somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি যদি ডুইবা মরি

০৮ ই নভেম্বর, ২০১১ রাত ৯:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ বড় ঝড়-জলের রাত। বিকাল থেকেই রাতের আঁধার নেমে আসছে চারদিকে, পশ্চিমের আকাশে কাল মেঘের ঝাপ আর সাথে সাথে শোঁ শোঁ বাতাস। যেন উড়িয়ে নিবে সব! নিজেই লুঙ্গি গুটিয়ে বাইরের বেড়ার ধারে নালা কেটে দিয়ে আসলাম, ডীপটিউবওয়েলের মুখটা ঢেকে দিলাম ভাঙা টিনের টুকরা দিয়ে। বিদ্যুৎ চলে গেছে বাতাস ছুটতেই, বারান্দায় বসে আছি জবুথবু হয়ে। আজকাল শরীর খুব অকেজো হয়ে গেছে, একটু ভেজাতেই হাঁচি ছুটে গেছে ভালমতন। ভিতর থেকে স্ত্রী ঘ্যানঘ্যান করছেন, 'যা পারেন না, করতে যান ক্যান! কি দরকার আছিল!' আমি চুপ করে বসে থাকি। ঘর থেকে আসা হারিকেনের আবছা আলোয় বাইরের ঝাপ ধরা অন্ধকারটা আরেকটু ঘন হয়েছে। মালা নি:শব্দে চায়ের কাপ রেখে ভিতরে চলে গেল। এইসব রাতে বাবা বহু দূরের মানুষ হয়ে যায় মালা বোঝে।

এইরকম বাদলা আর ঝড়ের রাতে নিজেকে স্থির রাখাটা কষ্টকর আমার জন্য। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো এমনি সব রাতেই ঘটেছিল একে একে। সাত বছর বয়সে বাবাকে হারানো, ষোল বছরে আদরের ছোট বোনকে, আটাশে যেয়ে মা'কে হারালাম, একইসাথে পেলাম বড়ছেলেকে-এমনি সব বাদলা ছিল সেইসব রাতে। মাত্র তিন বছর বয়সে এক ঝড়ের রাতে মেঝ ছেলেটা চলে গেল ডায়রিয়ায়, বিনা চিকিৎসায়। এত পাওয়া আর হারানোর স্মৃতি আমাকে বড় অস্থির করে দেয় এইসব বাদলার রাতে। আমি আর আমার মাঝে থাকি না। এর মাঝেও আরো একটা রাত আমাকে কাঁটার মত বিঁধে কেবল। আমি কাউকে বলতে পারি না, সহ্যও করতে পারি না। আপ্রাণ চেষ্টাও আমাকে বাঁচাতে পারে না সে স্মৃতির তাড়না থেকে।


আমার সংস্কার, সমাজ-সংসারের ভয়, কাপুরুষতা আমার হাত-পা বেঁধে রেখেছিল। আমি সিংহ হয়ে উঠতে পারি নি, গর্তে মুখ লুকিয়েছিলাম ইঁদুর হয়ে।


তেত্রিশ বছর আগের বানভাঙা এক রাতে আমি নিশাপুর স্টেশনে গিয়ে নামলাম। সর্দার বাড়ি থেকে নিতে আসার কথা থাকলেও কেউ আসে নি তখনও, কেই-বা আসবে এই বাদলা ঠেলে! তাই বর্ষণ ধরে না আসা পর্যন্ত আমি বসে রইলাম স্টেশন মাস্টারের ঘরেই। শেষ-মেষ রাত দশটায় গরুর গাড়ি নিয়ে লোক এল। থিকথিকে কাদায় ডুবে থাকা রাস্তা ভেঙে সর্দার বাড়ি পৌঁছাতে বেজে গেল বারটা। নাসিম সর্দার অত রাত অবধি জাগেন না, তবে তাঁর স্ত্রী জেগে ছিলেন। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে পা ধোয়ার পানি দেয়া, গরম খাবার পরিবেশন সমস্ত কাজের তদারকি করছিলেন। তাঁর আতিথেয়তায়, আদর-যত্নে যারপরনাই মুগ্ধ, কৃতজ্ঞ আমি, কারণ ডিগ্রী পর্যন্ত মানুষের বাড়ি পশুর মত জীবন কাটিয়েছি; এত যত্ন কেউই আমাকে করে নাই। তাই খাওয়া শেষে মুখ ফুটে সে কৃতজ্ঞতার প্রকাশ করেই ফেললাম। কিন্তু তখনই তাঁর সুললিত, কিশোরীকন্ঠের উচ্চ হাসিতে অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম খুব। তিনি কোনক্রমে মুখে কাপড় গুজে হাসি থামিয়ে বললেন, 'আমারে এত ধইন্যবাদ দেওনের কিছু নাই মাস্টার সাব। আমি আপনের জইন্য কিছুই করি নাই। করছি নিজের জইন্য।'

