(রাজনীতি বিমুখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং আরো দুএকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ তরুণী একটা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল । সেই তরুণ তরুণীদের অংশ হিসাবে কয়েকটি পর্বে তুলে ধরার চেষ্টা করব তাদের স্বপ্ন খুনের সত্য ঘটনা )
আমাদের নিয়মিত কাজগুলি যেমন প্রতি মাসে বস্তিতে মেডিকেল টিম নিয়ে যাওয়া, রক্তের গ্রুপিং জানানো, পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে পরিবেশ আন্দোলনের সাথে প্রোগ্রাম করা, বন্যার্তদের মাঝে মেডিকেল টীম নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমরা কয়েকটি প্রোগ্রাম নিয়েছিলাম কিছু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এদের মধ্যে দুটি ছিলো ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ ঠেকানোর জন্য বাংলাদেশ জুয়োলজিক্যাল সোসাইটি এর সাথে একটি প্রোগ্রাম এবং অপরটি ভেজাল এবং নিম্নমানের ওষুধ তৈরী এবং বিক্রি বন্ধের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটির সাথে একটি প্রোগ্রাম । ডেঙ্গু নিয়ে প্রোগ্রামটি পরে আবার আমরা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের নেতৃত্বে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সাথেও করি এবং ভেজাল ওষুধ বিরোধী কর্মসূচীটি আমরা এফিয়ার্ড নামের একটি এনজিও এবং পরবর্তীতে পরিবেশ আন্দোলনকে সাথে নিয়েও করি ।
১৯৯৯-২০০২ সালের দিকে ডেঙ্গু রোগটি হঠাৎ করেই জনমনে আতংক তৈরী করলো । তখন জুয়োলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক মাহমুদুল আমিন যিনি আমাদের সাথে ছিলে। তিনি একদিন আমাদের ডেকে পাঠালেন এবং বললেন ডেঙ্গু নিয়ে একটি বড় কর্মসূচী নিতে । তিনি নিজহাতে ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পাবার উপায় নিয়ে আমাদের একটি লিফলেট লিখে দিলেন । আমরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের বাড়ীতে বাড়ীতে সেই লিফলেট বিলি করতে লাগলাম, তাদেরকে বোঝাতে লাগলাম আর সেইসাথে অনুমতি নিয়ে বাসার আশপাশ পরিচ্ছন্ন করে দিলাম । এই ব্যাপারে আমরা ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাহায্য নিয়েছিলাম।
ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের ব্যবসার ফলে আমাদের সমাজের নিম্ন নিম্ন আয়ের মানুষগুলো অসুস্থ হলে অনেক ক্ষেত্রেই কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে মৃত্যুবড়ি কিনে খাচ্ছেন । আমরা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার জন্য বাংলাদেশ ফার্মিসিউটিক্যাল সোসাইটিকে সাথে নিয়ে একটি কর্মসূচী হাতে নিলাম, আমাদের সেই কর্মসূচীতে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক এসে আমাদের সবকথা শুনলেন, আমরা এভিডেন্স দেখালাম , তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন । যদিও জানি যে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি । এ মৃত্যু ব্যবসা এখনো জমজমাট ।
টি এস সি যাত্রা
আমাদের কোন অফিস না থাকায় আমাদের সব মিটিং হতো কার্জন হলের ঘাসে কিংবা সায়েন্স লাইব্রেরীর পিছনে । কিন্তু কাজের পরিধি বেড়ে যাওয়াতে একটি অফিস ছাড়া কাজকর্ম চালানো খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো । আরেকটি প্রধান সমস্যা ছিলো পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ করা । ততদিনে সদস্য সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেলেও সক্রিয় সদস্য ৩০-৪০ জন । যদিও আমরা অধিকাংশই ছিলাম সায়েন্স ফ্যাকাল্টির কিন্তু সমস্যা ছিলো কোন কর্মসূচীতে কে কে আসতে পারছে আর কে আসতে পারছেনা সেটা অনেক সময় কর্মসূচীর দিন ছাড়া বোঝা যেতনা । তবে অধিকাংশ সদস্য বাসায় থাকার কারনে ফোনে যোগাযোগ করতে হতো যেটিও ছিলো একটি বিড়ম্বনা বিশেষ করে মেয়ে সদস্যদের ক্ষেত্রে ।
