্লিফ লিপির প্রায় সমসাময়িক কালেই দৈনন্দিন কাজে, জিনিসপত্রের হিসেব কিংবা চিঠিপত্র লিখায়, আরেকটি সরলীকৃত লিপি উদ্ভাবন করেন জ্ঞানীমানবগণ। সবুজ কালি আর নলখাগড়ার লাল কলম দিয়ে টানা হাতে তাঁরা লিখে যেতেন এসব প্রতীক, যার নাম যাজকীয় লিপি, গ্রিকদের ভাষায় হায়েরাটিক।"

"হুমম, এটি আসলেই হায়ারোগ্লিফের চেয়ে সোজা।" লিপি দুটির পারস্পরিক ছবি দেখে মতামত ব্যক্ত করে ফারিন।
"হায়েরাটিকের পর ডেমোটিক নামে আরেকটি লিপি চালু হয়েছিল আমাদের দেশে, এই তো কয়েক বছর আগেও ছিল এর প্রচলন। কিন্তু আজ কেবল চলছে গ্রিক বর্ণমালায় লিখা কপটিক লিপি। আহ্‌!" খু-এন-হোতেপের আক্ষেপটি ভাসতে থাকে ঘরের মধ্যে।

খানিক চুপ থাকে খু-এন, তারপর বলে, "সংক্ষেপে, এ-ই হচ্ছে আমাদের ভাষার কাহিনী। এবার বলছি গণিতের কথা।
আমাদের সংখ্যা দশ-ভিত্তিক, এর মানে এক থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যা লিখলে আমরা কাঠির মতো দেখতে একটি প্রতীক ব্যবহার করি। এক লিখতে প্রতীকটি এক বার, দুই লিখতে দুই বার, এমনিভাবে নয় লিখতে নয় বার ব্যবহার করি।
দশ লিখতে গেলে আবার আগের প্রতীকটি দশ বার ব্যবহার না করে, নতুন একটি প্রতীক গ্রহণ করি।"

"তার মানে নতুন প্রতীকটির একটির মানই দশ। এভাবে তোমরা বিশ, ত্রিশ, ...,নব্বই পর্যন্ত লিখ। তারপর একশ, দুশ, তিনশ, ...এদের জন্য আবার নতুন প্রতীক।" ফারিন বলে।

উজ্জ্বল হয় বৃদ্ধের মুখ, "ঠিক বলেছ তুমি। এভাবে সাতটি ভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করি আমরা। আমাদের চিত্রাকৃতির সংখ্যা প্রতীকগুলি তোমাকে দেখাচ্ছি।" খু-এন-হোতেপ দ্রুত প্রতীকগুলি এঁকে ফেলে প্যাপিরাসে:


খানিক পর প্যাপিরাসের টুকরোটি উল্টে ফেলে খু-এন-হোতেপ। হাসতে হাসতে বলে, "দেখি, কেমন তোমার স্মৃতিশক্তি; গণিতে তোমার বুদ্ধিই বা কেমন!" প্যাপিরাসের আরেকটি টুকরো তুলে নেয় বৃদ্ধ, নিচের প্রতীকগুলো আঁকে, তারপর প্রশ্ন করে, "এ সংখ্যাটির মান কত?"


চারটে জলপদ্ম, দুটি দড়িকুণ্ডলি, পায়ের গোড়ালির পাঁচটি হাড়, আর সাতটি কাঠি। ডান থেকে বামে তাকালে আমাদের সংখ্যার মতোই দেখতে, কেবল চিহ্নগুলো অন্যরকম। আরেকটি পার্থক্য আছে: আমাদের সংখ্যায় একক, দশক, শতক, ..., একটি ঘরের জায়গায় একটি মাত্র প্রতীক লিখি, এরকম একাধিক প্রতীক নয়।

একটি পদ্ম চারার মান এক হাজার, তা সংখ্যার যেখানেই লেখা হোক না কেন, আগের প্যাপিরাসটির কথা মনে করে ফারিন। কাজেই এর মান হওয়া উচিত চারটে হাজার, দুটি শত, পাঁচটি দশ, সাতটি এক। "চার হাজার দুশ সাতান্ন!" উত্তর দেয় ফারিন।

"দেশরেতের উপর উড়ে যাওয়া শিকারি বাজপাখির মতোই ক্ষীপ্র তোমার হিসেব।" প্রশংসায় উদ্ভাসিত হয় খু-এন এর মুখ। ফারিন বুঝল, প্রাচীন মিশরীয় সংখ্যা আমাদের সংখ্যার মতো দশ-ভিত্তিক হলেও স্থানীয়মানভিত্তিক নয়। তার মানে মিশরীয় সংখ্যাপদ্ধতিতে কোনো সংখ্যাকে গ্রুপ করে করে প্রতীক আকারে লেখা হয়, সংখ্যাটি বের করতে হলে আলাদা করে প্রতীকগুলির মান জেনে যোগ করতে হবে। একটু জটিল হলেও বেশ মজার, বিশেষ করে হাজার হাজার বছর আগের কথা, আর ছবিগুলিও বেশ সুন্দর। ফারিন মুগ্ধ হয় প্রাচীন মিশরীয়দের গাণিতিক উৎকর্ষে।

বৃদ্ধ হাঁপিয়ে উঠে, তাঁর কপালে ঘামের ছাপ।
"তুমি একটু বসো, আমি আসছি।" দৌড়ে গিয়ে একপাত্র পানি নিয়ে আসে ফারিন। ঢক ঢক করে পান করে খু-এন-হোতেপ, "আহ, ধন্যবাদ তোমাকে, ফারিন।"

ঘরের কোণে শক্ত এক তালাবদ্ধ কাঠের সিন্ধুক। খু-এন-হোতেপ তালা খুলে তার ভেতর থেকে ৬ মিটার লম্বা ১/৩ মিটার প্রশস্ত প্যাপিরাসের একটি স্ক্রল বের করে পড়তে থাকে:
"জানিয়া রাখ তোমরা, লিখিত হইয়াছে এই গ্রন্থখানি তেত্রিশতম বর্ষে, প্লাবনের চতুর্থ মাসে, উচ্চ ও নিম্ন খেমেতের মহামহিম সম্রাট আ-সুর-রে'র বদান্যতায়, জীবনের উপহারে, সেই গ্রন্থের অনুরূপ করিয়া যাহা রচিত হইয়াছিল প্রাচীনকালে, উচ্চ ও নিম্ন খেমেতের সম্রাট নে-মা-এত-রে'র জীবনকালে. লিপিবদ্ধ হইয়াছে ইহা সুবর্ণিক আহমেসের হস্তে ..."

___________________
ক্রমশ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29282571 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29282571 2010-12-02 23:46:41
সোনালি ডানার চিল: জীবন ও গণিতের আনন্দ বিষণ্ণ বিকেল এক
বিশাল মাঠে হিমেল বাতাসে একাকি উড়ছে নিঃসঙ্গ এক চিল, উড়তে উড়তে চলে গেছে বেশ উঁচুতে, তিলের কালচে দানার মতো দেখায় তার শরীর। হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য আকাশে স্থির হয় চিল, পর মুহূর্তে পাক খেতে খেতে তীব্র বেগে নামে সে, ভূমি স্পর্শ করার খানিক আগে খাড়া ঝাঁপ দিয়ে ছোঁ মারে—পায়ের নখরে উঠে আসে এক মেঠো ইঁদুর।

"ইশশ, মেরে ফেলল তো ইঁদুরটাকে!"
কান্নাকান্না কণ্ঠের তীক্ষ্ণ চিৎকারে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাই আমি, আমার ছোট মেয়ে ফারিন। ইঁদুরটির জন্য কিছুই করার নেই, আমার গা ঘেঁষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে।

চিলের থাবা থেকে হঠাৎ ছিটকে পড়ে মেঠো ইঁদুর, লুকিয়ে পড়ে খড়বিচালির ভেতর। উল্লাসে ফেটে পড়ে ফারিন। ইঁদুরকে কিছুক্ষণ খুঁজে ফিরে লালচে ডানার চিল, তারপর চলে যায় উড়ে উড়ে।
"আচ্ছা, বাবা, চিলটা ইঁদুরটাকে ধরতে সোজা না এসে এভাবে বেঁকে বেঁকে নামল কেন?" প্রশ্ন করে ফারিন। "সোজা নামলে তো তার পথ হতো ছোট, সময়ও লাগত কম, আর পরিশ্রমও বেশি হতো না।"
"শোনো তাহলে।" মেয়ের মাথার চুলগুলি আলতো নেড়ে দিয়ে বলি আমি।
"দাঁড়াও, দাঁড়াও, আপুকেও নিয়ে আসি।" এক দৌঁড়ে ঘরের ভেতর চলে যায় ফারিন, সারাকা'র হাত ধরে নিয়ে আসে তাকে।

শিকারি পাখি চিল, বাজ কিংবা ঈগলের রয়েছে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি, মানুষের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। খাবারের সন্ধানে উড়তে উড়তে বেশ উঁচুতে উঠে যায় এরা, কখনো কখনো ৩-৪ কিলোমিটার, যাতে ভূমিতে অনেক জায়গা জুড়ে বিস্তৃত হয় এদের দৃষ্টি সীমা।


আমরা মানুষেরা একদম স্থির হয়ে মাথা বা চোখ না নড়িয়ে জগতের যতটুকু জায়গা এক বারে দেখতে পারি, তা হচ্ছে আমাদের দৃষ্টিক্ষেত্র (field of vision)। এই দৃষ্টিক্ষেত্রের ডান প্রান্তের একটি অংশ কেবল ডান চোখই দেখতে পায়, বাম প্রান্তে অন্য একটি অংশ দেখে কেবল বাম চোখ, আর মাঝের বড় একটি অংশ দুই চোখই একসাথে দেখতে পায়। যে অংশটি দুই চোখই দেখে থাকে, তাকে বলা হয় দ্বিঅক্ষীয় (binocular) দৃষ্টিক্ষেত্র; প্রান্তের দিকে বাকি অংশ দু'টি হচ্ছে একাক্ষীয় (monocular) দৃষ্টিক্ষেত্র।

ডানে ও বামে মোটামুটিভাবে মোট ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত বিস্তৃত আমাদের দৃষ্টিক্ষেত্র। খুব সহজেই দৃষ্টিক্ষেত্র বের করার পরীক্ষাটি তুমি করতে পার। ঘরের মেঝেতে সোজা দাঁড়িয়ে হাত দুটি টানটান করে কাঁধের পেছনে ছড়িয়ে দাও। তারপর নাক বরাবর দেয়ালের একটি বিন্দুতে তোমার দুই চোখ নিবদ্ধ রেখে হাত দুটি আস্তে আস্তে সামনে আনতে থাক। প্রথমে কোনো হাত চোখে পড়বে না তোমার, তবে কিছুক্ষণ পর, হাত যখন কাঁধ বরাবর চলে আসবে, অস্পষ্টভাবে তোমার চোখে ধরা পড়বে সেগুলো। তার মানে দুই হাত মিলে একটি সরল রেখা বা সরল কোণ (১৮০ ডিগ্রি) তৈরি করল।


তবে বুঝতেই পারছ, দৃষ্টিসীমা বড় হলেও সব জায়গা আমরা ঝকঝকে দেখতে পাই না। চোখের সামনে অল্প একটু জায়গা জুড়েই কেবল সুস্পষ্ট দেখি আমরা, ডানে-বামে ঝাপসা হয়ে আসে আমাদের দৃষ্টি। দশম শতকের মহান বিজ্ঞানী ইবনে আল-হাতেম (Alhazen) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ কিতাব আল-মানাজির (Book of Optics)-এ প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়ে গেছেন কীভাবে বস্তু থেকে আলো এসে পড়ে আমাদের চোখের লেন্সে, তারপর সে আলো চোখের ভেতরে রেটিনা নামক জায়গায় পৌঁছে তৈরি করে বস্তুর উল্টো প্রতিবিম্ব। চোখের স্নায়ুর মাধ্যমে প্রতিবিম্বের তথ্য মুহূর্তে পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে, আর মস্তিষ্ক সে তথ্যের উপর কাজ করে আমাদের মনে সৃষ্টি করে সোজা বস্তুর অনুভূতি, ফলে বস্তুটিকে আমরা সোজা দেখতে পাই। চোখের সাপেক্ষে বস্তুর বিভিন্ন অবস্থানের ফলে আমরা কখনো একে দেখি ঝকঝকে, কখনো অস্পষ্ট।


"কোনো কারণে চোখের স্নায়ুটি যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কি আমরা সবকিছু উল্টো দেখব, বাবা?" সারাকা প্রশ্ন করে।
"না," মৃদু হাসি আমি। "বরং কিছুই আমরা দেখব না তখন, কারণ আমাদের সব অনুভূতির কেন্দ্র হচ্ছে মস্তিষ্ক। চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক—এই যে পঞ্চ ইন্দ্রিয়, এদের কাজ হচ্ছে কেবল অনুভূতির তথ্য বহন করে মস্তিষ্কে নিয়ে যাওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত তথ্য মস্তিষ্কে না পৌঁছবে, আর মস্তিষ্ক এর উপর কাজ না করবে, ততক্ষণ পৃথিবীর রূপ, শব্দ, ঘ্রাণ, স্বাদ, স্পর্শ, কিছুই বুঝতে পারব না আমরা।"
"কী অদ্ভুত! দেখার সময় তাহলে আমরা জগতের ছবি দেখি মাত্র, আর সব অনুভূতি ঘটে মাথায়?" সারাকার কণ্ঠে চিন্তার সুর।
"হ্যাঁ।" খানিকটা আনমনা হই আমি। জগতের সবকিছু আসলে এক ধরণের প্রতিবিম্বমাত্র, মাঝেমাঝে এ চিন্তাটি আমার মধ্যে সৃষ্টি করে অদ্ভুত অনুভূতি, মনে পড়ে প্রাচ্যদেশীয় ঋষি আর সুফিদের এক দর্শনের কথা: জগতে সবই মায়া, সবই বিভ্রম!

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রতিটি চোখের রেটিনার মাঝামাঝি ক্ষুদ্র একটি গর্তের মতো জায়গায় যদি কোনো বস্তুর প্রতিবিম্ব পড়ে, তাহলে বস্তুটিকে আমরা সবচেয়ে ঝকঝকে দেখতে পাই; জায়গাটির নাম দিয়েছেন তাঁরা ফোবিয়াস সেন্ট্রালিস (foveas centralis)। এখন ফোবিয়াসে কোনো বস্তুর প্রতিবিম্ব ফেলতে চাইলে বস্তুটির দিকে আমাদের সোজাসুজি তাকাতে হবে, অর্থাৎ বস্তুটিকে আমাদের দ্বিঅক্ষীয় দৃষ্টিক্ষেত্রের ঠিক মাঝে রাখতে হবে।

চিলের মতো শিকারি পাখিদের ক্ষেত্রে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এদের প্রতিটি চোখে দুটি করে ফোবিয়াস সেন্ট্রালিস থাকে: একটি গভীর ফোবিয়াস সেন্ট্রালিস, অন্যটি অগভীর ফোবিয়াস সেন্ট্রালিস। দুই ফোবিয়াসই তীক্ষ্ণ ছবি গঠনে সাহায্য করে, তবে দ্বিতীয়টির তুলনায় প্রথমটির ছবি বহুগুণে স্পষ্ট।

কাজেই অনেক উঁচুতে উঠে চিল যখন কোনো শিকার খুঁজে পেয়ে তাকে টার্গেট করে, শিকারটিকে সে সব সময় তার গভীর ফোবিয়াসের আওতায় রাখতে চায়। তাতে নামার সময় শিকারটি হঠাৎ হারিয়ে ফেলার ভয় থাকে না। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, চিলের গভীর ফোবিয়াস সেন্ট্রালিস তার রেটিনার এমন জায়গায় গঠিত, যেখানে কোনো বস্তুর ছবি ফেলতে হলে, বস্তুটিকে চিলের চোখের সোজা সামনে হলে চলবে না। বরং চিলের ঠোঁট বরাবর একটি সোজা রেখা কল্পনা করলে, তার প্রায় ৪০ ডিগ্রি ডানে বা বামে বস্তুটির অবস্থান হতে হবে।


আর এ জন্য চিল শিকারের দিকে সোজা সরলরেখায় না নেমে বক্রপথে এমনভাবে নামে যেন তার মাথাটি সোজা থাকে কিন্তু চোখের গভীর ফোবিয়াসের দিক সব সময় ৪০ ডিগ্রি কোণে শিকারের দিকে থাকে।


"হুমম, মজার ব্যাপার তো বেশ!।" ধীরে ধীরে বলে ফারিন। কিছুক্ষণ চিন্তামগ্ন হয় সে, চিন্তা করে চিলের পথটির কথা। তারপর হঠাৎ জোরে জোরে বলে উঠে, "ইশশ, চিলেরা কী বোকা! অত কষ্ট করে বাঁকানো লম্বা পথে না নেমে তারা তো ইচ্ছে করলে সোজাই নামতে পারে, মাথাটা কেবল সোজা পথের সাথে একপাশে হেলিয়ে রাখলেই হয়।"


মেয়ের চিন্তা চমৎকৃত করে আমাকে। সস্নেহে তার চুলগুলো নেড়ে দেই আমি, বলি, "সত্যি বলতে কী, বিজ্ঞানীদের কাছে বহু বছর ধরে ধাঁধাঁর মতোই ছিল, কেন পাখিগুলো এভাবে ঘাড় বাঁকিয়ে নামে না? আসলে পাখি যখন আকাশে ভাসে, তার শরীর ও ডানার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বায়ু ধাক্কা দেয় তাকে, টেনে ধরে রাখতে চায় পেছনে। পাখির শরীর যদি টানটান সোজা থাকে, তাহলে দুপাশে বায়ুর চাপের ভারসাম্য থাকে, পাশ দিয়ে সাবলীলভাবে বায়ু বয়ে যায়। তখন শরীরের উপর বায়ুর টান সবচেয়ে কম হয়। কিন্তু একদিকে মাথা বাঁকিয়ে রাখলে বায়ু জোরালো ধাক্কা দেয় শরীরে, তখন দুই-তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বায়ুর টান। ফলে পাখির গতি কমে যাবে বেশ অনেকটা, পাখি ক্লান্ত হয়ে পড়বে তাড়াতাড়ি, আর দ্রুত নামার প্রশ্নই উঠে না তখন। বরং লম্বা বাঁকানো পথে সময় লাগে কম।"

খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠে ফারিন, পাখিদের বুদ্ধিমত্তা বেশ আনন্দিত করে তাকে।
"পাখির এই যে সর্পিলাকার গতিপথ, দেখতে স্পাইরালের মতো, একে তুমি গণিতের সাহায্যেও প্রকাশ করতে পার।" মিটিমিটি হেসে বললাম।
"কীভাবে!" তীব্র চিৎকার দিয়ে উঠে দুই বোন।

"তোমাদের মনে আছে, বিস্ময়কর গণিতবিদ মৌমাছি'র ক্ষেত্রে আমরা দেখেছিলাম মধু আহরণের সময় মৌমাছির যে গতিপথ, তা পোলার স্থানাঙ্কের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়?"
"হ্যাঁ, বাবা।" প্রখর স্মৃতি শক্তির প্রমাণ দেবার সুযোগ পেয়ে দ্রুত বলতে থাকে সারাকা, "কার্তেসীয় বা আয়তিক স্থানাঙ্ক হচ্ছে প্রথমে আমরা ডানে বা বামে যাব, তারপর উপরে বা নিচে যাব। যেমন, কোনো বিন্দুর অবস্থান (৩, ৪) মানে প্রথমে আমরা ৩-ঘর ডানে যাব, তারপর ৪ ঘর উপরে যাব। কিন্তু পোলার স্থানাঙ্কে আমরা সোজা ডানে-বামে কিংবা খাড়া উপরে-নিচে না গিয়ে কোণ বরাবার এগুই। যেমন, (৫, ৫৩°) মানে হচ্ছে অনুভূমিকের সাথে ৫৩° কোণ করে, সে পথে ৫-ঘর যাব।"
"একশ'তে একশ।" মেয়ের দিকে হেসে তাকিয়ে তার যথার্থ মূল্যায়ন করতে কার্পণ্য বা দেরি করি না আমি।

এখন ধর, তোমাদেরকে একটি গাণিতিক সম্পর্ক দেয়া হলো: y=2x। এরকম গাণিতিক সম্পর্ক বাস্তবজীবনে প্রায়ই দেখবে তোমরা। যেমন মনে কর, একটি চকলেটের দাম দুই টাকা, তাহলে অনেকগুলি চকলেটের দাম কত হবে?
"চকলেটের মোট দাম হবে (২ গুণন চকলেটের মোট সংখ্যা)।" ফারিন জবাব দেয়।
"হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। কিন্তু চকলেটের মোট দাম, চকলেটের মোট সংখ্যা—এ কথাগুলো বারবার লিখতে সময় লাগে অনেক, আর অনেক হিসেবের ভেতর এগুলো লিখে রাখলে সাথে সাথে বুঝে উঠবে না তুমি, তাই না?"
"হ্যাঁ, সবগুলো শব্দ আগে পড়তে হবে।"
"গণিতবিদগণ এ ধরণের জিনিসকে সংক্ষেপে লেখার জন্য চিহ্ন ব্যবহার করে থাকেন।"
"বুঝেছি, বাবা, তারা লিখবেন y=2x, যেখানে y হচ্ছে চকলেটের মোট দাম, আর x হচ্ছে চকলেটের মোট সংখ্যা।"
"ঠিক ধরেছ, মামনি। এতে শব্দ লাগে কম, সহজে চোখে পড়ে, হিসেবও করা যায় বেশ দ্রুত। এখন এক কাজ কর, চকলেটের সংখ্যা ১, ৩, ৪, ৭ হলে, চকলেটের দাম কত কত হবে, তার একটি তালিকা বানিয়ে দেখাও।"

তালিকা তৈরিতে মগ্ন হয় দুই বোন, দেরাজের ভেতর থেকে ছক কাগজের (Graph Paper) একটি পাতা বের করি আমি।"
"এই যে, বাবা, তালিকা।" তালিকাটি হাতে দেয় আমার।


"তাহলে x ও y-এর জন্য চার জোড়া সংখ্যা পেলে তোমরা: (১, ২), (৩, ৬), (৪, ৮) এবং (৭, ১৪)। এবার এই ছক কাগজে, যা কার্তেসীয় স্থানাঙ্কের জন্য বানানো, বিন্দুগুলো বসাও। সবচেয়ে ছোট বর্গটির বাহুকে এক ধরে নাও।"
"কিন্তু, বাবা, ছক কাগজে তো আমরা দূরত্ব বসাই, এভাবে সংখ্যা ও দাম তো বসাই না।" সারাকা প্রশ্ন করে।
"না, ছক কাগজে আসলে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত যেকোনো দুটি রাশি তুমি বসাতে পার। শুধু আগে থেকে বলে দিবে, ডানে-বামে কী বসাচ্ছ, আর উপরে নিচে কী বসাচ্ছ। তাহলে যারা পড়বে, তার বুঝতে পারবে কীসের সাথে কীসের সম্পর্ক দেখানো হচ্ছে। যেমন, ঘড়ির সাহায্যে এবং কোনো গাড়ির দূরত্বমাপক যন্ত্র ওডোমিটারের দিকে তাকিয়ে, তুমি হিসেব রাখতে পার গাড়িটি ১, ২, ৩ ঘন্টায় কত দূরত্ব যাচ্ছে। এভাবে গাড়ির সময় ও দূরত্বকে ছক কাগজে ফেলতে পার তুমি। ছক কাগজ আসলে কোনো জিনিস সহজে ছবির মাধ্যমে বুঝতে পারার কৌশল।"
"বুঝেছি, বাবা।" ফারিন দ্রুত বিন্দুগুলো বসিয়ে নেয় ছক কাগজে।
"এবার বিন্দুগুলো যোগ করো।"
রুলার দিয়ে বিন্দগুলো যোগ করে ফারিন। "এ তো একটা সরল রেখা, বাবা!" স্পষ্ট বিস্ময় তার কণ্ঠ।

"হ্যাঁ, এর মানে y=2x, যা একটি বীজগাণিতিক সম্পর্ক বা সমীকরণ, (Algebraic Equation) তা জ্যামিতিতে প্রকাশ করলে একটি সরল রেখায় পরিণত হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে, জ্যামতিক কোনো রেখাকে বীজগণিতের একটি সমীকরণের মাধ্যমে আমরা প্রকাশ করতে পারি। জ্যামিতি ও বীজগণিতের এই যে পারস্পরিক ঘনিষ্ট সম্পর্ক, এটি গণিতের ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলির একটি। আজকে সভ্যতার এত যে দ্রুত গতি, তার অনেকটাই এর উপর নির্ভরশীল।"
"এভাবে কী তাহলে সব সম্পর্ককে ছক কাগজে ফেললে জ্যামিতিক ছবি পাব, বাবা?"
"হ্যাঁ, যেহেতু যেকোনো সম্পর্ক থেকেই যত খুশি জোড়া বিন্দু পাবে তুমি, সেগুলো বসিয়ে একটির পর একটি টেনে যোগ করে দিলেই হবে। সরল রেখার জন্য তিনটি বিন্দু নিলেই কাজ হয়ে যায়, কিন্তু কিছু কিছু সম্পর্কের পুরো ছবিটা পেতে গেলে, বেশ অনেক বিন্দু নিতে হতে পারে তোমায়। যত বেশি বিন্দু নিবে, তত বেশি নিখুঁত হবে ছবি।"
"সমীকরণ থেকে যেহেতু বিন্দু বের করা সোজা, সেহেতু সমীকরণ থেকে ছবি আঁকাও সোজা হবে। কিন্তু বাবা, উল্টোটা কী হবে, মানে সব ছবিকে সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে?"
"ছবিটি যদি সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে, তাহলে এর সমীকরণ পাওয়া যাবে। গণিতবিদগণ এর জন্য গণিতের উচ্চতর একটি শাখা ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের সাহায্য নেন, আরেকটু বড় ক্লাসে বুঝতে পারবে তোমরা।"
"চিলের এই যে সর্পিল পথ, বাবা, এ তো সব সময় একটি নিয়ম মেনে চলছে, ঠোঁটের দিকের সাথে শিকারকে সব সময় ৪০° কোণে রাখছে, এর জন্য কি সমীকরণ আছে?"
"হ্যাঁ, এর জন্যও আছে সুন্দর একটি সমীকরণ, তবে কার্তেসীয় স্থানাঙ্কে সেটি একটু জটিল। তোমাদের বোঝার জন্য তাই পোলার স্থানাঙ্কে বলছি।"
*
* মূল সমীকরণটি আসলে r=e^{(theta - π) × cot(a)}, যেখানে a=40°। মেয়েদের বোঝার জন্য প্রতীকগুলিকে মানে রূপান্তরিত করে দিয়েছি।