তারপর আমাকে একরাশ বিস্ময়ে ডুবিয়ে তিনি বিদায় নিলেন তখনকার জন্য। পরেরদিন দেখা হল নাসিম সর্দারের সাথে। হঠাৎ টাকা আর ক্ষমতা পেয়ে যাওয়া মানুষটার শিক্ষা আর ভব্যতা ছাড়া সবই ছিল। পান চিবুতে চিবুতে আমাকে বলল, 'শুনো মাস্টার, আইছো, ঠিকমত কাজ কর, কাজে ফাঁকি দিও না। মাসের শেষে বেতনতো ঠিকই নিবা। ট্যাকাটা হালাল কইরা ন্যাও। বুঝলা কি কইছি?' লজ্জায়, অপমানে আমার কান লাল হয়ে গেলেও আশ্রয়ের কৃতজ্ঞতায় একান্ত বশংবদ আমি মাথা নুইয়ে সম্মতি জানাই।

কাজ শুরু করি কাজের প্রতি ভালবাসা থেকেই। স্কুলের বাচ্চারা আর তাদের বাপ-মায়েরা আমাকে কোন এক বিচিত্র কারণে অসম্ভব পছন্দ করতো। তাই আমার কাজে কোন সমস্যাই ছিল না। দুপুরের পরে বাড়ি ফিরে নিজের মত পড়াশোনা করতাম। ভিতর বাড়ি থেকে ঝি খাবার নিয়ে আসতো, খাওয়া শেষে আবার নিয়ে যেতো। এর মাঝে আর সর্দার গিন্নীর সাথে দেখা বা কথা হয় নি আমার। তবে কখনো কখনো তাঁর উচ্চকন্ঠের হাসি বা গানে সচকিত হয়েছি, বিস্মিত হয়েছি। এভাবেই কেটে গেল পুরো দেড়টা মাস।

আশ্বিনের শেষের এক বিকালে খেতে বসেছি। বাইরে ঝি অপেক্ষা করছে ঝুটা বাসন-কোসন নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাইরে সর্দার গিন্নীর গলা পেলাম, 'মাস্টার সাব, একটা কথা ছিল আপনের সাথে। আসবো?' খাওয়া ফেলে ত্রস্তে উঠে দাঁড়ালাম, কারণ অনুমতির তোয়াক্কা না করে তিনি ঢুকে পড়েছেন ঘরে। তেইশ বছরের আমি তখন পর্যন্ত কোন নারীর চোখে চোখ রাখি নি। কিন্তু চোখ লুকোনোর আগেই তাঁর গভীর কাল দুটো চোখে বাঁধা পড়ে গেলাম। সমস্ত মুখ জুড়ে মায়াভরা ছলছলে দুটো চোখ! 'আরে বসেন বসেন। খাওয়া ফেলায় উঠলেন ক্যান!' সরে যাওয়া আঁচল টেনে দিয়ে বলেন তিনি।

আমার বসা হয় না। বিব্রত কন্ঠে বলি, 'বলেন ভাবীসাব, কি করবো আপনার জন্যে?'

'মাস্টার সাব, আমিতো লিখতে পড়তে জানি না। আমার ছোট ভাইটা চিঠি লিখে পাঠাইছে। আপনে ওইটা পইড়া শুনাবেন, আর তারপরে চিঠির উত্তর লিখা দিবেন।'

বিনীত ভঙিতে মাথা নাড়ি আমি, 'জ্বী আচ্ছা ভাবীসাব।'

তিনি কিছুক্ষণ তীব্র দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন, তারপরে বলেন, 'সবেরে মাথায় উঠনের সুযোগ দিয়েন না। পরে আর নামাইতে পারবেন না। নিজেরটা নিজেই বুঝন লাগে। আর আমার নাম নয়ন। আমারে নয়ন বইলেন, ভাবীসাব না।' নয়ন চলে যায় ঝড়ের মত।

