পিকনিক ও কিছু মানুষ
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
আমরা একজন আরেকজনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকি। প্রত্যেকের চোখেই হতবিহবল দৃষ্টি, একইসাথে সতর্ক এবং আক্রমণাত্মক। আমাদের দাঁড়ানোর ভঙ্গী, মুখের ভাব এবং দৃষ্টির মধ্যে যে ভয়ানক হিংস্রতা ও ক্রূরতা প্রকাশ পাচ্ছে তার সাথে আমরা পরিচিত নই। এ কারণেই নিজেদের করণীয় সম্পর্কে আমরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু একইসাথে ভেতরের সহজাত প্রবৃত্তি আমাদের সতর্ক করে দেয়... "মারো অথবা মরো"। অতি সাবধানতার সাথে আমরা আক্রান্ত না হওয়া বা আক্রমণ করার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। এ অপেক্ষাকালের ব্যপ্তি যেন ছাড়িয়ে যায় অনন্তকে।
(১)
বছরের সেরা পারফরমেন্সের ভিত্তিতে বাছাই করা কয়েকজন কর্মী অফিসের খরচায় বছর শেষে আনন্দভ্রমণের সুযোগ পায়। এ অফিসের বহু বছরের পুরনো ঐতিহ্য এটা। ধরে নেয়া হয় প্রতিষ্ঠানের কোন কর্মী এ সুযোগ পেয়েছে মানে সে তার জীবনের সেরা অর্জনটি করেছে। এ বছরের সৌভাগ্যবান সাতজনের মধ্যে আমিও একজন। সাধারণত সাত-আট বা দশ বছরের পুরনো কর্মীরাই দ্বিতীয়-তৃতীয়বারের চেষ্টায় এ সুযোগ পেয়ে থাকে। কিন্তু বছর না ঘুরতেই আরো অনেক অভিজ্ঞ কর্মীর সাথে আমিও যখন নির্বাচিত হলাম, বিস্ময়ের সীমা ছিল না। স্বীকার করছি আমার সর্বোচ্চ শ্রমটুকুই আমি দিয়েছিলাম, কিন্তু সেটা নি:সন্দেহে পাঁচ বা সাত বছরের অভিজ্ঞ কারো সাথে তুলনীয় হতে পারে না। নির্বাচিতদের নাম প্রকাশের পরপরই চারদিকে অভিনন্দনের বন্যা বয়ে গেল। আমাদের মধ্যে প্রীতি, সৌজন্যবোধ এবং আন্তরিকতা প্রবল। এখনও পর্যন্ত একবারও এ সুযোগ না পাওয়া অনেক বয়োজ্যাষ্ঠ কর্মীও বিনা দ্বিধায়, অত্যন্ত ঊষ্ণভঙ্গীতে আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন, হাত মেলাতে হল প্রায় প্রতিটি মানুষের সাথে। তারপরও, এতকিছুর পরেও কোথায় যেন খুব সুক্ষ্মভাবে একটা ঈর্ষার কাঁটা বিধছিল আমাকে। যে আন্তরিক হাতটি আমার হাতকে মুঠোয় পুরল তার ঊষ্ণতা যেন তালুতে ছ্যাকা দিয়ে গেল। হাস্যোজ্জ্বল চকচকে চোখের পিছনে যেন আমি দেখতে পাচ্ছিলাম ঈর্ষাকাতর দৃষ্টি। খুব যত্ন করে গভীরে লুকিয়ে রাখা নিজেদের প্রবৃত্তিকে কোন না কোন সময়ে বোধহয় আর লুকানো যায় না। তবে তা ক্ষণিকের জন্যই। নিজের অর্জনে উৎফুল্ল এবং গর্বিত আমি কিছু সময় পরেই এটাকে আমার উর্বর মস্তিষ্কের অতি কল্পনা বলে ধরে নিলাম। মেতে উঠলাম আনন্দ উল্লাসে।
সপ্তাহখানেক পরে সমস্ত প্রস্তুতি শেষে খুব সুন্দর আলোময় একটা সকালে আমরা রওনা হলাম। সবাই বলাবলি করছিল আমরা হলাম সবচেয়ে সৌভাগ্যবান দল। কারণ আমাদের জন্য ঠিক করা হয়েছে দেশের সেরা জায়গাটি। ঘন-গহীন এক জঙ্গল, যেখানে পৌঁছানোটা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তবে জায়গাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, দুর্ভেদ্যতার রহস্য সবার জন্যই একে আরাধ্য করে তুলেছে। দলের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্যটিকে আমি হাসিমুখে বিনীত সম্ভাষণ জানাই। তাঁর চকচকে লেদার জ্যাকেট, ভেতরের দামী হাওয়াইয়ান শার্ট আর পায়ের জুতো জোড়ার অকুন্ঠ প্রশংসা করি। দলের একমাত্র মহিলা সদস্য মিস শায়লার দিকে অকৃত্রিম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাই। রঙচঙে বাহারী ফ্যাশনেবল পোশাকে তাঁকে যেন চেনাই যাচ্ছে না। একথা জানাতে আমি দ্বিধাও করি না।
-আপনাকেতো চিনতেই পারছি না ম্যা'ম। অফিসের ফরমাল পোশাকে আপনার এই অদ্ভুত সৌন্দর্য বোঝাই যায় না!