"তার মানে এখানে প্রথমে থেটা = ১, ২, ৩, ..., ধরে ক্যালকুলেটরের সাহায্যে সম্পর্কটি থেকে r-এর মান বের করে আমরা অনেকগুলি (r, থেটা) জোড়া পেতে পারি। তারপর প্রতি জোড়ার জন্য প্রথমে চাঁদার সাহায্যে থেটার সমান কোণ এঁকে, কোণের লাইন থেকে উক্ত জোড়ার r-এর মানটি বসিয়ে, আমরা একটি বিন্দু পাব। এভাবে অনেকগুলি বিন্দু বসালেই চিলের সেই বাঁকানো গতিপথ পেয়ে যাব আমরা।" সারাকা বলল।
"ঠিক বলেছ, মা।"
"কিন্তু, বাবা এত ছোট ডিগ্রি আঁকব কীভাবে?" সারাকা প্রশ্ন করে।
"ওহ্‌, বলতে ভুলে গিয়েছি। এ সমীকরণে থেটা'র মানকে রেডিয়ান নামক কোণের একটি এককে চিন্তা করতে হবে, আর ১ রেডিয়ান হচ্ছে প্রায় ৫৭.৩°। চাঁদায় যেহেতু ডিগ্রি থাকে, কাজেই ১, ২, ৩, ..., রেডিয়ানগুলোকে আঁকার সময় ডিগ্রি বানিয়ে নিতে হবে তোমাদের।"

বিন্দুর পর বিন্দু বানিয়ে যেতে থাকে দুই বোন, বেশ অনেক সময় লাগে তাদের, কপালে ঘামের হালকা বিন্দু জমে উঠে।


কিন্তু কাগজে ধীরে ধীরে যখন ফুটে উঠে সোনালি ডানার চিলের গতিপথ, অপার্থিব স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত হয় তাদের চোখ। এটি হচ্ছে সেই সময় বিশ্ব জগতের মহান নিয়ন্তার ছড়িয়ে রাখা গণিত আর মেয়েদের হাসি যখন আবিষ্ট করে আমাকে। আবার বিষণ্ণও হয় হৃদয় আমার, এত ক্ষুদ্র জীবন আমাদের!
____________________
একদিন কুয়াশার এই মাঠে আমারে পাবে না কেউ খুঁজে আর, জানি; হৃদয়ের পথ চলা শেষ হল সেই দিন—গিয়েছে যে শান্ত হিম ঘরে, অথবা সান্ত্বনা পেতে দেরি হবে কিছু কাল—পৃথিবীর এই মাঠখানি ভুলিতে বিলম্ব হবে কিছু দিন; এ মাঠের কয়েকটি শালিকের তরে আশ্চর্য বিস্ময়ে আমি চেয়ে রবো কিছু কাল অন্ধকার বিছানার কোলে, আর সে সোনালি চিল ডানা মেলে দূর থেকে আজো কি মাঠের কুয়াশায় ভেসে আসে? সেই ন্যাড়া অশ্বত্থের পানে আজো চলে যায় সন্ধ্যা সোনার মতো হলে? ধানের নরম শিষে মেঠো ইঁদুরের চোখ নক্ষত্রের দিকে আজো চায় সন্ধ্যা হলে? মউমাছি চাক আজো বাঁধে নাকি জামের নিবিড় ঘন ডালে, মউ খাওয়া হয়ে গেলে আজো তারা উড়ে যায় কুয়াশায় সন্ধ্যার বাতাসে– কতো দূরে যায়, আহা… অথবা হয়তো কেউ চালতার ঝরাপাতা জ্বালে মধুর চাকের নিচে—মাছিগুলো উড়ে যায়… ঝ’রে পড়ে… ম’রে থাকে ঘাসে–]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29270954 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29270954 2010-11-12 21:42:05
কোয়ান্টাম দিদিমার রাজ্যে!
অদ্ভুত রহস্যময় জগত এক, ভৌতিক সব কাহিনী তাকে ঘিরে! সেখানে বাস করে প্রাণী, একই সাথে জীবিত ও মৃত। প্রতি মুহূর্তে ভেঙে পড়ে সে জগত, জন্ম নেয় কোটি কোটি নতুন জগত, একই মানুষকে তখন দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন জগতে। নিজেদের সাথে তারা যোগাযোগ করে আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে, একেবারে চিন্তার নিমেষে। বস্তুকণা সেখানে কখনো চলে যায় অতীতে, কখনো ভবিষ্যতে। আমাদের চেনাজানা জগত থেকে একেবারেই ভিন্ন সে জগত, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জগত!

কিন্তু এসব গল্পে মোটেও ভয় পাবার মেয়ে নয় ফারিন। কোয়ান্টামের ক্ষ্যাপাটে জগতকে জানার আগ্রহ বরং দিন দিন বেড়েই চলে তার। চৌদ্দ চলছে ফারিনের বয়স, এবং সে জানে বড়রা তাকে সেখানে নিয়ে যাবে না, বরং দৈববাণীর মতো বলে উঠবে, "ইঁচড়েপাকা মেয়ে, বড়দের ব্যাপার এসব, তোমাকে নাক গলাতে হবে না।" তাই নিজেই একদিন চুপিচুপি হেঁটে হেঁটে তাদের এলাকা পেরিয়ে দূরে, বহু দূরে কোয়ান্টামের রহস্যময় নগরীর সদর দরজায় কড়া নাড়ল ফারিন।

"কে, কাকে চাই?" নীরব শুনশানভাবে খুলে যায় দরজা, বেরিয়ে আসে শুভ্র চুলের এক বৃদ্ধা। চুলে তার খেলা করছে আলোর নানান কণার ঢেউ, হারিয়ে যাচ্ছে, আবার উঁকি দিচ্ছে।
"আমি ফারিন, আলোকিত ও অভিযানপ্রিয়। আমি এসেছি কোয়ান্টামের জগত দেখতে।"
মিষ্টি হাসে বুড়ি। "সবাই আমাকে বলে কোয়ান্টাম দিদিমা। যেহেতু অনেক কষ্ট আর চেষ্টা করে এসেছিস তুই, কোয়ান্টাম জগতের কথা তোকে বলব। আসলে তোদের দেখা জগত আর অদেখা কোয়ান্টাম জগত একই, কেবল ভিন্ন ভিন্ন দুটি স্তর মাত্র, এ কথা বলা যায়। কিন্তু তার আগে তোকে পরীক্ষা করে দেখি, আমার কথা সত্যি সত্যি বুঝবি কি না; কাজেই তোদের দেখা জগত নিয়েই শুরু করা যাক।"
"আচ্ছা।" মাথা নেড়ে দুরুদুরু বুকে মেনে নেয় ফারিন।

"অনেক অনেক বছর আগে পৃথিবীর মানুষ ভাবত ভূমণ্ডল আর নভোমণ্ডলের জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম। আকাশের বস্তুসমূহ ঘুরতে থাকবে বৃত্তাকার পথে, আর পৃথিবীর বস্তুসমূহ ছেড়ে দিলে পড়তে থাকবে নীচে, এ-ই হচ্ছে নিয়ম।" একটু বলে থামেন কোয়ান্টাম দিদিমা, প্রশ্ন করেন, "নিউটনকে চিনিস?"
"চিনি, চিনি, মহামতি আইজাক নিউটন!" চিৎকার করে উঠে ফারিন। "জ্ঞান-সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে নূড়ি-পাথর কুড়িয়েছিলেন তিনি, অনন্ত সমুদ্রের দেখা পাননি বলে আক্ষেপ করেছেন খুব। মস্ত বড় বিজ্ঞানী!" দু'হাত ছড়িয়ে দিয়ে মস্ত ব্যাপারটি বোঝানোর চেষ্টা করে ফারিন।

বিষণ্ণতা ভর করে কোয়ান্টাম দিদিমার চেহারায়। "নিঃসঙ্গ, দুঃখী আর একরোখা মানুষ ছিলেন রে! তাঁর জন্মের পূর্বেই রাজা চার্লসের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা যান তাঁর বাবা আইজাক নিউটন। দুর্বল ক্লিষ্ট চেহারা আর অনেক ক্ষুদ্র আকৃতি নিয়ে জন্ম, দু'হাতের তালুতেই এঁটে যেত পুরো শরীর—মরে যাবার সব লক্ষণ নিয়েই পৃথিবীতে এসেছিলেন তিনি। এমনকি জন্মের পর নবজাতকের কিছু কাজের জন্য যে দুজন মহিলাকে পাঠানো হয়েছিল বাইরে, তারা হাঁটতে তাড়া অনুভব করছিল না, থেমে থেমে বিশ্রাম নিচ্ছিল বিভিন্ন জায়গায়, কারণ তাদের ফিরে আসার আগেই দুর্ভাগা শিশুটি মারা যাবে, এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল তারা।

কিন্তু ভুল হয়েছিল তাদের। যতই দিন যেতে লাগল, জীবনকে শিশুটি আঁকড়ে ধরতে লাগল ক্রমাগত জোরালোভাবে, অদ্ভুত এক একগুঁয়েমি দেখা গেল তার ভেতর, অনন্য এক ইচ্ছাশক্তি। গ্রামবাসীদের আগের এক বিশ্বাস ফিরে আসলো—মৃত পিতার পুত্র, বড়দিনে জন্ম, সাধারণ নয় সে।

জীবনের প্রথম কয়েক বছর নিউটন এত দুর্বল ছিল যে শক্ত গলাবন্ধ পড়ে থাকতে হয়েছিল তাকে, ঘাড়ের উপর মাথাটি যাতে সোজা থাকে। তা সত্ত্বেও জীবনের ঝুঁকিটি যখন রইল না তার, উলসথর্পের শান্ত গ্রামবাসীরা ভাবল, মা ও শিশুটি শান্ত, স্বস্তিদায়ক এক জীবনই কাটাতে যাচ্ছে। আবার ভুল হলো তাদের।

নিউটনের দু'বছর বয়সে বিয়ের প্রস্তাব পান তার মা হান্না আসকিউ নিউটন, ভাই রেভারেন্ড উইলিয়াম আসকিউ'র সাথে কথা বলে সে বিয়েতে মতও দিয়ে দেন তিনি। নানীর কাছে নিউটনকে রেখে নতুন স্বামীর বাড়িতে চলে যান মা।

দুর্বল একগুঁয়ে শিশুর জন্য স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই এটি হয়ে উঠত মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা। আর এটি ১৬৪৫ সালের কথা, ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ হানা দিয়েছে শান্ত গ্রামাঞ্চলেও। রাজার তত্ত্বাবধান থেকে উলসথর্প মুক্ত করে ফেলেছে সাংসদগণ, প্রতিদিনই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসে। ভয়ে কেঁপে কেঁপে কেঁদে উঠে সারাক্ষণই মাকে খুঁজত নিউটন, কিন্তু মা তো তার সেই অনেক দূরে!

বৃদ্ধা নানী চেষ্টা করতেন নিউটনকে যথাসাধ্য শান্ত করতে, কিন্তু চারপাশের ঘটনায় তিনি নিজেই প্রচণ্ড আতঙ্কিত। উলসথর্পের সমর্থ সব পুরুষ মারা গিয়েছে যুদ্ধে, অথবা এখনও যুদ্ধ করে যাচ্ছে; পেছনে রয়ে গেছে শুধু ধর্মীয় কাজে নিয়োজিত পুরুষগণ, যুদ্ধের পাশবিকতায় নারী ও শিশুদের রক্ষা করতে।

এ সময়, ১৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে স্কুলে যেতে থাকে নিউটন। দুর্বল দেহে অন্যান্য বালকগণ দুরন্ত যেসব খেলা খেলত, সেগুলোতে অংশ নেয়ার সাহস কিংবা আমন্ত্রণ তার ছিল না। এতিম হওয়ার কারণে আর সব শিশুদের কাছে নিজেকে সবসময় ছোট আর অসহায় লাগত তার। অসহায় ভাবটি তার আরো বেড়ে গেল যখন অলিভার ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে পিউরিটান-প্রধান সংসদ রাজার বাহিনীকে পরাজিত করে ফেলে এবং রাজা চার্লসের শিরশ্ছেদ করে, কারণ নিউটন স্বপ্ন দেখত টগবগিয়ে ঘোড়ায় চড়ে কোনো একদিন রাজা নিজেই এসে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে চলে যাবে।

মামার সঙ্গ এ সময় প্রেরণাদায়ক হয়ে উঠল নিউটনের কাছে। সৌম্য চেহারার রেভারেন্ড আত্মসমাহিত হয়ে পড়াশোনা করতেন তাঁর গ্রন্থাগারে, আর বিনম্রভাবে কথা বলতেন গ্রামবাসীদের সাথে। ধর্মীয় ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ জীবনাচরণকে নিউটন দেখতে পেলেন নিরাপত্তা ও স্বস্তি হিসেবে, ফলে যুদ্ধের বিভীষিকা এড়িয়ে নির্জন শান্ত জায়গায় গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে উঠার অভ্যেস গড়ে উঠল তঁর।

এভাবে তরুণ নিউটন প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে দেখলেন জীবনের করুণ অস্তিত্বকে সহজেই তিনি ভুলে যেতে পারছেন প্রকৃতির ব্যাপারে নানা প্রশ্নে করে, নানা অনুসন্ধানে। রঙধনু কেন সবসময় একই রঙে আসে, জোয়ার-ভাঁটা কেন হয়, কেনই হয় চন্দ্রগ্রহণ আর সূর্যগ্রহণ? কিসের টানে চাঁদ ঘুরে পৃথিবীর চারদিকে, পৃথিবী ঘুরে সূর্যের চারদিকে?

সবকিছুই তিনি দেখতেন পরম কৌতূহলে, এমনকি উলসথর্পের ছোট্ট শিশুরা খেলার সময় যখন হাত ধরাধরি করে চক্রাকারে ঘুরত আর গাইত
Ring a-ring o' roses, A pocketful of posies. a-tishoo!, a-tishoo!. We all fall down. ,
তিনি দেখতেন কীভাবে বেঁকে যাচ্ছে শিশুদের শরীর, যেন পেছন থেকে অদৃশ্য কেউ জামা ধরে টানছে তাদের!


এমনি একদিন এক সন্ধ্যায় বাগানে বসে নিউটন ভাবছিলেন নতুন এক গণিতের কথা, কীভাবে জট খোলা যায় তার, একদিন যার নাম হবে ক্যালকুলাস। কৃষ্ণমৃত্যু প্লেগের কারণে তখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, বাড়িতে ফিরে এসেছেন তিনি। টুপ করে এক আপেল এসে পড়ে তার মাথায়, চমকে উঠে উপরে তাকান তিনি—থালার মতো বিশাল চাঁদ উঠেছে পূবের আকাশে।
আপেল সবসময় কেন খাড়া নীচে পড়ে? কেন তীর্যকভাবে পড়ে না? পাশে, উপরে এত জায়গা থাকতেও কেন যায় না সেদিকে?
নিশ্চয়ই কেউ সবসময় আপেলকে নীচের দিকে টেনে রাখে!
সেই জিনিসটি কী?
অনেক চিন্তাভাবনার পর নিজেকেই বললেন নিউটন, নিশ্চয়ই পৃথিবী, পৃথিবী ছাড়া আর কে আছে টানার? আরো ভেবে বের করলেন, পৃথিবী শুধু আপেলকেই টানে না, মহাশূন্যের আরো অনেক বস্তুকেও টানে। পৃথিবীর টানেই চাঁদ ঘুরে তার চারদিকে।

"হ্যাঁ, আমাদের বইয়ে পড়েছি। কিন্তু আমি সবসময় ভাবি, আপেল তো পৃথিবীর বুকে পড়ে যায়, চাঁদটা কেন পড়ে না?" চিন্তামগ্ন হয় ফারিন।
"দড়ির আগায় পাথরের টুকরো বেঁধে গোড়টা হাতে ধরে মাথার চারপাশে ঘুরিয়েছিস কখনো?" দিদিমা প্রশ্ন করেন তাকে।
"হ্যাঁ।"
"পাথরের টুকরা কেন ছিটকে চলে যায় না হাত থেকে, বল তো দেখি?"
"দড়ির সাহায্যে পাথরটা আমি শক্ত করে হাতের দিকে টেনে রাখি, তাই।" হালকা ঠোঁট টিপে বলে ফারিন।
"হাতের মুঠি ছেড়ে দিলে কী হয়?" দিদিমার প্রশ্ন চলতে থাকে।
"পাথরটা সোজা ছিটকে দূরে চলে যায়।"
"নিউটন ভাবতেন, বিশাল এক অদৃশ্য দড়ি এভাবেই চাঁদকে টেনে ধরে রাখে তার ভ্রমণপথে, আর তাই পাথরের মতো এটি ঘুরতে থাকে।" দিদিমা বলেন।


"কিন্তু এভাবে অদৃশ্য দড়ি আসা কি সম্ভব?" ফারিনের চোখে অবিশ্বাস।
"চুম্বক নিয়ে কখনো খেলেছিস?"
"হ্যাঁ, অনেক।" মাথা নেড়ে নেড়ে বলে ফারিন। "চুম্বক দিয়ে লোহার টুকরো টেনেছি কতো!"
"তাহলে দেখেছিস, চুম্বকটা লোহার টুকরোর সাথে কোনোকিছু দিয়ে না লেগে থাকলেও লোহাটাকে সে ঠিকই টানে। এক হাতে চুম্বক আরেক হাতে লোহা রাখলে, অনুভব করবি চুম্বকটা লোহাসহ হাতকে টানছে।"
"হ্যাঁ, দিদিমা, ঠিকই বলেছ।"
"এই যে চুম্বকের টান, একেই তুই দড়ির মতো মনে কর, বাস্তবে যদিও দড়িটা নেই। তাতে কী, টান তো আছে। তেমনিভাবে, পৃথিবী যে চাঁদকে টানে, সেই টানকেও তুই একটা দড়ি কল্পনা কর না? তাহলেই দেখবি কত্ত সোজা।"
"হ্যাঁ, এবার বুঝেছি। কিন্তু চুম্বক তো লোহাকে টানে, কাঠকে টানে না। পৃথিবীও কি এরকম চাঁদের মতো বেছে বেছে কাউকে টানে? আমি বলতে চাচ্ছি, চুম্বকের টান আর পৃথিবীর টান কি এক রকমের?"
"না, একটু চিন্তা করলেই ধরতে পারবি তুই। যেমন, পৃথিবী আম জাম আপেল সব জিনিসকেই টানে, টানে বিমান, চাঁদ, উল্কা, গ্রহ-নক্ষত্র সবাইকে। চুম্বকের টানকে বলে চুম্বক টান বা চৌম্বক বল, পৃথিবীর টানকে বলে অভিকর্ষ। বুঝতেই পারছিস, পৃথিবীর টানের কোনো বাছবিছার নেই, সবাইকে টানে।"

"পৃথিবী যদি অন্য গ্রহকে টানে, সেই গ্রহও কি একইভাবে পৃথিবীকে টানে?" ফারিনের প্রশ্ন।
"তোর অনেক বুদ্ধি রে! হ্যাঁ, তাই কি হওয়া উচিত না? পৃথিবী যদি মঙ্গল গ্রহকে নিজের দিকে টানে, মঙ্গল গ্রহও পৃথিবীকে নিজের দিকে টানবে, এ-ই স্বাভাবিক। আসলে পৃথিবীর সকল বস্তুই এভাবে একে অপরকে নিজের দিকে টানে। পৃথিবীর বুকের কোনো বস্তু, বাইরের কোনো বস্তু, মঙ্গলের বুকের কোনো বস্তু, মঙ্গলের বাইরের কোনো বস্তু, সবাই সবাইকে ক্রমাগত অদৃশ্য দড়ি দিয়ে টেনে যাচ্ছে।"
"তার মানে একজন মানুষও কি আরেকজন মানুষকে এভাবে টানে?" ফারিনের মনে দ্বিধা।
"হ্যাঁ।"
"কিন্তু তুমি যদি আমাকে তোমার দিকে টানোই, আমি সেই অদৃশ্য দড়িটার টান টের পাই না কেন?"
"তুই যদি দাঁড়িয়ে থাকিস, আর তোর বন্ধু যদি পেছন থেকে ধাক্কা দেয়, কী ঘটবে?"
"ধাক্কার ঠেলায় আমি সামনে চলে যাব, আছাড়ও খেতে পারি।"
"একটা পিঁপড়া যদি তোকে ধাক্কা দেয়?"
"হা হা হা।" একটি পিঁপড়া ধাক্কা দিচ্ছে, ছবিটি মনে ভাসতেই হাসিতে ফেটে পড়ল ফারিন। "আমি তো টেরই পাব না।" বলে সে।
"একটি মানুষ আরেকটি মানুষকে তার চেয়েও অনেক কম জোরে টানে।"
"কিভাবে জানো?"
"নিউটন নামের মানুষটি শুধু টানের কথাই বলে যাননি, কে কাকে কত জোরে টানে তার অনেক অঙ্কও করে গেছেন।"
"বাব্বা!"


"নিউটনের এই সূত্রের সাহায্যে এভাবে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি সঠিকভাবে হিসেব করা যায়। এমনকি একবার একটি গ্রহ কোথায় আছে, কেমন তার আকার আর গতিবেগ, জানতে পারলে তুই অঙ্ক করে বলে দিতে পারবি, কত দিন পর কোথায় এটি পাওয়া যাবে।"
"অনেক মজা তো!" হাসিতে উজ্জ্বল হয় ফারিনের মুখ।
"নিউটন যে বছর তার অভিকর্ষ সূত্রটি পূর্ণাঙ্গ করলেন, সেই ১৬৮২ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের আকাশে উদয় হওয়া একটি ধূমকেতুর কথাই ধর। প্রাচীন পুঁথিপত্র ঘেঁটে নিউটনের বন্ধু, মহাকাশবিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালির মনে হলো, এটিই সেই ধূমকেতু শত শত বছর আগে ব্যাবিলন চীন আর গ্রিসের নক্ষত্র-অবলোকনকারীরা তাদের পুঁথিতে বলে গেছে যার কথা। এমনকি ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে একেই দেখেছিলেন বিজ্ঞানী ইয়োহান কেপলার। সবাইকে তাঁর ধারণার কথা বললেন হ্যালি, কিন্তু মানুষ কেবল হাসলো তাঁর কথায়। কারণ তখন মানুষের বিশ্বাস ছিল, ধূমকেতুরা মহাকাশের কোনো জায়গা একবার অতিক্রম করে চলে যায়, আর ফিরে আসে না। কিন্তু নিউটনের সূত্র প্রয়োগ করে হ্যালি হিসেব করলেন, প্রতি ৭৬ বছর পর ধূমকেতুটি একবার করে আমাদের সৌরজগতে দেখা দিয়ে যায়। সে হিসেবে ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর আকাশে আবার দেখা যাবে একে।" থামলেন দিদিমা।
"তারপর কী হলো?" তীব্র কৌতূহলে জানতে চায় ফারিন।
"হ্যালি জন্মেছিলেন ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে, ৮৬ বছর বয়সে। মৃত্যুর আগে বুঝতে পেরেছিলেন, সময় ঘনিয়ে এসেছে তাঁর, ধূমকেতুটিকে আরেক বার দেখে যেতে পারবেন না তিনি। কিন্তু নিখুঁত তাঁর হিসেব, এ বিশ্বাস নিয়ে উত্তরসূরীদের কাছে ধূমকেতুর দায়িত্ব তুলে দিয়ে হাসিমুখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।"
"কিন্তু ধূমকেতুটির কী হলো?" তীব্র কৌতূহলে আবারও প্রশ্ন করে ফারিন।
"১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে বড় দিনের আগের রাতে লন্ডনের আকাশে ভেসে উঠে হ্যালির ধূমকেতু।"

"বস্তুর গতি নিয়ে আরো তিনটি সূত্র আবিষ্কার করেন নিউটন। এ সূত্রগুলোর সাহায্যে ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের সকল বস্তুর চলাচল ব্যাখ্যা করা যায়, সবার জন্য একই নিয়ম, নীচে উপরে কোনো ভিন্নতা নেই।" কোয়ান্টাম দিদিমা বলতে থাকেন। "পরবর্তী বিজ্ঞানীরা এগিয়ে নিয়ে যান নিউটনের কাজ, পৃথিবীতে শুরু হয় বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তাবাদের (Scientific Determinism) যুগ। সমীকরণের সাহায্যে অঙ্ক করে সব বলে দেয়া সম্ভব, অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করা শুরু করলেন।

এবং নিউটনের প্রায় একশ বিশ বছর পর, ফ্রান্সের পিয়েরে সাইমন ল্যাপ্লাস ঘোষণা করেন, "মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থাকে আমরা বিবেচনা করতে পারি তার অতীত কোনো অবস্থার ফলাফল হিসেবে এবং ভবিষ্যতের কোনো অবস্থার কারণ হিসেবে। কোনো এক মহাসত্তা যদি কোনো এক মুহূর্তে পৃথিবীর সকল বলের মান এবং সকল বস্তুকণার পারস্পরিক অবস্থান জানতে পারে, এবং উক্ত মহাসত্তা যদি এতই বিশাল হয় যে সকল উপাত্ত বিশ্লেষণ করতে পারে, তাহলে সে এমন একটি মাত্র সূত্র তৈরি করতে পারবে যার দ্বারা সে বৃহত্তম বস্তুসমূহ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রতম কণাসমূহের গতিবিধি নিখুঁত হিসেব করতে পারবে; উক্ত মহাসত্তার কাছে কোনোকিছুই অনিশ্চিত থাকবে না এবং ভবিষ্যত তার কাছে অতীতের মতোই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হবে।"
"তার মানে কেউ একবার মহাবিশ্বের সব ঘটনা জেনে গেলে, পরে কী হবে সব হিসেব করে বের করে ফেলবে?" ফারিনের চোখ বড় হয়ে উঠে।
"হ্যাঁ, তিনি এবং অনেকে এ ধারণাই পোষণ করতেন। তাদের মতে, সবকিছুই চলে নিখুঁত অঙ্কের হিসেবে; একটি ঘটনা জন্ম দেয় আরেকটি ঘটনার, সেটি আবার জন্ম দেয় আরেকটি ঘটনার, এভাবে ঘটনার পর ঘটনা ঘটতে থাকে, কিন্তু সবই সুনির্দিষ্ট ছকে।"

"বিজ্ঞানীদের কাছে নিশ্চয়তাবাদ বেশ আকর্ষণীয়;" বলেন দিদিমা, "সবই সমীকরণ, হতেও পারে, না-ও হতে পারে, এরকম কোনো ব্যাপার নেই এখানে। হবেই, এটিই হচ্ছে কথা; নেই কোনো অন্যথা, নেই কোনো অনিশ্চয়তা।"
"মজাই তো!"
"হ্যাঁ, তবে সমস্যাও আছে, কেউ যখন একে সবকিছুতে মিলিয়ে দিতে চায়, যখন বলে, মানুষের আচরণ ব্যবহার এসবও নিশ্চয়তাবাদের অংশ। তার মানে কেউ যদি কাউকে গালি দেয়, আঘাত করে, মেরে ফেলে, তা হচ্ছে অতীতের কোনো ঘটনার ফলাফল মাত্র, যার উপর আঘাতকারীর কোনো হাত বা প্রভাব নেই।"
"ইশশ, এ কেমন কথা!" অবাক হয় ফারিন।
"হ্যাঁ। যাক, সেটি আরেক প্রসঙ্গ।" দিদিমা বলেন।

"বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে একদল বিজ্ঞানী যখন উন্মোচিত করতে থাকে বিশালকায় মহাশূন্যের রহস্য, আরেক দল তখন যেতে লাগল পদার্থের ভেতরে, গভীরতম প্রদেশে—ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের বিস্ময়কর জগতে। বড় ধাক্কাটি আসলো সেখান থেকেই!