তবে তারপর থেকে প্রায়ই সে আসতে লাগল, বিচিত্র সব আবদার নিয়ে। আশ্রয়দাতার স্ত্রী, আমার না করবার উপায়ও ছিল না। আর বলতে নেই, নয়ন বউয়ের ওইসব আবদার আমার ভালও লাগতো খুব। সবে সতের কি আঠার হয়েছে তার, ছিপছিপে লাউয়ের ডগার মত দেহ, শ্যামবর্ণের মেয়েটা যে কী অপরূপ সুন্দরী! তারপরেও সর্দারের আদর পায় না নয়ন বউ। সে যে বাঁজা। চার বছরে এখনও পারল না আলো জ্বালতে সর্দারের ঘরে। এই অপরাধে হাসি-খুশি বউটা সারাদিন গঞ্জনা সয়। একটু হাসলে কি কথা কইলেই সর্দারের বুড়ি মা খনখনে গলায় চিৎকার করে উঠতো, 'মাগী চিক্কুর পাইরা হাসতেছে দেখ! মান-ইজ্জত সব খাইল বাড়ির। আবার গান গায় নডী মাগী! চুপ! চুউপ!' কখনো এসব চিৎকারে পাগলি মেয়েটা দ্বিগুণ উৎসাহে হেসে উঠতো, আর কখনো থেমে যেতো আচমকাই। তারপরও সংসারে সব কাজ করতো একলা হাতে, খনখনে বুড়িটার সেবা-যত্নেও কোন ঘাটতি ছিল না কোনদিন।

মাঝে মাঝেই ভরদুপুরে নয়ন বউ হানা দিতো আমার ঘরে, 'ও মাস্টার, আপনের ওই লাল বইটা থিকা একটা গল্প পইড়া শুনান দেখি।' আর নাহয় হাতে করে নিয়ে আসতো একটা সুগন্ধি পান, 'ও মাস্টার বহুৎ তো পড়ালেখা হইসে, ধরেন একটা পান খান। সুগন্ধি মশলা দেওয়া।' আমার বিপন্ন চেহারা দেখে আবার হেসে পড়তো খিলখিল করে, 'ভয় নাই গো মাস্টার, ভয় নাই। আমি আপ্নেরে মন্ত্র পড়া পান দেই নাই। হি হি হি।' আমি মুগ্ধ চোখে দেখতাম, এবং প্রচন্ডভাবে ভয়ও পেতাম। নয়ন বউ আমার ঘরে, এটা যদি বুড়ি কোনভাবে টের পায় তাহলে রক্ষা নাই কারো। কোন কোন দিন বুড়ির মাথা বেশি গরম হলে সে সর্দারের কাছে সত্য-মিথ্যা কত কথা যে লাগাতো! আর যত রাতই হোক, রাগে সর্দার পাগল হয়ে যেতো। অক্ষম আমি দাঁতে দাঁত চেপে শুনতাম নয়ন বউয়ের করুণ বিলাপ।

নয়ন বউয়ের গভীর কাল দুটো চোখে কবে হারিয়েছিলাম সে হিসেব আমি রাখি নি। তবে ধরা পড়েছিলাম চৈত্রের এক সাঁঝে। আমি বাজার যাবো বলে বের হয়েছি ঘর থেকে, শুনি পুকুরঘাটে নয়ন বউয়ের গলা, মৃদু কন্ঠে কি যেন গান গাইছে। নিজেকে সংবরণ করতে পারলাম না। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। স্নান সেরে নয়ন বউ তখন মাত্র শুকনো কাপড়টা গায়ে জড়িয়েছে। সম্মোহিতের মত আমি চেয়ে রইলাম তার নদীর মত বাঁকানো সেই পিঠের দিকে। নয়ন বউ বুঝি টের পেয়েছিল সে দৃষ্টি। ঝট করে ঘাড় ঘুরাল। আমার সরে দাঁড়ানোর শক্তিও ছিল না, সেই অক্ষম-অথর্ব আমাকে ঠোঁট বাঁকানো তীব্র ব্যঙ্গাত্মক একটা হাসি দিয়ে নয়ন বউ পাশ কাটিয়ে চলে গেল।

সে রাতে আমার ঘুম হল না। সারারাত ছটফট করে কেটে গেল। রবিঠাকুর কুড়ে খেলেন মগজ,

নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
রয়েছো নয়নে নয়নে
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে
রয়েছো হৃদয়ে গোপনে