-কি যে বলেন! এ আর এমন কি?
মাপা, মিষ্টি করে হাসেন তিনি। সেই হাসিতে একইসাথে লজ্জা, গর্ব, আর কিছুটা প্রশ্রয়।
সর্বকনিষ্ঠ সদস্য বলে আমার আদরটা যেন অন্যরকম। সবাই ডেকে ডেকে পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন, করণীয়-কর্তব্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন। 'আপনিতো একেবারে নতুন। তবে মাত্রইতো ছাত্রজীবন শেষ করে এলেন, এসব ক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা এখনো একেবারেই টাটকা।' মার্জিত, স্মিতহাসিতেই কেবল এমন কথার উত্তর দেয়া যায়। এমনি সব ছোট ছোট হাসি ঠাট্টার মধ্য দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি।
পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে গাড়ি যতই জঙ্গলের কাছাকাছি হচ্ছিল, প্রকৃতির অপার্থিব সৌন্দর্যে আমরা যেন বিমোহিত হয়ে পড়ছিলাম। কাঠখোট্টা শহরে এমন সবুজের সমারোহ দেখা যায় না। ঘন সবুজের স্নিগ্ধতায় আমরা যেন নিজেদের হারিয়ে ফেললাম। প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই মি. রহমান ও মি. আহমেদ গাড়ির স্টেরিওতে চলতে থাকা গানের সাথেই হেঁড়ে গলায় তাল মেলাতে শুরু করলেন। হাততালি দিয়ে তাঁদের সাথে গানের তাল মেলাই বাকিরাও। এমনকি সমস্ত গাম্ভীর্য আর আভিজাত্য একপাশে সরিয়ে মিস শায়লাও মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেন। এভাবেই হাসি-আনন্দে প্রায় আট ঘন্টার জার্নিশেষে আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছালাম।
গাড়ি থেকে নেমে কিছু মূহুর্ত যেন বাকহারা হয়ে রইলাম। চোখের সামনে আকাশ ছোঁয়া সবুজ গাছের সারি, ঘন-দুর্ভেদ্য। এই গভীর জঙ্গলের প্রায় মাঝামাঝিতে অসম্ভব সুন্দর এক উপত্যকা আমাদের গন্তব্য। এখান থেকে আমরা সাতজনই এগুবো। গাড়ি এবং অন্য লোকজন রয়ে যাবে আমাদের অপেক্ষায়। একে একে নামানো হল আমাদের প্রয়োজনীয় সব জিনিস- তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ, দড়ি-দড়া, রান্নার জন্য কিছু তৈজস, স্টোভ, দেয়াশলাই, টর্চ, মোমবাতি, কিছু অস্ত্র, পোকা-মাকড় তাড়ানোর স্প্রে, সাধারণ কিছু অষুধ, কাপড়-চোপড়, এবং সাতদিনের আনুমানিক খাবার ও পানি। সবকিছু ভাগাভাগি করে আমরা নিজেদের বোঝা কাঁধে তুলে নিই। মিস শায়লা বারবার বলেন, 'প্লিজ আমাকে আরো কিছু জিনিস দিন। আমি ঠিক বইতে পারবো, আমার অভ্যাস আছে।'
কিন্তু আমরা হাসিমুখে বলি, 'তাই হয় নাকি! আমরা এতগুলো পুরুষ থাকতে একজন নারীকে কষ্ট করতে দিতে পারি না।' ম্যাচ জিতে আসা একদল স্কুল বালকের উল্লাসে কোরাস গাইতে গাইতে আমরা এগুতে থাকি বনের পথে।
