বাইরে খুব বৃষ্টি পড়ছে। মিলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে । বৃষ্টির পানির মত তার চোখের পানিও যদি একসময় শেষ হয়ে যেত, ভাবতে ভাবতেই তার চোখ আবারও পানিতে ভরে গেলো। ভালোই তো ছিল মিলার জীবনটা । বাবা-মার বড় আদরের মেয়ে ছিল মিলা। ঢাকা ভার্সিটির পড়া শেষ করে মা-বাবার পছন্দেই বিয়ে করল শিমুলকে। শিমুল অসম্ভব হ্যান্ডসাম একটা ছেলে। পেশায় ডাক্তার। সবদিক দিয়েই মিলার যোগ্য একজন বরই তার বাবা - মা পছন্দ করেছেন । প্রথমদিকের সময়গুলো অসম্ভব ভালো কেটেছে মিলার । শিমুল অনেক রোমান্টিক মনের মানুষ । মিলার পছন্দ অপছন্দ সবই খেয়ালে রাখত শিমুল। বছর দুই পরে মিলার কোল জুড়ে এলো মিষ্টি। এতো কিউট একটা মেয়ে যে আশেপাশের সবাই খালি ওকে কোলে নিতে চায়। মিষ্টির জন্মের আগে থেকেই শিমুল যেন কেমন বদলে যেতে লাগলো। আগের মত মিলাকে আর ভালোবাসতো না। মিলার সাথে কেমন জানি একটা গা ছাড়া ভাবে কথা বলতে লাগলো। আগের মত রোমান্টিজম আর রইলো না। মিলা ভাবলো হয়তো এটা শিমুলের কাজের চাপের ফলাফল। অথবা মিলাকে নিয়ে ও খুব চিন্তিত। কিন্তু শিমুলের এই পরিবর্তন থামলো না। শিমুল যেন অনেক দূরের একটা জগতের বাসিন্দা হয়ে গেলো। নতুন সন্তানের আগমনের সাথে সাথে আরও নতুন সব দায়িত্ব যোগ হলো মিলার জীবনে। বাচ্চার সেবা করতে গিয়ে ও যেন নিজের কাছের মানুষটিকেই হারিয়ে ফেলল। মিলা বুঝতে পারছিল শিমুল আর তার সেই আগের শিমুল নেই। কিন্তু পাছে ও কষ্ট পায় তাই মিলা কিছুই মুখ ফুটে বলে না। মিষ্টিকে নিয়ে ও একটা আলাদা জগত তৈরি করে ফেলে। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের সব অপূর্ণতা ভুলে যেতে চায় সে।
কিন্তু পারে না। বাস্তবতা মানুষের জীবনকে সুখি হতে দেয় না। একদিন মিলার খুব কাছের এক বান্ধবী সীমা মিলার বাসায় বেড়াতে এলো। পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে মিলা যেন আকাশের চাঁদ পেল। অনেক গল্প করলো দুই বান্ধবী মিলে । কিন্তু মিলা বুঝতে পারছিল সীমা যেন মিলাকে কি একটা বলতে চায়। মিলাকে সীমা বলে,"আচ্ছা মিলা দুলাভাই তোকা এখনও আগের মতই পাগলের মত ভালোবাসে? " মিলা হেসে উঠে," হ্যা রে । ও তো এখনও আমার জন্য পাগল। কেন? হঠাৎ এই কথা যে? " সীমা মিলার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে," আমার কাছে মিথ্যা বলিস না মিলা। আমি তোর চোখ দেখে বলতে পারিস তুই মিথ্যা বলছিস। আমি দুইদিন আগে শপিং এ গিয়ে তোর বরকে অন্য একটা মেয়ের সাথে হাতে হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি? তুই কি এগুলো জেনেও এই মিথ্যা সংসার করছিস? " মিলার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। "কি বকছিস এসব তুই? এসব মিথ্যা। তুই মিথ্যা বলছিস।" কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মিলা। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। তাহলে এজন্যেই শিমুলের এত ব্যস্ততা, এত অবহেল। যখন সে শিমুলের সংসারকে গোছানোর জন্য তার সব শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিচ্ছিল তখন শিমুল ব্যস্ত ছিল তার রঙ্গলীলায়। আর ভাবতে পারে না মিলা। চোখটা অন্ধকার হয়ে আসে।
শিমুল হাসপাতাল থেকে ফেরার পর মিলা কথাটা তুলেই ফেলে। "আজ আমাকে তুমি সত্যি করে বল যে কেন তুমি আর আগের মত নেই। আমাকে এত অবহেলা করার কারন কি?" শিমুল চুপ থাকে। তারপর নিস্তব্ধতা যখন ভাঙ্গে তখন মিলার সব কিছু যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। শিমুলের কাটাছেড়া উত্তর," তোমাকে আর আমার আগের মত ভালো লাগে না। সংসারের চাপে তুমি আমাকে ভুলে গেছ। তোমার মাঝে এখন আর আমি আমার কামনার নারীকে পাই না। আমি বুঝতে পারছি আজ হঠাৎ করে তুমি প্রশ্নটা আমাকে করোনি। তুমি কিছু শুনেছ। যা শুনেছ তার সবই সত্যি। কিন্তু তোমার কোনো ভয় নেই। আমি তোমাকে ডিভোর্স দিব না। তুমি তোমার জায়গায় থাকবে। কিন্তু আমি রিনিকে ছাড়তে পারবো না। ও বিয়েতে বিশ্বাসী না। সো তোমার কোনো ভয় নাই।"মিলা প্রচন্ড ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো। কি সব বলছে এই নির্লজ্ঝ পুরুষটা? ভালোবাসার সবকিছুই কি খালি ঐ একটা জিনিসে আবদ্ধ?
বৃষ্টি বাড়ছে। মিলা মেয়ের মুখের দিকে তাকালো। একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। এই লোক দেখানো সম্পর্ক ভাঙ্গার সময় এখনই। কষ্ট শুধু মেয়েটার জন্য । বাবার আদর হতে হয়ত বঞ্চিত হবে সে। কিন্তু বাবার অসভ্য আচরণ নিজ চোখে দেখার থেকে না দেখাই তার জন্য ভালো। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মিলা তার মুখ শক্ত করলো। মেয়ের জন্যেই বাঁচতে হবে তাকে নতুন করে।
(এই গল্পটা যখন লিখছিলাম তখন মাথায় ছিল সেইসব মেয়েদের কথা যারা সংসার আগলাতে গিয়ে নিজের যৌবনকে বিসর্জন দেয় আর তারই ফলে একসময় হারায় তাদের স্বামীর মন। এইসব স্বামীরা আসলে মানুষ না অন্যকিছু তা আপনারাই জানাবেন। )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