ঘুম হল না তারপরের রাতেও, তারপরের রাতেও না। গত তিনদিন নয়ন বউকে আর দেখি নি আশে পাশে। না জানি সে কি ভেবেছে আমাকে! না জানি কত ক্ষেপেছে আমার ওপরে। এমনও ভয় হল যদি সর্দারকে বলে দেয় আমার কথা! তবে তো আমার আশ্রয় হারাবো, হারাবো এত কষ্টে পাওয়া চাকরিটাও। চারদিন পরে নয়ন বউ এল, জবুথবু হয়ে, সর্বাঙ্গ চাদরে মুড়ে। জ্বরে কাবু হয়ে ছিল এ কয়দিন, আরো ক্ষীণ হয়েছে তার ক্ষীণ তনু। কিন্তু ওই চোখের উজ্জ্বলতা বুঝি বেড়েছে কয়েকগুণ, ঠোঁটে সেই তীব্র শ্লেষ! 'কি মাস্টার, ঘুমাও নাই বুঝি সারা রাইত! চোখের নিচে কালি পড়ছে দেখি।' সে এখন আরো সাহসী, আরো বেপরোয়া। আপনি-তুমির ভেদ ভুলেছে। 'মাস্টার তুমি গান বান্ধছো আমারে নিয়া?'

ভুলে বুঝি উচ্চস্বরেই গেয়েছিলাম গানটা। সভয়ে পিছিয়ে বলি, 'না নয়ন বউ, ওটা রবি ঠাকুরের গান।' নয়ন বউ হাসে, 'তুমি আমারে ভুলায়ো না মাস্টার। তুমিতো কবেই ডুবছো।'

'ঘরে যাও নয়ন বউ।'

'ভয় কি মাস্টার? তোমার তো আর কলঙ্ক হইবো না। ডুইবা মরলে ওই কলঙ্ক আমারই। চল মাস্টার, পলাই যাই।' নয়ন বউয়ের তপ্ত শ্বাস পড়ে আমার মুখের ওপর। আমি মুখ ঘুরিয়ে নেই, 'না, নয়ন বউ। তা হয় না। লোকে কি বলবে!'

'লোকে কি কইবো তুমি সেই ভয় পাও মাস্টার! লোকেরে ডরাও!' সর্বনাশা দুই চোখে আমাকে জ্বালিয়ে দিয়ে নয়ন বউ ঝড় তুলে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

নয়ন বউয়ের ভাগ্য খারাপ, আমারও। সোজা গিয়ে পড়ল সর্দারের মায়ের সামনে, 'মাগী, বারবাড়িত তোর কি এত কাম বেহান-হাঞ্জে? কই গেসিলি!' পাগল হয়ে নয়ন উল্টো উত্তর করে বসল, 'তোর কি মাগী? আমি যেইখানেই যাই, ছোঁকছোঁক কইরা গন্ধ শুইখা হাজির হইবো। কুত্তার লাহান স্বভাব।'

নয়ন বউয়ের ভাগ্য খারাপ সে জবাব দিয়েছিল। ওই রোগা শরীরে শাশুড়ি-স্বামীর দুই দফা প্রহার সইতে হল তাকে। কিন্তু নয়ন বউ তখন বেপরোয়া। পরদিন নাসিম সর্দার বাজারে যেতেই রক্তলাল চোখে সে এসে হাজির হল আবারও। 'মাস্টার, তুমি ক্যামনে প্রাণে বাইন্ধা সহ্য করলা? একবারও মনে হইল না তোমার নয়নের কত কষ্ট! মাইরা সমস্ত শরীরে দাগ বসায় দিসে সর্দার হারামীডা।'

চোখের জল ঠেকিয়ে বলি, ' ঘরে যাও নয়ন বউ। আর এসো না। পাপ হয়।'

'পাপ হয় মাস্টার! কিসে পাপ হয়? ভালবাসলে পাপ হয় না কো।'

নয়নের জ্বরতপ্ত মুখ, অগোছাল চুল, ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে আমার দিশা লোপ পায়। আমি আলতো হাতে তার গালে ছুঁই। আবেশে চোখ বুজে ফিসফিস করে নয়ন বলে, 'ছুঁইয়ো না মাস্টার, পাপ হয়।'

আমি যেন বিষধর সাপের ছোবল খেয়ে ঝটকা মেরে হাত টেনে নিলাম। নয়ন বউ হেসে উঠল হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতন। হাসতেই থাকল হেচকি তুলে, চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল টপটপ করে। তবু তার হাসি থামে না। 'পাপ মাস্টার! কিসে পাপ হয়! দুফুরবেলায় পরের বউয়ের লগে গপ করলে পাপ হয় না মাস্টার? পলায় পলায় তার শরীর দেখলে পাপ হয় না! এতকিছু পারো মাস্টার, তুমি তার হাতটা ধরে পালায়ে যাইতে পারো না! তোমার কলজেটা এত ছোট ক্যান মাস্টার?'