তবে যে ব্যাপারটির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি অফিস নেয়ার তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম সেটি হলো স্বপ্নটিকে বাচিয়ে রাখার এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যাবার পরে নতুন ছেলেদের মধ্যে সেটিকে ছড়িয়ে দেবার ইচ্ছা । এটি ২০০২ সালের প্রথম দিককার ঘটনা । আমরা নিয়মিত কাজ করলেও আমাদের কাজগুলির অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নয় । ফলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আমাদের পরিচিতি কম । তাই প্রথম বা ২য় বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের ভিতর থেকে আমাদের সদস্য হিসাবে যোগদানের সংখ্যা ছিলো খুব কম। আমি ততদিনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে গিয়েছি । অনার্স মাস্টার্স দুটিতেই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হলেও শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলার দেবার কোন সম্ভাবনা দেখছিলামনা । আমাদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের প্রায় সবাই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে । এখন আমরা সবাই যদি বের হয়ে যাই তাহলে হাল ধরবে কে? সবাই কর্ম ক্ষেত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়বে । তারমানে আমাদের স্বপ্নকে বাচিয়ে রাখার জন্য হলেও আমাদের নতুন বেশ কিছু উদ্যমী তরুণ-তরুণী দরকার ছিলো যারা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবে আর আমরা সহায়তা করবো । আর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কোন অফিস মানেই আমাদের প্রথম চিন্তা এলো টি এস সির ব্যাপারে । খোজ নিয়ে দেখলাম বেশ কয়েকটি রুম ফাকা পড়ে আছে ।
আমরা সবার প্রথমে যোগাযোগ করলাম সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার এর সাথে । তিনি ডিইউডিএস এর মডারেটর থাকায় টিএসসির ব্যাপারে স্যারের একটা ভালো প্রভাব আছে মনে হতো । স্যার আমাদের খুব একটা উৎসাহ দিলেননা আবার নিরুৎসাহিতও করলেননা । তিনি আমাদের বললেন তখন টি এস সির দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক আবুল কালাম স্যারের সাথে যোগাযোগ করতে । মনজুর স্যার বললেন তিনি আমাদের কথা কালাম স্যারের কাছে বলবেন । আমরা আবুল কালাম স্যারের সাথে যোগাযোগ করলাম । তিনি আমাদেরকে তার কলাভবনের অফিসে আসতে বললেন সাথে আমাদের সব কর্মকান্ডের বিবরণ । আমরা আমাদের বেশ কিছু প্রোগ্রামের ছবি তুলে রেখেছিলাম, আর আমাদের কাজকর্ম নিয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিটি পেপার কাটিং যত্নের সাথে সংরক্ষন করতাম । স্যার আমাদের কাজের বর্ণনা, আমাদের সাথে কে কে আছেন এবং বিশেষ করে পেপার কাটিংগুলো দেখে খুব ইমপ্রেসড হলেন । টি এস সিতে আমাদের সাময়িকভাবে বসতে দিতে তিনি রাজী হলেন । জায়গা হলো দোতলায় ট্যুরিষ্ট সোসাইটির পাশের খালি জায়গাটির এক কোণে (যেখানে অনেক নাট্যদল এবং আবৃত্তি সংগঠন মহড়া করতো) । আমরা বসবার একটুকু জায়গা পেয়ে, একটা ঠিকানা পেয়েই মহা খুশী । রাজনৈতিক পরিচয়হীন, সাংস্কৃতিক পরিচয়হীন কতগুলি সাধারণ তরুণ তরুণী যে তাদের স্বপ্ন নিয়ে কার্জন হলের ঘাস থেকে টিএসসির ভিতরে একটা বসবার জায়গা পাবে, এটি ছিলো আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি । একটা টেবিল, চারটি চেয়ার আর পিছনে একটি ব্যানার টাঙ্গিয়ে আমাদের টি এস সি পর্ব শুরু হলো । তখন যদি জানতাম যে এই টি এস সিতে আসাই আমাদের স্বপ্ন মৃত্যুর কারন হবে তবে নিশ্চয়ই আমরা আমাদের স্বপ্নের মৃত্যুর জন্য এতটা ব্যাকুল হতামনা । আমাদের আনন্দ দেখে সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই অলক্ষ্যে হেসেছিলেন ।
মানবতার সেবায় ছাত্রদের অধিকতর অংশগ্রহণের উপায়?