১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ প্রমাণ করলেন, ল্যাপ্লাসের বিশ্বাস ঠিক নয়!" থামলেন কোয়ান্টাম দিদিমা।

[ক্রমশ]
______________________
পোস্টের সূচনাভঙ্গিটি পরীক্ষামুলক, পরিবর্তিত হতে পারে। — লেখক]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29265359 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29265359 2010-11-02 01:41:06
এনহেদুয়ানা—ইতিহাসের প্রথম কবি
দজলা-ফোরাতের অববাহিকায় গড়ে উঠা মেসোপটেমিয়ার বিস্ময়কর প্রাচীন পৃথিবী, হাজার হাজার বছর ধরে অদম্য কৌতূহল জাগিয়ে যায় আমাদের—কী বলে গেছে অতীতের মানুষেরা? রাজা-রাণীদের রোমাঞ্চকর সমরগাঁথা, গ্রহ-নক্ষত্রে বিচরণকারী দেব-দেবীদের সভাকার্য, মৃত্যু-দরিয়া অতিক্রমের গল্প, নাকি সাধারণ মানুষের আনন্দ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বঞ্চনা-দ্রোহের কথা?

কিন্তু সুমের, আক্কাদ আর ব্যাবিলনের এসব মানুষেরা বলে গেছে তাদের কথা কীলকলিখন (cuneiform) লিপিতে, রহস্যময় এক ভাষা, চিত্র যেখানে কাজ করে ধ্বনির। ধীরে ধীরে একদিন হারিয়েও যায় তারা, মাটির নীচে চাপা পড়ে তাদের ভাষা।

না, একেবারে হারিয়ে যায় না! বাইবেলে বর্ণিত খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের বিখ্যাত সম্রাট প্রথম দারিয়ুস, অধীনস্থ করেন হিব্রুভাষীসহ বহু জনগোষ্ঠিকে। নিজের বংশলতিকা ও বিজয়াভিযান কীলকলিখন ভাষায় উৎকীর্ণ করে রাখেন পারস্যরাজ, পশ্চিম পারস্যের বেহিস্তুনে জাগরোজ পর্বতমালার শৈলচূড়ায়। আর কেউ যাতে কোনোদিন তার কীর্তিকে বিনাশ করতে না পারে, তাই পাহাড়ের ধারগুলো কেটে দেন তিনি। আড়াই হাজার বছর ধরে মানুষ দূর থেকে অবলোকন করে গেছে এ লিপি, কিন্তু জানতে পারেনি কী লিখে গেছেন পারস্যরাজ পাহাড় চূড়ায়।

প্রাচীন পার্সি, এলুমাইট এবং কিউনিফর্মের ব্যাবিলনীয় রূপে বেহিস্তুন শিলালিপি

১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে স্যার হেনরী রলিনসন নামে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একজন সেনাকর্মকর্তা পারস্যে শাহের সেনাবাহিনীকে সাহায্য করতে গিয়ে খুঁজে পান রহস্যময় এ শিলালিপি। পরবর্তী চার বছর, পাহাড়ের সঙ্কীর্ণ অরক্ষিত কিনারায় দাঁড়িয়ে জীবনের উপর হুমকি নিয়ে, শিলালিপিগুলো নকল করেন তিনি। সম্পূর্ণ নকলকাজ শেষ হবার পর, যা লিখা ছিল প্রাচীন পার্সি, এলুমাইট এবং ব্যাবিলনীয় ভাষায়, রলিনসন প্রথমে পার্সি লিপির পাঠোদ্ধার করেন যেহেতু তার জানা ভাষার সাথে এর ছিল সবচেয়ে বেশি মিল। পরে আরো কিছু ভাষাবিদের সহায়তায় এলুমাইট এবং ব্যাবিলনীয় কিউনিফর্ম ভাষারও পাঠোদ্ধার হয়, যদিও তুলনামূলকভাবে অনেক দুরূহ ছিল সেগুলো।

পরবর্তী বছরগুলোতে আমাদের চোখের সামনে একের পর এক উদ্ভাসিত হতে থাকে গৌরবময় এক সভ্যতা, যা আমাদের দান করেছে পৃথিবীর প্রাচীনতম লিখনপদ্ধতি, সভ্যতাকে বেগবানকারী যন্ত্র চাকা, নগররাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, সংখ্যাতত্ত্বে শূন্যের ব্যবহার।

এবং ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে, প্রাচীন উর নগরীর ধ্বংসস্তুপে, মর্মরসদৃশ নরম কালো পাথরের এক চাকতিতে, আমরা জানতে পারি রাজকীয় এক নারীর কথা—এন-হেদু-আনা, যার অর্থ আন-এর রমণীয় অলঙ্কার বা আন-এর উচ্চ যাজকীয় অলঙ্কার; আন সুমের-ব্যাবিলনীয় পুরাণের আকাশদেব। এনহেদুয়ানা অবশ্য নারীটির আসল কিংবা জন্ম নাম নয়, একটি উপাধি, আর আসল নামটি হারিয়ে গেছে, কিংবা হয়তো লুকিয়ে আছে ইতিহাসের গর্ভে। পাথরের চাকতিটিতে কীলকলিখনে তার পরিচয় দেয়া হয়েছে: নান্নার স্ত্রী এবং পৃথিবীর রাজা সারগনের কন্যা

এনহেদুয়ানার চিত্রখচিত চাকতি; সবচেয়ে দীর্ঘাঙ্গী নারীটি তিনি

২৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে কীশ নগরীর রাজপ্রাসাদের সামান্য পেয়ালাবাহক থেকে ধীরে ধীরে পরাক্রমশালী এক সম্রাট হয়ে উঠেন আক্কাদের সারগন (Sargon of Akkad), ধীরে ধীরে দখল করে নেন দক্ষিণে অবস্থিত সুমেরের নগর রাষ্ট্রসমূহ, উরুক, উর, লাগাশ, উম্মা, এবং একসময় পৌঁছে যান নিম্ন সাগরের (Persian Gulf) কাছে, পানিতে তরবারি নিমজ্জিত করে উত্তোলন করেন মাথার উপর—সুমেরের বিজয় সম্পন্ন হলো।

আক্কাদের রাজা প্রথম সারগন (সম্ভবত)

সারগন এবার দৃষ্টি প্রসারিত করেন উত্তর ও পূর্বে উচ্চ সাগরের (Mediterranean Sea) দিকে, আর তখন জটিল এক সমস্যা এসে পথ রোধ করে তার: আক্কাদ ও সূমের, ভিন্ন দুই জাতি, ভিন্ন তাদের ভাষা, অগ্নিস্ফূলিঙ্গের মতো মুখোমুখি দাঁড়িয়ে—কার তত্ত্বাবধানে রেখে যাবেন বিশাল বিবদমান এ সাম্রাজ্য।

এগিয়ে আসেন সারগনের তরুণী কন্যা এনহেদুয়ানা, জানেন তিনি রঙ-বর্ণ-ভাষা ভিন্ন হলেও আত্মিক বন্ধন মানুষকে নিয়ে আসে কাছাকাছি, শত্রুকে করে বন্ধু। আক্কাদের দেবী ইশতার, সুমেরের দেবী ইনান্নাকে একীভূত করেন তিনি, দায়িত্ব নেন উর নগরীতে ইনান্নার পিতা চন্দ্রদেব নান্নার মন্দিরে উচ্চ যাজিকা'র (High Priestess)। পরবর্তী ৫০০ বছর মেসোপটেমিয়ার মানচিত্রে, সম্রাটদের রাজনীতিতে, এবং গণমানুষের জীবনাচরণে বিশাল প্রভাব রাখে এনহেদুয়ানা ও তার উত্তরসূরী এসব উচ্চ যাজিকাগণ।

এবং এনহেদুয়ানা, বেঁচেছিলেন যিনি শেক্সপিয়ারের জন্মের প্রায় ৪০০০ বছর পূর্বে, গ্রিক গীতিকবি স্যাফো'র ১৭০০ বছর এবং চারণকবি হোমারের ১৫০০ বছর পূর্বে, রচনা করে গেছেন অনন্য ভাষা শৈলী ও শব্দচয়নে চমৎকার অনেক কবিতা, ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত, যুগ যুগ ধরে মেসোপটেমীয়ার বিদ্যালয় (edubba) ও উপাসনালয়গুলিতে লেখকরা যা পাঠ করে যেত গভীর ভক্তিতে, এবং এখনও বিস্ময় জাগিয়ে যায় আমাদের।

এনহেদুয়ানা—এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ইতিহাসে, বিশ্বের প্রথম কবি, যাকে চেনা যায় নাম ধরে, উত্তম পুরুষে প্রথম কবিতা লেখার কৃতিত্বও যার।

এনহেদুয়ানার কবিতা
১। নিন-মে-সার-রা (ইনান্নার পরমানন্দ)
২। ইন-নিন-সা-গুর-রা (দৃঢ় আত্মার নারী)
৩। ইন-নিন-মে-হুস-আ (ইনান্না ও এবি)
৪। এ-উ-নির (মন্দির গীতি)
৫। এ-উ-গিম-এ-আ (নান্না গীতি)
৬। এনহেদুয়ানার প্রশংসা গাঁথা


সারগনের বংশ ধারা

তথ্যসূত্রঃ
Click This Link
http://en.wikipedia.org/wiki/Enheduanna
http://www.angelfire.com/mi/enheduanna/]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29251532 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29251532 2010-10-08 19:04:15
রামানুজন—গণিতের মহত্তম এক শিল্পী
১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ, লন্ডন শহর, ব্রিটেন
“জনাব, অধীনের সবিনয় নিবেদন এই যে, আমি মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্ট অফিসের হিসেবরক্ষণ বিভাগে বাৎসরিক মাত্র ২০ পাউন্ড বেতনে কর্মরত একজন কেরানি। আমার বয়স ২৩। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার কোনো সুযোগ আমার হয় নাই, তবে বিদ্যালয়ে সাধারণ বিষয়সমূহ আমি পড়িয়াছি। বিদ্যালয় ছাড়িবার পর অবসর সময়ে আমি গণিত চর্চা করিয়া থাকি। বিদ্যাশিক্ষার গতানুগতিক যে পথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুসরণ করা হইয়া থাকে, উহা আমি অবলম্বন করি নাই, বরঞ্চ নিজের জন্য নতুন একটি পথ নিজেই আমি সৃষ্টি করিয়া লইয়াছি। অপসারী ধারার উপর আমি কিছু কাজ করিয়াছি এবং স্থানীয় গণিতবিদগণ উহার ফলাফলকে "বিস্ময়কর" বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছে। আপনাকে অনুরোধ করিতেছি আমার কাজগুলি দয়া করিয়া একটু দেখিবার জন্য। আমার নিজের সামর্থ্য নাই, যদি আপনি মনে করিয়া থাকেন ইহাদের কিছুমাত্র গুরুত্ব আছে, তাহা হইলে আমি বাধিত হইব যদি উপপাদ্যগুলি প্রকাশিত হয়। আমার অভিজ্ঞতা তেমন নাই, আপনার যেকোনো উপদেশ আমার কাছে অমূল্য হিসেবে গৃহীত হইবে। আপনাকে বিরক্ত করিবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। আপনার একান্ত বাধ্যগত,”
____________________
মাদ্রাজ থেকে ১৬ই জানুয়ারি ১৯১৩ তারিখে পোস্ট করা বিরাট খামটি খুলে চিঠিটি পড়লেন জি. এইচ. হার্ডি (Godfrey Harold Hardy)। পাঁচ হাজার মাইল দূরে মারী ও মন্বন্তরের ভারতবর্ষ, সেখানকার অখ্যাত এক কেরানি চেষ্টা করছে একসাথে তার করূণা ও বিস্ময় উদ্রেক করতে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে হাসলেন হার্ডি। ৩৬ চলছে তাঁর বয়স; এ বয়সেই দুনিয়াজোড়া নাম ছড়িয়েছে তাঁর গণিতবিদ হিসেবে, তিন বছর আগে সভ্য নির্বাচিত হয়েছেন ব্রিটেনের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান পরিষদ রয়্যাল সোসাইটির। খ্যাতির সাথে অবশ্য আসছে নানা বিড়ম্বনা। কত পাগল আর চালিয়াত যে রয়েছে দুনিয়াতে! উঠকো এসব চিঠি প্রায়ই আজকাল আসছে তার কাছে: ফারাও খুফুর পিরামিডের দৈবজ্ঞান আয়ত্ত করেছে কেউ, কাব্বালাহ'র রহস্য ভেদ করে ফেলেছে কেউ, কেউ বা আবার খুঁজে পেয়েছে শেক্সপিয়ারের নাটকে ঢুকিয়ে দেয়া বেকনের ধাঁধা।

হার্ডি জানেন না ভারতবর্ষের দরিদ্র যুবকটি কেমব্রিজের আরো দুজন প্রখ্যাত গণিতবিদ, ই. ডব্লিউ. হবসন ও এইচ. এফ. বেকারের কাছে অনুরূপ সাহায্যের আবেদন পাঠিয়েছিল; তারা তাকে পাত্তা দেননি।

খামটির ভেতর থেকে এক টুকরো কাগজ পড়ল মাটিতে। উবু হয়ে কাগজটি তুলে চোখের সামনে মেলে ধরলেন হার্ডি, টানা হাতের অক্ষরে ছোট্ট একটি সমীকরণ লেখা তাতে:
১+২+৩+৪+⋯∞=-১/১২
কৌতুকের দমকে খানিকটা বিষমই খেলেন হার্ডি। প্রথম চারটি পদ যোগ করলেই ধারাটির যোগফল আসে ১০। এরপর পদ যত বাড়বে যোগফলও তত বাড়তে থাকবে, বাড়তে বাড়তে তা ধাবিত হবে অসীমের দিকে; একটি শিশুও ধরতে পারবে এটি। যোগফল ভগ্নাংশ, তাও আবার ঋণাত্মক, পাগল আর কাকে বলে!

কৌতুকের প্রভাব অবশ্য স্থায়ী হলো না বেশিক্ষণ; বিরক্তে কুঞ্চিত হলো হার্ডির কপাল ও মন। ভারতবর্ষের ছোকরাটি একটি চালিয়াত ছাড়া আর কিছুই নয়। সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না, আলমিরার এক কোণে খামটি ছুঁড়ে মেরে টেবিলের উপর থেকে লন্ডন টাইমস পত্রিকাটি তুলে নিলেন তিনি।

বিকেলে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্টে টেবিল টেনিস খেলতে গেলেন হার্ডি। কিন্তু কেন যেন খেলায় মন বসছে না তাঁর, অস্পষ্টভাবে মনে হানা দিচ্ছে হতদরিদ্র, ছেঁড়া পোশাকের রোগা এক যুবকের মুখ।
অদ্ভুত এক সমীকরণ: ১+২+৩+৪+⋯∞=-১/১২
জিনিয়াস, চালিয়াত, জিনিয়াস, চালিয়াত...?

হঠাৎই বিদ্যুত চমকের মতো কী এক চিন্তায় কেঁপে উঠলেন হার্ডি, মনে পড়ে গেল তাঁর সোয়া দু'শো বছর পূর্বে বেরনুলি ভাইদের কথা। তবে কী? খেলা অসমাপ্ত রেখেই দ্রুত উঠে পড়লেন হার্ডি।

১৬৮৯ খ্রিস্টাব্দ, ব্যাসেল শহর, সুইজারল্যান্ড
পড়ন্ত বিকেলে চেয়ার পেতে বাগানে বসে আছেন বেরনুলি পরিবারের জ্যেষ্ঠ ছেলে জ্যাকব বেরনুলি (Jacob Bernoulli) আর কনিষ্ঠ জোহান বেরনুলি (Johann Bernoulli)। তের বছরের ছোট জোহানকে কোলে পিঠে বড় করেছেন জ্যাকব, শিখিয়েছেন তাঁকে গণিতের নানা রহস্য; শুধু তাই নয়, জোহান এখন পিএইচডি করছেন জ্যাকবেরই তত্ত্বাবধানে। চিন্তা-ভাবনায় তুখোড় জোহান, তবে আদরে আদরে পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তানদের ক্ষেত্রে যা হয়—এই বয়সেও প্রচণ্ড একরোখা রয়ে গেছেন। গবেষণা, পড়াশোনা নিয়ে প্রায়ই তীব্র ঝগড়া বেঁধে যায় দু'ভাইয়ের, কথা, এমনকি মুখ দেখাদেখিও, বন্ধ থাকে বেশ কিছুদিন।

আজকে অবশ্য দু'জনের মেজাজ কিছুটা ফুরফুরে। বাগানে বসে নানা মজা করছেন দু'ভাই, খোঁচাচ্ছেন একে অপরকে বেশ। কিছুক্ষণ পর জোহান বেরনুলি একটি কৌতুক বললেন:
পানীয় কেনার জন্য একদা অসীম সংখ্যক গণিতবিদ আসলো এক দোকানে।
"আমাকে ১ ইমমি (তরলের আয়তন পরিমাপকারী প্রাচীন সুইস একক, যা ১.৫ লিটারের সমপরিমাণ) আপেলের রস দিন।" প্রথম জন বলল।
দোকানি তাক থেকে এক ইমমির বোতল নামাতে যাবে, এমন সময় দ্বিতীয় জন বলল, "আমাকে দিবেন এর অর্ধেক, মানে ১/২ ইমমি।"
"আমাকে দেবেন এর অর্ধেক, অর্থাৎ ১/৪ ইমমি।" তৃতীয় জন দাঁত বের করে হাসে।
"আমাকে ১/৮ ইমমি।" তীর্যক হেসে চতুর্থ জন দাবি পেশ করে।
গণিতবিদদের লাইনে হাস্যরসাত্মক গুঞ্জনে একের পর এক দাবি উঠতে থাকে; দোকানের মালিক লাইনের দিকে তাকিয়ে শেষ দেখতে পায় না।
"এই দুই বোতল নিয়ে বিদায় হও তোমরা, যত্তসব!" গজগজ করতে করতে এক ইমমির দুইটি বোতল নামিয়ে রাখে বিক্রেতা।

পরস্পরের দিকে হেসে উঠেন জ্যাকব ও জোহান বেরনুলি। এক সাথেই তারা উপলব্ধি করেছেন দোকানি, বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক, ভুল কিছু করেননি, কারণ (১ ইমমি+১/২ ইমমি+১/৪ ইমমি+১/৮ ইমমি+⋯∞) অসীম এ ধারাটির যোগফল বাস্তবিকই ২ ইমমি। গণিতের অপার সৌন্দর্যের এক নিদর্শন এটি: অসীম সংখ্যক সংখ্যার যোগফল সসীম। নানাভাবেই এটি প্রমাণ করা যায়, যেমন ১+(১/২)+(১/৪)+(১/৮)+⋯∞
=১+(১-১/২)+(১/২-১/৪)+(১/৪-১/৮)+⋯∞
সমমানের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক পদগুলো কাটাকাটি করলে, অবশিষ্ট থাকে কেবল প্রথম দু‘টি ১, আর তা থেকে বাদ যাবে অসীম দূরের একটি পদ। সুতরাং ধারাটির যোগফল =(১+১-অসীম দূরের একটি পদ)।
পদগুলো যেহেতু ১/২,১/৪,১/৮,১/১৬,⋯এভাবে ক্রমাগত ছোট হয়ে যাচ্ছে, কাজেই অসীম দূরের পদটির কথা চিন্তা করলে, তা এতই ছোট হবে যে একেবারে শূন্যে মিলিয়ে যাবে। ফলে ধারাটির চূড়ান্ত যোগফল পাওয়া যায় ২।

এটি বিপরীত দিক থেকেও ভাবা যায়। ধরা যাক, একজন লোকের ২ ফুট লম্বা একটি লাঠি রয়েছে। তিনি এটি সমান দু'ভাগ করলেন। তাহলে
২=১+১
লোকটি তারপর প্রথম ভাগটিকে ঠিক রেখে দ্বিতীয় ভাগটিকে আবার সমান দু'ভাগে ভাগ করলেন। এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি
২=১+(১/২+১/২)
লোকটি দ্বিতীয় ১/২'কে আবার সমান দু‘ভাগে ভাগ করতে পারেন এভাবেঃ ১/২=১/৪+১/৪
ফলে ২=১+১/২+(১/৪+১/৪)
এভাবে ক্রমাগত ভাগ করে গেলে দেখা যায়,
২=১+১/২+১/৪+১/৮+⋯∞
সুতরাং আলোচ্য অসীম ধারাটি আসলে ২'কে নিরন্তর ভাগ করে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। কতই না সুন্দর গণিত—সসীমের ভেতর লুকিয়ে অসীম!

এবার বড় ভাই জ্যাকব বেরনুলি একটি কৌতুক বললেন:
অসীম সংখ্যক থেলার (ব্যাসেল শহরে প্রচলিত প্রাচীন মুদ্রা) পুরস্কার, এ ঘোষণা দিয়ে লটারির আয়োজন করেন এক গণিতবিদ। অবিশ্বাস্য পুরস্কারটিতে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করতে থাকে, কিন্তু লটারির টিকেট মাত্র ১০ থেলার হওয়ায় অভূতপূর্ব টিকেট বিক্রি হয়। যথারীতি ফল ঘোষণার পর বিজয়ী ব্যক্তি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তার পুরস্কার আনতে যায়। গণিতবিদ তখন থেলার পরিশোধের শর্তটি তার কাছে ব্যাখ্যা করেন: "আজকে ১ থেলার, আগামিকাল ১/২ থেলার, পরশু ১/৩ থেলার, তার পরদিন ১/৪ থেলার...!"

জোহান ভাবতে লাগলেন ধারাটির কথাঃ (১+১/২+১/৩+১/৪+⋯∞)। ঐকতানিক ধারা (Harmonic Series) নামে পরিচিত দেখতে নিরীহ এ ধারাটি গণিতবিদদের কাছে বিস্ময়, সংগীতবিশারদদের চোখের মনি, স্থপতিদের পরম প্রিয়, দার্শনিকদের ধাঁধা, যা কাজ করে স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধির বাইরে । কারণ এ ধারাটির পদগুলোও দ্রুত ছোট হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তথাপি আগের ধারাটির মতো এর নির্দিষ্ট কোনো মান নেই। আগের ধারাটির যোগফল যেখানে মাত্র ২, ঐকতানিক ধারার যোগফল সেখানে অসীম। যদিও যোগফল খুবই আস্তে আস্তে বাড়ে—যেমন, ধারটির প্রথম ১০,০০০ পদ যোগ করার পরও যোগফল ১০ পাওয়া যায় না; প্রথম ১০০ কোটি পদের যোগফল ৩০ থেকেও কম—তারপরও মান বেড়ে বেড়ে ঠিকই অসীমের দিকে রওয়ানা হয় এটি।

জ্যাকব ও জোহান অবশ্য বহু বছর ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন ঐকতানিক ধারাটি যে অপসারী (divergent), অর্থাৎ এর কোনো নির্দিষ্ট কোনো মান নেই, তা প্রমাণ করার জন্য। সরাসরি প্রমাণে সফল না হয়ে তাই বুদ্ধিদীপ্ত এক পদ্ধতির আশ্রয় নেন তারা—অন্য একটি ধারার সাথে তুলনা করেন একে:
ঐকতানিক ধারা, S=১+(১/২)+(১/৩+১/৪)+(১/৫+১/৬+১/৭+১/৮)+(১/৯+⋯∞
অন্য ধারা, ধরা যাক, T=১+(১/২)+(১/৪+১/৪)+(১/৮+১/৮+১/৮+১/৮)+(১/১৬+⋯∞
পদে পদে ধারা দু'টি তুলনা করে বোঝা যাচ্ছে, S>T।

এখন T=১+(১/২)+(১/৪+১/৪)+(১/৮+১/৮+১/৮+১/৮)+(১/১৬+⋯∞
=১+(১/২)+(১/২)+(১/২)+(১/২)+⋯∞
= ১ + ১ + ১ + ..., যা নিঃসন্দেহে অসীম মানের একটি অপসারী ধারা। S যেহেতু T-এর চেয়ে বড়, সুতরাং Sও অসীম মানের একটি অপসারী ধারা।

জ্যাকব হঠাৎ বলে উঠেন, "আচ্ছা, জোহান, তোর কী মনে হয়, ঐকতানিক ধারার প্রতিটি পদকে বর্গ করে যদি আরেকটি ধারা তৈরি করি, সেটি কি অপসারী না অভিসারী হবে? অভিসারী হলে তার মান কতো?"