যে উদ্যমে আমরা হাঁটতে শুরু করেছিলাম তা মিইয়ে আসতে খুব বেশি সময় অবশ্য লাগল না। ঘন্টা দুয়েক পরেই আমাদের আরামপ্রিয় অলস শরীর বিদ্রোহ করতে শুরু করল। আমাদের গতি ধীর হয়ে আসতে আসতে থেমে গেল। মাসুদ সাহেব, আমাদের গ্রুপ লিডার যাত্রাবিরতি ঘোষণা করলেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম, খাওয়া-দাওয়া। খোলা একটা জায়গায় বসেছিলাম আমরা, চারদিকে পাখির কল-কাকলি। আমাদের গরম কাপড়, জ্যাকেট বা কোট অনেক আগেই খুলে ফেলা হয়েছে। রিয়াজ সাহেব এখন শার্টের হাতাও গুটিয়ে ফেলেছেন। মুখের উপরের গাম্ভীর্যটা খসে পড়ায় তাঁকে বেশ তরুণ দেখাচ্ছে। মিস শায়লা হঠাৎই বালিকার মত হেসে উঠে আমার শার্টের হাত খামচে ধরেন, 'দেখো দেখো নাসিফ, একটা কাঠবিড়ালি!' দেখার জন্য আমিও উৎসুক হয়ে উঠি, 'কোথায়! কই?'
'ওই যে! ওই! ঐ যাহ্ কোথায় লুকাল দেখো!' তাঁর উচ্ছাস, শিশুসুলভ হতাশা আমাকে খুবই বিস্মিত করে। মিস শায়লার মত এত সিরিয়াস একজন মানুষের সাথে এ ধরনের তারল্য একেবারেই বেমানান। মুখ তুলে তাকাতেই চোখ পড়ে জামিল সাহেবের চোখে। ভুল দেখলাম কিনা কে জানে, কিন্তু আমার মনে হল স্পষ্ট তাঁর চোখে আমি হিংসা-দ্বেষ, ঘৃষা অথবা তারচেয়েও খুব কুৎসিত কিছু দেখেছি। তবে তা মূহুর্তের জন্যই।
তিরিশ মিনিটের যাত্রা বিরতি শেষে আমরা আবার রওনা দেই। চারপাশের সুবিশাল গাছের সারি, পথ আটকে রাখা ছোট ঝোপঝাড়, পাখির গান, এবং দূরে দূরে কিছু বুনো জন্তুর ডাক আমাদের আচ্ছন্ন করে। আমরা একটা ঘোরের মধ্যে হাঁটতে থাকি। কিন্তু এরমধ্যেও টের পাই একটা চাপা অস্বস্তি। কিসের যেন একটা খচ খচ ভিতরে। প্রকৃতির সহজ-স্বাভাবিক রূপ, সরল আদিমতা ব্যঙ্গ করতে থাকে যেন আমাদের মার্জিত আচরণ, আভিজাত্য, এবং সবকিছু ছাপিয়ে কৃত্রিমতাকে। কেউ কাউকে বলে না, বরং সযত্নে চেষ্টা করতে থাকে আড়াল করার। রাত নেমে আসায় সেদিনের মত ক্যাম্প করা হল একটা বিশাল রেইন ট্রির আশে পাশে। একটা তাঁবু মিস শায়লার, আর বাকি তিনটাতে আমরা দুজন করে। মাঝে বেশ বড় করে জ্বালা হয় আগুন, যেন বুনো জন্তুরা এসে আক্রমণ করতে না পারে। প্রথমে জঙ্গলের বিভিন্ন শব্দে ঘুম না এলেও সারাদিনের ক্লান্তিতে জেগে থাকা সম্ভব হয় না। একে একে সবাই গভীর ঘুমে তলিয়ে পড়ি।
(২)
খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে যায় পরদিন। কাজ ভাগ করে নিয়ে আমরা নাস্তা বানাই, খেয়ে-দেয়ে পাত্তারি গুটিয়ে রওনা দেই আবার। আজ আর কেউ স্বত:স্ফূর্তভাবে মিস শায়লার বোঝা বহন করতে রাজি হয় না। মি. আহমেদ নিচু গলায় বলেই ফেলেন, 'নিজেরটাই এত ভারি, আরেকজনেরটা ক্যামনে নিবো? মেয়েমানুষ বলে সবসময় বেশি সুবিধা ভোগ করতে চাইবে এইটাতো ঠিক না।' তাঁর ভাষা ভব্যতার সীমা পার হলেও বাকিরা নিরবে তাঁকে সমর্থনই দেয় যেন।