আমরা একটি ব্যাপার খেয়াল করেছিলাম যে আমাদের সংস্পর্শে আসা অনেকেই আমাদের কাজে অনুপ্রানিত হয়ে আমাদের সাথে যোগ দিলেও দু একটি প্রোগ্রাম পরেই তাদের অনেককেই খুজে পাওয়া যেতনা । আসলে সমস্যা ছিলো দুটি। প্রথমত: আমাদের কাজগুলি ছিলো অনেক কায়িক পরিশ্রমের, দ্বিতীয়ত: সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের মুখে কিছু হাসি দেখা ছাড়া অন্য কোন বিনোদন ছিলোনা । যার ফলে নতুন সদস্যদের মোটিভেটেড রাখাটি ছিলো একটি বড় চ্যালেন্জ । আমরা এই ব্যাপারটি নিয়ে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এর সাথে কথা বললাম । তারা আমাদের সাথে এই ব্যাপারগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেন যার মধ্যে কয়েকটি ধারণা ছিলো বেশ চমকপ্রদ । আমরা ঠিক করলাম তাদের এই কথাগুলিকেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সাধারণ ছাত্রদের সামনে তুলে ধরবো । আমরা
মানবতার সেবায় ছাত্রদের অধিকতর অংশগ্রহণের উপায়? এই শিরোনামে একটি বড় আকারের আলোচনা সভা করার সিদ্ধান্ত নিলাম টি এস সির মুল মিলনায়তনে । আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো দু্ইটি । প্রথমত : অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এর মতো আলোকিত মানুষদের কথার মাধ্যমে থেকে সাধারণ ছাত্রদের সমাজের প্রয়োজনে এগিয়ে আসার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করা এবং দ্বিতীয়ত: আমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের অবহিত করা ।
আমাদের এই সেমিনারে উপস্থিত থাকার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, হাঙ্গার প্রজেক্টের ড. বদিউল আলম মজুমদার, পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আবু নাসের খান, অধ্যাপক মাহমুদুল আমীন, অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং প্রো-ভিসি । আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ব্যাপক প্রচার চালালাম । আমাদের উদ্যোগর কথা জেনে আমাদের এই পুরো প্রোগ্রামটিকে স্পন্সর করতে রাজী হলেন আমাদের পূর্ব-পরিচিত এসিআই কনজুমার্স প্রোডাক্ট এর ডিরেক্টর সৈয়দ আলমগীর । এসিআই তখন নতুন মিনারেল ওয়াটার বাজারে ছাড়বে, তারা আমাদের যত প্রয়োজন তত মিনারেল ওয়াটার বিনামুল্যে দিলো, অংশগ্রহনকারী সবার জন্য আলাদা ফাইল এবং কলম দিলো । আমরা সেই ফাইলের ভিতরে "সেবা" এর জনসচেতনতা সৃষ্টির ব্যাপারে যতগুলি লিফলেট ছিলো সেগুলি দিয়ে দিলাম । এই ব্যাপারটি পুরোটাই কো-অর্ডিনেট করলো এসিআই ।
নির্দিষ্ট দিনে পুরো অডিটরিয়াম ভরে গেল ছাত্র-ছাত্রীতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও অন্যান্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা আসলো । কোন রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া শুধু এই মানুষগুলির কথা শোনার জন্য টি এস সি অডিটরিয়ামে এত লোকের উপস্থিতি আমি এর আগে দেখিনি। সকাল ১১টা থেকে শুরু হয়ে বেলা ৩টা পর্যন্ত চললো আলোচনা । অদ্ভুতরকমের প্রেরণাদায়ী বক্তব্য রাখলেন আনিসুল হক, মোজাফফর আহমেদ, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ । তবে সবাইকে ছাপিয়ে আমাদেরকে মন্ত্রমুগ্ধ করলেন ড. বদিউল আলম মজুমদার । সবার শেষে ক্ষুদ্র আমি সেবার কাজকর্মের ফিরিস্তি দিয়ে সবাইকে আহবান জানালাম সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের পাশে এসে দাড়াতে । আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে সবাই বাড়ি ফিরে গেলাম মানবতার সেবায় আরো সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসবার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ।
আমাদের এই প্রোগ্রামটির পর হঠাত করেই টি এস সির উপদেষ্টা আবুল কালাম স্যার আমাদের ডেকে পাঠালেন টি এস সির অফিসে । পাশে টি এস সির পরিচালক আলমগীর ভাই । আমাদেরকে জানালেন আমাদেরকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের পাশের রুমটি বরাদ্দ দিয়েছেন । তিনি নিজে এসে চাবি দিয়ে রুমটি খুলে আমাদের হাতে চাবিটি হস্তান্তর করলেন ।
আমাদের স্বপ্নের একটি ঠিকানা হলো তবে সেই সাথে স্বপ্ন খুনের দিকে আমরা বড় একটি ধাপ আগালাম ।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