চোখ বন্ধ করেন জোহান, কল্পনা করেন ধারাটির কথা:
(১)^২+(১/২)^২+(১/৩)^২+(১/৪)^২+⋯∞
=১+১/৪+১/৯+১/১৬+⋯∞
ঐকতানিক ধারার চেয়েও প্রখর গতিতে দ্রুত ছোট হয়ে যাচ্ছে এটি। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলেন তিনি, দ্রুত বলে উঠেন, “এটি অভিসারীই হবে। হওয়াই তো উচিত!” কিছুটা অনিশ্চয়তা তার কন্ঠে।

পরবর্তী কয়েক ঘন্টা মেতে উঠলেন দু'ভাই ধারাটি নিয়ে। কাগজের স্তুপ জমে উঠল টেবিলে, তর্ক হলো, মনকষাকষি হলো, ঝগড়া হলো, কিন্তু আসলো না কোনো ফল। শুধু ঘন্টা নয়, মহাকালের পথে চলে গেল কত না দিন মাস, বছরের পর বছর—না, কিছুই হলো না! ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে যক্ষ্মার হিমশীতল স্পর্শে চিরনিদ্রায় শায়িত হন জ্যাকব বেরনুলি, কিছুটা আক্ষেপ আর অনেকটা আশা নিয়ে: কেউ না কেউ একদিন সমাধান করবে এটি। ব্যর্থ হন বৃদ্ধ জোহান বেরনুলি, ব্যর্থ হন মহান দার্শনিক গণিতবিদ লিবনিটজও। বেরনুলিদের শহর ব্যাসেল-এর নামানুসারে ব্যাসেল সমস্যা (Basel Problem) নামে গণিতের আকাশে জ্বলজ্বল করতে থাকল সংখ্যাতত্ত্বের জটিল এ সমস্যা, পিয়েরে দ্য ফামার বিখ্যাত শেষ উপপাদ্যের মতো।

জ্যাকব বেরনুলির আত্মা শান্ত পায় ১৭৩৫ সালে, যখন জোহানেরই ছাত্র, ব্যাসেল শহরের বিস্ময়কর যুবক লিউনার্দ অয়লার (Leonhard Euler), জ্যাকবের মৃত্যুর দুবছর পর যাঁর জন্ম, সমস্যাটির সমাধান করেন। ম্যাকলরিনের ত্রিকোণমিতিক সাইন (sin) ফাংশনের অনন্ত ধারার উপর ভিত্তি করে অয়লার প্রমাণ করেন, ব্যাসেল ধারা, অর্থাৎ
১+১/৪+১/৯+১/১৬+⋯∞=π^২/৬

সমস্যার মতো সমাধানটিও চমকে দিল সমগ্র গণিত জগতকে কারণ যুগ-যুগান্তরের রহস্যময় সংখ্যা π, এতদিন যা ছিল কেবল জ্যামিতির একচ্ছত্র সম্পদ, রহস্যময়ভাবে আজ আবিষ্কৃত হলো বীজগণিতের সীমানায়, এ এক কল্পনাতীত ঘটনা।

অয়লার অবশ্য শুধু ব্যাসেল ধারারই সমাধান করেননি, বরং এ জাতীয় সকল ধারাকে প্রকাশ করার জন্য একটি সাধারণ ফাংশন প্রস্তাব করেন এবং তা থেকে বিভিন্ন ধারার যোগফল তথা ফাংশনটির মান বের করার জন্য একটি সূত্রও আবিষ্কার করেন। অয়লারের ফাংশনটি হলো:
E(n)=১+১/২^n +১/৩^n +১/৪^n +⋯∞।
অয়লারের নামানুসারে ফাংশনটির নাম হয় অয়লার জেটা ফাংশন
যখন n = ১, তখন অয়লারের ফাংশনটি ঐকতানিক ধারায় পরিণত হয়, যার কোনো নির্দিষ্ট মান নেই।
যখন n = ২, তখন অয়লারের ফাংশনটি ব্যাসেল ধারায় পরিণত হয়, যার মান π^২/৬।
যখন n = ৪, তখন অয়লারের ফাংশনটির মান π^৪/৯০।
যখন n = ২৬, তখন অয়লারের ফাংশনটির মান (১,৩১৫,৮৬২×π^২৬)/(১১,০৯৪,৪৮১,৯৭৬,০৩০,৫৭৮,১২৫)!

১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ, লন্ডন শহর, ব্রিটেন
ভারতবর্ষের যুবকের কাগজগুলো ঘরের কোণা থেকে কুড়িয়ে নিলেন হার্ডি। কৌতূহলবশতঃ অয়লার ফাংশনে n=-১ বসিয়ে হার্ডি দেখেন,
E(-১) =১+১/২^(-১) +১/৩^(-১) +১/৪^(-১) +⋯∞
=>E(-১)=১+২+৩+৪+⋯∞
প্রথমে কিছুটা চমকে গেলেও হাসলেন হার্ডি, কারণ অয়লার ফাংশনে এভাবে n=-১ বসানো যায় না; অয়লার ফাংশনে n-এর মান অবশ্যই ধনাত্মক হতে হবে।

অয়লার জেটা ফাংশনে n=-১ বসানো না গেলেও রীমান জেটা ফাংশনে n-এর মান ঋণাত্মক, এমনকি কাল্পনিক সংখ্যাও, বসানো যায়। রীমান জেটা ফাংশনটি, যা মূলতঃ কাল্পনিক সংখ্যার জন্যই সংজ্ঞায়িত, আসলে অয়লার জেটা ফাংশনেরই বিস্তৃতরূপ, যেখানে n-এর পরিবর্তে s প্রতীকটি ব্যবহার করা হয় এবং s=-১ বসানো যায়।
রীমান জেটা ফাংশন:
ζ(s)=১+১/২^s +১/৩^s +১/৪^s +⋯∞
s=-১ হলে, ζ(-১)=১+২+৩+৪+⋯∞

ζ(-১) কিংবা s-এর অন্য কোনো মানের জন্য রীমান জেটা ফাংশনের মান সরাসরি বের করার সূত্রটি খুব জটিল, তবে একটি জেটা ফাংশনের মান আগে থেকেই জানা থাকলে তার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্য একটি জেটা ফাংশনের মান নিচের সূত্রের সাহায্যে পাওয়া যায়ঃ
ζ(s)=২^s.π^(s-১).sin(πs/২).Г(১-s).ζ(১-s)
সুতরাং ζ(১-s) এর মান জানা থাকলে উপরের সমীকরণের সাহায্যে ζ(s) এর মান নির্ণয় করা সম্ভব।

সমীকরণটিতে s=-১ বসিয়ে হার্ডি পান,
ζ(-১)=২^(-১).π^(-২).sin(-π/২).Г(২).ζ(২)
=১/২∙১/π^২∙-১∙Г(২)∙ζ(২)
এখন ζ(২) আসলে E(২) তথা বিখ্যাত সেই ব্যাসেল ধারা, যার মান π^২/৬। বাকি থাকল কেবল Г(২)। Г প্রকাশ করে বিখ্যাত গামা ফাংশন যা গৌণিক ফাংশনের (একের পর এক ক্রমিক সংখ্যা গুণ করার ফাংশন) অনুরূপ, তবে তা বাস্তব ও কাল্পনিক উভয় ধরণের সংখ্যার জন্য প্রযোজ্য। m ধনাত্মক পূর্ণ সংখ্যা হলে,
Г(m)=(m-১)(m-২)(m-৩)⋯⋯⋯৩.২.১, অর্থাৎ ১ থেকে শুরু করে (m – ১) পর্যন্ত সবগুলো পূর্ণ সংখ্যার গুণফল।
m = ২ বসালে, Г(২)=১।
সুতরাং ζ(-১)=১/২∙১/π^২∙-১∙১∙π^২/৬=-১/১২
অর্থাৎ ১+২+৩+৪+⋯∞=-১/১২, ভারতবর্ষের যুবকটি এ জিনিসই আবিষ্কার করেছে।

বিস্ময়ে স্তম্ভিত, আপ্লুত হলেন হার্ডি। ভারতবর্ষের হতদরিদ্র যুবকটি আসলে অদ্ভুত সুন্দরভাবে অয়লার জেটা ফাংশন, রীমান জেটা ফাংশন, ব্যাসেল সমস্যা আর শতশত বছর ধরে নিবেদিত মহান গণিতজ্ঞদের বহু বছরের সাধনার গল্পটি শিল্পীর নিপুণ তুলিতে এক নিমিষে মূর্ত করে তুলেছে। কী অদ্ভুত, কী সুন্দর! মোনালিসাও তো এর চেয়ে বেশি সুন্দর হতে পারে না!

কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়লেন হার্ডি, গণিতের নতুন এ রাজপুত্রকে মহাসমাদরে নিজের মাতৃভূমিতে আনার অনন্য সম্মানই কেবল তাঁর নিজের লজ্জা আর গ্লানি দূর করতে পারে। গভীর সম্ভ্রম-শ্রদ্ধায় শুরু করলেন হার্ডি,
Dear Sir, …

তারপর, কাবেরীর জলে বেড়ে উঠা ভারতের ছেঁড়া পোশাকের যুবকটি, শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার রামানুজন তাঁর নাম, সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে টেমসের তীরে যখন পা রাখে একদিন—মহত্তম বন্ধুত্বের এ তো অমর গাঁথা এক, বলা যাবে আরেক দিন।

[সংক্ষেপিত]

তথ্যসূত্র:
The Man Who Knew Infinity, Robert Kanigel
A Mathematician's Apology, G. H. Hardy
http://www.wikipedia.org

"এস্কাইলিসকে যখন মানুষ ভুলে যাবে, তখনও তারা আর্কিমিডিসকে ঠিকই মনে রাখবে, কারণ ভাষা মারা যায়, গণিত বেঁচে থাকে।"—জি. এইচ. হার্ডি

"আমার কাছে কোনো সমীকরণের অর্থ নেই যদি না তা স্রষ্টার চিন্তাকে প্রকাশ করে।"—শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার রামানুজন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29245144 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29245144 2010-09-25 20:23:09
গণিতের পঞ্চ কৌতুক (৩)
কার্টুন: একিলিস দৌঁড়ে কচ্ছপকে হারাতে পারবে না, তার প্রমাণ

১। গণিত শিক্ষার বিবর্তন
৬০-এর দশক: একজন কৃষক ১০ টাকায় এক ঝুড়ি গোল আলু বিক্রয় করলেন। তার উৎপাদন খরচ বিক্রয়মূল্যের চার-পঞ্চমাংশ। এক ঝুড়ি গোল আলুতে তার লাভ কত?
৭০-এর দশক: একজন কৃষক ১০ টাকায় এক ঝুড়ি গোল আলু বিক্রয় করলেন। তার উৎপাদন খরচ বিক্রয়মূল্যের চার-পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ ৮ টাকা। এক ঝুড়ি গোল আলুতে তার লাভ কত?
৭০-এর দশক (নতুন নিয়ম): একজন কৃষক P সংখ্যক গোল আলুর একটি সেট মুদ্রা-সংক্রান্ত একটি সেট M-এর সাথে বিনিময় করলেন। M-এর মোট সদস্য সংখ্যা ১০, যাদের প্রত্যেকের মান ১ টাকা। M-এর উপাদানগুলো চিহ্নিত করতে ১০টি বড় ফোঁটা আঁক। উৎপাদন খরচের সেট C হচ্ছে সেট M-এর চেয়ে দু'টি কম ফোঁটা বিশিষ্ট সেট। C'কে M-এর উপসেট হিসেবে দেখাও এবং লাভ সেটের মোট উপাদান সংখ্যা নির্ণয় করো।
৮০-এর দশক: একজন কৃষক ১০ টাকায় এক ঝুড়ি গোল আলু বিক্রয় করলেন। তার উৎপাদন খরচ ৮ টাকা এবং লাভ ২ টাকা। গোল আলু'র নীচে দাগ দাও এবং সহপাঠীদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করো।
৯০-এর দশক: একজন কৃষক ১০ টাকায় এক ঝুড়ি গোল আলু বিক্রয় করলেন। তার (পুং) বা তার (স্ত্রী) উৎপাদন খরচ ৮ টাকা। ক্যালকুলেটরে আয় বনাম ব্যয়-এর লেখচিত্র অঙ্কন করো। POTATO প্রোগ্রামটি চালিয়ে লাভ-ক্ষতি বের কর এবং ফলাফলটি সবার সাথে আলোচনা কর। বাস্তব জীবনের অর্থনীতিতে উদাহরণটি বিশ্লেষণ করে একটি রচনা লিখ।

২। কাঁধসংক্রান্ত গণিত বচন
"আমি যদি অন্যদের চেয়ে বেশি দূরের জিনিস দেখে থাকি, তা এই কারণে যে, আমি দৈত্যদের কাঁধে দাঁড়িয়েছিলাম।":-*—আইজাক নিউটন
"আমি যদি অন্যদের মতো দূরের জিনিস দেখতে না পাই, তা এই কারণে যে, দৈত্যরা আমার কাঁধে দাঁড়িয়েছিল।"<img src=" style="border:0;" />—হাল আবেলসন
"জ্ঞান-বিজ্ঞানে যেসব দৈত্যের কাঁধে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, আজকে আমরা সেসব দৈত্যের পাশাপাশি বসার মর্যাদাও অর্জন করেছি।" <img src=" style="border:0;" />—জেরাল্ড হলটন
"গণিতবিদগণ পরস্পরের কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকে।"<img src=" style="border:0;" />— কার্ল ফ্রেডারিক গাউস

৩। গাণিতিক কুসংস্কার
একজন পদার্থবিদ তার গবেষণাগারের দরজায় ঘোড়ার খুর ঝুলিয়ে রাখলেন। তার সহকর্মীরা তা দেখে খুব অবাক হয়ে গেলেন। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করো যে ঘোড়ার খুর তোমার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সৌভাগ্য বয়ে আনবে?"
"আরে না, তা কেন, কুসংস্কারে আমি মোটেও বিশ্বাস করি না। তবে শুনেছি বিশ্বাস না করলেও এতে নাকি কাজ হয়!"<img src=" style="border:0;" />

৪। সীমা ও সীমাহীনতা
(ক) পানীয় কেনার জন্য একদা অসংখ্য গণিতবিদ আসলো এক দোকানে।
"আমাকে ১ লিটার আমের রস দিন।" প্রথম জন বলল।
দোকানী তাক থেকে এক লিটারের বোতল নামাতে যাবে, এমন সময় দ্বিতীয় জন বলল, "আমাকে দিবেন এর অর্ধেক, মানে ১/২ লিটার।"
"আমাকে দেবেন এর অর্ধেক, অর্থাৎ ১/৪ লিটার।" তৃতীয় জন দাঁত বের করে হাসে।
"আমাকে ১/৮ লিটার।" তীর্যক হেসে চতুর্থ জন দাবি পেশ করে।
গণিতবিদদের লাইনে হাস্যরসাত্মক গুঞ্জনে একের পর এক দাবি উঠতে থাকে; দোকানের মালিক লাইনের দিকে তাকিয়ে শেষ দেখতে পায় না।
"এই দুই বোতল নিয়ে বিদায় হও তোমরা, যত্তসব!" গজগজ করতে করতে এক লিটারের দুইটি বোতল নামিয়ে রাখে বিক্রেতা। <img src=(" style="border:0;" />

(খ) অসীম সংখ্যক টাকা পুরস্কার, এ ঘোষণা দিয়ে লটারির আয়োজন করেন এক গণিতবিদ। অবিশ্বাস্য পুরস্কারে অনেকেই সন্দেহ পোষণ করতে থাকে, কিন্তু লটারির টিকেট মাত্র ১০ টাকা হওয়ার কারণে অভূতপূর্ব টিকেট বিক্রি হয়। যথারীতি ফল ঘোষণার পর বিজয়ী ব্যক্তি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তার পুরস্কার আনতে যায়। গণিতবিদ তখন টাকা পরিশোধের শর্তটি তার কাছে ব্যাখ্যা করেন: "আজকে ১ টাকা, আগামিকাল ১/২ টাকা, পরশু ১/৩ টাকা, তার পরদিন ১/৪ টাকা...!" <img src=" style="border:0;" />

৫। মনস্তত্ত্ব
মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার জন্য একজন তত্ত্বীয় গণিতবিদ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের এক কর্মীকে একটি কক্ষে ঢুকানো হলো। কক্ষের অন্য প্রান্তে অনিন্দ্যসুন্দরী মায়াবতী এক মেয়ে উপবিষ্ট।

মনস্তত্ত্ববিদ পরীক্ষাটি ব্যাখ্যা করলেন: তারা দু'জনই ইচ্ছে করলে মেয়েটির কাছে যেতে পারবে, তবে শর্ত হচ্ছে একেবারে না গিয়ে প্রথম মিনিটে অর্ধেক দূরত্ব যেতে হবে, দ্বিতীয় মিনিটে যেতে হবে বাকি অর্ধেকের অর্ধেক, তৃতীয় মিনিটে যেতে হবে বাকি অর্ধেকের অর্ধেক, ...।

গণিতবিদ তাৎক্ষণিক মন খারাপ করে উঠে পড়ে চলে যেতে যেতে বলল, "মেয়েটিকে দেখার পরই মনে হচ্ছিল এর সাথে সারা জীবন কাটানো যায়, কিন্তু যে শর্ত দেয়া হয়েছে তাতে তো তার কাছে কখনো পৌঁছাই যাবে না।"

রাজনৈতিক কর্মীটি তখনও রয়ে গেছে দেখে মনস্তত্ত্ববিদ বললেন, "তুমি এখনও আছ কেন? তুমি কি বুঝতে পারনি যে মেয়েটির কাছে কখনোই তুমি পৌঁছতে পারবে না?"
"তত্ত্বীয়ভাবে আমি তার কাছে কখনোই হয়তো পৌঁছতে পারব না, কিন্তু প্র্যাকটিক্যালি তার শ্লীলতাহানি করার মতো যথেষ্ট কাছেই যেতে পারব আমি।" অশুভ হাসি হেসে জবাব দিল কর্মী। <img src=(" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29235255 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29235255 2010-09-04 23:16:06
আর্জেন্টিনা কেন স্পেনিশ, ব্রাজিল কেন পর্তুগিজ?
(ইবনে বতুতা, বাষ্পীয় এঞ্জিন আবিষ্কৃত হবার পূর্বে দীর্ঘতম পথের অভিযাত্রী, ভ্রমণ করেন ১২০,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ)

মঙ্গোল শান্তি'র (Pax Mongolica) সুবাদে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে জমজমাট হয়ে উঠেছিল এশিয়া ও ইউরোপের রেশম পথগুলো (Silk Route), চীনের মহাপ্রাচীর থেকে ভেনিসের খাল পর্যন্ত মানুষের পদচারণায় মুখরিত হতো স্থল বাণিজ্য পথ। কিন্তু অসহিষ্ণুতা,অন্তর্কলহ আর যুদ্ধ ধীরে ধীরে স্তিমিত করে দেয় মঙ্গোল শান্তির প্রভাব, একে ত্বরান্বিত করে বিউবোনিক প্লেগ, কৃষ্ণ মৃত্যু (The Black Death)। চীন নিজেকে গুটিয়ে নেয় তার মহাপ্রাচীরের ভেতর, দারিদ্র জোরালো আঘাত হানে ইউরোপে।

(প্রধান প্রধান রেশম পথ)

রেশম পথগুলোর জীর্ণদশা, যা কিছু অবশেষ তাও ভেনিসের দখলে। পর্তুগিজরা তাই এগুতে থাকল সমুদ্র পথ ধরে, জিব্রালটার প্রণালী (Strait of Gibraltar) পেরিয়ে আফ্রিকা উপকূল ঘেঁষে উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope) ঘুরে তাদের নৌযান পড়ল ভারত মহাসাগরের বুকে— ইউরোপের অন্যান্য জাতির তুলনায় সমুদ্র অভিযানে বেশ খানিটা অগ্রযাত্রা হয়ে গেল পর্তুগিজদের।

আফ্রিকা ঘুরে এশিয়া গমন, এ এক সুদীর্ঘ বিপদসঙ্কুল জলপথ; আর ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের সংযোজনকারী খাল সুয়েজ, সে তো সুদূর ভবিষ্যতের গল্প। ইটালির এক নাবিক আসলেন এ সময় স্পেনের রাজা ফার্দিন্যান্ড ও রানী ইসাবেলার রাজসভায়: পূর্বদিকে না গিয়ে যদি পশ্চিম দিকে যাত্রা করা হয়, তাহলে পর্তুগালের অনেক আগেই স্পেন পৌঁছে যাবে ভারতীয় উপমহাদেশের দোরগোড়ায়।

স্পেনের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৪৯২ সালের অগাস্ট মাসে পশ্চিম দিকে যাত্রা করেন নাবিক কলম্বাস, অক্টোবরে দেখা পান স্থলভাগের। পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ (West Indies) আবিষ্কার করেছেন, ভ্রান্ত এ বিশ্বাসে উল্লাসিত হন কলম্বাস, ইউরোপকে চমকে দেয়ার জন্য বন্দী করে নিয়ে আসেন বেশ কিছু স্থানীয় অধিবাসী। এদের অনেকে সমুদ্রযাত্রায় মারা যায়, কিন্তু জীবিত যে ক'জন ইউরোপে পৌঁছতে পেরেছিল, ইউরোপকে চমকে দেবার জন্য তারা যথেষ্ঠই ছিল।

(নতুন মহাদেশ দখল করছেন কলম্বাস)

আটলান্টিকের বুকে সাম্রাজ্যবাদের খেলায় পর্তুগালের বিরুদ্ধে সমতা আনল স্পেন, ফলে পরবর্তী অংশ হয়ে উঠল আরো যুদ্ধংদেহী। রোমান ক্যাথলিক চার্চের স্পেনিশ বংশোদ্ভূত পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডার দ্রুত হস্তক্ষেপ করেন এতে। ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা মে পোপের অধ্যাদেশ (Papal Bull) জারি করেন তিনি—এতে আফ্রিকা উপকূলবর্তী ভার্দে অন্তরীপের দ্বীপপুঞ্জ (Cape Verde Islands) থেকে ১০০ লীগ (৩০০ মাইল) পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগরের বুক চিরে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত কাল্পনিক এক রেখা টানলেন তিনি, এবং ঘোষণা করলেন, এ লাইনের পশ্চিমে আবিষ্কৃত সকল ভূমির মালিক স্পেন। পর্তুগালের কথা উল্লেখ করেননি পোপ, ফলে লাইনের পূর্ব দিকে হলেও কোনো ভূমি দাবি করতে পারবে না পর্তুগাল।

স্বভাবতই এতে মন খারাপ হয় পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জনের। ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলার সাথে সরাসরি দর কষাকষি শুরু করেন তিনি: কাল্পনিক লাইনটি যেন আরো পশ্চিমে সরানো হয় এবং পূর্বদিকের ভূমি পর্তুগালকে দেয়া হয়। জনের প্রচেষ্টা সফল হয়—১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে টর্ডেসিলা চুক্তির (Treaty of Tordesillas) মাধ্যমে লাইনটিকে ভার্দে দ্বীপপুঞ্জের ৩৭০ লীগ পশ্চিমে স্থাপন করা হয় এবং পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে একে স্বীকৃতি দান করেন।

(পোপ আলেকজান্ডার লাইন ও টর্ডেসিলা লাইন)

পোপ আলেকজান্ডারের অধ্যাদেশে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ স্পর্শ করার অধিকারই পায়নি পর্তুগাল, কিন্তু টর্ডেসিলা চুক্তির মাধ্যমে সে সুযোগ এসে গেল। আটলান্টিকের তীর থেকে শুরু করে নতুন মহাদেশের যতটুকু পারল ভেতরে ঢুকে গেল তারা, স্থাপন করল আধিপত্য। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বাকি অংশ রয়ে গেল স্পেনের প্রভাবে। এ কারণেই আজ ব্রাজিল মূলত পর্তুগিজভাষী এবং আর্জেন্টিনা স্পেনিশভাষী।

(লাতিন আমেরিকায় রোমান্স ভাষা। সবুজ: স্পেনিশ, কমলা: পর্তুগিজ, নীল: ফরাসি।)

তবে দ্বন্দ্ব থামেনি তারপরও। স্পেনিশরা টর্ডেসিলা লাইন থেকে পশ্চিমে যেতে লাগল, পর্তুগিজরা পূর্বদিকে। গোলাকার পৃথিবীতে ঘুরতে ঘুরতে প্রশান্ত মহাসাগরের মসলা দ্বীপগুলোতে আবার মুখোমুখি হলো তারা, শুরু করল মারামারি। তবে ইতোমধ্যে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ডাচ, ফরাসি, আর ব্রিটিশরা। পোপের অধ্যাদশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সাম্রাজ্যবাদের খেলায়, শুরু হলো নতুন সমীকরণ।

টর্ডেসিলা চুক্তির প্রভাব পড়েছে আমাদের উপমহাদেশেও, চট্টগ্রাম উপকূলে পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল বাংলার মানুষ। তবে লাইনের পূর্ব পশ্চিমে তেমন কোনো তফাৎ হতো বলে মনে হয় না; সুবেদার শায়েস্তা খাঁ তখন পর্তুগিজদের পরিবর্তে স্পেনিশ দস্যুদের তাড়াতেন, এই যা!