মিস শায়লা আহত হন, তবে কিছু বলেন না। আমরা আবার হাঁটতে শুরু করি। কিন্তু কোথায় যেন সুরটা কেটে গেছে। পরস্পরকে সাহায্য করার বদলে আমরা নিজেদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। জামিল সাহেবের খুঁত খুঁতটা একটু বেশিই। কেন তাঁকে আরেকটু ভালটা, একটু বেশি সুবিধাটা দেয়া হল না তাই নিয়ে গজগজ করতেই থাকলেন। মাসুদ সাহেব দলনেতা হিসেবে সবাইকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করতে থাকলেও খুব বেশিক্ষণ সেটা কাজে লাগল না। খুব ছোটখাট ব্যাপারে খিটমিট আর অসন্তোষ বাড়তেই থাকল। চারপাশের সবুজ বনানী, মাথার উপরের উজ্জ্বল রোদ, পাখির গান, কাঠবিড়ালীদের নেচে বেড়ানো এত এত আনন্দময় উপকরণের মাঝে আমরা সাতজন মানুষ মুখ অন্ধকার করে হাঁটতে লাগলাম।
হিসাব অনুযায়ী চার রাত-তিন দিন ধরে আমরা হাঁটছি। সাথে থাকা ম্যাপে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি সেই স্বর্গীয় উপত্যকা। তিক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে সবার মধ্যে। সাতদিনের ভ্রমণ আমাদের, তারমানে এখন ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে। কিন্তু জায়গাটা খুঁজেই পেলাম না এখনো। একজন আরেকজনকে দুষছি। যেটা শুরু হয়েছিল স্বগতোক্তির মাধ্যমে, ক্রমে সেটা ভব্যতার সীমা ছাড়াতে শুরু করল। সাথে থাকা খাবার এবং পানির পরিমাণ যতই কমে আসতে লাগল প্রত্যেকের ভেতরের স্বার্থপর, সুবিধাবাদী সত্ত্বাটি ততই কুৎসিত রূপ ধরে জেগে উঠতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতেই অন্যদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি বুলালাম। দামী, রঙচঙে, হাল-ফ্যাশনের পোশাকগুলোর অর্ধেকও অবশিষ্ট নেই শরীরে। বুনো ঝোপঝাড়ের মাঝ দিয়ে পথ করে নিতে গিয়ে ডাল-পালা আর কাঁটার খোঁচায় ছিঁড়ে-খুড়ে একাকার। মাথার চুল উস্কো-খুস্কো, মুখে ময়লার আস্তর, চোখে বুনো উদভ্রান্ত দৃষ্টি। গভীর জঙ্গলে জানা-অজানা বিভিন্ন বিপদ থেকে বাঁচার প্রথম নিয়ম অনুযায়ী দল বেঁধে হাঁটলেও আমরা যেন নিজেদের কাছ থেকেই নিরাপদ থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরপরই একজন অন্যজনের ওপর বুলিয়ে নিচ্ছি সতর্ক দৃষ্টি।
(৩)
