অবশেষে ডানা ছাঁটা হলো যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের। তাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ নবগঠিত তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
এর আগে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এতে দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প পদ্মা সেতুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পের ঋণ বন্ধ করে দেয়। এরপর বিভিন্ন মহল থেকে সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগের দাবি ওঠে।
ওই সময় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংক যদি কোনো দল সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং কোনো পরামর্শক যদি অনিয়ম করে থাকে, তার বিচার তার দেশে হবে, সেটার জন্য তারা অপেক্ষা করতে রাজি নয়। কারণ, এগুলোর নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় দরকার। তাই যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তা প্রমাণ হলো কি হলো না, তাতে তাদের কিছু যায়-আসে না। এটার জন্য পদ্মা সেতু আটকে থাকবে, তা তারা চান না। বিশ্বব্যাংক থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অফিসিয়ালি জানালে তাদের বাতিল করে দেয়া হবে। নতুন করে অন্যদের কাজ দেয়া হবে। সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের জন্য আবুল হোসেনকে না সরিয়ে কোনো বিকল্প ছিল না সরকারের হাতে। তাই এক প্রকার বাধ্য হয়েই সরকার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে সরিয়ে দিয়েছে। কারণ, বিশ্বব্যাংক বার বার জানতে চেয়েছে, আবুল হোসেনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে। এখন তাকে সরানোর ফলে পদ্মা সেতুর অর্থ প্রাপ্তিতে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখা দিয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।
জানা গেছে, সরকার এবং বিশ্বব্যাংকের মধ্যে চিঠি চালাচালি অব্যাহত থাকলেও তাতে সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছিল না। কারণ, বিশ্বব্যাংকের মূল অভিযোগ যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া পর্যন্ত পদ্মা সেতুর কাজ এগোবে না বলেও দাতা সংস্থাটি বিভিন্নভাবে সরকারকে বুঝিয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক একটি তদন্ত প্রতিবেদন সরকারকে দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য ঘুষ বা কমিশন চেয়েছেন সৈয়দ আবুল হোসেনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সাকো ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিরা। সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম ব্যবহার করে এই অর্থ চাওয়া হয়েছে। কমিশন দিলে কাজ পেতে যোগাযোগমন্ত্রী নিজেই সহায়তা করবেন বলেও আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
পদ্মা সেতুর ব্যাপারে সরকার গত ২০ অক্টোবর একটি প্রেসনোট জারি করে। এরপরই এই সেতু নিয়ে সরকারের অবস্থান জানিয়ে দুটি চিঠি দেয়া হয় বিশ্বব্যাংককে। চিঠি দুটির একটি লিখেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং অপরটি লিখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমান। তাদের চিঠির ভাষা ছিল, এসএনসি লাভালিনকে কালো তালিকাভুক্ত করে অন্যদের মধ্য থেকে যেন পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক তাতে সাড়া দেয়নি। এরপর আরেকটি চিঠি লিখে দুদক। সব চিঠিরই জবাব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে গত মাসে অর্থমন্ত্রীকে একটি চিঠি দেয়া হয়। আর সমপ্রতি বিশ্বব্যাংক চিঠি দিয়েছে অর্থ উপদেষ্টা ও দুদককে।
বিশ্বব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, কানাডিয়ান কোম্পানি এসএনসি লাভালিনকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে একাধিক কর্মকর্তা কোম্পানিটির কাছে কমিশন চান। পরামর্শক হিসেবে কাজ পাওয়ার পর ওই কাজের বিনিময়ে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা থেকে একটি অংশ কমিশন হিসেবে চাওয়া হয়। এ ব্যাপারে কোম্পানি সম্মত হলে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতাও হয়।
এদিকে উইকিলিকসে প্রকাশিত গোপন কূটনৈতিক নথিতে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের মূল্যায়ন তুলে ধরে বলা হয়, 'হি ইজ লেস দ্যান অনেস্ট'।
পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছিল গত ২১ সেপ্টেম্বর। বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি প্রতিরোধ সংক্রান্ত সংস্থা ইন্টেগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে একটি চিঠি দিয়ে যোগাযোগমন্ত্রী এবং তার মালিকানাধীন কোম্পানি সাকো ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির বিবরণ দেয়। এ সময় সংস্থাটি জানিয়ে দেয়, জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিষয়টির সুরাহা না হলে এই প্রকল্পে তারা অর্থায়ন করবে না। একই কারণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্য দাতারাও অর্থ ছাড় আটকে রেখেছে।
এর আগে গত ২৮ এপ্রিল ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে ৬ জুন সরকারের ঋণচুক্তি হয়েছে ৬১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এছাড়া সরকার গত ১৮ মে অন্যান্য দাতা সংস্থার মধ্যে জাইকার সঙ্গে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ঋণ প্রদান বিষয়ক চুক্তি করে । গত ২৪ মে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সাথে ১৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মহায়তা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার।
পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে সরকার মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরের ১৬৩ দশমিক ০৩ হেক্টর জমি হুকুমদখল করা করেছে। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জের ২৬ দশমিক ৩০ হেক্টর আর শরীয়তপুরের ১৩৬ দশমিক ৭৩ হেক্টর জমি রয়েছে। বাকি ৭৪২ দশমিক ৭ হেক্টর সরকারি জমি ব্যবহার করা হবে। পদ্মা সেতুর জন্য সরকার মোট ৯১৮ দশমিক ১০ হেক্টর জমি ব্যবহার করবে বলে জানা গেছে।
এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। ৪ লেনের মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। আর পুরো সেতুটি হবে ১৩ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার। সেতুর নিচতলায় রেললাইন বসানো হবে আর দোতলা দিয়ে চলবে গাড়ি।
সূত্রে জানা গেছে, ৪ লেন আর রেললাইনের ব্যবস্থা রেখে ২৫ মিটার প্রস্থের মূল পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার হলেও এর সঙ্গে ১২ দশমিক ১৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে মাওয়ার দিকে শূন্য দশমিক ২১৩ কিলোমিটার আর আল-জাজিরার দিকে ১১ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার।
রাজধানী ঢাকা এবং প্রধান সামুদ্রিক বন্দর চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি সড়কপথে প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল এবং দ্বিতীয় সামুদ্রিক বন্দর মংলাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের জন্য মহাসড়ক উন্নয়ন করা হয়েছে। অবশিষ্ট অংশ ভাটিয়াপাড়া থেকে বেনাপোল পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কাজ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক সহায়তায় ২০১০ সালের মধ্যে শুরু হবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের মধ্যে পদ্মা সেতু অবস্থিত হওয়ায় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পরিকল্পিত এশীয় হাইওয়ে প্রাইয়রটি রুট নাম্বার এএইচ-১-এর পর অবস্থিত।
জানা গেছে, সেতুটি নির্মাণ হলে দেশের অর্থনীতিতে ১ দশমিক ৩ শতাংশ জিডিপিতে সহায়তা করবে। আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি পাবে।
এদিকে বিপর্যস্ত যোগাযোগব্যবস্থার জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগ ভেঙে পড়েছিল। এজন্য নিজের ওপর কোনো দায় নেননি তিনি। তবে যোগাযোগব্যবস্থার এই অবস্থার জন্য তিনি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের দায়ী করেছিলেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