ডিসক্লেইমার: স্পেনের নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবাদী খেলা এবং স্পেনের নান্দনিক ফুটবল খেলাকে এক না করে ফেলার দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা সম্পূর্ণরূপে পাঠকের উপর ন্যাস্ত। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29195791 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29195791 2010-07-09 14:18:30
ভয়ঙ্কর এক সংখ্যার জন্ম, নিষ্ঠুর এক খুনের গল্প (শেষ পর্ব)

ফারাও আমাসিস। আহ্‌, কী দূরদর্শী প্রতাপান্বিত সম্রাটই না ছিলেন তিনি! বয়স হয়েছিল বেশ, অন্তিম শয়ানে তখন, তারপরও রণকৌশল সাজিয়ে গেছেন তিনি, রাজধানী মেমফিসের চারপাশে গড়ে তুলেছেন কঠিন প্রতিরক্ষাবেষ্টনী। দক্ষিণ-পশ্চিম আনাতোলিয়া'র (Turkey) কারিয়া এবং গ্রিস থেকে ভাড়াটে সৈন্য এনে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন সেনাদল, মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন সামোসের পলিক্রেটিজকে, যাতে পলিক্রেটিজের বিশাল নৌবহর গাজা থেকে পেলুসিয়াম (Pelusium) পর্যন্ত সঙ্কীর্ণ মরুপথটিতে অরক্ষিত পার্সি বাহিনীর উপর শাম সাগর (Syrian Sea) থেকে ভয়ঙ্কর আক্রমণ চালায়।

যুদ্ধ শুরু হবার কিছু দিন পূর্বে বিশ্বাঘাতকতা করে পলিক্রেটিজ। ক্যাম্বাইসিজের পক্ষে যোগ দেয় তার নৌবহর, বিনা বাধায় পার্সি সৈন্যদল পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে পৌঁছে যায় পেলুসিয়াম উপসাগরের তীরে। আর এ সময় মারা যান বৃদ্ধ আমাসিস, সিংহাসনে আরোহণ করেন সামতিক—সে কেবল কয়েক মাসের জন্য। পেলুসিয়ামে পরাজিত হয় মিশরবাহিনী, ক্যাম্বাইসিজ অগ্রসর হতে থাকেন আরো পশ্চিমে, হেলিওপলিসের পতন ঘটিয়ে পৌঁছে যান রাজধানী মেমফিসের সদর দরজায়। কয়েক মাস অবরোধের পর ভেঙে পড়ে মেমফিস।

পারস্যরাজ আমাকে বন্দি করে ব্যাবিলনে (Babylon) নিয়ে আসেন, কিন্তু রহস্যময়ভাবে মুক্তভাবে সেখানে চলাচল করতে দেন। অপ্রত্যাশিত সুযোগটি আমি কাজেই লাগাই জ্ঞান সাধনায়—প্রাচ্যদেশীয় জ্ঞানীদের (magi) কাছে দীক্ষালাভ করি অতিন্দ্রীয় শাস্ত্রে, আয়ত্ত করি ক্যালডীয় (Caldean) পুরোহিতদের ধর্মাচার, অর্জন করি নক্ষত্র-অবলোকনকারীদের (star-gazer) গণিত ও জ্যোতির্জ্ঞান। সমকোণী ত্রিভুজ নিয়ে এদেরও ছিল সুতীব্র আকর্ষণ যা আমাকেও তীব্র আলোড়িত করে।

আনুমানিক ১৮০০-১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি ব্যাবিলনীয় শিলাখণ্ড যেখানে কীলক-লিখনের (cuneiform) সাহায্যে ২-এর বর্গমূলের মান ৬০-ভিত্তিক (sexagesimal) পদ্ধতিতে নির্ণয় করা হয়েছে; দশমিক পদ্ধতিতে রূপান্তর করলে বর্গমূলটির মান দশমিকের পর ৫-ঘর পর্যন্ত সঠিক হয়। সৌজন্যে, উইকিপিডয়া

এক যুগ কাটাই আমি ব্যাবিলনে। পারস্যরাজ ক্যাম্বাইসিজ ও গ্রিক স্বৈরাচারী (tyrant) পলিক্রেটিজের মৃত্যু হয় ইত্যবসরে, ফলে সামোস ফিরে আসি আমি। তারপর ক্রিট দ্বীপে কিছু দিন আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন করে আবার সামোসে ফিরে একটি বিদ্যালয় চালু করার মনঃস্থির করি।

আহ্‌, সামিয়ানবাসীরা ছিল খুব ব্যস্ত, বিদ্যাশিক্ষার মতো অগুরুত্বপূর্ণ কাজে তাদের সময় ছিল অপ্রতুল। সামগ্রিক বিবেচনা করে চলে আসি ক্রোটন, এখানেই আদিষ্ট আমি, আর সব দার্শনিকের মতো, যারা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দূরদেশে। তবে সামোসে পেয়েছি আমি নক্ষত্র এক, তোমাদেরই একজন সে, তোমাদের মতোই আলোকিত, প্রিয় ফিলোক্রেটজ।

"এ-ই হচ্ছে আমার গল্প, হে স্বর্গীয় আলোর দিশারীগণ, হে নির্বাচিত অভিমন্ত্রিতগণ।" পীথাগোরাস শেষ করেন তাঁর কাহিনী, সসম্ভ্রমে সবাই তাকায় ফিলোক্রেটজের দিকে।

সূর্য ডুবে গেছে পশ্চিমাকাশে, ধীরে ধীরে শীতল হয়ে উঠে ভূমধ্যসাগরীয় রাত। "জগতের সবই সংখ্যা, পূর্ণসংখ্যা, যাদের রয়েছে বাস্তব, স্বকীয় অস্তিত্ব।" রহস্যময়ভাবে বলে উঠেন পীথাগোরাস। "সংখ্যা-ই জীবন, সংখ্যা-ই মরণ, সংখ্যা গড়েছে জগত-সংসার। মহাবিশ্বের সবকিছুই পূর্ণসংখ্যায় পরিমাপযোগ্য (commensurable), এমনকি শরীর বলো, আত্মা বলো, ন্যায়বিচার বলো, সবই সংখ্যা।

যেকোনো দুটি সংখ্যাকে তোমরা সর্বদা সুবিধামতো তৃতীয় একটি ক্ষুদ্রতর সংখ্যার পূর্ণ গুণিতক আকারে প্রকাশ করতে পার। যেমন ধরো, ক্রোটনের বাজার থেকে ৫ ড্রাকমা ২ অবোলি দিয়ে কিছু জলপাই কিনলে তুমি, সম পরিমাণ জলপাই কিনলে সামোস থেকে ৪ ড্রাকমা ৪ অবোলি দিয়ে। তাহলে অবোলি হিসেবে তুমি পেলে দুটি সংখ্যা:
৩২ [অবোলি] ও ২৮ [অবোলি], যেহেতু ১ ড্রাকমা=৬ অবোলি।

এখন তুমি যদি একটি ক্ষুদ্রতর সংখ্যা, ১৬ [অবোলি] নাও, তাহলে মূল সংখ্যা দু'টি কিন্তু পরিপূর্ণ বিভাজ্য তথা পূর্ণ গুণিতক হচ্ছে না, কারণ ৩২÷১৬=পূর্ণ সংখ্যা, কিন্তু ২৮÷১৬=পূর্ণ সংখ্যা নয়।

এবার তুমি আরেকটু ক্ষুদ্রতর সংখ্যা নিয়ে চেষ্টা কর: ধরো, ১৪। না, এবারও দুটি পূর্ণ গুণিতক হচ্ছে না। কিন্তু এভাবে ক্ষুদ্রতর সংখ্যাটি কমিয়ে যেতে থাক, এক সময় দেখবে সেটি ৪ ধরলে দুটি সংখ্যাই পূর্ণ বিভাজ্য হচ্ছে: ৩২÷৪=৮, ২৮÷৪=৭। ৪ হচ্ছে ৩২ ও ২৮-এর সাধারণ পরিমাপক (common measure)।

আবার তুমি যদি ড্রাকমা হিসেব করো, তাহলে সংখ্যা দুটি:
৫ ও ১/৩ [ড্রাকমা] এবং ৪ ও ২/৩ [ড্রাকমা]।

এখন তুমি যদি ক্ষুদ্রতর সংখ্যাটি নাও ১/৩, তাহলে আগের মতো ভাগফল হিসেবে পাচ্ছ দুটি পূর্ণ সংখ্যা:
(৫ ও ১/৩)÷১/৩=১৫ ও ১=১৬
(৪ ও ২/৩)÷১/৩=১২ ও ২=১৪

জ্যামিতিকভাবে বললে, ৩২ ও ২৮ যদি দুটি রেখাংশ হয়, তাহলে ৪ মাপের রেখাংশটি তাদের সাধারণ পরিমাপক। এভাবে ২, ১, ১/২, ১/৪... প্রভৃতিও তাদের সাধারণ পরিমাপক হবে।

আবার ৫ ও ১/৩ এবং ৪ ও ২/৩ দুটি রেখাংশ হলে, তাদের সাধারণ পরিমাপক হবে ১/৩, ১/৬, ১/৯...এসব মানের রেখাংশ।


এভাবে ক্ষুদ্রতর সংখ্যাটি যত ক্ষুদ্র নেবে, এক সময় না এক সময় সেটি দিয়ে মূল সংখ্যাদ্বয়কে ভাগকরলে ভাগফল হিসেবে পূর্ণ সংখ্য পাবেই— মহাবিশ্বের সবকিছুই পূর্ণ সংখ্যায় পরিমাপযোগ্য।

"না, এ সত্য নয়, জগতের সবকিছুই এভাবে পূর্ণ সংখ্যায় প্রকাশযোগ্য নয়। অনেক সংখ্যাযুগল আছে দুনিয়ায় যাদের এরূপ তৃতীয় কোনো সাধারণ পরিমাপক পাওয়া যাবে না, তা যত চেষ্টাই করাই হোক, আর পরিমাপকটি যত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রই নেয়া হোক না কেন।

আতঙ্কে শিউরে উঠল ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যগণ। প্রখর রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে ভয়ানক বজ্রপাতেও এতটা চমকে উঠত না তারা। গুরুর সামনে উচ্চকণ্ঠ হয় না তারা, তাঁর শিক্ষাকে অস্বীকার করা তাদের ভয়ানক দুঃস্বপ্নেরও অতীত; আর এ তো স্পষ্ট বিদ্রোহ, ভ্রাতৃগোষ্ঠির বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত, তাদের সামগ্রিক জীবনাচারণকে অস্বীকার। কে সে দুরাত্মা, পাপিষ্ঠ! আক্রোশে ফেটে পড়তে উন্মুখ ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যগণ।

"কে, কে বলেছে এ কথা?" কঠোর থমথমে মুখে প্রশ্ন করেন পীথাগোরাস।
"আমি, হিপ্যাসাস।" মেটাপানটামের (Metapontum) যুবকটি বলে। গত কয়েক দিন অস্থির সময় কেটেছে। আবিষ্কারটির ভয়ঙ্করতায় প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল সে, কেঁপে উঠেছিল তার অন্তরাত্মা। তারপরও নানা ভাবে পরীক্ষা করে দেখেছে সে—না, সে-ই ঠিক, পীথাগোরাসের সংখ্যাই জগতের সব সংখ্যা নয়। শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে উচ্চারণ করেই ফেলেছে সত্যটির কথা।
"তুমি জান কী উচ্চারণ করেছে তুমি? এর কী প্রমাণ আছে তোমার কাছে? প্রমাণ করতে না পারলে তার পরিণতি সম্পর্কে ধারণা আছে?" পীথাগোরাস দৃঢ়কণ্ঠে বলেন।
"হ্যাঁ, প্রমাণ আমি করতে পারব। আপনার সমকোণী ত্রিভুজেই লুকিয়ে আছে তা।" ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে হিপ্যাসাসের।
"উঠে এসো এখানে, প্রমাণ কর।"

ভীড় সরিয়ে সেমিসার্কেলে উঠে হিপ্যাসাস। নানা রঙের বালি ও নূড়িপাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন সহকারী। মাটিতে একটি বর্গক্ষেত্র আঁকে হিপ্যাসাস, তারপর নীল বালি ছিটিয়ে রঙিন করে তার বাহুগুলো, আর একটি সবুজ কর্ণ তৈরি করে।
"আপনার কথামতো বাহু-রেখাংশ AB এবং কর্ণ-রেখাংশ AC পরস্পর পরিমাপযোগ্য (commensurable), অর্থাৎ তৃতীয় আরেকটি ক্ষুদ্রতর রেখাংশ তাদের উভয়কে পূর্ণ সংখ্যায় ভাগ করতে পারবে, তাই না?" প্রশ্ন করে হিপ্যাসাস।


"হ্যাঁ, তাই।" ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করে বলেন পীথাগোরাস, স্পষ্টতই এ ধরণের আচরণ, বিশেষ করে শিষ্যদের কাছ থেকে, একেবারে অকল্পনীয়।
"ধরে নেই, তৃতীয় সেই ক্ষুদ্রতর রেখাংশটির মান m। অতএব, AB ও AC উভয়ে m-এর সাপেক্ষে পরিমেয়, যেখানে m হতে পারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি সংখ্যা। বোঝার সুবিধার্থে ধরে নেই, AC=1000m, AB=707m, যদিও পরে আমরা দেখব আমার পদ্ধতিতে 1000 বা 707-এর কোনো ভূমিকা নেই।"
বর্গের কর্ণ যদি ১০ হস্ত হয়, বাহু তার মোটামুটি ৭ হস্ত; ১০০০ হলে মোটামুটি ৭০০, মনে মনে হিসেব করেন পীথাগোরাস। "ঠিক আছে।" বলেন তিনি।

"এবার কর্ণ AC থেকে AB-এর সমান করে AB1 অংশ কেটে নেই। CB1 কে বাহু ধরে আরেকটি বর্গ আঁকি।" বর্গক্ষেত্রটিকে হিপ্যাসাস এবার লালচে বালি দিয়ে স্পষ্ট করেন। পিনপতন নীরবতা সেমিসার্কেলে, কী একটা আঁচ করার চেষ্টা করছেন পীথাগোরাস, কপালে বয়সরেখাগুলোতে ভাঁজ পড়তে শুরু করছে।


"এখন ছোট বর্গের বাহু, CB1=1000m-707m=293m (=EB1)।
ত্রিভুজ ABE এবং ত্রিভুজ AB1E সর্বসম, কারণ এরা সমকোণী ত্রিভুজ যেখানে দুটি করে বাহু সমান: AB=AB1, AE সাধারণ বাহু।
ফলে EB1=EB=293m, এবং
ছোট বর্গের কর্ণ, CE=707m-293m=414m।
অতএব আমরা পাচ্ছি, ছোট বর্গের বাহু ও তার কর্ণ পরস্পর m-এর সাপেক্ষে পরিমাপযোগ্য।" হিপ্যাসাস একটি বিরতি নেন।

মৃদু গুঞ্জন উঠে সেমিসার্কেলের চারপাশে, এ-তো ঠিকই আছে, সমস্যা কোথায়! হিপ্যাসাস আবার তার চিত্রে মনোযোগ দেয়, CE রেখাংশ থেকে CB1 এর সমান করে CB2 অংশ কেটে নিয়ে আগের মতো ক্ষুদ্রতর একটি বর্গক্ষেত্র অঙ্কন করে, এবারেরটি বেগুনি বর্ণের।

"আগের মতোই আমরা বলতে পারি, বেগুনি বর্গের বাহু এবং তার কর্ণও m-এর সাপেক্ষে পরিমাপযোগ্য, তা m-এর যত গুণিতকই হোক না কেন? তবে আগের বর্গদুটোর চেয়ে এখানে গুণিতকের মান কম হবে, তাই না?" হিপ্যাসাস প্রশ্ন করে।
"হ্যাঁ।" পীথাগোরাস সায় দেন, স্বর তার ক্ষীণ, যুক্তিশাস্ত্রের কোন শাখা দিয়ে হিপ্যাসাস অগ্রসর হচ্ছে, তা ধরতে পেরেছেন তিনি।
"এভাবে m-এর সাপেক্ষে কর্ণ ও বাহুতে গুণিতকের মান কমতে থাকবে। আমি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বর্গ এঁকে যেতে থাকব, এক সময় এমন এক বর্গ পাব যার বাহু ও কর্ণ m-রেখাংশটির চেয়েও ছোট হয়ে যাবে, ফলে বাহু ও কর্ণ m-এর সাপেক্ষে আর পরিমাপযোগ্য হবে না।"

খানিক থেমে আবার বলে হিপ্যাসাস, "এখন কথা হলো m কত ছোট হতে পারে। আমি সুবিধার জন্য m-কে এমন ধরেছি যে প্রথম বর্গের কর্ণ 1000m ও বাহু 707m হয়। কিন্তু m যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, তা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের হবে, কিন্তু আমি এভাবে অসীম সংখ্যক ক্ষুদ্রতর বর্গ আঁকতে পারব, যখন বর্গের বাহু নির্দিষ্ট mটি থেকে এক সময় ছোট হবে।"

"অতএব, যুক্তিশাস্ত্রের রিডাকশিও এড অ্যাবসার্ডাম (reductio ad absurdum) এর ব্যাতিরেকী প্রমাণের (proof by contradiction) মাধ্যমে আমি প্রমাণ করলাম, এক সময় এমন বর্গ আঁকাও সম্ভব যার বাহু ও কর্ণ কোনোভাবেই সাধারণ কোনো পরিমাপকের সাপেক্ষে পরিমেয় নয়! কিন্তু এ তো স্ববিরোধী কথা, কারণ সকল বর্গেরই কর্ণ ও বাহু একই আনুপাতিক সম্পর্কে থাকার কথা।
তার মানে বর্গের বাহু ও কর্ণ আসলেই কখনো পরস্পর পরিমেয় নয়—বাহু পূর্ণ সংখ্যায় পরিমেয় হলে কর্ণ পরিমেয় হবে না, আবার কর্ণ পরিমেয় হলে বাহু হবে না। বর্গের বাহু যদি ১ হয়, তার কর্ণ হয় ২-এর বর্গমূল, এবং ১ যেহেতু পরিমেয়, ২-এর বর্গমূল কখনো চূড়ান্ত পরিমেয় নয়। একে দুটি পূর্ণ সংখ্যার কোনো অনুপাতে প্রকাশ করা যায় না। এটি একেবারেই নতুন ধরণের সংখ্যা, মহান পীথাগোরাস! "

গভীর নিঃস্তব্ধতা নেমে আসে সেমিসার্কেলে। আইওনিয়ান সাগর থেকে পাক খেতে খেতে সাদা কুয়াশা ছড়িয়ে পরে ভুখণ্ডে, শীতলতর হয় ভূমধ্যসাগরীয় রাত। হিপ্যাসাসের যুক্তি বুঝতে পেরেছেন তিনি, কিন্তু এখনই সামলে নেয়া প্রয়োজন ব্যাপারটি, নয়তো ভ্রাতৃগোষ্ঠির ভাঙন ঠেকাতে পারবে না কেউ!
"তুমি অশুভ অযৌক্তিক (irrational) এক সংখ্যার কথা বললে, হিপ্যাসাস। আমি আরো পরীক্ষা করে দেখব তোমার প্রমাণ, তবে উদ্ধত, অমার্জিত আচরণের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে তোমাকে। আগামীকাল প্রত্যূষেই জাহাজে করে ক্রোটন ত্যাগ করবে তুমি, আমার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত মেটাপানটাম আসার চেষ্টা করবে না এবং কোথাও প্রকাশও করবে না অশুভ সংখ্যাটির কথা।" সভা ত্যাগ করেন পীথাগোরাস।
_________________
"এ-ই হচ্ছে হিপ্যাসাসের গল্প, ভয়ঙ্কর অমূলদ সংখ্যার জন্মের গল্প।" বিবর্ণ পোশাক পরিহিত মানুষটি, চোখে তার অপার্থিব আনন্দ-আভা, চারপাশে মানুষের ভীড়, বলতে লাগল। দীনহীন এক চারণকবি সে—পথে-প্রান্তরে বর্ণনা করে গণিতের উপাখ্যান, গণিতই মহান গীতিকবিতা তার কাছে, আনন্দ-বেদনা হাসি-কান্নার গৌরবগাঁথা।
"সহজ-সরল ভাষায় নিজের মতো করে এ উপাখ্যান বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি; এতে আছে ইতিহাস, আছে কিংবদন্তি, পুরাকালের পরম কথা, যার সত্য-মিথ্যা আজ হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। মানুষ হিসেবে আমারও রয়েছে সীমাবদ্ধতা, ভুল-ত্রুটি নিজ গুণে মার্জনা করবেন।" দু'হাত জোড় করে বুকের কাছে রাখে সে।
"হিপ্যাসাসের শেষ পর্যন্ত কী হলো!" উৎসুক জনতা জানতে চায়।
"গুরুর আদেশে পরদিনই সমুদ্রযাত্রা করে সে। তারপর হঠাৎই হারিয়ে যায় ভূমধ্যসাগরের বুকে, কেউ তাকে আর দেখেনি কোনো দিন! শান্ত মাছরাঙা দিন [halcyon days] ছিল সেদিন, কিন্তু কেউ বলে ঝড়ে ভেসে গেছে সে, কেউ বলে ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যরা খুন করে লাশ তার ফেলে দিয়েছে সাগরে।"

"শান্তি পাক হিপ্যাসাসের আত্মা, সুখে থাকুক জগতের সব মানুষ।" মাটি থেকে কাপড়ের ঝোলাটি তুলে নেয় চারণকবি, জনপদটি পেছনে ফেলে দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠে নেমে পড়ে সে, এগিয়ে যেতে থাকে নতুন আরেক জনপথের সন্ধানে, যারা গণিতের প্রতি ভালোবাসা মমতায় তাকে থামিয়ে দেবে চলার পথে, গভীর আগ্রহে শুনতে চাইবে প্রাচীন মানুষদের কথা— জ্ঞানের মধ্যেই যারা খুঁজে পেয়েছেন জীবনের মহত্তম অর্থ, পরিশুদ্ধতম আনন্দ। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29135937 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29135937 2010-04-16 14:36:32
ভয়ঙ্কর এক সংখ্যার জন্ম, নিষ্ঠুর এক খুনের গল্প (২)
আগের পর্ব: Click This Link

"কেমন আছ তোমরা, হে অভিমন্ত্রিত [initiated] সত্যব্রতগণ?" দু'হাত প্রসারিত করে হাস্যপ্রোজ্জ্বল মুখে জানতে চান পীথাগোরাস।
"চমৎকার, হে মহান গুরুদেব!" সমস্বরে বলে উঠে সবাই।
"তোমরা হচ্ছ নির্বাচিতগণ," শান্তস্বরে বলেন পীথাগোরাস,"তোমরা পরিহার করবে সব ধরণের উগ্রবাদিতা। সর্বোতপ্রচেষ্টায় তোমাদেরকে অপসারণ করতে হবে, এবং ছিন্ন করতে হবে অগ্নি ও তরবারির মাধ্যমে, এবং আরো নানাবিধ উপায়ে, দেহ থেকে অসুস্থতা, আত্মা থেকে অজ্ঞানতা, উদর থেকে ভোগবিলাস, নগরী থেকে অরাজকতা, পরিবার থেকে বিভেদ, এবং সকল ক্ষেত্রে বাহুল্য।"
"জী, গুরুদেব।" সবার হৃদয়ে গেঁথে থাকে বাণীটি।

পীথাগোরাসের নেতৃত্বে ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যগণ অতঃপর মেতে উঠে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনায়, নিয়ন্ত্রিত বিতর্কে, প্রশ্নোত্তরে। কেটে যায় বেশ কয়েক ঘন্টা, শেষ হয় প্রথম পর্বের আলোচনা।

অপরাহ্নে, অড্রিয়াটিক সাগর থেকে উঠে আসা বর্ষবায়ু (etesian wind) যখন বয়ে যাচ্ছিল আয়োনিয়ার উপর, দলটি আবার সমবেত হয়, এবার আলোচনার বিষয়বস্তু অতিন্দ্রীয় শাস্ত্র (esoterica)।
"আপনার জীবনের কথা বলে আমাদের সম্মানিত করুন, হে গুরুদেব।" লুকানিয়া থেকে আগত কমনীয় চেহারার মেয়েটি, ঈসারা (Aesara) তার নাম, উঠে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করে; তীব্র কৌতূহলে নড়েচড়ে বসে সবাই।

স্মিতহাস্যে আলখেল্লাটি ঠিক করে নেন পীথাগোরাস। মনে তাঁর ভীড় করে কত না স্মৃতি—নদী, দরিয়া আর পথের অন্তহীন বয়ে চলা, নগর ও বন্দরসমূহের শান-শওকত, উত্থান-পতন, নানা জাতির মানুষ, দেহ ও মনে তাদের হরেক রঙের খেলা; সম্মোহিত হয়ে যান দার্শনিক কয়েক মুহূর্তের জন্য।

"সাতচল্লিশতম অলিম্পিয়াডের প্রাক্কালে জন্ম আমার। আমার বাবা নেসারকাস (Mnesarchus) ছিলেন ফিনিশিয়ার [Lebanon] বন্দরনগরী টায়ারের (Tyre) মুক্তা ব্যবসায়ী, মা ঈজিয়ানতীরে সামোস নগরীর (Samos) মেয়ে পার্থেনাস। সামোসের ভয়ানক দুর্ভিক্ষে বাবা একদা প্রচুর খাদ্শস্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, ফলে নগরীর অধিকর্তাগণ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে সামোসের নাগরিকত্ব দান করেন।