আজ ষষ্ঠ দিন, সন্ধ্যা নামি নামি করছে। যত এগোচ্ছি গাছপালা আরো ঘন থেকে ঘন হচ্ছে। সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে প্রত্যেকেই। যে সভ্য-ভব্য মানুষগুলো যাত্রা শুরু করেছিল ছয়দিন আগের এক আলোকিত ভোরে, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খসে পড়েছে সভ্যতার মুখোশ। ভান বা ভন্ডামি নয়, যা অনুভব করছি আমরা নির্দ্বিধায় তা প্রকাশ করছি। রাগ, ঘৃণা, ক্ষোভ প্রকাশে এখন আর কোন বাধা নেই। গভীর প্রকৃতি আমাদের পৌঁছে দিয়েছে আদিতে, চালিত হচ্ছি প্রবৃত্তির বশে। নিজেদের সুবিধা আদায়ে আমরা করতে পারি যেকোন কাজ, এমনকি লড়াই করতে পারি বুনো জন্তুর মত। মেরে, কেটে শেষ করে ফেলতে পারি একজন আরেকজনকে। আজ আর কোন কিছুতেই কোন বাধা নেই।
রাতে খাবার ভাগ করা নিয়ে এক প্রস্থ বাক-বিতন্ডা হয়ে গেল। এখনও দলপতি হিসেবে মাসুদ সাহেব থাকলেও তাঁকে কেউ মানতে রাজি হচ্ছে না। সবার অভিযোগ তিনি খাবার নিয়ে কারচুপি, পক্ষপাত করছেন। নিজের জন্য লুকিয়ে রেখেছেন ভাল খাবারগুলো, মেয়ে সদস্য হিসেবে পক্ষপাত করছেন মিস শায়লার ব্যাপারে।
-ওই বুইড়া ভামের জন্যই আমরা পথ হারাইছি। এখন আবার খাওয়া নিয়াও ঝামেলা করতেছে। ব্যাটা বুইড়ার শখ মিটে না, আবার মেয়েমানুষটারে নিয়া পড়ছে। উঁচু গলাতেই গজ গজ করতে লাগলেন জামিল সাহেব। মিস শায়লার সাড়া না পাওয়াটা এমনিতেই তাঁকে সারাক্ষণ জ্বালাচ্ছে। আর অন্যদিকে তিনিই সবচেয়ে বেশি সুবিধাবাদী।
তাঁর ক্রমাগত অশালীন কথা, আর তাতে অন্যদের সায় দিয়ে যাওয়া শেষ পর্যন্ত আর সহ্য হল না শান্ত, ধৈর্যশীল মাসুদ সাহেবের। 'অতিরিক্ত করতেছেন আপনি। সাবধান বললাম, কোনরকম উল্টা-পাল্টা কথা যদি আর একটা বলছেন!' তাঁর উঁচু গলার এই একটা কথাই আগুনে ঘি ঢালার জন্য যথেষ্ট ছিল। কি ঘটল পরবর্তী দু-তিন মিনিট সময়ে মনে করতে পারছি না, হুশ ফিরল মিস শায়লার তীব্র কন্ঠের একটানা চিৎকারে। আমরা ছয়জন নিজেদের আবিস্কার করলাম এক জায়গায় তালগোল পাকানো অবস্থায়। প্রায় প্রত্যেকেই কিছুটা আহত এবং রক্তাক্ত। মিস শায়লা তখনও অপ্রকৃতিস্থির মত হেঁচকি তুলে চিৎকার করে যাচ্ছেন। আমরা অস্বাভাবিক ক্ষীপ্রতায় সরে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ালাম। তাৎক্ষণিকভাবে তুলে নেয়া অস্ত্রগুলো হাতে ধরা, হিংস্র বুনো চোখ পরস্পরের ওপর, শিকারি জন্তুর মত ওঁৎ পেতে দাঁড়ালাম।
এবং দাঁড়িয়েই থাকলাম মুখোমুখি। চোখে হতবিহবল হিংস্র, বুনো দৃষ্টি, একইসাথে সতর্ক এবং আক্রমণাত্মক। আমাদের দাঁড়ানোর ভঙ্গী, মুখের ভাব এবং দৃষ্টির ভয়ানক হিংস্রতা ও ক্রূরতার তার সাথে পরিচয় ঘটেছে গত ছয়দিনে। স্পষ্টই জানি নিজেদের করণীয়। ভেতরের সহজাত প্রবৃত্তি বারবার তাড়া দেয়... "মারো অথবা মরো"। অতি সাবধানতার সাথে আমরা আক্রান্ত না হওয়া বা আক্রমণ করার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। এ অপেক্ষাকালের ব্যপ্তি যেন ছাড়িয়ে যায় অনন্তকে।
৪৪টি মন্তব্য ৪৪টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।