হ্যাঁ নয়ন বউ, আমার কলজে সত্যি বড্ড ছোট। আমাকে যে বিশাল এক সংসারের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে এখানে আসতে হয়েছে। আমার উপরেই এতগুলো মানুষের খাওয়া-পরা নির্ভর। ভালবেসেছি বলেই নিজের সুখের কথা স্বার্থপরের মত ভাবলে আমার চলে বল? আমি যে পারি না অমন দায়িত্বজ্ঞানহীন হতে। আমার যে পায়ে শিকল বাধা।

সে রাতেও মদ্যপ নাসিম সর্দার নয়ন বউকে ঠ্যাঙাল তার মায়ের কথায়। নয়ন বউ কেবল চিৎকার করে বলতে লাগল, 'গজব পড়বো, আল্লাহর গজব পড়বো।' কিন্তু তার ক্ষীণ, দুর্বল কন্ঠ চাপা পড়ে গেল সর্দারের গর্জনে, 'চোপ মাগী, এক্কেবারে চুপ। আরেকটা আওয়াজ দিলে খুন কইরা ফালামু।'

পরের তিন দিন নাসিম সর্দার বাড়ি ফিরল না, নয়ন বউয়েরও কোন সাড়া-শব্দ নেই। ঝি-চাকরের কাছে শুনেছিলাম সে খুব অসুস্থ, শয্যাশায়ী। রোগা শরীরে এত অত্যাচার সহ্য হয় নি।

তারও এক সপ্তা পরের কথা। প্রায় সারারাত চলেছে কালবোশেখীর তান্ডব। পুরো গ্রাম বিধ্বস্ত, লন্ডভন্ড। এর মাঝেই সর্দারবাড়িতে যেন ভেঙে পড়েছে সারা গাঁয়ের মানুষের ঢল। ভেতর বাড়িতে সর্দারের মায়ের খনখনে স্বরের বিলাপ শোনা যাচ্ছে,' রাক্ষুসী মাগী, আমার পোলাডারে খাইল। হারামজাদী, নডী মাগী। বাচ্চা বিয়ানীর ক্ষ্যামতা নাই, নষ্টামী কইরা বেড়াবি ব্যাডাগো লগে। তোরে ঘরে আনাডাই ভুল হইসিল। আগো আমার বাপধন গো!'

হাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি, চারদিকে পুলিশ বেষ্টিত হয়ে নয়ন বের হয়ে এল বাড়ি ছেড়ে। নয়নকে দেখে নিস্তব্ধ জনতা। নয়ন পরাজিত মানুষের মত মাথা নিচু করে বের হয় নি, তার মাথা উঁচু ছিল, জ্বলজ্বল করছিল দুই চোখ। তবে সে কাউকেই দেখছিল না, একবারের জন্য পথের ধারে দাঁড়ানো আমার চোখে চোখ পড়ল তার। যেন ওই ধারাল দুই চোখে কেটে টুকরো টুকরো করে দিল নয়ন আমাকে, ঠোঁটে তেমনি সেই ব্যঙ্গ আর শ্লেষের হাসি। আমি সেই দৃষ্টির সামনে দাঁড়াতে পারি না, মাথা নামিয়ে নেই। চিরদিনের জন্য ছোট হয়ে যাই নয়নের কাছে, নিজের কাছে।



মালা বারান্দায় বেরিয়ে আসে নি:শব্দ পায়ে, আলতো হাত রাখে আমার কাঁধে, 'বাবা, ঘরে চল। রাত হয়েছে অনেক।' মেয়ের হাতে হাত রেখে আমি ঘরে ঢুকি। পরাজিত একজন মানুষ, এমনি সব ঝড়জলের রাতে যে বারবার ভেঙেচুড়ে যায়, ছোট হতে হতে ধূলায় মিশে যায়।



সে রাতেও কালবোশেখীর তান্ডব ছিল, ঝড়-জলে ডুবে ছিল চারদিক। গভীর রাতে নয়ন বউ এসেছিল আমার কাছে। হাতে তখনও তাজা রক্ত, দুই চোখ জ্বলছে ধক ধক করে। 'চল মাস্টার, চল আমার সাথে। তুমিতো বহু আগেই ডুবছো। মরণে আর ভয় কি! দুইজনে একসাথেই ডুইবা মরি।'

কিন্তু আমার তবু ভয় ছিল। আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম নয়নকে। পারি নাই হাতে হাত রেখে ডুবে মরার সাহস অর্জন করতে।
৪০টি মন্তব্য ৪০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×