আমি যখন মাতৃগর্ভে, মা'কে নিয়ে বাবা পার্নেসাস পর্বতের পাদদেশে ডেলফাই'র(Delphi) দৈববাণীর মন্দিরে গমন করেন, এপোলোর সন্ন্যাসিনী পীথিয়ার (Pythia, Pythoness) ওরাকল শুনতে। পীথিয়া আমার পিতাকে তাঁর জাহাজের জন্য অনুকূল বাণিজ্যবায়ুর ভবিষ্যতবাণী ব্যক্ত করে, এবং সুসংবাদ প্রদান করে আমার আগমনের, যা বাবা তখনও জানতেন না। ডেলফাই থেকে টায়ারে ফেরার পথে সিডন (Sidon) বন্দরে আমার জন্ম হয়। বাবা-মা খুশিতে সন্ন্যাসিনীর নামানুসারে আমার নাম রাখেন পীথাগোরাস—পীথিয়া'র মতো কথা বলে যে।

জগতকে জানার অদম্য স্পৃহা আমার উপর ভর করে সেই শৈশবেই, বাবার বাণিজ্য অভিযাত্রায় প্রায়ই তাঁর সহযাত্রী হতাম আমি। এভাবে ঈজিয়ান, এশিয়া মাইনর এবং ফিনিশিয়ার তীরে হাঁটতে হাঁটতে বড় হতে থাকি আমি।

আমার বিদ্যাশিক্ষার জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগ করেন বাবা। ছেলেবেলায়ই শামদেশের (Syria) বিদ্বজ্জনদের কাছে দীক্ষা লাভ করি আমি, সংস্পর্শে আসি আমার প্রিয় শিক্ষক ফেরেকাইদেসের (Pherekydes)।

অষ্টদশ বর্ষ বয়স পূর্ণ হলে আমি গমন করি মাইলিটাস নগরে, গ্রিক জ্ঞানের পুরোধা বৃদ্ধ থেলিজ (Thales) ও তাঁর ছাত্র অ্যানাক্সিম্যান্ডরের (Anaximander) সাহচর্য লাভ করি। পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভের জন্য থেলিজ আমাকে কৃষ্ণ ও লোহিত মৃত্তিকার দেশে (Khemet-Deshret) গমন করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

দূরদেশ গমনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সিডন বন্দরে ফিরে আসি আমি, এখানে আরো কিছুকাল বিবলস ও টায়ারের যাবতীয় অতিন্দ্রীয় শাস্ত্রে অভিমন্ত্রিত হই। তারপর শুভ এক দিনে কারমেলাস পর্বতের পাদদেশে কৃষ্ণ ও লোহিত মৃত্তিকার দেশ মিশরগামী এক জাহাজে আরোহণ করি আমি।

মিশরের ফারাও আমাসিস (Ahmose II) এবং তাঁর গ্রিক স্ত্রী রদোপেস [Rodhopes, ইনি প্রাচীনতম সিন্ডারেলা, যার উপর ভিত্তি করেই পৃথিবীর নানা দেশে সিন্ডারেলা কাহিনী ছড়িয়েছে এবং ঈশপ যাকে রূপকথা শোনাতেন] আমাকে সাদরে গ্রহণ করেন। ফারাওয়ের প্রাসাদে কিছুদিন কাটানোর পর তাঁর রাজ্যের উচ্চ পুরোহিতদের কাছে দীক্ষা নেবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করি আমি, রাজা তখন আমাকে একটি সুপারিশনামা লিখে পাঠিয়ে দেন মেমফিসের মন্দিরে ও পিরামিডে।

কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষ মিশরীয়রা চূড়ান্ত রকমের গোপনীয়তা অবলম্বন করত তাদের জ্ঞান-সাধনায়, যেরকম করে গিয়েছিল ত্রিভূবনের জ্ঞানী থোথ-হার্মিস-ট্রাইম্যাজিস্টাস। তিন দিবস তিন রজনী আমি অতিবাহিত করি পাথরের শবাধারে (sarcophagus), মিশমিশে অন্ধকার এক গুপ্ত প্রকোষ্ঠে, আলোর প্রতীক্ষায়। আস্তে আস্তে আলোড়িত হতে থাকে শরীর আমার, বাড়তে থাকে হৃদস্পন্দন, ধীরে ধীরে চেতনা হারাই আমি। আমি অনুভব করি আলো, ভাসতে থাকে সত্তা আমার, অনন্তকালের গর্ভে, ফিনিক্স পাখির মতো উড়তে থাকে আমার আত্মা। চারপাশে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করি আমি, অবলোকন করি আকার ও সংখ্যা।

"তুমি এখানে, পুনরুজ্জীবিত, অনুভব করেছ মহান রহস্য। মৃত্যুকে পরাভূত করেছ তুমি, অর্জন করেছ মৃত্যুঞ্জয়তা।" তিন দিন পরে উচ্চ পুরোহিত সঞ্চিসের গলার স্বরে জাগরণ আসে আমার। "এসো, অভিমন্ত্রিতদের গৌরব উদযাপন কর। তুমি হয়েছ আমাদেরই একজন, লাভ করেছ নবজন্ম।"

২২ বছর মিশরে কাটাই আমি, আয়ত্ত করি তাদের জ্যামিতিক জ্ঞান, সান্নিধ্যে আসি দড়ি-প্রসারণকারীদের (rope stretcher)। প্রতিবছর নীল নদের বন্যায় ভেসে যেত জমির খাড়া আল, ফারাও তখন নীলের অববাহিকায় পাঠাতেন দড়ি-প্রসারণকারীদের, কতটুকু জমি কমে গেল তা পরিমাপ করতে। পরিমাপের কাজে সূক্ষ্মভাবে সমকোণ বানানোর প্রয়োজন হতো তাদের, এর জন্য সমান দূরত্বে তৈরি করা ১২টি গিঁটের দড়ি নিত তারা। তারপর মাঝ থেকে এমনভাবে ৩ গিঁট নিত, যাতে একপাশে ৪গিঁট ও অন্যপাশে ৫ গিঁট থাকে এবং তাদের প্রান্ত জোড়া দিয়ে একটি ত্রিভুজ সৃষ্টি করা যায়, যা সবসময় সমকোণ সৃষ্টি করে। অন্য কোনো ভাবে গিঁট নিলে কখনো সমকোণ হতো না।

মহান থেলিজও আমাকে এই ত্রিভুজের কথা বলেছিলেন, গভীরভাবে তা নিয়ে ভাবতে থাকি দিনের পর দিন। বহু বছর পর আমার সমকোণী ত্রিভুজের সূত্র আবিষ্কারে দড়িপ্রসারণকারীদের ত্রিভুজের অবদানের কথা আমি অস্বীকার করতে পারি না।

বাইশ বছর পর সামোসে ফেরার প্রস্তুতি নেই আমি। ফারাও আমাসিস মারা গেছেন ততদিনে, উচ্চ ও নিম্ন মিশরের অধিপতি এখন তাঁর ছেলে তৃতীয় সামতিক (Psamtik III)। আর এ সময়ই মিশরে বেজে উঠে যুদ্ধের দামামা, ফিনিশিয়ার তীর ঘেঁষে সিরোক্কো হাওয়ার মতো প্রবল প্রতাপে মরুভূমি ধরে মিশরের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে আসুর-রাজ (Assyrian/Persian) ক্যাম্বাইসিজ (Cambyses II)।

আগামী পর্বে সমাপ্য]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29135098 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29135098 2010-04-14 21:59:42
ভয়ঙ্কর এক সংখ্যার জন্ম, নিষ্ঠুর এক খুনের গল্প দক্ষিণ ইটালি, বৃহত্তর গ্রিসের (Magna Grecia) ক্রোটন নগর

[১]
৫ম খ্রিস্টপূর্বাব্দের শেষভাগ

"আচ্ছা, সবাই বলে ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যরাই তাকে মেরে আইওনিয়ান সাগরে তার লাশ ফেলে দিয়েছিল! গুরু নিজেই নাকি নির্দেশ দিয়েছিলেন এ কাজে?" উদ্বিগ্নতা আর তীব্র কৌতূহলে মেয়েটি জানতে চায় যুবকের কাছে।
"হশ্‌শ্‌..."মুখে তর্জনী রেখে দ্রুত চারদিকে তাকায় যুবক।

অস্তগামী সূর্যের ম্লান আলোয় ভরে গেছে গাঢ় সবুজ জলপাই অরণ্য, খেলা করছে বৃক্ষশাখা আর পত্রপল্লবের ছায়া। মাঝেমাঝে আইওনিয়ান সাগরের বুক থেকে ভেসে আসছে দমকা হাওয়া, তার তোড়ে জায়গা বদল করে আলো-ছায়া। না, কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

তবু অ্যাডোনিয়াকে সাবধান করে ফিলোক্রেটস, "আস্তে কথা বলো, কে কী শুনে ফেলে, বিপদে পড়ব আমরা।"
গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করে অ্যাডোনিয়া, "কিন্তু এ কি সত্যি?"
"আরে না, তা হবে কেন?" তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে ফিলোক্রেটস। "সাগরে ঝড় উঠেছিল সেদিন, আর সে দাঁড়িয়ে ছিল জাহাজের খোলা জায়গায়। প্রচণ্ড এক ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাকে।"
"সে একাই কেন দাঁড়াতে গেলো খোলা জায়গায়?" প্রশ্ন করে অ্যাডোনিয়া, সন্দেহ দূর হয় না তার। "আর, বছরের এ সময় ঝড়ের কথা তো কখনো শোনে না কেউ, মাছরাঙা দিন [halcyon days] চলছিল তখন!"

"অ্যাডো, গুরু কেন এ কাজের নির্দেশ দিতে যাবেন? সত্যানুসন্ধানী মানুষ তিনি, কেবল সত্যেরই লেনদেন করেন। একটি সংখ্যা আবিষ্কারের জন্য কেন মানুষ খুন করাবেন তিনি?" ফিলোক্রেটসের গলার স্বর দৃঢ় হয়ে উঠে।
"কারণ গুরুর সারা জীবনের দর্শন আর শিক্ষার ভীত দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিল সংখ্যটি। তিনি কঠোরভাবে চেয়েছিলেন তা গুপ্ত থাকুক, কিন্তু সে প্রকাশ করে দিয়েছে।"

"আমি তা বিশ্বাস করি না, অ্যডো। তুমি জানো, তাঁর কাছে বিদ্যাশিক্ষার বিনিময়ে আমাকে প্রতিদিন তিন অবোলি [oboli] করে দিতেন! এরকম অদ্ভুত শিক্ষক, যিনি পড়ানোর বিনিময়ে ছাত্রকেই পারিশ্রমিক দেন, আর একজন খুঁজে পাবে না তুমি। এ ধরণের মানুষ কখনো কাউকে হত্যা করতে পারেন না। আমি তাকে চিনি বলেই, জন্মভূমি সামোস ছেড়ে কেবল তাঁর দর্শন শেখার জন্য ক্রোটন এসেছি।" এক টানে বলতে থাকে ফিলোক্রেটস, একটু উষ্ণ তার গলা।
খানিক পর আর্দ্র হয় যুবকের কণ্ঠ। "অবশ্য তা না হলে তোমাকেও পাওয়া হতো না," অ্যাডোনিয়ার কাঁধে দু'হাত রেখে আলতো করে তার কপোল ঘষে দেয় ফিলোক্রেটস। সোনালি অলকগুচ্ছ নড়ে উঠে মেয়েটির, ভূমধ্যসাগরের গাঢ় নীল জলরাশির মতো চোখ মেলে গভীর ভালোবাসা আর মায়ায় গণিতপাগল স্বামীর দিকে চেয়ে থাকে সে।

[২]
এর এক বছর আগের কথা।

চমৎকার করে কেটে, মসৃণভাবে লেপে দেয়া অর্ধবৃত্তাকার মাটির ঢিবি— সেমিসার্কেল (semicircle)। ব্যাস লাইন বরাবর ঝুলছে ভারী পর্দা। অর্ধবৃত্তের ধার ঘেঁষে ইতোমধ্যেই সমবেত হয়েছে অনেক তরুণ-তরুণী, ভ্রাতৃগোষ্ঠির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শাখা ম্যাথমেটিকোই (Mathematici)'র অন্তর্ভুক্ত তারা, অর্জন করেছে স্বচক্ষে গুরুকে দেখা ও তাঁর ভাষণ শোনার বিরল কৃতিত্ব। এর আগে তারা ছিল ভ্রাতৃগোষ্ঠির আরেকটি শাখা অ্যাকৌজমেটিকোই (Acusmatici)'র সদস্য, তিন বছর তীব্র কৌতূহলে শুধু গুরুর ভাষণই শুনে গিয়েছিল, পর্দার আড়ালের মানুষটি দেখতে পায়নি কখনো, কারণ তার জন্য আগে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।

গভীর উদ্দীপনায় অপেক্ষা করছে ম্যাথমেটিকোইয়ের সদস্যগণ, দিনের পর দিন তারা এভাবেই অপেক্ষা করে আসছে গুরুর আগমনক্ষণটিতে। আজকে কী নিয়ে কথা বলবেন গুরু ভাবতে থাকে তারা, আর পরিকল্পনা করে আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে কীভাবে নিজেদের যোগ্যতা মেলে ধরবে।

বাজনা বেজে উঠে অর্ধবৃত্তের অভ্যন্তরে, শোনা যায় জনপ্রিয় গ্রিসীয় সঙ্গীত, পর্দা সরে যায় দু'পাশে। সাদা আলখেল্লা পরিহিত, পায়ে সোনালি পাদুকা, আর মাথায় গ্রিসীয় ফুলের মুকুট, জলপাইয়ের পাতা গোঁজা তাতে, রাজকীয় মহিমায় প্রবেশ করেন সৌম্য চেহারা মানুষটি—পীথাগোরাস, সেমিসার্কেলের শিক্ষক, ভ্রাতৃগোষ্ঠির প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনের প্রচারক।

(ক্রমশ...)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29131800 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29131800 2010-04-09 16:57:30
গণিতের পঞ্চ কৌতুক (২)

১। হিমালয় আরোহণ করছে একদল গণিতবিদ। কিন্তু অভিযানের কয়েক ঘন্টা পরই দিক হারিয়ে ফেলল তারা। চারদিকে কেবল তুষারশুভ্র পর্বত আর পর্বত, ঠিক কোথায় তাদের অবস্থান কেউ বের করতে পারল না।

অভিযানে আনা মানচিত্রটি বের করে গভীরভাবে সেটি পর্যবেক্ষণ করল একজন গণিতবিদ। তারপর তাকাল সে চারপাশের ভূমিরূপের দিকে। সবশেষে কম্পাস বের করে সূর্যের অবস্থান দেখে বেশ কিছু হিসেব-নিকেশ করল।

"দেখ, দেখ!" উল্লাসে চিৎকার করে উঠল গণিতবিদ।
"কী হয়েছে, কী!" তীব্র কৌতূহলে অন্যেরা ঘিরে ধরল তাকে।
"ঐ যে দূরের পর্বত চুড়াটা দেখতে পাচ্ছ..." গণিতবিদ বলল।
"হ্যাঁ, হ্যাঁ।" একসাথে উত্তর করে সবাই।
"এই যে মানচিত্র দেখ। মানচিত্র বলছে আমরা এখন তার উপরই দাঁড়িয়ে আছি।" <img src=" style="border:0;" />

২। ছোট বুশের শাসনামল। বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনা চলছে আমেরিকান সিনেটে।
"ইরাকের উম্মুল কসর বন্দরে গতরাতে ভয়ানক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে, মি. প্রেসিডেন্ট। তিন ব্রাজিলিয়ান সৈন্য নিহত হয়েছে এতে।" ডোনাল্ড রামসফিল্ড রিপোর্ট পেশ করল।

"ওহ্‌, কী ভয়ঙ্কর, কী ভয়ঙ্কর!" দু'হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে বুশ। টেবিলে কনুই রেখে ঝুঁকে থাকে কিছুক্ষণ।

খানিক নিরবতার পর টেবিল থেকে মাথা তুলে বুশ, প্রশ্ন করে, "আচ্ছা, ডোনাল্ড, কত জন মিলে এক ব্রাজিলয়ান হয়?" <img src=" style="border:0;" />

৩। স্নায়ু যুদ্ধের সময়কার কথা, একাডেমিক জগতেও পড়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। রাশিয়ার এক গণিতবিদ ইউএসএ থেকে আমন্ত্রণ পেলেন গণিতের উপর বক্তৃতা দিতে। অনেক কষ্টে ভিসা ম্যানেজ করে, ইমিগ্রেশন অফিসারদের নানান যন্ত্রণা জেরা পেরিয়ে, এমনকি ট্যাক্সিচালকদের খোঁচা সহ্য করে সেমিনারে পৌঁছলেন তিনি।

তার সিরিয়াল আসলে বোর্ডে একটি সূত্র লিখে আলোচনা শুরু করলেন গণিতবিদ। যখন তা প্রমাণ করতে গেলেন তিনি, হলভর্তি আমেরিকান দর্শক ব্যঙ্গ করতে লাগল, এ তো একেবারে জলের মতো ক্লিয়ার, প্রমাণ করার কী আছে!

স্বাভাবিকভাবেই বিরক্ত হলেন গণিতবিদ, কিন্তু তা চেপে রেখে আরেকটি সূত্র ধরে আলোচনা চালিয়ে যেতে লাগলেন তিনি। যখন দ্বিতীয় সূত্রটির প্রমাণের উপরও আলোকপাত করতে গেলেন, হলভর্তি দর্শক আবার আগের মতোই শুরু করল, "হি হি, প্রমাণের কী আছে এতে? এ তো জানাই কথা!"

থমথমে কঠোর মুখে তৃতীয় সূত্রটি লিখেন গণিতবিদ। "নিশ্চয়ই বলবেন না, এটিও একেবারে জলের মতো স্পষ্ট ও সোজা?" দর্শকদের দিকে প্রত্যাশা নিয়ে তাকালেন তিনি।
"হা হা হা। তা নয়তো কী? এ-তো আমরা সবাই জানি, একেবারে দিবালোকের মতো পরিষ্কার।"
কাষ্ঠহাসি হেসে গণিতবিদ বললেন, "না, দিবালোকের মতো পরিষ্কার নয়, এবার সূত্রটা ভুল লিখেছি আমি, হে হে!" <img src=" style="border:0;" />

৪। খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে বুয়েটে কন্ট্রোল এঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো কর্নেলের সাথে নিশ্চয়ই পরিচয় হয়েছে পাঠকদের।

তো সেই কর্নেল একদিন তার গাড়ির পরিবর্তে একেবারে ট্যাংক নিয়ে হাজির হলেন বুয়েটে, থামলেন ক্যাফেটেরিয়ার সামনে কড়াই গাছের নিচে। বিপদ হবে না নিশ্চিত হয়ে শিক্ষার্থীরা গেল ট্যাংক দেখতে।
"দেখতে পাচ্ছ ট্যাংকটি? সর্বাধুনিক কম্পিউটর প্রযুক্তিসম্পন্ন এটি, সমরকৌশলের চরম উৎকর্ষ বলা যায় একে!" গর্বে কর্নেলের গলা ফুটে উঠে।
"কম্পিউটরের স্পিড কতো, স্যার?" জানতে চায় একজন শিক্ষাথী।
"কেন? ট্যাংকের যা স্পিড, কম্পিউটরেরও তা, এ তো জানাই কথা।" <img src=" style="border:0;" />

৫। গণিতের এক প্রফেসরের বাসার রান্নাঘরের বেসিনটি নষ্ট হয়ে গেছে। সারানোর জন্য একজন পানির মিস্ত্রি ((plumber) ডাকলেন তিনি। পরদিন মিস্ত্রি এসে বেসিনের কয়েকটি স্ক্রু ঠিক করে দিল, সাথে সাথে বেসিনও ঠিক হয়ে গেল। খুব খুশি হলেন প্রফেসর, কিন্তু মিস্ত্রি যখন মজুরি বিল ধরিয়ে দিল, চোখ একেবারে ছানাবড়া হয়ে গেল তার।
"এ তো আমার এক মাসের বেতনের তিন ভাগের এক ভাগ! দুই মিনিটের একটা কাজের জন্য এত বেশি!" গজগজ করতে লাগলেন প্রফেসর।
"আমি আপনাকে বেশি চার্জ করিনি, বাজারে বর্তমানে এ-ই রেট।" মিস্ত্রি বলল।

দুঃখ চেপে টাকা শোধ করে দিলেন প্রফেসর । মিস্ত্রি তখন সান্ত্বনা দিয়ে বলল, "প্রফেসর হিসেবে আপনার অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি। তা, আপনি কেন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়ে আমাদের কোম্পানিতে জয়েন করেন না? তিন গুণ রোজগার হবে আপনার। তবে আপনি যখন আবেদন করবেন, তাদের বলবেন আপনার পড়াশোনা ক্লাস সেভেন পর্যন্ত মাত্র। তারা কিন্তু আবার শিক্ষিত লোক পছন্দ করে না।"

বাস্তবে সেরকমই হলো। কল সারানোর মিস্ত্রি হিসেবে কাজ পেলেন প্রফেসর, অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ ভালো হলো তার। মাঝেমাঝে কেবল একটি দু'টি স্ক্রু ঠিক করা, মোটামুটি এটুকুই কাজ, কিন্তু বেতন বাড়তে লাগল।

একদিন কোম্পানির বোর্ড ঠিক করল কাজে দক্ষতার জন্য সকল মিস্ত্রিকে নৈশ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে অষ্টম শ্রেণী পাস করতে হবে। প্রফেসরকেও যেতে হলো।

ঘটনাক্রমে প্রথম দিনেই গণিতের ক্লাস। নৈশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জ্ঞান পরীক্ষা করার জন্য তাদের বৃত্তের ক্ষেত্রফলের সূত্র জিজ্ঞাসা করলেন। প্রফেসরকেই ধরলেন প্রথমে।

ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে গিয়ে প্রফেসর বুঝতে পারলেন সূত্র ভুলে গেছেন তিনি। সূত্রটি নিয়ে ভাবতে লাগলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর ইন্টেগ্রেশান, ডিফারেন্সিয়েশান এবং উচ্চতর গণিতের আরো অন্যান্য প্রতীক ও সূত্রে ব্ল্যাকবোর্ড ভরে উঠল। একসময় বৃত্তের ক্ষেত্রফলের সূত্রটি বের করলেন তিনি, A = -πr^2। কিন্তু ক্ষেত্রফলে নেগেটিভ চিহ্ন পছন্দ হলো না তার। তাই সব মুছে আবার প্রথম থেকে শুরু করলেন, আবারও সূত্র আসলো A = -πr^2।

খুব হতাশ হয়ে গেলেন প্রফেসর। ভয়ার্ত চোখে ক্লাসের দিকে তাকালেন তিনি, দেখলেন সবাই ফিসফিস করে তাকে বলছে, "আরে মিয়া, লিমিট দুইটা উল্টাইয়া দাও, উল্টাইয়া দাও।" <img src=" style="border:0;" />

ছবি: জনৈক চার্লি স্মিথের আইডিয়া সামু'র ইমো'র উপর খানিকটা প্রয়োগ করা হলো। আশা করি সামু কর্তৃপক্ষ -বদনে অবলোকন করবে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29123654 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29123654 2010-03-26 09:30:16
(বাংলা) শব্দ-রাজ্যে অভিযান (৩): মান্ধাতা ধুন্ধুমার
লোমশ সেই ক্ষণে এই উপাখ্যান ব্যক্ত করিলেন—
বহু, বহু বর্ষকাল পূর্বে, ইক্ষ্বাকু (Ikshvaku) বংশে রাজা ছিলেন যুবনাশ্ব (Yuvanashva), অনন্য পুণ্যাত্মা তিনি, সম্পন্ন করিয়াছিলেন এক সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞ, এবং আরো নানাবিধ যজ্ঞানুষ্ঠান, মহা আড়ম্বরে, প্রচুর দক্ষিণাসহকারে।

পরিতাপের বিষয়, রাজর্ষির ছিল না কোনো পুত্রসন্তান, তাই অমাত্যদিগের উপর রাজ্যভার অর্পণ করিয়া অরণ্যে গমন করিলেন তিনি এবং তথায় পুত্রকামনায় শাস্ত্রানুসন্ধান ও যোগবলসাধনায় নিমগ্ন হইলেন।

শাস্ত্রাচারে উপবাস করিয়া একদা নিশীথে ক্লিষ্ট হইয়া উঠিলেন রাজর্ষি। ক্ষুধার যন্ত্রণা তাঁহাকে দহন করিতে লাগিল, অন্তরাত্মায় তাঁহার অনুভূত হইল সুতীব্র তৃষ্ণা—চ্যবন মুনির আশ্রমে প্রবেশ করিলেন তিনি: তথায় যজ্ঞবেদীর উপর এক কুম্ভ জল রক্ষিত ছিল।

তৃষ্ণার্ত সম্রাট জল কামনা করিলেন, কিন্তু পক্ষীর ন্যায় ক্ষীণ তাঁহার কণ্ঠস্বর কাহারও কর্ণগোচর হইল না। অনন্তর স্বপ্রণোদনায় কুম্ভ উত্তোলন করিয়া জলপান করিলেন তিনি, অবশিষ্ট জল নিক্ষেপ করিলেন ভূতলে। চ্যবন ও অন্যান্য মুনিগণ নিদ্রোত্থিত হইয়া কুম্ভ জলশূন্য দেখিতে পাইলেন এবং উহার তত্ত্বানুসন্ধানে নিয়োজিত হইলেন; যুবনাশ্ব অগ্রসর হইয়া সত্য স্বীকার করিলেন।

"আপনি অনুচিত কার্য করিয়াছেন, হে রাজন্য!" চ্যবন বলিতে লাগিলেন। "আপনকার পুত্রোৎপত্তির নিমিত্তে মন্ত্রঃপূত তপোসিদ্ধ এই জল সংরক্ষিত হইয়াছিল, উহা আপনকার রাজ্ঞীর জন্য অভীষ্ট ছিল। তপোসাধনা ব্যর্থ হইবার নহে, এই ক্ষণে জলপান করিবার দরুন আপনিই পুত্র প্রসব করিবেন, কিন্তু গর্ভধারণের ক্লেশ যাহাতে আপনাকে আক্রান্ত না করে, আমরা সেই প্রয়াস পাইব।"

শতবর্ষ পূর্ণ হইলে যুবনাশ্বের বাম পার্শ ভেদ করিয়া সূর্যতুল্য এক তেজস্বী পুত্র নির্গত হইল, সুতীব্র দ্যুতিময় শিশু, কিন্তু যুবনাশ্বের মৃত্যু ঘটিল না; নিঃসন্দেহে ইহা অত্যাশ্চার্য এক কাণ্ড বটে!

মহাদ্যুতি শিশুর দর্শনাভিলাষে নক্ষত্রবাসীদিগের আগমন ঘটিল এবং উহারা এই বিস্ময় প্রকাশ করিতে লাগিলেন, শিশুর জন্য মাতৃস্তন্যের কী ব্যবস্থা হইবে!"

"মাং ধাস্যতি—আমাকে পান করিবে" বলিয়া ইন্দ্র, যিনি নির্ঘোষ করিয়া থাকেন বজ্র, তাহার মুখে তর্জনী প্রবেশ করাইয়া দিলেন; শিশু তাহা চোষণ করিয়া ব্যাপক বলশালী হইয়া উঠিল এবং ত্রয়োদশ হস্ত পর্যন্ত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল।

হে ভরতপুত্র, উক্ত দিবসেই আনীত হইল সেই ধনুক, বিশ্বজুড়ে অজগব নামে যাহার প্রসিদ্ধি, এবং শৃঙ্গনির্মিত শরও, এবং অভেদ্য বর্ম। স্বয়ং ইন্দ্র তাঁহাকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন; অনন্তর ত্রিভূবন জয় করিলেন তিনি, ন্যায়পথে, একদা ত্রিপদক্ষেপে যাহা সম্পাদন করিয়াছিলেন মহাত্মা বিষ্ণু। বিশ্বজুড়ে তাঁহার রথচক্র অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলমান হইল।

ইহাই সেই কাহিনী, যুবনাশ্বের পুত্র, সসাগরা সদ্বীপা রাজ্যের মার্তণ্ডপ্রতাপ রাজার উপাখ্যান, হে ধর্মপূত্র, মাং ধাস্যতি'র কারণে যাঁহার নাম হইয়াছিল মান্ধাতা। আর শত শত বর্ষ পূর্বেকার, সুপ্রাচীন তাঁহার শাসনকালকে আমরা অভিধা দিয়া থাকি মান্ধাতার আমল
_________________________________
ইক্ষ্বাকু: আখ-সম্পর্কীয়; প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক সভ্যতার ক্ষত্রিয়দের বিখ্যাত বংশ, সূর্যদেবের নামানুসারে যা সূর্যবংশ নামেও পরিচিত। এ বংশের প্রথম সম্রাট ইক্ষ্বাকু, যিনি তাঁর পিতা মনু'র ধর্মশাসন তথা "মনুস্মৃতি" বাস্তবায়ন করেন। দক্ষিণ-এশিয়ার পৌরাণিক কাহিনীতে আখ গাছ থেকে মানুষের উৎপত্তির যে কাহিনী, সেখান থেকেই ইক্ষ্বাকু বংশের নামকরণ বলে অনেকের অভিমত। ইক্ষ্বাকু বংশেরই পরবর্তী একটি প্রধান শাখা রঘুবংশে বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রামের জন্ম।

কুবলাশ্বর: মান্ধাতার পিতামহ কুবলাশ্বরের শাসনামলে মহাবল, মহাসুর এক দানব ব্যাপক ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। বালুকার মধ্যে নিদ্রিত উক্ত দানব বৎসরান্তে যখন নিঃশ্বাস ফেলত, অর্ধপক্ষকাল ভূমিকম্প সৃষ্টি হতো, স্ফুলিঙ্গ, অগ্নিশিখা ও ধূম্রজালে আচ্ছন্ন হয়ে যেত চতুর্দিক। মহাসুরকে বধ করার উদ্দেশ্য কুবলাশ্বর একদা তাঁর একুশ সহস্র পুত্র ও সৈন্য নিয়ে অভিযাত্রা করেন। বালুকাবেলায় ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং যোগবল ও ব্রহ্মাস্ত্রের সমন্বয়ে একসময় দানবকে হত্যা করতে সমর্থ হন কুবলাশ্বর। ধুন্ধু নামক এ দানব বধের কারণে কুবলাশ্বর ধুন্ধুমার নামে খ্যাতি লাভ করেন এবং তার অভিযান পরিচিত হয় "ধুন্ধুমার কাণ্ড" নামে।

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস রচিত মহাভারত অবলম্বনে]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29116448 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29116448 2010-03-14 23:46:58
(বাংলা) শব্দ-রাজ্যে অভিযান (২): অয়োময়
দিবি ন কেতুরধি ধায়ি হর্যতো বিব্যচদ্বজ্রো হরিতো ন রংহ্যা। তুদদহিং হরিশিপ্রো য আয়সঃ সহস্রশোকা অভবদ্ধরিম্ভরঃ।।
"আকাশে সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল কিরণ স্থাপিত হলো, সে যেন আপন বেগে সমস্ত দিক পরিব্যাপ্ত করল। সুগঠন হনুবিশিষ্ট সোমরস পানকারী ইন্দ্র অয়োময় বজ্র দ্বারা বৃত্রকে নিধন করার কালে অপরিসীম দীপ্তি প্রাপ্ত হলেন।"
—ঋগ্বেদ সংহিতা, মণ্ডল ১০, সূক্ত ৯৬, ঋক্‌ ৪

আর্যদের ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদ সংহিতায় সর্বাধিক উল্লেখিত ধাতুটি হচ্ছে সুবর্ণ; এরপরই আসে রহস্যময় ধাতু অয়সের নাম, বেশ অনেকবার, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে, কিন্তু দ্ব্যর্থহীন কোনো নিদর্শন ছাড়াই যাতে বোঝা যেতে পারত সেটি কী ছিল।

অয়স কখনো এসেছে দেবরাজ ইন্দ্রের বজ্রের কঠোরতায়, কখনো বা সোমরস পানে হৃষ্ট ইন্দ্রের নিজেরই অয়োবর্ম পরিহিত রূপে। এসেছে এটি সেসব দুর্গের উপাদানে যা নির্মাণে যা করত দস্যুরা, দৃশ্যগোচর হয়েছে তা ইন্দ্র ও সোমের অয়োনির্মিত বাসগৃহে। এমনকি মিত্র ও বরণেরও ছিল অয়োস্তম্ভবিশিষ্ট রথ, অগ্নি ও মারুতের ছিল অয়োময় দন্তরাজি, অশ্ব ও সূর্যের ছিল হিরণসুদৃঢ় অয়োহনু

উরুর বর্ণনায় ছিল অয়সের কথা, ছিল তা যজ্ঞাশ্বের পদ-নির্দেশক হিসেবে, চঞ্চু, তরবারি, সুঁচালো ডগা, শর, পরশু, কুম্ভ কিংবা ছোরার ধাতব উপাদানে।

কিন্তু এসব বর্ণনা থেকে সুনির্দিষ্টভাবে পরিস্ফূট হয় না অয়সের মানে। এটি হতে পারে তাম্র, ব্রোঞ্জ বা লৌহ, কিংবা তিনটেই। যজ্ঞাশ্বের পদ যদি নির্দেশ করে তার নাল, তাহলে অয়সের পক্ষে লৌহ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, কারণ অশ্বের নাল সচরাচর হয়ে থাকে লৌহনির্মিত। কিন্তু সমস্যা বাঁধে আমরা যখন দৃষ্টিপাত করি ইন্দ্রের কঠোর বজ্রের দিকে, যা স্বর্ণাভ সুবর্ণদীপ্ত, এবং ইন্দ্রের হস্তে হরিদবর্ণীয়। আর অস্তগামী সূর্যের কিরণে দীপ্ত, অগ্নি ও মারুতের রথের যে অয়োস্তম্ভ, তা নিশ্চয়ই ছিল লোহিত বর্ণের, এবং এর ফলে অয়স হয়ে থাকবে লোহিতুষ্ণ কোনো ধাতু, সন্দেহাতীতভাবে লৌহ নয়। এছাড়া শর, পরশু, কুম্ভ সবই নির্মিত হতে পারে তামা, ব্রোঞ্জ বা লৌহ থেকে।

তবে ঋগ্বেদ পরবর্তী দুটো গ্রন্থ, অথর্ব বেদ এবং যজুর বেদে অয়সকে কৃষ্ণ অয়ো এবং লোহিত অয়ো'তে বিভক্ত করা নিঃসন্দেহে কৌতূহলোদ্দীপক; এতে প্রতীয়মান হয় অয়স বিভিন্ন ধাতুর একটি সাধারণ পরিচায়ক নাম, কেবলমাত্র লৌহ নয়।

সংস্কৃতের অয়স কখন, কীভাবে বাংলায় লৌহ হয়ে উঠল, সে ব্যাপারে হয়তো চলবে আরো অনুসন্ধান এবং বিতর্ক! তবে ঋগ্বেদের অয়স দ্ব্যর্থহীনভাবে কোনোদিন লৌহ প্রমাণিত হলে, উপমহাদেশের ইতিহাস সন্দেহাতীতভাবে নতুন করে লিখতে হবে—শব্দের ইতিহাস থেকে সে এক রোমাঞ্চকর, বিতর্কিত মানব ইতিহাসের কথা!

অয়স থেকে উদ্ভূত কিছু শব্দ
অয়স: লৌহ
অয়স্কঠিন: লৌহদৃঢ়
অয়স্কর্ষণী: চৌম্বকীয়, চুম্বকীয় শক্তি
অয়স্কংস, অয়স্কুম্ভ: লৌহপাত্র, বাত্যাচুল্লি
অয়স্কান্ত: চুম্বক
অয়স্কার: লৌহকার, কর্মকার
অয়স্কুশা: আংশিক লৌহময় রজ্জু
অয়স্ক্বতি: চিকিৎসশাস্ত্রে লৌহের প্রয়োগ
অয়স্তাপ: লৌহ উত্তপ্তকারী

অয়োকায়: লৌহশরীর বিশিষ্ট
অয়োঘন: লোহার মুগুড়; হাতুড়ি
অয়োদংষ্ট্রা: লৌহদন্তের অধিকারী
অয়োময়: লৌহনির্মিত, লৌহের ন্যায় কঠোর
অয়োমল: মরিচা
অয়োমুখ: যে শরের মুখ বা ডগা লোহার তৈরী
অয়োহনু: লৌহচোয়াল

তথ্যসূত্র:
১। http://en.wikipedia.org/wiki/Rigveda
২। Iron in Early Indian Literature, by Dilip K Chakrabarti
৩। A Sanskrit-English dictionary: etymological and philologically arranged, by Monier Monier-Williams, Ernst Leumann, Carl Cappe]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29112852 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29112852 2010-03-09 02:42:17
(গল্প) জীবন ও জলুস্তির চক্র নতুন ঘর লেপার জন্য সারা সকাল মাটির ঢেলা ভেঙে আর দুপুরে খড়ের গাদা তৈরি করে অবসন্ন হয়ে উঠল ছমিরণের শরীর। কুটকুট করা শরীর নিয়ে গা ধুতে গেল সে।

চৈত্রের কাঠফাঁটা দুপর শেষে ক্লান্ত, বিষণ্ণ অপরাহ্ন, তপ্ত হাওয়ার হলকা বইছে মৃদু। এখনও উষ্ণ ছোট্ট নদীটির গা, অবশ্য ডুব দিয়ে একটু গভীরে গেলেই শীতল। আহ্‌, জলের কী স্নিগ্ধতা! ছমিরণ বিবি শিশুর মতো মেতে উঠল ডুব খেলায়।

নীল আকাশে চক্কর দিচ্ছে লালরঙা চিলের দল, তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটোছুটি করছে সাদা মেঘ। মাঝেমাঝে সূর্যের একেবারে সামনে এসে পড়ে মেঘেরা, রৌদ্র সরে গিয়ে তখন বেরিয়ে আসে তাদের ছায়া, সরসর করে বোরো ধানের ক্ষেতের উপর দিয়ে, সাদা কাশফুল পেরিয়ে, নদীর আরো গভীরে চলে যায়; এক সময় হারিয়েও যায়। বেশ চলছে এই মেঘ, রৌদ্র-ছায়ার খেলা।

ডুব-সাঁতার দিতে দিতে আর রৌদ্র-ছায়ার খেলা দেখতে দেখতে মাঠের মধ্যে বিশাল বটগাছটির উপর হঠাৎ চোখ পড়ে ছমিরণের, তার পাশ ঘেঁষে দৃষ্টি সরে যায় আরো দূরে, ঈষাণ কোণে। আকাশের গায়ে ঝুলছে এক টুকরো সিঁদুরে মেঘ, বছরের প্রথম জলুস্তি কোনো সন্দেহ নেই।

"নাপিত বাড়ির বৈশাখি মেলার আগে, চোখ রাখবা বট গাছের ফাঁকে," মুরুব্বিদের কথা মনে পড়ে যায় ছমিরণের; আশঙ্কায় কেঁপে উঠে তার বুক। বড় খারাপ জিনিস এই জলুস্তি, লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায় সব, মানুষও মারা পড়ে। জলুস্তির পরেও সময় খুব খারাপ। শিলাবৃষ্টি নষ্ট করে যায় ফসল; কফাত লাগে দেশে। কয়েক বছর আগে কফাতে কত মানুষই না মরল না খেয়ে!

সিঁদুরে মেঘটি কালচে বর্ণ ধারণ করে ধেয়ে আসে দ্রুত, অসম্ভব ক্ষীপ্রতায় জল থেকে উঠে পড়ে ছমিরণ। টিনের চালে লাল মরিচ আর উঠোনভর্তি ধান রেখে এসেছে সে, এক ফোঁটা বৃষ্টি লাগলে নষ্ট হয়ে যাবে সব, না খেয়েই থাকতে হবে নতুন বছর। অসহায় ভয়ে পাগলের মতো বাড়ির দিকে ছুটে ছমিরণ, বেশ অনেকটা দূরেই তার বাড়ি।

বাতাস পড়ে যায় হঠাৎ, ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়ে উঠতে থাকে চারপাশ। ভয়ঙ্কর এক লালিমা ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমাকাশে। ছোট ছোট বানকুড়ালি সৃষ্টি হয় গাঁয়ের সড়কে, ধুলোবালি, খড়কুটো, গাছের পাতা পাক খেয়ে খেয়ে উপরে উঠতে থাকে। দৌড়ে এসে বানকুড়ালির ভেতর ঢুকে পড়ে এক দল বালক, পরস্পরকে খোঁচাতে খোঁচাতে হেসে উঠে তারা।

"অই হার্মাদের পুতেরা, বাড়িত যা তাড়াতাড়ি। জলুস্তি আইতাছে মিসমার কইরা!" পাশ দিয়ে যাবার সময় চিৎকার করে তাদের সাবধান করে ছমিরণ। হার্মাদের পুত্রদের অবশ্য জলুস্তির আগমন সংবাদে চিন্তিত হতে দেখা যায় না। বানকুড়ালিটা সড়ক থেকে নেমে পড়ে জমিতে, বানকুড়ালির পেছন পেছন ছুটে যায় তারা।

ছমিরণ যখন বাড়ি ফিরল, অদ্ভুত, ঘোর-লাগা ঘোলাটে আলোয় ভরে গেছে চারপাশ। বাঁশঝাড়ের মাথায় সাদা বক উড়তে থাকে। নিরাক-পড়া চারপাশের ভেতর থেকে একেবারে হঠাৎই শুরু হয়ে গেল লাগামহীন বাতাসের শোঁ শোঁ গর্জন। অনেক বড় জলুস্তি হবে এবার!

"কৈ গো বউ, কৈ গেলা? তাড়াতাড়ি ধান মরিচ তোল, জলুস্তি আইতাছে।" এলোমেলো চুলে লুটিয়ে পড়া আঁচলে ঘরের ভেতর লাফ দিয়ে ঢুকে পড়ে ছমিরণ।

ঘর লেপা শেষ করে তখন কেবল খেতে বসেছে নতুন বউটি, শাশুড়ির ডাকে ত্রস্ত হয়ে উঠল সে। ভাতের থালায় চোখ পড়ে ছমিরণের, দপ করে জ্বলে উঠে তার চোখ, "নবাবের বেটি, দ্যাহস না, জলুস্তি আইছে?" হিংস্রতর হয়ে উঠে ছমিরণের চোখ, উঁচু হয় তার গলা, "সব ভিজ্যা গেলে কী খাবি, কোন বাপ খাওয়াবে তোর, ছিনাল বেটি?"

আরো জড়োসড়ো হয়ে উঠে নতুন বউ, বুঝে উঠতে পারে না কী করবে সে। টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল মনে হয়। ছোঁ মেরে ভাতের থালাটা কেড়ে নেয় ছমিরণ, ছিটকে মাটিতে পড়ে বেশ কিছু ভাত। বউয়ের চুল ধরে উঠানের দিকে হিড়হিড় করে তাকে টানে ছমিরণ, ঘরের চৌকাঠে লেগে কেটে যায় তার কপাল। ছড়িয়ে পড়া ভাতগুলোতে একপাল মুরগি এসে জুটে।

আঁচলে এঁটো হাত মুছে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে বউটি। কাজ করতে পারে সে অমানুষিক, কিন্তু ক্ষুধা-তৃষ্ণাও তীব্র তার। প্রথম বার যখন সে এ বাড়িতে আসে, মা বারবার বলে দিয়েছিলেন কম কথা বলতে আর কম খেতে—একজন ভালো বউয়ের এগুলোই হচ্ছে আসল গুণ। ভালো বউ হওয়ার চেষ্টা অবশ্য করেই যাচ্ছে সে, কথা বলে খুব কম। কিন্তু ক্ষিধেটা তেমন সামাল দিতে পারে না, মাঝেমাঝে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে সেটি। ব্যাপারটি তাকে খুব লজ্জিতও করে, বিশেষ করে শাশুড়ি যখন পড়শিদের কাছে তা বলে বেড়ায়।

উঠোন থেকে ধান আর মরিচ তুলে ঘরের কোণে ছুঁড়ে দিতে দিতে দ্রুতই ক্ষুধার কষ্টটি ভুলে যেতে পারে নতুন বউ, কারণ চৌকাটে লেগে কেটে যাওয়া কপালের ব্যথাটি তার তীব্রতর হয়ে উঠেছে ততক্ষণে। কোনোমতে জিনিসগুলো ঘরের কোণে রাখা শেষ হতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে, চমকায় বিদ্যুত, আর ভয়ঙ্কর শব্দে বাজ পড়ে। দমকা হাওয়া প্রবল আক্রোশে গাছপালা উপড়ে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা ভেঙে ভেঙে সাদা ফেনার মতো ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। অঝোর সেই বৃষ্টির ধারায় কপালের ব্যাথাটিও দ্রুত ভুলে যায় নতুন বউ, কারণ দু'চোখ বেয়ে তার নেমে এসেছে লোনা জলের ধারা; ধীরে ধীরে কাদামাটিতে মিশে হারিয়ে যায় সে ধারা।

২.
১৯ বছর পর।

নতুন বউ পুরাতন হয়েছে বেশ। জলুস্তির পরের বছরই পুত্র সন্তানের মা হয়েছিল সে, তার পরের বছর, তারও পরের বছর। বাড়িটিতে ধীরে ধীরে জোরালো হয়ে উঠে বউটির গলা, আর সেসাথে ম্রিয়মাণ হচ্ছিল ছমিরণের গলা। হাঁপানিতে ভুগে ভুগে ক্ষীণতর গলায় তিন বছর আগে মারা যায় ছমিরণ, মরার আগে জবান একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার। বেশ ক'বছর ধরেই বাড়ির সর্বময় কর্ত্রী এখন পুরাতন বউ।

উনিশ বছর পর বৈশাখ মাসের প্রথম দিকে পড়ন্ত এক বিকেলে কাজ শেষে গা ধুতে যায় পুরাতন বউ, রৌদ্র-ছায়ার খেলা নদীতীরে। ঈষাণ কোণে চোখ পড়তেই সিঁদুরে মেঘটি দেখতে পায় সে। জলুস্তি, কোনো সন্দেহ নেই! নদী থেকে দ্রুত উঠে পড়ে পাগলের মতো বাড়ির দিকে ছুটে পুরাতন বউ, মরিচ আর মসুর পড়ে আছে উঠানে।

"জলুস্তি আইতাছে, জলুস্তি, মিসমার কইরা।" চিৎকার করতে করতে বাড়িতে প্রবেশ করে পুরাতন বউ, নতুন বউটা তার সদ্য খেতে বসেছে তখন। শাশুড়ির চিৎকারে ভয়ে ভয়ে তাকায় সে, আঁচলে দ্রুত হাত মুছে উঠে পড়ে সে।

আলোর ঝলকানিতে ভরে যায় চারপাশ, প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ে। বাজের শব্দ ছাপিয়েও শোনা যায় পুরাতন বউয়ের ক্রুদ্ধ গলা, "উঠবা না বউ, উঠবা না। ভিজ্জা গেলে যাউক সব। আইজকা মানুষ খাইতে না পারলে, কাইলকার জন্য কষ্ট কইরা কী লাভ? আমি একাই পারমু উঠাইতে, তুমি খাওয়া শেষ কর।" প্রবল আক্রোশে উঠানের মরিচ আর মসুর ঘরের কোণে ছুড়ে দিতে থাকে পুরাতন বউ। কীসের উপর আক্রোশ তার কে জানে!

উৎসর্গ:
ব্লগার ভাঙ্গন (http://www.somewhereinblog.net/blog/msd86)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29101395 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29101395 2010-02-20 03:14:05
(গল্প) অমীমাংসিত আপেল "কঙ্কার বাপ, এই কেইলডা বন্ধ কইরা নতুন কেইল ছাইড়া দিয়া আয়, ভাই।"
মুলিবাঁশের টানা কলের ভেতরে পিস্টন টানতে টানতে কুঁজো শরীরটাকে সোজা করার চেষ্টা করতে করতে বলেন সোনাতন বানু। বাঁশের কলে যথেষ্ঠ জোরালো নয় বায়ুর চাপ, আজকাল তাই দ্রুতই কুঁজো হয়ে উঠছেন তিনি। পাওয়ার পাম্প কিংবা নিদেনপক্ষে প্লাস্টিকের টানা কলের টাকা থাকলে আরো কিছুদিন ঋজু থাকত তার শরীর।

চোখ জুড়ানো সবুজ মরিচ ক্ষেত, বেশ অনেকগুলি সারিতে ভাগ করা, যাকে বলা হয় কেইল। প্রতিটি কেইলের দু'ভাগ খানিকটা উঁচু যাতে সেঁচের পানি কেইলের ভেতর আবদ্ধ থাকে। কেইলগুলির একদিকের ধার বরাবর তৈরি করা হয়েছে ছোট্ট নালা, কল থেকে পড়ে সেটি ধরে অগ্রসর হয় পানির প্রবাহ। নালার এক কোণে কল, টানছেন সোনাতন বানু, আর কঙ্কার বাপের কাজ হচ্ছে মরিচ ক্ষেতে দাঁড়িয়ে কেইলের মধ্যে পানির অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা। কেইলের শেষ প্রান্তে পানি পৌঁছার খানিকটা আগেই কেইল বন্ধ করে নতুন কেইলের মুখ খুলে দিতে হবে তাকে। সূক্ষ্মভাবে কাজটি করার অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যেই অর্জন করেছে পাঁচ বছরের কঙ্কার বাপ, এমনভাবে কেইল বন্ধ করে সে যাতে পুরো কেইলই পানি পায়, কিন্তু পাশের জমিতে গড়িয়ে পড়ে না পানি।

ঘাসফড়িঙের পেছনে ছুটতে ছুটতে ভুট্টা ক্ষেতে ঢুকে পড়েছিল কঙ্কার বাপ। দাদীর ডাক শুনে যেই না ফিরে আসবে, শুনতে পেল লঞ্চের ভেঁপু; গঞ্জের লঞ্চ ভিড়েছে মেঘনার ঘাটে। কেইলের কথা ভুলে তুফানবেগে ভোঁ দৌঁড় দিল কঙ্কার বাপ, এ লঞ্চেই তার কাকা ফরিদ আসবে আজ। ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করে ফরিদ, তার জন্য নতুন জামা আর রঙিন চশমা আনবে। কালকে রোজার ঈদ।

একে একে লঞ্চ থেকে নামে যাত্রীরা। শেষ যাত্রী হিসেবে রঙবেরঙের আংটি ও ঘড়ি হাতে, গলায় চেইন পড়া, বাবরি চুলের সিটার [প্রতারক] কফিলও নেমে পড়ে লঞ্চ থেকে, কিন্তু ফরিদের কোনো চিহ্ন দেখা যায় না। লঞ্চটি ঘাট থেকে না ছাড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে কঙ্কার বাপ, তারপর হাঁটা ধরে মরিচ ক্ষেতের দিকে। গতি বেশ মন্থর তার, মাথাটা সামান্য ঝুঁকে আছে নিচের দিকে।

সোনাতন বিবি এদিকে পড়েছেন সমস্যায়। কঙ্কার বাপ চলে গেলে নিজেই কেইল বন্ধ করতে গিয়েছিলেন তিনি, ফলে নালার মধ্যে জলের প্রবাহ ক্ষীণ হয়ে গেছে। নতুন করে আবার বেগ বাড়াতে হবে জলের। কাজটি করতে গিয়ে টের পেলেন বাঁশের চোঙায় বায়ুর চাপও নষ্ট হয়ে গেছে, পানি উঠছে না আর। কঙ্কার বাপ কাছে এসে চোঙায় পানি ঢালতে লাগল অল্প করে, পিস্টন টানতে লাগলেন সোনাতন বিবি। বেশ অনেকক্ষণ পর আবার শুরু হলো প্রবাহ।

সোয়া ঘন্টা পর আবারও ভেঁপু, কঙ্কার বাপের আবার দৌঁড়। এবার লঞ্চ থেকে নামল চৌধুরীদের সুন্দরী নতুন বউটি, অনেক মাল-সামানা তার, নামতে অনেকক্ষণ লাগল তার। না, এ লঞ্চেও আসেনি ফরিদ! বুক ঠেলে আসা কান্নার বেগ রুখতে ঠোঁট চেপে অনেক কষ্ট করতে হয় কঙ্কার বাপকে, বুকের উপর থুতনি ঝুলে পড়ে পাঁচ বছরের বালকটির।

এভাবেই কেটে যায় আরো কয়েক ঘন্টা। ম্লান অপরাহ্নে মরিচ ক্ষেতে পানি দেয়ার কাজ শেষ হয় যখন, শেষ লঞ্চটিও চলে গেছে ততোক্ষণে। পাশাপাশি বাড়ি ফিরতে থাকে দুই জন কুঁজো মানুষ, দুই প্রজন্মের। সূর্যের আলোয় তাদের কুঁজো ছায়া দীর্ঘতর হতে থাকে।

২.
গভীর রাত। সাদা কুয়াশার চাদর ঢেকে রেখেছে সারা গাঁ, শীত রয়ে গেছে এখনও। পাটখড়ির বেড়ার ফাঁক দিয়ে কনকনে হাওয়া ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর, নাড়িয়ে দিয়ে যায় ঘুমন্ত মানুষগুলির শরীর।

সোনাতন বিবির পাশে তার মেয়ে জমিলা। মাত্র কিছু দিন আগে বিয়ে হয়েছে তার, কিন্তু কুড়ি হাজার টাকার জন্য বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে জামাই। উচ্ছ্বল মেয়েটি আজকাল তেমন কথা বলে না কারো সাথে। কবে যে টাকা জোগাড় হবে, কবে আবার শ্বশুর বাড়িতে যেতে পারবে, কে জানে?

দমকা হাওয়া বয়। মানুষের মতো গোঙানির আওয়াজ আসে গরুর খোঁয়ার থেকে। লালী গাভীটার উরুতে পচন ধরেছে, চৌধুরীদের ক্ষেতের ধান খেয়ে ফেলায় শিকের খোঁচা খেয়েছিল সে। মরণ ঘনিয়ে এসেছে তার, সবাই জবাই করে ফেলার জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু বাধ সাধে সোনাতন বিবির বড় ছেলে রহিম। বোকাসোকা রহিম, হালচাষ করতে পাচন দিয়ে মারত যে গরুটিকে, তার জন্যই এখন রুখে দাঁড়িয়েছে সবার বিরুদ্ধে। বোবা প্রাণীর গোঙানির ফাঁকে ফাঁকে তারও কান্না ভেসে আসে বারান্দার ঘর থেকে।

রহিম মানুষটা অবশ্য বেশিই বোকাসোকা। তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করে সবাই, ঠাট্টা করে দু'বছর আগে তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া বউটিকে নিয়ে। বউটি এখন শহরে কাজ করে, সবাই বলে অনেক রঙঢং আর সুখে আছে সে। সোনাতন বিবি এ ঘরে তার একমাত্র নাতি, কঙ্কার বাপকে রেখে দিয়েছেন নিজের কাছে। সেটি অবশ্য অধিকতর ভালো হয়েছে বলা যায় না, কারণ পাঁচ বছরের বালককেও মা'কে নিয়ে শুনতে হয় নানা কথা। এবং আজকাল কিছু কিছু কথা সে বুঝতে পারে।

নিশুতি রাতে গোঙাতে থাকে একটি বোবা গরু এবং একজন বোকা মানুষ। রাতের গভীরতায় ক্রমাগত দীর্ঘতর হয় তাদের গোঙানির আওয়াজ।

৩.
দুঃখ-কষ্টের অনুভূতি আজকাল আর তেমন তীক্ষ্ণ নয় সোনাতন বিবির। গরীব মানুষদের জন্য এটি অবশ্য চমৎকার একটি ব্যাপার, কারণ আনন্দিত না হতে পারলেও এতে কম দুঃখী হয় তারা। শুধু কষ্ট খানিক তীব্র হয় যখন, সোনাতন বিবির মনে পড়ে তার পাগল স্বামীর কথা, দেড় যুগ আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি। কোথায় আছে মানুষটি, কেমন আছে? বেঁচে আছেন কি? কত উড়ো খবর আসে, আর পাগলের মতো ছুটেন সোনাতন বিবি!

"মা, মা, কই তোমরা?" চমকে উঠে সোনাতন বিবি।
মুহূর্তে জেগে উঠে ঘুমন্ত বাড়িটি। চোখ কচলে ঘুম থেকে উঠে কঙ্কার বাপ, তার গালে কান্নার রেখা অনেকটা ম্লান এখন। ফরিদের চার বছরের মেয়ে মালাও জেগে উঠে। বাবার দিকে চেয়ে মিষ্টি হাসিতে হাত বাড়িয়ে দেয় সে, ঘুম কেটে গেছে তার।

শেষ রাতে প্রজাপতির ডানার মতো ফিনফিনে উত্তুরে হাওয়া বইতে থাকে। বাসন্তী উষ্ণতার আমেজ বাতাসে, আমের হলুদ বোলের মিষ্টি ঘ্রাণ। বোকা রহিমের গোঙানি থেমে যায়, চুপ করে লালী গাভিটিও। খানিক পর আবার নিস্তব্ধ হয় বাড়িটি।

রঙিন চশমা পরে ঘুমাতে যায় কঙ্কার বাপ, পাশে মালা। দু'জনের হাতে একটি করে লালচে আপেল, হাত দিয়ে চোখের সামনে নিজ নিজ আপেল ধরে পরীক্ষা করে তারা। কঙ্কার বাপের কপাল থেকে চশমাটি খুলে নেয় মালা, বসিয়ে দেয় নিজের চোখের উপর। হঠাৎই ভাইয়ের আপেলটিকে সুন্দর মনে হয় তার।
"এইটা নেও, ঐটা আমারে দেও।" আপেল বদল করতে জেদ ধরে মালা।
কঙ্কার বাপ অবশ্য এসব ক্ষেত্রে বোনকেই অগ্রাধিকার দেয়, সানন্দে বদল করে ফেলে। বদলি আপেলটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখে মালা, গভীর ভাবনায় মগ্ন হয়। কেন যেন আগের মতো আর সুন্দর লাগছে না আপেলটিকে। নিজের আপেলটিকে ফিরিয়ে নিতে গোঁ ধরে মালা, আবারও বদল হয় আপেল। কিছুক্ষণ পর মালা আবার হাত বাড়ায় ভাইয়ের আপেলটির দিকে।

গভীরতর হয় রাত, কিন্তু ছোট্ট দু'টি মানুষের মধ্যে আপেল দু'টির চূড়ান্ত কোনো মীমাংসা হয় না। একসময় বুকের কাছে আপেল রেখেই ঘুমিয়ে পড়ে তারা, ঘুমের ঘোরে মজার স্বপ্ন দেখে তারা, স্বপ্নে ডানাওয়ালা স্বর্গীয় দেবদূতের পিঠে চড়ে হাসতে থাকে তারা।

বাইরে ধূসর, অন্ধকার আকাশ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে দু'টি মানব শিশুর দিকে। কত অযুত-নিযুত বছর পেরিয়ে যায় মহাকালের পথে, তবু সাধারণ দু'টি আপেল নিয়ে ক্ষুদ্র দু'টি মানুষের এত আনন্দের রহস্য এখনও বুঝে উঠতে পারে না সুবিশাল আকাশ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29096078 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29096078 2010-02-12 18:39:28
গণিত বিষয়ক ফিকশান: পিঁপশঙ্কের রাজ্যাভিযান (পর্ব ২) Click This Link

[২]
তীব্র শৈত্য প্রবাহের রাত, ১৫ই জানুয়ারি ২০১০ মেঘনা-তিতাসের বাঁক, ফারিনের গ্রামের বাড়ি, ড্রয়িংরুম

রাতের খাবার শেষে ভারী পোশাক গায়ে চাপিয়ে সবাই বসে আছি। আমার পাশে ফারিন, তার পাশে ফারিনের বড় বোন জেরিন, আর ওপাশে তাদের মা। তীব্র শীতে কাবু হয়ে পড়া এক রাত। কাঠালিচাঁপার গন্ধে ভরে গেছে সারা বাড়ি। টিনের চালে টুপটাপ শিশিরের শব্দ, মাঝে মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে প্যাঁচার ডাকে। আর বাতাসের বেগ বেড়ে গেলে ভেসে আসছে কৈবর্ত পাড়ার কীর্তনের বিষণ্ণ সুর; সেই সাথে আরো দূরে, মিটমিট আলোতে মেঘনার বুকে ছলছল জেলে নৌকার ছৈয়ের ভেতর থেকে ভাটিয়ালী গানের শব্দ।

আমার হাতে চায়ের কাপ। ফারিনের হাতেও, যদিও মেয়ের চা খাওয়া তেমন পছন্দ করেন না তার মা। তবে মাঝে মাঝে নিয়ম শিথিল হয়, আজকে সেরকম একটি সময়। আজ থেকে বেশ ক'বছর আগে, জেরিনের জন্মের পর প্রথম বার তার মুখ দেখে হাসপাতালের বারান্দা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম আমার জীবনের শেষ সিগারেটের প্যাকেটটি। তার কিছু দিন পর শুরু হয় চায়ের ব্যাপারটি। না, একটি নেশাকে কাটানোর জন্য আরেকটি নেশার আশ্রয় নয়; সিগারেট কাটানোর জন্য জেরিনের কোমল মায়াবী মুখই যথেষ্ট ছিল। আমি আসলে সেসময় থেকে মাঝে মাঝে রাত জেগে লিখতে শুরু করেছিলাম।

"আচ্ছা, বাবা, ধরো তোমাকে বিশাল একটি গুহায় ফেলে দেয়া হলো। উঁচু-নিচু, এবড়ো-থেবড়ো গুহার দেয়াল, আর ভেতরটা মিশমিশে কালো, কোনো আলো নেই কোথাও।" হঠাৎ ফারিনের এ অদ্ভুত কথায় হাসতে শুরু করল সবাই। তীব্র শৈত্য প্রবাহের রাতে জনমানবহীন অন্ধকার গুহায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার কল্পনা উষ্ণ চায়ের পেয়ালা হাতেও সুখপ্রদ কোনো ব্যাপার নয়; আমি দ্রুত গুহার ভেতর থেকে বের হবার উপায় খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম আমার সমস্যাটি আসলে তার চেয়েও বড়।
"কীভাবে তুমি বুঝবে গুহাটা আকারে কত বড়?" ফারিনের প্রশ্ন এবার।
অন্ধকার গুহায় বসে তার ক্ষেত্রফল বের করার সূত্রটি নিঃসন্দেহে তার ভেতর থেকে বের হয়ে আসার উপায়টি থেকে অনেক বেশি জটিল। আমি মগ্ন হয়ে গেলাম চিন্তায়।

"আচ্ছা, আরেকটু সহজ করে দেই," ফারিন আশ্বস্ত করে আমাকে, "তুমি ইচ্ছে করলেই টিকটিকি বা তেলাপোকার মতো বুকে ভর দিয়ে গুহার দেয়ালের উপর চলতে পার। তবে তোমার সময় কিন্তু মাত্র দু'মিনিট।"
"একটা কাজ করা যায়," নিজেকে স্পাইডারম্যানের মতো খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললাম আমি, "দেয়ালের পরিসীমা হিসেব করে মোটামুটি ক্ষেত্রফলটি বের করা যায়। যত বেশি পরিসীমা, তত বেশি ক্ষেত্রফল।"
"ওহ, তাই!" একটু যেন দমে যাওয়া কণ্ঠ ফারিনের, হয়তো বা সমাধানটির এতটা পরিষ্কার সারল্য আশা করেনি সে। তবু পরীক্ষা করে নিশ্চিত হবার জন্য টেবিল থেকে পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে আসলো।

আর তখনই আমার মনে পড়ে গেল কী হাস্যকর ভুলটিই না করেছি আমি! "না, না, এভাবে হবে না," অনেকটা চিৎকার করে উঠলাম। "কারণ শুধু পরিসীমার মানের উপরই ক্ষেত্রফল নির্ভর করে না, পরিসীমাটির আকৃতি কীরূপ, আয়তকার, বৃত্তাকার, ডিম্বাকার, না অন্য কোনোরূপ, এটিও একটি বড় ব্যাপার। যেমন, নিচের চিত্রে, আয়তকার ক ও খ গুহার পরিসীমা প্রায় সমান, প্রত্যেকটি ৬ ইঞ্চির কাছাকাছি, কিন্তু ক-এর ক্ষেত্রফল, খ-এর ক্ষেত্রফলের দ্বিগুণ।



"এছাড়া গুহার ভেতর কোনো জায়গায় যদি খুব সরু, লম্বা ফাটল থাকে, তাহলে পরিসীমা অনেক বেড়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু সে অনুযায়ী ক্ষেত্রফল তেমন নাও বাড়তে পারে।"
"হ্যাঁ, বাবা, এভাবে হবে না।" ফারিনের গলার স্বরে খুশির পরিবর্তনটি সুস্পষ্ট।

এবার আমার মনে পড়ে গেল একাদশ শ্রেণীতে পড়া রসায়নের ক্লাসের কথা। স্পাইডারম্যান থেকে—না, রসায়নের ছাত্র নয়, বরং আবদ্ধ কোনো পাত্রে ছুটন্ত গ্যাসের অণু হয়ে গেলাম আমি, ক্রমাগত ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছি পাত্রের দেয়াল থেকে দেয়ালে। এক দেয়াল থেকে ধাক্কা খাবার পর গুণে যাচ্ছি কত কদম পর আবার আরেক দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছি। এভাবে অনেকক্ষণ ধরে একটি ধাক্কা ও তার পরবর্তী ধাক্কার মধ্যবর্তী দূরত্বের হিসেব রেখে একটি গড় দূরত্ব বের করা যায়, যার উপর ভিত্তি করে গড় মুক্ত-পথের সূত্র অনুযায়ী গুহার ক্ষেত্রফল বের করা যেতে পারে। গড় মুক্ত পথের দূরত্ব যত বেশি হবে, গুহার ক্ষেত্রফলও সে অনুযায়ী বেশি হতে থাকবে।

কাগজে বেলনাকৃতির জায়গায় একটি অণুর ছবি এঁকে সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম ফারিনকে।

বেশ মনোযোগ দিয়ে ছবিটি দেখার পর ফারিন বলল, "তার মানে এ পদ্ধতি কাজ করবে যখন গুহার দেয়ালের অভ্যন্তরটি বাঁধাহীন, মুক্ত হয়, তাই না?"
"হ্যাঁ, তাই।" সায় দিলাম আমি।
"কিন্তু, বাবা, মনে করো, গুহার মাঝ বরাবর খুব পাতলা একটা পর্দার মতো ঝুলিয়ে দেয়া হলো। পর্দার দু'পাশে একদম অল্প করে মাত্র জায়গা রাখা হলো যাতে তা গলে গুহার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে গুহার ক্ষেত্রফল তেমন কমলো না বললেই চলে, কিন্তু প্রাণীটি এখন আগের চেয়ে আরো তাড়াতাড়ি গুহার দেয়ালে ধাক্কা খেতে থাকবে, তাই না? আর তখন হিসেবেও ভুল হয়ে যাবে।"


মমতামাখা বিস্ময়ে আপ্লুত হলো আমার হৃদয়, একটু গর্ববোধও। আলতো করে নেড়ে দেই ফারিনের চুলগুলো। পৃথিবীতে আশাবাদী, সুখী হবার কতই না অসংখ্য অপার বিষয় রয়েছে আমাদের, এবং চারপাশে।

[প্রিয় পাঠকদের প্রতি:
প্রথম পর্বের সাড়ায় সবার প্রতি গভীর মুগ্ধতা, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। দুঃখিত, এ পর্বে শেষ করা গেল না। তবে শেষ পর্বের কাজ চলছে, সম্ভব হলে আজ রাতেই তা এসে যাবে।]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29083733 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29083733 2010-01-22 21:19:23
গণিত বিষয়ক ফিকশান: পিঁপশঙ্কের রাজ্যাভিযান (পর্ব ১)
[১]
শুনশান নীরব দুপুর, ১৫ ই জানুয়ারি ২০১০ মেঘনা-তিতাসের বাঁক, কাশবনের ধার, গ্রামের জংলা ঝোঁপ

প্রিইইই...
তীক্ষ্ণ চিৎকারে হঠাৎ ভেঙে পড়ে নীরবতা। ক্ষীণতর হয়ে গেল নদীর কুলকুল ধ্বনি, ঝরা পাতার মচমচ শব্দ, কাশবনের সরসর দোল। চমকে উঠে ফারিন, দ্রুত চোখ বোলায় চারপাশে। কিন্তু না, চোখে পড়ছে না কিছুই!

প্রিইইই..., এবার আরো জোরালো হলো শব্দ, আরো কাছ থেকে আসছে মনে হলো।
"এগুবে না, এগুবে না আর! দেখতে পাওনা, একেবারে গায়ের উপর এসে পড়লে যে!"

পায়ের দিকে এবার তাকায় ফারিন। দৃশ্য দেখে হাসি চেপে রাখতে পারে না কোনো মতেই: শুঁড় আর সামনের দু'টি পা উঁচু করে যুদ্ধংদেহী ভঙ্গিতে মুষ্ঠিযোদ্ধার মতো দাঁড়িয়ে একটি পিঁপড়া।

"ভয় পেয়ো না, আমি তোমাকে মারব না। সত্যি বলতে কী, পিঁপড়াদের খুবই ভালোবাসি আমি।" আশ্বাস দেয় ফারিন।
"আমার নাম পিঁপশঙ্ক—পিঁপ অশঙ্ক, মানে অদম্য সেই পিঁপড়া শঙ্কা জানে না যে। ভয় আমি পাইনি মোটেও, কিন্তু তোমরা যদি কাউকে ভালোই বাস, তাহলে তার সাথে কীভাবে উদ্ধত অবজ্ঞার আচরণ করো?"
"এর মানে কী, পিঁপশঙ্ক? অবাক হয় ফারিন।
"এই যে বললে পিঁপড়াদের ভালোবাস তুমি। তাহলে জমিনের উপর দিয়ে এভাবে সংবেদনহীন, অসতর্কভাবে কীভাবে হেঁটে যেত পার? আমি তোমাকে না দেখলে এবং চিৎকার না করলে তো পিষেই ফেলছিলে!" ক্ষোভে-মেশানো কণ্ঠ পিঁপের।
"আসলেই আমার ভুল হয়েছে, আর এরকম হবে না কখনো।" অনুতপ্ত গলায় জবাব দেয় ফারিন।
"আমার নাম ফারিন, আলোকিত ও অভিযানপ্রিয়। আমি তোমার বন্ধু, পিঁপ।" বলতে বলতে পিঁপশঙ্ককে হাতে তুলে নেয় সে।
হাসি ফুটে উঠে পিঁপের ঠোঁটের কোণ, শুঁড় বাড়িয়ে স্পর্শ করে ফারিনের হাতের তালু। "ধন্যবাদ তোমাকে।"

"তুমি কী করছিলে?" ফারিনের প্রশ্ন।
"আমি একজন অনুসন্ধানী পিঁপড়া, বেরিয়েছি আমার গোত্রের জন্য নতুন রাজ্য খুঁজতে।"
"নতুন রাজ্য কেন? আগের রাজ্য কি ধ্বংস হয়ে গেছে?"
"না, ধ্বংস হয়নি। ঐ যে, পাকুড় গাছটা দেখছ, তার পাশে আমাদের বর্তমান রাজ্য। কিন্তু আমাদের জন্যসংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে তো, শিশুদের ভালোভাবে বেড়ে উঠার জন্য নতুন, প্রশস্ত এলাকা দরকার।"
"ওখানেই নতুন বাসা বানিয়ে নাও না কেন তোমরা?"
"আমরা তোমাদের মতো অবিমৃষ্যকারী নই যে সবাই রাজধানীর দিকে ছুটব আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকব।" মানুষের বোকামির কথা ভেবে উষ্ণ হয় পিঁপের কণ্ঠ। "জনসংখ্যার সাথে আমাদের বাসস্থানের আকারের সুনির্দিষ্ট একটি আনুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে। জীবনের সুষ্ঠু বিকাশে অনুপাতটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাই কষ্ট হলেও প্রয়োজনে খোলামেলা রাজ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি আমরা। আমার মতো আরো অনেক স্কাউট বেরিয়েছে চারদিকে, তবে আশা করছি সবার আগে আমিই ভালো একটা জায়গার সন্ধান পেয়ে যাব।" হাসিতে উদ্ভাসিত হয় পিঁপের মুখ।

"কীভাবে রাজ্য খুঁজ তোমরা আমি দেখব।" অনুরোধ করে ফারিন।
"আচ্ছা, হাত থেকে নামিয়ে দাও আমাকে। তারপর আমার পেছন পেছন আস।"
হাতের তালু থেকে পিঁপশঙ্ককে নামিয়ে দিল ফারিন। এগিয়ে যেতে থাকে অদম্য সেই পিঁপড়া শঙ্কা জানে না যে।

বেশ অনেক ক্ষণ হাঁটার পর বিশাল এক অশ্বত্থ গাছের পাশে শক্ত লালমাটির একটি ঢিবি দেখতে পায় পিঁপ। তার ধার বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে সে, তারপর হঠাৎই দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
"পিঁপ, পিঁপ, পিঁপশঙ্ক! কোথায় গেলে তুমি?" চিৎকার করে ডাকে ফারিন।
প্রায় দু'মিনিট পর পিঁপের শুড় দেখা যায়, দুর্বাঘাসের আড়ালে একটি গর্তের মুখে।
"সম্ভাব্য রাজ্য দেখে এলাম একটা, ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা করলাম তার চারপাশটা।" হাসে পিঁপ।
"তুমি তো দেখলাম গর্তের ভেতর ঢুকলে। অন্ধকারে আবার কী পরীক্ষা করলে, কীভাবেই বা করলে!" বেশ অবাক হয় ফারিন।
"হ্যাঁ, ভেতরটা একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আলকাতরার মতো কালো। তবে আমরা তো আর চোখে দেখে কোনো জায়গার আয়তন হিসেব করি না, স্পর্শ করে করে আয়তন বের করি।" রহস্যময় ভঙ্গিতে শব্দ করে হাসে পিঁপ, চোয়াল প্রশস্ত হয় তার।

ফারিনের কাছে আসে পিঁপশঙ্ক। তারপর ঘুরে আবার রওয়ানা দেয় গর্তের দিকে।
"আরে, আরে, কোথায় যাচ্ছ আবার?" অবাক হয়ে প্রশ্ন করে ফারিন।
"আমার কাজ শেষ হয়নি তো এখনও, গর্তে ঢুকতে হবে আরেকবার। তারপরই আয়তনের হিসেব শেষ হবে।"
"ঘাসের ভেতর তো অনেক গর্ত, আগের গর্ত চিনতে পারবে?"
"গর্তের দেয়াল ঘেঁষে আমার শরীর থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থের একটা পথ বানিয়ে এসেছি, যাকে বলে ফেরোমোন ট্রেইল। আমাদের প্রত্যেক স্কাউটেরই রয়েছে যার যার নিজস্ব ফেরোমোন ট্রেইল বানানোর ক্ষমতা, একটির সাথে অন্যটির ঝামেলা হয় না কখনো। গন্ধ শুঁকে আমার সঠিক গর্তটি ঠিকই বের করে ফেলব।" পিঁপের কণ্ঠে দৃঢ় প্রত্যয়।

ঘাসের ভেতর হারিয়ে যায় পিঁপ। এবার বেশ অনেকটা সময় পর বেরিয়ে আসলো সে, মুখের হাসিটি আরো বিস্তৃত হয়েছে তার।
"পছন্দ হয়েছে জায়গাটা, হিসেব করলাম আয়তন। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আর চারপাশের বিন্যাস সব মিলিয়েও চমৎকার। যাই, সবাইকে নতুন রাজ্যের খবর দিয়ে আসি।"
"কিন্তু তোমার মতো আরো অনেকেই হয়তো এরকম নতুন রাজ্যের সন্ধান নিয়ে যাবে, তাই না? কারটা চূড়ান্ত হবে?"
"হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ, ফারিন। আর আমরা পিঁপড়ারা গণতান্ত্রিকও বটে। আমি এখন বেশ কয়েকজনকে রিক্রুট করব জায়গাটা দেখার জন্য, তারাও সেটি পরীক্ষা করে দেখবে। যার রাজ্য সবচেয়ে বেশি পিঁপড়ার পছন্দ হবে, সেটিই নির্বাচিত হবে নতুন নিবাস হিসেবে।"
"কিন্তু ঠিকমতো বাসায় পৌঁছতে পারবে তো তুমি?" ফারিন প্রশ্ন।
"হ্যাঁ," মাথা ঝাঁকায় পিঁপ, "বাসা থেকে এ পর্যন্ত আমি ৩৩,০০০ কদম এসেছি। গুণে গুণে ঠিকই বাড়ি ফিরে যেতে পারব।"

তারপর একটু বিষণ্ণ যেন হয় পিঁপের স্বর। "আচ্ছা, যাই তাহলে, পরে কথা হবে। খুব ভালো লাগল তোমাকে দেখে। ও হ্যাঁ, বাড়ি যাবার সময় একটু সাবধানে, নিচের দিকে তাকিয়ে যাবে কিন্তু।" অনুরোধ করে সে।
মৃদু হাসল ফারিন, "হ্যাঁ, অবশ্যই। কিন্তু নতুন রাজ্যের আয়তনটা কীভাবে বের করলে, বলো না?"
"এটি তোমার জন্য একটি ধাঁধা," দুষ্টু হাসি হাসে পিঁপ, "পরের বার যখন দেখা হবে, উত্তরটা জানাবে আমাকে।"
"ওহ," একটু মনমরা হয় যেন ফারিন, কিন্তু পিঁপের মায়াকাড়া দুষ্টু চেহারা দেখে হেসে ফেলে, "আচ্ছা।"

ক্রমশ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29083451 http://www.somewhereinblog.net/blog/Maveriick/29083451 2010-01-22 10:42:03